📄 তারা সৎকর্মকে দূষণীয় গণ্য করে
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمِنْهُم مَّن يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُواْ مِنْهَا رَضُوا وَإِن لَّمْ يُعْطَوْا مِنهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ ‘তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা ছাদাক্বা বণ্টনের ব্যাপারে তোমার প্রতি দোষারোপ করে। যদি তাদেরকে ছাদাক্বা থেকে কিছু দেওয়া হয়, তাহলে খুশী হয়। আর যদি কিছু না দেওয়া হয়, তাহলে তারা ক্রুদ্ধ হয়' (তওবা ৯/৫৮)।
একদল মুনাফিক নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগে দান-ছাদাক্বা বণ্টন নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করত। তারা সরাসরি দ্বীন ইসলাম অস্বীকার করত না। কেবল অস্বীকার করত তাদের দানের অংশ না পাওয়ার জন্য। এজন্যই যাকাতের অংশ পেলে তারা খুশি থাকত, না পেলে মনে মনে খুব অসন্তুষ্ট হ'ত। তারা যাকাত ও অন্যান্য দান বণ্টনকালে নবী করীম (ছাঃ)-কে এভাবে অন্যায় দোষারোপ করতো বলে আলোচ্য আয়াতে তাদেরকে অভিযুক্ত ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
الَّذِينَ يَلْمِرُوْنَ الْمُطَّوِّعِيْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُوْنَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُوْنَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'যারা স্বেচ্ছায় ছাদাক্বা দানকারী মুমিনদের প্রতি বিদ্রূপ করে এবং যাদের স্বীয় পরিশ্রملব্ধ বস্তু ছাড়া কিছুই নেই তাদেরকে উপহাস করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি' (তওবা ৯/৭৯)।
আবু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, لَمَّا أُمِرْنَا بِالصَّدَقَةِ كُنَّا نَتَحَامَلُ فَجَاءَ أَبُو عَقِيلٍ بِنِصْفِ صَاعٍ، وَجَاءَ إِنْسَانٌ بِأَكْثَرَ مِنْهُ، فَقَالَ الْمُنَافِقُونَ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَدَقَةِ هَذَا، وَمَا فَعَلَ هَذَا الْآخَرُ إِلَّا رِئَاء 'আমাদেরকে যখন দান করার আদেশ দেওয়া হ'ল তখন আর্থিক সঙ্কট সত্ত্বেও আমরা তা পালনে তৎপর হ'লাম। আবু আকীল অর্ধ ছা' (খেজুর কিংবা অন্য কিছু) নিয়ে এল। আরেকজন তার থেকে অনেক বেশী নিয়ে এল। তখন মুনাফিকরা বলতে লাগল, আল্লাহ তা'আলা এই লোকের সামান্য দান গ্রহণের মুখাপেক্ষী নন। আর অন্যজন যে অনেক দান করল, সেও লোক দেখানোর জন্য'। তখন আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন যে, 'যারা স্বেচ্ছায় ছাদাক্বা দানকারী মুমিনদের প্রতি বিদ্রূপ করে এবং যাদের স্বীয় পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ছাড়া কিছুই নেই তাদেরকে উপহাস করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি' (তওবা ৯/৭৯)।
কোন অবস্থাতেই এই মুনাফিকদের দোষারোপ ও নিন্দাবাদের হাত থেকে কেউ নিষ্কৃতি পাবে না। এমনকি তাদের নিন্দা থেকে দানকারীরাও মুক্ত নয়। যদি তারা কেউ অনেক মাল দান করে তাহ'লে ওরা বলে, এ লোক দেখাচ্ছে। আর যদি কেউ সামান্য সম্পদ দান করার জন্য হাযির করে, তাহ'লেও বলে, আল্লাহ তা'আলার এতটুকু দান গ্রহণের কোন প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
৩২. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ২/১৮২।
৩৩. বুখারী হা/৪৬৬৮; মুসলিম হা/১০১৮।
৩৪. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ৪/১৭৪।
📄 নিম্নতম অবস্থানে খুশী
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ أَنْ آمِنُوا بِاللَّهِ وَجَاهِدُوْا مَعَ رَسُولِهِ اسْتَأْذَنَكَ أُولُوا الطَّوْلِ مِنْهُمْ وَقَالُوا ذَرْنَا نَكُن مَّعَ الْقَاعِدِينَ ‘যখনই কুরআনের কোন অংশ নাযিল হয় এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ্র উপর ঈমান আনো এবং তাঁর রাসূলের সাথে জিহাদ কর, তখন তাদের মধ্যকার সামর্থ্যবান লোকেরা তোমার নিকটে অব্যাহতি চায় এবং বলে যে, আমাদেরকে ছাড়ুন আমরা উপবিষ্টদের সাথে থেকে যাই' (তওবা ৯/৮৬)।
যাদের জিহাদ করার শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থ-বিত্ত আছে, তারপরও তারা জিহাদে অংশ না নিয়ে বাড়ি বসে থাকার অনুমতি চায়, আল্লাহ এই আয়াতে তাদের নিন্দা করেছেন। এরা নিজেদের জন্য লজ্জা-অপমানে সন্তুষ্ট। এরা মহিলাদের ন্যায় বাড়ি বসে থাকে সেনাবাহিনীর যুদ্ধে বেরিয়ে যাওয়ার পর। যুদ্ধ সংঘটিত হ'লে দেখা যায়, এদের মত কাপুরুষ আর দ্বিতীয় কেউ মানব সমাজে নেই। আর যখন শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করে, তখন লম্বা লম্বা কথা বলায় মানবসমাজে তাদের জুড়ি মেলে না। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন,
أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوْكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ -
'তারা তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। অতঃপর যখন তোমাদের উপর কোন বিপদ আসে তখন তুমি তাদের দেখবে তারা মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মত চক্ষু উল্টিয়ে তোমার দিকে তাকায়। তারপর ভয় যখন দূরীভূত হয়ে যায়, তখন এরাই (গনীমতের) সম্পদের লালসায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী শুরু করে দেয়' (আহযাব ৩৩/১৯)। অর্থাৎ নিরাপদকালে তারা তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার ভাষায় লম্বা লম্বা কথা বলে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তারা হয়ে যায় সবচেয়ে বড় কাপুরুষ।
টিকাঃ
৩৫. ঐ ৪/১৯৬।
📄 অন্যায়ের আদেশ ও ন্যায়ের নিষেধ
মুমিনরা যেখানে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করে থাকে, সেখানে মুনাফিকরা তার বিপরীতে মানুষকে অন্যায় কথা ও কাজের আদেশ দেয় এবং ন্যায় কথা ও কাজ করতে নিষেধ করে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ আচরণ অবৈধ আখ্যায়িত করে বলেছেন,
الْمُنَافِقُوْنَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُوْنَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوْفِ وَيَقْبِضُوْنَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ
'মুনাফিক পুরুষ ও নারী পরস্পরে সমান। তারা অসৎ কাজের আদেশ দেয় ও সৎকাজে নিষেধ করে এবং তাদের হাত সমূহ বন্ধ রাখে (অর্থাৎ আল্লাহ্র পথে ব্যয় থেকে কৃপণতা করে)। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাদের ভুলে গেছেন। নিশ্চয় মুনাফিকরাই হ'ল পাপাচারী' (তওবা ৯/৬৭)।
তাদের হাত গুটিয়ে রাখার অর্থ আল্লাহ্ পথে জিহাদ ও জনকল্যাণমূলক কাজে তারা অর্থ ব্যয় করে না। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার অর্থ তারা আল্লাহ্র যিকির করতে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহও তাদের ভুলে গেছেন অর্থ- তাদেরকে ভুলে যাওয়া লোক যেমন আচরণ তাদের সাথে করে, তিনিও তাদের সাথে সেরূপ আচরণ করবেন। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেন, وَقِيلَ الْيَوْمَ نَنْسَاكُمْ كَمَا نَسِيْتُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ‘আর বলা হবে, তোমরা যেমন এই দিনের সাক্ষাৎ লাভের কথা ভুলে গিয়েছিলে, আজ আমিও তেমনি তোমাদের ভুলে গিয়েছি' (জাছিয়া ৪৫/৩৪)। আর মুনাফিকরা পাপিষ্ট অর্থ তারা সত্যপথ থেকে বিচ্যুত; বাতিল পথের অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
৩৬. ঐ ৪/১৭৩।
📄 জিহাদকে অপসন্দ করা এবং তা থেকে পিছুটান দেয়া
মুনাফিকরা ইসলামের খাতিরে জিহাদে অংশগ্রহণে মোটেও আগ্রহ বোধ করে না; বরং জিহাদে অংশগ্রহণ না করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ আচরণ প্রসঙ্গে বলেন,
فَرِحَ الْمُخَلَّفُوْنَ بِِمَقْعَدِهِمْ خِلافَ رَسُوْلِ اللهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَقَالُوْا لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ -
'(তাবুকের যুদ্ধ থেকে) পিছনে রয়ে যাওয়া লোকেরা আল্লাহ্র রাসূলের বিপরীতে ঘরে বসে থাকতে পেরে উৎফুল্ল হয়েছিল। তারা আল্লাহ্র রাস্তায় তাদের মাল ও জান দিয়ে যুদ্ধ করতে অনীহা প্রকাশ করেছিল এবং তারা বলেছিল, এই দাবদাহে তোমরা যুদ্ধে বের হয়ো না। তুমি বল, জাহান্নামের আগুন এর চেয়ে কঠিনভাবে উত্তপ্ত, যদি তারা বুঝত' (তওবা ৯/৮১)।
তাবুক যুদ্ধে কিছু মুনাফিক নানা বাহানা তুলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণের সঙ্গে যুদ্ধে যায়নি। ছাহাবীগণের যুদ্ধে বেরিয়ে পড়ার পর তারা বাড়ীতে বসে থাকল এবং সেজন্য আনন্দিত হ'ল। তারা নিজেদের জান-মাল ব্যয় করে তাদের সাথে আল্লাহ্ পথে যুদ্ধ করতে একেবারেই অনাগ্রহী, অনিচ্ছুক ছিল। তাইতো তারা একে অপরকে বলছিল, এই গরমে যুদ্ধের জন্য বাইরে বের হয়ো না। তাবুক যুদ্ধ যে সময় হ'তে যাচ্ছিল, তখন ছিল প্রচণ্ড গরম। ছায়া ও ফলমূল ভাল লাগার সময়। তাইতো তারা বলেছিল, এই গরমে বাইরে বের হওয়ার দরকার নেই। তদুত্তরে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে বললেন, তুমি ওদের বলে দাও, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতার জন্য যে জাহান্নামের আগুনের দিকে তোমরা ধাবিত হচ্ছ, তা তোমাদের পালিয়ে বাঁচা গরম থেকে বহু বহু গুণ বেশী গরম।
টিকাঃ
৩৭. ঐ ৪/১৮৯।