📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 আয়েশি-জীবন বর্জন করা

📄 আয়েশি-জীবন বর্জন করা


সপ্তম অনুচ্ছেদ
আয়েশি-জীবন বর্জন করা

কল্যাণকর বিষয় মনোনয়ন
৫৪৬. আল্লাহ তাআলা বলেন, اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ "আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার ইচ্ছা রিযক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা রিযক সংকুচিত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা যে বান্দার জন্য যেটা কল্যাণকর মনে করেন, তার জন্য তা-ই মনোনীত করেন।”[৬১৯]

হালাল উপার্জনে কোনো লজ্জা নেই
৫৪৭. আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআ থেকে বর্ণিত, ইয়াযীদ ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হালাল (উপার্জনের) ব্যাপারে যে ব্যক্তি লজ্জাবোধ করে না, তার খরচ এবং অহংকার কমে যায়।”[৬২০]

সম্পদ দেখে সুখলাভ
৫৪৮. লুকমান ইবনু আমির থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “সম্পদশালীও আহার করে, আমরাও আহার করি; তারাও পান করে, আমরাও পান করি; তারাও কাপড় পরে, আমরাও কাপড় পরি; তাদের থাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ, যার দিকে তারা তাকিয়ে থাকে (এবং সুখ পায়)। তাদের সম্পদের দিকে আমরাও তাকাই। সেসব সম্পদের হিসাব তাদেরকে দিতে হবে; কিন্তু আমরা তা থেকে মুক্ত।”[৬২১]

আত্মার প্রশান্তি
৫৪৯. বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, الزهادة في الدنيا راحة القلب والجسد “দুনিয়াবিমুখতা হলো আত্মা ও দেহের প্রশান্তি।”[৬২২]

দুই সতীন
৫৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "দুনিয়া ও আখিরাত হলো এক ব্যক্তির দুই স্ত্রীর মতো। একজনকে সন্তুষ্ট করতে গেলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হয়।”[৬২৩]

না-পাওয়ার প্রতিদান
৫৫১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের কিছু জিনিস পেতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু পাওয়ার সামর্থ্য নেই। তার জন্য কি আমরা প্রতিদান পাব?” তিনি জবাবে বললেন, فَقِيمَ تُؤْجَرُونَ إِذَا لَمْ تُؤْجَرُوا عَلَى ذَلِكَ؟ “এর জন্যই যদি প্রতিদান না পাও, তা হলে কীসের জন্য পাবে?”[৬২৪]

ওপর ভালো তো নিচ ভালো
৫৫২. আবূ আবদ রাব্বিহি বলেন, আমি শুনেছি, মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান এই মিম্বরের ওপর বসে বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি- إِنَّ مَا بَقِيَ مِنَ الدُّنْيَا بَلَاءٌ وَفِتْنَةٌ، وَإِنَّمَا مَثَلُ عَمَلِ أَحَدِكُمْ كَمَثَلِ الْوِعَاءِ، إِذَا طَابَ أَعْلَاهُ طَابَ أَسْفَلُهُ، وَإِذَا خَبُثَ أَعْلَاهُ خَبُثَ أَسْفَلُهُ
“দুনিয়াতে যা অবশিষ্ট থাকবে তা হলো বিপদাপদ ও ফিতনা। তোমাদের আমলের উদাহরণ হলো পাত্রের মতো: তার ওপরের অংশ ভালো থাকলে নিচের অংশও ভালো থাকে। আর ওপরের অংশ খারাপ হলে নিচের অংশও খারাপ হয়।”[৬২৫]

কারাগার
৫৫৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “দুনিয়া হলো কাফিরের জন্য জান্নাত ও মুমিনের জন্য কারাগার। যখন মুমিনের (জান কব্য) করা হয় তখন তার অবস্থা যেন কারাগার থেকে বের হওয়া ব্যক্তির মতো। যে কিনা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা শুরু করে এবং স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়।”[৬২৬] (অনুরূপ মুমিন বান্দাও দুনিয়ার কারাগার থেকে বেরিয়ে জান্নাতে গিয়ে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করবে।)

কারাগার থেকে মুক্তিলাভ
৫৫৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَسَنَّتُهُ، فَإِذَا فَارَقَ الدُّنْيَا فَارَقَ السِّجْنَ وَالسَّنَةَ
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার ও সঙ্কটময় সময়; যখন সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, তখন সে মূলত কারাগার ও সঙ্কট থেকে বিদায় নেয়।”[৬২৭]

মুমিনের উপহার
৫৫৫. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, تُحْفَةُ الْمُؤْمِنِ الْمَوْتُ “মুমিনের জন্য উপহার হলো মৃত্যু।”[৬২৮]

গুনাহগার ব্যতীত সবাইকে
৫৫৬. মুহারিব ইবনু দিসার বলেন, খাইসামাহ রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, মৃত্যু কি তোমাকে আনন্দিত করে? আমি বললাম, না তো। তখন তিনি বললেন, দোষত্রুটিপূর্ণ লোক ছাড়া আর সবাইকেই মৃত্যু আনন্দিত করে।”[৬২৯]

সবচেয়ে প্রিয়
৫৫৭. আবূ আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, আবুল আ'ওয়ার সুলামি একটি মজলিসে বসা ছিলেন। সেখানে একজন লোক বলল, আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা যত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এ কথা শুনে আবুল আ'ওয়ার সুলামি বললেন, “তোমার মতো হওয়া আমার কাছে লাল উটের পাল থেকেও প্রিয়। কিন্তু, আল্লাহর কসম, তিনটি জিনিস দেখার আগেই আমি মৃত্যুবরণ করতে চাই : ১. কাউকে উপদেশ দিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হতে দেখা। ২. কোনো-কিছুর পরিবর্তন করতে চেয়েও তা করতে না পারা। ৩. নিজের বার্ধক্য।”[৬৩০]

অহংকার প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা
৫৫৮. শুরাহবীল ইবনু মুসলিম থেকে বর্ণিত। আমর ইবনু আসওয়াদ আনসি অনেক তৃপ্তিদায়ক বস্তু পরিত্যাগ করতেন এই ভয়ে যে (সেগুলো গ্রহণ করলে) তাঁর অহংকার প্রকাশ পাবে।[৬৩১]

পেট একটি মন্দ পাত্র
৫৫৯. মিকদাম ইবনু মাদিকারিব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلُ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ فَثُلُثُ طَعَامُ، وَثُلُثُ شَرَابٌ ، وَثُلُثُ لِنَفْسِهِ
"পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লুকমা খাবারই আদম-সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আরও বেশি যদি খেতেই হয় তবে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”[৬০২]

বেশি খেলে বেশি ক্ষুধা
৫৬০. আইয়ূব ইবনু উসমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লোককে ঢেকুর তুলতে দেখে বললেন-
أَقْصِرُ مِنْ جُشَابِكَ، فَإِنَّ أَطْوَلَ النَّاسِ جُوعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ شِبَعًا فِي الدُّنْيَا
"ঢেকুর কম তোলো। কিয়ামাতের দিন ওইসব লোকের ক্ষুধাই সবচেয়ে দীর্ঘ হবে, যারা দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি পরিতৃপ্ত থাকে।”[৬৩৩]

আট বছর অতৃপ্ত থাকা
৫৬১. হামযা ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উমর বলেছেন, (আমার পিতা) আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে যদি বেশি খাবার থাকত, তা হলে তিনি খাবারের জন্য অন্য কাউকে পেয়ে গেলে তৃপ্তিভরে খেতেন না। হামযা বলেন, তাঁর মৃত্যুশয্যায় ইবনু মুত্বি' তাঁকে দেখতে এলেন। দেখলেন তাঁর শরীর শুকিয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যা বিনতু আবী উবাইদকে বললেন, আপনি কি তাঁর সেবাযত্ন করেন না? তাকে ভালো খাবার খাওয়ান না? তা হলে তো তার শরীরটা ফিরে আসত। সাফিয়্যা বললেন, আমরা তো খাবার প্রস্তুত করিই। কিন্তু তিনি সেটা পরিবার-পরিজন আর মেহমানদের সাথে ভাগ করে নেন। প্রয়োজনে তাঁকেই জিজ্ঞস করুন। তখন ইবনু মুত্বি' বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান, আপনি যদি ঠিকমতো খাবার খেতেন, তা হলে আপনার শরীরটা ফিরে আসত। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমার আটটি বছর এমনভাবে কেটেছে যে একবারও তৃপ্তিসহ খাইনি (অথবা বলেছেন, মাত্র একবার তৃপ্তিসহ খেয়েছি)। এখন তো একটি গাধার পিপাসার সমান[৬৩৪] আয়ু বাকি রয়েছে। এমন সময় আমি পেটপুরে খাই, এমনটাই কি তুমি চাও?”[৬৩৫]

তরকারিতে ঝোল বেশি দেওয়া
৫৬২. আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার প্রিয়বন্ধু (নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ওসিয়ত করেছেন- إِذَا صَنَعْتَ مَرَقًا فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، ثُمَّ انْظُرْ إِلَى أَهْلِ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِكَ فَأَصِبْهُمْ مِنْهُ بِمَعْرُوفٍ "তরকারি রান্না করলে বেশি করে পানি দেবে। তারপর প্রতিবেশী লোকদের খোঁজ-খবর নেবে এবং ওই ঝোল থেকে সৌজন্য হিসেবে কিছুটা তাদেরকে দেবে।”[৬৩৬]

মেহমান ছাড়া না খাওয়া
৫৬৩. আবদুর রহমান ইবনু নাওফাল থেকে বর্ণিত, সাফিয়্যাহ বিনতু আবী উবাইদ বলেন, আমি আমার স্বামী (আবদুল্লাহ ইবনু উমরকে) কখনও তৃপ্তিসহ খেতে দেখিনি। তবে একবার দেখেছি। তাঁর আশ্রয়ে দুইজন ইয়াতীম বালক-বালিকা ছিল। আমি তাঁর জন্য একবার একটি আলাদা খাবার প্রস্তুত করলাম। তিনি ওই ইয়াতীম বালক-বালিকাকে ডেকে পাঠালেন। তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো। এরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাঁর জন্য আলাদা খাবারটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, ইয়াতীম মেয়েটিকে ডাকো। আমি বললাম, ওরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওদের দুইজনকে পেটভরে খাইয়েছি। তিনি বললেন, ও আচ্ছা। তা হলে আহলে সুফফার কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসো, যাও।
তখন কয়েকজন গরিব মানুষকে ডেকে আনা হলো এবং তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো।”[৬৩৭]

ভালো খাবার বেছে মিসকীনদের প্রদান
৫৬৪. আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা একবার একটি সফরে ছিলেন। চলতে চলতে একটি জায়গায় (যাত্রা) বিরতি করলেন। তখনও তাঁর পাথেয় ও সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি। কাফেলার সঙ্গীরা তাঁকে এভাবে দেখে নিজেদের খাবার থেকে কিছু অংশ তাঁকে পাঠালেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বসলেন। এ সময় কিছু মিসকীন লোক এল। ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা তখন তা দেখতে লাগলেন তাঁর সামনে কোন খাবারটি সবচেয়ে ভালো। বড়ো একটি পাত্রভর্তি ছারিদ পেয়ে সেটিই উঁচিয়ে ধরলেন মিসকীনদের দেওয়ার জন্য। তৎক্ষণাৎ তাঁর এক ছেলে তাঁর হাত থেকে পাত্রটি নিয়ে নিলেন। বললেন, “আব্বু, এটা আপনার সবচেয়ে ভালো খাবার। এটা আমাদের জন্য রাখুন। গরিব-মিসকীনকে খাওয়ানোর মতো এখানে আরও খাবার আছে।” বর্ণনাকারী বলেন, পাত্রটি নিয়ে পিতা-পুত্রের কাড়াকাড়ির মধ্যে লেগে গেল। অবশেষে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "আমি এই পাত্রের খাবার দান করে আমার ঘাড় থেকে বোঝা নামাতে চাই।”[৬৩৮]

খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয়
৫৬৫. শাহর ইবনু হাওশাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এ কথা বলা হতো—খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয় যুক্ত হলে সব দিক থেকে খাবারের পূর্ণতা পায়। ১. খাবার হালাল হওয়া; ২. খাবার গ্রহণের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ; ৩. খাবারে অনেকগুলো হাতের সমাবেশ (কয়েকজন একসঙ্গে খাওয়া); ৪. খাবার গ্রহণের শেষে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায়। যখন এই চারটি বিষয় একত্র হয়, তখন খাবার সবদিক থেকেই পূর্ণতা লাভ করে।”

খাবার খেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা
৫৬৬. আবূ সালিহ বলেন, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে কয়েকজন লোক খাবার খেল। তিনি বললেন, “(খাবারের সাথে সুস্বাদু) কিছু মিশিয়ে নাও।” তারা বলল, “কী দিয়ে সুস্বাদু করব?” তিনি বললেন, “খাবার গ্রহণ শেষ হলে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।”[৬৩৯]

দুধের মাছি
৫৬৭. আবূ বকর ইবনু হাম্স রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত কাউকেই তাঁর সঙ্গে খাদ্যগ্রহণে বাধা দিতেন না। এমনকি কুষ্ঠরোগী, শ্বেতরোগীরা ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত লোকদেরও তিনি নিমন্ত্রণ জানাতেন। তারা তাঁর সঙ্গে বসে খেত। একবার আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা দস্তরখানায় বসে ছিলেন। এ সময় মদীনার দুজন দাস এল। তারা সালাম দিল। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে যে-সকল ফকির-মিসকীন বসে ছিল তারা এই দুজন লোককে অভিনন্দন জানাল, তাদের উদ্দেশ্যে আনন্দ প্রকাশ করল এবং তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিল। এটা দেখে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা হেসে ফেললেন। কিন্তু আগন্তুক লোক দুজন তাঁর হাসিকে মেনে নিতে পারল না। তারা বলল, আবূ আবদুর রহমান, আল্লাহ তাআলা আপনার দাঁতগুলোকে হাসিতে উজ্জ্বল রাখুক। কিন্তু কেন হাসলেন, তা জানতে পারি কি? আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি এই লোকগুলোর কাণ্ড দেখে হেসেছি। এই লোকগুলো এখানে আসে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় তাদের মুখ থেকে যেন রক্ত পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়; একজন আরেকজনকে জায়গায় দিতে চায় না, যে যাকে পারে কষ্ট দেয়। কারও পক্ষে দুইজনের জায়গা দখল করা সম্ভব হলে অন্যদের কষ্ট দিয়েও ওই কাজটাই করে। তোমরা দুইজন এখানে এসেছ, তবে তোমাদের সাথে আছে পর্যাপ্ত পাথেয় ও সামগ্রী। ফলে তারা তোমাদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে, তোমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা এমন লোকদেরকে তাদের খাবার খাওয়াতে চায় যারা তা খেতে চায় না; অথচ যারা তা খেতে চায় তাদেরকে কিছুতেই দেয় না।”[৬৪০]

টিকাঃ
[৬১৯] হাদীসটির সনদ সহীহ ও মাওকুফ।
[৬২০] হাদীসটির সনদ হাসান ও মাওকুফ।
[৬২১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২২] তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ১০/২৮৬। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১, মাওকুফ এবং এর সনদ দুর্বল।
[৬২৪] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৬২৫] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪০৩৫, সনদ সহীহ।
[৬২৬] হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণিত।
[৬২৭] মুসনাদ আহমাদ, ২/১৯৮, হাদীসটির সনদ হাসান লি-গাইরিহি।
[৬২৮] হাকিম, মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, সনদ সহীহ।
[৬২৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০২] তিরমিযি, সুনান, ২৩৮০, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৬৩৩] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত। আলবানি বলেছেন, হাদীসটি হাসান, কারণ এর একাধিক সূত্র রয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, হাদীস নং ৩৪৩; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৪/২৫০।
[৬৩৪] গাধা খুব দ্রুত পিপাসার্ত হয়। তাই এখানে মুমূর্ষু অবস্থাকে গাধার পিপাসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
[৬৩৫] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩১৮। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৬] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৬৮৫৫।
[৬৩৭] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৮] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩৯] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪০] তাহযিবুল কামাল, ৩৩/৮৯। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ。

সপ্তম অনুচ্ছেদ
আয়েশি-জীবন বর্জন করা

কল্যাণকর বিষয় মনোনয়ন
৫৪৬. আল্লাহ তাআলা বলেন, اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ "আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার ইচ্ছা রিযক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা রিযক সংকুচিত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা যে বান্দার জন্য যেটা কল্যাণকর মনে করেন, তার জন্য তা-ই মনোনীত করেন।”[৬১৯]

হালাল উপার্জনে কোনো লজ্জা নেই
৫৪৭. আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআ থেকে বর্ণিত, ইয়াযীদ ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হালাল (উপার্জনের) ব্যাপারে যে ব্যক্তি লজ্জাবোধ করে না, তার খরচ এবং অহংকার কমে যায়।”[৬২০]

সম্পদ দেখে সুখলাভ
৫৪৮. লুকমান ইবনু আমির থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “সম্পদশালীও আহার করে, আমরাও আহার করি; তারাও পান করে, আমরাও পান করি; তারাও কাপড় পরে, আমরাও কাপড় পরি; তাদের থাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ, যার দিকে তারা তাকিয়ে থাকে (এবং সুখ পায়)। তাদের সম্পদের দিকে আমরাও তাকাই। সেসব সম্পদের হিসাব তাদেরকে দিতে হবে; কিন্তু আমরা তা থেকে মুক্ত।”[৬২১]

আত্মার প্রশান্তি
৫৪৯. বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, الزهادة في الدنيا راحة القلب والجسد “দুনিয়াবিমুখতা হলো আত্মা ও দেহের প্রশান্তি।”[৬২২]

দুই সতীন
৫৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "দুনিয়া ও আখিরাত হলো এক ব্যক্তির দুই স্ত্রীর মতো। একজনকে সন্তুষ্ট করতে গেলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হয়।”[৬২৩]

না-পাওয়ার প্রতিদান
৫৫১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের কিছু জিনিস পেতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু পাওয়ার সামর্থ্য নেই। তার জন্য কি আমরা প্রতিদান পাব?” তিনি জবাবে বললেন, فَقِيمَ تُؤْجَرُونَ إِذَا لَمْ تُؤْجَرُوا عَلَى ذَلِكَ؟ “এর জন্যই যদি প্রতিদান না পাও, তা হলে কীসের জন্য পাবে?”[৬২৪]

ওপর ভালো তো নিচ ভালো
৫৫২. আবূ আবদ রাব্বিহি বলেন, আমি শুনেছি, মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান এই মিম্বরের ওপর বসে বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি- إِنَّ مَا بَقِيَ مِنَ الدُّنْيَا بَلَاءٌ وَفِتْنَةٌ، وَإِنَّمَا مَثَلُ عَمَلِ أَحَدِكُمْ كَمَثَلِ الْوِعَاءِ، إِذَا طَابَ أَعْلَاهُ طَابَ أَسْفَلُهُ، وَإِذَا خَبُثَ أَعْلَاهُ خَبُثَ أَسْفَلُهُ
“দুনিয়াতে যা অবশিষ্ট থাকবে তা হলো বিপদাপদ ও ফিতনা। তোমাদের আমলের উদাহরণ হলো পাত্রের মতো: তার ওপরের অংশ ভালো থাকলে নিচের অংশও ভালো থাকে। আর ওপরের অংশ খারাপ হলে নিচের অংশও খারাপ হয়।”[৬২৫]

কারাগার
৫৫৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “দুনিয়া হলো কাফিরের জন্য জান্নাত ও মুমিনের জন্য কারাগার। যখন মুমিনের (জান কব্য) করা হয় তখন তার অবস্থা যেন কারাগার থেকে বের হওয়া ব্যক্তির মতো। যে কিনা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা শুরু করে এবং স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়।”[৬২৬] (অনুরূপ মুমিন বান্দাও দুনিয়ার কারাগার থেকে বেরিয়ে জান্নাতে গিয়ে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করবে।)

কারাগার থেকে মুক্তিলাভ
৫৫৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَسَنَّتُهُ، فَإِذَا فَارَقَ الدُّنْيَا فَارَقَ السِّجْنَ وَالسَّنَةَ
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার ও সঙ্কটময় সময়; যখন সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, তখন সে মূলত কারাগার ও সঙ্কট থেকে বিদায় নেয়।”[৬২৭]

মুমিনের উপহার
৫৫৫. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, تُحْفَةُ الْمُؤْمِنِ الْمَوْتُ “মুমিনের জন্য উপহার হলো মৃত্যু।”[৬২৮]

গুনাহগার ব্যতীত সবাইকে
৫৫৬. মুহারিব ইবনু দিসার বলেন, খাইসামাহ রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, মৃত্যু কি তোমাকে আনন্দিত করে? আমি বললাম, না তো। তখন তিনি বললেন, দোষত্রুটিপূর্ণ লোক ছাড়া আর সবাইকেই মৃত্যু আনন্দিত করে।”[৬২৯]

সবচেয়ে প্রিয়
৫৫৭. আবূ আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, আবুল আ'ওয়ার সুলামি একটি মজলিসে বসা ছিলেন। সেখানে একজন লোক বলল, আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা যত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এ কথা শুনে আবুল আ'ওয়ার সুলামি বললেন, “তোমার মতো হওয়া আমার কাছে লাল উটের পাল থেকেও প্রিয়। কিন্তু, আল্লাহর কসম, তিনটি জিনিস দেখার আগেই আমি মৃত্যুবরণ করতে চাই : ১. কাউকে উপদেশ দিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হতে দেখা। ২. কোনো-কিছুর পরিবর্তন করতে চেয়েও তা করতে না পারা। ৩. নিজের বার্ধক্য।”[৬৩০]

অহংকার প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা
৫৫৮. শুরাহবীল ইবনু মুসলিম থেকে বর্ণিত। আমর ইবনু আসওয়াদ আনসি অনেক তৃপ্তিদায়ক বস্তু পরিত্যাগ করতেন এই ভয়ে যে (সেগুলো গ্রহণ করলে) তাঁর অহংকার প্রকাশ পাবে।[৬৩১]

পেট একটি মন্দ পাত্র
৫৫৯. মিকদাম ইবনু মাদিকারিব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلُ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ فَثُلُثُ طَعَامُ، وَثُلُثُ شَرَابٌ ، وَثُلُثُ لِنَفْسِهِ
"পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লুকমা খাবারই আদম-সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আরও বেশি যদি খেতেই হয় তবে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”[৬০২]

বেশি খেলে বেশি ক্ষুধা
৫৬০. আইয়ূব ইবনু উসমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লোককে ঢেকুর তুলতে দেখে বললেন-
أَقْصِرُ مِنْ جُشَابِكَ، فَإِنَّ أَطْوَلَ النَّاسِ جُوعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ شِبَعًا فِي الدُّنْيَا
"ঢেকুর কম তোলো। কিয়ামাতের দিন ওইসব লোকের ক্ষুধাই সবচেয়ে দীর্ঘ হবে, যারা দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি পরিতৃপ্ত থাকে।”[৬৩৩]

আট বছর অতৃপ্ত থাকা
৫৬১. হামযা ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উমর বলেছেন, (আমার পিতা) আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে যদি বেশি খাবার থাকত, তা হলে তিনি খাবারের জন্য অন্য কাউকে পেয়ে গেলে তৃপ্তিভরে খেতেন না। হামযা বলেন, তাঁর মৃত্যুশয্যায় ইবনু মুত্বি' তাঁকে দেখতে এলেন। দেখলেন তাঁর শরীর শুকিয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যা বিনতু আবী উবাইদকে বললেন, আপনি কি তাঁর সেবাযত্ন করেন না? তাকে ভালো খাবার খাওয়ান না? তা হলে তো তার শরীরটা ফিরে আসত। সাফিয়্যা বললেন, আমরা তো খাবার প্রস্তুত করিই। কিন্তু তিনি সেটা পরিবার-পরিজন আর মেহমানদের সাথে ভাগ করে নেন। প্রয়োজনে তাঁকেই জিজ্ঞস করুন। তখন ইবনু মুত্বি' বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান, আপনি যদি ঠিকমতো খাবার খেতেন, তা হলে আপনার শরীরটা ফিরে আসত। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমার আটটি বছর এমনভাবে কেটেছে যে একবারও তৃপ্তিসহ খাইনি (অথবা বলেছেন, মাত্র একবার তৃপ্তিসহ খেয়েছি)। এখন তো একটি গাধার পিপাসার সমান[৬৩৪] আয়ু বাকি রয়েছে। এমন সময় আমি পেটপুরে খাই, এমনটাই কি তুমি চাও?”[৬৩৫]

তরকারিতে ঝোল বেশি দেওয়া
৫৬২. আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার প্রিয়বন্ধু (নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ওসিয়ত করেছেন- إِذَا صَنَعْتَ مَرَقًا فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، ثُمَّ انْظُرْ إِلَى أَهْلِ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِكَ فَأَصِبْهُمْ مِنْهُ بِمَعْرُوفٍ "তরকারি রান্না করলে বেশি করে পানি দেবে। তারপর প্রতিবেশী লোকদের খোঁজ-খবর নেবে এবং ওই ঝোল থেকে সৌজন্য হিসেবে কিছুটা তাদেরকে দেবে।”[৬৩৬]

মেহমান ছাড়া না খাওয়া
৫৬৩. আবদুর রহমান ইবনু নাওফাল থেকে বর্ণিত, সাফিয়্যাহ বিনতু আবী উবাইদ বলেন, আমি আমার স্বামী (আবদুল্লাহ ইবনু উমরকে) কখনও তৃপ্তিসহ খেতে দেখিনি। তবে একবার দেখেছি। তাঁর আশ্রয়ে দুইজন ইয়াতীম বালক-বালিকা ছিল। আমি তাঁর জন্য একবার একটি আলাদা খাবার প্রস্তুত করলাম। তিনি ওই ইয়াতীম বালক-বালিকাকে ডেকে পাঠালেন। তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো। এরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাঁর জন্য আলাদা খাবারটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, ইয়াতীম মেয়েটিকে ডাকো। আমি বললাম, ওরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওদের দুইজনকে পেটভরে খাইয়েছি। তিনি বললেন, ও আচ্ছা। তা হলে আহলে সুফফার কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসো, যাও।
তখন কয়েকজন গরিব মানুষকে ডেকে আনা হলো এবং তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো।”[৬৩৭]

ভালো খাবার বেছে মিসকীনদের প্রদান
৫৬৪. আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা একবার একটি সফরে ছিলেন। চলতে চলতে একটি জায়গায় (যাত্রা) বিরতি করলেন। তখনও তাঁর পাথেয় ও সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি। কাফেলার সঙ্গীরা তাঁকে এভাবে দেখে নিজেদের খাবার থেকে কিছু অংশ তাঁকে পাঠালেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বসলেন। এ সময় কিছু মিসকীন লোক এল। ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা তখন তা দেখতে লাগলেন তাঁর সামনে কোন খাবারটি সবচেয়ে ভালো। বড়ো একটি পাত্রভর্তি ছারিদ পেয়ে সেটিই উঁচিয়ে ধরলেন মিসকীনদের দেওয়ার জন্য। তৎক্ষণাৎ তাঁর এক ছেলে তাঁর হাত থেকে পাত্রটি নিয়ে নিলেন। বললেন, “আব্বু, এটা আপনার সবচেয়ে ভালো খাবার। এটা আমাদের জন্য রাখুন। গরিব-মিসকীনকে খাওয়ানোর মতো এখানে আরও খাবার আছে।” বর্ণনাকারী বলেন, পাত্রটি নিয়ে পিতা-পুত্রের কাড়াকাড়ির মধ্যে লেগে গেল। অবশেষে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "আমি এই পাত্রের খাবার দান করে আমার ঘাড় থেকে বোঝা নামাতে চাই।”[৬৩৮]

খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয়
৫৬৫. শাহর ইবনু হাওশাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এ কথা বলা হতো—খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয় যুক্ত হলে সব দিক থেকে খাবারের পূর্ণতা পায়। ১. খাবার হালাল হওয়া; ২. খাবার গ্রহণের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ; ৩. খাবারে অনেকগুলো হাতের সমাবেশ (কয়েকজন একসঙ্গে খাওয়া); ৪. খাবার গ্রহণের শেষে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায়। যখন এই চারটি বিষয় একত্র হয়, তখন খাবার সবদিক থেকেই পূর্ণতা লাভ করে।”

খাবার খেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা
৫৬৬. আবূ সালিহ বলেন, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে কয়েকজন লোক খাবার খেল। তিনি বললেন, “(খাবারের সাথে সুস্বাদু) কিছু মিশিয়ে নাও।” তারা বলল, “কী দিয়ে সুস্বাদু করব?” তিনি বললেন, “খাবার গ্রহণ শেষ হলে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।”[৬৩৯]

দুধের মাছি
৫৬৭. আবূ বকর ইবনু হাম্স রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত কাউকেই তাঁর সঙ্গে খাদ্যগ্রহণে বাধা দিতেন না। এমনকি কুষ্ঠরোগী, শ্বেতরোগীরা ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত লোকদেরও তিনি নিমন্ত্রণ জানাতেন। তারা তাঁর সঙ্গে বসে খেত। একবার আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা দস্তরখানায় বসে ছিলেন। এ সময় মদীনার দুজন দাস এল। তারা সালাম দিল। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে যে-সকল ফকির-মিসকীন বসে ছিল তারা এই দুজন লোককে অভিনন্দন জানাল, তাদের উদ্দেশ্যে আনন্দ প্রকাশ করল এবং তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিল। এটা দেখে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা হেসে ফেললেন। কিন্তু আগন্তুক লোক দুজন তাঁর হাসিকে মেনে নিতে পারল না। তারা বলল, আবূ আবদুর রহমান, আল্লাহ তাআলা আপনার দাঁতগুলোকে হাসিতে উজ্জ্বল রাখুক। কিন্তু কেন হাসলেন, তা জানতে পারি কি? আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি এই লোকগুলোর কাণ্ড দেখে হেসেছি। এই লোকগুলো এখানে আসে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় তাদের মুখ থেকে যেন রক্ত পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়; একজন আরেকজনকে জায়গায় দিতে চায় না, যে যাকে পারে কষ্ট দেয়। কারও পক্ষে দুইজনের জায়গা দখল করা সম্ভব হলে অন্যদের কষ্ট দিয়েও ওই কাজটাই করে। তোমরা দুইজন এখানে এসেছ, তবে তোমাদের সাথে আছে পর্যাপ্ত পাথেয় ও সামগ্রী। ফলে তারা তোমাদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে, তোমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা এমন লোকদেরকে তাদের খাবার খাওয়াতে চায় যারা তা খেতে চায় না; অথচ যারা তা খেতে চায় তাদেরকে কিছুতেই দেয় না।”[৬৪০]

টিকাঃ
[৬১৯] হাদীসটির সনদ সহীহ ও মাওকুফ।
[৬২০] হাদীসটির সনদ হাসান ও মাওকুফ।
[৬২১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২২] তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ১০/২৮৬। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১, মাওকুফ এবং এর সনদ দুর্বল।
[৬২৪] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৬২৫] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪০৩৫, সনদ সহীহ।
[৬২৬] হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণিত।
[৬২৭] মুসনাদ আহমাদ, ২/১৯৮, হাদীসটির সনদ হাসান লি-গাইরিহি।
[৬২৮] হাকিম, মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, সনদ সহীহ।
[৬২৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০২] তিরমিযি, সুনান, ২৩৮০, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৬৩৩] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত। আলবানি বলেছেন, হাদীসটি হাসান, কারণ এর একাধিক সূত্র রয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, হাদীস নং ৩৪৩; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৪/২৫০।
[৬৩৪] গাধা খুব দ্রুত পিপাসার্ত হয়। তাই এখানে মুমূর্ষু অবস্থাকে গাধার পিপাসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
[৬৩৫] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩১৮। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৬] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৬৮৫৫।
[৬৩৭] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৮] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩৯] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪০] তাহযিবুল কামাল, ৩৩/৮৯। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00