📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 অধ্যায় ৩ : ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ক্ষেত্রে যারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী

📄 অধ্যায় ৩ : ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ক্ষেত্রে যারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী


ইমানের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে সালাফদের অভিমত যেহেতু সুসাব্যস্ত হয়ে গেল, সেহেতু আমাদের নিকট প্রতিভাত হলো, সালাফগণ মূলত দুটি ভ্রান্ত দল- 'ওয়ায়িদিয়্যা এবং মুরজিয়া' – এর মধ্যবর্তী উত্তম দল। ওয়ায়িদিয়‍্যারা হলো খারেজি সম্প্রদায় ও মুতাজিলা সম্প্রদায়। তারা বলে, কবিরা গুনাহগার ইমানের পরিচয় থেকে বের হয়ে যায় এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার হকদার হয়। ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার অন্তর্ভুক্ত খারেজি সম্প্রদায় বলে, উক্ত ব্যক্তি কাফির। পক্ষান্তরে মুতাজিলারা বলে, সে দুটি পর্যায়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়েছে। মুতাজিলাদের ব্যাপারটা আশ্চর্যের, তারা নিজেদের ব্যাপারে দাবি করে, তারা হলো আদলকারী (ন্যায়পরায়ণ)। অথচ তারাই আবার বলে, কেউ একটা কবিরা গুনাহ করলেই তার সকল ভালো আমল বরবাদ হয়ে যায়, যদিও তার আমল পাহাড় সমপরিমাণ হয়ে থাকে!

ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কা একটি বাতিল ফের্কা। কেননা সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির (বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত বর্ণনা) পর্যায়ের দলিলসমগ্র থেকে প্রতীয়মান হয়, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি ইমানের ন্যূনতম পরিচয়ের আওতা থেকে বের হয়ে যায় না। এজন্যই কিসাস (সমপরিমাণ বদলা) ও হুদুদের (নির্ধারিত শাস্তি) মতো শরয়ি দণ্ডবিধি— হত্যাকারী, চোর, ব্যভিচারের অপবাদদাতা ও মদ্যপানকারী ব্যক্তিদের ওপর প্রয়োগ করা হয়। যদি সে কবিরা গুনাহর কারণে ইমানের পরিচয় থেকে বের হয়েই যেত, তাহলে তো তার ওপর রিদ্দাহ তথা ধর্মত্যাগের দণ্ডবিধান প্রয়োগ করে হত্যা করা হত; তার জন্য ঐ (নির্দিষ্ট) দণ্ডবিধিগুলো বাস্তবায়ন করা হত না।

উদাহরণস্বরূপ আপনি হত্যার মতো অপরাধের কথা চিন্তা করেন। এটা অনেক বড়ো একটা অপরাধ। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا». “মুমিন ব্যক্তি তার দিনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশস্ততায় থাকে, যে পর্যন্ত না সে কোনো হারাম (অবৈধ) রক্তপাতে লিপ্ত হয়।” (রক্তপাত ঘটানোর পরেও) হত্যাকারীকে মুমিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হাদিসে।

আল্লাহ তায়ালা যখন কিসাসকে বাধ্যতামূলক করছেন, তখন তিনি হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “হে ইমানদারগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিসাসের বিধান লিখে দেওয়া হয়েছে।” এরপরে বলেছেন, «فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَان». “তবে তার (নিহত) ভাইয়ের পক্ষ থেকে তাকে (ঘাতককে) কোনো ক্ষমাপ্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা এবং সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় (দিয়াত) আদায় করা কর্তব্য।”

মহান আল্লাহ তায়ালা হত্যাকারীকে ইমানের পরিচয় থেকে খারিজ করে দেননি, বরং তার জন্য (ইমানি) ভ্রাতৃত্ব সাব্যস্ত করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেছেন বলেছেন, “আর মুমিনদের দুদল যুদ্ধে লিপ্ত হলে...।" তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরেও আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ইমানের নাম সাব্যস্ত করেছেন (তাদেরকে মুমিন হিসেবে অভিহিত করেছেন)। তিনি আরও বলেছেন, “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মিমাংসা করে দাও।”

ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার খণ্ডনে সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর অন্যতম- মহান আল্লাহর এই বাণী, “তারপর তাদেরকে আমি কিতাবের অধিকারী করলাম, যাদেরকে আমার বান্দাদের মধ্য থেকে আমি মনোনিত করেছি; তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থি এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রগামী। এটাই তো মহাঅনুগ্রহ।”

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজের নাফসের প্রতি জুলুমকারীকেও এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তিই আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে অবশ্যই এক মহাপাপ উদ্ভাবন করে। "

এই আয়াত তওবাকারীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি। কেননা তওবা তো সকল গুনাহ মিটিয়ে দেয়, যদিও তা শির্ক হয়ে থাকে।

ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার ব্যাপারে (আল্লাহর শাস্তির) আশঙ্কা করা হয় নিম্নোক্ত হাদিসটির কারণে। জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'এক লোক বলল, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ অমুক লোককে মাফ করবেন না।' আর আল্লাহ তাআলা বললেন, 'সে লোক কে? যে আমার শপথ করে বলে যে, আমি অমুককে মাফ করব না? আমি তাকেই মাফ করে দিলাম, আর তোর আমলকে নষ্ট করে দিলাম।'

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَوْ بَقَتْ دُنْيَاهُ وَآخِرَتَهُ». “সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, সে এমন কথা বলেছে, যা তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ করে দিয়েছে।”

টিকাঃ
৬৪ অর্থাৎ তারা বলে, 'তাকে আমরা মুমিনও বলব না, আবার কাফিরও বলব না।' – অনুবাদক।
৬৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৮৬২।
৬৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৭৮।
৬৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ৯।
৬৮ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১০।
৬৯ আল-কুরআন, ৩৫ (সুরা ফাতির) : ৩২।
৭০ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ৪৮।
৭১ কেননা তারা এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে – অনুবাদক।
৭২ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ২৬২১।
৭৩ সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৯০১; সনদ : হাসান।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 অধ্যায় ৪ : মুরজিয়া

📄 অধ্যায় ৪ : মুরজিয়া


মুরজিয়া ফের্কা ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার বিপরীত। মুরজিয়াদের মধ্যে বেশকিছু দল রয়েছে। এমনকি আবুল হাসান আল-আশআরি রাহিমাহুল্লাহ মুরজিয়াদের বারোটি দলের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর পরে আরও দলের আবির্ভাব হয়েছে। মুরজিয়াদের সূচনালগ্ন থেকে তাদের প্রধান বক্তব্য ছিল, 'কোনো আমল না থাকলেও ইমান বিশুদ্ধ থাকবে।' তারা ইমানের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করা থেকে সকল আমলকে মুলতবি করেছে। কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবি-তাবেয়িদের বক্তব্য পরিত্যাগ করাই মূলত তাদের এই মতাদর্শ উদ্ভাবিত হওয়ার কারণ। পরন্তু তারা আকলের (বিবেক) ওপর এবং ভাষা থেকে নিজস্ব বুঝানুযায়ী গৃহীত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করেছে। এখান থেকেই আমরা দেখতে পাই, বিদাতিরা তাদের রায়, বুঝ ও ভাষা থেকে গৃহীত ব্যাখ্যার আলোকে কুরআনের তাফসির (ব্যাখ্যা) করেছে। তারা সুন্নাহনির্ভর তাফসির, হাদিস এবং সালাফদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেনি। তারা নির্ভর করেছে (আরবি) সাহিত্যের গ্রন্থাবলির ওপর; নির্ভর করেছে কালামের কিতাবসমগ্রের ওপর, যা তাদের গুরুরা প্রণয়ন করেছে।

যেহেতু কুরআন-সুন্নাহর দলিল ও সালাফদের ইজমা (সর্ববাদিসম্মত অভিমত) অনুযায়ী এই ফের্কার মতাদর্শগুলো পর্যালোচনা করা এবং সেগুলো জ্ঞানতাত্ত্বিক খণ্ডন করাই আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য, সেহেতু আমি সুস্পষ্ট হক বিরোধী এই ফের্কার মতাদর্শগুলো আলোকপাত করব এবং শরিয়তের দলিল অনুযায়ী সেগুলোর খণ্ডন করব।

টিকাঃ
৭৪ অনুবাদকের টীকা : গ্রিক ফিলোসফির তথাকথিত ইসলামিক ভার্শনকে ইলমুল কালাম তথা কালামশাস্ত্র বলে। যৌক্তিক কথা মাত্রই তা কালামশাস্ত্র নয়, কারণ কুরআন-সুন্নাহয় প্রচুর যৌক্তিক কথা রয়েছে। বরং গ্রিক ফিলোসফি, সার্বজনিক যৌক্তিক নীতিমালা এবং শরিয়তের কথামালা থেকে তৈরি করা এমন অভিযোজিত যৌক্তিক প্রমাণাদির সংকলনকে কালাম বলে, যা দিয়ে এই শাস্ত্রচর্চাকারীরা আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করত। কিন্তু এসব নির্দিষ্ট যৌক্তিক প্রমাণকে গ্রহণ করার ফলে তারা মহান আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করতে বাধ্য হয়। এজন্য ন্যায়নিষ্ঠ সালাফগণ ইলমুল কালাম চর্চা করতে নিষেধ করেছেন এবং এক্ষেত্রে তীব্র কঠোরতা আরোপ করেছেন। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: মুস্তাফা মুহাম্মাদ হিলমি, মানহাজু উলামায়িল হাদিসি ওয়াস সুন্নাতি ফি উসুলিদ্দিন (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৬ হি.), পৃ. ৫৩-৮৪ ও ১৯৮-১৯৯; ইউসুফ বিন মুহাম্মাদ আলি আল-গাফিস, শারহুল কাওয়ায়িদিস সাবয়ি মিনাত তাদমুরিয়্যা, ই-বুক (মুদ্রণবিহীন ডক ফাইল, তাবি), পৃ. ১১-১৩, তথ্য সংগ্রহের তারিখ: ২২শে নভেম্বর, ২০২৩ খ্রি., https://t.me/yosfe555/1466; আবু ইসমায়িল আল-হারাউয়ি, জাম্মুল কালামি ওয়া আহলিহি, তাহকিক : আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আশ-শিবল (মদিনা : মাকতাবাতুল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১ম প্রকাশ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি. - ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি.), খ. ৫, পৃ. ৬৮-২২১।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 অধ্যায় ৬ : সংক্ষেপে মুরজিয়াদের আরও কিছু বিদাতি আকিদার বিবরণ এবং মুরজিয়া বিষয়ক আলোচনার সমাপ্তি

📄 অধ্যায় ৬ : সংক্ষেপে মুরজিয়াদের আরও কিছু বিদাতি আকিদার বিবরণ এবং মুরজিয়া বিষয়ক আলোচনার সমাপ্তি


তারা বলে, “কিছু আমলকে ইমান বলে অবহিত করা হয়েছে, এটা রূপকার্থে।” এর জবাব—কথার মূল হচ্ছে হাকিকি বা প্রকৃত অর্থ। দলিল ব্যতিরেকে (কোনো কথাকে) রূপক বলা যাবে না। আর এ ব্যাপারে কোনো দলিল নেই। বরং দলিল—এর বিপরীত অর্থ বহন করে।

মুরজিয়ারা ইসলামকে ইমানের একটি অংশ বানিয়ে দিয়েছে। তারা বলে, ইমান কেবল একটামাত্র জিনিস, এটা খণ্ডিত হয় না। তারা আরও বলে, কোনো ব্যক্তির মধ্যে ইমান এবং মুনাফেকি একত্র হতে পারে না; আবার কারও মধ্যে ইমান এবং কুফরের একটি অংশও একত্রিত হতে পারে না।

মুরজিয়াদের কেউ কেউ মনে করে, আল্লাহর প্রতি কুফরি করার মানে কেবল তাঁর সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা (অন্যান্য বিষয় কুফরি নয়)। তাদের মতে, ভালো আমলগুলোর একটি অপরটির সাথে সম্পৃক্ত নয়।

তাদের আরেকটি বিদাতি মত হলো, “ফাসেককে পূর্ণ ইমানদার বলা।” সঠিক কথা হলো—ফাসেকের সাথে ফাসেকির গুণ যুক্ত করে দেওয়া হবে; বলতে হবে, কবিরা গুনাহগার ফাসেক মুমিন, যেন (ভুলবশত) কেউ তাকে পূর্ণ ইমানদার মনে না করে।

মুরজিয়াদের বিদাতি আকিদা মোতাবেক মুনাফেকির প্রকার স্রেফ একটিই, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। অথচ বিশুদ্ধ আকিদা মোতাবেক অভিমত হলো—মুনাফেকি দু ভাগে বিভক্ত : একটি বড়ো মুনাফেকি, যা ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়; আরেকটি ছোটো মুনাফেকি, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।

মুরজিয়াদের আরেকটি বিদাতি আকিদা-একজন (মুমিন) বান্দার বিলকুল কোনো আমল নাও থাকতে পারে, যদিও উক্ত আমল করার জন্য সেই বান্দার উপযুক্ত ইচ্ছে ও ক্ষমতা থাকে এবং 'আমলটি বাস্তবায়নে বাধা দেয়' এমন যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয়ে যায়।

মুরজিয়াদের আরেকটি বিদাত—তাদের এমন কথা বলা যে, 'কুফরি কাজগুলো মূলত কুফরের আলামত, সরাসরি কুফর নয়' এবং তাদের এমন কথা বলা যে, 'শরিয়ত যাকে কাফির হিসেবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তার অন্তর কেবল বিশ্বাস ও ইমান থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই উক্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।' তাদের এই বক্তব্য সকল বিবেকবান মানুষের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা মানুষ কখনো কখনো জানতে পারে, হক আছে অন্য ব্যক্তির সাথে। এ সত্ত্বেও সে উক্ত হককে অস্বীকার করতে পারে, অহংকারবশত, কিংবা হিংসাবশত, অথবা অন্ধ-অনুকরণবশত, কিংবা কোনো কিছুর লোভে বা ভয়ে।

মুরজিয়াদের এসব বিদাতি বক্তব্য এবং সেসবের খণ্ডন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক দীর্ঘায়ত হয়ে যাবে। তবে আমি দুটো বিষয়ে সচেতন করতে চাই। যথা :

এক. আল্লাহর পাকড়াও হতে নিরাপদবোধ করা থেকে সাবধান থাকতে হবে, মানুষদেরকেও সাবধান করতে হবে এবং 'ইমান থাকলে পাপকাজ কোনো ক্ষতি করতে পারে না' - এমন দাবি করে পাপকাজ সম্পাদন করা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কেননা ইমানদার ব্যক্তিবর্গ নিজেদের কৃত পাপের দরুন আল্লাহর আজাব চলে আসার আশঙ্কা করে। এই তো একজন মহিলা, যে একটি বিড়ালের জন্য জাহান্নামে গেছে, আবার সামান্য সময়ের একটি গুনাহর কারণে (বিবাহিত) ব্যভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা এটাকে তুচ্ছ গণ্য করেছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটা ছিল গুরুতর (পাপ)।”

একটি পাপ অপর পাপকে টেনে আনে, এ কথার ভিত্তিতে বলা যায়, আল্লাহর নাফরমানিকে সামান্যতম বিষয় মনে করার গুনাহ মূল গুনাহর কাজটি সম্পাদন করার চেয়েও ভয়াবহ!

দুই. শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব ও সৌদ পরিবারের ইমামদের থেকে আরম্ভ করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মহান আল্লাহ এই দেশের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন নবিদের মানহাজ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত সালাফি দাওয়াতের মাধ্যমে। আমাদের যে কারও কাছে কোনো (শরয়ি) বিষয় সংশয়াবিষ্ট হলে, তিনি এ দেশের কিতাব-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ আকিদার (বিদ্বান হিসেবে) সুপরিচিত উলামাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। এ স্থলে আমি আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে নিই। বিষয়টি হলো, ইলমের গভীর জ্ঞানসম্পন্ন উলামাদের নিকট থেকেই ইলম নেওয়া বাঞ্ছনীয়, যাঁরা যোগ্য ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে ইলম হাসিল করেছেন, এবং ইলম-অর্জনের ক্ষেত্রে স্রেফ কিতাবপত্রের ওপর নির্ভর করেননি। যেমন কথিত আছে, “তুমি স্রেফ কিতাব থেকে জ্ঞানার্জন করা ব্যক্তির নিকট থেকে ইলম নিয়ো না, এবং স্রেফ কুরআনের মুসহাফ দেখে মুখস্থ করা ব্যক্তির নিকট থেকে কুরআন শিখ না (যে ব্যক্তি কোনো শিক্ষকের কাছে নিজের পড়া শোনায়নি, বরং কুরআন থেকে নিজে নিজে মুখস্থ করেছে শুধু)।” আরও বলা হয়, “যে ব্যক্তির শাইখ হলো তার কিতাব, তার সঠিকতার চেয়ে ভুলের পরিমাণই বেশি।”

এই ছিল আমাদের আলোচনা। মহান আল্লাহর কাছে আমি প্রার্থনা করছি, তিনি যেন সকল মুসলিমকে সেসব বিষয়ের তৌফিক দেন, যেগুলো তিনি ভালোবাসেন এবং যেসবের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, তিনি যেন মুসলিমদের শাসকবর্গকে এই বরকতময় শরিয়ত দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করার তৌফিক দেন, মুসলিমদের উলামাদেরকে দলিল অনুযায়ী হককে প্রকাশ করার তৌফিক দেন। এও প্রার্থনা করছি, তিনি যেন ভ্রষ্টকারী চিন্তাধারা ও বিপথগামী মতাদর্শ থেকে মুসলিমদের আকিদাকে হেফাজত করেন। আমাদের নবি মুহাম্মাদ, তাঁর অনুসারীবর্গ ও সাহাবিদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে ধার্য হোক অজস্র সালাত ও সালাম।

টিকাঃ
২১৪ অনুবাদকের টীকা : শেষোক্ত অনুচ্ছেদটি আরবিতে এমনভাবে ছিল— «ومن بدع المرجئة : أن فعل العبد قد ينعدم مع كون العبد مريدا له قادرا عليه مع انتفاء الموانع عن فعله». আমি (মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মৃধা) ১লা সফর ১৪৪৫ হিজরি মোতাবেক ১৮ই আগস্ট ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে সৌদি আরবের বিশিষ্ট আকিদাবিশারদ শাইখ সুলতান আল-উমাইরি হাফিজাহুল্লাহর কাছে এই অনুচ্ছেদটির ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, এর দ্বারা মুরজিয়াদের জিনসুল আমাল (সমুদয় আমল) বিষয়ক আকিদা উদ্দেশ্য করা হয়েছে। মুরজিয়ারা বিশ্বাস করে, জিনসুল আমাল তথা বিলকুল সমুদয় আমল পরিত্যাগকারী ব্যক্তি মুমিন। অথচ সালাফগণ একমত ছিলেন, কোনো ব্যক্তি যদি অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে স্বীকৃতি দেওয়ার পর কোনো আমলই না করে, তাহলে সে ব্যক্তি আর মুমিন থাকে না, বরং কাফির হয়ে যায়। জিনসুল আমাল পরিত্যাগের বিধান নিয়ে ইতঃপূর্বে আলোচনা গত হয়েছে।
২১৫ আল-কুরআন, ২৪ (সুরা নূর): ১৫।

📘 মুরজিয়াদের আকিদা 📄 পরিশিষ্ট : গ্র্যান্ড মুফতি সামাহাতুশ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখের অভিমত

📄 পরিশিষ্ট : গ্র্যান্ড মুফতি সামাহাতুশ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখের অভিমত


যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। হে আল্লাহ, আপনার বান্দা ও রসুল, সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ও রসুল, মুহাম্মাদের প্রতি, তাঁর সমুদয় সাহাবির প্রতি এবং কেয়ামত পর্যন্ত তাঁদেরকে উত্তমরূপে অনুসরণকারী ব্যক্তিবর্গের প্রতি সালাত, সালাম ও বরকত বর্ষণ করুন। অতঃপর :

আজ রাতে আমাদের সামনে অত্যন্ত মূল্যবান, উপকারী ও ফলপ্রসূ লেকচার পেশ করা হয়েছে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য খুবই জরুরি এই আলোচনার বিষয়গুলো অনুধাবন করা, যাতে সে জাগ্রত জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে, এবং কুরআন-সুন্নাহ-বিরোধী বাতিল ও বিরল মতবাদ থেকে বেঁচে থাকতে পারে।

লেকচারের বিষয় ছিল, ইমানের প্রকৃতত্ব (এবং মুরজিয়াদের বিদাত)। ইমানের মর্মার্থ কী, যা কুরআনের আয়াত এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়েছে? যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “যারা অদৃশ্যের প্রতি ইমান রাখে।”

মহান আল্লাহ আরও বলেন, “(এই নেক আমলগুলো যারা করে) তারাই তো প্রকৃত মুমিন।” তিনি আরও বলেন, "আর আমাদের দায়িত্ব হলো মুমিনদের সাহায্য করা।” তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় আমাদের রসুলগণকে এবং যারা ইমান এনেছে তাদেরকে আমি সাহায্য করব পার্থিব জীবনে, আর যেদিন সাক্ষীবর্গ দণ্ডায়মান হবে (সেই কেয়ামত-দিবসে)।”

ইমান কী? ইমানের প্রকৃত বাস্তবতা কী? ইমানের মূল কী? নিশ্চয় এটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি বিষয়। মুসলিমরা মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে— যেসময় মুসলিমদের অন্তরে ইমান অনেক শক্তিশালী ছিল— বিশ্বাস করতেন, ইমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, জবানের কথা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ; এখানে কাজ তথা আমল হলো ইমানের অংশ। তাঁরা বলতেন না, আমল ইমানের পূর্ণতার শর্ত। বরং তাঁরা বিশ্বাস করতেন, আমল ইমানের পরিচয়েরই একটি অংশ। তাই ইমান শব্দের মধ্যে যাবতীয় (ইবাদতমূলক) কথা, কাজ, এবং বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত হয়। ইমানের পরিচয় সবগুলোকেই শামিল করে এবং ইমানের মর্মার্থ সবগুলোকেই দাবি করে।

এজন্য তাঁরা আল্লাহর ইবাদত করেছেন; ইলম ও জাগ্রত জ্ঞানের ভিত্তিতে। তারা আল্লাহর রহমতের আশা করতেন এবং তাঁর আজাবের ভয় করতেন। যেমনভাবে কোনো মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “তুমি তোমার অন্তরে কেমন অনুভব করছ?” তাহলে সে বলবে, “আল্লাহর কাছে মঙ্গল কামনা করছি, এবং আমার পাপের জন্য আশঙ্কাও করছি।”

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো বান্দার অন্তরে যদি এমনটি একত্রিত হয় তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”

সাহাবিগণ আল্লাহর প্রতি আশা এবং নিজেদের কৃত পাপের জন্য আশঙ্কাকে সমন্বয় করেছিলেন। আশা তাঁদেরকে (পাপকে) অবহেলা করতে প্ররোচিত করেনি, আবার ভয়ও তাদেরকে নিরাশ ও হতাশ হতে উদ্বুদ্ধ করেনি। বরং তাঁরা একইসাথে ভয় করতেন এবং আশাও রাখতেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য করে, পরকালকে ভয় করে এবং তার রবের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, (সে কি তার মতো যে তা করে না?)।”

ইসলামের প্রথম যুগের মানুষরাও মনে করতেন, শরিয়তের অবাধ্য হওয়া ব্যক্তি একজন পাপী লোক, তাঁরা তাকে ইমানের পরিচয়ের আওতা থেকে বের করে দিতেন না, আবার তাকে পরিপূর্ণ ইমানের পরিচয়ও দিতেন না। তাঁরা মনে করতেন, একজন লোক মুমিন হওয়া সত্ত্বেও জাহেলি যুগের আচরণ ও ছোটো কুফরমূলক কর্মকাণ্ডে নিপাতিত হতে পারেন। যেমন আবু জার রাদিয়াল্লাহু আনহু জনৈক ব্যক্তিকে তাঁর মা তুলে ভর্ৎসনা করলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উদ্দেশে বলেন, «إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّة». “নিশ্চয়ই তুমি এমন লোক, যার মধ্যে জাহেলি যুগের স্বভাব আছে।”

সাহাবিগণ মনে করতেন, ইমানের পরিচয় একজন মুসলিমের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, যদিও তার মাঝে শরিয়তবিরোধী বিষয়াদি বিদ্যমান থাকে। অনুরূপভাবে একজন লোক মুমিন হওয়া সত্ত্বেও নিজের মধ্যে মুনাফেকির বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে। যেমন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফেকের ব্যাপারে বলেছেন, «آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثُ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ». “মুনাফেকের আলামত তিনটি; কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা দিলে খেলাপ করে এবং আমানত দেওয়া হলে খেয়ানত করে।” তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, «لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَا يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيهَا أَبْصَارَهُمْ حِينَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ».
“কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোনো মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন লুটতরাজকারী মুমিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুট করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে।”

এ সত্ত্বেও উক্ত ব্যক্তির লুটতরাজ, চুরি ও মদ্যপান তাকে ইমানের পরিচয়ের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়নি। কিন্তু এসব বিষয় তার ইমানকে দুর্বল করে দেয় এবং তার ইমানকে ত্রুটিপূর্ণ করে তোলে, পরিপূর্ণ ইমান আনয়ন করে না।

আবার সাহাবিগণ পাপী লোকদেরকে স্রেফ তাদের পাপের জন্য কাফির বলতেন না। কিন্তু তাঁরা বলতেন, এ সমস্ত লোক ফাসিক, কবিরা-গুনাহগার। তবে তারা পাপের জন্য কাফির বলতেন না।

অনন্তর যখন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত-আমলের সায়াহ্নে খারেজিদের উত্থান ঘটল এবং খারেজিরা তাদের এই কদর্য ও জঘন্য বিদাত জাহির করল—যে ব্যক্তিই পাপকাজ করবে, সে কাফির হয়ে যাবে, আর যে কাফির হবে তার জান-মাল হয়ে যাবে হালাল; ইমান বিভাজিত হতে পারে না, হয় পূর্ণাঙ্গ ইমান থাকবে, আর নয়তো পূর্ণাঙ্গ কুফর। যখন তারা এগুলো জাহির করল, তখন তারা এমন ভ্রষ্ট বিদাত আনয়ন করল, যার দরুন তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত হয়েছিল এবং তাদের জান-মাল হালাল গণ্য করেছিল।

ফলে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর সাথে সাহাবিগণও এই অনিষ্টকর ভ্রষ্ট বিদাতের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, যে বিদাতের দরুন তারা মুসলিমদেরকে কাফির ফতোয়া দিয়েছিল, শুধু কোনো পাপ বা ভুলে পতিত হওয়ার কারণে। তাঁরা ওই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কুফর ও ভ্রষ্টতার ফতোয়া আরোপ করেছিলেন। এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খারেজিদের ব্যাপারে বলেছেন, «تحقرون صلاتكم مع صلاتهم، وقراءتكم مع قراءتهم، يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية». “তাদের নামাজের তুলনায় তোমরা তোমাদের নামাজকে তুচ্ছ ভাববে। তাদের কেরাতের তুলনায় তোমরা তোমাদের কেরাতকে তুচ্ছ ভাববে। তারা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে, যেমনভাবে তির শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়।”

হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষের দিকে খারেজিদের একটি বিরোধী ফের্কার উদ্ভব হয়, যারা আমলকে ইমান থেকে পিছিয়ে দেওয়ার মত পোষণ করে (অর্থাৎ তাদের মতে আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়)। বরং তারা অতিরঞ্জন করে এমনও বলে যে, ইমান ও আমলের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নাই। আমল এক জিনিস, ইমান আরেক জিনিস! তাদের এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য-আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয়।

আবু হানিফার বক্তব্য সরাসরি এমন নয়। বরং আবু হানিফা বলতেন, আমল ও ইমান আলাদা; কিন্তু ইমানের দাবি হলো আমল করা। তিনি এমনটি মনে করতেন না যে, আমল পরিত্যাগকারী সঠিক অবস্থানে আছে। বরং (তাঁর কাছে) আমল পরিত্যাগের ফলে উক্ত ব্যক্তি পাপী হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু আবু হানিফা এটা বলতেন না যে, আমল ইমানেরই অংশ। তিনি আহলুস সুন্নাহর সাথে এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, শরিয়তের অবাধ্যতা ও শরিয়ত লঙ্ঘন করা ব্যক্তি ফাসিক। কিন্তু বিদাতি মুরজিয়ারা বলে, আমল ও ইমান সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়, কোনোভাবেই বিষয়দুটোর মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের এই মতাদর্শ কুরআনের দলিলপ্রমাণকে মিথ্যা-প্রতিপন্নকারী।

বরং তারা বলে—যেমনটি শাইখ ইঙ্গিত করেছেন—ইমানের জন্য স্রেফ অন্তরের বিশ্বাসই যথেষ্ট, অথবা শুধু আল্লাহকে জানাই যথেষ্ট, কিংবা আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞ না থাকাই যথেষ্ট। এগুলো এমনসব কথা, তারা যদি এগুলোর প্রকৃত বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করত, তাহলে এমন মতাদর্শের দিকে তারা অগ্রসর হতো না। তাদের কেউ যদি এসব কথার ফলে অপরিহার্যভাবে চলে আসা বিষয়াদি ও কথাগুলোর পরিণাম চিন্তা করত, তাহলে কখনোই তারা এ জাতীয় মতাদর্শের দিকে যেত না। কিন্তু তাদের কেউ কেউ তাকলিদ করে এসব মতাদর্শ গ্রহণ করেছে, আবার কেউ কেউ জেনেশুনেই এগুলো বলেছে তাদের অন্তরে থাকা মুনাফেকি ও ব্যাধির কারণে।

এসব থেকে বেঁচে আছে কেবল আহলুস সুন্নাহ, যাঁরা এ বিষয়ে অন্যায়ভাবে কাফির আখ্যাদাতা খারেজি-মুতাজিলি গোষ্ঠী এবং পথভ্রষ্ট মুরজিয়া গোষ্ঠীীর মাঝে মধ্যপন্থি। তারা এই দুটো বিপথগামী ফের্কার মাঝে মধ্যপন্থি। আহলুস সুন্নাহ বলে, নিশ্চয় ইমান কথা, কাজ ও বিশ্বাসের নাম। আহলুস সুন্নাহ মনে করে, নিশ্চয় আমল ইমানের অংশ। আহলুস সুন্নাহ বলে, স্রেফ পাপের ফলে একজন মুমিন ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায় না; সে কেবল তখনই ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়, যখন ইমানের মূলনীতি-বিনাশী কোনো বিষয় আনয়ন করে। যেমন দেখা গেল, সে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে, কিংবা গাইরুল্লাহর ইবাদত করে, অথবা শরিয়তের কোনো হারাম বিষয়ে হালাল বলে বিশ্বাস করে, বা কোনো হালাল বিষয়ে হারাম বলে বিশ্বাস করে।

হারামকে হালাল বলে বিশ্বাস করা কিংবা হালালকে হারাম বলে বিশ্বাস করা বড়ো কুফর হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের সবাই একমত। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ (বড়ো কুফর নয় এমন) গুনাহ ও পাপকাজকেই কুফরকে অপরিহার্যকারী বড়ো কুফর সাব্যস্ত করেনি। বরং আল্লাহর হারামকৃত বিষয় সম্পাদনকারীকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের না করে দিয়ে তারা তাকে ফাসিক (পাপী) আখ্যা দেয়। এজন্য কাউকে কাফির বলা, ফাসিক বলা ও বিদাতি বলার ব্যাপারগুলো আহলুস সুন্নাহর কাছে শরয়ি নীতিমালা অনুযায়ী সুশৃঙ্খলিত।

পক্ষান্তরে খারেজি ও মুতাজিলিদের কাছে এসব বলার পদ্ধতি—নিজেদের খেয়ালখুশি, আল্লাহর কাছে পানা চাই। আর মুরজিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা, যারা দুনিয়ায় কোনো কাফির আছে বলে মনে করে না, তারা আল্লাহর শরিয়তকে বাতিল করেছে এবং পাপিষ্ঠ ও পাপাচারী ব্যক্তিকে সাব্যস্ত করেছে ইমানের তরিকার ওপর প্রতিষ্ঠিত! কুরআনে এসেছে, “তবে কি আমরা (রবের অনুগত) মুসলিমদেরকে অপরাধীদের সমান গণ্য করব? তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা এ কেমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?!” এরাও নিজেদের চিন্তাধারা ও খেয়ালখুশিকে ফয়সালাকারী বানিয়ে নিয়েছে।

শাইখ এই লেকচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। যদিও এ বিষয়টি গুরুতর লড়াইয়ের জায়গা। এক্ষেত্রে কতজনের সমঝই না বিপথগামী হয়েছে এবং কতজনই না হয়রান-পেরেশান হয়েছে! কিন্তু মহান আল্লাহ শাইখকে যেই সূক্ষ্ম সমঝ এবং ইলম ও বয়ানের দৃঢ়তা দিয়ে তৌফিকপ্রাপ্ত বান্দা করেছেন, তা এই স্বল্প সময়ের মধ্যে এমন আলোচনাকে উত্তমরূপে নির্গত করেছে। শাইখ এ বিষয়ক সংশয় দূর করেছেন, (হককে আচ্ছন্নকারী) পর্দা উন্মোচিত করেছেন এবং হকের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ও হককে স্পষ্ট করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি আল্লাহর তরফ থেকে আসা তৌফিক ও হেদায়েত, যা দিয়ে আল্লাহ মুমিনের অন্তরকে সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকেন।

হে আল্লাহ, হে জিবরিল, মিকাইল ও ইসরাফিলের রব, হে আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা, হে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা! আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যকার মতপার্থক্যে ফায়সালা করে দিন। হে আল্লাহ, হকের ব্যাপারে যে ইখতিলাফ করা হয়েছে, এ সম্পর্কে আপনার ইচ্ছায় আমাকে সরল সঠিক পথ দেখান। কারণ আপনি যাকে ইচ্ছা সরল পথ দেখিয়ে থাকেন।

মানুষদের মধ্যকার মতপার্থক্যে আল্লাহ যাকে সুস্পষ্ট হক এবং কুরআন ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেক সঠিক মানহাজের দিশা দেন, তাকে সঠিক পথের হেদায়েতই দেওয়া হয়েছে। কেননা কুরআনের দলিলপ্রমাণে কোনো মতদ্বৈধতা ও বৈপরীত্য নেই, সুন্নাহর দলিলগুলোতেও বৈপরীত্য নেই। বরং যাকে আল্লাহ তৌফিক দিয়েছেন এবং হেদায়েত দিয়েছেন, তার কাছে এসব দলিল সুস্পষ্ট নিদর্শন। আল্লাহর কাছে আমি সবার জন্য তৌফিক চাইছি। আর নবি মুহাম্মাদের জন্য আল্লাহ সালাত ধার্য করুন।
সমাপ্ত, আলহামদুলিল্লাহ।

টিকাঃ
২১৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ৩।
২১৭ আল-কুরআন, ৮ (সুরা আনফাল) : ৪।
২১৮ আল-কুরআন, ৩০ (সুরা রুম) : ৪৭।
২১৯ আল-কুরআন, ৪০ (সুরা গাফির) : ৫১।
২২০ তিরমিজি, হা. ৯৮৩; ইবনু মাজাহ, হা. ৪২৬১; বর্ণনার মান : সহিহ।
২২১ আল-কুরআন, ৩৯ (সুরা জুমার): ৯।
২২২ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬০৫০; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৬৬১।
২২৩ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৩৩, মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ৫৯।
২২৪ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ২৪৭৫; হাদিসে চোরের ব্যাপারেও একই কথা বলা হয়েছে, কিন্তু শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বাক্যটি উল্লেখ করেননি। – অনুবাদক।
২২৫ অনুবাদকের টীকা: খারেজিরা কাফির, না কাফির নয়-এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর উলামাদের মাঝে খুবই শক্তিশালী ইখতিলাফ (মতদ্বৈধতা) আছে। অধিকাংশ উলামার মতে, খারেজিরা কাফির নয়। আরেকদল উলামার মতে, খারেজিরা কাফির। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: ইবতিহাজ বিনতু আব্দিল্লাহ আশ-শালান, আকওয়ালু আইম্মাতি আহলিস সুন্নাহ ফিল হুকমি আলাল খাওয়ারিজ (রিয়াদ: দারুস সামিয়ি, ১ম প্রকাশ, ১৪৩৪ হি./২০১৩ খ্রি.), পৃ. ৯৬-১১৫, ১৩৭-১৬৩, ১৭৯-৩৫২।
২২৬ হাদিসটির মূল দ্রষ্টব্য: আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৯৩১; মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ১৫৬৬।
২২৭ আল-কুরআন, ৬৮ (সুরা কালাম): ৩৫-৩৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px