📄 চতুর্থ অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায়
প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার হাকীকত
প্রশাসকের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
৪৬২. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নুমান ইবনু মুকরিন রদিয়াল্লাহু আনহু-কে কাসকারে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। কিছুদিন পর তিনি উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আল্লাহ তাআলার কসম দিয়ে চিঠি পাঠালেন, যেন তাঁকে কাসকার [৫২৪] থেকে সরিয়ে নিয়ে কোনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিহাদে পাঠানো হয়। তিনি লেখেন, 'কাসকারের অবস্থা হলো রূপসি নারীর মতো, প্রতিদিন তা নতুন করে সাজগোজ করে আমার সামনে আসে।' ফলে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কাসকার থেকে সরিয়ে নেন এবং নাহাওয়ান্দে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন।”[৫২৫]
দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতে আগ্রহ
৪৬৩. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজ তোমরা ইবাদাতে সাহাবিদের থেকেও অনেক বেশি পরিশ্রম করো, অনেক দীর্ঘ সালাত আদায় করো, কিন্তু তবুও তারা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।” জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “তাঁরা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ ছিলেন এবং আখিরাতের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন।”[৫২৬]
দুনিয়া উপার্জনের কুফল
৪৬৪. মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন এবং বদর-যুদ্ধে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বাহরাইনে জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠালেন। তিনি বাহরাইন থেকে জিযিয়ার মাল-সম্পদ নিয়ে ফিরে এলেন। আনসারগণ আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আগমনের সংবাদ শুনতে পেলেন। ফলে তাঁরা সবাই ফজরের সালাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন, তখন সবাই তাঁর সামনে সমবেত হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দেখে হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, তোমরা শুনেছ যে আবূ উবাইদা কিছু নিয়ে ফিরেছেন। তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন,
فَأَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِي أَخْشَى أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ
“তবে তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তোমাদের যা আনন্দিত করবে তার আশা রাখো। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। কিন্তু আশঙ্কা করি যে, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রসারিত হয়ে যাবে যেভাবে পূর্ববর্তীদের জন্য প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর ঠিক তাদেরই মতো করেই তোমরা দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। ফলে দুনিয়া তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, ঠিক যেভাবে তাদেরকে ধ্বংস করেছিল।”[৫২৭]
কারও কাছে কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা
৪৬৫. উরওয়া ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বর্ণনা করেন, হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আমি আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। তারপর আবারও চাইলাম, এবারও দিলেন। তারপর বললেন,
يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
“হাকীম, এই সম্পদ শ্যামল ও সুস্বাদু। অন্তরের সচ্ছলতার সঙ্গে (লোভ-লালসা ছাড়া) যে তা গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে। আর যে অন্তরে লোভ-লালসাসহ গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে না। সে যেন এমন ব্যক্তির মতো যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।"
হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার কসম, আপনার পর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত (সম্পদ চেয়ে) আমি কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করব না।”
পরবর্তী সময়ে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু-কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন; তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। তারপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলেও একই ঘটনা ঘটে। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ওহে মুসলিমগণ, তোমরা হাকীম ইবনু হিযামের ব্যাপারে সাক্ষী থেকো। আমি এই গনীমাতের মাল থেকে তার কাছে তার অংশ পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর হাকীম রদিয়াল্লাহু আনহু কারও কাছে (সম্পদ চেয়ে) তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।”[৫২৮]
দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা
৪৬৬. উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ-যুদ্ধে নিহত শহীদদের ওপর আট বছর পর (জানাযার) সালাত পড়লেন। সেই দিনের সালাতে মনে হলো, যেন তিনি জীবিত এবং মৃতদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে বললেন,
إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ ، وَأَنَا عَلَيْكُمْ شَهِيدٌ، وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْحَوْضُ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ وَأَنَا فِي مَقَامِي هَذَا، وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا
“(হাশরের ময়দানে) আমি তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হব। আমি হব তোমাদের পক্ষে সাক্ষী এবং তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের স্থান হলো হাউযে কাউসার। আমি এখন এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাউযে কাউসার দেখতে পাচ্ছি। আমার পরে তোমরা সবাই শিরকে লিপ্ত হবে, এরকম কোনো আশঙ্কা নেই; কিন্তু ভয় হয় যে, তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।”
উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এটাই ছিল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।”[৫২৯]
টিকাঃ
[৫২৪] দক্ষিণ ইরাকের একটি শহর।
[৫২৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫২৬] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫২৭] বুখারি, ২৯৮৮; মুসলিম, ৭৬১৪। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৮] বুখারি, ২৯৭৪, ৫০৪০, ৬০৭৬; মুসলিম, ২৪৩৫। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৯] বুখারি, ৩৮১৬।