📄 কাপুরুষতা ও অস্থিরতা
আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের উক্ত আচরণা সম্পর্কে বলেন,
وَيَحْلِفُوْنَ بِاللَّهِ إِنَّهُمْ لَمِنْكُمْ وَمَا هُم مِّنْكُمْ وَلَكِنَّهُمْ قَوْمٌ يَفْرَقُوْنَ لَوْ يَجِدُوْنَ مَلْجَأَ أَوْ مَغَارَاتِ أَوْ مُدَّخَلاً لَّوَلَّوْا إِلَيْهِ وَهُمْ يَجْمَحُوْنَ -
'এরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে যে, এরা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। অথচ এরা কখনই তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। বস্তুতঃ এরা এমন লোক, যারা ভয় করে থাকে। এরা কোন আশ্রয়স্থল, কোন গুহা অথবা মাটির ভিতর ঢুকে পালাবার মত কোন সুড়ঙ্গ পেলে অবশ্যই তোমাদের ছেড়ে এসব জায়গার দিকে দ্রুত পালিয়ে যাবে' (তওবা ৯/৫৬-৫৭)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে মুনাফিকদের অস্থিরতা, ভয়-ভীতি, অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে বলেন, ওরা জোরালো শপথ করে বলে যে, ওরা তোমাদের লোক, অথচ প্রকৃতপক্ষে ওরা তোমাদের লোক নয়। এই মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করতেই ওরা কসমের আশ্রয় নিয়েছে। ওরা তোমাদের প্রতি এতটাই বিদ্বেষপরায়ণ যে, যদি তোমাদের সংস্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য কোন দুর্গ পেত, তবে তাকে আশ্রয়স্থল বানাত অথবা কোন গিরিগুহা পেলে তাতে ঢুকে পড়ত কিংবা মাটিতে কোন সুড়ঙ্গ পেলে তথায় পালিয়ে যেত। তোমাদের থেকে সরে পড়ার কাজটা তখন তারা খুব দ্রুতই করত। কারণ তারা তো মুমিনদের সাথে মিশে মনের ঘৃণা ও অসন্তোষ নিয়ে, ভালবাসার টানে নয়। তারা মন থেকে চায় যে, মুমিনদের সাথে যেন তাদের মিশতে না হয়। কিন্তু বাধ্য হয়ে মিশতে হচ্ছে বলে তারা সব সময় পেরেশানী, দুঃখ-বেদনা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিনাতিপাত করে।
📄 তারা যা করেনি তা করার নামে প্রশংসা পিয়াসী
আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّوْنَ أَن يُحْمَدُوْا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلاَ تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ 'যারা নিজেরা যা করে তাতে আনন্দ প্রকাশ করে এবং নিজেরা যা করেনি তার জন্যও প্রশংসিত হ'তে ভালবাসে এমন লোকদের সম্পর্কে তুমি কখনো ভাববে না যে তারা আল্লাহ্র আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। বরং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে' (আলে ইমরান ৩/১৮৮)।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, أَنَّ رِجَالاً مِنَ الْمُنَافِقِينَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا خَرَجَ رَسُوْلُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْغَزْوِ تَخَلَّفُوا عَنْهُ ، وَفَرِحُوا بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُوْلِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا قَدِمَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم اعْتَذَرُوا إِلَيْهِ وَحَلَفُوا، وَأَحَبُّوا أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا، فَنَزَلَتْ لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّوْنَ أَن يُحْمَدُوْا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوْا) ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে মুনাফিকদের কিছু লোক ছিল, যারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন কোন যুদ্ধে বের হ'তেন তখন তাঁর সাথে অংশ না নিয়ে পিছনে থেকে যেত। তারা এভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে না যাওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করত। তারপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসতেন তখন তারা তাঁর সামনে নানা অজুহাত পেশ করত। তারা এসব অজুহাতের জন্য আল্লাহ্র নামে কসমও করত। সেই সঙ্গে তারা যে কাজ করেনি, সেই কাজ করেছে মর্মে তাদের প্রশংসা করা হ'লে তারা খুব খুশি হয় এবং এরূপ কাজ না করেও প্রশংসা পেতে তারা খুব আকাঙ্ক্ষী হয়। এতদপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।
টিকাঃ
৩১. বুখারী হা/৪৫৬৭; মুসলিম হা/২৭৭৭।
📄 তারা সৎকর্মকে দূষণীয় গণ্য করে
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمِنْهُم مَّن يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُواْ مِنْهَا رَضُوا وَإِن لَّمْ يُعْطَوْا مِنهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ ‘তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা ছাদাক্বা বণ্টনের ব্যাপারে তোমার প্রতি দোষারোপ করে। যদি তাদেরকে ছাদাক্বা থেকে কিছু দেওয়া হয়, তাহলে খুশী হয়। আর যদি কিছু না দেওয়া হয়, তাহলে তারা ক্রুদ্ধ হয়' (তওবা ৯/৫৮)।
একদল মুনাফিক নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগে দান-ছাদাক্বা বণ্টন নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করত। তারা সরাসরি দ্বীন ইসলাম অস্বীকার করত না। কেবল অস্বীকার করত তাদের দানের অংশ না পাওয়ার জন্য। এজন্যই যাকাতের অংশ পেলে তারা খুশি থাকত, না পেলে মনে মনে খুব অসন্তুষ্ট হ'ত। তারা যাকাত ও অন্যান্য দান বণ্টনকালে নবী করীম (ছাঃ)-কে এভাবে অন্যায় দোষারোপ করতো বলে আলোচ্য আয়াতে তাদেরকে অভিযুক্ত ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
الَّذِينَ يَلْمِرُوْنَ الْمُطَّوِّعِيْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُوْنَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُوْنَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'যারা স্বেচ্ছায় ছাদাক্বা দানকারী মুমিনদের প্রতি বিদ্রূপ করে এবং যাদের স্বীয় পরিশ্রملব্ধ বস্তু ছাড়া কিছুই নেই তাদেরকে উপহাস করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি' (তওবা ৯/৭৯)।
আবু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, لَمَّا أُمِرْنَا بِالصَّدَقَةِ كُنَّا نَتَحَامَلُ فَجَاءَ أَبُو عَقِيلٍ بِنِصْفِ صَاعٍ، وَجَاءَ إِنْسَانٌ بِأَكْثَرَ مِنْهُ، فَقَالَ الْمُنَافِقُونَ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَدَقَةِ هَذَا، وَمَا فَعَلَ هَذَا الْآخَرُ إِلَّا رِئَاء 'আমাদেরকে যখন দান করার আদেশ দেওয়া হ'ল তখন আর্থিক সঙ্কট সত্ত্বেও আমরা তা পালনে তৎপর হ'লাম। আবু আকীল অর্ধ ছা' (খেজুর কিংবা অন্য কিছু) নিয়ে এল। আরেকজন তার থেকে অনেক বেশী নিয়ে এল। তখন মুনাফিকরা বলতে লাগল, আল্লাহ তা'আলা এই লোকের সামান্য দান গ্রহণের মুখাপেক্ষী নন। আর অন্যজন যে অনেক দান করল, সেও লোক দেখানোর জন্য'। তখন আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন যে, 'যারা স্বেচ্ছায় ছাদাক্বা দানকারী মুমিনদের প্রতি বিদ্রূপ করে এবং যাদের স্বীয় পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ছাড়া কিছুই নেই তাদেরকে উপহাস করে, আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি' (তওবা ৯/৭৯)।
কোন অবস্থাতেই এই মুনাফিকদের দোষারোপ ও নিন্দাবাদের হাত থেকে কেউ নিষ্কৃতি পাবে না। এমনকি তাদের নিন্দা থেকে দানকারীরাও মুক্ত নয়। যদি তারা কেউ অনেক মাল দান করে তাহ'লে ওরা বলে, এ লোক দেখাচ্ছে। আর যদি কেউ সামান্য সম্পদ দান করার জন্য হাযির করে, তাহ'লেও বলে, আল্লাহ তা'আলার এতটুকু দান গ্রহণের কোন প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
৩২. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ২/১৮২।
৩৩. বুখারী হা/৪৬৬৮; মুসলিম হা/১০১৮।
৩৪. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ৪/১৭৪।
📄 নিম্নতম অবস্থানে খুশী
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذَا أُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ أَنْ آمِنُوا بِاللَّهِ وَجَاهِدُوْا مَعَ رَسُولِهِ اسْتَأْذَنَكَ أُولُوا الطَّوْلِ مِنْهُمْ وَقَالُوا ذَرْنَا نَكُن مَّعَ الْقَاعِدِينَ ‘যখনই কুরআনের কোন অংশ নাযিল হয় এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ্র উপর ঈমান আনো এবং তাঁর রাসূলের সাথে জিহাদ কর, তখন তাদের মধ্যকার সামর্থ্যবান লোকেরা তোমার নিকটে অব্যাহতি চায় এবং বলে যে, আমাদেরকে ছাড়ুন আমরা উপবিষ্টদের সাথে থেকে যাই' (তওবা ৯/৮৬)।
যাদের জিহাদ করার শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থ-বিত্ত আছে, তারপরও তারা জিহাদে অংশ না নিয়ে বাড়ি বসে থাকার অনুমতি চায়, আল্লাহ এই আয়াতে তাদের নিন্দা করেছেন। এরা নিজেদের জন্য লজ্জা-অপমানে সন্তুষ্ট। এরা মহিলাদের ন্যায় বাড়ি বসে থাকে সেনাবাহিনীর যুদ্ধে বেরিয়ে যাওয়ার পর। যুদ্ধ সংঘটিত হ'লে দেখা যায়, এদের মত কাপুরুষ আর দ্বিতীয় কেউ মানব সমাজে নেই। আর যখন শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করে, তখন লম্বা লম্বা কথা বলায় মানবসমাজে তাদের জুড়ি মেলে না। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন,
أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوْكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ -
'তারা তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। অতঃপর যখন তোমাদের উপর কোন বিপদ আসে তখন তুমি তাদের দেখবে তারা মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মত চক্ষু উল্টিয়ে তোমার দিকে তাকায়। তারপর ভয় যখন দূরীভূত হয়ে যায়, তখন এরাই (গনীমতের) সম্পদের লালসায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরী শুরু করে দেয়' (আহযাব ৩৩/১৯)। অর্থাৎ নিরাপদকালে তারা তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার ভাষায় লম্বা লম্বা কথা বলে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তারা হয়ে যায় সবচেয়ে বড় কাপুরুষ।
টিকাঃ
৩৫. ঐ ৪/১৯৬।