📄 কাফেরদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা
মুনাফিকদের সখ্যতা ও সম্প্রীতি মুমিনদের সাথে নয় বরং কাফেরদের সাথে। কাফেরদের সাথে তাদের এই দহরম মহরমের জন্য আল্লাহ বলেন, بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَاباً أَلِيْماً، الَّذِيْنَ يَتَّخِذُوْنَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُوْنَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ العِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعاً - 'তুমি মুনাফিকদের এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক আযাব রয়েছে, যারা (দুনিয়ার ফায়েদার জন্য) ঈমানদারদের বদলে কাফেরদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। তারা কি এর দ্বারা এদের কাছ থেকে কোন সম্মান লাভের প্রত্যাশা করে? অথচ যাবতীয় সম্মান আল্লাহ্ জন্যই নির্দিষ্ট' (নিসা ৪/১৩৮-৩৯)।
এখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেছেন, হে রাসূল! যারা আমার সাথে কুফরী করে এবং আমার দ্বীনের মধ্যে যারা নাস্তিকতার বীজ বপন করে মুমিনদের বাদ দিয়ে তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে তারা মুনাফিক। এই মুনাফিকদের তুমি কঠিন শাস্তি লাভের সুসংবাদ দাও। তারা কি আমার প্রতি যারা ঈমান রাখে তাদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধু ও সহযোগিতাকারী রূপে গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের কাছে শক্তি ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করে? যারা এরূপ করে তারাই মূলতঃ দুর্বল ও সংখ্যালঘু। কারণ সম্মান, শক্তি, সহযোগিতা সবই তো আল্লাহ্র কাছে সংরক্ষিত। অতএব তারা কেন মুমিনদের বন্ধু ও সহযোগিতাকারী রূপে গ্রহণ করে না? তা করলে তারা আল্লাহ্র কাছে সম্মান, প্রতিরোধ ও সহযোগিতার আবেদন করতে পারত। যার হাতে সর্বময় ক্ষমতা, তিনি যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন। এভাবে ঐ মুনাফিকরাও তখন সম্মান ও শক্তির মালিক হ'ত।
টিকাঃ
২১. জামি'উল বায়ান ৯/৩১৯।
📄 মুমিনদের ব্যাপারে প্রতীক্ষা
[মুনাফিকরা মুসলমানদের ভাল-মন্দের প্রতীক্ষা করে। ভাল কিছু হ'লে বলে, আমরা তো তোমাদেরই লোক। এ কাজে আমাদেরও অংশ আছে। আর খারাপ কিছু হ'লে কাফেরদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের সুবিধা আদায় করে।-অনুবাদক]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, الَّذِينَ يَتَرَبَّصُوْنَ بِكُمْ فَإِنْ كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُنْ مَّعَكُمْ وَإِنْ كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُواْ أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُمْ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَنْ يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا 'যারা তোমাদের অকল্যাণের প্রতীক্ষায় থাকে, যদি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তোমাদের বিজয় আসে তখন এরা বলে, আমরা কি (এ যুদ্ধে) তোমাদের সাথে ছিলাম না? আর যদি কাফেরদের ভাগে বিজয়ের অংশ লেখা হয় তখন এরা বলে, আমরা কি তোমাদেরকে (গোপনে) সহায়তা করিনি এবং তোমাদেরকে মুসলমানদের কাছ থেকে রক্ষা করিনি? এমতাবস্থায় কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ফায়ছালা শুনিয়ে দিবেন এবং সেদিন আল্লাহ মুমিনদের বিরুদ্ধে কাফেরদের কোন অজুহাত পেশ করার কোন পথই খোলা রাখবেন না' (নিসা ৪/১৪১)। বস্তুতঃ মুনাফিকরা মুমিনদের বেলায় অপেক্ষায় থাকে। যদি কোন যুদ্ধে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাদের শত্রুপক্ষের উপর বিজয় দান করেন এবং তাতে গণীমতের সম্পদ অর্জিত হয় তখন তারা মুমিনদের নিকট এসে বলে, আমরা কি তোমাদের সাথে থেকে তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিনি? তোমাদের সঙ্গে থেকে লড়াই করিনি? যেহেতু আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছি সেহেতু তোমরা গণীমতের একটা অংশ আমাদের দাও। আর যদি কাফের বাহিনী মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে সক্ষম হয়, তখন মুনাফিকরা কাফেরদের নিকট গিয়ে বলে, আমরা কি তোমাদের বিজয়ের পথ করে দেইনি? সেজন্যই তো তোমরা মুমিনদের পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছ। আমরা তোমাদের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। ফলে তারা অপদস্থ হয়ে যুদ্ধ বিরতি দিয়েছিল, আর সেই ফাঁকে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছ। এখন এরূপ করলেও কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা ঠিকই মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে ঠিক ঠিক বিচার করবেন। চূড়ান্ত বিচারে তিনি মুমিনদের জান্নাতে দাখিল করবেন আর মুনাফিকদেরকে তাদের বন্ধু কাফেরদের সাথে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।
টিকাঃ
২২. ঐ ৯/৩২৪।
📄 আল্লাহ্ সঙ্গে ধোঁকাবাজি এবং ইবাদতে অলসতা
আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের এ আচরণ সম্পর্কে বলেন, إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُوْنَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوْا كُسَالَى يُرَاؤُوْنَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً ‘তারা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। বস্তুতঃ এর মাধ্যমে তিনিই (আল্লাহই) তাদের ধোঁকায় ফেলে দেন। আর যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায় তখন অলস হয়ে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায়, বস্তুতঃ তারা আল্লাহকে খুবই কম স্মরণ করে' (নিসা ৪/১৪২)।
মুনাফিকরা মুখে ইসলাম গ্রহণ করার মাধ্যমে মুসলমানদের হাত থেকে নিজেদের জান-মাল হেফাযত করতে পারে; সরাসরি কাফির হ'লে যা তারা পারত না। আর এভাবে তারা আল্লাহকে ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু এমনটি করতে গিয়ে তারা বরং আল্লাহ্ ধোঁকায় পড়ে যাচ্ছে। কেননা আল্লাহ তাদের মনের খবর ও তাদের কুফরী আক্বীদা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। তারপরও তিনি তাদের মুখে ঈমান যাহির করার জন্য তাদের জান-মালের উপর হস্তক্ষেপ বন্ধ রেখেছেন দুনিয়াতে ছাড় দেওয়ার মানসে। অবশেষে আখেরাতে যখন তারা আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন কুফর গোপন রাখার কারণে তিনি তাদের ঠিকই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
আর ছালাতে যে তারা অলসতাভরে দাঁড়ায় তার অর্থ হ'ল, আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর যেসব আমল ফরয করেছেন, মুনাফিকরা তার কোনটাই আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের নিয়তে করে না। কারণ তারা পরকাল, পাপ-পুণ্য, শাস্তি ও পুরস্কার কোনটাতেই বিশ্বাসী নয়। তারা কেবল জান বাঁচানোর তাকীদে কিছু বাহ্যিক আমল করে। মুমিনরা যাতে তাদের হত্যা না করে, তাদের অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে না নেয় সেই ভয়ে তারা এসব আমল করে। তাই ছালাতের মত একটি দৃশ্যমান ফরযে যখন তারা দাঁড়ায়, তখন আলস্যভরে দাঁড়ায়। যাতে মুমিনরা ছালাত আদায়কারী হিসাবে তাদের দেখতে পেয়ে তাদেরকে নিজেদের লোক বলে মনে করে। অথচ তারা তাদের লোক নয়। কেননা তারা ছালাতকে তাদের উপর ফরয বা আবশ্যিক বিষয় ভাবে না। তাই তারা আলস্যভরে ছালাতে দাঁড়ায়।
আল্লাহ্ বাণী- 'তারা আল্লাহকে খুব অল্পই স্মরণ করে' বাক্যটির উপর কেউ হয়তঃ প্রশ্ন করতে পারে যে, আল্লাহ্ যিকিরের ক্ষেত্রে 'অল্প কিছু' বলে কোন কথা আছে কি? তার উত্তরে বলা চলে, আয়াতের অর্থ আসলে তা নয়। এ কথার আসল অর্থ হচ্ছে- তারা আল্লাহকে লোক দেখানোর জন্য স্মরণ করে। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য নিহত হওয়া, বন্দী হওয়া এবং ধন-সম্পদ খোয়ানোর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। তাদের যিকির কোন বিশ্বাসীর যিকির নয়, যে আল্লাহ্র একত্ববাদে বিশ্বাস করে, একনিষ্ঠ মনে তার রুবুবিয়াতকে মেনে চলে। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা একে 'অল্প' বলেছেন। কেননা এই যিকিরের লক্ষ্য আল্লাহ তা'আলা নন, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের ইচ্ছাও তাতে নেই, আল্লাহ্র নিকট প্রতিদান লাভের প্রত্যাশাও এখানে নেই। তাই আমলকারী যতই কষ্ট করুক এবং যত বেশী যিকির করুক তা মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ গণ্য হবে। যা দেখতে পানির মত, কিন্তু আসলে পানি নয়।
টিকাঃ
২৩. ইবনু জারীর তাবারী, জামি'উল বায়ান ৫/৩২৯।
📄 দোটানা ও দোদুল্যমান মনোভাব
আল্লাহ তা'আলা বলেন, مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ لَا إِلَى هَؤُلاءِ وَلاَ إِلَى هَؤُلَاءِ 'এরা (কুফর ও ঈমানের) দোটানায় দোদুল্যমান, এরা না এদিকে, না ওদিকে' (নিসা ৪/১৪৩)।
এ আয়াতের মর্মার্থ হ'ল, মুনাফিকরা তাদের দ্বীন সম্পর্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা কোন বিশ্বাসেই স্থির হ'তে পারে না। না তারা মুমিনদের সাথে জাগ্রত জ্ঞানের উপর আছে, না কাফেরদের সাথে অজ্ঞতার উপর আছে। তারা বরং দুইয়ের মাঝে অস্থিরমতি হয়ে বিরাজ করছে। ইবনু ওমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَثَلُ الْمُنَافِقِ كَمَثَلِ الشَّاةِ الْعَائِرَةِ بَيْنَ الْغَنَمَيْنِ تَعِيرُ إِلَى هَذِهِ مَرَّةً وَإِلَى هَذِهِ مَرَّةً ‘মুনাফিকের উদাহরণ দু'টো পাঁঠার মাঝে অবস্থিত একটি গরম হওয়া বকরির মত, একবার সে এটার কাছে যায়, আরেকবার সে অন্যটার কাছে যায়'। ইমাম নববী বলেছেন, الْعَائِرَةُ অর্থ হয়রান, দোদুল্যমান, যে বুঝে উঠতে পারছে না, দু'জনের কার কাছে সে যাবে। আর تَعْيْرُ শব্দের অর্থ- সে কার কাছে যাবে তা নিয়ে দোটানায় পড়েছে।
টিকাঃ
২৪. ঐ ৫/৩৩২।
২৫. মুসলিম হা/২৭৮৪; মিশকাত হা/৫৭।
২৬. নববী, শারহ মুসলিম ১৭/১২৮।