📄 সাদামাটা জীবন-যাপন
ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ
সাদামাটা জীবন-যাপন
অপছন্দনীয় অথচ উত্তম দুটি বিষয়
৫২২. কাইস ইবনু হাবতার থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "মৃত্যু ও দরিদ্রতা, এই দুইটি বিষয়কে অপছন্দ করা হয়।
(অন্য বর্ণনায় আছে) : আল্লাহর কসম, সে বিষয় দুটি হলো, সচ্ছলতা ও দরিদ্রতা। এই দুটির কোনো-একটা দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করা হোক না কেন, আমি কোনো পরোয়া করি না। (কারণ,) দুটি অবস্থাতেই আল্লাহর হক আদায় করা ওয়াজিব। সচ্ছলতার সময় (অন্যের ওপর) দয়া করা আর দরিদ্রতার সময় ধৈর্য ধারণ করা (আবশ্যক)।”[৫৮৮]
আগন্তুক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
৫২৩. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “ইশ! আমি যদি সকালে এসে সন্ধ্যায় চলে যাওয়া মুসাফিরের মতো হতে পারতাম!”[৫৮৯]
দরিদ্রতা মুমিনের জন্য শোভাময়
৫২৪. সা'দ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْفَقْرُ أَحْسَنُ - أَوْ أَزْيَنُ - بِالْمُؤْمِنِ مِنَ الْعِذَارِ الْجَيِّدِ عَلَى خَدِ الْفَرَسِ
"দরিদ্রতা মুমিনের জন্য ঘোড়ার গালে-থাকা চমৎকার পশমের চেয়েও সুন্দর, সুশোভিত।”[৫৯০]
সাহাবিগণ উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ
৫২৫. আলি ইবনু আবী তালহা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কোনো-একটি ঘর থেকে বেরিয়ে মাসজিদে গেলেন। সেখানে কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন মাসজিদের এক প্রান্তে (কিছু মানুষের) আওয়াজ শুনতে পেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
الصَّلَاةَ تَنْتَظِرُونَ؟ أَمَا إِنَّهَا صَلَاةً لَمْ تَكُنْ فِي الْأُمَمِ قَبْلَكُمْ, وَهِيَ الْعِشَاءُ
"সালাতের অপেক্ষা করছ, তাই না? এ তো এমন সালাত যা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে ছিল না; এটা ইশার সালাত।” তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
إِنَّ النُّجُومَ أَمَانُ لِلسَّمَاءِ، فَإِذَا حُمِسَتِ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ، وَأَنَا أَمَانُ لِأَصْحَابِي، فَإِذَا مِتُ أَتَى أَصْحَابِي مَا يُوعَدُونَ، وَأَصْحَابِي أَمَانُ لِأُمَّتِي، فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِي أَتَى أُمَّتِي مَا يُوعَدُونَ
“নক্ষত্ররাজি হলো আকাশের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা; যখন নক্ষত্রগুলো আলোকহীন হয়ে যাবে, আকাশের জন্য প্রতিশ্রুত বিপদ (কিয়ামাত) আসবে। আমি আমার সাহাবিদের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ; আমার ইন্তেকালের পর তাদের ওপর প্রতিশ্রুত বিপদাপদ (ফিতনা-ফাসাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ) উপস্থিত হবে। আর আমার সাহাবিগণ আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ; তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর আমার উম্মতের ওপর প্রতিশ্রুত বিপদ উপস্থিত হবে।"[৫৯১]
খাবার শেষে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা
৫২৬. উসমান ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমরা একবার উন্মুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহা-এর সঙ্গে খাবার খাওয়ার পর 'আলহামদু লিল্লাহ' বলতে ভুলে গেলাম। তিনি বললেন, ছেলেরা, খাবারের সাথে আল্লাহর যিকর মিশিয়ে নাও। চুপ থেকে খাওয়ার চেয়ে আল্লাহর প্রশংসা-সহ খাবার খাওয়া উত্তম।”[৫৯২]
খাবার স্বাদটুকুও খেয়াল না করা
৫২৭. আবদুর রহমান ইবনু আমর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا أُبَالِي مَا رَدَدْتُ بِهِ عَنِي الْجُوعِ
"কী দিয়ে ক্ষুধা মেটালাম, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।”[৫৯৩]
সাহাবিগণের উপমা
৫২৮. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مَثَلَ أَصْحَابِي فِي أُمَّتِي كَالْمِلْحِ فِي الطَّعَامِ، لَا يَصْلُحُ الطَّعَامُ إِلَّا بِالْمِلْحِ.
“খাবারের মধ্যে লবণ যেমন, উম্মতের মধ্যে আমার সাহাবিরাও তেমন। লবণ ছাড়া খাদ্য (খাওয়ার) উপযুক্ত হয় না।”[৫৯৪] হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমাদের লবণ চলে গেছে, আমরা আর কীভাবে উপযুক্ত হব?
সামান্যতম জীবনোপকরণই যথেষ্ট
৫২৯. খাইসামা ইবনু আবদির রহমান থেকে বর্ণিত, সুলাইমান আলাইহিস সালাম বলেছেন,
كُلُّ الْعَيْشِ قَدْ جَرَّبْنَاهُ، لَيْنُهُ وَشَدِيدُهُ، فَوَجَدْنَا يَكْفِي مِنْهُ أَدْنَاهُ
“কোমল ও কঠিন সব ধরনের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা আমরা লাভ করেছি। আমরা দেখেছি, সামান্যতম জীবনোপকরণই যথেষ্ট।”[৫৯৫]
কষ্টকর জীবনযাপন
৫৩০. মুসআব ইবনু সা'দ থেকে বর্ণিত। হাফসা রদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর বাবা উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, “আপনি কি এর চেয়ে নরম কাপড় পরতে পারেন না? অথবা এর চেয়ে উত্তম খাবার খেতে পারেন না? আল্লাহ তাআলা তো আপনার জন্য জমিনকে অধীন করে দিয়েছেন, প্রাচুর্যও দিয়েছেন রিযকে।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি তোমার সাথে কিছুটা বোঝাপড়া করতে চাই।” তারপর তিনি রাসূলের জীবনের কষ্টগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন। এবং অবশেষে হাফসা রদিয়াল্লাহু আনহা কেঁদে ফেললেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “(রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু-র মতো) আমিও কষ্টকর জীবনযাপন করতে চাই, তা হলে হয়তো (জান্নাতে) স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনেও তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারব।”[৫৯৬]
নবিজির কিছু বৈশিষ্ট্য
৫৩১. ইয়াহইয়া ইবনুল মুখতার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা স্মরণ করে বললেন, “আল্লাহর কসম, তাঁর ও সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো দরজা বন্ধ হতো না; তাঁর ও মানুষের মাঝে কোনো পর্দা ছিল না। সকালে তার জন্য (খাদ্যভর্তি) বড়ো বড়ো পাত্র নিয়ে আসা হতো না, সন্ধ্যায়ও না। তিনি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকতেন। নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে যে-কেউ সাক্ষাৎ করতে চাইলে সাক্ষাৎ করতে পারত। তিনি মাটির ওপর বসতেন, মাটির ওপর তাঁর খাবারের পাত্র রাখতেন। মোটা কাপড় পরতেন। গাধায় চড়তেন। আরোহণের সময় পেছনে (গোলামকে বা অন্য কাউকে) বসাতেন। হাত চেটে খেতেন।”[৫৯৭]
ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার না করা
৫৩২. উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আজাদকৃত গোলাম আসলাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান রদিয়াল্লাহু আনহুমা একবার আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলেন। মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ফর্সা ও সুন্দর। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে হাজ্জের উদ্দেশে বের হলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর (সৌন্দর্যের) দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছিলেন। তিনি তার হাতের আঙুল মুআবিয়ার পিঠের ওপর রাখলেন। তারপর জুতার ফিতা যতটুকু ওপরে থাকে আঙুলগুলো ততটুকু ওপরে উঠিয়ে বললেন, “বাহ্, বাহ্, দুনিয়া- আখিরাত উভয়টির কল্যাণ যদি একত্র হয়, তবে তো আমরা অতি উত্তম!” মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমীরুল মুমিনীন, আসলে আমাদের ওখানে খাদ্য ও পানীয়ের প্রাচুর্য [৫৯৮] আছে, গোসলখানাও আছে প্রচুর।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “তোমার কী সমস্যা, আমি তোমাকে জানাচ্ছি। তুমি সুস্বাদু খাবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছ, পিঠে সূর্যের আঁচ লাগলেই তোমার ভোর হয়, অথচ মুখাপেক্ষী ও সাহায্যপ্রার্থীরা আগে থেকেই তোমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।” বর্ণনাকারী বলেন, আমরা যখন যু-তুওয়া এলাকায় এলাম, মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু চমৎকার সুগন্ধি মাখানো একজোড়া পোশাক বের করে পরলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “তোমাদের কেউ কেউ সুগন্ধিবিহীন পোশাক পরে হাজি সাজে। কিন্তু আল্লাহর জমিনের সম্মানিত জায়গায় এসে সে-ই কিনা সুগন্ধীতে ডোবানো পোশাক বের করে পরিধান করে!” এ কথা শুনে মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি এটা পরে আমার পরিবার-আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলাম। আল্লাহর কসম, শুনেছি তারা সিরিয়ায় রয়েছে। আল্লাহ জানেন যে, আমি এই পোশাক পরতে (এখন) লজ্জা পাচ্ছি।” মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সুগন্ধময় পোশাক খুলে ফেললেন এবং যে দুটি কাপড়ে ইহরাম অবস্থায় ছিলেন, সে দুটি কাপড় পরলেন।”[৫৯৯]
পেটের চামড়া মসৃণ হওয়ায় নিন্দা
৫৩৩. আবদুল্লাহ ইবনু তাউস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াযীদ ইবনু আবী সুফইয়ানকে পেট বের করে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি দেখলেন যে তাঁর পেটের চামড়া অত্যন্ত মসৃণ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চাবুক ওঠালেন এবং বললেন, এটা কি কাফিরের চামড়া?[৬০০]
সুন্নাহর ব্যতিক্রম না করা
৫৩৪. সাঈদ ইবনু জুবাইর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু জানতে পারলেন যে, ইয়াযীদ ইবনু আবী সুফইয়ান রঙ- বেরঙের খাবার খান। শুনে তাঁর গোলাম ইয়ারফাকে বললেন, ইয়াযীদের রাতের খাবার পরিবেশন করার খবর পেলে আমাকে জানাবে। ইয়াযীদের রাতের খাবার পরিবেশন করা হলে গোলাম উমরকে জানাল। সংবাদ শুনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াযীদের কাছে এসে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ইয়াযীদের অনুমতি পেয়ে ভেতরে গেলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে রাতের খাবার এগিয়ে দিলেন ইয়াযীদ ইবনু আবী সুফইয়ান। প্রথমে দিলেন গোশত দিয়ে তৈরি ছারিদ [৬০১], উমর তাঁর সঙ্গে ছারিদ খেলেন। তারপর পরিবেশন করা হলো ভুনা গোশত। ইয়াযীদ রদিয়াল্লাহু আনহু ভুনা গোশত খাওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন; কিন্তু উমর রদিয়াল্লাহু আনহু হাত গুটিয়ে নিলেন। বললেন, ইয়াযীদ, এক বেলায় এত বাহারি রকমের খাবার? যাঁর হাতে উমরের প্রাণ তাঁর কসম, তুমি যদি তাঁদের সুন্নাহর ব্যতিক্রম করো, তা হলে এই ব্যতিক্রম আচরণ তোমাকে তাঁদের পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবে।”[৬০২]
উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খাদ্যাভ্যাস
৫৩৫. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসরা থেকে একদল প্রতিনিধি এলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আবূ মূসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে অবস্থান গ্রহণ করলাম। তাঁর প্রতিদিনের খাদ্য ছিল পানিতে ভেজানো টুকরো টুকরো শক্ত রুটি। আমাদের জন্য কখনও টুকরো রুটির সঙ্গে তরকারি হিসেবে ঘি থাকত, কখনও যাইতুনের তেল, কখনও বা দুধ। কখনও পেতাম শুকনো গোশতের গুঁড়ো, যা পানি দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়েছে। কদাচিৎ তাজা গোশত পেতাম। তবে পরিমাণে খুবই কম। একদিন তিনি আমাদের বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা দেখি কম কম খাচ্ছ। আমার খাবারেও তোমাদের অনীহা। আল্লাহর কসম, আমি চাইলেই সবচেয়ে ভালো খাবার খেতে পারতাম, আয়েশি জীবনযাপন করতে পারতাম। শোনো, সিনা আর কুঁজের গোশত যে কী (সুস্বাদু), তা আমি জানি। ভুনা গোশত, সরিষা ও তিলসমৃদ্ধ খাদ্য, পাতলা রুটির ব্যাপারেও আমার ভালো জানা আছে।”[৬০৩] কিন্তু আমি আল্লাহ তাআলাকে একদল লোকের নিন্দা করতে শুনেছি। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে নিন্দা করে বলেছেন,
أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا
"তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই সুখ-সম্ভার পেয়েছ এবং সেগুলো উপভোগও করেছ।”[৬০৪]
বর্ণনাকারী বলেন, আবূ মূসা আশআরি আমাদের বললেন, তোমরা যদি আমীরুল মুমিনীনকে বলতে, তা হলে তিনি তোমাদের খাবারের জন্য বাইতুল মাল থেকে খাদ্যের ব্যবস্থা করে দিতেন। তোমরা তা খেতে পারতে। তাঁর পরামর্শক্রমে আমরা আমীরুল মুমিনীনের সঙ্গে কথা বললাম। তখন তিনি আমাদের বললেন, “হে আমীর-উমারা সম্প্রদায়, আমি আমার নিজের জন্য যাতে সন্তুষ্ট তোমরা কি তোমাদের জন্য তাতে সন্তুষ্ট নও?” আমরা বললাম, আমীরুল মুমিনীন, মদীনার মতো জায়গায় জীবনযাপন খুব কঠিন। আমরা মনে করি না যে, আপনার খাদ্য বেশি জাঁকজমকপূর্ণও নয়, আবার অখাদ্যও নয়। কিন্তু আমাদের ওখানে খাদ্য ও পানীয়ের প্রাচুর্য আছে। আমাদের আমীরের সাথে দেখা করতে আসা বিপুল-সংখ্যক মানুষকে বেশ সুস্বাদু খাবার দেওয়া হয়। বর্ণনাকারী বলেন, এসব কথা শুনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন, “তোমাদের জন্য বাইতুল মাল থেকে দৈনিক দুটি ছাগল ও দুই জারিব[৬০৫] শস্য বরাদ্দ দিলাম। সকালে এক জারিব শস্য ও একটি ছাগল সবাই মিলে খাবে। তারপর পানীয় [৬০৬] চেয়ে পান করবে। তারপর তোমার ডান দিকে যে থাকবে তাকে পান করাবে, এরপর তার পরে যে রয়েছে তাকে পান করাবে। এরপর চাহিদা পূরণে (মলমূত্র ত্যাগের জন্য) বেরিয়ে পড়বে। সন্ধ্যায়ও অবশিষ্ট এক জারিব শস্য ও অবশিষ্ট ছাগলটি একইভাবে খেয়ো। সাবধান, ঘরবাড়িতে থাকা লোকদেরও পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে খাওয়াবে। ভূরিভোজের আয়োজন তাদের চরিত্রকে সুন্দর করে না; ক্ষুধার্তকেও তৃপ্ত করবে না। কিন্তু আল্লাহর কসম আমি মনে করি, কোনো মহল্লা বা পল্লী থেকে যদি প্রতিদিন দুটি ছাগল ও দুই জারিব শস্য নিয়ে নেওয়া হয়, তা হলে তা দ্রুতই ওই মহল্লাকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেবে।”[৬০৭]
চর্বি ও ঘি পরিহার
৫৩৬. আবদুল্লাহ ইবনু তাউস তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে একবার অনাবৃষ্টির ফলে অভাব দেখা দেয়। সেই সময়টাতে যতদিন না মানুষের মাখনযুক্ত খাওয়ার সামর্থ্য ফিরে এসেছে, ততদিন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু মাখনযুক্ত কোনো বস্তু খাননি।”[৬০৮]
বাহন থেকে অবতরণ
৫৩৭. আলকামা ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে (সিরিয়ায়) আসার পর তাঁকে অনারবি খচ্চর দেওয়া হলো। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? বলা হলো, আমীরুল মুমিনীন, এই বাহনটির চলন-ক্ষমতা চমৎকার, গঠন-আকৃতি ভালো, দেখতেও সুন্দর। অনারবরা এতে চড়ে। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু উঠে খচ্চরটিতে আরোহণ করলেন। প্রাণীটি চলা শুরু করা-মাত্রই প্রচণ্ডভাবে কাঁধ ঝাঁকাল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ এর অকল্যাণ করুন। কত নিকৃষ্ট বাহন এটা! এ কথা বলে খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে পড়লেন।”[৬০৯]
আটা ছাঁকতে নিষেধ
৫৩৮. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “তোমরা চালুনি দিয়ে আটা ছেঁকো না। কারণ আটা পুরোটাই খাদ্য।”[৬১০]
কখনও খাদ্যবস্তু না ছাঁকা
৫৩৯. ইয়াসার ইবনু নুমাইর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি যখনই উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খাদ্যবস্তু চেলেছি তার অবাধ্য হয়েই চেলেছি।”[৬১১]
ইসলামের দ্বারা সম্মানিত হওয়া
৫৪০. তারিক ইবনু শিহাব বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে আসার পর তাঁকে অনারবি খচ্চর দেওয়া হলো। তিনি খচ্চরটিতে চড়লেন। কিন্তু প্রাণীটি তাঁকে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকি দিল। তাই বাহনটি তাঁর পছন্দ হলো না, তিনি নেমে পড়লেন। তারপর নিজের উটে চড়ে সামনে যাওয়ার পথে একটি নালা পড়ল। তিনি উট থেকে নেমে তাঁর চামড়ার চটিজোড়া নিজের হাতে নিলেন। উটের লাগাম ধরে রেখে পানি পার হলেন। এই ঘটনার পর আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আজকে আপনি বিশ্ববাসীর সামনে মহান দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এ কথা শুনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বুকে চাপড় দিলেন এবং উচ্চ আওয়াজে বললেন, ওহ্, আবূ উবাইদা, এই কথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ বললে (মানাতো)। তোমরা ছিলে নিকৃষ্ট মানুষ, সংখ্যায় নগণ্য, তুচ্ছ। তখন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। তাই যতই তোমরা ইসলাম ছাড়া অন্যকিছুতে সম্মান খুঁজবে, আল্লাহ তোমাদের ততই অপদস্থ করবেন।”[৬১২]
বাহন বদল
৫৪১. কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ বলেন যে, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু- এর আজাদকৃত গোলাম আসলামকে এই ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি : শাম সফরে আসলাম উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলেন। সিরিয়ার কাছাকাছি পৌঁছে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর উটটিকে বসিয়ে ইসতিঞ্জা করতে গেলেন। আসলাম বলেন, "এই ফাঁকে আমি আমার পশমি চামড়ার পোশাকটি আমার বাহনের কাঁধের ওপর রাখলাম।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু ইসতিঞ্জা থেকে ফিরে এসে আমার উটটিতে আরোহণ করতে চাইলেন। উটটির পিঠে বিছিয়ে রাখা চামড়ার পোশাকটির ওপর বসলেন তিনি।” তারা দুইজন আবারও চলতে শুরু করলেন। সিরিয়ার লোকজন তাঁদেরকে অভিনন্দন জানাতে বেরিয়ে এল। আসলাম বলেন, “মানুষ আমাদের কাছে চলে এলে আমি তাদের ইশারায় উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখালাম। তখন তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা শুরু করে দিল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "তাদের চোখ এমন লোকদের বাহন খুঁজছিল যাদের কোনো অংশীদারত্ব নেই।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু অনারবদের বাহন বুঝিয়েছেন।[৬১৩]
সামান্য সম্পদ
৫৪২. হিশাম ইবনু উরওয়া তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে এলেন। তিনি সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সেনাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বললেন, আমার ভাই কোথায়? সবাই জিজ্ঞেস করল, তিনি কে? উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আবূ উবাইদা। লোকেরা বলল, তিনি এখনই আপনার কাছে আসবেন। আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু মাথায় রশি-বাঁধা একটি উটনীর ওপর চড়ে এলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলেন। তারপর লোকদের বললেন, তোমরা চলে যাও। তারপর তিনি আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর বাড়িতে এসে অবতরণ করলেন। আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে ঢাল, তরবারি ও বাহন ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আপনি কিছু আসবাবপত্র কিনে নিলেই তো পারেন। আবু উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমীরুল মুমিনীন, সেগুলো তো আমাকে দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।”[৬১৪]
তালিযুক্ত জামা গ্রহণ
৫৪3. হিশাম ইবনু উরওয়ার পিতা উমর রদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক আযরুআত শহরে [615] নিযুক্ত এক কর্মকর্তা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে আমাদের কাছে এলেন। তাঁর গায়ে সুতি কাপড়ের একটি জামা ছিল। তিনি জামাটি আমার কাছে দিয়ে বললেন, এটা ধুয়ে তালি দিয়ে দাও। আমি জামাটি ধুয়ে তালি দিয়ে দিলাম। সেইসাথে কাপড় কেটে নতুন আরেকটি জামাও সেলাই করে দিলাম। জামা দুটি নিয়ে তাঁর কাছে এসে বললাম, এটা আপনার জামা আর এটা আপনার জন্য নতুন কাপড় কেটে বানিয়েছি। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নতুন জামাটি ছুঁয়ে দেখলেন। তাঁর কাছে জামাটি বেশ মসৃণ মনে হলো। বললেন, “লাগবে না নতুন জামা। পুরনোটাই বেশি ঘাম শোষণ করে।”[616]
জামায় চরাটি তালি
544. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর জামার দুই কাঁধের মাঝে চারটি তালি দেখেছি।”[617]
আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আপ্যায়ন
545. ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর সিরিয়ার একজন লোক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একবার আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গেলাম। দেখি তিনি একটি কাঠের পাত্রের নিচে আগুন ধরাচ্ছেন। তাঁর ওপর বৃষ্টি পড়ছিল এবং চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, “আপনি তো এসব কাজ না করলেও পারেন। চাইলেই অন্য ব্যবস্থা করা যেত।” তিনি বললেন, "আমি আবূ যর। এটাই আমার জীবনযাপন। ইচ্ছে হলে থাকো, আর না হলে আল্লাহ তাআলার তত্ত্বাবধানে চলে যাও, বাধা দেব না।” বর্ণনাকারী বলেন, আবূ যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু যেন পাত্রের মধ্যে পাথর দিয়ে রান্না করছিলেন। যাইহোক, তাঁর পাত্রে যা ছিল তা সিদ্ধ হলো। তিনি একটি বড়ো থালা নিয়ে এলেন। তাতে শক্ত মোটা রুটি টুকরো টুকরো করে রাখলেন। তারপর পাত্রের জিনিসটা নিয়ে এলেন এবং রুটির টুকরোগুলোর ওপর ঢেলে দিলেন। থালাটি নিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে এলেন। আমাকে বললেন, কাছে এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে খেলাম। খাওয়া হলে তিনি তাঁর সেবিকাকে নির্দেশ দিলেন পানীয় আনতে। সেবিকা আমাদের পানি-মেশানো ছাগলের দুধ পান করাল। বললাম, আবু যর, বাড়িতে একটু আরামসে জীবনযাপন করলে কী হয়! তিনি বললেন, “আরে আল্লাহর বান্দা, আখিরাতে এতকিছুর হিসাব দিতে পারবে তো? এটা কি বিছানা নয়? আমরা যেখানে বসেছি এটার ওপরই শুই। একটি ঢিলেঢালা পোশাক আছে, সেটা বিছাই এবং পরিধান করি। একটি ডেকচিতেই রান্না করি। একটিই বড়ো থালাতে খাই। একটি পাত্র আছে, তাতে তেল রাখি। একটি থলিতে রাখি আটা। তুমি কি চাও আমি এর চেয়েও বেশি জিনিসের হিসেব দিতে বাধ্য হই? আমি বললাম, আপনার জন্য চার শ দীনার সরকারি ভাতা আছে। এটা তো সম্মানজনক ভাতা। আপনার এই ভাতার টাকা যায় কোথায়? তিনি বললেন, “আমি তোমার কাছে কোনো-কিছু গোপন করব না।” তিনি সিরিয়ার একটি গ্রামের দিকে ইশারা করে বললেন, "ওই গ্রামে আমার তিরিশটি ঘোড়া রয়েছে। ভাতা পেলে ঘোড়াগুলোর জন্য ঘাস কিনি। যারা ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করে, তাদের জন্য খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিস কিনি। বাকিটা দিয়ে পরিবারের খরচ চালাই। তারপরও যদি কিছু দীনার অবশিষ্ট থাকে সেগুলো দিয়ে ভাংতি পয়সা কিনি। এখানের এক নাবতি লোকের কাছে রাখি পয়সাগুলো। পরিবারের গোশতের প্রয়োজন হলে তারা তার থেকে গোশত নেয়। অন্যকিছু লাগলেও ওই লোকটি থেকেই নেয়। এই পয়সাগুলোর ওপর নির্ভর করে আল্লাহর পথে ব্যয় করি। আবূ যরের পরিবারের সঞ্চয়ে একটি দীনার বা দিরহামও থাকে না।”[৬১৮]
টিকাঃ
[৫৮৮] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবির, ৯/৯৩, ৯৪, সনদ হাসান ও মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৮৯] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৯০, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং সনদ দুর্বল।
[৫৯০] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৬৬০, মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৯১] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত। তবে অনুরূপ অর্থবোধক হাদীস আবু মুসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদের সঙ্গে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। মুসলিম, ৬৬২৯।
[৫৯২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৯৩] হাদীসটি মু'দালরূপে বর্ণিত।
[৫৯৪] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/১৮, হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৫৯৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২০৫, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৯৬] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১০৬৪৪, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর দুর্বল।
[৫৯৭] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৫৯৮] এখানে (الريف )রিফ) শব্দটি খাদ্য ও পানীয়ের প্রাচুর্য (السعة في المأكل والمشرب) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; পল্লী এলাকা বা গ্রাম অর্থে নয়।
[৫৯৯] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০০] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০১] টুকরো টুকরো রুটি ও গোশত দিয়ে তৈরি মণ্ডবিশেষ।
[৬০২] হা দীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত। ইবনু সায়িদ বলেছেন, হাদীসটি গরিব। কারণ আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক ছাড়া উল্লিখিত সনদে আর কেউ হাদীস বর্ণনা করেননি।
[৬০৩] صلاء-এর ভুনা গোশত ;صناب-এর অর্থ সরিষা ও তিলসমৃদ্ধ খাদ্য এবং صَّلَائِ .-এর অর্থ পাতলা রুটি।
[৬০৪] সূরা আহকাফ: ২০।
[৬০৫] ১ জারিব = ৪ কাফিয; ১ কাফিজ = ৮ মাকুক; ১ মাকুক = ১.১/২ সা; ১ সা = ২০৩৫ গ্রাম বা ২.০৩৫ কেজি। সুতরাং ১ জারিব = ৯৭ কেজি ৬৮০ গ্রাম।
[৬০৬] ইবনু সায়িদ বলেছেন, অর্থাৎ হালাল পানীয়।
[৬০৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৪৯, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬০৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬১০] হাদীসটির সনদ দুর্বল এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬১১] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৬৮, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬১২] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/৬২, ৩/৮২, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৬১৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ৩১/৩৬২, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬১৪] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/১০১, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[615] এটি সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোটো শহর। এর পরেই রয়েছে জর্ডানের রামসা শহরটি।
[616] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, 13/273, হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[617] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, 13/265, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ。
[৬১৮] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৪/২৩৫, হাদীসটির সনদ সহীহ ও মাওকুফ।
ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ
সাদামাটা জীবন-যাপন
অপছন্দনীয় অথচ উত্তম দুটি বিষয়
৫২২. কাইস ইবনু হাবতার থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "মৃত্যু ও দরিদ্রতা, এই দুইটি বিষয়কে অপছন্দ করা হয়।
(অন্য বর্ণনায় আছে) : আল্লাহর কসম, সে বিষয় দুটি হলো, সচ্ছলতা ও দরিদ্রতা। এই দুটির কোনো-একটা দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করা হোক না কেন, আমি কোনো পরোয়া করি না। (কারণ,) দুটি অবস্থাতেই আল্লাহর হক আদায় করা ওয়াজিব। সচ্ছলতার সময় (অন্যের ওপর) দয়া করা আর দরিদ্রতার সময় ধৈর্য ধারণ করা (আবশ্যক)।”[৫৮৮]
আগন্তুক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
৫২৩. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “ইশ! আমি যদি সকালে এসে সন্ধ্যায় চলে যাওয়া মুসাফিরের মতো হতে পারতাম!”[৫৮৯]
দরিদ্রতা মুমিনের জন্য শোভাময়
৫২৪. সা'দ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْفَقْرُ أَحْسَنُ - أَوْ أَزْيَنُ - بِالْمُؤْمِنِ مِنَ الْعِذَارِ الْجَيِّدِ عَلَى خَدِ الْفَرَسِ
"দরিদ্রতা মুমিনের জন্য ঘোড়ার গালে-থাকা চমৎকার পশমের চেয়েও সুন্দর, সুশোভিত।”[৫৯০]
সাহাবিগণ উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ
৫২৫. আলি ইবনু আবী তালহা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কোনো-একটি ঘর থেকে বেরিয়ে মাসজিদে গেলেন। সেখানে কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন মাসজিদের এক প্রান্তে (কিছু মানুষের) আওয়াজ শুনতে পেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
الصَّلَاةَ تَنْتَظِرُونَ؟ أَمَا إِنَّهَا صَلَاةً لَمْ تَكُنْ فِي الْأُمَمِ قَبْلَكُمْ, وَهِيَ الْعِشَاءُ
"সালাতের অপেক্ষা করছ, তাই না? এ তো এমন সালাত যা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে ছিল না; এটা ইশার সালাত।” তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
إِنَّ النُّجُومَ أَمَانُ لِلسَّمَاءِ، فَإِذَا حُمِسَتِ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ، وَأَنَا أَمَانُ لِأَصْحَابِي، فَإِذَا مِتُ أَتَى أَصْحَابِي مَا يُوعَدُونَ، وَأَصْحَابِي أَمَانُ لِأُمَّتِي، فَإِذَا ذَهَبَ أَصْحَابِي أَتَى أُمَّتِي مَا يُوعَدُونَ
“নক্ষত্ররাজি হলো আকাশের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা; যখন নক্ষত্রগুলো আলোকহীন হয়ে যাবে, আকাশের জন্য প্রতিশ্রুত বিপদ (কিয়ামাত) আসবে। আমি আমার সাহাবিদের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ; আমার ইন্তেকালের পর তাদের ওপর প্রতিশ্রুত বিপদাপদ (ফিতনা-ফাসাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ) উপস্থিত হবে। আর আমার সাহাবিগণ আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ; তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর আমার উম্মতের ওপর প্রতিশ্রুত বিপদ উপস্থিত হবে।"[৫৯১]
খাবার শেষে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা
৫২৬. উসমান ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমরা একবার উন্মুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহা-এর সঙ্গে খাবার খাওয়ার পর 'আলহামদু লিল্লাহ' বলতে ভুলে গেলাম। তিনি বললেন, ছেলেরা, খাবারের সাথে আল্লাহর যিকর মিশিয়ে নাও। চুপ থেকে খাওয়ার চেয়ে আল্লাহর প্রশংসা-সহ খাবার খাওয়া উত্তম।”[৫৯২]
খাবার স্বাদটুকুও খেয়াল না করা
৫২৭. আবদুর রহমান ইবনু আমর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا أُبَالِي مَا رَدَدْتُ بِهِ عَنِي الْجُوعِ
"কী দিয়ে ক্ষুধা মেটালাম, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।”[৫৯৩]
সাহাবিগণের উপমা
৫২৮. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مَثَلَ أَصْحَابِي فِي أُمَّتِي كَالْمِلْحِ فِي الطَّعَامِ، لَا يَصْلُحُ الطَّعَامُ إِلَّا بِالْمِلْحِ.
“খাবারের মধ্যে লবণ যেমন, উম্মতের মধ্যে আমার সাহাবিরাও তেমন। লবণ ছাড়া খাদ্য (খাওয়ার) উপযুক্ত হয় না।”[৫৯৪] হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমাদের লবণ চলে গেছে, আমরা আর কীভাবে উপযুক্ত হব?
সামান্যতম জীবনোপকরণই যথেষ্ট
৫২৯. খাইসামা ইবনু আবদির রহমান থেকে বর্ণিত, সুলাইমান আলাইহিস সালাম বলেছেন,
كُلُّ الْعَيْشِ قَدْ جَرَّبْنَاهُ، لَيْنُهُ وَشَدِيدُهُ، فَوَجَدْنَا يَكْفِي مِنْهُ أَدْنَاهُ
“কোমল ও কঠিন সব ধরনের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা আমরা লাভ করেছি। আমরা দেখেছি, সামান্যতম জীবনোপকরণই যথেষ্ট।”[৫৯৫]
কষ্টকর জীবনযাপন
৫৩০. মুসআব ইবনু সা'দ থেকে বর্ণিত। হাফসা রদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর বাবা উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, “আপনি কি এর চেয়ে নরম কাপড় পরতে পারেন না? অথবা এর চেয়ে উত্তম খাবার খেতে পারেন না? আল্লাহ তাআলা তো আপনার জন্য জমিনকে অধীন করে দিয়েছেন, প্রাচুর্যও দিয়েছেন রিযকে।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি তোমার সাথে কিছুটা বোঝাপড়া করতে চাই।” তারপর তিনি রাসূলের জীবনের কষ্টগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন। এবং অবশেষে হাফসা রদিয়াল্লাহু আনহা কেঁদে ফেললেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “(রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু-র মতো) আমিও কষ্টকর জীবনযাপন করতে চাই, তা হলে হয়তো (জান্নাতে) স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনেও তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারব।”[৫৯৬]
নবিজির কিছু বৈশিষ্ট্য
৫৩১. ইয়াহইয়া ইবনুল মুখতার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা স্মরণ করে বললেন, “আল্লাহর কসম, তাঁর ও সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো দরজা বন্ধ হতো না; তাঁর ও মানুষের মাঝে কোনো পর্দা ছিল না। সকালে তার জন্য (খাদ্যভর্তি) বড়ো বড়ো পাত্র নিয়ে আসা হতো না, সন্ধ্যায়ও না। তিনি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকতেন। নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে যে-কেউ সাক্ষাৎ করতে চাইলে সাক্ষাৎ করতে পারত। তিনি মাটির ওপর বসতেন, মাটির ওপর তাঁর খাবারের পাত্র রাখতেন। মোটা কাপড় পরতেন। গাধায় চড়তেন। আরোহণের সময় পেছনে (গোলামকে বা অন্য কাউকে) বসাতেন। হাত চেটে খেতেন।”[৫৯৭]
ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার না করা
৫৩২. উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আজাদকৃত গোলাম আসলাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান রদিয়াল্লাহু আনহুমা একবার আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলেন। মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ফর্সা ও সুন্দর। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে হাজ্জের উদ্দেশে বের হলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর (সৌন্দর্যের) দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছিলেন। তিনি তার হাতের আঙুল মুআবিয়ার পিঠের ওপর রাখলেন। তারপর জুতার ফিতা যতটুকু ওপরে থাকে আঙুলগুলো ততটুকু ওপরে উঠিয়ে বললেন, “বাহ্, বাহ্, দুনিয়া- আখিরাত উভয়টির কল্যাণ যদি একত্র হয়, তবে তো আমরা অতি উত্তম!” মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমীরুল মুমিনীন, আসলে আমাদের ওখানে খাদ্য ও পানীয়ের প্রাচুর্য [৫৯৮] আছে, গোসলখানাও আছে প্রচুর।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “তোমার কী সমস্যা, আমি তোমাকে জানাচ্ছি। তুমি সুস্বাদু খাবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছ, পিঠে সূর্যের আঁচ লাগলেই তোমার ভোর হয়, অথচ মুখাপেক্ষী ও সাহায্যপ্রার্থীরা আগে থেকেই তোমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।” বর্ণনাকারী বলেন, আমরা যখন যু-তুওয়া এলাকায় এলাম, মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু চমৎকার সুগন্ধি মাখানো একজোড়া পোশাক বের করে পরলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “তোমাদের কেউ কেউ সুগন্ধিবিহীন পোশাক পরে হাজি সাজে। কিন্তু আল্লাহর জমিনের সম্মানিত জায়গায় এসে সে-ই কিনা সুগন্ধীতে ডোবানো পোশাক বের করে পরিধান করে!” এ কথা শুনে মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি এটা পরে আমার পরিবার-আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলাম। আল্লাহর কসম, শুনেছি তারা সিরিয়ায় রয়েছে। আল্লাহ জানেন যে, আমি এই পোশাক পরতে (এখন) লজ্জা পাচ্ছি।” মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সুগন্ধময় পোশাক খুলে ফেললেন এবং যে দুটি কাপড়ে ইহরাম অবস্থায় ছিলেন, সে দুটি কাপড় পরলেন।”[৫৯৯]
পেটের চামড়া মসৃণ হওয়ায় নিন্দা
৫৩৩. আবদুল্লাহ ইবনু তাউস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াযীদ ইবনু আবী সুফইয়ানকে পেট বের করে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি দেখলেন যে তাঁর পেটের চামড়া অত্যন্ত মসৃণ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চাবুক ওঠালেন এবং বললেন, এটা কি কাফিরের চামড়া?[৬০০]
সুন্নাহর ব্যতিক্রম না করা
৫৩৪. সাঈদ ইবনু জুবাইর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু জানতে পারলেন যে, ইয়াযীদ ইবনু আবী সুফইয়ান রঙ- বেরঙের খাবার খান। শুনে তাঁর গোলাম ইয়ারফাকে বললেন, ইয়াযীদের রাতের খাবার পরিবেশন করার খবর পেলে আমাকে জানাবে। ইয়াযীদের রাতের খাবার পরিবেশন করা হলে গোলাম উমরকে জানাল। সংবাদ শুনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াযীদের কাছে এসে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ইয়াযীদের অনুমতি পেয়ে ভেতরে গেলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে রাতের খাবার এগিয়ে দিলেন ইয়াযীদ ইবনু আবী সুফইয়ান। প্রথমে দিলেন গোশত দিয়ে তৈরি ছারিদ [৬০১], উমর তাঁর সঙ্গে ছারিদ খেলেন। তারপর পরিবেশন করা হলো ভুনা গোশত। ইয়াযীদ রদিয়াল্লাহু আনহু ভুনা গোশত খাওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন; কিন্তু উমর রদিয়াল্লাহু আনহু হাত গুটিয়ে নিলেন। বললেন, ইয়াযীদ, এক বেলায় এত বাহারি রকমের খাবার? যাঁর হাতে উমরের প্রাণ তাঁর কসম, তুমি যদি তাঁদের সুন্নাহর ব্যতিক্রম করো, তা হলে এই ব্যতিক্রম আচরণ তোমাকে তাঁদের পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবে।”[৬০২]
উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খাদ্যাভ্যাস
৫৩৫. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসরা থেকে একদল প্রতিনিধি এলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আবূ মূসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে অবস্থান গ্রহণ করলাম। তাঁর প্রতিদিনের খাদ্য ছিল পানিতে ভেজানো টুকরো টুকরো শক্ত রুটি। আমাদের জন্য কখনও টুকরো রুটির সঙ্গে তরকারি হিসেবে ঘি থাকত, কখনও যাইতুনের তেল, কখনও বা দুধ। কখনও পেতাম শুকনো গোশতের গুঁড়ো, যা পানি দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়েছে। কদাচিৎ তাজা গোশত পেতাম। তবে পরিমাণে খুবই কম। একদিন তিনি আমাদের বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা দেখি কম কম খাচ্ছ। আমার খাবারেও তোমাদের অনীহা। আল্লাহর কসম, আমি চাইলেই সবচেয়ে ভালো খাবার খেতে পারতাম, আয়েশি জীবনযাপন করতে পারতাম। শোনো, সিনা আর কুঁজের গোশত যে কী (সুস্বাদু), তা আমি জানি। ভুনা গোশত, সরিষা ও তিলসমৃদ্ধ খাদ্য, পাতলা রুটির ব্যাপারেও আমার ভালো জানা আছে।”[৬০৩] কিন্তু আমি আল্লাহ তাআলাকে একদল লোকের নিন্দা করতে শুনেছি। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে নিন্দা করে বলেছেন,
أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا
"তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই সুখ-সম্ভার পেয়েছ এবং সেগুলো উপভোগও করেছ।”[৬০৪]
বর্ণনাকারী বলেন, আবূ মূসা আশআরি আমাদের বললেন, তোমরা যদি আমীরুল মুমিনীনকে বলতে, তা হলে তিনি তোমাদের খাবারের জন্য বাইতুল মাল থেকে খাদ্যের ব্যবস্থা করে দিতেন। তোমরা তা খেতে পারতে। তাঁর পরামর্শক্রমে আমরা আমীরুল মুমিনীনের সঙ্গে কথা বললাম। তখন তিনি আমাদের বললেন, “হে আমীর-উমারা সম্প্রদায়, আমি আমার নিজের জন্য যাতে সন্তুষ্ট তোমরা কি তোমাদের জন্য তাতে সন্তুষ্ট নও?” আমরা বললাম, আমীরুল মুমিনীন, মদীনার মতো জায়গায় জীবনযাপন খুব কঠিন। আমরা মনে করি না যে, আপনার খাদ্য বেশি জাঁকজমকপূর্ণও নয়, আবার অখাদ্যও নয়। কিন্তু আমাদের ওখানে খাদ্য ও পানীয়ের প্রাচুর্য আছে। আমাদের আমীরের সাথে দেখা করতে আসা বিপুল-সংখ্যক মানুষকে বেশ সুস্বাদু খাবার দেওয়া হয়। বর্ণনাকারী বলেন, এসব কথা শুনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন, “তোমাদের জন্য বাইতুল মাল থেকে দৈনিক দুটি ছাগল ও দুই জারিব[৬০৫] শস্য বরাদ্দ দিলাম। সকালে এক জারিব শস্য ও একটি ছাগল সবাই মিলে খাবে। তারপর পানীয় [৬০৬] চেয়ে পান করবে। তারপর তোমার ডান দিকে যে থাকবে তাকে পান করাবে, এরপর তার পরে যে রয়েছে তাকে পান করাবে। এরপর চাহিদা পূরণে (মলমূত্র ত্যাগের জন্য) বেরিয়ে পড়বে। সন্ধ্যায়ও অবশিষ্ট এক জারিব শস্য ও অবশিষ্ট ছাগলটি একইভাবে খেয়ো। সাবধান, ঘরবাড়িতে থাকা লোকদেরও পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে খাওয়াবে। ভূরিভোজের আয়োজন তাদের চরিত্রকে সুন্দর করে না; ক্ষুধার্তকেও তৃপ্ত করবে না। কিন্তু আল্লাহর কসম আমি মনে করি, কোনো মহল্লা বা পল্লী থেকে যদি প্রতিদিন দুটি ছাগল ও দুই জারিব শস্য নিয়ে নেওয়া হয়, তা হলে তা দ্রুতই ওই মহল্লাকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেবে।”[৬০৭]
চর্বি ও ঘি পরিহার
৫৩৬. আবদুল্লাহ ইবনু তাউস তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে একবার অনাবৃষ্টির ফলে অভাব দেখা দেয়। সেই সময়টাতে যতদিন না মানুষের মাখনযুক্ত খাওয়ার সামর্থ্য ফিরে এসেছে, ততদিন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু মাখনযুক্ত কোনো বস্তু খাননি।”[৬০৮]
বাহন থেকে অবতরণ
৫৩৭. আলকামা ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে (সিরিয়ায়) আসার পর তাঁকে অনারবি খচ্চর দেওয়া হলো। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? বলা হলো, আমীরুল মুমিনীন, এই বাহনটির চলন-ক্ষমতা চমৎকার, গঠন-আকৃতি ভালো, দেখতেও সুন্দর। অনারবরা এতে চড়ে। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু উঠে খচ্চরটিতে আরোহণ করলেন। প্রাণীটি চলা শুরু করা-মাত্রই প্রচণ্ডভাবে কাঁধ ঝাঁকাল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ এর অকল্যাণ করুন। কত নিকৃষ্ট বাহন এটা! এ কথা বলে খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে পড়লেন।”[৬০৯]
আটা ছাঁকতে নিষেধ
৫৩৮. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “তোমরা চালুনি দিয়ে আটা ছেঁকো না। কারণ আটা পুরোটাই খাদ্য।”[৬১০]
কখনও খাদ্যবস্তু না ছাঁকা
৫৩৯. ইয়াসার ইবনু নুমাইর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি যখনই উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খাদ্যবস্তু চেলেছি তার অবাধ্য হয়েই চেলেছি।”[৬১১]
ইসলামের দ্বারা সম্মানিত হওয়া
৫৪০. তারিক ইবনু শিহাব বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে আসার পর তাঁকে অনারবি খচ্চর দেওয়া হলো। তিনি খচ্চরটিতে চড়লেন। কিন্তু প্রাণীটি তাঁকে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকি দিল। তাই বাহনটি তাঁর পছন্দ হলো না, তিনি নেমে পড়লেন। তারপর নিজের উটে চড়ে সামনে যাওয়ার পথে একটি নালা পড়ল। তিনি উট থেকে নেমে তাঁর চামড়ার চটিজোড়া নিজের হাতে নিলেন। উটের লাগাম ধরে রেখে পানি পার হলেন। এই ঘটনার পর আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আজকে আপনি বিশ্ববাসীর সামনে মহান দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এ কথা শুনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বুকে চাপড় দিলেন এবং উচ্চ আওয়াজে বললেন, ওহ্, আবূ উবাইদা, এই কথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ বললে (মানাতো)। তোমরা ছিলে নিকৃষ্ট মানুষ, সংখ্যায় নগণ্য, তুচ্ছ। তখন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। তাই যতই তোমরা ইসলাম ছাড়া অন্যকিছুতে সম্মান খুঁজবে, আল্লাহ তোমাদের ততই অপদস্থ করবেন।”[৬১২]
বাহন বদল
৫৪১. কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ বলেন যে, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু- এর আজাদকৃত গোলাম আসলামকে এই ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি : শাম সফরে আসলাম উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলেন। সিরিয়ার কাছাকাছি পৌঁছে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর উটটিকে বসিয়ে ইসতিঞ্জা করতে গেলেন। আসলাম বলেন, "এই ফাঁকে আমি আমার পশমি চামড়ার পোশাকটি আমার বাহনের কাঁধের ওপর রাখলাম।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু ইসতিঞ্জা থেকে ফিরে এসে আমার উটটিতে আরোহণ করতে চাইলেন। উটটির পিঠে বিছিয়ে রাখা চামড়ার পোশাকটির ওপর বসলেন তিনি।” তারা দুইজন আবারও চলতে শুরু করলেন। সিরিয়ার লোকজন তাঁদেরকে অভিনন্দন জানাতে বেরিয়ে এল। আসলাম বলেন, “মানুষ আমাদের কাছে চলে এলে আমি তাদের ইশারায় উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখালাম। তখন তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা শুরু করে দিল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "তাদের চোখ এমন লোকদের বাহন খুঁজছিল যাদের কোনো অংশীদারত্ব নেই।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু অনারবদের বাহন বুঝিয়েছেন।[৬১৩]
সামান্য সম্পদ
৫৪২. হিশাম ইবনু উরওয়া তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে এলেন। তিনি সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সেনাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বললেন, আমার ভাই কোথায়? সবাই জিজ্ঞেস করল, তিনি কে? উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আবূ উবাইদা। লোকেরা বলল, তিনি এখনই আপনার কাছে আসবেন। আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু মাথায় রশি-বাঁধা একটি উটনীর ওপর চড়ে এলেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলেন। তারপর লোকদের বললেন, তোমরা চলে যাও। তারপর তিনি আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর বাড়িতে এসে অবতরণ করলেন। আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে ঢাল, তরবারি ও বাহন ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আপনি কিছু আসবাবপত্র কিনে নিলেই তো পারেন। আবু উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমীরুল মুমিনীন, সেগুলো তো আমাকে দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।”[৬১৪]
তালিযুক্ত জামা গ্রহণ
৫৪3. হিশাম ইবনু উরওয়ার পিতা উমর রদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক আযরুআত শহরে [615] নিযুক্ত এক কর্মকর্তা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু শামে আমাদের কাছে এলেন। তাঁর গায়ে সুতি কাপড়ের একটি জামা ছিল। তিনি জামাটি আমার কাছে দিয়ে বললেন, এটা ধুয়ে তালি দিয়ে দাও। আমি জামাটি ধুয়ে তালি দিয়ে দিলাম। সেইসাথে কাপড় কেটে নতুন আরেকটি জামাও সেলাই করে দিলাম। জামা দুটি নিয়ে তাঁর কাছে এসে বললাম, এটা আপনার জামা আর এটা আপনার জন্য নতুন কাপড় কেটে বানিয়েছি। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নতুন জামাটি ছুঁয়ে দেখলেন। তাঁর কাছে জামাটি বেশ মসৃণ মনে হলো। বললেন, “লাগবে না নতুন জামা। পুরনোটাই বেশি ঘাম শোষণ করে।”[616]
জামায় চরাটি তালি
544. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর জামার দুই কাঁধের মাঝে চারটি তালি দেখেছি।”[617]
আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আপ্যায়ন
545. ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর সিরিয়ার একজন লোক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একবার আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গেলাম। দেখি তিনি একটি কাঠের পাত্রের নিচে আগুন ধরাচ্ছেন। তাঁর ওপর বৃষ্টি পড়ছিল এবং চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, “আপনি তো এসব কাজ না করলেও পারেন। চাইলেই অন্য ব্যবস্থা করা যেত।” তিনি বললেন, "আমি আবূ যর। এটাই আমার জীবনযাপন। ইচ্ছে হলে থাকো, আর না হলে আল্লাহ তাআলার তত্ত্বাবধানে চলে যাও, বাধা দেব না।” বর্ণনাকারী বলেন, আবূ যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু যেন পাত্রের মধ্যে পাথর দিয়ে রান্না করছিলেন। যাইহোক, তাঁর পাত্রে যা ছিল তা সিদ্ধ হলো। তিনি একটি বড়ো থালা নিয়ে এলেন। তাতে শক্ত মোটা রুটি টুকরো টুকরো করে রাখলেন। তারপর পাত্রের জিনিসটা নিয়ে এলেন এবং রুটির টুকরোগুলোর ওপর ঢেলে দিলেন। থালাটি নিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে এলেন। আমাকে বললেন, কাছে এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে খেলাম। খাওয়া হলে তিনি তাঁর সেবিকাকে নির্দেশ দিলেন পানীয় আনতে। সেবিকা আমাদের পানি-মেশানো ছাগলের দুধ পান করাল। বললাম, আবু যর, বাড়িতে একটু আরামসে জীবনযাপন করলে কী হয়! তিনি বললেন, “আরে আল্লাহর বান্দা, আখিরাতে এতকিছুর হিসাব দিতে পারবে তো? এটা কি বিছানা নয়? আমরা যেখানে বসেছি এটার ওপরই শুই। একটি ঢিলেঢালা পোশাক আছে, সেটা বিছাই এবং পরিধান করি। একটি ডেকচিতেই রান্না করি। একটিই বড়ো থালাতে খাই। একটি পাত্র আছে, তাতে তেল রাখি। একটি থলিতে রাখি আটা। তুমি কি চাও আমি এর চেয়েও বেশি জিনিসের হিসেব দিতে বাধ্য হই? আমি বললাম, আপনার জন্য চার শ দীনার সরকারি ভাতা আছে। এটা তো সম্মানজনক ভাতা। আপনার এই ভাতার টাকা যায় কোথায়? তিনি বললেন, “আমি তোমার কাছে কোনো-কিছু গোপন করব না।” তিনি সিরিয়ার একটি গ্রামের দিকে ইশারা করে বললেন, "ওই গ্রামে আমার তিরিশটি ঘোড়া রয়েছে। ভাতা পেলে ঘোড়াগুলোর জন্য ঘাস কিনি। যারা ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করে, তাদের জন্য খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিস কিনি। বাকিটা দিয়ে পরিবারের খরচ চালাই। তারপরও যদি কিছু দীনার অবশিষ্ট থাকে সেগুলো দিয়ে ভাংতি পয়সা কিনি। এখানের এক নাবতি লোকের কাছে রাখি পয়সাগুলো। পরিবারের গোশতের প্রয়োজন হলে তারা তার থেকে গোশত নেয়। অন্যকিছু লাগলেও ওই লোকটি থেকেই নেয়। এই পয়সাগুলোর ওপর নির্ভর করে আল্লাহর পথে ব্যয় করি। আবূ যরের পরিবারের সঞ্চয়ে একটি দীনার বা দিরহামও থাকে না।”[৬১৮]
টিকাঃ
[৫৮৮] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবির, ৯/৯৩, ৯৪, সনদ হাসান ও মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৮৯] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৯০, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং সনদ দুর্বল।
[৫৯০] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৬৬০, মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৯১] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত। তবে অনুরূপ অর্থবোধক হাদীস আবু মুসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদের সঙ্গে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। মুসলিম, ৬৬২৯।
[৫৯২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৯৩] হাদীসটি মু'দালরূপে বর্ণিত।
[৫৯৪] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/১৮, হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৫৯৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২০৫, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৯৬] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১০৬৪৪, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর দুর্বল।
[৫৯৭] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৫৯৮] এখানে (الريف )রিফ) শব্দটি খাদ্য ও পানীয়ের প্রাচুর্য (السعة في المأكل والمشرب) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; পল্লী এলাকা বা গ্রাম অর্থে নয়।
[৫৯৯] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০০] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০১] টুকরো টুকরো রুটি ও গোশত দিয়ে তৈরি মণ্ডবিশেষ।
[৬০২] হা দীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত। ইবনু সায়িদ বলেছেন, হাদীসটি গরিব। কারণ আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক ছাড়া উল্লিখিত সনদে আর কেউ হাদীস বর্ণনা করেননি।
[৬০৩] صلاء-এর ভুনা গোশত ;صناب-এর অর্থ সরিষা ও তিলসমৃদ্ধ খাদ্য এবং صَّلَائِ .-এর অর্থ পাতলা রুটি।
[৬০৪] সূরা আহকাফ: ২০।
[৬০৫] ১ জারিব = ৪ কাফিয; ১ কাফিজ = ৮ মাকুক; ১ মাকুক = ১.১/২ সা; ১ সা = ২০৩৫ গ্রাম বা ২.০৩৫ কেজি। সুতরাং ১ জারিব = ৯৭ কেজি ৬৮০ গ্রাম।
[৬০৬] ইবনু সায়িদ বলেছেন, অর্থাৎ হালাল পানীয়।
[৬০৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৪৯, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬০৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬১০] হাদীসটির সনদ দুর্বল এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬১১] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৬৮, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬১২] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/৬২, ৩/৮২, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৬১৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ৩১/৩৬২, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬১৪] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/১০১, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[615] এটি সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোটো শহর। এর পরেই রয়েছে জর্ডানের রামসা শহরটি।
[616] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, 13/273, হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[617] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, 13/265, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ。
[৬১৮] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৪/২৩৫, হাদীসটির সনদ সহীহ ও মাওকুফ।
📄 আয়েশি-জীবন বর্জন করা
সপ্তম অনুচ্ছেদ
আয়েশি-জীবন বর্জন করা
কল্যাণকর বিষয় মনোনয়ন
৫৪৬. আল্লাহ তাআলা বলেন, اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ "আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার ইচ্ছা রিযক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা রিযক সংকুচিত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা যে বান্দার জন্য যেটা কল্যাণকর মনে করেন, তার জন্য তা-ই মনোনীত করেন।”[৬১৯]
হালাল উপার্জনে কোনো লজ্জা নেই
৫৪৭. আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআ থেকে বর্ণিত, ইয়াযীদ ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হালাল (উপার্জনের) ব্যাপারে যে ব্যক্তি লজ্জাবোধ করে না, তার খরচ এবং অহংকার কমে যায়।”[৬২০]
সম্পদ দেখে সুখলাভ
৫৪৮. লুকমান ইবনু আমির থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “সম্পদশালীও আহার করে, আমরাও আহার করি; তারাও পান করে, আমরাও পান করি; তারাও কাপড় পরে, আমরাও কাপড় পরি; তাদের থাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ, যার দিকে তারা তাকিয়ে থাকে (এবং সুখ পায়)। তাদের সম্পদের দিকে আমরাও তাকাই। সেসব সম্পদের হিসাব তাদেরকে দিতে হবে; কিন্তু আমরা তা থেকে মুক্ত।”[৬২১]
আত্মার প্রশান্তি
৫৪৯. বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, الزهادة في الدنيا راحة القلب والجسد “দুনিয়াবিমুখতা হলো আত্মা ও দেহের প্রশান্তি।”[৬২২]
দুই সতীন
৫৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "দুনিয়া ও আখিরাত হলো এক ব্যক্তির দুই স্ত্রীর মতো। একজনকে সন্তুষ্ট করতে গেলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হয়।”[৬২৩]
না-পাওয়ার প্রতিদান
৫৫১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের কিছু জিনিস পেতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু পাওয়ার সামর্থ্য নেই। তার জন্য কি আমরা প্রতিদান পাব?” তিনি জবাবে বললেন, فَقِيمَ تُؤْجَرُونَ إِذَا لَمْ تُؤْجَرُوا عَلَى ذَلِكَ؟ “এর জন্যই যদি প্রতিদান না পাও, তা হলে কীসের জন্য পাবে?”[৬২৪]
ওপর ভালো তো নিচ ভালো
৫৫২. আবূ আবদ রাব্বিহি বলেন, আমি শুনেছি, মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান এই মিম্বরের ওপর বসে বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি- إِنَّ مَا بَقِيَ مِنَ الدُّنْيَا بَلَاءٌ وَفِتْنَةٌ، وَإِنَّمَا مَثَلُ عَمَلِ أَحَدِكُمْ كَمَثَلِ الْوِعَاءِ، إِذَا طَابَ أَعْلَاهُ طَابَ أَسْفَلُهُ، وَإِذَا خَبُثَ أَعْلَاهُ خَبُثَ أَسْفَلُهُ
“দুনিয়াতে যা অবশিষ্ট থাকবে তা হলো বিপদাপদ ও ফিতনা। তোমাদের আমলের উদাহরণ হলো পাত্রের মতো: তার ওপরের অংশ ভালো থাকলে নিচের অংশও ভালো থাকে। আর ওপরের অংশ খারাপ হলে নিচের অংশও খারাপ হয়।”[৬২৫]
কারাগার
৫৫৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “দুনিয়া হলো কাফিরের জন্য জান্নাত ও মুমিনের জন্য কারাগার। যখন মুমিনের (জান কব্য) করা হয় তখন তার অবস্থা যেন কারাগার থেকে বের হওয়া ব্যক্তির মতো। যে কিনা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা শুরু করে এবং স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়।”[৬২৬] (অনুরূপ মুমিন বান্দাও দুনিয়ার কারাগার থেকে বেরিয়ে জান্নাতে গিয়ে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করবে।)
কারাগার থেকে মুক্তিলাভ
৫৫৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَسَنَّتُهُ، فَإِذَا فَارَقَ الدُّنْيَا فَارَقَ السِّجْنَ وَالسَّنَةَ
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার ও সঙ্কটময় সময়; যখন সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, তখন সে মূলত কারাগার ও সঙ্কট থেকে বিদায় নেয়।”[৬২৭]
মুমিনের উপহার
৫৫৫. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, تُحْفَةُ الْمُؤْمِنِ الْمَوْتُ “মুমিনের জন্য উপহার হলো মৃত্যু।”[৬২৮]
গুনাহগার ব্যতীত সবাইকে
৫৫৬. মুহারিব ইবনু দিসার বলেন, খাইসামাহ রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, মৃত্যু কি তোমাকে আনন্দিত করে? আমি বললাম, না তো। তখন তিনি বললেন, দোষত্রুটিপূর্ণ লোক ছাড়া আর সবাইকেই মৃত্যু আনন্দিত করে।”[৬২৯]
সবচেয়ে প্রিয়
৫৫৭. আবূ আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, আবুল আ'ওয়ার সুলামি একটি মজলিসে বসা ছিলেন। সেখানে একজন লোক বলল, আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা যত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এ কথা শুনে আবুল আ'ওয়ার সুলামি বললেন, “তোমার মতো হওয়া আমার কাছে লাল উটের পাল থেকেও প্রিয়। কিন্তু, আল্লাহর কসম, তিনটি জিনিস দেখার আগেই আমি মৃত্যুবরণ করতে চাই : ১. কাউকে উপদেশ দিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হতে দেখা। ২. কোনো-কিছুর পরিবর্তন করতে চেয়েও তা করতে না পারা। ৩. নিজের বার্ধক্য।”[৬৩০]
অহংকার প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা
৫৫৮. শুরাহবীল ইবনু মুসলিম থেকে বর্ণিত। আমর ইবনু আসওয়াদ আনসি অনেক তৃপ্তিদায়ক বস্তু পরিত্যাগ করতেন এই ভয়ে যে (সেগুলো গ্রহণ করলে) তাঁর অহংকার প্রকাশ পাবে।[৬৩১]
পেট একটি মন্দ পাত্র
৫৫৯. মিকদাম ইবনু মাদিকারিব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلُ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ فَثُلُثُ طَعَامُ، وَثُلُثُ شَرَابٌ ، وَثُلُثُ لِنَفْسِهِ
"পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লুকমা খাবারই আদম-সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আরও বেশি যদি খেতেই হয় তবে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”[৬০২]
বেশি খেলে বেশি ক্ষুধা
৫৬০. আইয়ূব ইবনু উসমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লোককে ঢেকুর তুলতে দেখে বললেন-
أَقْصِرُ مِنْ جُشَابِكَ، فَإِنَّ أَطْوَلَ النَّاسِ جُوعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ شِبَعًا فِي الدُّنْيَا
"ঢেকুর কম তোলো। কিয়ামাতের দিন ওইসব লোকের ক্ষুধাই সবচেয়ে দীর্ঘ হবে, যারা দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি পরিতৃপ্ত থাকে।”[৬৩৩]
আট বছর অতৃপ্ত থাকা
৫৬১. হামযা ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উমর বলেছেন, (আমার পিতা) আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে যদি বেশি খাবার থাকত, তা হলে তিনি খাবারের জন্য অন্য কাউকে পেয়ে গেলে তৃপ্তিভরে খেতেন না। হামযা বলেন, তাঁর মৃত্যুশয্যায় ইবনু মুত্বি' তাঁকে দেখতে এলেন। দেখলেন তাঁর শরীর শুকিয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যা বিনতু আবী উবাইদকে বললেন, আপনি কি তাঁর সেবাযত্ন করেন না? তাকে ভালো খাবার খাওয়ান না? তা হলে তো তার শরীরটা ফিরে আসত। সাফিয়্যা বললেন, আমরা তো খাবার প্রস্তুত করিই। কিন্তু তিনি সেটা পরিবার-পরিজন আর মেহমানদের সাথে ভাগ করে নেন। প্রয়োজনে তাঁকেই জিজ্ঞস করুন। তখন ইবনু মুত্বি' বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান, আপনি যদি ঠিকমতো খাবার খেতেন, তা হলে আপনার শরীরটা ফিরে আসত। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমার আটটি বছর এমনভাবে কেটেছে যে একবারও তৃপ্তিসহ খাইনি (অথবা বলেছেন, মাত্র একবার তৃপ্তিসহ খেয়েছি)। এখন তো একটি গাধার পিপাসার সমান[৬৩৪] আয়ু বাকি রয়েছে। এমন সময় আমি পেটপুরে খাই, এমনটাই কি তুমি চাও?”[৬৩৫]
তরকারিতে ঝোল বেশি দেওয়া
৫৬২. আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার প্রিয়বন্ধু (নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ওসিয়ত করেছেন- إِذَا صَنَعْتَ مَرَقًا فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، ثُمَّ انْظُرْ إِلَى أَهْلِ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِكَ فَأَصِبْهُمْ مِنْهُ بِمَعْرُوفٍ "তরকারি রান্না করলে বেশি করে পানি দেবে। তারপর প্রতিবেশী লোকদের খোঁজ-খবর নেবে এবং ওই ঝোল থেকে সৌজন্য হিসেবে কিছুটা তাদেরকে দেবে।”[৬৩৬]
মেহমান ছাড়া না খাওয়া
৫৬৩. আবদুর রহমান ইবনু নাওফাল থেকে বর্ণিত, সাফিয়্যাহ বিনতু আবী উবাইদ বলেন, আমি আমার স্বামী (আবদুল্লাহ ইবনু উমরকে) কখনও তৃপ্তিসহ খেতে দেখিনি। তবে একবার দেখেছি। তাঁর আশ্রয়ে দুইজন ইয়াতীম বালক-বালিকা ছিল। আমি তাঁর জন্য একবার একটি আলাদা খাবার প্রস্তুত করলাম। তিনি ওই ইয়াতীম বালক-বালিকাকে ডেকে পাঠালেন। তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো। এরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাঁর জন্য আলাদা খাবারটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, ইয়াতীম মেয়েটিকে ডাকো। আমি বললাম, ওরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওদের দুইজনকে পেটভরে খাইয়েছি। তিনি বললেন, ও আচ্ছা। তা হলে আহলে সুফফার কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসো, যাও।
তখন কয়েকজন গরিব মানুষকে ডেকে আনা হলো এবং তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো।”[৬৩৭]
ভালো খাবার বেছে মিসকীনদের প্রদান
৫৬৪. আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা একবার একটি সফরে ছিলেন। চলতে চলতে একটি জায়গায় (যাত্রা) বিরতি করলেন। তখনও তাঁর পাথেয় ও সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি। কাফেলার সঙ্গীরা তাঁকে এভাবে দেখে নিজেদের খাবার থেকে কিছু অংশ তাঁকে পাঠালেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বসলেন। এ সময় কিছু মিসকীন লোক এল। ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা তখন তা দেখতে লাগলেন তাঁর সামনে কোন খাবারটি সবচেয়ে ভালো। বড়ো একটি পাত্রভর্তি ছারিদ পেয়ে সেটিই উঁচিয়ে ধরলেন মিসকীনদের দেওয়ার জন্য। তৎক্ষণাৎ তাঁর এক ছেলে তাঁর হাত থেকে পাত্রটি নিয়ে নিলেন। বললেন, “আব্বু, এটা আপনার সবচেয়ে ভালো খাবার। এটা আমাদের জন্য রাখুন। গরিব-মিসকীনকে খাওয়ানোর মতো এখানে আরও খাবার আছে।” বর্ণনাকারী বলেন, পাত্রটি নিয়ে পিতা-পুত্রের কাড়াকাড়ির মধ্যে লেগে গেল। অবশেষে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "আমি এই পাত্রের খাবার দান করে আমার ঘাড় থেকে বোঝা নামাতে চাই।”[৬৩৮]
খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয়
৫৬৫. শাহর ইবনু হাওশাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এ কথা বলা হতো—খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয় যুক্ত হলে সব দিক থেকে খাবারের পূর্ণতা পায়। ১. খাবার হালাল হওয়া; ২. খাবার গ্রহণের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ; ৩. খাবারে অনেকগুলো হাতের সমাবেশ (কয়েকজন একসঙ্গে খাওয়া); ৪. খাবার গ্রহণের শেষে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায়। যখন এই চারটি বিষয় একত্র হয়, তখন খাবার সবদিক থেকেই পূর্ণতা লাভ করে।”
খাবার খেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা
৫৬৬. আবূ সালিহ বলেন, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে কয়েকজন লোক খাবার খেল। তিনি বললেন, “(খাবারের সাথে সুস্বাদু) কিছু মিশিয়ে নাও।” তারা বলল, “কী দিয়ে সুস্বাদু করব?” তিনি বললেন, “খাবার গ্রহণ শেষ হলে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।”[৬৩৯]
দুধের মাছি
৫৬৭. আবূ বকর ইবনু হাম্স রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত কাউকেই তাঁর সঙ্গে খাদ্যগ্রহণে বাধা দিতেন না। এমনকি কুষ্ঠরোগী, শ্বেতরোগীরা ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত লোকদেরও তিনি নিমন্ত্রণ জানাতেন। তারা তাঁর সঙ্গে বসে খেত। একবার আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা দস্তরখানায় বসে ছিলেন। এ সময় মদীনার দুজন দাস এল। তারা সালাম দিল। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে যে-সকল ফকির-মিসকীন বসে ছিল তারা এই দুজন লোককে অভিনন্দন জানাল, তাদের উদ্দেশ্যে আনন্দ প্রকাশ করল এবং তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিল। এটা দেখে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা হেসে ফেললেন। কিন্তু আগন্তুক লোক দুজন তাঁর হাসিকে মেনে নিতে পারল না। তারা বলল, আবূ আবদুর রহমান, আল্লাহ তাআলা আপনার দাঁতগুলোকে হাসিতে উজ্জ্বল রাখুক। কিন্তু কেন হাসলেন, তা জানতে পারি কি? আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি এই লোকগুলোর কাণ্ড দেখে হেসেছি। এই লোকগুলো এখানে আসে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় তাদের মুখ থেকে যেন রক্ত পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়; একজন আরেকজনকে জায়গায় দিতে চায় না, যে যাকে পারে কষ্ট দেয়। কারও পক্ষে দুইজনের জায়গা দখল করা সম্ভব হলে অন্যদের কষ্ট দিয়েও ওই কাজটাই করে। তোমরা দুইজন এখানে এসেছ, তবে তোমাদের সাথে আছে পর্যাপ্ত পাথেয় ও সামগ্রী। ফলে তারা তোমাদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে, তোমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা এমন লোকদেরকে তাদের খাবার খাওয়াতে চায় যারা তা খেতে চায় না; অথচ যারা তা খেতে চায় তাদেরকে কিছুতেই দেয় না।”[৬৪০]
টিকাঃ
[৬১৯] হাদীসটির সনদ সহীহ ও মাওকুফ।
[৬২০] হাদীসটির সনদ হাসান ও মাওকুফ।
[৬২১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২২] তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ১০/২৮৬। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১, মাওকুফ এবং এর সনদ দুর্বল।
[৬২৪] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৬২৫] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪০৩৫, সনদ সহীহ।
[৬২৬] হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণিত।
[৬২৭] মুসনাদ আহমাদ, ২/১৯৮, হাদীসটির সনদ হাসান লি-গাইরিহি।
[৬২৮] হাকিম, মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, সনদ সহীহ।
[৬২৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০২] তিরমিযি, সুনান, ২৩৮০, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৬৩৩] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত। আলবানি বলেছেন, হাদীসটি হাসান, কারণ এর একাধিক সূত্র রয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, হাদীস নং ৩৪৩; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৪/২৫০।
[৬৩৪] গাধা খুব দ্রুত পিপাসার্ত হয়। তাই এখানে মুমূর্ষু অবস্থাকে গাধার পিপাসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
[৬৩৫] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩১৮। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৬] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৬৮৫৫।
[৬৩৭] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৮] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩৯] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪০] তাহযিবুল কামাল, ৩৩/৮৯। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ。
সপ্তম অনুচ্ছেদ
আয়েশি-জীবন বর্জন করা
কল্যাণকর বিষয় মনোনয়ন
৫৪৬. আল্লাহ তাআলা বলেন, اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ "আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার ইচ্ছা রিযক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা রিযক সংকুচিত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা যে বান্দার জন্য যেটা কল্যাণকর মনে করেন, তার জন্য তা-ই মনোনীত করেন।”[৬১৯]
হালাল উপার্জনে কোনো লজ্জা নেই
৫৪৭. আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআ থেকে বর্ণিত, ইয়াযীদ ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হালাল (উপার্জনের) ব্যাপারে যে ব্যক্তি লজ্জাবোধ করে না, তার খরচ এবং অহংকার কমে যায়।”[৬২০]
সম্পদ দেখে সুখলাভ
৫৪৮. লুকমান ইবনু আমির থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “সম্পদশালীও আহার করে, আমরাও আহার করি; তারাও পান করে, আমরাও পান করি; তারাও কাপড় পরে, আমরাও কাপড় পরি; তাদের থাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ, যার দিকে তারা তাকিয়ে থাকে (এবং সুখ পায়)। তাদের সম্পদের দিকে আমরাও তাকাই। সেসব সম্পদের হিসাব তাদেরকে দিতে হবে; কিন্তু আমরা তা থেকে মুক্ত।”[৬২১]
আত্মার প্রশান্তি
৫৪৯. বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালিদ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, الزهادة في الدنيا راحة القلب والجسد “দুনিয়াবিমুখতা হলো আত্মা ও দেহের প্রশান্তি।”[৬২২]
দুই সতীন
৫৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "দুনিয়া ও আখিরাত হলো এক ব্যক্তির দুই স্ত্রীর মতো। একজনকে সন্তুষ্ট করতে গেলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হয়।”[৬২৩]
না-পাওয়ার প্রতিদান
৫৫১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের কিছু জিনিস পেতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু পাওয়ার সামর্থ্য নেই। তার জন্য কি আমরা প্রতিদান পাব?” তিনি জবাবে বললেন, فَقِيمَ تُؤْجَرُونَ إِذَا لَمْ تُؤْجَرُوا عَلَى ذَلِكَ؟ “এর জন্যই যদি প্রতিদান না পাও, তা হলে কীসের জন্য পাবে?”[৬২৪]
ওপর ভালো তো নিচ ভালো
৫৫২. আবূ আবদ রাব্বিহি বলেন, আমি শুনেছি, মুআবিয়া ইবনু আবী সুফইয়ান এই মিম্বরের ওপর বসে বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি- إِنَّ مَا بَقِيَ مِنَ الدُّنْيَا بَلَاءٌ وَفِتْنَةٌ، وَإِنَّمَا مَثَلُ عَمَلِ أَحَدِكُمْ كَمَثَلِ الْوِعَاءِ، إِذَا طَابَ أَعْلَاهُ طَابَ أَسْفَلُهُ، وَإِذَا خَبُثَ أَعْلَاهُ خَبُثَ أَسْفَلُهُ
“দুনিয়াতে যা অবশিষ্ট থাকবে তা হলো বিপদাপদ ও ফিতনা। তোমাদের আমলের উদাহরণ হলো পাত্রের মতো: তার ওপরের অংশ ভালো থাকলে নিচের অংশও ভালো থাকে। আর ওপরের অংশ খারাপ হলে নিচের অংশও খারাপ হয়।”[৬২৫]
কারাগার
৫৫৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “দুনিয়া হলো কাফিরের জন্য জান্নাত ও মুমিনের জন্য কারাগার। যখন মুমিনের (জান কব্য) করা হয় তখন তার অবস্থা যেন কারাগার থেকে বের হওয়া ব্যক্তির মতো। যে কিনা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা শুরু করে এবং স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়।”[৬২৬] (অনুরূপ মুমিন বান্দাও দুনিয়ার কারাগার থেকে বেরিয়ে জান্নাতে গিয়ে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করবে।)
কারাগার থেকে মুক্তিলাভ
৫৫৪. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَسَنَّتُهُ، فَإِذَا فَارَقَ الدُّنْيَا فَارَقَ السِّجْنَ وَالسَّنَةَ
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার ও সঙ্কটময় সময়; যখন সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, তখন সে মূলত কারাগার ও সঙ্কট থেকে বিদায় নেয়।”[৬২৭]
মুমিনের উপহার
৫৫৫. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, تُحْفَةُ الْمُؤْمِنِ الْمَوْتُ “মুমিনের জন্য উপহার হলো মৃত্যু।”[৬২৮]
গুনাহগার ব্যতীত সবাইকে
৫৫৬. মুহারিব ইবনু দিসার বলেন, খাইসামাহ রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, মৃত্যু কি তোমাকে আনন্দিত করে? আমি বললাম, না তো। তখন তিনি বললেন, দোষত্রুটিপূর্ণ লোক ছাড়া আর সবাইকেই মৃত্যু আনন্দিত করে।”[৬২৯]
সবচেয়ে প্রিয়
৫৫৭. আবূ আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, আবুল আ'ওয়ার সুলামি একটি মজলিসে বসা ছিলেন। সেখানে একজন লোক বলল, আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা যত জিনিস সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এ কথা শুনে আবুল আ'ওয়ার সুলামি বললেন, “তোমার মতো হওয়া আমার কাছে লাল উটের পাল থেকেও প্রিয়। কিন্তু, আল্লাহর কসম, তিনটি জিনিস দেখার আগেই আমি মৃত্যুবরণ করতে চাই : ১. কাউকে উপদেশ দিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হতে দেখা। ২. কোনো-কিছুর পরিবর্তন করতে চেয়েও তা করতে না পারা। ৩. নিজের বার্ধক্য।”[৬৩০]
অহংকার প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা
৫৫৮. শুরাহবীল ইবনু মুসলিম থেকে বর্ণিত। আমর ইবনু আসওয়াদ আনসি অনেক তৃপ্তিদায়ক বস্তু পরিত্যাগ করতেন এই ভয়ে যে (সেগুলো গ্রহণ করলে) তাঁর অহংকার প্রকাশ পাবে।[৬৩১]
পেট একটি মন্দ পাত্র
৫৫৯. মিকদাম ইবনু মাদিকারিব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلُ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ فَثُلُثُ طَعَامُ، وَثُلُثُ شَرَابٌ ، وَثُلُثُ لِنَفْسِهِ
"পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লুকমা খাবারই আদম-সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আরও বেশি যদি খেতেই হয় তবে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”[৬০২]
বেশি খেলে বেশি ক্ষুধা
৫৬০. আইয়ূব ইবনু উসমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লোককে ঢেকুর তুলতে দেখে বললেন-
أَقْصِرُ مِنْ جُشَابِكَ، فَإِنَّ أَطْوَلَ النَّاسِ جُوعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ شِبَعًا فِي الدُّنْيَا
"ঢেকুর কম তোলো। কিয়ামাতের দিন ওইসব লোকের ক্ষুধাই সবচেয়ে দীর্ঘ হবে, যারা দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি পরিতৃপ্ত থাকে।”[৬৩৩]
আট বছর অতৃপ্ত থাকা
৫৬১. হামযা ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উমর বলেছেন, (আমার পিতা) আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে যদি বেশি খাবার থাকত, তা হলে তিনি খাবারের জন্য অন্য কাউকে পেয়ে গেলে তৃপ্তিভরে খেতেন না। হামযা বলেন, তাঁর মৃত্যুশয্যায় ইবনু মুত্বি' তাঁকে দেখতে এলেন। দেখলেন তাঁর শরীর শুকিয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যা বিনতু আবী উবাইদকে বললেন, আপনি কি তাঁর সেবাযত্ন করেন না? তাকে ভালো খাবার খাওয়ান না? তা হলে তো তার শরীরটা ফিরে আসত। সাফিয়্যা বললেন, আমরা তো খাবার প্রস্তুত করিই। কিন্তু তিনি সেটা পরিবার-পরিজন আর মেহমানদের সাথে ভাগ করে নেন। প্রয়োজনে তাঁকেই জিজ্ঞস করুন। তখন ইবনু মুত্বি' বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান, আপনি যদি ঠিকমতো খাবার খেতেন, তা হলে আপনার শরীরটা ফিরে আসত। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমার আটটি বছর এমনভাবে কেটেছে যে একবারও তৃপ্তিসহ খাইনি (অথবা বলেছেন, মাত্র একবার তৃপ্তিসহ খেয়েছি)। এখন তো একটি গাধার পিপাসার সমান[৬৩৪] আয়ু বাকি রয়েছে। এমন সময় আমি পেটপুরে খাই, এমনটাই কি তুমি চাও?”[৬৩৫]
তরকারিতে ঝোল বেশি দেওয়া
৫৬২. আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার প্রিয়বন্ধু (নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ওসিয়ত করেছেন- إِذَا صَنَعْتَ مَرَقًا فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، ثُمَّ انْظُرْ إِلَى أَهْلِ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِكَ فَأَصِبْهُمْ مِنْهُ بِمَعْرُوفٍ "তরকারি রান্না করলে বেশি করে পানি দেবে। তারপর প্রতিবেশী লোকদের খোঁজ-খবর নেবে এবং ওই ঝোল থেকে সৌজন্য হিসেবে কিছুটা তাদেরকে দেবে।”[৬৩৬]
মেহমান ছাড়া না খাওয়া
৫৬৩. আবদুর রহমান ইবনু নাওফাল থেকে বর্ণিত, সাফিয়্যাহ বিনতু আবী উবাইদ বলেন, আমি আমার স্বামী (আবদুল্লাহ ইবনু উমরকে) কখনও তৃপ্তিসহ খেতে দেখিনি। তবে একবার দেখেছি। তাঁর আশ্রয়ে দুইজন ইয়াতীম বালক-বালিকা ছিল। আমি তাঁর জন্য একবার একটি আলাদা খাবার প্রস্তুত করলাম। তিনি ওই ইয়াতীম বালক-বালিকাকে ডেকে পাঠালেন। তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো। এরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাঁর জন্য আলাদা খাবারটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, ইয়াতীম মেয়েটিকে ডাকো। আমি বললাম, ওরা দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওদের দুইজনকে পেটভরে খাইয়েছি। তিনি বললেন, ও আচ্ছা। তা হলে আহলে সুফফার কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসো, যাও।
তখন কয়েকজন গরিব মানুষকে ডেকে আনা হলো এবং তারা তাঁর সঙ্গে খাবার খেলো।”[৬৩৭]
ভালো খাবার বেছে মিসকীনদের প্রদান
৫৬৪. আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা একবার একটি সফরে ছিলেন। চলতে চলতে একটি জায়গায় (যাত্রা) বিরতি করলেন। তখনও তাঁর পাথেয় ও সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি। কাফেলার সঙ্গীরা তাঁকে এভাবে দেখে নিজেদের খাবার থেকে কিছু অংশ তাঁকে পাঠালেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বসলেন। এ সময় কিছু মিসকীন লোক এল। ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা তখন তা দেখতে লাগলেন তাঁর সামনে কোন খাবারটি সবচেয়ে ভালো। বড়ো একটি পাত্রভর্তি ছারিদ পেয়ে সেটিই উঁচিয়ে ধরলেন মিসকীনদের দেওয়ার জন্য। তৎক্ষণাৎ তাঁর এক ছেলে তাঁর হাত থেকে পাত্রটি নিয়ে নিলেন। বললেন, “আব্বু, এটা আপনার সবচেয়ে ভালো খাবার। এটা আমাদের জন্য রাখুন। গরিব-মিসকীনকে খাওয়ানোর মতো এখানে আরও খাবার আছে।” বর্ণনাকারী বলেন, পাত্রটি নিয়ে পিতা-পুত্রের কাড়াকাড়ির মধ্যে লেগে গেল। অবশেষে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "আমি এই পাত্রের খাবার দান করে আমার ঘাড় থেকে বোঝা নামাতে চাই।”[৬৩৮]
খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয়
৫৬৫. শাহর ইবনু হাওশাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এ কথা বলা হতো—খাবারের সঙ্গে চারটি বিষয় যুক্ত হলে সব দিক থেকে খাবারের পূর্ণতা পায়। ১. খাবার হালাল হওয়া; ২. খাবার গ্রহণের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ; ৩. খাবারে অনেকগুলো হাতের সমাবেশ (কয়েকজন একসঙ্গে খাওয়া); ৪. খাবার গ্রহণের শেষে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায়। যখন এই চারটি বিষয় একত্র হয়, তখন খাবার সবদিক থেকেই পূর্ণতা লাভ করে।”
খাবার খেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা
৫৬৬. আবূ সালিহ বলেন, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে কয়েকজন লোক খাবার খেল। তিনি বললেন, “(খাবারের সাথে সুস্বাদু) কিছু মিশিয়ে নাও।” তারা বলল, “কী দিয়ে সুস্বাদু করব?” তিনি বললেন, “খাবার গ্রহণ শেষ হলে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।”[৬৩৯]
দুধের মাছি
৫৬৭. আবূ বকর ইবনু হাম্স রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত কাউকেই তাঁর সঙ্গে খাদ্যগ্রহণে বাধা দিতেন না। এমনকি কুষ্ঠরোগী, শ্বেতরোগীরা ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত লোকদেরও তিনি নিমন্ত্রণ জানাতেন। তারা তাঁর সঙ্গে বসে খেত। একবার আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা দস্তরখানায় বসে ছিলেন। এ সময় মদীনার দুজন দাস এল। তারা সালাম দিল। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে যে-সকল ফকির-মিসকীন বসে ছিল তারা এই দুজন লোককে অভিনন্দন জানাল, তাদের উদ্দেশ্যে আনন্দ প্রকাশ করল এবং তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিল। এটা দেখে ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা হেসে ফেললেন। কিন্তু আগন্তুক লোক দুজন তাঁর হাসিকে মেনে নিতে পারল না। তারা বলল, আবূ আবদুর রহমান, আল্লাহ তাআলা আপনার দাঁতগুলোকে হাসিতে উজ্জ্বল রাখুক। কিন্তু কেন হাসলেন, তা জানতে পারি কি? আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি এই লোকগুলোর কাণ্ড দেখে হেসেছি। এই লোকগুলো এখানে আসে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় তাদের মুখ থেকে যেন রক্ত পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়; একজন আরেকজনকে জায়গায় দিতে চায় না, যে যাকে পারে কষ্ট দেয়। কারও পক্ষে দুইজনের জায়গা দখল করা সম্ভব হলে অন্যদের কষ্ট দিয়েও ওই কাজটাই করে। তোমরা দুইজন এখানে এসেছ, তবে তোমাদের সাথে আছে পর্যাপ্ত পাথেয় ও সামগ্রী। ফলে তারা তোমাদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে, তোমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা এমন লোকদেরকে তাদের খাবার খাওয়াতে চায় যারা তা খেতে চায় না; অথচ যারা তা খেতে চায় তাদেরকে কিছুতেই দেয় না।”[৬৪০]
টিকাঃ
[৬১৯] হাদীসটির সনদ সহীহ ও মাওকুফ।
[৬২০] হাদীসটির সনদ হাসান ও মাওকুফ।
[৬২১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২২] তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ১০/২৮৬। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১, মাওকুফ এবং এর সনদ দুর্বল।
[৬২৪] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৬২৫] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪০৩৫, সনদ সহীহ।
[৬২৬] হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণিত।
[৬২৭] মুসনাদ আহমাদ, ২/১৯৮, হাদীসটির সনদ হাসান লি-গাইরিহি।
[৬২৮] হাকিম, মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, সনদ সহীহ।
[৬২৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩১] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০২] তিরমিযি, সুনান, ২৩৮০, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৬৩৩] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত। আলবানি বলেছেন, হাদীসটি হাসান, কারণ এর একাধিক সূত্র রয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, হাদীস নং ৩৪৩; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৪/২৫০।
[৬৩৪] গাধা খুব দ্রুত পিপাসার্ত হয়। তাই এখানে মুমূর্ষু অবস্থাকে গাধার পিপাসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
[৬৩৫] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩১৮। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৬] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৬৮৫৫।
[৬৩৭] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৩৮] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৩৯] হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪০] তাহযিবুল কামাল, ৩৩/৮৯। হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ。