📄 অধ্যায় ২ : সালাফদের নিকট ইমানের প্রকৃত পরিচয়
আহলুস সুন্নাহ ইমানের পরিচয় দিয়েছে, জবানের কথা, অন্তরের বিশ্বাস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজকে বলা হয় ইমান। ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৪১ হি.) বলেন, «الْإِيمَانُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ». “ইমান হলো কথা ও কাজ; যা বাড়ে এবং কমে।” ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৫৬ হি.) তাঁর 'আস-সহিহ' গ্রন্থের শুরুতে উল্লেখ করেছেন, «وَهُوَ قَوْلٌ وَفِعْلٌ وَيَزِيدُ وَيَنْقُصُ». “ইমান হলো কথা ও কাজ; যা বাড়ে এবং কমে।” একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, «وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ مِنَ الْإِيمَانِ». “আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করাও ইমানের অন্তর্ভুক্ত।”
এটা শুধু উক্ত দুই ইমামেরই কথা নয়, বরং এটা সাহাবাগণ এবং আহলুস সুন্নাহর ঐক্যমত। (এ বিষয়ে) তাঁদের কথামালা একদল উলামা উল্লেখ করেছেন।
ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৪৬৩ হি.) বলেন :
«الْقَوْلُ فِي الْإِيمَانِ عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَهُمْ أَهْلُ الْأَثَرِ مِنَ الْمُتَفَقِّهَةِ وَالنَّقَلَةِ وَعِنْدَ مَنْ خَالَفَهُمْ مَنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ فِي الْعِبَارَةِ عَنْهُ اخْتِلَافٌ وَسَتَذْكُرُ مِنْهُ فِي হ্যﺬَا الْبَابِ مَا فِيهِ مَقْنَعٌ وَهِدَايَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ أَجْمَعَ أَهْلُ الْفِقْهِ وَالْحَدِيثِ عَلَى أَنَّ الْإِيمَانَ قَوْلُ وَعَمَلٌ وَلَا عَمَلَ إِلَّا بِنِيَّةٍ وَالْإِيمَانُ عِنْدَهُمْ يَزِيدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ وَالطَّاعَاتُ كُلُّهَا عِنْدَهُمْ إِيمَانٌ».
“ইমান বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর বক্তব্য : আহলুস সুন্নাহ হলেন হাদিস বর্ণনাকারী ও ফিকহের জ্ঞানে সমৃদ্ধ আহলুল আসার। সমুদয় ফাকিহ ও মুহাদ্দিস একমত হয়েছেন, ইমান হলো কথা ও কাজের নাম। আর নিয়ত ছাড়া কোনো আমল (শুদ্ধ) হয় না। আহলুস সুন্নাহর মতে ইমান (শরিয়তের) আনুগত্যমূলক কাজের ফলে বাড়ে এবং অবাধ্যতার ফলে কমে যায়। তাঁদের মতে (শরিয়তে বিবৃত) সমস্ত ভালো কাজ ইমানের অন্তর্ভুক্ত।” ইবনু আব্দিল বারের বক্তব্য এখানেই সমাপ্ত। এরপর ইবনু আব্দিল বার মুরজিয়াতুল ফুকাহাদের মতানৈক্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেছেন, “কাঙিক্ষত শরয়ি ইমান- বিশ্বাস, কথা ও কাজ ব্যতিরেকে অর্জিত হয় না। অধিকাংশ ইমামগণ এই মত পোষণ করেছেন। এমনকি ইমাম শাফেয়ি, আহমাদ, আবু উবাইদ-সহ অপরাপর উলামা এ মর্মে ইজমা (সর্ববাদিসম্মত অভিমত) বর্ণনা করেছেন যে, ইমান হলো কথা ও কাজ, যা বাড়ে এবং কমে।” বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৫১৬ হি.) শারহুস সুন্নাহয় উল্লেখ করেছেন, «اتَّفَقَتِ الصَّحَابَةُ وَالتَّابِعُونَ، فَمَنْ بَعْدَهُمْ مِنْ عُلَمَاءِ السُّنَّةِ عَلَى أَنَّ الأَعْمَالَ مِنَ الإِيمَانِ ... وَقَالُوا: إِنَّ الإِيمَانَ قَوْلُ، وَعَمَلٌ، وَعَقِيدَةٌ». “সাহাবিবর্গ, তাবেয়িবৃন্দ এবং তৎপরবর্তী সুন্নাহপন্থি উলামাগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন, যাবতীয় আমল ইমানের অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা আরো বলেছেন, ইমান হলো কথা, কাজ এবং বিশ্বাস।”
এসব বর্ণনায় মতানৈক্য রয়েছে—এমনটি যেন আবার কেউ ভেবে না বসে। কেননা ইমানের পরিচয়কে যিনি শুধু কথা ও কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন তিনি 'কথা' বলতে জবান ও অন্তরের কথা উদ্দেশ্য করেছেন। আর যিনি 'বিশ্বাস' শব্দটি বাড়িয়ে বলেছেন, তিনি মূলত আশঙ্কা করেছেন, কেউ হয়তো ভ্রমাত্মক ধারণা করে বসবে, 'বিশ্বাস' অন্তরের কথার অন্তর্ভুক্ত নয়! তাঁদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, “ইমান কথা, কাজ এবং নিয়তের নাম।” কেউ আরও বৃদ্ধি করে বলেছেন, “সুন্নাহর অনুসরণও (ইমান)।” কেননা কথা এবং কাজ কেবল সুন্নাহ অনুসারে করলেই তা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্ণিত হয়েছে :
«سُئِلَ سَهْلُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ التستري عَنْ الْإِيمَانِ مَا هُوَ؟ فَقَالَ: قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَنِيَّةٌ وَسُنَّةٌ لِأَنَّ الْإِيمَانَ إِذَا كَانَ قَوْلًا بِلَا عَمَلٍ فَهُوَ كُفْرٌ وَإِذَا كَانَ قَوْلًا وَعَمَلًا بِلَا نِيَّةٍ فَهُوَ نِفَاقٌ وَإِذَا كَانَ قَوْلًا وَعَمَلًا وَنِيَّةً بِلَا سُنَّةٍ فَهُوَ بِدْعَةٌ».
সাহল আত-তুসতারি রাহিমাহুল্লাহকে (মৃ. ২৮৩ হি.) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “ইমান কী?” তিনি বলেন, “ইমান হলো কথা, কাজ, নিয়ত ও সুন্নাহ। কেননা ইমান যদি হয় আমলবিহীন কথা, তবে সেটা কুফরি। ইমান যদি হয় নিয়তবিহীন কথা ও কাজ, তবে সেটা নিফাক। আর ইমান যদি হয় সুন্নাতবিহীন কথা, কাজ ও নিয়ত, তবে সেটা বিদাত।”
টিকাঃ
৫৮ আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ, কিতাবুস সুন্নাহ, খ. ১, পৃ. ২০৭।
৫৯ আল-বুখারি, আস-সহিহ, খ. ১, পৃ. ১০, অধ্যায়: কিতাবুল ইমান।
৬০ আত-তামহিদ, খ. ৯, পৃ. ২৩৮; লালাকায়ি, শারহু উসুলিল ইতিকাদ, খ. ৪, পৃ. ৮৩২; ফাতহুল বারি, খ. ১; পৃ. ৪৭।
৬১ তাফসিরু ইবনি কাসির, খ. ১, পৃ. ৩৯।
৬২ শারহুস সুন্নাহ, খ. ১, পৃ. ৩৮।
৬৩ মাজমুউল ফাতাওয়া লিবনি তাইমিয়া, খ. ৭, পৃ. ১৭১।
📄 অধ্যায় ৩ : ইমানের প্রকৃত পরিচয়ের ক্ষেত্রে যারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী
ইমানের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে সালাফদের অভিমত যেহেতু সুসাব্যস্ত হয়ে গেল, সেহেতু আমাদের নিকট প্রতিভাত হলো, সালাফগণ মূলত দুটি ভ্রান্ত দল- 'ওয়ায়িদিয়্যা এবং মুরজিয়া' – এর মধ্যবর্তী উত্তম দল। ওয়ায়িদিয়্যারা হলো খারেজি সম্প্রদায় ও মুতাজিলা সম্প্রদায়। তারা বলে, কবিরা গুনাহগার ইমানের পরিচয় থেকে বের হয়ে যায় এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার হকদার হয়। ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার অন্তর্ভুক্ত খারেজি সম্প্রদায় বলে, উক্ত ব্যক্তি কাফির। পক্ষান্তরে মুতাজিলারা বলে, সে দুটি পর্যায়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়েছে। মুতাজিলাদের ব্যাপারটা আশ্চর্যের, তারা নিজেদের ব্যাপারে দাবি করে, তারা হলো আদলকারী (ন্যায়পরায়ণ)। অথচ তারাই আবার বলে, কেউ একটা কবিরা গুনাহ করলেই তার সকল ভালো আমল বরবাদ হয়ে যায়, যদিও তার আমল পাহাড় সমপরিমাণ হয়ে থাকে!
ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কা একটি বাতিল ফের্কা। কেননা সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির (বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত বর্ণনা) পর্যায়ের দলিলসমগ্র থেকে প্রতীয়মান হয়, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি ইমানের ন্যূনতম পরিচয়ের আওতা থেকে বের হয়ে যায় না। এজন্যই কিসাস (সমপরিমাণ বদলা) ও হুদুদের (নির্ধারিত শাস্তি) মতো শরয়ি দণ্ডবিধি— হত্যাকারী, চোর, ব্যভিচারের অপবাদদাতা ও মদ্যপানকারী ব্যক্তিদের ওপর প্রয়োগ করা হয়। যদি সে কবিরা গুনাহর কারণে ইমানের পরিচয় থেকে বের হয়েই যেত, তাহলে তো তার ওপর রিদ্দাহ তথা ধর্মত্যাগের দণ্ডবিধান প্রয়োগ করে হত্যা করা হত; তার জন্য ঐ (নির্দিষ্ট) দণ্ডবিধিগুলো বাস্তবায়ন করা হত না।
উদাহরণস্বরূপ আপনি হত্যার মতো অপরাধের কথা চিন্তা করেন। এটা অনেক বড়ো একটা অপরাধ। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا». “মুমিন ব্যক্তি তার দিনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশস্ততায় থাকে, যে পর্যন্ত না সে কোনো হারাম (অবৈধ) রক্তপাতে লিপ্ত হয়।” (রক্তপাত ঘটানোর পরেও) হত্যাকারীকে মুমিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হাদিসে।
আল্লাহ তায়ালা যখন কিসাসকে বাধ্যতামূলক করছেন, তখন তিনি হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “হে ইমানদারগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কিসাসের বিধান লিখে দেওয়া হয়েছে।” এরপরে বলেছেন, «فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَان». “তবে তার (নিহত) ভাইয়ের পক্ষ থেকে তাকে (ঘাতককে) কোনো ক্ষমাপ্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা এবং সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় (দিয়াত) আদায় করা কর্তব্য।”
মহান আল্লাহ তায়ালা হত্যাকারীকে ইমানের পরিচয় থেকে খারিজ করে দেননি, বরং তার জন্য (ইমানি) ভ্রাতৃত্ব সাব্যস্ত করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেছেন বলেছেন, “আর মুমিনদের দুদল যুদ্ধে লিপ্ত হলে...।" তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরেও আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ইমানের নাম সাব্যস্ত করেছেন (তাদেরকে মুমিন হিসেবে অভিহিত করেছেন)। তিনি আরও বলেছেন, “মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে মিমাংসা করে দাও।”
ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার খণ্ডনে সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর অন্যতম- মহান আল্লাহর এই বাণী, “তারপর তাদেরকে আমি কিতাবের অধিকারী করলাম, যাদেরকে আমার বান্দাদের মধ্য থেকে আমি মনোনিত করেছি; তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থি এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রগামী। এটাই তো মহাঅনুগ্রহ।”
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজের নাফসের প্রতি জুলুমকারীকেও এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তিই আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে অবশ্যই এক মহাপাপ উদ্ভাবন করে। "
এই আয়াত তওবাকারীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি। কেননা তওবা তো সকল গুনাহ মিটিয়ে দেয়, যদিও তা শির্ক হয়ে থাকে।
ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার ব্যাপারে (আল্লাহর শাস্তির) আশঙ্কা করা হয় নিম্নোক্ত হাদিসটির কারণে। জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'এক লোক বলল, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ অমুক লোককে মাফ করবেন না।' আর আল্লাহ তাআলা বললেন, 'সে লোক কে? যে আমার শপথ করে বলে যে, আমি অমুককে মাফ করব না? আমি তাকেই মাফ করে দিলাম, আর তোর আমলকে নষ্ট করে দিলাম।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَوْ بَقَتْ دُنْيَاهُ وَآخِرَتَهُ». “সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, সে এমন কথা বলেছে, যা তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ করে দিয়েছে।”
টিকাঃ
৬৪ অর্থাৎ তারা বলে, 'তাকে আমরা মুমিনও বলব না, আবার কাফিরও বলব না।' – অনুবাদক।
৬৫ আল-বুখারি, আস-সহিহ, হা. ৬৮৬২।
৬৬ আল-কুরআন, ২ (সুরা বাকারা): ১৭৮।
৬৭ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ৯।
৬৮ আল-কুরআন, ৪৯ (সুরা হুজুরাত) : ১০।
৬৯ আল-কুরআন, ৩৫ (সুরা ফাতির) : ৩২।
৭০ আল-কুরআন, ৪ (সুরা নিসা): ৪৮।
৭১ কেননা তারা এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে – অনুবাদক।
৭২ মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আস-সহিহ, হা. ২৬২১।
৭৩ সুনানু আবি দাউদ, হা. ৪৯০১; সনদ : হাসান।
📄 অধ্যায় ৪ : মুরজিয়া
মুরজিয়া ফের্কা ওয়ায়িদিয়্যা ফের্কার বিপরীত। মুরজিয়াদের মধ্যে বেশকিছু দল রয়েছে। এমনকি আবুল হাসান আল-আশআরি রাহিমাহুল্লাহ মুরজিয়াদের বারোটি দলের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর পরে আরও দলের আবির্ভাব হয়েছে। মুরজিয়াদের সূচনালগ্ন থেকে তাদের প্রধান বক্তব্য ছিল, 'কোনো আমল না থাকলেও ইমান বিশুদ্ধ থাকবে।' তারা ইমানের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করা থেকে সকল আমলকে মুলতবি করেছে। কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবি-তাবেয়িদের বক্তব্য পরিত্যাগ করাই মূলত তাদের এই মতাদর্শ উদ্ভাবিত হওয়ার কারণ। পরন্তু তারা আকলের (বিবেক) ওপর এবং ভাষা থেকে নিজস্ব বুঝানুযায়ী গৃহীত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করেছে। এখান থেকেই আমরা দেখতে পাই, বিদাতিরা তাদের রায়, বুঝ ও ভাষা থেকে গৃহীত ব্যাখ্যার আলোকে কুরআনের তাফসির (ব্যাখ্যা) করেছে। তারা সুন্নাহনির্ভর তাফসির, হাদিস এবং সালাফদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেনি। তারা নির্ভর করেছে (আরবি) সাহিত্যের গ্রন্থাবলির ওপর; নির্ভর করেছে কালামের কিতাবসমগ্রের ওপর, যা তাদের গুরুরা প্রণয়ন করেছে।
যেহেতু কুরআন-সুন্নাহর দলিল ও সালাফদের ইজমা (সর্ববাদিসম্মত অভিমত) অনুযায়ী এই ফের্কার মতাদর্শগুলো পর্যালোচনা করা এবং সেগুলো জ্ঞানতাত্ত্বিক খণ্ডন করাই আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য, সেহেতু আমি সুস্পষ্ট হক বিরোধী এই ফের্কার মতাদর্শগুলো আলোকপাত করব এবং শরিয়তের দলিল অনুযায়ী সেগুলোর খণ্ডন করব।
টিকাঃ
৭৪ অনুবাদকের টীকা : গ্রিক ফিলোসফির তথাকথিত ইসলামিক ভার্শনকে ইলমুল কালাম তথা কালামশাস্ত্র বলে। যৌক্তিক কথা মাত্রই তা কালামশাস্ত্র নয়, কারণ কুরআন-সুন্নাহয় প্রচুর যৌক্তিক কথা রয়েছে। বরং গ্রিক ফিলোসফি, সার্বজনিক যৌক্তিক নীতিমালা এবং শরিয়তের কথামালা থেকে তৈরি করা এমন অভিযোজিত যৌক্তিক প্রমাণাদির সংকলনকে কালাম বলে, যা দিয়ে এই শাস্ত্রচর্চাকারীরা আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করত। কিন্তু এসব নির্দিষ্ট যৌক্তিক প্রমাণকে গ্রহণ করার ফলে তারা মহান আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করতে বাধ্য হয়। এজন্য ন্যায়নিষ্ঠ সালাফগণ ইলমুল কালাম চর্চা করতে নিষেধ করেছেন এবং এক্ষেত্রে তীব্র কঠোরতা আরোপ করেছেন। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: মুস্তাফা মুহাম্মাদ হিলমি, মানহাজু উলামায়িল হাদিসি ওয়াস সুন্নাতি ফি উসুলিদ্দিন (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৬ হি.), পৃ. ৫৩-৮৪ ও ১৯৮-১৯৯; ইউসুফ বিন মুহাম্মাদ আলি আল-গাফিস, শারহুল কাওয়ায়িদিস সাবয়ি মিনাত তাদমুরিয়্যা, ই-বুক (মুদ্রণবিহীন ডক ফাইল, তাবি), পৃ. ১১-১৩, তথ্য সংগ্রহের তারিখ: ২২শে নভেম্বর, ২০২৩ খ্রি., https://t.me/yosfe555/1466; আবু ইসমায়িল আল-হারাউয়ি, জাম্মুল কালামি ওয়া আহলিহি, তাহকিক : আব্দুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আশ-শিবল (মদিনা : মাকতাবাতুল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১ম প্রকাশ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি. - ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি.), খ. ৫, পৃ. ৬৮-২২১।
📄 অধ্যায় ৬ : সংক্ষেপে মুরজিয়াদের আরও কিছু বিদাতি আকিদার বিবরণ এবং মুরজিয়া বিষয়ক আলোচনার সমাপ্তি
তারা বলে, “কিছু আমলকে ইমান বলে অবহিত করা হয়েছে, এটা রূপকার্থে।” এর জবাব—কথার মূল হচ্ছে হাকিকি বা প্রকৃত অর্থ। দলিল ব্যতিরেকে (কোনো কথাকে) রূপক বলা যাবে না। আর এ ব্যাপারে কোনো দলিল নেই। বরং দলিল—এর বিপরীত অর্থ বহন করে।
মুরজিয়ারা ইসলামকে ইমানের একটি অংশ বানিয়ে দিয়েছে। তারা বলে, ইমান কেবল একটামাত্র জিনিস, এটা খণ্ডিত হয় না। তারা আরও বলে, কোনো ব্যক্তির মধ্যে ইমান এবং মুনাফেকি একত্র হতে পারে না; আবার কারও মধ্যে ইমান এবং কুফরের একটি অংশও একত্রিত হতে পারে না।
মুরজিয়াদের কেউ কেউ মনে করে, আল্লাহর প্রতি কুফরি করার মানে কেবল তাঁর সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা (অন্যান্য বিষয় কুফরি নয়)। তাদের মতে, ভালো আমলগুলোর একটি অপরটির সাথে সম্পৃক্ত নয়।
তাদের আরেকটি বিদাতি মত হলো, “ফাসেককে পূর্ণ ইমানদার বলা।” সঠিক কথা হলো—ফাসেকের সাথে ফাসেকির গুণ যুক্ত করে দেওয়া হবে; বলতে হবে, কবিরা গুনাহগার ফাসেক মুমিন, যেন (ভুলবশত) কেউ তাকে পূর্ণ ইমানদার মনে না করে।
মুরজিয়াদের বিদাতি আকিদা মোতাবেক মুনাফেকির প্রকার স্রেফ একটিই, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। অথচ বিশুদ্ধ আকিদা মোতাবেক অভিমত হলো—মুনাফেকি দু ভাগে বিভক্ত : একটি বড়ো মুনাফেকি, যা ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়; আরেকটি ছোটো মুনাফেকি, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।
মুরজিয়াদের আরেকটি বিদাতি আকিদা-একজন (মুমিন) বান্দার বিলকুল কোনো আমল নাও থাকতে পারে, যদিও উক্ত আমল করার জন্য সেই বান্দার উপযুক্ত ইচ্ছে ও ক্ষমতা থাকে এবং 'আমলটি বাস্তবায়নে বাধা দেয়' এমন যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয়ে যায়।
মুরজিয়াদের আরেকটি বিদাত—তাদের এমন কথা বলা যে, 'কুফরি কাজগুলো মূলত কুফরের আলামত, সরাসরি কুফর নয়' এবং তাদের এমন কথা বলা যে, 'শরিয়ত যাকে কাফির হিসেবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তার অন্তর কেবল বিশ্বাস ও ইমান থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই উক্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।' তাদের এই বক্তব্য সকল বিবেকবান মানুষের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা মানুষ কখনো কখনো জানতে পারে, হক আছে অন্য ব্যক্তির সাথে। এ সত্ত্বেও সে উক্ত হককে অস্বীকার করতে পারে, অহংকারবশত, কিংবা হিংসাবশত, অথবা অন্ধ-অনুকরণবশত, কিংবা কোনো কিছুর লোভে বা ভয়ে।
মুরজিয়াদের এসব বিদাতি বক্তব্য এবং সেসবের খণ্ডন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক দীর্ঘায়ত হয়ে যাবে। তবে আমি দুটো বিষয়ে সচেতন করতে চাই। যথা :
এক. আল্লাহর পাকড়াও হতে নিরাপদবোধ করা থেকে সাবধান থাকতে হবে, মানুষদেরকেও সাবধান করতে হবে এবং 'ইমান থাকলে পাপকাজ কোনো ক্ষতি করতে পারে না' - এমন দাবি করে পাপকাজ সম্পাদন করা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। কেননা ইমানদার ব্যক্তিবর্গ নিজেদের কৃত পাপের দরুন আল্লাহর আজাব চলে আসার আশঙ্কা করে। এই তো একজন মহিলা, যে একটি বিড়ালের জন্য জাহান্নামে গেছে, আবার সামান্য সময়ের একটি গুনাহর কারণে (বিবাহিত) ব্যভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা এটাকে তুচ্ছ গণ্য করেছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটা ছিল গুরুতর (পাপ)।”
একটি পাপ অপর পাপকে টেনে আনে, এ কথার ভিত্তিতে বলা যায়, আল্লাহর নাফরমানিকে সামান্যতম বিষয় মনে করার গুনাহ মূল গুনাহর কাজটি সম্পাদন করার চেয়েও ভয়াবহ!
দুই. শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব ও সৌদ পরিবারের ইমামদের থেকে আরম্ভ করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মহান আল্লাহ এই দেশের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন নবিদের মানহাজ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত সালাফি দাওয়াতের মাধ্যমে। আমাদের যে কারও কাছে কোনো (শরয়ি) বিষয় সংশয়াবিষ্ট হলে, তিনি এ দেশের কিতাব-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ আকিদার (বিদ্বান হিসেবে) সুপরিচিত উলামাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। এ স্থলে আমি আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে নিই। বিষয়টি হলো, ইলমের গভীর জ্ঞানসম্পন্ন উলামাদের নিকট থেকেই ইলম নেওয়া বাঞ্ছনীয়, যাঁরা যোগ্য ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে ইলম হাসিল করেছেন, এবং ইলম-অর্জনের ক্ষেত্রে স্রেফ কিতাবপত্রের ওপর নির্ভর করেননি। যেমন কথিত আছে, “তুমি স্রেফ কিতাব থেকে জ্ঞানার্জন করা ব্যক্তির নিকট থেকে ইলম নিয়ো না, এবং স্রেফ কুরআনের মুসহাফ দেখে মুখস্থ করা ব্যক্তির নিকট থেকে কুরআন শিখ না (যে ব্যক্তি কোনো শিক্ষকের কাছে নিজের পড়া শোনায়নি, বরং কুরআন থেকে নিজে নিজে মুখস্থ করেছে শুধু)।” আরও বলা হয়, “যে ব্যক্তির শাইখ হলো তার কিতাব, তার সঠিকতার চেয়ে ভুলের পরিমাণই বেশি।”
এই ছিল আমাদের আলোচনা। মহান আল্লাহর কাছে আমি প্রার্থনা করছি, তিনি যেন সকল মুসলিমকে সেসব বিষয়ের তৌফিক দেন, যেগুলো তিনি ভালোবাসেন এবং যেসবের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, তিনি যেন মুসলিমদের শাসকবর্গকে এই বরকতময় শরিয়ত দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করার তৌফিক দেন, মুসলিমদের উলামাদেরকে দলিল অনুযায়ী হককে প্রকাশ করার তৌফিক দেন। এও প্রার্থনা করছি, তিনি যেন ভ্রষ্টকারী চিন্তাধারা ও বিপথগামী মতাদর্শ থেকে মুসলিমদের আকিদাকে হেফাজত করেন। আমাদের নবি মুহাম্মাদ, তাঁর অনুসারীবর্গ ও সাহাবিদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে ধার্য হোক অজস্র সালাত ও সালাম।
টিকাঃ
২১৪ অনুবাদকের টীকা : শেষোক্ত অনুচ্ছেদটি আরবিতে এমনভাবে ছিল— «ومن بدع المرجئة : أن فعل العبد قد ينعدم مع كون العبد مريدا له قادرا عليه مع انتفاء الموانع عن فعله». আমি (মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মৃধা) ১লা সফর ১৪৪৫ হিজরি মোতাবেক ১৮ই আগস্ট ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে সৌদি আরবের বিশিষ্ট আকিদাবিশারদ শাইখ সুলতান আল-উমাইরি হাফিজাহুল্লাহর কাছে এই অনুচ্ছেদটির ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, এর দ্বারা মুরজিয়াদের জিনসুল আমাল (সমুদয় আমল) বিষয়ক আকিদা উদ্দেশ্য করা হয়েছে। মুরজিয়ারা বিশ্বাস করে, জিনসুল আমাল তথা বিলকুল সমুদয় আমল পরিত্যাগকারী ব্যক্তি মুমিন। অথচ সালাফগণ একমত ছিলেন, কোনো ব্যক্তি যদি অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে স্বীকৃতি দেওয়ার পর কোনো আমলই না করে, তাহলে সে ব্যক্তি আর মুমিন থাকে না, বরং কাফির হয়ে যায়। জিনসুল আমাল পরিত্যাগের বিধান নিয়ে ইতঃপূর্বে আলোচনা গত হয়েছে।
২১৫ আল-কুরআন, ২৪ (সুরা নূর): ১৫।