📄 আমানতের খেয়ানত করা
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمِنْهُم مَّنْ عَاهَدَ اللهَ لَئِنْ آتَانَا مِنْ فَضْلِهِ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ الصَّالِحِينَ فَلَمَّا آتَاهُم مِّنْ فَضْلِهِ بَخِلُوا بِهِ وَتَوَلَّواْ وَهُم مُّعْرِضُوْنَ - فَأَعْقَبَهُمْ نِفَاقًا فِي قُلُوْبِهِمْ إِلَى يَوْمٍ يَلْقَوْنَهُ بِمَا أَخْلَفُوا اللَّهَ مَا وَعَدُوهُ وَبِمَا كَانُوا يَكْذِبُوْنَ -
'তাদের মধ্যে অনেকে রয়েছে যারা আল্লাহ্র কাছে অঙ্গীকার করে যে, যদি আল্লাহ আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে (প্রচুর ধন-সম্পদ) দান করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ছাদাক্বা করব এবং অবশ্যই সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হব। অতঃপর যখন আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ থেকে দান করেন, তখন তারা কৃপণতা করে এবং সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে আল্লাহ শাস্তি স্বরূপ তাদের অন্তর সমূহে মুনাফেকী ঢেলে দিলেন যা আল্লাহ্র সম্মুখে তাদের হাযির হবার দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এ কারণে যে, তারা আল্লাহ্র সাথে যে ওয়াদা করেছিল তা ভঙ্গ করেছিল এবং একারণে যে, তারা মিথ্যা বলেছিল' (তওবা ৯/৭৫-৭৭)।
কিছু মুনাফিক আল্লাহ তা'আলাকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আল্লাহ যদি অনুগ্রহ করে তাদের ধনী করে দেন তাহ'লে তারা তাদের ধন-সম্পদ থেকে দান করবে এবং নিজেরা সৎ লোকদের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ধনী হওয়ার পর তারা সে কথা রাখেনি এবং তাদের দাবীর সত্যতাও প্রতিপাদন করেনি। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাদের অন্তরে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুনাফিকী স্থায়ী করে দেন। আল্লাহ এহেন অবস্থা থেকে আমাদের তাঁর নিকট আশ্রয় দিন।
টিকাঃ
৪৩. ঐ, ৪/৮৩।
📄 কথোপকথনকালে মিথ্যা বলা
আবার আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُوْلُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ ‘মানুষের মাঝে এমন লোক আছে, যারা মুখে বলে আমরা আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান এনেছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ঈমানদার নয়' (বাক্বারাহ ২/৮)।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, رَأْسُ مَالِهِمُ الْخَدِيعَةُ وَالْمَكْرُ، وَبِضَاعَتُهُمُ الْكَذِبُ وَالْخَيْرُ ، وَعِنْدَهُمُ الْعَقْلُ الْمَعِيشِيُّ أَنَّ الْفَرِيقَيْنِ عَنْهُمْ رَاضُونَ، وَهُمْ بَيْنَهُمْ آمِنُونَ 'প্রতারণা ও চক্রান্ত তাদের পুঁজি, মিথ্যা কথন ও চাটুকারিতা তাদের পণ্য বা বেসাতী, আর মুসলিম অমুসলিম উভয় পক্ষ যাতে তাদের প্রতি প্রসন্ন থাকে সেটাই তাদের জীবন-জীবিকা। সকলের মাঝে বাস করে তারা থাকবে অক্ষত নিরাপদ। এভাবে তারা আল্লাহ ও মুমিনদেরকে ধোঁকা দেয়, মূলতঃ তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধোঁকায় ফেলে। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না।
📄 অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করা এবং বাকবিতণ্ডাকালে বাজে কথা বলা
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ أَرْبَعُ مَنْ كُنَّ فِيْهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيْهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيْهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ -
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'যার মধ্যে চারটি আচরণ থাকবে, সে নির্ভেজাল মুনাফিক বলে গণ্য হবে। আর যার মধ্যে সেগুলোর একটি আচরণ পাওয়া যাবে তার মধ্যে মুনাফিকীর একটি চিহ্ন বিদ্যমান থাকবে, যে পর্যন্ত না সে তা পরিহার করে। যখন সে কথা বলে, তখন মিথ্যা বলে; যখন কোন চুক্তিবদ্ধ হয় তখন তা ভঙ্গ করে; যখন কোন প্রতিশ্রুতি দেয় তখন তা অমান্য করে এবং যখন বাক-বিতণ্ডা করে তখন বেহুদা বা বাজে কথা বলে' ।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেন, একদল আলেম এই হাদীছকে মুশকিল বা দুর্বোধ্য অর্থবোধক হাদীছ হিসাবে গণ্য করেছেন। কেননা এই আচরণগুলো অনেক খাঁটি মুসলমানের মধ্যেও পাওয়া যায়। যার ঈমানের মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের মধ্যে উল্লিখিত আচরণের সবক'টি ছিল। অনুরূপ পূর্বসূরী অনেক আলেম ও বিদ্বানের মাঝে এগুলো আংশিক কিংবা পূর্ণ বিদ্যমান ছিল। তাই প্রশ্ন দেখা দেয়, একই ব্যক্তি একই সাথে কি করে মুমিন ও মুনাফিক হ'তে পারে। এজন্যই হাদীছটিকে তারা মুশকিল বা দুর্বোধ্য বলেছেন।
কিন্তু ইমাম নববী বলেন, আল্লাহ্রই সকল প্রশংসা, হাদীছটিতে আসলে কোন দুর্বোধ্যতা নেই। অবশ্য আলেমরা এর অর্থ নিয়ে নানা কথা বলেছেন। মহাক্বিক্ব আলেমগণ ও অধিকাংশ ব্যক্তির মত যা সঠিক ও শ্রেয় তা এই যে, এই আচরণগুলো মুনাফিকীর আচরণ। যে এসব আচরণের অধিকারী সে মুনাফিকতুল্য এবং তাদের চারিত্রিকগুণে বিভূষিত। কেননা মুনাফিকী মূলতঃ প্রকাশ্যে এক রকম এবং গোপনে অন্য রকম। এই অর্থ উক্ত আচরণগুলোর অধিকারীর মধ্যেও বিরাজমান। তার এ মুনাফিকী ঐ ব্যক্তির সাথে যার সাথে সে কথা বলেছে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আমানত গচ্ছিত রেখেছে, বাক-বিতণ্ডা করেছে এবং চুক্তি করেছে। সে ইসলামের মধ্যে মুনাফিক নয়- যে কিনা বাইরে মুসলিম কিন্তু ভেতরে কাফের। নবী করীম (ছাঃ)ও এতদ্বারা তাকে জাহান্নামের নিম্নদেশে চিরকাল অবস্থানকারী মুনাফিক গণ্য করেননি।
রাসূল (ছাঃ)-এর উক্তি 'সে নির্ভেজাল মুনাফিক'-এর অর্থ এ আচরণগুলোর কারণে সে মুনাফিকদের সাথে কঠিন সাদৃশ্যপূর্ণ। জনৈক আলেম বলেছেন, কঠিনভাবে মুনাফিকের সাথে তুলনীয় সেই ব্যক্তি যার মধ্যে এসব আচরণ অতি মাত্রায় বিরাজিত। যার মধ্যে অল্প মাত্রায় রয়েছে সে মুনাফিক শ্রেণীভুক্ত নয়। এটিই হাদীছের গ্রহণীয় ও শ্রেয় অর্থ।
টিকাঃ
৪৪. মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৪৯।
৪৫. বুখারী হা/৩৪; মুসলিম হা/৫৮।
৪৬. শারহ নববী মুসলিম ২/৪৬-৪৭।
📄 ছালাতকে যথাসময় থেকে বিলম্বিত করা
আলা ইবনু আব্দুর রহমান হ'তে বর্ণিত তিনি একবার যোহর ছালাত শেষ করে বছরা শহরে ছাহাবী আনাস ইবনু মালেক (রাঃ)-এর বাড়ীতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। তাঁর বাড়ীটা ছিল মসজিদের পাশে। তিনি বলেন, আমরা যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম তখন তিনি বললেন, তোমরা কি আছর ছালাত আদায় করেছ? আমরা বললাম, আমরা তো এই মাত্র যোহর ছালাত আদায় করে আসলাম। তিনি বললেন, তোমরা আছর ছালাত আদায় কর। আমরা তখন আছর ছালাত আদায় করলাম। আমাদের ফিরে আসার সময় তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,
تِلْكَ صَلاةُ الْمُنَافِقِ يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنِي الشَّيْطَانِ قَامَ فَنَقَرَ أَرْبَعًا لَا يَذْكُرُ اللَّهَ فِيهَا إِلَّا قَلِيْلاً
'যে বসে বসে সূর্য ডোবার প্রতীক্ষা করে, তারপর সূর্য যখন শয়তানের দুই শিঙের মাঝ বরাবর হয় অর্থাৎ একেবারে ডুবে যাবার উপক্রম হয় তখন চারটা ঠোকর মারে (অতি দ্রুত চার রাক'আত আছর পড়ে)। তাতে সে আল্লাহ তা'আলাকে নামমাত্র স্মরণ করে'।
ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, তারা ছালাতকে তার প্রথম ওয়াক্ত থেকে বিলম্বিত করে মরণাপন্ন ব্যক্তির দম বন্ধ হওয়ার উপক্রমের মুহূর্তে (একেবারে শেষ মুহূর্তে) আদায় করে। ফজর আদায় করে সূর্যোদয়ের মুহূর্তে এবং আছর আদায় করে সূর্যাস্তের সময়ে। কাক যেমন ঠোকর মারে তারাও তেমনি (সিজদার নামে) ঠোকর মারে। তা দৈহিকভাবে ছালাত হ'লেও আন্তরিকতাপূর্ণ ছালাত নয়। এ ছালাত আদায়কালে তারা শিয়ালের মত এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। কেননা তাদের বিশ্বাস হয়, এভাবে ছালাত আদায়ের জন্য তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হ'তে পারে এবং কৈফিয়তের জন্য তলব করা হ'তে পারে।
টিকাঃ
৪৭. মুসলিম হা/৬২২।
৪৮. মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৫৪।