📄 আল্লাহ্র আয়াত সমূহের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ
মুনাফিকরা আল্লাহ্র আয়াত তথা কথা ও বিধিবিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের এ আচরণের জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَحْذَرُ الْمُنَافِقُوْنَ أَنْ تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجٌ مَّا تَحْذَرُوْنَ
'মুনাফিকরা (সদাই) এ আশংকায় থাকে যে, তাদের বিপক্ষে এমন কোন সূরা অবতীর্ণ হয় কি-না যাতে তাদের মনের কথা ফাঁস হয়ে পড়ে। তুমি বল, তোমরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাক। তোমরা যার ভয় করছ, আল্লাহ তা ঠিকই প্রকাশ করে দিবেন' (তওবা ৯/৬৪)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগের মুনাফিকদের মনে সব সময় এই আশঙ্কা বিরাজ করত যে, কুরআনের কোন সূরা নাযিল হয়ে মুমিনদের নিকট তাদের মনের সকল দুরভিসন্ধি ও জারিজুরি ফাঁস করে দেয় কি-না? কেউ কেউ বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের উপর এ আয়াত নাযিলের কারণ হ'ল, মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দোষারোপ করত এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও মুসলমানদের কাজের সমালোচনা করত। যখন তারা এসব করত তখন বলত, সম্ভবতঃ আল্লাহ আমাদের গোপন কথা ফাঁস করে দিবেন না। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে বললেন, ওদের তুমি ধমকের সুরে ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে বল, ঠিক আছে তোমরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ চালিয়ে যাও। তোমরা যার ভয় করছ, আল্লাহ তা ঠিকই প্রকাশ করে দিবেন।
টিকাঃ
১৭. জামি'উল বায়ান ১৪/৩৩১।
📄 মুমিনদের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُواْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُوْنَ اللهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ - 'তারা যখন ঈমানদারদের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার যখন তাদের দুষ্ট নেতাদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমরা তো ওদের সাথে উপহাস করি মাত্র। বরং আল্লাহ তাদের উপহাসের বদলা নেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে ছেড়ে দেন বিভ্রান্ত অবস্থায়' (বাক্বারাহ ২/১৪-১৫)।
ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেন, মুনাফিকরা প্রত্যেকেই দ্বিমুখী আচরণকারী। এক মুখে তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়। অন্য মুখে ভোল পাল্টিয়ে তারা তাদের কাফের ভাইদের সাথে মিলিত হয়। তাদের জিহ্বাও দু'টো। এক জিহ্বা দিয়ে তারা মুসলমানদের সাথে উপর উপর কথা বলে, আর অন্য জিহ্বা তাদের গোপন অবস্থার ভাষ্যকার।
📄 মানুষকে আল্লাহ্ পথের পথিকদের জন্য ব্যয় করতে বাধা দান
তাদের এরূপ অভ্যাস সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন,
هُمُ الَّذِيْنَ يَقُولُوْنَ لاَ تُنْفِقُوْا عَلَى مَنْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنْفَضُّوا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُوْنَ
'এই মুনাফিকরা তো সেসব লোক, যারা বলে, আল্লাহ্র রাসূলের (মুহাজির) সাথীদের জন্য তোমরা কোন রকম অর্থ ব্যয় করো না। ফলে তারা রাসূলের কাছ থেকে সরে পড়বে। অথচ আসমান ও যমীনের ধনভাণ্ডার সমূহ তো আল্লাহ্। আসলে মুনাফিকরা কিছুই বুঝতে চায় না' (মুনাফিকুন ৬৩/৭)।
যায়েদ বিন আরকাম (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। সে যুদ্ধে আমি আব্দুল্লাহ বিন উবাই (মুনাফিকদের নেতা)-কে বলতে শুনলাম, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটস্থ মক্কার মুহাজিরদের জন্য তোমরা মদীনাবাসীরা কিছুই খরচ করো না। দেখবে অর্থকষ্টে পড়ে তারা তাঁর নিকট থেকে দূরে সরে পড়বে। মদীনায় ফিরে যেতে পারলে অবশ্যই আমরা সম্মানী লোকেরা সেখানে অবস্থিত ছোট লোকদের (মুহাজিরদের) বের করে দিব। আমি এ কথা আমার চাচা অথবা ওমর (রাঃ)-কে বললাম। তিনি কথাটা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জানালেন। তিনি আমাকে ডেকে পাঠালে আমি তাঁকে সব বললাম। তিনি আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার সাথীদের ডাকিয়ে আনলেন। তারা শপথ করে বলল, এমন কথা তারা বলেইনি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তখন আমাকে মিথ্যুক এবং আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে সত্যবাদী ভাবলেন। ফলে আমি যার পর নেই ব্যথিত হ'লাম فَأَصَابَنِي هَمَّ لَمْ يُصِبْنِي مِثْلُهُ قَطْ। মনোকষ্টে আমি ঘরে বসে থাকলাম। এ অবস্থা দেখে আমার চাচা আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তোমাকে মিথ্যুক মনে করেছেন এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে কি তুমি মনে করলে? তখন আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন, إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ 'যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে...। এ সূরা নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমার নিকট লোক পাঠান। তিনি সূরা পড়ে শুনান এবং বলেন, إِنَّ اللَّهَ قَدْ صَدَّقَكَ يَا زَيْدُ 'হে যায়েদ! আল্লাহ তোমাকে সত্যবাদী আখ্যা দিয়েছেন'।
টিকাঃ
১৮. মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৫০।
১৯. বুখারী হা/৪৯০০; মুসলিম হা/২৭৭২।
📄 মুমিনদের মূর্খ আখ্যা দেওয়া
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُواْ كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُواْ أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَكِنْ لا يَعْلَمُوْنَ '(মুনাফিকদের) বলা হয়, লোকেরা যেমন ঈমান এনেছে তোমরাও তেমন ঈমান আন, তখন তারা বলে, ঐ নির্বোধরা যেমন ঈমান এনেছে আমাদেরও কি তেমন ঈমান আনতে হবে? সাবধান! ওরাই আসলে নির্বোধ। কিন্তু ওরা তা অনুধাবন করতে পারে না' (বাক্বারাহ ২/১৩)।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, 'মুনাফিকরা কুরআন ও সুন্নাহ্ ধারক-বাহকদের প্রান্তিক ও পতিত মনে করে। তাদের ধারণায় এদের বোধ-বুদ্ধি খুবই অল্প। তাদের মতে কুরআন-হাদীছের বাণী বাহকরা সেই গাধাতুল্য, যে তার পিঠে বইয়ের বোঝা বহন করে। গাধার চিন্তা থাকে কেবল বোঝা বহন করা। তাই বইয়ের বোঝা বইলেও তো আর গাধাটাকে শিক্ষিত বলা যায় না। অহি-র বেসাতিকারীর পণ্য (অর্থাৎ ইসলামী বিধানের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় জীবনপাতকারীর চেষ্টা) মুনাফিকদের দৃষ্টিতে মন্দা ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের কাছে এ পণ্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মনে করে ইসলামের অনুসারীরা নির্বোধ। ফলে তারা নিজেরা যখন একান্তে মিলিত হয় তখন মুসলমানদের নষ্ট ও অপয়া হিসাবে তুলে ধরতে তৎপরতা চালায়'।
টিকাঃ
২০. ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৫০।