📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 নবিগণের তাওবা-ইস্তিগফার

📄 নবিগণের তাওবা-ইস্তিগফার


অষ্টম অনুচ্ছেদ
নবিগণের তাওবা-ইস্তিগফার

দাউদ আলাইহিস সালাম-এর দুআ
৪৪৮. ফাদালাহ ইবনু উবাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম তাঁর প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করলেন: “রব আমার, আমাকে আপনার প্রিয় আমল সম্পর্কে জানান।” তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, “হে দাউদ, দশটি আমল—যদি করতে পারো :
১. আমার সৃষ্টির কারও সম্পর্কে ভালো ছাড়া কোনো কথা বলবে না।
২. আমার সৃষ্টির কারও সম্পর্কে গীবত করবে না।
৩. আমার সৃষ্টির কারও প্রতি হিংসা পোষণ করবে না।”
দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, এই তিনটির কোনোটিই আমি করতে পারব না। তাই অবশিষ্ট সাতটি আমার জন্য তুলে রাখুন। কিন্তু, হে আমার প্রতিপালক, আপনার প্রিয় বান্দাদের সম্পর্কে আমাকে জানান। আপনার জন্যই আমি তাদেরকে ভালোবাসব।
আল্লাহ তাআলা বললেন (তারা হলো) :
১. যে শাসক মানুষের প্রতি দয়া করে। মানুষের প্রতি সেভাবেই ফয়সালা করে যেভাবে নিজের প্রতি ফয়সালা করে।
২. এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, আর সে ওই সম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে।
৩. এমন ব্যক্তি যে তার যৌবনকাল ও শক্তি-সামর্থ্য আল্লাহর আনুগত্যে নিঃশেষ করে।
৪. মাসজিদের প্রতি ভালোবাসার কারণে যার অন্তর মাসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
৫. এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো সুন্দরী নারী নিজের ব্যাপারে ফুসলিয়েছে; কিন্তু সে ওই নারীকে আল্লাহর ভয়ে ত্যাগ করেছে।
৬. এমন ব্যক্তি, যে মনে করে আল্লাহ তাআলা সর্বদাই তার সঙ্গে রয়েছেন। এই ধরনের লোকদের অন্তর পবিত্র। তাদের উপার্জন হালাল। তারা আমার উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে। আমি তাদের কথা স্মরণ করি, তারাও আমাকে স্মরণ করে।
৭. এমন ব্যক্তি যার দুচোখ থেকে আল্লাহর ভয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।”[৫০৯]

চল্লিশ দিন-ব্যাপী সাজদা
৪৪৯. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, দাউদ আলাইহিস সালাম এর একটি ভুল হয়ে যাওয়ায় তিনি চল্লিশ রাত পর্যন্ত সাজদাবনত হয়ে থাকলেন। তারপর তাঁকে বলা হলো, “দাউদ, মাথা ওঠাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” তিনি বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, আপনি ন্যায়বিচারক। আপনি কারও প্রতি জুলুম করেন না। আমি তো একজন মানুষকে হত্যা করেছি।”[৫১০] আল্লাহ তাআলা বললেন, "আমি তার কাছ থেকে উপহার হিসেবে তোমাকে চাইব, তখন সে তোমাকে আমার জন্য উপহার দেবে। বিনিময়ে আমি তাকে জান্নাত দান করব।"
আবদুল্লাহ ইবনু উমাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, “দাউদ আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন পর্যন্ত সাজদাবনত হয়ে ক্রন্দন করলেন। তারপর যখন মাথা তুললেন, তাঁর কপালে এক টুকরো গোশতও ছিল না।”[৫১১]

৪৫০. বাক্কার ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “(দাউদ আলাইহিস সালাম) সাজদা থেকে মাথাই ওঠাচ্ছিলেন না। অবশেষে ফেরেশতা এসে তাঁকে বলেছেন, আপনার প্রথম কাজটি হলো পাপ, শেষ কাজটি হলো নাফরমানি। আপনি মাথা তুলুন। তখন তিনি মাথা তুললেন। তারপর থেকে তিনি জীবদ্দশায় এমন কোনো পানি পান করেননি, যাতে চোখের জল মিশ্রিত ছিল না। এমন কোনো খাবার খাননি যাকে চোখের পানি সিক্ত করেনি। এমন কোনো শয্যায় শয়ন করেননি যা তার অশ্রুতে ভিজে যায়নি। তাই কম্বল কিংবা চাদর তাঁকে উষ্ণ করতে পারত না।”[৫১২]

৪৫১. আবু আবদুল্লাহ জাদালি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “দাঊদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জার কারণে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আসমানের দিকে মাথা তোলেননি।”[৫১৩]

৪৫২. মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম-এর অপরাধ তাঁর হাতের তালুতে খোদাই করা ছিল।[৫১৪]

৪৫৩. আবুল জালদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রতিপালকের কাছে দাউদ আলাইহিস সালাম-এর প্রার্থনার ব্যাপারে আমি যা পড়েছি তা এই : তিনি বললেন, রব আমার, যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বিপদগ্রস্ত দুঃখভারাক্রান্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেয় তার জন্য কী প্রতিদান রয়েছে? আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি তাকে ঈমানের চাদরে শোভিত করব। তার ও জাহান্নামের মাঝে পর্দা দিয়ে দেব। তিনি বললেন, রব আমার, যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জানাযায় শরিক হয় তার জন্য কী প্রতিদান? আল্লাহ তাআলা বললেন, তার প্রতিদান এই যে, তার মৃত্যুর দিন ফেরেশতারা তাকে বিদায় জানাবে। আর রূহের জগতে তাঁর রূহের ওপর আমি রহমত বর্ষণ করব। তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আর যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইয়াতীম ও বিধবাদের পরিতৃপ্ত করবে, তার জন্য কী রয়েছে? আল্লাহ তাআলা বললেন, তার প্রতিদান এই যে, যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন আমি তাকে আমার ছায়ায় আশ্রয় দেব। দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন, আর যে ব্যক্তি তোমার ভয়ে কাঁদে এবং তার চেহারার ওপর চোখের পানি ঝরে পড়ে, তাকে কী প্রতিদান দেওয়া হবে? আল্লাহ তাআলা বললেন, তার প্রতিদান এই যে, আমি তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেব এবং বিভীষিকাময় (কিয়ামাতের দিনে) তাকে আমি আগুনে পোড়ানো থেকে নিরাপদ রাখব।[৫১৫]

পাপ স্বীকার করে সিদ্দীকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া
৪৫৪. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী ইসরাঈলের লোকেরা বাইতুল মাকদিসে সালাত পড়ছিল। সে সময় দুইজন লোক এল। তাদের একজন মাসজিদে প্রবেশ করল এবং অন্যজন প্রবেশ করল না। সে মাসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। বলল, আমি কীভাবে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করব? আমার মতো (পাপী) লোক তো আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে না। আমি আমার পাপ ও অপরাধের কথা জানি। এই কথা বলে সে কাঁদতে থাকল, ঢুকলোই না মাসজিদে। কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ বলেন, পরের দিন লিখে দেওয়া হলো যে, সে সিদ্দীক (সত্যবাদী)।[৫১৬]

পঙ্গপাল ও গাছের শাঁস খেয়ে জীবনধারণ
৪৫৫. ইয়াযীদ ইবনু মাইসারা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর খাদ্য ছিল পঙ্গপাল, গাছের শাঁস (ভেতরের অংশ)। তিনি নিজেকে বলতেন, ইয়াহইয়া, তোমার চেয়ে বেশি নিয়ামাতপ্রাপ্ত আর কে আছে? তোমার খাদ্য হলো পঙ্গপাল আর গাছের শাঁস।”[৫১৭]

সালাতের সময় খাবার উপস্থিত হলে
৪৫৬. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا حَضَرَ الْعَشَاءُ، وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَابْدَءُوا بِالْعَشَاءِ
"যখন রাতের খাবার সামনে চলে আসে এবং সালাতের ইকামাতও দিয়ে দেওয়া হয়, তখন খাবার খেয়ে নাও।”[৫১৮]

দুর্গন্ধময় আবর্জনায় পরিণত হওয়া
৪৫৭. আবু উসমান নাহদী রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, খাবার খাও তো? লোকটি বলল, হ্যাঁ, খাই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, খাবার রান্নার সময় তার সাথে মশলা মিশিয়ে সুবাসিত করো? লোকটি বলল, জি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পানীয় পান করো? লোকটি বলল, হ্যাঁ, করি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি সেই পানীয় পরিবেশন করো? পানিকে শীতল রাখো, পরিচ্ছন্ন রাখো এবং তাতে সুগন্ধি মেশাও? লোকটি বলল, জি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই দুটি জিনিসকে তুমি কি তোমার পেটে একত্র করেছ? লোকটি বলল, জি হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাদের পরিণতি কী, জানো? লোকটি বলল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। কথাটি সে তিনবার বলল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, দুনিয়ার স্বাভাবিক পরিণতিই তাদের পরিণতি (অর্থাৎ, শেষমেশ তারা দুর্গন্ধময় আবর্জনায় পরিণত হয়)। বাড়ির পেছনে দাঁড়ালেই ওসবের দুর্গন্ধে নাকের ওপর হাত চেপে ধরতে হয়।”[৫১৯]

আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া
৪৫৮. মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا كَمَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ أُصْبُعَهُ هَذِهِ فِي الْيَمِّ، فَلْيَنْظُرُ بِمَ تَرْجِعُ
“তোমাদের কেউ সমুদ্রে আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনলে আঙুলে যতটুকু পানি লেগে থাকে, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া ততটুকুই।”[৫২০]

মাত্র তিনভাবে সম্পদ উপভোগ
৪৫৯. মুতাররিফ রহিমাহুল্লাহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তখন তিনি সূরা তাকাসুর তিলাওয়াত করছিলেন-
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
"প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও।” তিনি বললেন,
يَقُولُ ابْنُ آدَمَ مَالِي مَالِي، فَهَلْ لَكَ مِنْ مَالِكَ إِلَّا مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ؟ أَوْ لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ؟ أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ؟
"আদম-সন্তান বলে, আমার মাল, আমার মাল। হে আদম-সন্তান, তোমার মাল তো তা-ই যা তুমি খেয়ে শেষ করে ফেলেছ বা পরিধান করে নষ্ট করেছ অথবা দান করে সঞ্চয় করেছ।"[৫২১]

যারা মারা গেছে তারা উত্তম
৪৬০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকীউল গারকাদ গোরস্থানে তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে বের হলেন এবং বললেন, “হে কবরের বাসিন্দারা, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আহ! যদি তোমরা জানতে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কী অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন! তোমাদের অনুপস্থিতিতে যে কতকিছু ঘটবে!” তারপর তিনি তাঁর সাহাবিদের দিকে ফিরে বললেন, “আমার কাছে তারা তোমাদের চেয়ে উত্তম।” সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, তারা তো আমাদেরই ভাই। তারা যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে আমরাও সেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। তারা যেভাবে হিজরত করেছে আমরাও সেভাবে হিজরত করেছি। যেভাবে জিহাদ করেছে আমরাও সেভাবে জিহাদ করেছি। তাদের হায়াত শেষ, আর আমরা জীবিত আছি। তা হলে তারা আমাদের চেয়ে উত্তম হলো কীভাবে?” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “প্রতিদানের কোনো অংশ ভোগ করা ছাড়াই তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আমি উপস্থিত থাকা অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছে। আর তোমরা তোমাদের প্রতিদানের কিছু অংশ ভোগ করেছ। তা ছাড়া আমার মৃত্যুর পর তোমাদের কী হবে, সেটা তো আমি জানি না।”
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম, সাহাবিগণ কথাগুলো উপলব্ধি করলেন এবং উপকৃত হলেন। তাঁরা বললেন, আমরা দুনিয়ার যতটুকু অংশ অর্জন করেছি তার জন্য আমাদেরকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে। তার জন্য আমাদের প্রতিদানও কমে যাবে। আল্লাহর কসম, (যারা গত হয়ে গেছে) তারা উত্তম বস্তু আহার করেছে, মধ্যম-পন্থায় ব্যয় করেছে আর সাওয়াব সঞ্চয় করেছে।[৫২২]

মৃত্যু অনিবার্য
৪৬১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাদের বিজয় দান করার পর এক ব্যক্তি তার ভাইকে বলল, (পরাজয় বা মৃত্যু) যা আমাদের কাছে পৌঁছবে বলে আমরা ভয় পাচ্ছি, তা কি আসলেই আসবে? অপরজন বলল, তা থেকে কে তোমাকে আশ্বস্ত করল?[৫২৩]

টিকাঃ
[৫০৯] ফাযালাতা ইবনু উবাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ঘটনা।
[৫১০] ইসরাইলি রেওয়ায়েতের ওপর ভিত্তি করে এ কথা বলা হয়েছে। এমন ঘটনা নবিগণের নিষ্পাপ হওয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ এটা মারাত্মক ধরনের অপরাধ, যা থেকে সাধারণ মুসলমানেরই বিরত থাকা আবশ্যক। নবিগণের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ভাবা যেতে পারে না। (অনুবাদক)
[৫১১] এই আসারটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫১২] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত আসার এবং এর সনদ সহীহ। কিন্তু এটি ইসরাইলি বর্ণনা, যা বিশ্বাসও করা যায় না. মিথ্যাও প্রতিপন্ন করা যায় না।
[৫১৩] মাওকুফরূপে বর্ণিত ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৪] মাওকুফরূপে বর্ণিত ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৫] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৪৬, ৪৭; আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৭০। মাওকুফরূপে বর্ণিত। ইসরাইলি বর্ণনা, যা বিশ্বাসও করা যায় না, মিথ্যাও প্রতিপন্ন করা যায় না।
[৫১৬] ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৫/২৩৭, ২৩৮। ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৮] বুখারি, ৫১৪৭, ৬৪২; মুসলিম, ১২৬৯। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫১৯] হাদীসটির মুরসালরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৫২০] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৭৩৭৬; ইবনু মাজাহ, ৪১০৮।
[৫২১] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৭৬০৯; তিরমিযি, ২৩৪২, ৩৩৫৪।
[৫২২] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত হয়েছে। হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত মুরসাল হাদীসগুলোতে দুর্বলতা রয়েছে।
[৫২৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 চতুর্থ অধ্যায়

📄 চতুর্থ অধ্যায়


চতুর্থ অধ্যায়
প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার হাকীকত

প্রশাসকের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
৪৬২. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নুমান ইবনু মুকরিন রদিয়াল্লাহু আনহু-কে কাসকারে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। কিছুদিন পর তিনি উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আল্লাহ তাআলার কসম দিয়ে চিঠি পাঠালেন, যেন তাঁকে কাসকার [৫২৪] থেকে সরিয়ে নিয়ে কোনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিহাদে পাঠানো হয়। তিনি লেখেন, 'কাসকারের অবস্থা হলো রূপসি নারীর মতো, প্রতিদিন তা নতুন করে সাজগোজ করে আমার সামনে আসে।' ফলে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কাসকার থেকে সরিয়ে নেন এবং নাহাওয়ান্দে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন।”[৫২৫]

দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতে আগ্রহ
৪৬৩. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজ তোমরা ইবাদাতে সাহাবিদের থেকেও অনেক বেশি পরিশ্রম করো, অনেক দীর্ঘ সালাত আদায় করো, কিন্তু তবুও তারা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।” জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “তাঁরা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ ছিলেন এবং আখিরাতের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন।”[৫২৬]

দুনিয়া উপার্জনের কুফল
৪৬৪. মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন এবং বদর-যুদ্ধে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বাহরাইনে জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠালেন। তিনি বাহরাইন থেকে জিযিয়ার মাল-সম্পদ নিয়ে ফিরে এলেন। আনসারগণ আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আগমনের সংবাদ শুনতে পেলেন। ফলে তাঁরা সবাই ফজরের সালাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন, তখন সবাই তাঁর সামনে সমবেত হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দেখে হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, তোমরা শুনেছ যে আবূ উবাইদা কিছু নিয়ে ফিরেছেন। তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন,
فَأَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِي أَخْشَى أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ
“তবে তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তোমাদের যা আনন্দিত করবে তার আশা রাখো। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। কিন্তু আশঙ্কা করি যে, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রসারিত হয়ে যাবে যেভাবে পূর্ববর্তীদের জন্য প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর ঠিক তাদেরই মতো করেই তোমরা দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। ফলে দুনিয়া তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, ঠিক যেভাবে তাদেরকে ধ্বংস করেছিল।”[৫২৭]

কারও কাছে কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা
৪৬৫. উরওয়া ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বর্ণনা করেন, হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আমি আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। তারপর আবারও চাইলাম, এবারও দিলেন। তারপর বললেন,
يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
“হাকীম, এই সম্পদ শ্যামল ও সুস্বাদু। অন্তরের সচ্ছলতার সঙ্গে (লোভ-লালসা ছাড়া) যে তা গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে। আর যে অন্তরে লোভ-লালসাসহ গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে না। সে যেন এমন ব্যক্তির মতো যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।"
হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার কসম, আপনার পর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত (সম্পদ চেয়ে) আমি কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করব না।”
পরবর্তী সময়ে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু-কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন; তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। তারপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলেও একই ঘটনা ঘটে। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ওহে মুসলিমগণ, তোমরা হাকীম ইবনু হিযামের ব্যাপারে সাক্ষী থেকো। আমি এই গনীমাতের মাল থেকে তার কাছে তার অংশ পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর হাকীম রদিয়াল্লাহু আনহু কারও কাছে (সম্পদ চেয়ে) তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।”[৫২৮]

দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা
৪৬৬. উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ-যুদ্ধে নিহত শহীদদের ওপর আট বছর পর (জানাযার) সালাত পড়লেন। সেই দিনের সালাতে মনে হলো, যেন তিনি জীবিত এবং মৃতদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে বললেন,
إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ ، وَأَنَا عَلَيْكُمْ شَهِيدٌ، وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْحَوْضُ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ وَأَنَا فِي مَقَامِي هَذَا، وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا
“(হাশরের ময়দানে) আমি তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হব। আমি হব তোমাদের পক্ষে সাক্ষী এবং তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের স্থান হলো হাউযে কাউসার। আমি এখন এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাউযে কাউসার দেখতে পাচ্ছি। আমার পরে তোমরা সবাই শিরকে লিপ্ত হবে, এরকম কোনো আশঙ্কা নেই; কিন্তু ভয় হয় যে, তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।”
উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এটাই ছিল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।”[৫২৯]

টিকাঃ
[৫২৪] দক্ষিণ ইরাকের একটি শহর।
[৫২৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫২৬] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫২৭] বুখারি, ২৯৮৮; মুসলিম, ৭৬১৪। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৮] বুখারি, ২৯৭৪, ৫০৪০, ৬০৭৬; মুসলিম, ২৪৩৫। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৯] বুখারি, ৩৮১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00