📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 দুনিয়ার হাকীকত

📄 দুনিয়ার হাকীকত


প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার হাকীকত

প্রশাসকের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
৪৬২. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নুমান ইবনু মুকরিন রদিয়াল্লাহু আনহু-কে কাসকারে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। কিছুদিন পর তিনি উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আল্লাহ তাআলার কসম দিয়ে চিঠি পাঠালেন, যেন তাঁকে কাসকার [৫২৪] থেকে সরিয়ে নিয়ে কোনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিহাদে পাঠানো হয়। তিনি লেখেন, 'কাসকারের অবস্থা হলো রূপসি নারীর মতো, প্রতিদিন তা নতুন করে সাজগোজ করে আমার সামনে আসে।' ফলে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কাসকার থেকে সরিয়ে নেন এবং নাহাওয়ান্দে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন।”[৫২৫]

দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতে আগ্রহ
৪৬৩. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজ তোমরা ইবাদাতে সাহাবিদের থেকেও অনেক বেশি পরিশ্রম করো, অনেক দীর্ঘ সালাত আদায় করো, কিন্তু তবুও তারা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।” জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “তাঁরা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ ছিলেন এবং আখিরাতের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন।”[৫২৬]

দুনিয়া উপার্জনের কুফল
৪৬৪. মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন এবং বদর-যুদ্ধে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বাহরাইনে জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠালেন। তিনি বাহরাইন থেকে জিযিয়ার মাল-সম্পদ নিয়ে ফিরে এলেন। আনসারগণ আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আগমনের সংবাদ শুনতে পেলেন। ফলে তাঁরা সবাই ফজরের সালাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন, তখন সবাই তাঁর সামনে সমবেত হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দেখে হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, তোমরা শুনেছ যে আবূ উবাইদা কিছু নিয়ে ফিরেছেন। তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন,
فَأَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِي أَخْشَى أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ
“তবে তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তোমাদের যা আনন্দিত করবে তার আশা রাখো। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। কিন্তু আশঙ্কা করি যে, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রসারিত হয়ে যাবে যেভাবে পূর্ববর্তীদের জন্য প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর ঠিক তাদেরই মতো করেই তোমরা দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। ফলে দুনিয়া তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, ঠিক যেভাবে তাদেরকে ধ্বংস করেছিল।”[৫২৭]

কারও কাছে কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা
৪৬৫. উরওয়া ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বর্ণনা করেন, হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আমি আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। তারপর আবারও চাইলাম, এবারও দিলেন। তারপর বললেন,
يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
“হাকীম, এই সম্পদ শ্যামল ও সুস্বাদু। অন্তরের সচ্ছলতার সঙ্গে (লোভ-লালসা ছাড়া) যে তা গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে। আর যে অন্তরে লোভ-লালসাসহ গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে না। সে যেন এমন ব্যক্তির মতো যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।"
হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার কসম, আপনার পর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত (সম্পদ চেয়ে) আমি কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করব না।”
পরবর্তী সময়ে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু-কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন; তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। তারপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলেও একই ঘটনা ঘটে। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ওহে মুসলিমগণ, তোমরা হাকীম ইবনু হিযামের ব্যাপারে সাক্ষী থেকো। আমি এই গনীমাতের মাল থেকে তার কাছে তার অংশ পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর হাকীম রদিয়াল্লাহু আনহু কারও কাছে (সম্পদ চেয়ে) তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।”[৫২৮]

দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা
৪৬৬. উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ-যুদ্ধে নিহত শহীদদের ওপর আট বছর পর (জানাযার) সালাত পড়লেন। সেই দিনের সালাতে মনে হলো, যেন তিনি জীবিত এবং মৃতদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে বললেন,
إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ ، وَأَنَا عَلَيْكُمْ شَهِيدٌ، وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْحَوْضُ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ وَأَنَا فِي مَقَامِي هَذَا، وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا
“(হাশরের ময়দানে) আমি তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হব। আমি হব তোমাদের পক্ষে সাক্ষী এবং তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের স্থান হলো হাউযে কাউসার। আমি এখন এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাউযে কাউসার দেখতে পাচ্ছি। আমার পরে তোমরা সবাই শিরকে লিপ্ত হবে, এরকম কোনো আশঙ্কা নেই; কিন্তু ভয় হয় যে, তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।”
উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এটাই ছিল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।”[৫২৯]

টিকাঃ
[৫২৪] দক্ষিণ ইরাকের একটি শহর।
[৫২৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫২৬] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫২৭] বুখারি, ২৯৮৮; মুসলিম, ৭৬১৪। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৮] বুখারি, ২৯৭৪, ৫০৪০, ৬০৭৬; মুসলিম, ২৪৩৫। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৯] বুখারি, ৩৮১৬।

প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার হাকীকত

প্রশাসকের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
৪৬২. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নুমান ইবনু মুকরিন রদিয়াল্লাহু আনহু-কে কাসকারে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। কিছুদিন পর তিনি উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আল্লাহ তাআলার কসম দিয়ে চিঠি পাঠালেন, যেন তাঁকে কাসকার [৫২৪] থেকে সরিয়ে নিয়ে কোনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিহাদে পাঠানো হয়। তিনি লেখেন, 'কাসকারের অবস্থা হলো রূপসি নারীর মতো, প্রতিদিন তা নতুন করে সাজগোজ করে আমার সামনে আসে।' ফলে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কাসকার থেকে সরিয়ে নেন এবং নাহাওয়ান্দে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন।”[৫২৫]

দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতে আগ্রহ
৪৬৩. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজ তোমরা ইবাদাতে সাহাবিদের থেকেও অনেক বেশি পরিশ্রম করো, অনেক দীর্ঘ সালাত আদায় করো, কিন্তু তবুও তারা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।” জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “তাঁরা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ ছিলেন এবং আখিরাতের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন।”[৫২৬]

দুনিয়া উপার্জনের কুফল
৪৬৪. মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন এবং বদর-যুদ্ধে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বাহরাইনে জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠালেন। তিনি বাহরাইন থেকে জিযিয়ার মাল-সম্পদ নিয়ে ফিরে এলেন। আনসারগণ আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আগমনের সংবাদ শুনতে পেলেন। ফলে তাঁরা সবাই ফজরের সালাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন, তখন সবাই তাঁর সামনে সমবেত হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দেখে হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, তোমরা শুনেছ যে আবূ উবাইদা কিছু নিয়ে ফিরেছেন। তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন,
فَأَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِي أَخْشَى أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ
“তবে তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তোমাদের যা আনন্দিত করবে তার আশা রাখো। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। কিন্তু আশঙ্কা করি যে, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রসারিত হয়ে যাবে যেভাবে পূর্ববর্তীদের জন্য প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর ঠিক তাদেরই মতো করেই তোমরা দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। ফলে দুনিয়া তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, ঠিক যেভাবে তাদেরকে ধ্বংস করেছিল।”[৫২৭]

কারও কাছে কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা
৪৬৫. উরওয়া ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বর্ণনা করেন, হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আমি আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। তারপর আবারও চাইলাম, এবারও দিলেন। তারপর বললেন,
يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
“হাকীম, এই সম্পদ শ্যামল ও সুস্বাদু। অন্তরের সচ্ছলতার সঙ্গে (লোভ-লালসা ছাড়া) যে তা গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে। আর যে অন্তরে লোভ-লালসাসহ গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে না। সে যেন এমন ব্যক্তির মতো যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।"
হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার কসম, আপনার পর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত (সম্পদ চেয়ে) আমি কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করব না।”
পরবর্তী সময়ে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু-কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন; তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। তারপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলেও একই ঘটনা ঘটে। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ওহে মুসলিমগণ, তোমরা হাকীম ইবনু হিযামের ব্যাপারে সাক্ষী থেকো। আমি এই গনীমাতের মাল থেকে তার কাছে তার অংশ পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর হাকীম রদিয়াল্লাহু আনহু কারও কাছে (সম্পদ চেয়ে) তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।”[৫২৮]

দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা
৪৬৬. উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ-যুদ্ধে নিহত শহীদদের ওপর আট বছর পর (জানাযার) সালাত পড়লেন। সেই দিনের সালাতে মনে হলো, যেন তিনি জীবিত এবং মৃতদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে বললেন,
إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ ، وَأَنَا عَلَيْكُمْ شَهِيدٌ، وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْحَوْضُ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ وَأَنَا فِي مَقَامِي هَذَا، وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا
“(হাশরের ময়দানে) আমি তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হব। আমি হব তোমাদের পক্ষে সাক্ষী এবং তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের স্থান হলো হাউযে কাউসার। আমি এখন এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাউযে কাউসার দেখতে পাচ্ছি। আমার পরে তোমরা সবাই শিরকে লিপ্ত হবে, এরকম কোনো আশঙ্কা নেই; কিন্তু ভয় হয় যে, তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।”
উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এটাই ছিল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।”[৫২৯]

টিকাঃ
[৫২৪] দক্ষিণ ইরাকের একটি শহর।
[৫২৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫২৬] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫২৭] বুখারি, ২৯৮৮; মুসলিম, ৭৬১৪। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৮] বুখারি, ২৯৭৪, ৫০৪০, ৬০৭৬; মুসলিম, ২৪৩৫। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৯] বুখারি, ৩৮১৬।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 দুনিয়া থেকে অল্প গ্রহণ

📄 দুনিয়া থেকে অল্প গ্রহণ


দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
দুনিয়া থেকে অল্প গ্রহণ

আগ্রহের সঙ্গে ধন-সম্পদ গ্রহণ না করা
৪৬৭. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا تَتَّخِذُوا الضَّيْعَةَ؛ فَتَرْغَبُوا فِي الدُّنْيَا
“তোমরা বাগ-বাগিচা ও খেত-খামার আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ কোরো না, তা হলে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।"[৫০০]

দুনিয়ার চাকচিক্যে মনোযোগ না দেওয়া
৪৬৮. ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু কুদামা রদিয়াল্লাহু আনহু হাদীস বর্ণনা করতেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর লোক এবং আল্লাহর রাসূলের একজন সাহাবি। তিনি বলেন, “একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। তখন এই উম্মতের একটি দল আমার সামনে আত্মপ্রকাশ করল। দলটির লোক দ্বারা পুরো দিগন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। তারা আমার নিকটবর্তী হতেই তাদের সামনে দুনিয়ার প্রতিটি চাকচিক্যময় বস্তু প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে গেল। তারা (সেটিকে পাশ কাটিয়ে) এগিয়ে গেল, একজনও সে দিকে ফিরে তাকাল না। তারা অতিক্রম করে যেতে-না-যেতেই প্রাচীর সংকুচিত হয়ে পড়ল। আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ চাইলেন, ততক্ষণ আমি পাহাড়ের ওপর অবস্থান করলাম। তারপর এই উম্মতের আরেকটি দল আবির্ভূত হলো। একই জায়গায় তাদের সামনেও দুনিয়ার প্রতিটি চাকচিক্যময় বস্তুর প্রাচীর দাঁড়িয়ে গেল। তারা অতিক্রম করে যেতে-না-যেতেই প্রাচীর সংকুচিত হয়ে পড়ল। আবারও আল্লাহর ইচ্ছে মোতাবেক কিছুক্ষণ আমি পাহাড়ের ওপর থাকলাম। এবার এল উম্মতের তৃতীয় দলটি। তাদের সামনেও একই জায়গায় একইরকম প্রাচীর দাঁড়িয়ে গেল। প্রথম আরোহী এসে তার বাহনটি থামাল। অন্যান্য আরোহীদের কেউই তাকে অতিক্রম করে যায়নি। এরপর কিছু লোক দুনিয়ার চাকচিক্যে আতঙ্কিত হয়ে (কৌতূহলবশত) বাহন থেকে নেমে এল। এরপর দেখতে পাই, এ লোকগুলো (কৌতূহলে) মগ্ন থাকতে থাকতেই, যারা বাহন থেকে নামেনি তারা চলে গিয়েছে।”[৫৩১]

দুনিয়ার বাগ-বাগিচা ক্ষণস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ
৪৬৯. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়া এবং আমাদের দৃষ্টান্ত এরকম : একটি সম্প্রদায় ধুলোয় আচ্ছন্ন নির্জন প্রান্তর অতিক্রম করছে; প্রান্তরটির কতটুকু অংশ অতিক্রম করেছে, তাও জানে না তারা। ইতিমধ্যে তারা ক্লান্ত, পাথেয়ও শেষ। নির্জন প্রান্তরেই তারা মুমূর্ষু হয়ে পড়ল, মৃত্যুর ব্যাপারে তাদের দৃঢ়-বিশ্বাস জন্ম নিল। এ অবস্থায় হঠাৎ তাদের সামনে একজন লোক বিশেষ পোশাকে উপস্থিত হলেন। তার মাথা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছিল। কাফেলার লোকেরা বলল, নির্জন ভূমিতে আজব ঘটনা ঘটল তো! লোকটি তাদের কাছে এসে বললেন, অবস্থা কী তোমাদের? তারা বলল, যা দেখছেন তা-ই : আমরা ক্লান্ত, পাথেয়ও শেষ, আমরা এই নির্জন প্রান্তরে মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত হয়েছি। এই প্রান্তরের বেশিরভাগ অংশ অতিক্রম করেছি নাকি বাকি আছে, তাও আমরা জানি না। লোকটি বললেন, যদি আমি তোমাদেরকে সুমিষ্ট জল ও সবুজ বাগ-বাগিচার সন্ধান দিই, তা হলে আমাকে কী দেবে? তারা বলল, আমরা আপনার কর্তৃত্ব মেনে নেব। তিনি বললেন, আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও যে কখনও আমার অবাধ্য হবে না। তখন তারা তাকে প্রতিশ্রুতি দিল যে তারা অবাধ্য হবে না। তখন তিনি তাদের নিয়ে সামনে এগোলেন। তাদেরকে সবুজ বাগ-বাগিচা ও সুমিষ্ট পানির কাছে নিয়ে গেলেন। ওখানে কিছুক্ষণ থাকার পর বললেন, আমার সঙ্গে এসো, তোমাদেরকে এর চেয়েও সবুজ-শ্যামল উদ্যানে নিয়ে যাব। এই পানির চেয়েও সুমিষ্ট পানি খুঁজে পাবে। তখন কাফেলার কিছু লোক বলল, এটাই তো উপভোগ করে শেষ করতে পারলাম না; আর ওটা তো আরও পারব না। কাফেলার অন্য লোকেরা বলল, তোমরা না অঙ্গীকার করেছিলে যে, তার অবাধ্য হবে না?
তার প্রথম কথা যেহেতু সত্য প্রমাণিত হয়েছে; তা হলে নিশ্চয়ই পরেরটিও সত্য হবে। এবারও তিনি এই লোকগুলোকে আগের চেয়েও সবুজ-শ্যামল উদ্যান ও সুমিষ্ট জলের কাছে নিয়ে গেলেন। আর যারা তার কথা বিশ্বাস না করে থেকে গিয়েছিল, রাতের বেলা শত্রুদল তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে। ফলে তাদের কেউ নিহত হয়, কেউ বন্দি হয়।”[৫৩২]

টিকাঃ
[৫০০] মুসনাদ আহমাদ, ১/৩৭৭; হাসান সনদে বর্ণিত। অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে তা সহীহ।
[৫৩১] আবদুল্লাহ ইবনু সা'দী থেকে বর্ণিত ঘটনা।
[৫৩২] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
দুনিয়া থেকে অল্প গ্রহণ

আগ্রহের সঙ্গে ধন-সম্পদ গ্রহণ না করা
৪৬৭. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا تَتَّخِذُوا الضَّيْعَةَ؛ فَتَرْغَبُوا فِي الدُّنْيَا
“তোমরা বাগ-বাগিচা ও খেত-খামার আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ কোরো না, তা হলে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।"[৫০০]

দুনিয়ার চাকচিক্যে মনোযোগ না দেওয়া
৪৬৮. ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু কুদামা রদিয়াল্লাহু আনহু হাদীস বর্ণনা করতেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর লোক এবং আল্লাহর রাসূলের একজন সাহাবি। তিনি বলেন, “একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। তখন এই উম্মতের একটি দল আমার সামনে আত্মপ্রকাশ করল। দলটির লোক দ্বারা পুরো দিগন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। তারা আমার নিকটবর্তী হতেই তাদের সামনে দুনিয়ার প্রতিটি চাকচিক্যময় বস্তু প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে গেল। তারা (সেটিকে পাশ কাটিয়ে) এগিয়ে গেল, একজনও সে দিকে ফিরে তাকাল না। তারা অতিক্রম করে যেতে-না-যেতেই প্রাচীর সংকুচিত হয়ে পড়ল। আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ চাইলেন, ততক্ষণ আমি পাহাড়ের ওপর অবস্থান করলাম। তারপর এই উম্মতের আরেকটি দল আবির্ভূত হলো। একই জায়গায় তাদের সামনেও দুনিয়ার প্রতিটি চাকচিক্যময় বস্তুর প্রাচীর দাঁড়িয়ে গেল। তারা অতিক্রম করে যেতে-না-যেতেই প্রাচীর সংকুচিত হয়ে পড়ল। আবারও আল্লাহর ইচ্ছে মোতাবেক কিছুক্ষণ আমি পাহাড়ের ওপর থাকলাম। এবার এল উম্মতের তৃতীয় দলটি। তাদের সামনেও একই জায়গায় একইরকম প্রাচীর দাঁড়িয়ে গেল। প্রথম আরোহী এসে তার বাহনটি থামাল। অন্যান্য আরোহীদের কেউই তাকে অতিক্রম করে যায়নি। এরপর কিছু লোক দুনিয়ার চাকচিক্যে আতঙ্কিত হয়ে (কৌতূহলবশত) বাহন থেকে নেমে এল। এরপর দেখতে পাই, এ লোকগুলো (কৌতূহলে) মগ্ন থাকতে থাকতেই, যারা বাহন থেকে নামেনি তারা চলে গিয়েছে।”[৫৩১]

দুনিয়ার বাগ-বাগিচা ক্ষণস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ
৪৬৯. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়া এবং আমাদের দৃষ্টান্ত এরকম : একটি সম্প্রদায় ধুলোয় আচ্ছন্ন নির্জন প্রান্তর অতিক্রম করছে; প্রান্তরটির কতটুকু অংশ অতিক্রম করেছে, তাও জানে না তারা। ইতিমধ্যে তারা ক্লান্ত, পাথেয়ও শেষ। নির্জন প্রান্তরেই তারা মুমূর্ষু হয়ে পড়ল, মৃত্যুর ব্যাপারে তাদের দৃঢ়-বিশ্বাস জন্ম নিল। এ অবস্থায় হঠাৎ তাদের সামনে একজন লোক বিশেষ পোশাকে উপস্থিত হলেন। তার মাথা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছিল। কাফেলার লোকেরা বলল, নির্জন ভূমিতে আজব ঘটনা ঘটল তো! লোকটি তাদের কাছে এসে বললেন, অবস্থা কী তোমাদের? তারা বলল, যা দেখছেন তা-ই : আমরা ক্লান্ত, পাথেয়ও শেষ, আমরা এই নির্জন প্রান্তরে মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত হয়েছি। এই প্রান্তরের বেশিরভাগ অংশ অতিক্রম করেছি নাকি বাকি আছে, তাও আমরা জানি না। লোকটি বললেন, যদি আমি তোমাদেরকে সুমিষ্ট জল ও সবুজ বাগ-বাগিচার সন্ধান দিই, তা হলে আমাকে কী দেবে? তারা বলল, আমরা আপনার কর্তৃত্ব মেনে নেব। তিনি বললেন, আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও যে কখনও আমার অবাধ্য হবে না। তখন তারা তাকে প্রতিশ্রুতি দিল যে তারা অবাধ্য হবে না। তখন তিনি তাদের নিয়ে সামনে এগোলেন। তাদেরকে সবুজ বাগ-বাগিচা ও সুমিষ্ট পানির কাছে নিয়ে গেলেন। ওখানে কিছুক্ষণ থাকার পর বললেন, আমার সঙ্গে এসো, তোমাদেরকে এর চেয়েও সবুজ-শ্যামল উদ্যানে নিয়ে যাব। এই পানির চেয়েও সুমিষ্ট পানি খুঁজে পাবে। তখন কাফেলার কিছু লোক বলল, এটাই তো উপভোগ করে শেষ করতে পারলাম না; আর ওটা তো আরও পারব না। কাফেলার অন্য লোকেরা বলল, তোমরা না অঙ্গীকার করেছিলে যে, তার অবাধ্য হবে না?
তার প্রথম কথা যেহেতু সত্য প্রমাণিত হয়েছে; তা হলে নিশ্চয়ই পরেরটিও সত্য হবে। এবারও তিনি এই লোকগুলোকে আগের চেয়েও সবুজ-শ্যামল উদ্যান ও সুমিষ্ট জলের কাছে নিয়ে গেলেন। আর যারা তার কথা বিশ্বাস না করে থেকে গিয়েছিল, রাতের বেলা শত্রুদল তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে। ফলে তাদের কেউ নিহত হয়, কেউ বন্দি হয়।”[৫৩২]

টিকাঃ
[৫০০] মুসনাদ আহমাদ, ১/৩৭৭; হাসান সনদে বর্ণিত। অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে তা সহীহ।
[৫৩১] আবদুল্লাহ ইবনু সা'দী থেকে বর্ণিত ঘটনা।
[৫৩২] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 দুনিয়ার তুচ্ছতা

📄 দুনিয়ার তুচ্ছতা


তৃতীয় অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার তুচ্ছতা

দুনিয়ার তুচ্ছতা
৪৭০. ফিহর গোত্রের লোক মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবিকে সাথে নিয়ে (রাস্তার ধারে) পড়ে-থাকা একটি মরা বকরির বাচ্চার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাদের মাঝে আমিও ছিলাম। (তা দেখিয়ে) তিনি বললেন,
أَتَرَوْنَ هَذِهِ هَانَتْ عَلَى أَهْلِهَا حَتَّى أَلْقَوْهَا؟ قَالُوا: مِنْ هَوَانِهَا أَلْقَوْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ : فَالدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ عَلَى أَهْلِهَا
"নিকৃষ্ট বলেই তো এটিকে তার মালিক ফেলে দিয়েছে, তাই না? তাঁরা বললেন : (জি,) হে আল্লাহর রাসূল, নিকৃষ্ট হওয়ার কারণেই এটিকে তার মালিক ফেলে দিয়েছে। তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : এটি তার মালিকের কাছে যতটা তুচ্ছ, আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুনিয়া তার চেয়েও বেশি তুচ্ছ।”[৫০০]

দুনিয়া মশার ডানার সমতুল্যও নয়
৪৭১. উসমান ইবনু উবাইদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, কয়েকজন সাহাবি বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَوْ أَنَّ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ فِي الْخَيْرِ مَا أَعْطَى مِنْهَا الْكَافِرَ شَيْئًا
“এই দুনিয়া যদি আল্লাহ তাআলার কাছে মশার একটি পাখার সমানও মূল্য রাখত তবে তিনি কোনো কাফিরকে কিছুই দিতেন না।”[৫৩৪]-[৫৩৫]

সম্পদ সামনে পেয়েও গ্রহণ না করা
৪৭২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি এমন-এক সম্প্রদায়কে পেয়েছি, যাঁদের সামনে দুনিয়ার যাবতীয় হালাল বস্তু পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা গ্রহণ করেননি। তাঁরা বলেছেন, আল্লাহর কসম, এসব সম্পদ হাতে পেলে কোথায় না কোথায় ব্যয় করে বসব, তা তো জানি না।”[৫৩৬]

সমস্ত দীনার বণ্টন করে দেওয়া
৪৭৩. মালিক আদ-দার বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু চার শ দীনার নিয়ে একটি থলেতে রাখলেন। তারপর একজন গোলামকে বললেন, তুমি এগুলো নিয়ে আবূ উবাইদা-র কাছে যাও। তারপর তার বাড়িতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখো সে কী করে। গোলাম দীনারগুলো নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন আপনাকে এই দীনারগুলো আপনার প্রয়োজনে ব্যয় করতে বলেছেন। আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করুন, রহম করুন। তারপর দাসীকে ডেকে বললেন, এ সাতটি দীনার অমুককে দিয়ে আসো, এ পাঁচটি দীনার অমুককে দিয়ে আসো। এভাবে তিনি সবগুলো দীনার বণ্টন করে দিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে ফিরে এসে গোলাম তাঁকে বিস্তারিত জানাল। গোলাম দেখল, উমর রদিয়াল্লাহু আনহু মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য সমপরিমাণ দীনার একটি থলেতে প্রস্তুত করেছেন। তাকে বললেন, এগুলো মুআয ইবনু জাবালের কাছে নিয়ে যাও। তারপর তার বাড়িতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখো সে কী করে। গোলাম দীনারগুলো নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন আপনাকে এই দীনারগুলো আপনার প্রয়োজনে ব্যয় করতে বলেছেন। মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করুন, রহম করুন। তারপর দাসীকে ডেকে বললেন, এ দীনারগুলো অমুককে দিয়ে আসো আর এ দীনারগুলো অমুককে দিয়ে আসো এবং এ দীনারগুলো অমুকের বাড়িতে দিয়ে আসো। এ সময় মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী বেরিয়ে এসে বললেন, আল্লাহর কসম, আমরাও তো গরিব। আমাদেরকে কিছু দিন। কিন্তু ততক্ষণে থলিতে মাত্র দুটি দীনার বাকি আছে। তিনি দীনার দুটি স্ত্রীর দিকে ছুড়ে দিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ফিরে এসে গোলাম তাঁকে বিস্তারিত জানাল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু খুব খুশি হলেন এবং বললেন, তারা পরস্পর ভাই, অভিন্ন হৃদয়ের অধিকারী।”[৫৩৭]

স্পষ্টভাষী মিত্র
৪৭৪. মূসা ইবনু আবী ঈসা রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বনি হারিসার পানশালার কাছে এসে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে পেয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, মুহাম্মাদ, আমি মানুষটা কেমন, বলুন তো? মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম, আমি এবং আপনার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আপনাকে যেমন দেখতে চাই, আপনি তেমনই। আপনি (যাকাতের) সম্পদ সংগ্রহে শক্তিমান; কিন্তু নিজে তা থেকে পবিত্র এবং সম্পদ বণ্টনে ন্যায়পরায়ণ। আপনি যদি কোনো দিকে ঝুঁকে পড়েন তবে আমরা আপনাকে সোজা করে ফেলি যেভাবে ধনুকে তির সোজা রাখা হয়। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তাই নাকি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন সম্প্রদায়ের মধ্যে রেখেছেন—যখন আমি বাঁকাপথে ঝুঁকে পড়ি তারা আমাকে সোজা পথে নিয়ে আসে।”[৫৩৮]

মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সফর
৪৭৫. আবায়া ইবনু রিফাআ রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু জানতে পারলেন যে সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস রদিয়াল্লাহু আনহু একটি প্রাসাদের মালিক হয়েছেন এবং এর সামনে একটি ফটকও লাগিয়েছেন।
উমর বললেন, এতে করে ভেতরে আওয়াজ প্রবেশ করবে না। এরপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু সা'দ-এর কাছে কাছে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা-কে পাঠালেন।
উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে চাইলে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাকে পাঠাতেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, “সা'দ যে ফটক বানিয়েছে তা জ্বালিয়ে দিয়ে এসো।” তিনি কুফায় গেলেন। এবং ওই ফটকের কাছে গিয়ে আগুন ধরানোর কাঠি বের করে জ্বালিয়ে দিলেন। এক ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাসের কাছে গিয়ে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার চেহারার বর্ণনা দিলেন। সা'দ রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে চিনতে পেরে তাঁর কাছে এলেন। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমীরুল মুমিনীনের কাছে খবর পৌঁছেছে যে, আপনি বলেছেন, ফটক থাকলে নাকি কোনো আওয়াজ ভেতরে প্রবেশ করবে না। সা'দ রদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর নামে কসম করে বললেন যে তিনি তা বলেননি। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যা-ই হোক, আমাকে যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা-ই করেছি। আর আপনি যা বলেছেন আমি তা আমীরুল মুমিনীনের কাছে পৌঁছে দেব। তিনি তাঁর বাহনে চড়ে রওনা দিলেন। রুম্মা উপত্যকায় পৌঁছে তাঁর প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও ক্ষুধা পেল। আল্লাহ তাআলা সে ব্যাপারে সমধিক অবগত। তিনি একটি ছাগলের পাল দেখতে পেলেন। তাই তাঁর গোলামকে তাঁর পাগড়িটি দিয়ে বললেন, এর বিনিময়ে একটি ছাগল কিনে নিয়ে আসো।
কিছুক্ষণ পর গোলাম একটি ছাগল নিয়ে এল। তিনি তখন সালাত পড়ছিলেন। গোলাম ছাগলটিকে জবাই করতে চাইল। কিন্তু তিনি ইশারায় জবাই করতে নিষেধ করলেন। সালাত শেষ করে বললেন, ছাগলটি নিয়ে যাও, এটির মালিক মুসলিম দাস হলে ছাগলটি ফিরিয়ে দিয়ে পাগড়িটি নিয়ে আসো। আর সে স্বাধীন মানুষ হলে ছাগলটিই নিয়ে এসো। গোলাম ওখানে গিয়ে জানতে পারল ছাগলটির মালিক একজন দাস। ফলে সে ছাগলটি ফিরিয়ে দিয়ে পাগড়িটি নিয়ে এল। এরপর সে বাহনের লাগাম ধরে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকল। যেখানেই সে তৃণ বা সবজি-জাতীয় কিছু পাচ্ছিল তা উপড়ে নিচ্ছিল। (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার খাওয়ার জন্য।) অবেশেষে রাত নেমে এলে তাঁরা একটি গোত্রে পৌঁছলেন। তারা তাঁর জন্য রুটি ও দুধ নিয়ে এল। তারা বলল, আমাদের কাছে এর চেয়ে ভালো কিছু থাকলে আপনার জন্য পরিবেশন করতাম। তিনি বললেন, বিসমিল্লাহ, যে হালাল খাদ্য ক্ষুধা দূর করে তা নিকৃষ্ট খাদ্য থেকে অনেক উত্তম। তিনি মদীনায় পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তারপর পানির চেয়েও দ্রুতবেগে চললেন। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, এত তাড়াতাড়ি চলে এলে! তোমার প্রতি সুধারণা না থাকলে ধরেই নিতাম তুমি আমার আদেশ মানোনি। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা বললেন, আপনি যা নির্দেশ দিয়েছিলেন তা পালন করেছি। কিন্তু (সা'দ) কৈফিয়ত দিয়েছেন এবং আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলেছেন যে তিনি ওই কথাটি বলেননি। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সে কি তোমাকে কিছু দেওয়ার জন্য বলেছে? মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা বললেন, আমার একটি জায়গা পছন্দ হয়েছে, আমাকে ওখান থেকে কিছু দেবেন? উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ইরাকের ভূমি উঁচু আর মদীনার লোকেরা আমার চারপাশে ক্ষুধায়-অনাহারে মারা যাচ্ছে। তাই তোমাকে কোনো জমি দিতে আমার ইতস্তত বোধ হয়। কারণ তা তোমার জন্য হবে সহজ কিন্তু আমার জন্য হবে কঠিন। তুমি কি শোনোনি যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিন তাঁর প্রতিবেশীকে ছাড়া তৃপ্ত হতে পারে না।” অথবা তিনি বলেছেন, “মানুষ তার প্রতিবেশীকে ছাড়া তৃপ্ত হতে পারে না।”[৫৩৯]

সচ্ছলতার দ্বারা পরীক্ষার মুখোমুখি
৪৭৬. ইবরাহীম ইবনু আবদির রহমান রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতকালে প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দরবারে গেলাম। তাঁর খাসকামরায় ঢুকে উপস্থিত লোকদের সালাম দিয়ে বসলাম। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে, যুবক? বললাম, আমি ইবরাহীম ইবনু আবদির রহমান ইবনু আওফ। তিনি একজন লোকের নাম উচ্চারণ করে বললেন, অমুককে আল্লাহর কসম করে বলতে শুনেছি যে, অবশ্যই আমি আল্লাহর রাসূলের সাহাবিগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। করে তাঁদের থেকে একটি প্রতিশ্রুতি নেব, আর কোনো কথাই বলব না। তাই সে উসমান ইবনু আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতকালে মদীনায় যায়। আবদুর রহমান ইবনু আউফ বাদে সকল সাহাবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সে। পরে জানতে পারল যে, তিনি জুরুফে তাঁর একটি জমিনে আছেন। বাহনে চড়ে সেখানে গিয়ে দেখল, তিনি গায়ের চাদর রেখে দিয়ে একটি কোদাল দিয়ে পানির প্রবাহ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। তাকে দেখে তিনি লজ্জা পেয়ে গেলেন। কোদাল ফেলে দিয়ে চাদরটা নিয়ে গায়ে দিলেন। সে সালাম দিয়ে বলল, আপনার কাছে একটি বিষয় জানার জন্য এসেছি। আবদুর রহমান কেন যেন খুব অবাক হলেন। সে জিজ্ঞেস করল, আমাদের কাছে যা এসেছে তার চেয়ে বেশি কিছু কি আপনাদের কাছে এসেছে? আমরা যা জেনেছি তার চেয়ে বেশি কিছু কি আপনারা জেনেছেন? তখন ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমাদের কাছে যা এসেছে আমাদের কাছেও তা-ই এসেছে। আমরা যা জেনেছি তোমরাও তা-ই জেনেছ। সে বলল, তা হলে কী ব্যাপার, আমরা দুনিয়াবিমুখ হচ্ছি আর আপনারা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন; আমরা জিহাদ সহজ মনে করছি আর আপনারা তা কঠিন মনে করছেন! অথচ আপনারা আমাদের পূর্বসূরি, আমাদের চেয়ে উত্তম, এবং আপনারা আল্লাহর রাসূলের সাহাবি। তখন আবদুর রহমান ইবনু আউফ বললেন, তোমাদের কাছে যা এসেছে আমাদের কাছেও তা-ই এসেছে। আমরা যা জেনেছি তোমরাও তা-ই জেনেছ। কিন্তু আমরা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে দুঃখ-দারিদ্র্য-দুর্দশায় আক্রান্ত হয়েছি এবং ধৈর্যধারণ করেছি। তারপর এখন আমরা সচ্ছলতার দ্বারা পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছি; কিন্তু ধৈর্যধারণ করতে পারিনি।”[৫৪০]

বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান
৪৭৭. ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর অর্ধেক সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে দিলেন। তা ছিল চার হাজার দীনার। পরে আবার চল্লিশ হাজার দীনার দান করেন, তারপর আবারও চল্লিশ হাজার দীনার, তারপর তৃতীয়বার আরও চল্লিশ হাজার। এরও পরে আরও পাঁচ শ ঘোড়া-বোঝাই সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেন। এরপর আরও এক হাজার পাঁচ শ বাহন-বোঝাই সম্পদ দান করেন। তাঁর সমস্ত সম্পদ ছিল ব্যবসার মুনাফা।”[৫৪১]

অপর্যাপ্ত চাদর
৪৭৮. সা'দ ইবনু ইবরাহীম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে খাবার পরিবেশন করা হলো। তিনি রোজা রেখেছিলেন। তখন তিনি বললেন, "মুসআব ইবনু উমাইর আমার চেয়ে উত্তম। তিনি শাহাদাতবরণ করলে তাঁকে তাঁর পরনের চাদরে কাফন পরানো হলো। চাদরটি দিয়ে মাথা ঢেকে দিলে পা বেরিয়ে যাচ্ছিল, আবার পা ঢেকে দিলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল।” বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি আরও বলেছেন, “হামযাও শাহাদাতবরণ করেছেন। তিনিও আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারপর আমরা দুনিয়ার সব ধরনের প্রাচুর্য পেয়ে গেলাম। (অথবা তিনি বলেন, দুনিয়ার সবকিছুই আমাদের দিয়ে দেওয়া হলো।) আমরা আশঙ্কা করলাম যে, আমাদের সৎকর্মের প্রতিদান হয়তো আগেভাগেই দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।” এ কথা বলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন, খাবার তো খেলেনই না।[৫৪২]

পার্থিব-জীবনেই আখিরাতের সঞ্চয় ফুরিয়ে ফেলার আশঙ্কা
৪৭৯. তারিক ইবনু শিহাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যে সকল সাহাবি জীবিত ছিলেন তাঁরা খাব্বাব রদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে গেলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, হে আবূ আবদুল্লাহ! সুসংবাদ গ্রহণ করুন। শীঘ্রই আপনার (মৃত) ভাইদের সঙ্গে মিলিত হবেন। এ কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। তখন তাঁরা বললেন, তাঁদের অবস্থা আপনার মতোই ছিল। তিনি বললেন, মৃত্যুর ব্যাপারে আমার কোনো ভয়-ভীতি নেই। কিন্তু ব্যাপার হলো, তোমরা আমাকে একদল মানুষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছ এবং আমার যে ভাইদের কথা মনে করিয়ে দিলে, তাঁরা নিশ্চয় তাঁদের কর্মের যথার্থ প্রতিদান সঙ্গে নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয় যে, আমরা আমাদের সৎকর্মের প্রতিদান (আগেভাগেই) পেয়ে গেছি।”[৫৪৩]

সাহাবিগণের সাদাসিধে জীবনযাপন
৪৮০. উমাল মুরাদি থেকে বর্ণিত। আবুল উবাইদাইন রহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবি, আপনারা নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য করবেন না। তা হলে আমাদের জন্য আমল করতে কষ্ট হয়ে যায়।” জবাবে তিনি বললেন, “হে আবুল উবাইদাইন, আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি রহম করুন। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি তো তাঁরাই, যারা তাঁর সাথে নিজেদের পরনের চাদরে সমাহিত হয়েছেন।”[৫৪৪]

সাহাবিগণ মহামারিকে ভয় পেতেন না
৪৮১. মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ইনাবা খাওলানি রদিয়াল্লাহু আনহু[৫৪৫] খাওলান গোত্রের লোকদের সাথে মসিজদে বসে ছিলেন। এ সময় (উমাইয়া খলিফা) আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক মহামারির ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে (ইয়ামান থেকে) বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, তিনি মহামারির ভয়ে পালিয়ে গেছেন। এ কথা শুনে আবূ ইনাবা খাওলানি রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমি জীবিত থাকতে এমন ঘটনা শুনতে হবে তা কখনও ভাবিনি। আমি কি তোমাদের জানাব না, তোমাদের (সাহাবি) ভাইদের স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল? প্রথমত, আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করা তাঁদের কাছে মধুর চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁরা শত্রুকে ভয় পেতেন না, শত্রু সংখ্যায় কম হোক বা বেশি হোক। তৃতীয়ত, তাঁরা দুনিয়াবি প্রয়োজন ও অভাবে ভীত হয়ে পড়তেন না। আল্লাহ তাআলার প্রতি তাঁদের দৃঢ়-বিশ্বাস ছিল যে তিনি তাঁদের রিযক দান করবেন। চতুর্থত, মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটলে তাঁরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন না। আল্লাহ তাআলা তাঁদের ব্যাপারে যে ফয়সালা করতেন সেই ফয়সালাই মেনে নিতেন।”[৫৪৬]

সহযোদ্ধার জন্য মৃত্যুপূর্ব ত্যাগ স্বীকার
৪৮২. আবূ জাহম ইবনু হুজায়ফা বলেন, “আমি ইয়ারমুক যুদ্ধের দিন রণাঙ্গনে বেরোলাম। আমার সঙ্গে ছিল এক মশক পানি এবং একটি পাত্র। খুঁজছিলাম আমার চাচাতো ভাইকে। (মনে মনে) বললাম, যদি তার তৃষ্ণা থাকে তবে পানি পান করাব এবং পানি দিয়ে তার চেহারা মুছে দেব। ভাইকে পেয়ে গেলাম, সে তখন কাতরাচ্ছিল। বললাম, পানি খাবে? সে ইঙ্গিতে বলল, দাও। তখন তার পাশেই একজন লোক 'আহ' বলে কাতরে উঠল। চাচাতো ভাই ইঙ্গিতে বলল, লোকটির কাছে গিয়ে তাকে পানি পান করাও। লোকটি ছিলেন আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাই হিশাম ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু। আমি তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি পানি পান করবেন? তিনি তখন শুনতে পেলেন, আরেকজন লোক 'আহ' বলে কাতরে উঠেছেন। হিশাম আমাকে ইশারায় ওই লোকটির কাছে যেতে বললেন। আমি লোকটির কাছে গেলাম, দেখি তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তৎক্ষণাৎ হিশামের কাছে ফিরে এলাম, দেখি তিনিও মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপর আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে এলাম। দেখি সেও ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।”[৫৪৭]

সম্পদকে পরীক্ষা মনে করা
৪৮৩. আবদুল্লাহ ইবনু আবী বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আবূ তালহা আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু একবার তাঁর এক বাগানে সালাত পড়ছিলেন। তখন একটি ছোটো পাখি উড়তে শুরু করল, (বাগান এত ঘন ছিল যে এ ক্ষুদ্র পাখিটি পথ খুঁজে পাচ্ছিল না) এবং বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এদিক-সেদিক পথ খুঁজতে লাগল। এই দৃশ্য তাঁর খুব ভালো লাগল। ফলে তিনি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর সালাতের প্রতি মনোযোগী হলেন। কিন্তু তখন মনে করতে পারলেন না যে সালাত কত রাকআত পড়েছেন। তিনি বললেন, এই সম্পদ আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে। তারপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানালেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই সম্পদ আল্লাহ তাআলার জন্য উৎসর্গ করছি। আপনি তা যেখানে ইচ্ছা সেখানেই ব্যয় করুন।”[৫৪৮]

সালাতে বিঘ্ন ঘটার কারণে বাগান বিক্রি
৪৮৪. আবদুল্লাহ ইবনু আবী বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “একজন আনসারি লোক খেজুর ফলনের মৌসুমে কুফ এলাকায় অবস্থিত তাঁর বাগানে সালাত পড়ছিলেন। খেজুর গাছগুলো থোকায় থোকায় ফলভারে নুয়ে ছিল। লোকটি সেদিকে তাকালেন এবং বিপুল ফলরাশি দেখে খুবই খুশি হলেন। তারপর আবার সালাত শুরু করলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ভুলে গেছেন তিনি কত রাকআত সালাত পড়েছেন। তখন বললেন, আমার এই সম্পদ আমার জন্য ফিতনায় পরিণত হয়েছে। তিনি উসমান ইবনু আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে ঘটনাটি উল্লেখ করলেন। বললেন, আমার এই বাগান সদাকা করতে চাই। আপনি তা কল্যাণের পথে ব্যয় করে দিন। তিনি উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তাঁর বাগান পঞ্চাশ হাজার দিরহামে বিক্রি করে দিলেন। এ কারণে এই সম্পদের নাম হয়ে ছিল 'খামসিনা' বা 'পঞ্চাশ'।”[৫৪৯]

ফজরের দুই রাকআত সুন্নত ছুটে যাওয়ার কারণে গোলাম আজাদ
৪৮৫. উবাইদুল্লাহ ইবনুল কিবতিয়্যাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু আবী রবীআ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর একবার ফজরের দুই রাকআত (সুন্নত) সালাত ছুটে গেল। তাই তিনি একটি গোলাম আজাদ করে দেন।”[৫৫০]

মাগরিবের সালাত দেরি হওয়ায় দুটি গোলাম আজাদ
৪৮৬. মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান তাঁর দাদা আবূ মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। অথবা, যিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করেছেন তিনি বর্ণনা করেছেন। মাগরিবের সালাত পড়তে সন্ধ্যা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল অথবা তিনি কোনো কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলেন, ফলে দেরি হয়ে গিয়েছিল, এমনকি আকাশে নক্ষত্র দুটিও উদিত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে তিনি সালাত শেষ করে দুটি গোলাম আজাদ করে দিলেন।"[৫৫১]

এক ঢোক পানির বিনিময়ে গোটা দুনিয়া দান
৪৮৭. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “বসরার একজন লোক আমাকে জানিয়েছেন, মুতাররিফ ইবনু শিখখিরের স্ত্রী বা তার কোনো-এক আত্মীয় মৃত্যুবরণ করলেন। তখন তার কিছু বন্ধু বললেন, তোমাদের ভাই মুতাররিফের কাছে আমাদেরকে নিয়ে চলো। শয়তান যেন তাকে নিভৃতে না পায়। পেলে কিন্তু (শয়তান) তার প্রয়োজন পূরণ করে নেবে। (ধোঁকা দেবে ও প্রতারিত করবে।)
তারা মুতাররিফের কাছে এলেন। তিনি সুসজ্জিত ও সুবাসিত হয়ে তাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তারা বললেন, আমরা একটি ব্যাপারে আশঙ্কা করেছি এবং আশা করেছি যে, আল্লাহ তাআলা আপনাকে তা থেকে রক্ষা করবেন। তারা যা বলাবলি করেছেন তা তাঁকে জানালেন। (অর্থাৎ, আত্মীয় মৃত্যুশোকে অস্থির হয়ে হয়তো তিনি কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে বসবেন।) তদের কথা শুনে মুতাররিফ বললেন, আখিরাতে এক ঢোক পানির বিনিময়ে গোটা দুনিয়াও যদি আমাকে দান করে দিতে বলা হয়, তবে তা-ই দেব (সুতরাং আত্মীয়ের মৃত্যুশোক আমার জন্য কঠিন ব্যাপার নয়, আমি ধৈর্যধারণ করব।)”[৫৫২]

জাহান্নামের ভয়ে কান্না
৪৮৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “(পূর্বসূরিরা) যা কিছুর বিনিময়ে জান্নাত চেয়েছেন তা কখনোই তাঁদের কাছে কঠিন মনে হয়নি। জাহান্নামের ভয় তাঁদেরকে কাঁদিয়েছে।”[৫৫৩]

মুমিন বান্দার কিছু বৈশিষ্ট্য
৪৮৯. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “প্রকৃত মুমিন তো সে- ই, যে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ যথার্থভাবে জানে। মুমিন ব্যক্তির কাজকর্ম সবার চেয়ে সুন্দর। সে আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে। পাহাড়সম সম্পদ দান করে দিলেও (তার দান কবুল হলো কি না, তা) চাক্ষুষ না দেখে নিশ্চিন্ত হয় না। তার আত্মশুদ্ধি, সততা ও ইবাদাত যতই বাড়ে, আল্লাহভীতিও তত বাড়ে। সে বলে, আমি তো আখিরাতে মুক্তি পাব না, আমি তো আখিরাতে মুক্তি পাব না। আর যারা মুনাফিক তারা বলে, মানুষ তো কত পাপই করে। আমি এমনিই মাফ পেয়ে যাব। কোনো চিন্তা নেই। তাই মুনাফিকেরা খারাপ কাজ করে আর আশা করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দেবেন।”[৫৫৪]

নির্ধারিত রিযকে সন্তুষ্টিই সচ্ছলতা
৪৯০. আতা ইবনু আবী রাবাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মূসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রতিপালক, আপনার কোন বান্দা সবচেয়ে ন্যায়বিচারক? আল্লাহ তাআলা বললেন, যারা মানুষের জন্য সেভাবেই বিচার করে যেভাবে নিজেদের জন্য বিচার করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আর সবচেয়ে সচ্ছল কারা? আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা রিযক দিয়েছি তাতেই যারা সন্তুষ্ট থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আর সবচেয়ে তাকওয়াবান? আল্লাহ তাআলা বললেন, যাঁরা আমার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানে।”[৫৫৫]

দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয়
৪৯১. খালিদ ইবনু উমাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, “উতবা ইবনু গাযওয়ান রদিয়াল্লাহু আনহু একবার খুতবা দিলেন। প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা প্রকাশ করলেন। তারপর বললেন, দুনিয়া তো ধ্বংস হয়ে যাবার সংবাদ দিয়েছে ও দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। দুনিয়ার (সামান্য) তলানি অবশিষ্ট রয়েছে, যেমন খানা খাওয়ার পর বাসনে তলানি থাকে, যা খাদ্য গ্রহণকারী অল্প অল্প করে খায়। একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে তোমরা অবিনশ্বর জগতের দিকে রওনা করবে। তাই ভবিষ্যতের জন্য কিছু নেকি নিয়ে রওনা করো। কেননা, আমাকে বলা হয়েছে যে, যদি জাহান্নামের প্রান্ত থেকে একটি পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং তা সত্তর বছর পর্যন্ত ক্রমাগত যেতে থাকে, তারপরও তা তার তলদেশে পৌঁছাবে না। আল্লাহর শপথ! জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যাবে। কী? অবাক লাগছে? আমার কাছে এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, জান্নাতের দরজার দুই পাল্লার দূরত্ব হলো চল্লিশ বছর সফরের পথ। অচিরেই এমন-একদিন আসবে যখন তা মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকবে। আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে থাকা সাত ব্যক্তির শেষ-জন। তখন আমাদের কাছে গাছের পাতা ছাড়া আর কোনো খাদ্যই ছিল না। ফলে আমাদের চোয়ালে ঘা হয়ে গেল। এ সময় আমি একটি চাদর পেয়েছিলাম, আমার ও সা'দ ইবনু মালিকের জন্য আমি তা দু- টুকরো করে নিই। এক টুকরো দিয়ে আমি লুঙ্গি বানিয়েছি, আরেক টুকরো দিয়ে লুঙ্গি বানিয়েছে সা'দ ইবনু মালিক। আজ আমরা সকলেই কোনো-না-কোনো নগরের আমীর। তারপর তিনি বললেন, নিজের কাছে বড়ো ও আল্লাহর কাছে ছোটো হওয়া-এমন অবস্থা থেকে আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। নুবুওয়াতের শিক্ষা বিকৃত হয়ে একপর্যায়ে তা রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। আমাদের পরের আমীররা কেমন হবে, তা শিগগিরই যাচাই করতে পারবে। "[৫৫৬]

দুনিয়া হলো ব্যস্ততার আখড়া
৪৯২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ যখন এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন—
فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ
“সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই (দুনিয়াবি জীবন) যেন কিছুতে তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত না করে।”[৫৫৭]
হাসান বসরি বলতেন: কে তা বলেছেন, (জানো)? তিনি নিজেই জবাব দিতেন, যিনি পার্থিব জীবন সৃষ্টি করেছেন এবং দুনিয়া সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন, তিনিই এ কথা বলেছেন। হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, “তোমরা পার্থিব জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকো। দুনিয়া হলো ব্যস্ততার আখড়া। কেউ যখন ব্যস্ততার একটি দরজা খোলে, তা তার জন্য আরও দশটি দরজা খুলে দেয়।”[৫৫৮]

উপকারী গাধা বিক্রি
৪৯৩. উহাইব ইবনু ওয়ারদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা একটি গাধা বিক্রি করে দিলেন। কেউ তাকে বলল, আপনি গাধাটি রেখে দিলে ভালো হতো। তিনি বললেন, গাধাটি আমাদের বেশ উপযোগী ছিল। আর সে আমার অন্তরের একটি অংশ দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু অন্তরকে কোনো বস্তু দিয়ে ব্যস্ত করা আমার পছন্দ নয়।”[৫৫৯]

পুত্রের উদ্দেশে উপদেশ
৪৯৪. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বললেন, “ছেলে আমার, দুনিয়া এক গভীর সমুদ্র। এই সমুদ্রে অসংখ্য মানুষ ডুবে আছে। এখানে তোমার জাহাজ যেন হয় আল্লাহর প্রতি তাকওয়া; জাহাজের মাস্তল যেন হয় আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং জাহাজের পাল যেন হয় আল্লাহর ওপর ভরসা। তা হলেই আশা করা যায় তুমি মুক্তি পাবে। অন্যথায় নয়।”[৫৬০]

ইবাদাতে অগ্রগামী হয়ে আবার দুনিয়াদারদের সঙ্গে মিশে যাওয়া
৪৯৫. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “একজন আবিদ বান্দা আরেকজন লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দুশ্চিন্তায় মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখলেন। আবিদ বললেন, কী ব্যাপার, এভাবে বসে আছেন যে? তিনি বললেন, অমুকের কথা ভেবে অবাক লাগছে। তিনি ইবাদাতের কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তা আপনি জানেন; কিন্তু এখন আবার দুনিয়াদারদের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। তখন আবিদ বান্দা বললেন, যে লোক দুনিয়াদারদের সঙ্গে মিশে গিয়েছে তার ব্যাপারে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বরং যিনি ইবাদাতের ওপর অটল রয়েছেন তার ব্যাপারে বিস্মিত হোন।”[৫৬১]

দুনিয়াটা তেতো
৪৯৬. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলতেন, “(হে দুনিয়া,) তুমি কতই না নিকৃষ্ট! তোমার প্রতিটি কাঠিই আমরা চুষেছি। দেখলাম সবকটাই শেষপ্রান্তে গিয়ে তেতো."

ঐশ্বর্য ও মিতব্যয়ীতা
৪৯৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যাকে প্রাচুর্য দেওয়া হয়েছে, সে-ই প্রতারিত হয়েছে।” তিনি আরও বলেছেন, “মিতব্যয়ীরা কখনও অভাবের শিকার হয় না।”[৫৬২]

দুনিয়ার কল্যাণকর অংশ
৪৯৮. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বলা হতো, দুনিয়ার কল্যাণকর অংশ সেটাই যার দ্বারা তোমরা পরীক্ষার সম্মুখীন হওনি; আর দুনিয়ার যে অংশ দ্বারা তোমরা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছ, তার মধ্যে কল্যাণকর অংশ ওইটাই, যা তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে."

লোভের কারণে আলিমদের পদস্খলন
৪৯৯. সাহল ইবনু হাসসান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الصَّفَا الزَّلَّالَ الَّذِي لَا يَثْبُتُ عَلَيْهِ أَقْدَامُ الْعُلَمَاءِ: الطَّمَعُ
“যে পিচ্ছিল পাথরের ওপর আলিমগণের পা-ও স্থির থাকে না, তা হলো লোভ।"[৫৬৩]

ইলম শিক্ষাদানকারী ও ইলম অর্জনকারী
৫০০. খালিদ ইবনু মা'দান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “দুনিয়া অভিশপ্ত। দুনিয়াতে যা কিছু আছে তা-ও অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর যিকর এবং যা কিছু আল্লাহর যিকরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তা ব্যতীত। ইলম শিক্ষাদানকারী এবং ইলম অর্জনকারী উভয়ই কল্যাণের ক্ষেত্রে সমান। বাকি সব মানুষ অর্থহীন; তাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।”[৫৬৪]

জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত দুনিয়া
৫০১. উবাদা ইবনু সামিত রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কিয়ামাতের দিন দুনিয়াকে উপস্থিত করা হবে, তখন দুনিয়ার যা কিছু আল্লাহর জন্য ছিল তা পৃথক করা হবে; তারপর অবশিষ্ট দুনিয়াকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”[৫৬৫]

দুনিয়ার একটি উপমা
৫০২. উবাই ইবনু কা'ব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মানুষের খাদ্য যেন দুনিয়ার মতো। তাতে মশলা ও লবণ মিশিয়ে সুস্বাদু-সুগন্ধী করা হয়। (অথচ শেষমেশ তা দুর্গন্ধময় মলমূত্রে পরিণত হয়।)”[৫৬৬]

ধনী লোকের তিন বিপদ
৫০৩. সালামা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শয়তান বলে—সম্পদশালী ব্যক্তি আমার কাছ থেকে বাঁচতে পারবে না; তাকে তিনটি অবস্থার যে-কোনো একটির মুখোমুখি হতেই হবে : (১) হয় আমি তার চোখের সামনে সম্পদকে সুশোভিত করে দেখাব, ফলে সে তা যথাযথভাবে (অর্থাৎ আল্লাহর পথে ব্যয়) করবে না; অথবা (২) সম্পদকে আমি তার চোখে তুচ্ছ করে দেখাব, ফলে সে তা অবৈধ পথে খরচ করবে; নতুবা (৩) সম্পদকে আমি তার কাছে প্রিয় করে তুলব, সে অনৈতিক ও অবৈধ উপায়ে তা অর্জন করে।”[৫৬৭]

সম্পদ ও শয়তানের কাছে পরাজয়
৫০৪. সালিম ইবনু আবিল জা'দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, Abdullah ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন : “নিশ্চয় শয়তান মানুষকে প্রতিটি উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে পরাভূত করার চেষ্টা করে; কিন্তু পেরে ওঠে না। কিন্তু সম্পদের ক্ষেত্রে (শয়তান) মানুষের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তার ঘাড় ধরে (নিজের পথে) নিয়ে যায়।”[৫৬৮]

দুনিয়াবি উদ্দেশ্যের কারণে আখিরাতে প্রতিদান মেলে না
৫০৫. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يُعْطِي الدُّنْيَا عَلَى نِيَّةِ الْآخِرَةِ، وَأَبَى أَنْ يُعْطِيَ الْآخِرَةَ عَلَى نِيَّةِ الدُّنْيَا
“আখিরাতমুখী নিয়তের কারণে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া দিয়ে থাকেন; কিন্তু নিয়ত যদি দুনিয়ামুখী হয়, তবে আখিরাতে (কোনো প্রতিদান) দেন না।”[৫৬৯]

দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিই উত্তম
৫০৬. আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “কারও ব্যাপারে যদি হলফ করে বলতে পারো যে, সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুনিয়াবিমুখ, তা হলে আমিও কসম করে বলতে পারি, সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম লোক।”[৫৭০]

দুনিয়া থেকে পালিয়ে বেড়ানো
৫০৭. ইবরাহীম তাইমি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের ও পূর্ববর্তীদের মধ্যে কতই না পার্থক্য! দুনিয়া তাদের হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে, কিন্তু তারা দুনিয়া থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। অথচ তোমাদের থেকে দুনিয়া পিছু হটে যায় আর তোমরা এর পেছনে পেছনে ছোটো।”[৫৭১]

উত্তম পন্থা অবলম্বন
৫০৮. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أُوتِيتُ بِمَفَاتِيحِ الْأَرْضِ، فَوُضِعَتْ فِي يَدَيَّ، فَذَهَبَ نَبِيُّكُمْ بِخَيْرِ مَذْهَبٍ، وَتُرِكْتُمْ فِي الدُّنْيَا تَأْكُلُونَ مِنْ خَبِيصِهَا مِنْ أَصْفَرِهِ، وَأَحْمَرِهِ، وَأَخْضَرِهِ، وَأَبْيَضِهِ، وَإِنَّمَا هِيَ شَيْءٌ وَاحِدٌ، لَوَّثْتُمُوهُ؛ الْتِمَاسَ الشَّهَوَاتِ.
"দুনিয়ার সমস্ত চাবি আমাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো আমার হাতে রাখা হয়েছে। তোমাদের নবি উত্তম পন্থা অবলম্বন করেছেন। তোমরা (দুনিয়ার) মিষ্টান্ন [৫৭২] থেকে হলুদ, লাল, সবুজ ও সাদা-সব রঙেরই খাও। দুনিয়া এমন-একটি বস্তু, কুপ্রবৃত্তির সংস্পর্শে তোমরা যাকে কলঙ্কিত করেছ।”[৫৭৩]

টিকাঃ
[৫০০] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪১১১, হাদীসটি সহীহ। এ কথাই বলেছেন আলবানি।
[৫৩৪] অন্যান্য বর্ণনায় এসেছে, কাফিরকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।
[৫৩৫] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৩২০। আলবানি বলেছেন, হাদীসটির সনদে কোনো সমস্যা নেই। আস- সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস নং ৯৪৩।
[৫৩৬] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৩৭] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/২৩৭, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৩৮] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৩৯] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/২৭; মুসনাদ আহমাদ, ১/৫৫, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত। শেষের অংশটি মারফুরূপে বর্ণিত।
[৫৪০] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, ৭৮৫, হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৪১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৯৯। হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৫৪২] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৯৯, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৪৩] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৭৪, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৪৪] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৪৫] তবে বলা হয়ে থাকে যে, নবিজির যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তবে তাঁকে দেখেননি।
[৫৪৬] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৪৭] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৪৮] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত। তবে এই ঘটনা সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। মালিক, আল-মুআত্তা, হাদীস নং ২২৩; বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস নং ৩৬৮৯।
[৫৪৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২০০। মুতাররিফ থেকে বর্ণিত ঘটনা এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৫৩] আবু নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৩। হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৩। হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৫৫] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৩/২৯৩, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৫৬] হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৫৭] সূরা লুকমান: আয়াত ৩৩।
[৫৫৮] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১৫৩। হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[৫৫ ৯] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৬০] সুফইয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত আসার। আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১০৪।
[৫৬১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১। ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ পর্যন্ত সনদ সহীহ।
[৫৬২] হাদীসটির মাকতুরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৬৩] আলবানি বলেছেন, হাদীসটি দুর্বল, আস-সিলসিলাতুদ দয়িফা, ৩০২৩।
[৫৬৪] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং প্রথম অংশটি হাসান সনদের সঙ্গে মারফুরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৫৬৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসনাদ, ১৩/৩৮২ হাদীসটি মাওকুফ; তবে মারফুরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৫৬৬] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৬৭] মুরসালরূপে বর্ণিত। তাবারানি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৪৫।
[৫৬৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৬৯] হাদীসটি দুর্বল। কিন্তু মর্মগত দিক থেকে হাদীসটি সহীহ। কুরআনে এ হাদীসের সমার্থক আয়াত রয়েছে।
[৫৭০] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৭১] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৪/২১২। হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৭২] খাবিস )خبيص(: খেজুর, মধু ও ঘি দ্বারা প্রস্তুতকৃত মিষ্টান্ন।
[৫৭৩] হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল。

তৃতীয় অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার তুচ্ছতা

দুনিয়ার তুচ্ছতা
৪৭০. ফিহর গোত্রের লোক মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবিকে সাথে নিয়ে (রাস্তার ধারে) পড়ে-থাকা একটি মরা বকরির বাচ্চার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাদের মাঝে আমিও ছিলাম। (তা দেখিয়ে) তিনি বললেন,
أَتَرَوْنَ هَذِهِ هَانَتْ عَلَى أَهْلِهَا حَتَّى أَلْقَوْهَا؟ قَالُوا: مِنْ هَوَانِهَا أَلْقَوْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ : فَالدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ عَلَى أَهْلِهَا
"নিকৃষ্ট বলেই তো এটিকে তার মালিক ফেলে দিয়েছে, তাই না? তাঁরা বললেন : (জি,) হে আল্লাহর রাসূল, নিকৃষ্ট হওয়ার কারণেই এটিকে তার মালিক ফেলে দিয়েছে। তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : এটি তার মালিকের কাছে যতটা তুচ্ছ, আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুনিয়া তার চেয়েও বেশি তুচ্ছ।”[৫০০]

দুনিয়া মশার ডানার সমতুল্যও নয়
৪৭১. উসমান ইবনু উবাইদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, কয়েকজন সাহাবি বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَوْ أَنَّ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ فِي الْخَيْرِ مَا أَعْطَى مِنْهَا الْكَافِرَ شَيْئًا
“এই দুনিয়া যদি আল্লাহ তাআলার কাছে মশার একটি পাখার সমানও মূল্য রাখত তবে তিনি কোনো কাফিরকে কিছুই দিতেন না।”[৫৩৪]-[৫৩৫]

সম্পদ সামনে পেয়েও গ্রহণ না করা
৪৭২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি এমন-এক সম্প্রদায়কে পেয়েছি, যাঁদের সামনে দুনিয়ার যাবতীয় হালাল বস্তু পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা গ্রহণ করেননি। তাঁরা বলেছেন, আল্লাহর কসম, এসব সম্পদ হাতে পেলে কোথায় না কোথায় ব্যয় করে বসব, তা তো জানি না।”[৫৩৬]

সমস্ত দীনার বণ্টন করে দেওয়া
৪৭৩. মালিক আদ-দার বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু চার শ দীনার নিয়ে একটি থলেতে রাখলেন। তারপর একজন গোলামকে বললেন, তুমি এগুলো নিয়ে আবূ উবাইদা-র কাছে যাও। তারপর তার বাড়িতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখো সে কী করে। গোলাম দীনারগুলো নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন আপনাকে এই দীনারগুলো আপনার প্রয়োজনে ব্যয় করতে বলেছেন। আবূ উবাইদা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করুন, রহম করুন। তারপর দাসীকে ডেকে বললেন, এ সাতটি দীনার অমুককে দিয়ে আসো, এ পাঁচটি দীনার অমুককে দিয়ে আসো। এভাবে তিনি সবগুলো দীনার বণ্টন করে দিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে ফিরে এসে গোলাম তাঁকে বিস্তারিত জানাল। গোলাম দেখল, উমর রদিয়াল্লাহু আনহু মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য সমপরিমাণ দীনার একটি থলেতে প্রস্তুত করেছেন। তাকে বললেন, এগুলো মুআয ইবনু জাবালের কাছে নিয়ে যাও। তারপর তার বাড়িতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখো সে কী করে। গোলাম দীনারগুলো নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, আমীরুল মুমিনীন আপনাকে এই দীনারগুলো আপনার প্রয়োজনে ব্যয় করতে বলেছেন। মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করুন, রহম করুন। তারপর দাসীকে ডেকে বললেন, এ দীনারগুলো অমুককে দিয়ে আসো আর এ দীনারগুলো অমুককে দিয়ে আসো এবং এ দীনারগুলো অমুকের বাড়িতে দিয়ে আসো। এ সময় মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী বেরিয়ে এসে বললেন, আল্লাহর কসম, আমরাও তো গরিব। আমাদেরকে কিছু দিন। কিন্তু ততক্ষণে থলিতে মাত্র দুটি দীনার বাকি আছে। তিনি দীনার দুটি স্ত্রীর দিকে ছুড়ে দিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ফিরে এসে গোলাম তাঁকে বিস্তারিত জানাল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু খুব খুশি হলেন এবং বললেন, তারা পরস্পর ভাই, অভিন্ন হৃদয়ের অধিকারী।”[৫৩৭]

স্পষ্টভাষী মিত্র
৪৭৪. মূসা ইবনু আবী ঈসা রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বনি হারিসার পানশালার কাছে এসে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে পেয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, মুহাম্মাদ, আমি মানুষটা কেমন, বলুন তো? মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম, আমি এবং আপনার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আপনাকে যেমন দেখতে চাই, আপনি তেমনই। আপনি (যাকাতের) সম্পদ সংগ্রহে শক্তিমান; কিন্তু নিজে তা থেকে পবিত্র এবং সম্পদ বণ্টনে ন্যায়পরায়ণ। আপনি যদি কোনো দিকে ঝুঁকে পড়েন তবে আমরা আপনাকে সোজা করে ফেলি যেভাবে ধনুকে তির সোজা রাখা হয়। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তাই নাকি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন সম্প্রদায়ের মধ্যে রেখেছেন—যখন আমি বাঁকাপথে ঝুঁকে পড়ি তারা আমাকে সোজা পথে নিয়ে আসে।”[৫৩৮]

মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সফর
৪৭৫. আবায়া ইবনু রিফাআ রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু জানতে পারলেন যে সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস রদিয়াল্লাহু আনহু একটি প্রাসাদের মালিক হয়েছেন এবং এর সামনে একটি ফটকও লাগিয়েছেন।
উমর বললেন, এতে করে ভেতরে আওয়াজ প্রবেশ করবে না। এরপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু সা'দ-এর কাছে কাছে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা-কে পাঠালেন।
উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে চাইলে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাকে পাঠাতেন। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, “সা'দ যে ফটক বানিয়েছে তা জ্বালিয়ে দিয়ে এসো।” তিনি কুফায় গেলেন। এবং ওই ফটকের কাছে গিয়ে আগুন ধরানোর কাঠি বের করে জ্বালিয়ে দিলেন। এক ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাসের কাছে গিয়ে মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার চেহারার বর্ণনা দিলেন। সা'দ রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে চিনতে পেরে তাঁর কাছে এলেন। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমীরুল মুমিনীনের কাছে খবর পৌঁছেছে যে, আপনি বলেছেন, ফটক থাকলে নাকি কোনো আওয়াজ ভেতরে প্রবেশ করবে না। সা'দ রদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর নামে কসম করে বললেন যে তিনি তা বলেননি। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যা-ই হোক, আমাকে যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা-ই করেছি। আর আপনি যা বলেছেন আমি তা আমীরুল মুমিনীনের কাছে পৌঁছে দেব। তিনি তাঁর বাহনে চড়ে রওনা দিলেন। রুম্মা উপত্যকায় পৌঁছে তাঁর প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও ক্ষুধা পেল। আল্লাহ তাআলা সে ব্যাপারে সমধিক অবগত। তিনি একটি ছাগলের পাল দেখতে পেলেন। তাই তাঁর গোলামকে তাঁর পাগড়িটি দিয়ে বললেন, এর বিনিময়ে একটি ছাগল কিনে নিয়ে আসো।
কিছুক্ষণ পর গোলাম একটি ছাগল নিয়ে এল। তিনি তখন সালাত পড়ছিলেন। গোলাম ছাগলটিকে জবাই করতে চাইল। কিন্তু তিনি ইশারায় জবাই করতে নিষেধ করলেন। সালাত শেষ করে বললেন, ছাগলটি নিয়ে যাও, এটির মালিক মুসলিম দাস হলে ছাগলটি ফিরিয়ে দিয়ে পাগড়িটি নিয়ে আসো। আর সে স্বাধীন মানুষ হলে ছাগলটিই নিয়ে এসো। গোলাম ওখানে গিয়ে জানতে পারল ছাগলটির মালিক একজন দাস। ফলে সে ছাগলটি ফিরিয়ে দিয়ে পাগড়িটি নিয়ে এল। এরপর সে বাহনের লাগাম ধরে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকল। যেখানেই সে তৃণ বা সবজি-জাতীয় কিছু পাচ্ছিল তা উপড়ে নিচ্ছিল। (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার খাওয়ার জন্য।) অবেশেষে রাত নেমে এলে তাঁরা একটি গোত্রে পৌঁছলেন। তারা তাঁর জন্য রুটি ও দুধ নিয়ে এল। তারা বলল, আমাদের কাছে এর চেয়ে ভালো কিছু থাকলে আপনার জন্য পরিবেশন করতাম। তিনি বললেন, বিসমিল্লাহ, যে হালাল খাদ্য ক্ষুধা দূর করে তা নিকৃষ্ট খাদ্য থেকে অনেক উত্তম। তিনি মদীনায় পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তারপর পানির চেয়েও দ্রুতবেগে চললেন। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, এত তাড়াতাড়ি চলে এলে! তোমার প্রতি সুধারণা না থাকলে ধরেই নিতাম তুমি আমার আদেশ মানোনি। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা বললেন, আপনি যা নির্দেশ দিয়েছিলেন তা পালন করেছি। কিন্তু (সা'দ) কৈফিয়ত দিয়েছেন এবং আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলেছেন যে তিনি ওই কথাটি বলেননি। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সে কি তোমাকে কিছু দেওয়ার জন্য বলেছে? মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা বললেন, আমার একটি জায়গা পছন্দ হয়েছে, আমাকে ওখান থেকে কিছু দেবেন? উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ইরাকের ভূমি উঁচু আর মদীনার লোকেরা আমার চারপাশে ক্ষুধায়-অনাহারে মারা যাচ্ছে। তাই তোমাকে কোনো জমি দিতে আমার ইতস্তত বোধ হয়। কারণ তা তোমার জন্য হবে সহজ কিন্তু আমার জন্য হবে কঠিন। তুমি কি শোনোনি যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিন তাঁর প্রতিবেশীকে ছাড়া তৃপ্ত হতে পারে না।” অথবা তিনি বলেছেন, “মানুষ তার প্রতিবেশীকে ছাড়া তৃপ্ত হতে পারে না।”[৫৩৯]

সচ্ছলতার দ্বারা পরীক্ষার মুখোমুখি
৪৭৬. ইবরাহীম ইবনু আবদির রহমান রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতকালে প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দরবারে গেলাম। তাঁর খাসকামরায় ঢুকে উপস্থিত লোকদের সালাম দিয়ে বসলাম। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে, যুবক? বললাম, আমি ইবরাহীম ইবনু আবদির রহমান ইবনু আওফ। তিনি একজন লোকের নাম উচ্চারণ করে বললেন, অমুককে আল্লাহর কসম করে বলতে শুনেছি যে, অবশ্যই আমি আল্লাহর রাসূলের সাহাবিগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। করে তাঁদের থেকে একটি প্রতিশ্রুতি নেব, আর কোনো কথাই বলব না। তাই সে উসমান ইবনু আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতকালে মদীনায় যায়। আবদুর রহমান ইবনু আউফ বাদে সকল সাহাবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সে। পরে জানতে পারল যে, তিনি জুরুফে তাঁর একটি জমিনে আছেন। বাহনে চড়ে সেখানে গিয়ে দেখল, তিনি গায়ের চাদর রেখে দিয়ে একটি কোদাল দিয়ে পানির প্রবাহ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। তাকে দেখে তিনি লজ্জা পেয়ে গেলেন। কোদাল ফেলে দিয়ে চাদরটা নিয়ে গায়ে দিলেন। সে সালাম দিয়ে বলল, আপনার কাছে একটি বিষয় জানার জন্য এসেছি। আবদুর রহমান কেন যেন খুব অবাক হলেন। সে জিজ্ঞেস করল, আমাদের কাছে যা এসেছে তার চেয়ে বেশি কিছু কি আপনাদের কাছে এসেছে? আমরা যা জেনেছি তার চেয়ে বেশি কিছু কি আপনারা জেনেছেন? তখন ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমাদের কাছে যা এসেছে আমাদের কাছেও তা-ই এসেছে। আমরা যা জেনেছি তোমরাও তা-ই জেনেছ। সে বলল, তা হলে কী ব্যাপার, আমরা দুনিয়াবিমুখ হচ্ছি আর আপনারা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন; আমরা জিহাদ সহজ মনে করছি আর আপনারা তা কঠিন মনে করছেন! অথচ আপনারা আমাদের পূর্বসূরি, আমাদের চেয়ে উত্তম, এবং আপনারা আল্লাহর রাসূলের সাহাবি। তখন আবদুর রহমান ইবনু আউফ বললেন, তোমাদের কাছে যা এসেছে আমাদের কাছেও তা-ই এসেছে। আমরা যা জেনেছি তোমরাও তা-ই জেনেছ। কিন্তু আমরা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে দুঃখ-দারিদ্র্য-দুর্দশায় আক্রান্ত হয়েছি এবং ধৈর্যধারণ করেছি। তারপর এখন আমরা সচ্ছলতার দ্বারা পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছি; কিন্তু ধৈর্যধারণ করতে পারিনি।”[৫৪০]

বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান
৪৭৭. ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর অর্ধেক সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে দিলেন। তা ছিল চার হাজার দীনার। পরে আবার চল্লিশ হাজার দীনার দান করেন, তারপর আবারও চল্লিশ হাজার দীনার, তারপর তৃতীয়বার আরও চল্লিশ হাজার। এরও পরে আরও পাঁচ শ ঘোড়া-বোঝাই সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেন। এরপর আরও এক হাজার পাঁচ শ বাহন-বোঝাই সম্পদ দান করেন। তাঁর সমস্ত সম্পদ ছিল ব্যবসার মুনাফা।”[৫৪১]

অপর্যাপ্ত চাদর
৪৭৮. সা'দ ইবনু ইবরাহীম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে খাবার পরিবেশন করা হলো। তিনি রোজা রেখেছিলেন। তখন তিনি বললেন, "মুসআব ইবনু উমাইর আমার চেয়ে উত্তম। তিনি শাহাদাতবরণ করলে তাঁকে তাঁর পরনের চাদরে কাফন পরানো হলো। চাদরটি দিয়ে মাথা ঢেকে দিলে পা বেরিয়ে যাচ্ছিল, আবার পা ঢেকে দিলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল।” বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি আরও বলেছেন, “হামযাও শাহাদাতবরণ করেছেন। তিনিও আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারপর আমরা দুনিয়ার সব ধরনের প্রাচুর্য পেয়ে গেলাম। (অথবা তিনি বলেন, দুনিয়ার সবকিছুই আমাদের দিয়ে দেওয়া হলো।) আমরা আশঙ্কা করলাম যে, আমাদের সৎকর্মের প্রতিদান হয়তো আগেভাগেই দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।” এ কথা বলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন, খাবার তো খেলেনই না।[৫৪২]

পার্থিব-জীবনেই আখিরাতের সঞ্চয় ফুরিয়ে ফেলার আশঙ্কা
৪৭৯. তারিক ইবনু শিহাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যে সকল সাহাবি জীবিত ছিলেন তাঁরা খাব্বাব রদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে গেলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, হে আবূ আবদুল্লাহ! সুসংবাদ গ্রহণ করুন। শীঘ্রই আপনার (মৃত) ভাইদের সঙ্গে মিলিত হবেন। এ কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। তখন তাঁরা বললেন, তাঁদের অবস্থা আপনার মতোই ছিল। তিনি বললেন, মৃত্যুর ব্যাপারে আমার কোনো ভয়-ভীতি নেই। কিন্তু ব্যাপার হলো, তোমরা আমাকে একদল মানুষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছ এবং আমার যে ভাইদের কথা মনে করিয়ে দিলে, তাঁরা নিশ্চয় তাঁদের কর্মের যথার্থ প্রতিদান সঙ্গে নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয় যে, আমরা আমাদের সৎকর্মের প্রতিদান (আগেভাগেই) পেয়ে গেছি।”[৫৪৩]

সাহাবিগণের সাদাসিধে জীবনযাপন
৪৮০. উমাল মুরাদি থেকে বর্ণিত। আবুল উবাইদাইন রহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবি, আপনারা নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য করবেন না। তা হলে আমাদের জন্য আমল করতে কষ্ট হয়ে যায়।” জবাবে তিনি বললেন, “হে আবুল উবাইদাইন, আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি রহম করুন। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি তো তাঁরাই, যারা তাঁর সাথে নিজেদের পরনের চাদরে সমাহিত হয়েছেন।”[৫৪৪]

সাহাবিগণ মহামারিকে ভয় পেতেন না
৪৮১. মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ইনাবা খাওলানি রদিয়াল্লাহু আনহু[৫৪৫] খাওলান গোত্রের লোকদের সাথে মসিজদে বসে ছিলেন। এ সময় (উমাইয়া খলিফা) আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক মহামারির ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে (ইয়ামান থেকে) বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, তিনি মহামারির ভয়ে পালিয়ে গেছেন। এ কথা শুনে আবূ ইনাবা খাওলানি রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমি জীবিত থাকতে এমন ঘটনা শুনতে হবে তা কখনও ভাবিনি। আমি কি তোমাদের জানাব না, তোমাদের (সাহাবি) ভাইদের স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল? প্রথমত, আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করা তাঁদের কাছে মধুর চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁরা শত্রুকে ভয় পেতেন না, শত্রু সংখ্যায় কম হোক বা বেশি হোক। তৃতীয়ত, তাঁরা দুনিয়াবি প্রয়োজন ও অভাবে ভীত হয়ে পড়তেন না। আল্লাহ তাআলার প্রতি তাঁদের দৃঢ়-বিশ্বাস ছিল যে তিনি তাঁদের রিযক দান করবেন। চতুর্থত, মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটলে তাঁরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন না। আল্লাহ তাআলা তাঁদের ব্যাপারে যে ফয়সালা করতেন সেই ফয়সালাই মেনে নিতেন।”[৫৪৬]

সহযোদ্ধার জন্য মৃত্যুপূর্ব ত্যাগ স্বীকার
৪৮২. আবূ জাহম ইবনু হুজায়ফা বলেন, “আমি ইয়ারমুক যুদ্ধের দিন রণাঙ্গনে বেরোলাম। আমার সঙ্গে ছিল এক মশক পানি এবং একটি পাত্র। খুঁজছিলাম আমার চাচাতো ভাইকে। (মনে মনে) বললাম, যদি তার তৃষ্ণা থাকে তবে পানি পান করাব এবং পানি দিয়ে তার চেহারা মুছে দেব। ভাইকে পেয়ে গেলাম, সে তখন কাতরাচ্ছিল। বললাম, পানি খাবে? সে ইঙ্গিতে বলল, দাও। তখন তার পাশেই একজন লোক 'আহ' বলে কাতরে উঠল। চাচাতো ভাই ইঙ্গিতে বলল, লোকটির কাছে গিয়ে তাকে পানি পান করাও। লোকটি ছিলেন আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাই হিশাম ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু। আমি তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি পানি পান করবেন? তিনি তখন শুনতে পেলেন, আরেকজন লোক 'আহ' বলে কাতরে উঠেছেন। হিশাম আমাকে ইশারায় ওই লোকটির কাছে যেতে বললেন। আমি লোকটির কাছে গেলাম, দেখি তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তৎক্ষণাৎ হিশামের কাছে ফিরে এলাম, দেখি তিনিও মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপর আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে এলাম। দেখি সেও ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।”[৫৪৭]

সম্পদকে পরীক্ষা মনে করা
৪৮৩. আবদুল্লাহ ইবনু আবী বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আবূ তালহা আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু একবার তাঁর এক বাগানে সালাত পড়ছিলেন। তখন একটি ছোটো পাখি উড়তে শুরু করল, (বাগান এত ঘন ছিল যে এ ক্ষুদ্র পাখিটি পথ খুঁজে পাচ্ছিল না) এবং বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এদিক-সেদিক পথ খুঁজতে লাগল। এই দৃশ্য তাঁর খুব ভালো লাগল। ফলে তিনি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর সালাতের প্রতি মনোযোগী হলেন। কিন্তু তখন মনে করতে পারলেন না যে সালাত কত রাকআত পড়েছেন। তিনি বললেন, এই সম্পদ আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে। তারপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানালেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই সম্পদ আল্লাহ তাআলার জন্য উৎসর্গ করছি। আপনি তা যেখানে ইচ্ছা সেখানেই ব্যয় করুন।”[৫৪৮]

সালাতে বিঘ্ন ঘটার কারণে বাগান বিক্রি
৪৮৪. আবদুল্লাহ ইবনু আবী বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “একজন আনসারি লোক খেজুর ফলনের মৌসুমে কুফ এলাকায় অবস্থিত তাঁর বাগানে সালাত পড়ছিলেন। খেজুর গাছগুলো থোকায় থোকায় ফলভারে নুয়ে ছিল। লোকটি সেদিকে তাকালেন এবং বিপুল ফলরাশি দেখে খুবই খুশি হলেন। তারপর আবার সালাত শুরু করলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ভুলে গেছেন তিনি কত রাকআত সালাত পড়েছেন। তখন বললেন, আমার এই সম্পদ আমার জন্য ফিতনায় পরিণত হয়েছে। তিনি উসমান ইবনু আফফান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে ঘটনাটি উল্লেখ করলেন। বললেন, আমার এই বাগান সদাকা করতে চাই। আপনি তা কল্যাণের পথে ব্যয় করে দিন। তিনি উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তাঁর বাগান পঞ্চাশ হাজার দিরহামে বিক্রি করে দিলেন। এ কারণে এই সম্পদের নাম হয়ে ছিল 'খামসিনা' বা 'পঞ্চাশ'।”[৫৪৯]

ফজরের দুই রাকআত সুন্নত ছুটে যাওয়ার কারণে গোলাম আজাদ
৪৮৫. উবাইদুল্লাহ ইবনুল কিবতিয়্যাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু আবী রবীআ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর একবার ফজরের দুই রাকআত (সুন্নত) সালাত ছুটে গেল। তাই তিনি একটি গোলাম আজাদ করে দেন।”[৫৫০]

মাগরিবের সালাত দেরি হওয়ায় দুটি গোলাম আজাদ
৪৮৬. মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান তাঁর দাদা আবূ মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। অথবা, যিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করেছেন তিনি বর্ণনা করেছেন। মাগরিবের সালাত পড়তে সন্ধ্যা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল অথবা তিনি কোনো কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলেন, ফলে দেরি হয়ে গিয়েছিল, এমনকি আকাশে নক্ষত্র দুটিও উদিত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে তিনি সালাত শেষ করে দুটি গোলাম আজাদ করে দিলেন।"[৫৫১]

এক ঢোক পানির বিনিময়ে গোটা দুনিয়া দান
৪৮৭. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “বসরার একজন লোক আমাকে জানিয়েছেন, মুতাররিফ ইবনু শিখখিরের স্ত্রী বা তার কোনো-এক আত্মীয় মৃত্যুবরণ করলেন। তখন তার কিছু বন্ধু বললেন, তোমাদের ভাই মুতাররিফের কাছে আমাদেরকে নিয়ে চলো। শয়তান যেন তাকে নিভৃতে না পায়। পেলে কিন্তু (শয়তান) তার প্রয়োজন পূরণ করে নেবে। (ধোঁকা দেবে ও প্রতারিত করবে।)
তারা মুতাররিফের কাছে এলেন। তিনি সুসজ্জিত ও সুবাসিত হয়ে তাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তারা বললেন, আমরা একটি ব্যাপারে আশঙ্কা করেছি এবং আশা করেছি যে, আল্লাহ তাআলা আপনাকে তা থেকে রক্ষা করবেন। তারা যা বলাবলি করেছেন তা তাঁকে জানালেন। (অর্থাৎ, আত্মীয় মৃত্যুশোকে অস্থির হয়ে হয়তো তিনি কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে বসবেন।) তদের কথা শুনে মুতাররিফ বললেন, আখিরাতে এক ঢোক পানির বিনিময়ে গোটা দুনিয়াও যদি আমাকে দান করে দিতে বলা হয়, তবে তা-ই দেব (সুতরাং আত্মীয়ের মৃত্যুশোক আমার জন্য কঠিন ব্যাপার নয়, আমি ধৈর্যধারণ করব।)”[৫৫২]

জাহান্নামের ভয়ে কান্না
৪৮৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “(পূর্বসূরিরা) যা কিছুর বিনিময়ে জান্নাত চেয়েছেন তা কখনোই তাঁদের কাছে কঠিন মনে হয়নি। জাহান্নামের ভয় তাঁদেরকে কাঁদিয়েছে।”[৫৫৩]

মুমিন বান্দার কিছু বৈশিষ্ট্য
৪৮৯. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “প্রকৃত মুমিন তো সে- ই, যে আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ যথার্থভাবে জানে। মুমিন ব্যক্তির কাজকর্ম সবার চেয়ে সুন্দর। সে আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে। পাহাড়সম সম্পদ দান করে দিলেও (তার দান কবুল হলো কি না, তা) চাক্ষুষ না দেখে নিশ্চিন্ত হয় না। তার আত্মশুদ্ধি, সততা ও ইবাদাত যতই বাড়ে, আল্লাহভীতিও তত বাড়ে। সে বলে, আমি তো আখিরাতে মুক্তি পাব না, আমি তো আখিরাতে মুক্তি পাব না। আর যারা মুনাফিক তারা বলে, মানুষ তো কত পাপই করে। আমি এমনিই মাফ পেয়ে যাব। কোনো চিন্তা নেই। তাই মুনাফিকেরা খারাপ কাজ করে আর আশা করে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দেবেন।”[৫৫৪]

নির্ধারিত রিযকে সন্তুষ্টিই সচ্ছলতা
৪৯০. আতা ইবনু আবী রাবাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মূসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রতিপালক, আপনার কোন বান্দা সবচেয়ে ন্যায়বিচারক? আল্লাহ তাআলা বললেন, যারা মানুষের জন্য সেভাবেই বিচার করে যেভাবে নিজেদের জন্য বিচার করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আর সবচেয়ে সচ্ছল কারা? আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা রিযক দিয়েছি তাতেই যারা সন্তুষ্ট থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আর সবচেয়ে তাকওয়াবান? আল্লাহ তাআলা বললেন, যাঁরা আমার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানে।”[৫৫৫]

দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয়
৪৯১. খালিদ ইবনু উমাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, “উতবা ইবনু গাযওয়ান রদিয়াল্লাহু আনহু একবার খুতবা দিলেন। প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা প্রকাশ করলেন। তারপর বললেন, দুনিয়া তো ধ্বংস হয়ে যাবার সংবাদ দিয়েছে ও দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। দুনিয়ার (সামান্য) তলানি অবশিষ্ট রয়েছে, যেমন খানা খাওয়ার পর বাসনে তলানি থাকে, যা খাদ্য গ্রহণকারী অল্প অল্প করে খায়। একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে তোমরা অবিনশ্বর জগতের দিকে রওনা করবে। তাই ভবিষ্যতের জন্য কিছু নেকি নিয়ে রওনা করো। কেননা, আমাকে বলা হয়েছে যে, যদি জাহান্নামের প্রান্ত থেকে একটি পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং তা সত্তর বছর পর্যন্ত ক্রমাগত যেতে থাকে, তারপরও তা তার তলদেশে পৌঁছাবে না। আল্লাহর শপথ! জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যাবে। কী? অবাক লাগছে? আমার কাছে এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, জান্নাতের দরজার দুই পাল্লার দূরত্ব হলো চল্লিশ বছর সফরের পথ। অচিরেই এমন-একদিন আসবে যখন তা মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকবে। আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে থাকা সাত ব্যক্তির শেষ-জন। তখন আমাদের কাছে গাছের পাতা ছাড়া আর কোনো খাদ্যই ছিল না। ফলে আমাদের চোয়ালে ঘা হয়ে গেল। এ সময় আমি একটি চাদর পেয়েছিলাম, আমার ও সা'দ ইবনু মালিকের জন্য আমি তা দু- টুকরো করে নিই। এক টুকরো দিয়ে আমি লুঙ্গি বানিয়েছি, আরেক টুকরো দিয়ে লুঙ্গি বানিয়েছে সা'দ ইবনু মালিক। আজ আমরা সকলেই কোনো-না-কোনো নগরের আমীর। তারপর তিনি বললেন, নিজের কাছে বড়ো ও আল্লাহর কাছে ছোটো হওয়া-এমন অবস্থা থেকে আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। নুবুওয়াতের শিক্ষা বিকৃত হয়ে একপর্যায়ে তা রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। আমাদের পরের আমীররা কেমন হবে, তা শিগগিরই যাচাই করতে পারবে। "[৫৫৬]

দুনিয়া হলো ব্যস্ততার আখড়া
৪৯২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ যখন এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন—
فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ
“সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই (দুনিয়াবি জীবন) যেন কিছুতে তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত না করে।”[৫৫৭]
হাসান বসরি বলতেন: কে তা বলেছেন, (জানো)? তিনি নিজেই জবাব দিতেন, যিনি পার্থিব জীবন সৃষ্টি করেছেন এবং দুনিয়া সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন, তিনিই এ কথা বলেছেন। হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, “তোমরা পার্থিব জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকো। দুনিয়া হলো ব্যস্ততার আখড়া। কেউ যখন ব্যস্ততার একটি দরজা খোলে, তা তার জন্য আরও দশটি দরজা খুলে দেয়।”[৫৫৮]

উপকারী গাধা বিক্রি
৪৯৩. উহাইব ইবনু ওয়ারদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা একটি গাধা বিক্রি করে দিলেন। কেউ তাকে বলল, আপনি গাধাটি রেখে দিলে ভালো হতো। তিনি বললেন, গাধাটি আমাদের বেশ উপযোগী ছিল। আর সে আমার অন্তরের একটি অংশ দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু অন্তরকে কোনো বস্তু দিয়ে ব্যস্ত করা আমার পছন্দ নয়।”[৫৫৯]

পুত্রের উদ্দেশে উপদেশ
৪৯৪. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বললেন, “ছেলে আমার, দুনিয়া এক গভীর সমুদ্র। এই সমুদ্রে অসংখ্য মানুষ ডুবে আছে। এখানে তোমার জাহাজ যেন হয় আল্লাহর প্রতি তাকওয়া; জাহাজের মাস্তল যেন হয় আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং জাহাজের পাল যেন হয় আল্লাহর ওপর ভরসা। তা হলেই আশা করা যায় তুমি মুক্তি পাবে। অন্যথায় নয়।”[৫৬০]

ইবাদাতে অগ্রগামী হয়ে আবার দুনিয়াদারদের সঙ্গে মিশে যাওয়া
৪৯৫. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “একজন আবিদ বান্দা আরেকজন লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দুশ্চিন্তায় মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখলেন। আবিদ বললেন, কী ব্যাপার, এভাবে বসে আছেন যে? তিনি বললেন, অমুকের কথা ভেবে অবাক লাগছে। তিনি ইবাদাতের কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তা আপনি জানেন; কিন্তু এখন আবার দুনিয়াদারদের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। তখন আবিদ বান্দা বললেন, যে লোক দুনিয়াদারদের সঙ্গে মিশে গিয়েছে তার ব্যাপারে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বরং যিনি ইবাদাতের ওপর অটল রয়েছেন তার ব্যাপারে বিস্মিত হোন।”[৫৬১]

দুনিয়াটা তেতো
৪৯৬. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলতেন, “(হে দুনিয়া,) তুমি কতই না নিকৃষ্ট! তোমার প্রতিটি কাঠিই আমরা চুষেছি। দেখলাম সবকটাই শেষপ্রান্তে গিয়ে তেতো."

ঐশ্বর্য ও মিতব্যয়ীতা
৪৯৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যাকে প্রাচুর্য দেওয়া হয়েছে, সে-ই প্রতারিত হয়েছে।” তিনি আরও বলেছেন, “মিতব্যয়ীরা কখনও অভাবের শিকার হয় না।”[৫৬২]

দুনিয়ার কল্যাণকর অংশ
৪৯৮. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বলা হতো, দুনিয়ার কল্যাণকর অংশ সেটাই যার দ্বারা তোমরা পরীক্ষার সম্মুখীন হওনি; আর দুনিয়ার যে অংশ দ্বারা তোমরা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছ, তার মধ্যে কল্যাণকর অংশ ওইটাই, যা তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে."

লোভের কারণে আলিমদের পদস্খলন
৪৯৯. সাহল ইবনু হাসসান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الصَّفَا الزَّلَّالَ الَّذِي لَا يَثْبُتُ عَلَيْهِ أَقْدَامُ الْعُلَمَاءِ: الطَّمَعُ
“যে পিচ্ছিল পাথরের ওপর আলিমগণের পা-ও স্থির থাকে না, তা হলো লোভ।"[৫৬৩]

ইলম শিক্ষাদানকারী ও ইলম অর্জনকারী
৫০০. খালিদ ইবনু মা'দান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “দুনিয়া অভিশপ্ত। দুনিয়াতে যা কিছু আছে তা-ও অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর যিকর এবং যা কিছু আল্লাহর যিকরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তা ব্যতীত। ইলম শিক্ষাদানকারী এবং ইলম অর্জনকারী উভয়ই কল্যাণের ক্ষেত্রে সমান। বাকি সব মানুষ অর্থহীন; তাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।”[৫৬৪]

জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত দুনিয়া
৫০১. উবাদা ইবনু সামিত রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কিয়ামাতের দিন দুনিয়াকে উপস্থিত করা হবে, তখন দুনিয়ার যা কিছু আল্লাহর জন্য ছিল তা পৃথক করা হবে; তারপর অবশিষ্ট দুনিয়াকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”[৫৬৫]

দুনিয়ার একটি উপমা
৫০২. উবাই ইবনু কা'ব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মানুষের খাদ্য যেন দুনিয়ার মতো। তাতে মশলা ও লবণ মিশিয়ে সুস্বাদু-সুগন্ধী করা হয়। (অথচ শেষমেশ তা দুর্গন্ধময় মলমূত্রে পরিণত হয়।)”[৫৬৬]

ধনী লোকের তিন বিপদ
৫০৩. সালামা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শয়তান বলে—সম্পদশালী ব্যক্তি আমার কাছ থেকে বাঁচতে পারবে না; তাকে তিনটি অবস্থার যে-কোনো একটির মুখোমুখি হতেই হবে : (১) হয় আমি তার চোখের সামনে সম্পদকে সুশোভিত করে দেখাব, ফলে সে তা যথাযথভাবে (অর্থাৎ আল্লাহর পথে ব্যয়) করবে না; অথবা (২) সম্পদকে আমি তার চোখে তুচ্ছ করে দেখাব, ফলে সে তা অবৈধ পথে খরচ করবে; নতুবা (৩) সম্পদকে আমি তার কাছে প্রিয় করে তুলব, সে অনৈতিক ও অবৈধ উপায়ে তা অর্জন করে।”[৫৬৭]

সম্পদ ও শয়তানের কাছে পরাজয়
৫০৪. সালিম ইবনু আবিল জা'দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, Abdullah ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন : “নিশ্চয় শয়তান মানুষকে প্রতিটি উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে পরাভূত করার চেষ্টা করে; কিন্তু পেরে ওঠে না। কিন্তু সম্পদের ক্ষেত্রে (শয়তান) মানুষের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তার ঘাড় ধরে (নিজের পথে) নিয়ে যায়।”[৫৬৮]

দুনিয়াবি উদ্দেশ্যের কারণে আখিরাতে প্রতিদান মেলে না
৫০৫. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يُعْطِي الدُّنْيَا عَلَى نِيَّةِ الْآخِرَةِ، وَأَبَى أَنْ يُعْطِيَ الْآخِرَةَ عَلَى نِيَّةِ الدُّنْيَا
“আখিরাতমুখী নিয়তের কারণে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া দিয়ে থাকেন; কিন্তু নিয়ত যদি দুনিয়ামুখী হয়, তবে আখিরাতে (কোনো প্রতিদান) দেন না।”[৫৬৯]

দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিই উত্তম
৫০৬. আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “কারও ব্যাপারে যদি হলফ করে বলতে পারো যে, সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুনিয়াবিমুখ, তা হলে আমিও কসম করে বলতে পারি, সে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম লোক।”[৫৭০]

দুনিয়া থেকে পালিয়ে বেড়ানো
৫০৭. ইবরাহীম তাইমি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের ও পূর্ববর্তীদের মধ্যে কতই না পার্থক্য! দুনিয়া তাদের হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে, কিন্তু তারা দুনিয়া থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। অথচ তোমাদের থেকে দুনিয়া পিছু হটে যায় আর তোমরা এর পেছনে পেছনে ছোটো।”[৫৭১]

উত্তম পন্থা অবলম্বন
৫০৮. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أُوتِيتُ بِمَفَاتِيحِ الْأَرْضِ، فَوُضِعَتْ فِي يَدَيَّ، فَذَهَبَ نَبِيُّكُمْ بِخَيْرِ مَذْهَبٍ، وَتُرِكْتُمْ فِي الدُّنْيَا تَأْكُلُونَ مِنْ خَبِيصِهَا مِنْ أَصْفَرِهِ، وَأَحْمَرِهِ، وَأَخْضَرِهِ، وَأَبْيَضِهِ، وَإِنَّمَا هِيَ شَيْءٌ وَاحِدٌ، لَوَّثْتُمُوهُ؛ الْتِمَاسَ الشَّهَوَاتِ.
"দুনিয়ার সমস্ত চাবি আমাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো আমার হাতে রাখা হয়েছে। তোমাদের নবি উত্তম পন্থা অবলম্বন করেছেন। তোমরা (দুনিয়ার) মিষ্টান্ন [৫৭২] থেকে হলুদ, লাল, সবুজ ও সাদা-সব রঙেরই খাও। দুনিয়া এমন-একটি বস্তু, কুপ্রবৃত্তির সংস্পর্শে তোমরা যাকে কলঙ্কিত করেছ।”[৫৭৩]

টিকাঃ
[৫০০] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪১১১, হাদীসটি সহীহ। এ কথাই বলেছেন আলবানি।
[৫৩৪] অন্যান্য বর্ণনায় এসেছে, কাফিরকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।
[৫৩৫] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৩২০। আলবানি বলেছেন, হাদীসটির সনদে কোনো সমস্যা নেই। আস- সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস নং ৯৪৩।
[৫৩৬] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৩৭] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/২৩৭, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৩৮] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৩৯] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/২৭; মুসনাদ আহমাদ, ১/৫৫, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত। শেষের অংশটি মারফুরূপে বর্ণিত।
[৫৪০] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, ৭৮৫, হাদীসটির সনদ হাসান এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৪১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৯৯। হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৫৪২] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৯৯, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৪৩] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৭৪, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৪৪] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৪৫] তবে বলা হয়ে থাকে যে, নবিজির যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তবে তাঁকে দেখেননি।
[৫৪৬] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৪৭] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৪৮] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত। তবে এই ঘটনা সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। মালিক, আল-মুআত্তা, হাদীস নং ২২৩; বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস নং ৩৬৮৯।
[৫৪৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২০০। মুতাররিফ থেকে বর্ণিত ঘটনা এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৫৩] আবু নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৩। হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৫৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৩। হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৫৫] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৩/২৯৩, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৫৬] হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৫৭] সূরা লুকমান: আয়াত ৩৩।
[৫৫৮] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১৫৩। হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[৫৫ ৯] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৬০] সুফইয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত আসার। আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১০৪।
[৫৬১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৫১। ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ পর্যন্ত সনদ সহীহ।
[৫৬২] হাদীসটির মাকতুরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৫৬৩] আলবানি বলেছেন, হাদীসটি দুর্বল, আস-সিলসিলাতুদ দয়িফা, ৩০২৩।
[৫৬৪] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং প্রথম অংশটি হাসান সনদের সঙ্গে মারফুরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৫৬৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসনাদ, ১৩/৩৮২ হাদীসটি মাওকুফ; তবে মারফুরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৫৬৬] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৬৭] মুরসালরূপে বর্ণিত। তাবারানি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৪৫।
[৫৬৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৬৯] হাদীসটি দুর্বল। কিন্তু মর্মগত দিক থেকে হাদীসটি সহীহ। কুরআনে এ হাদীসের সমার্থক আয়াত রয়েছে।
[৫৭০] হাদীসটির সনদ দঈফ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৭১] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৪/২১২। হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৭২] খাবিস )خبيص(: খেজুর, মধু ও ঘি দ্বারা প্রস্তুতকৃত মিষ্টান্ন।
[৫৭৩] হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল。

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 কম সম্পদ, কম হিসাব

📄 কম সম্পদ, কম হিসাব


চতুর্থ অনুচ্ছেদ
কম সম্পদ, কম হিসাব

অল্পে তুষ্টির কল্যাণ
৫০৯. ফুদালা ইবনু উবাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
طُوبَى لِمَنْ هُدِى لِلْإِسْلَامِ، وَكَانَ عَيْشُهُ كَفَافًا، وَقَنَعَ
“যে ইসলামের হিদায়াত পেয়েছে, যার জীবনজীবিকা পরিমিত এবং যে অল্পে সন্তুষ্ট, তার জন্যে সুসংবাদ।”[৫৭৪]

একটি আয়াতের প্রেক্ষাপট
৫১০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ
“আল্লাহ তাআলা তাঁর (সকল) বান্দাদেরকে জীবনোপকরণের প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত।”[৫৭৫]
আবূ হানি খাওলানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমর ইবনু হুরাইস ও অন্য একজনকে বলতে শুনেছি: এই আয়াতটি আসহাবুস সুফফার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। কারণ তাঁরা একবার বলেছিলেন, "ইশ! আমাদের যদি দুনিয়ার প্রাচুর্য থাকত!" এভাবে দুনিয়া আকাঙ্ক্ষা করার কারণে এ আয়াত নাযিল হয়।[৫৭৬]

বেশি সম্পদের হিসাব কঠিন
৫১১. আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এক দিরহামের মালিকের চেয়ে দুই দিরহামের মালিককে কঠিন হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে।” (যার সম্পদ যত বেশি তার হিসাব তত কঠিন।)[৫৭৭]

কিয়ামাতের দিন দুই ধরনের বান্দার ঘটনা
৫১২. দামরাতা ইবনু হাবীব, মুহাসির ইবনু হাবীব ও হাকীম ইবনু উমাইর রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَبْعَثُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِهِ كَانَا عَلَى سِيرَةٍ وَاحِدَةٍ، أَحَدُهُمَا مَقْتُورُ عَلَيْهِ، وَالْآخَرُ مُوَسَّعُ عَلَيْهِ، فَيُقْبِلُ الْمَقْتُورُ فِي الْجَنَّةِ، لَا يَنْثَنِي عَنْهَا حَينَ يَنْتَهِي إِلَى أَبْوَابِهَا، فَيَقُولُ لَهُ حَجَبَتُهَا إِلَيْكَ، فَيَقُولُ: إِذًا لَا أَرْجِعُ، وَإِنَّ سَيْفَهُ فِي عُنُقِهِ، فَيَقُولُ: إِنِّي أُعْطِيتُ هَذَا السَّيْفَ فِي الدُّنْيَا أُجَاهِدُ بِهِ، فَلَمْ أَزَلْ مُجَاهِدًا بِهِ حَتَّى قُبِضْتُ وَأَنَا عَلَى ذَلِكَ، فَيَرْمِي بِسَيْفِهِ إِلَى الْخَزَنَةِ، وَيَنْطَلِقُ لَا يُثْنُونَهُ، وَلَا يَحْبِسُونَهُ عَنِ الْجَنَّةِ، فَيَدْخُلُهَا، فَيَمْكُثُ فِيهَا دَهْرًا، قَالَ: ثُمَّ يَمُرُّ بِهِ أَخُوهُ الْمُوَسَّعُ عَلَيْهِ فَيَقُولُ لَهُ: يَا فُلَانُ، مَا حَبَسَكَ؟ فَيَقُولُ: مَا خُلِيَ سَبِيلِي إِلَّا الْآنَ، وَلَقَدْ حُبِسْتُ مَا لَوْ أَنَّ ثَلَاثَ مِائَةِ بَعِيرٍ أَكَلَتْ حَمْضًا، لَا يَرِدْنَ الْمَاءَ إِلَّا خِمْسًا، وَرَدْنَ عَلَى عَرَقِي لَصَدَرْنَ مِنْهُ رِيًّا.
“আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন তাঁর দুই বান্দাকে ওঠাবেন যাদের স্বভাব- চরিত্র ছিল একই রকম; কিন্তু তাদের একজন ছিল অভাবগ্রস্ত, আরেকজন ধনাঢ্য। অভাবগ্রস্ত লোকটি এগিয়ে যেতে যেতে জান্নাতের দরজার কাছে পৌঁছে যাবে। তখন জান্নাতের পাহারাদার তাকে বলবে, দূর হও! দূর হও! সে বলবে, এখানে যখন এসেই পড়েছি আমি আর ফেরত যাব না। ওই সময় তার তরবারিটি তার কাঁধের ওপর থাকবে। সে বলবে, দুনিয়াতে আমাকে এই তরবারি দেওয়া হয়েছিল; আমি এটা দিয়ে জিহাদ করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছি। এ কথা বলে সে সামনে এগোবে; ফেরেশেতারা তার প্রশংসাও করবে না এবং তাকে জান্নাত থেকে বাধাও দেবে না। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতে সে বহুকাল অবস্থান করবে। তারপর একদিন দেখা যাবে, তার ওই সচ্ছল ভাইটি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। সে তাকে জিজ্ঞেস করবে, অমুক, কে তোমাকে এতদিন জান্নাতে আসতে বাধা দিল? সে বলল, এইমাত্র আমার জন্য জান্নাতের পথ খুলে দেওয়া হলো। আমি এমনভাবে আটক ছিলাম যে, তিন শ উট যদি টক খাদ্য খাওয়ার পর পাঁচদিন পানি পান না করে আমার ঘামের মধ্যে নামত (এবং ঘাম পান করত) তা হলে সব কটি উটের পিপাসা মিটে যেত।”[৫৭৮]

দুর্বল ঈমানের আশঙ্কা
৫১৩. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا أَتَخَوَّفُ عَلَى أُمَّتِي ضَعْفَ الْيَقِينِ
“আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে দুর্বল ঈমানের আশঙ্কা করি।”[৫৭৯]

ঈমান ও সুস্থতার শ্রেষ্ঠত্ব
৫১৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِلَّا إِنَّ النَّاسَ لَمْ يُؤْتَوْا فِي الدُّنْيَا شَيْئًا خَيْرًا مِنَ الْيَقِينِ، وَالْعَافِيَةِ، فَسَلُوهُمَا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ .
“দুনিয়াতে মানুষকে দৃঢ়-ঈমান ও সুস্থতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো নিয়ামাত দেওয়া হয়নি। তাই তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুটি জিনিস চাও।”

আল্লাহর ওপর সত্যিকার অর্থে নির্ভর করা
৫১৫. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُلِهِ؛ لَرَزَقَكُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ، تَغْدُو خِمَاصًا، وَتَرُوحُ بِطَانًا
“তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সত্যিকার অর্থে তাওয়াক্কুল করতে, তা হলে তিনি তোমাদের সেভাবেই রিযক দান করতেন যেভাবে পাখিদেরকে রিযক দান করা হয়। পাখিরা ভোরে খালি পেটে বেরিয়ে যায়, আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।”[৫৮০]

টিকাঃ
[৫৭৪] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৩৪৯, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৭৫] সূরা শুরা: আয়াত ২৭।
[৫৭৬] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৫/১৯১। মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫৭৭] ইবনে আবি শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৪২, হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৭৮] হাদীসটি দুর্বল। হাইসামি অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৬৩।
[৫৭৯] হাদীসটি দুর্বল। হাইসামি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে হাদীসটি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/১০৭। তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ৮৮৬৯। তাঁর বর্ণিত সনদের রাবীগণ বিশ্বস্ত (সিকাহ)।
[৫৮০] তিরমিযি, ৩৬২৯, হাদীসটির সনদ সহীহ।

চতুর্থ অনুচ্ছেদ
কম সম্পদ, কম হিসাব

অল্পে তুষ্টির কল্যাণ
৫০৯. ফুদালা ইবনু উবাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
طُوبَى لِمَنْ هُدِى لِلْإِسْلَامِ، وَكَانَ عَيْشُهُ كَفَافًا، وَقَنَعَ
“যে ইসলামের হিদায়াত পেয়েছে, যার জীবনজীবিকা পরিমিত এবং যে অল্পে সন্তুষ্ট, তার জন্যে সুসংবাদ।”[৫৭৪]

একটি আয়াতের প্রেক্ষাপট
৫১০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ
“আল্লাহ তাআলা তাঁর (সকল) বান্দাদেরকে জীবনোপকরণের প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত।”[৫৭৫]
আবূ হানি খাওলানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আমর ইবনু হুরাইস ও অন্য একজনকে বলতে শুনেছি: এই আয়াতটি আসহাবুস সুফফার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। কারণ তাঁরা একবার বলেছিলেন, "ইশ! আমাদের যদি দুনিয়ার প্রাচুর্য থাকত!" এভাবে দুনিয়া আকাঙ্ক্ষা করার কারণে এ আয়াত নাযিল হয়।[৫৭৬]

বেশি সম্পদের হিসাব কঠিন
৫১১. আবু যর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এক দিরহামের মালিকের চেয়ে দুই দিরহামের মালিককে কঠিন হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে।” (যার সম্পদ যত বেশি তার হিসাব তত কঠিন।)[৫৭৭]

কিয়ামাতের দিন দুই ধরনের বান্দার ঘটনা
৫১২. দামরাতা ইবনু হাবীব, মুহাসির ইবনু হাবীব ও হাকীম ইবনু উমাইর রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَبْعَثُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِهِ كَانَا عَلَى سِيرَةٍ وَاحِدَةٍ، أَحَدُهُمَا مَقْتُورُ عَلَيْهِ، وَالْآخَرُ مُوَسَّعُ عَلَيْهِ، فَيُقْبِلُ الْمَقْتُورُ فِي الْجَنَّةِ، لَا يَنْثَنِي عَنْهَا حَينَ يَنْتَهِي إِلَى أَبْوَابِهَا، فَيَقُولُ لَهُ حَجَبَتُهَا إِلَيْكَ، فَيَقُولُ: إِذًا لَا أَرْجِعُ، وَإِنَّ سَيْفَهُ فِي عُنُقِهِ، فَيَقُولُ: إِنِّي أُعْطِيتُ هَذَا السَّيْفَ فِي الدُّنْيَا أُجَاهِدُ بِهِ، فَلَمْ أَزَلْ مُجَاهِدًا بِهِ حَتَّى قُبِضْتُ وَأَنَا عَلَى ذَلِكَ، فَيَرْمِي بِسَيْفِهِ إِلَى الْخَزَنَةِ، وَيَنْطَلِقُ لَا يُثْنُونَهُ، وَلَا يَحْبِسُونَهُ عَنِ الْجَنَّةِ، فَيَدْخُلُهَا، فَيَمْكُثُ فِيهَا دَهْرًا، قَالَ: ثُمَّ يَمُرُّ بِهِ أَخُوهُ الْمُوَسَّعُ عَلَيْهِ فَيَقُولُ لَهُ: يَا فُلَانُ، مَا حَبَسَكَ؟ فَيَقُولُ: مَا خُلِيَ سَبِيلِي إِلَّا الْآنَ، وَلَقَدْ حُبِسْتُ مَا لَوْ أَنَّ ثَلَاثَ مِائَةِ بَعِيرٍ أَكَلَتْ حَمْضًا، لَا يَرِدْنَ الْمَاءَ إِلَّا خِمْسًا، وَرَدْنَ عَلَى عَرَقِي لَصَدَرْنَ مِنْهُ رِيًّا.
“আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন তাঁর দুই বান্দাকে ওঠাবেন যাদের স্বভাব- চরিত্র ছিল একই রকম; কিন্তু তাদের একজন ছিল অভাবগ্রস্ত, আরেকজন ধনাঢ্য। অভাবগ্রস্ত লোকটি এগিয়ে যেতে যেতে জান্নাতের দরজার কাছে পৌঁছে যাবে। তখন জান্নাতের পাহারাদার তাকে বলবে, দূর হও! দূর হও! সে বলবে, এখানে যখন এসেই পড়েছি আমি আর ফেরত যাব না। ওই সময় তার তরবারিটি তার কাঁধের ওপর থাকবে। সে বলবে, দুনিয়াতে আমাকে এই তরবারি দেওয়া হয়েছিল; আমি এটা দিয়ে জিহাদ করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছি। এ কথা বলে সে সামনে এগোবে; ফেরেশেতারা তার প্রশংসাও করবে না এবং তাকে জান্নাত থেকে বাধাও দেবে না। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতে সে বহুকাল অবস্থান করবে। তারপর একদিন দেখা যাবে, তার ওই সচ্ছল ভাইটি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। সে তাকে জিজ্ঞেস করবে, অমুক, কে তোমাকে এতদিন জান্নাতে আসতে বাধা দিল? সে বলল, এইমাত্র আমার জন্য জান্নাতের পথ খুলে দেওয়া হলো। আমি এমনভাবে আটক ছিলাম যে, তিন শ উট যদি টক খাদ্য খাওয়ার পর পাঁচদিন পানি পান না করে আমার ঘামের মধ্যে নামত (এবং ঘাম পান করত) তা হলে সব কটি উটের পিপাসা মিটে যেত।”[৫৭৮]

দুর্বল ঈমানের আশঙ্কা
৫১৩. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا أَتَخَوَّفُ عَلَى أُمَّتِي ضَعْفَ الْيَقِينِ
“আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে দুর্বল ঈমানের আশঙ্কা করি।”[৫৭৯]

ঈমান ও সুস্থতার শ্রেষ্ঠত্ব
৫১৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِلَّا إِنَّ النَّاسَ لَمْ يُؤْتَوْا فِي الدُّنْيَا شَيْئًا خَيْرًا مِنَ الْيَقِينِ، وَالْعَافِيَةِ، فَسَلُوهُمَا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ .
“দুনিয়াতে মানুষকে দৃঢ়-ঈমান ও সুস্থতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো নিয়ামাত দেওয়া হয়নি। তাই তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুটি জিনিস চাও।”

আল্লাহর ওপর সত্যিকার অর্থে নির্ভর করা
৫১৫. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُلِهِ؛ لَرَزَقَكُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ، تَغْدُو خِمَاصًا، وَتَرُوحُ بِطَانًا
“তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সত্যিকার অর্থে তাওয়াক্কুল করতে, তা হলে তিনি তোমাদের সেভাবেই রিযক দান করতেন যেভাবে পাখিদেরকে রিযক দান করা হয়। পাখিরা ভোরে খালি পেটে বেরিয়ে যায়, আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।”[৫৮০]

টিকাঃ
[৫৭৪] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৩৪৯, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৫৭৫] সূরা শুরা: আয়াত ২৭।
[৫৭৬] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৫/১৯১। মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫৭৭] ইবনে আবি শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৪২, হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫৭৮] হাদীসটি দুর্বল। হাইসামি অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৬৩।
[৫৭৯] হাদীসটি দুর্বল। হাইসামি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে হাদীসটি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/১০৭। তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ৮৮৬৯। তাঁর বর্ণিত সনদের রাবীগণ বিশ্বস্ত (সিকাহ)।
[৫৮০] তিরমিযি, ৩৬২৯, হাদীসটির সনদ সহীহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00