📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে

📄 আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে


সপ্তম অনুচ্ছেদ
আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে

আত্মতৃপ্তির চেয়ে অনুশোচনা উত্তম
৪২৫. জাফর ইবনু হাইয়ান তাঁর কিছু সঙ্গী থেকে বর্ণনা করেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু শিখখির রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “রাত জেগে ইবাদাত করার পর আত্মতৃপ্তি নিয়ে ভোরে জেগে ওঠার চেয়ে রাতের বেলা ঘুমানো এবং অনুতপ্ত হয়ে ভোরে জেগে ওঠা আমার কাছে উত্তম।”[৪৭৯]

দান করে প্রশংসা চাওয়া ঘৃণ্য কাজ
৪২৬. আবুস সালীল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ- কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, “একজন মানুষ দান করে, ভালো কাজ করে; কিন্তু প্রতিদান ও প্রশংসা পেতে পছন্দ করে, তার ব্যাপারে আপনার কী মত?” জবাবে তিনি বললেন, “তুমি কি ঘৃণিত হতে পছন্দ করো?”[৪৮০]

জাহান্নামের জ্বালানি যারা
৪২৭. আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَظْهَرُ هَذَا الدِّينُ حَتَّى يُجَاوِزَ الْبِحَارَ، وَحَتَّى يُخَاضَ بِالْخَيْلِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، ثُمَّ يَأْتِي أَقْوَامٌ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ، فَإِذَا قَرَءُوهُ، قَالُوا: قَدْ قَرَأْنَا الْقُرْآنَ، فَمَنْ أَقْرَأُ مِنَّا؟ مَنْ أَعْلَمُ مِنَّا ثُمَّ الْتَفَتَ إِلَى أَصْحَابِهِ، فَقَالَ: هَلْ تَرَوْنَ فِي أُولَبِكَ مِنْ خَيْرٍ ۚ قَالُوا: لَا ، قَالَ: فَأُولَبِكَ مِنْكُمْ، وَأُولَبِكَ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ، وَأُولَبِكَ هُمْ وَقُودُ النَّارِ
“এই দ্বীন বিজয়ী হবে, এমনকি সাগর-সমুদ্র পেরিয়ে যাবে এবং আল্লাহর পথে (মুজাহিদগণ) ঘোড়া নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর এমন জাতির আগমন ঘটবে যারা কুরআন পাঠ করবে। তারা যখন কুরআন পাঠ করবে, বলবে, আমাদের চেয়ে ভালো কুরআনপাঠক (ক্বারী) আর কে আছে? আমাদের চেয়ে জ্ঞানী আর কে আছে?” তারপর তিনি তাঁর সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি ওইসব লোকের মধ্যে কোনো কল্যাণ দেখতে পাও?” তাঁরা বললেন, "না।” তিনি বললেন, "তারা তোমাদের মতোই; তারা এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। তারাই হবে জাহান্নামের লাকড়ি।”[৪৮১]

ক্বারীদের মধ্যে অধিকাংশ মুনাফিক
৪২৮. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَكْثَرُ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا
“আমার উম্মতের অধিকাংশ মুনাফিক হলো ক্বারীরা।”[৪৮২]

আমল-ইবাদাত নিয়তের ওপর নির্ভরশীল
৪২৯. দামরাতা ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمَلَائِكَةَ يَرْفَعُونَ أَعْمَالَ الْعَبْدِ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ، يَسْتَكْثِرُونَهُ، وَيُزَكُونَهُ حَتَّى يَبْلُغُوا بِهِ إِلَى حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ مِنْ سُلْطَانِهِ، فَيُوحِى اللَّهُ إِلَيْهِمْ أَنَّكُمْ حَفَظَةٌ عَلَى عَمَلِ عَبْدِي، وَأَنَا رَقِيبٌ عَلَى مَا فِي نَفْسِهِ، إِنَّ عَبْدِي هَذَا لَمْ يُخْلِصُ لِي، وَلَمْ يُخْلِصُ عَمَلَهُ فَاجْعَلْهُ فِي سِجِّينٍ ، وَيَصْعَدُونَ بِعَمَلِ الْعَبْدِ يَسْتَقِلُّونَهُ ، وَيَحْقِرُونَهُ حَتَّى يَنْتَهُوا بِهِ إِلَى حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ مِنْ سُلْطَانِهِ ، فَيُوحِى اللَّهُ إِلَيْهِمْ أَنَّكُمْ حَفَظَةٌ عَلَى عَمَلٍ عَبْدِي ، وَأَنَا رَقِيبٌ عَلَى مَا فِي نَفْسِهِ ، إِنَّ عَبْدِي هَذَا أَخْلَصَ عَمَلَهُ فَاكْتُبُوهُ فِي عِلِّيِّينَ
"আল্লাহ তাআলার কোনো-এক বান্দার আমল ওপরে ওঠানোর সময় ফেরেশতাগণ তা ভারী এবং পবিত্র মনে করতে থাকেন। অবশেষে তাঁরা তার আমলকে আল্লাহ তাআলার দরবারে পৌঁছে দিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা তখন ফেরেশতাদের প্রতি ওহি পাঠান: তোমরা আমার বান্দার আমলের হেফাজতকারী ছিলে আর আমি তার অন্তরের ব্যাপারে সম্মক অবগত। আমার এই বান্দা আমার প্রতি একনিষ্ঠ ছিল না। তার ইবাদাতও ইখলাসপূর্ণ ছিল না। সুতরাং তাকে সিজ্জিনে [৪৮৩] রাখো। ফেরেশতাগণ আল্লাহর অপর-এক বান্দার আমল নিয়ে ওপরে ওঠার সময় তার আমলকে হালকা ও তুচ্ছ মনে করেন। কিন্তু আল্লাহর দরবারে নেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি ওহি পাঠান: তোমরা আমার বান্দার আমলের হেফাজতকারী ছিলে আর আমি তার অন্তরের ব্যাপারে সম্মক অবগত। আমার এই বান্দার ইবাদাত ইখলাসপূর্ণ ছিল। সুতরাং তার নাম ইল্লিয়িনে [৪৮৪] লিখে দাও।”[৪৮৫]

কোনো বান্দার জন্য মানুষের প্রশংসা স্থিতিশীল নয়
৪৩০. রবী' ইবনু যিয়াদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে কোনো বান্দার প্রশংসা ততক্ষণ স্থায়ী হয় না, যতক্ষণ না তার প্রশংসা আসমানের অধিবাসীদের কাছে স্থায়ী হয়।”[৪৮৬]

আল্লাহর সন্তুষ্টির সংবাদ দুনিয়াবাসীর কাছে পৌঁছে যায়
৪৩১. মুত্তালিব ইবনু হানতাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হলে জিবরাঈলকে ডাকেন। জিবরাঈল তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন, আল্লাহ যতক্ষণ চান, ততক্ষণ (তিনি ওই অবস্থাতেই থাকেন)। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর বলেন, হে রাব্বুল আলামিন, আমি উপস্থিত। আল্লাহ বলেন, আমি অমুক বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেছি। তখন ফেরেশতাগণ বলেন, আল্লাহ তাআলা অমুক বান্দার প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন। এই সংবাদ দুনিয়াতে পৌঁছে যায়।
ইমাম আওযাঈ বলেন, আমার ধারণা, মুত্তালিব ইবনু হানতাব আরও বলেছেন, “যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট হন তখনও অনুরূপ ঘটনা ঘটে।”[৪৮৭]

জান্নাতী ও জাহান্নামীর পরিচয়
৪৩২. আবুল জাওযা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ، وَأَهْلِ النَّارِ؟ أَهْلُ الْجَنَّةِ مَنْ مُلِئَتْ مَسَامِعُهُ مِنَ الثَّنَاءِ الْحَسَنِ وَهُوَ يَسْمَعُ، وَأَهْلُ النَّارِ مَنْ مُلِئَتْ مَسَامِعُهُ مِنَ الثَّنَاءِ السَّيِّئِ وَهُوَ يَسْمَعُ
"জান্নাত আর জাহান্নামের অধিবাসীদের কথা আমি কি তোমাদের জানাব না? সুন্দর প্রশংসা শুনতে শুনতে যাদের কান পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা তা শোনার উপযুক্ত, তারাই জান্নাতী। আর যাদের কান নিন্দনীয় কথা (শুনতে শুনতে) পরিপূর্ণ হয় এবং তারা তা শোনার উপযুক্ত, তারাই জাহান্নামী।”[৪৮৮]

রাসূলগণের প্রতি ও মুমিনগণের প্রতি নির্দেশ
৪৩৩. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওই নির্দেশই দিয়েছেন, যা তিনি দিয়েছিলেন নবিদেরকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
“ওহে রাসূলগণ! পাক-পবিত্র জিনিস খাও এবং সৎকাজ করো।”[৪৮১] তিনি (আরও) বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদের যে-সমস্ত পাক-পবিত্র জিনিস দিয়েছি, সেগুলো খাও।”[৪৯০]
এরপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সফরের দরুন যার চুল উশকোখুশকো, চেহারা ধুলামলিন; সে হাত দুটি আকাশের দিকে তুলে ধরে বলছে 'রব আমার, রব আমার!' কিন্তু তার খাবার হারাম, পোশাক হারাম, তা হলে, কীভাবে তার ডাকে সাড়া দেওয়া হবে?'[৪৯১]

উদাসীন মন নিয়ে দুআ করলে তা কবুল হয় না
৪৩৪. সালিহ ইবনু মিসমার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, [৪৯২]
تَدْعُونِي وَقُلُوبُكُمْ مُعْرِضَةٌ، فَبَاطِلُ مَا تَرْهَبُونَ
"তোমরা যদি গাফেল অন্তর নিয়ে আমাকে ডাকো তা হলে তোমাদের (আল্লাহ)-ভীতির কোনো মূল্যই নেই।”[৪৯৩]

বিশেষ দলের জন্য দুআ কবুল হবে না
৪৩৫. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এমন-এক যুগ আসবে যখন মুমিন বান্দা একটি গোষ্ঠীর জন্য দুআ করবে। ফলে তার দুআ কবুল করা হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তুমি নিজের বিশেষ পরিস্থিতির জন্য দুআ করো, আমি তোমার দুআ কবুল করব।' আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, 'কারণ তারা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে।”[৪৯৪]

মুনাফিকের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য থাকে না
৪৩৬. মুহাম্মাদ ইবনু হামযা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
خَصْلَتَانِ لَا تَكُونَانِ فِي مُنَافِقٍ، حُسْنُ سَمْتٍ، وَلَا فِقْهُ فِي الدِّينِ
“মুনাফিকের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য থাকে না: সুন্দর আচরণ এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞান।”[৪৯৫]

রোজাদারের বৈশিষ্ট্য
৪৩৭. ইবনু জুরাইজ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুলাইমান ইবনু মূসা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “রোজা রাখলে নিজের কান, চোখ ও জিহ্বাকেও মিথ্যা থেকে বিরত রেখো। খাদেমকে কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থেকো। শান্ত ও ধীরস্থির থেকো। রোজা রাখার দিন ও রোজা না-রাখার দিনগুলোকে সমান পর্যায়ের কোরো না।”[৪৯৬]

প্রশ্নহীনভাবে তাকদীরকে মেনে নেওয়া
৪৩৮. মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি একদিন ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলাম। তাঁকে বললাম, আমি আপনাকে যে অবস্থায় দেখছি, তার কারণে আপনার কাছে আর আসব না। তিনি বললেন, তা করো না। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে অবস্থায় রাখতে চেয়েছেন, তা-ই আমার কাছে প্রিয়। জারীর বলেন, ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু-এর পেটে পানি জমে ফুলে গিয়েছিল। (এ কারণে তার ঘনঘন প্রস্রাব হতো।) ফলে ফুটোযুক্ত খাটে তিনি তিরিশ বছর অবস্থান করেছিলেন。[৪৯৭]

আল্লাহর কাছে যা প্রিয়, তা-ই প্রিয় করে নেওয়া
৪৩৯. জাফর ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু এর একটি কঠিন রোগ হয়। তাঁকে দেখতে আসা লোকেরা কেউ কেউ বলতেন, আপনার এখানে যা দেখি তা আপনার কাছে আসতে আমাদের বাধা দেয়। তিনি তখন বলতেন, “তোমরা তা কোরো না। আল্লাহ তাআলার কাছে যা কিছু প্রিয় তা-ই আমার কাছে প্রিয়।”[৪৯৮]

আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টি
৪৪. আবু হাইয়ান তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শামে এসে জিজ্ঞেস করলাম, সৈনিকদের মধ্যে কেউ কি অসুস্থ আছেন যাকে আমি দেখতে যেতে পারি? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, একজন আছেন। তিনি হলেন সুওয়াইদ হানযালি। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তাঁর স্ত্রী (স্বামীর উদ্দেশে) বলছিলেন, "আপনার জন্য আমার পরিবার কুরবান হোক। আপনি কী খেতে চান? কী পান করতে চান?"
তাঁর স্ত্রীকে যদি এই কথা বলতে না শুনতাম, তবে ওখানে কাপড় ছাড়া যে অন্যকিছু আছে, তা টেরই পারতাম না। আমি ভয়ই পেয়ে গেলাম। সুওয়াইদ টের পেয়ে তাঁর চেহারা থেকে কাপড় সরালেন। সুওয়াইদ আমাকে বললেন, "আমাকে এ অবস্থায় দেখে কষ্ট পেলেন নাকি?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই তাঁর কসম।” তিনি বললেন, "কষ্ট পাবেন না। আমার নিতম্বের ওপরিভাগের হাড় দুটো সরে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমি উপুড় হওয়া ছাড়া শুতে পারি না। যার হাতে সুওয়াইদের প্রাণ তাঁর কসম, নখের কাটা অংশ পরিমাণ যন্ত্রণা কমে গেলেও আমি আনন্দিত হব না।”[৪৯৯]

আল্লাহ বিপদ-আপদে ফেলে পরীক্ষা করেন
৪৪১. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ
“আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান, সে বিপদ-আপদে আক্রান্ত হয়।”[৫০০]

মৃত-সন্তান প্রতিদান-প্রাপ্তির মাধ্যম
৪৪২. ইয়াদ ইবন উকবা রহিমাহুল্লাহ এর এক ছেলে মারা গেল। যখন তিনি তার কবরে নামলেন, একজন ব্যক্তি তাকে বললেন, “আল্লাহর কসম, সে তো ছিল সেনাদলের নেতা। তাকে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার ওসিলা মনে করুন।” তখন তিনি বললেন, “অবশ্যই আমি তাকে ওসিলা মনে করি। গতকাল পর্যন্ত সে ছিল পার্থিব সৌন্দর্য, আর আজ সে (ওসিলা পাওয়ার) স্থায়ী সৎকর্ম।”[৫০১]

কষ্টের সময় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
৪৪৩. উমাইর ইবনু সাইফ খাওলানি থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ মুসলিম খাওলানিকে বলতে শুনেছেন, “আমার কোনো সন্তানের জন্ম হওয়া, আল্লাহর মেহেরবানিতে তার ভালোভাবে বেড়ে ওঠা, তারপর যৌবনে উপনীত হওয়া এবং আমার কাছে বিস্ময়কর বস্তুতে পরিণত হওয়া, অতঃপর আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাকে উঠিয়ে নেওয়া আমার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে তার থেকে উত্তম।”[৫০২]

বিপদ-আপদে সান্ত্বনা দেওয়া কর্তব্য
৪৪৪. আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لِيُعَزِّى الْمُسْلِمِينَ عَنْ مَصَابِبِهِمْ الْمُصِيبَةُ بِي
“মুসলমানদেরকে যেন তাদের বিপদ-আপদে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। আর আমার মৃত্যু হলো সবচেয়ে বড়ো বিপদ।”[৫০৩]

ধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ যেমন
৪৪৫. আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ
“শোকে তার চোখ দুটি সাদা (নিষ্প্রভ) হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন দুঃখভারাক্রান্ত।”[৫০৪]
মা'মার আযদি বলেন, এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন, “(ইউসুফ আলাইহিস সালাম) দুঃখ-যাতনা চেপে রেখেছিলেন এবং ভালো কথা ছাড়া কোনো কথা বলেননি।”[৫০৫]

প্রথম তিন জাহান্নামী
৪৪৬. শুফাইয়া ইবনু মাতি' রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার মদীনায় গেলাম। মাসজিদে ঢুকে দেখলাম যে লোকজন এক ব্যক্তিকে ঘিরে সমবেত হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? লোকেরা বলল, ইনি আবূ হুরায়রা। লোকেরা চলে যাওয়ার পর তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আবূ হুরায়রা, আপনি আমাকে এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করুন যা আপনি সরাসরি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন, যা আর কেউ শোনেনি। আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "হ্যাঁ, বলছি। অবশ্যই এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন এবং তা আর কেউ শোনেনি।” এ কথা বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, “হ্যাঁ, বলছি। অবশ্যই এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকেই বলেছেন এবং তা আর কোনো মানুষ শোনেনি।” দ্বিতীয়বার তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, “অবশ্যই এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকেই বলেছেন এবং তা আর কোনো মানুষ শোনেনি।” তারপর তিনি তৃতীয়বার ও চতুর্থবারের মতো অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। এরপর জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, “বলছি। অবশ্যই তোমাকে এমন-একটি হাদীস বলব যা এই ঘরে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন। তখন আমার সঙ্গে আর কেউই ছিল না। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা বান্দাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন তাদের বিচার-ফয়সালা করার জন্য। সেদিন প্রত্যেক উম্মতই থাকবে নতজানু। প্রথম যে ব্যক্তিকে ডাকা হবে সে হলো কুরআনের হাফিজ (কুরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী)। আল্লাহ বলবেন, আমি আমার রাসূলের ওপর যা নাযিল করেছিলাম তোমাকে কি তার জ্ঞান দান করিনি?
সে বলবে, রব আমার, জি, অবশ্যই দিয়েছিলেন।
আল্লাহ বলবেন, তুমি যে জ্ঞান লাভ করেছিলে সে অনুসারে কী আমল করেছিলে? কুরআনের হাফিজ বলবে, রব আমার, আমি তো রাতদিন কুরআন নিয়েই ব্যাস্ত থেকেছি।
তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। ফেরেশতাগণও বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ।
আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, বরং তুমি চেয়েছিলে লোকেরা যেন তোমাকে বলে, অমুক লোক বড়ো ক্বারী। তোমাকে তা বলাও হয়েছে। তুমি যেতে পারো, আজ তোমার জন্য আমার কাছে কোনো প্রতিদান নেই।
তারপর ধনাঢ্য ব্যক্তিকে ডাকা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, হে আমার বান্দা, আমি কি তোমাকে নিয়ামাত দান করিনি? ধন-সম্পদ দান করিনি? তোমাকে প্রাচুর্য দিইনি?
সে বলবে, রব আমার, জি, অবশ্যই দিয়েছেন।
আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছি তা তুমি কোন কাজে ব্যায় করেছ?
ধনাঢ্য লোকটি বলবে, আমি তা দিয়ে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখেছি। দান-সদাকা করেছি। অমুক অমুক কাজ করেছি।
আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। ফেরেশতাগণও বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ।
আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, বরং তুমি চেয়েছিল লোকেরা যেন তোমাকে বলে, অমুক লোক বড়ো দানবীর। তোমাকে তা বলাও হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যেতে পারো, আজ আমার কাছে তোমার জন্য কোনো প্রতিদান নেই।
তারপর আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তিকে ডাকা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, কীভাবে তুমি নিহত হয়েছ?
সে বলবে, রব আমার, তোমার জন্য শহীদ হয়েছি। তোমার পথে নিহত হয়েছি।
তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। ফেরেশতাগণও বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ।
আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, বরং তুমি চেয়েছিলে যে, লোকেরা যেন তোমাকে বলে, অমুক লোক বিরাট বাহাদুর। তোমাকে তা বলাও হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যেতে পারো, আজ তোমার জন্য আমার কাছে কোনো প্রতিদান নেই।
আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তারপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাঁটুতে তাঁর হাত চাপড়ালেন এবং বললেন, “আবূ হুরায়রা, এই তিনজন হলো আল্লাহ তাআলার ওইসব সৃষ্টি যাদেরকে কিয়ামাতের দিন জাহান্নাম সর্বপ্রথম দগ্ধ করবে।”
মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর তরবারি-বাহক আলা ইবনু হাকীম রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাতে এ হাদীসটি বর্ণনা করলেন। উকবা রহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারী শুফাইয়া-ই মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আসেন এবং হাদীসটি বর্ণনা করেন। তখন মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে ফেলেন এবং তাঁর কান্না তীব্র হয়ে ওঠে। তারপর শান্ত হয়ে বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন,
مَن كَانَ يُرِيدُ الحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যে-কেউ পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের পূর্ণফল দান করি এবং এখানে তাদেরকে কম দেওয়া হয় না। তাদের জন্য আখিরাতে আগুন ব্যতীত আর কিছু নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক।”[৫০৬]-[৫০৭]

বানী ইসরাঈলের উদ্দেশে আল্লাহ যা বলেছেন
৪৪৭. বাক্কার ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ তাআলা বানী ইসরাঈলের ধর্মগুরুদের দোষ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তোমরা দ্বীনি উদ্দেশ্য ছাড়া ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করো, আমল ছাড়া ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করো, আখিরাতের আমলের বিনিময়ে দুনিয়া ক্রয় করো। তোমরা মানুষকে প্রতারিত করার জন্য গায়ের ওপর ভেড়ার চামড়া জড়াও, কিন্তু বুকের মধ্যে নেকড়ের স্বভাব লুকিয়ে রাখো। তোমরা তোমাদের পানীয় থেকে ফুঁ দিয়ে ময়লা সরাও, অথচ পাহাড় পরিমাণ হারাম খেয়ে থাকো। তোমরা দ্বীনকে মানুষের ওপর পাহাড়ের মতো চাপিয়ে দাও, অথচ তাদেরকে কনিষ্ঠ আঙুল দিয়েও সাহায্য করো না। তোমরা সালাতকে দীর্ঘ করো, সাদা পোশাক পরিধান করো আর এগুলো দিয়ে ইয়াতীম ও বিধবাদের মাল আত্মসাৎ করো। আমার ইজ্জতের কসম, আমি তোমাদেরকে এমন-এক ফিতনায় নিমজ্জিত করব, যার ফলে তোমাদের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান লোকেরাও পথভ্রষ্ট হবে।”[৫০৮]

টিকাঃ
[৪৭৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২০০। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৪৮০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৮১] হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৪৮২] হাদীসটির সনদ সহীহ। বেশ কয়েকজন সাহাবি থেকে হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২২৮; মুসনাদ আহমাদ, ২/১৭৫।
[৪৮৩] সিজ্জিন: সপ্ত জমিনের নিচে অবস্থিত একটি স্থান।
[৪৮৪] ইল্লিয়িন: সপ্তম আকাশের নাম অথবা সৎ বান্দাদের আমল সংরক্ষণকারী ফেরেশতাদের দফতর।
[৪৮৫] হাদীসটি দুর্বল সনদের বর্ণিত।
[৪৮৬] আবু দাউদ, কিতাবুয যুহদ, ৪৭৫। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৮৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৮৮] আবু দাউদ, কিতাবুয যুহদ, ৫০৭। হাদীসটির মুরসালরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৪৮৯] সূরা আল-মু'মিনূন: আয়াত ৫১।
[৪৯০] সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৭২।
[৪৯১] মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৩; তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৯৮৯।
[৪৯২] একটি হাদীসে কুদসী।
[৪৯৩] সালিহ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৪৯৪] হাদীসটির মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
[৪৯৫] হাদীসটি মু'দালরূপে বর্ণিত; অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ার কারণে এটি সহীহ। তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৬৪৮; আলবানি, আস-সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস নং ১৫০৬।
[৪৯৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৪৯৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৪৮। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৯৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ মুনকাতি।
[৪৯৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫০০] হাদীসটি সহীহ। বুখারি, ৫৩২১; মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ২/৯৪১।
[৫০১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৫০২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৫০৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫০৪] সূরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪।
[৫০৫] হাদীসটি মাকতু।
[৫০৬] সূরা হুদ : আয়াত ১৫-১৬।
[৫০৭] হাদীসটির সনদ দুর্বল। অন্য কিতাবে হাসান সনদে সংক্ষিপ্তরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৫০৮] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 নবিগণের তাওবা-ইস্তিগফার

📄 নবিগণের তাওবা-ইস্তিগফার


অষ্টম অনুচ্ছেদ
নবিগণের তাওবা-ইস্তিগফার

দাউদ আলাইহিস সালাম-এর দুআ
৪৪৮. ফাদালাহ ইবনু উবাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম তাঁর প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করলেন: “রব আমার, আমাকে আপনার প্রিয় আমল সম্পর্কে জানান।” তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, “হে দাউদ, দশটি আমল—যদি করতে পারো :
১. আমার সৃষ্টির কারও সম্পর্কে ভালো ছাড়া কোনো কথা বলবে না।
২. আমার সৃষ্টির কারও সম্পর্কে গীবত করবে না।
৩. আমার সৃষ্টির কারও প্রতি হিংসা পোষণ করবে না।”
দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, এই তিনটির কোনোটিই আমি করতে পারব না। তাই অবশিষ্ট সাতটি আমার জন্য তুলে রাখুন। কিন্তু, হে আমার প্রতিপালক, আপনার প্রিয় বান্দাদের সম্পর্কে আমাকে জানান। আপনার জন্যই আমি তাদেরকে ভালোবাসব।
আল্লাহ তাআলা বললেন (তারা হলো) :
১. যে শাসক মানুষের প্রতি দয়া করে। মানুষের প্রতি সেভাবেই ফয়সালা করে যেভাবে নিজের প্রতি ফয়সালা করে।
২. এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, আর সে ওই সম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে।
৩. এমন ব্যক্তি যে তার যৌবনকাল ও শক্তি-সামর্থ্য আল্লাহর আনুগত্যে নিঃশেষ করে।
৪. মাসজিদের প্রতি ভালোবাসার কারণে যার অন্তর মাসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
৫. এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো সুন্দরী নারী নিজের ব্যাপারে ফুসলিয়েছে; কিন্তু সে ওই নারীকে আল্লাহর ভয়ে ত্যাগ করেছে।
৬. এমন ব্যক্তি, যে মনে করে আল্লাহ তাআলা সর্বদাই তার সঙ্গে রয়েছেন। এই ধরনের লোকদের অন্তর পবিত্র। তাদের উপার্জন হালাল। তারা আমার উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে। আমি তাদের কথা স্মরণ করি, তারাও আমাকে স্মরণ করে।
৭. এমন ব্যক্তি যার দুচোখ থেকে আল্লাহর ভয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।”[৫০৯]

চল্লিশ দিন-ব্যাপী সাজদা
৪৪৯. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, দাউদ আলাইহিস সালাম এর একটি ভুল হয়ে যাওয়ায় তিনি চল্লিশ রাত পর্যন্ত সাজদাবনত হয়ে থাকলেন। তারপর তাঁকে বলা হলো, “দাউদ, মাথা ওঠাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” তিনি বললেন, “হে আমার প্রতিপালক, আপনি ন্যায়বিচারক। আপনি কারও প্রতি জুলুম করেন না। আমি তো একজন মানুষকে হত্যা করেছি।”[৫১০] আল্লাহ তাআলা বললেন, "আমি তার কাছ থেকে উপহার হিসেবে তোমাকে চাইব, তখন সে তোমাকে আমার জন্য উপহার দেবে। বিনিময়ে আমি তাকে জান্নাত দান করব।"
আবদুল্লাহ ইবনু উমাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, “দাউদ আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন পর্যন্ত সাজদাবনত হয়ে ক্রন্দন করলেন। তারপর যখন মাথা তুললেন, তাঁর কপালে এক টুকরো গোশতও ছিল না।”[৫১১]

৪৫০. বাক্কার ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “(দাউদ আলাইহিস সালাম) সাজদা থেকে মাথাই ওঠাচ্ছিলেন না। অবশেষে ফেরেশতা এসে তাঁকে বলেছেন, আপনার প্রথম কাজটি হলো পাপ, শেষ কাজটি হলো নাফরমানি। আপনি মাথা তুলুন। তখন তিনি মাথা তুললেন। তারপর থেকে তিনি জীবদ্দশায় এমন কোনো পানি পান করেননি, যাতে চোখের জল মিশ্রিত ছিল না। এমন কোনো খাবার খাননি যাকে চোখের পানি সিক্ত করেনি। এমন কোনো শয্যায় শয়ন করেননি যা তার অশ্রুতে ভিজে যায়নি। তাই কম্বল কিংবা চাদর তাঁকে উষ্ণ করতে পারত না।”[৫১২]

৪৫১. আবু আবদুল্লাহ জাদালি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “দাঊদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জার কারণে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আসমানের দিকে মাথা তোলেননি।”[৫১৩]

৪৫২. মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম-এর অপরাধ তাঁর হাতের তালুতে খোদাই করা ছিল।[৫১৪]

৪৫৩. আবুল জালদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রতিপালকের কাছে দাউদ আলাইহিস সালাম-এর প্রার্থনার ব্যাপারে আমি যা পড়েছি তা এই : তিনি বললেন, রব আমার, যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বিপদগ্রস্ত দুঃখভারাক্রান্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেয় তার জন্য কী প্রতিদান রয়েছে? আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি তাকে ঈমানের চাদরে শোভিত করব। তার ও জাহান্নামের মাঝে পর্দা দিয়ে দেব। তিনি বললেন, রব আমার, যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জানাযায় শরিক হয় তার জন্য কী প্রতিদান? আল্লাহ তাআলা বললেন, তার প্রতিদান এই যে, তার মৃত্যুর দিন ফেরেশতারা তাকে বিদায় জানাবে। আর রূহের জগতে তাঁর রূহের ওপর আমি রহমত বর্ষণ করব। তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আর যে ব্যক্তি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইয়াতীম ও বিধবাদের পরিতৃপ্ত করবে, তার জন্য কী রয়েছে? আল্লাহ তাআলা বললেন, তার প্রতিদান এই যে, যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন আমি তাকে আমার ছায়ায় আশ্রয় দেব। দাউদ আলাইহিস সালাম বললেন, আর যে ব্যক্তি তোমার ভয়ে কাঁদে এবং তার চেহারার ওপর চোখের পানি ঝরে পড়ে, তাকে কী প্রতিদান দেওয়া হবে? আল্লাহ তাআলা বললেন, তার প্রতিদান এই যে, আমি তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেব এবং বিভীষিকাময় (কিয়ামাতের দিনে) তাকে আমি আগুনে পোড়ানো থেকে নিরাপদ রাখব।[৫১৫]

পাপ স্বীকার করে সিদ্দীকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া
৪৫৪. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী ইসরাঈলের লোকেরা বাইতুল মাকদিসে সালাত পড়ছিল। সে সময় দুইজন লোক এল। তাদের একজন মাসজিদে প্রবেশ করল এবং অন্যজন প্রবেশ করল না। সে মাসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। বলল, আমি কীভাবে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করব? আমার মতো (পাপী) লোক তো আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করে না। আমি আমার পাপ ও অপরাধের কথা জানি। এই কথা বলে সে কাঁদতে থাকল, ঢুকলোই না মাসজিদে। কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ বলেন, পরের দিন লিখে দেওয়া হলো যে, সে সিদ্দীক (সত্যবাদী)।[৫১৬]

পঙ্গপাল ও গাছের শাঁস খেয়ে জীবনধারণ
৪৫৫. ইয়াযীদ ইবনু মাইসারা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-এর খাদ্য ছিল পঙ্গপাল, গাছের শাঁস (ভেতরের অংশ)। তিনি নিজেকে বলতেন, ইয়াহইয়া, তোমার চেয়ে বেশি নিয়ামাতপ্রাপ্ত আর কে আছে? তোমার খাদ্য হলো পঙ্গপাল আর গাছের শাঁস।”[৫১৭]

সালাতের সময় খাবার উপস্থিত হলে
৪৫৬. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا حَضَرَ الْعَشَاءُ، وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَابْدَءُوا بِالْعَشَاءِ
"যখন রাতের খাবার সামনে চলে আসে এবং সালাতের ইকামাতও দিয়ে দেওয়া হয়, তখন খাবার খেয়ে নাও।”[৫১৮]

দুর্গন্ধময় আবর্জনায় পরিণত হওয়া
৪৫৭. আবু উসমান নাহদী রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, খাবার খাও তো? লোকটি বলল, হ্যাঁ, খাই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, খাবার রান্নার সময় তার সাথে মশলা মিশিয়ে সুবাসিত করো? লোকটি বলল, জি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পানীয় পান করো? লোকটি বলল, হ্যাঁ, করি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি সেই পানীয় পরিবেশন করো? পানিকে শীতল রাখো, পরিচ্ছন্ন রাখো এবং তাতে সুগন্ধি মেশাও? লোকটি বলল, জি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই দুটি জিনিসকে তুমি কি তোমার পেটে একত্র করেছ? লোকটি বলল, জি হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাদের পরিণতি কী, জানো? লোকটি বলল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। কথাটি সে তিনবার বলল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, দুনিয়ার স্বাভাবিক পরিণতিই তাদের পরিণতি (অর্থাৎ, শেষমেশ তারা দুর্গন্ধময় আবর্জনায় পরিণত হয়)। বাড়ির পেছনে দাঁড়ালেই ওসবের দুর্গন্ধে নাকের ওপর হাত চেপে ধরতে হয়।”[৫১৯]

আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া
৪৫৮. মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا كَمَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ أُصْبُعَهُ هَذِهِ فِي الْيَمِّ، فَلْيَنْظُرُ بِمَ تَرْجِعُ
“তোমাদের কেউ সমুদ্রে আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনলে আঙুলে যতটুকু পানি লেগে থাকে, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া ততটুকুই।”[৫২০]

মাত্র তিনভাবে সম্পদ উপভোগ
৪৫৯. মুতাররিফ রহিমাহুল্লাহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তখন তিনি সূরা তাকাসুর তিলাওয়াত করছিলেন-
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
"প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও।” তিনি বললেন,
يَقُولُ ابْنُ آدَمَ مَالِي مَالِي، فَهَلْ لَكَ مِنْ مَالِكَ إِلَّا مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ؟ أَوْ لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ؟ أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ؟
"আদম-সন্তান বলে, আমার মাল, আমার মাল। হে আদম-সন্তান, তোমার মাল তো তা-ই যা তুমি খেয়ে শেষ করে ফেলেছ বা পরিধান করে নষ্ট করেছ অথবা দান করে সঞ্চয় করেছ।"[৫২১]

যারা মারা গেছে তারা উত্তম
৪৬০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকীউল গারকাদ গোরস্থানে তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে বের হলেন এবং বললেন, “হে কবরের বাসিন্দারা, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আহ! যদি তোমরা জানতে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে কী অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন! তোমাদের অনুপস্থিতিতে যে কতকিছু ঘটবে!” তারপর তিনি তাঁর সাহাবিদের দিকে ফিরে বললেন, “আমার কাছে তারা তোমাদের চেয়ে উত্তম।” সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, তারা তো আমাদেরই ভাই। তারা যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে আমরাও সেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। তারা যেভাবে হিজরত করেছে আমরাও সেভাবে হিজরত করেছি। যেভাবে জিহাদ করেছে আমরাও সেভাবে জিহাদ করেছি। তাদের হায়াত শেষ, আর আমরা জীবিত আছি। তা হলে তারা আমাদের চেয়ে উত্তম হলো কীভাবে?” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “প্রতিদানের কোনো অংশ ভোগ করা ছাড়াই তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আমি উপস্থিত থাকা অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছে। আর তোমরা তোমাদের প্রতিদানের কিছু অংশ ভোগ করেছ। তা ছাড়া আমার মৃত্যুর পর তোমাদের কী হবে, সেটা তো আমি জানি না।”
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর কসম, সাহাবিগণ কথাগুলো উপলব্ধি করলেন এবং উপকৃত হলেন। তাঁরা বললেন, আমরা দুনিয়ার যতটুকু অংশ অর্জন করেছি তার জন্য আমাদেরকে হিসেবের মুখোমুখি হতে হবে। তার জন্য আমাদের প্রতিদানও কমে যাবে। আল্লাহর কসম, (যারা গত হয়ে গেছে) তারা উত্তম বস্তু আহার করেছে, মধ্যম-পন্থায় ব্যয় করেছে আর সাওয়াব সঞ্চয় করেছে।[৫২২]

মৃত্যু অনিবার্য
৪৬১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাদের বিজয় দান করার পর এক ব্যক্তি তার ভাইকে বলল, (পরাজয় বা মৃত্যু) যা আমাদের কাছে পৌঁছবে বলে আমরা ভয় পাচ্ছি, তা কি আসলেই আসবে? অপরজন বলল, তা থেকে কে তোমাকে আশ্বস্ত করল?[৫২৩]

টিকাঃ
[৫০৯] ফাযালাতা ইবনু উবাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ঘটনা।
[৫১০] ইসরাইলি রেওয়ায়েতের ওপর ভিত্তি করে এ কথা বলা হয়েছে। এমন ঘটনা নবিগণের নিষ্পাপ হওয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ এটা মারাত্মক ধরনের অপরাধ, যা থেকে সাধারণ মুসলমানেরই বিরত থাকা আবশ্যক। নবিগণের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ভাবা যেতে পারে না। (অনুবাদক)
[৫১১] এই আসারটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫১২] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত আসার এবং এর সনদ সহীহ। কিন্তু এটি ইসরাইলি বর্ণনা, যা বিশ্বাসও করা যায় না. মিথ্যাও প্রতিপন্ন করা যায় না।
[৫১৩] মাওকুফরূপে বর্ণিত ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৪] মাওকুফরূপে বর্ণিত ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৫] আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৪৬, ৪৭; আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৭০। মাওকুফরূপে বর্ণিত। ইসরাইলি বর্ণনা, যা বিশ্বাসও করা যায় না, মিথ্যাও প্রতিপন্ন করা যায় না।
[৫১৬] ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৭] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৫/২৩৭, ২৩৮। ইসরাইলি বর্ণনা।
[৫১৮] বুখারি, ৫১৪৭, ৬৪২; মুসলিম, ১২৬৯। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫১৯] হাদীসটির মুরসালরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৫২০] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৭৩৭৬; ইবনু মাজাহ, ৪১০৮।
[৫২১] হাদীসটি সহীহ। মুসলিম, ৭৬০৯; তিরমিযি, ২৩৪২, ৩৩৫৪।
[৫২২] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত হয়েছে। হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত মুরসাল হাদীসগুলোতে দুর্বলতা রয়েছে।
[৫২৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 চতুর্থ অধ্যায়

📄 চতুর্থ অধ্যায়


চতুর্থ অধ্যায়
প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়ার হাকীকত

প্রশাসকের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
৪৬২. সালিম ইবনু আবিল জা'দ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু নুমান ইবনু মুকরিন রদিয়াল্লাহু আনহু-কে কাসকারে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। কিছুদিন পর তিনি উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আল্লাহ তাআলার কসম দিয়ে চিঠি পাঠালেন, যেন তাঁকে কাসকার [৫২৪] থেকে সরিয়ে নিয়ে কোনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে জিহাদে পাঠানো হয়। তিনি লেখেন, 'কাসকারের অবস্থা হলো রূপসি নারীর মতো, প্রতিদিন তা নতুন করে সাজগোজ করে আমার সামনে আসে।' ফলে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কাসকার থেকে সরিয়ে নেন এবং নাহাওয়ান্দে যে বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন।”[৫২৫]

দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতে আগ্রহ
৪৬৩. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজ তোমরা ইবাদাতে সাহাবিদের থেকেও অনেক বেশি পরিশ্রম করো, অনেক দীর্ঘ সালাত আদায় করো, কিন্তু তবুও তারা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।” জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “তাঁরা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ ছিলেন এবং আখিরাতের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন।”[৫২৬]

দুনিয়া উপার্জনের কুফল
৪৬৪. মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু আউফ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বনু আমির ইবনু লুওয়াই-এর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন এবং বদর-যুদ্ধে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বাহরাইনে জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠালেন। তিনি বাহরাইন থেকে জিযিয়ার মাল-সম্পদ নিয়ে ফিরে এলেন। আনসারগণ আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর আগমনের সংবাদ শুনতে পেলেন। ফলে তাঁরা সবাই ফজরের সালাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে শরিক হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন, তখন সবাই তাঁর সামনে সমবেত হলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের দেখে হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, মনে হয়, তোমরা শুনেছ যে আবূ উবাইদা কিছু নিয়ে ফিরেছেন। তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন,
فَأَبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَاللَّهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِي أَخْشَى أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ
“তবে তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং তোমাদের যা আনন্দিত করবে তার আশা রাখো। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। কিন্তু আশঙ্কা করি যে, দুনিয়া তোমাদের জন্য প্রসারিত হয়ে যাবে যেভাবে পূর্ববর্তীদের জন্য প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর ঠিক তাদেরই মতো করেই তোমরা দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। ফলে দুনিয়া তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, ঠিক যেভাবে তাদেরকে ধ্বংস করেছিল।”[৫২৭]

কারও কাছে কিছু না চাওয়ার প্রতিজ্ঞা
৪৬৫. উরওয়া ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বর্ণনা করেন, হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আমি আবার চাইলাম, তিনি দিলেন। তারপর আবারও চাইলাম, এবারও দিলেন। তারপর বললেন,
يَا حَكِيمُ، إِنَّ هَذَا الْمَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
“হাকীম, এই সম্পদ শ্যামল ও সুস্বাদু। অন্তরের সচ্ছলতার সঙ্গে (লোভ-লালসা ছাড়া) যে তা গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে। আর যে অন্তরে লোভ-লালসাসহ গ্রহণ করবে তার জন্য তা বরকতময় হবে না। সে যেন এমন ব্যক্তির মতো যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।"
হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার কসম, আপনার পর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত (সম্পদ চেয়ে) আমি কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করব না।”
পরবর্তী সময়ে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু যখন হাকীম ইবনু হিযাম রদিয়াল্লাহু আনহু-কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন; তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। তারপর উমর রদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলেও একই ঘটনা ঘটে। তখন উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “ওহে মুসলিমগণ, তোমরা হাকীম ইবনু হিযামের ব্যাপারে সাক্ষী থেকো। আমি এই গনীমাতের মাল থেকে তার কাছে তার অংশ পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর হাকীম রদিয়াল্লাহু আনহু কারও কাছে (সম্পদ চেয়ে) তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।”[৫২৮]

দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা
৪৬৬. উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ-যুদ্ধে নিহত শহীদদের ওপর আট বছর পর (জানাযার) সালাত পড়লেন। সেই দিনের সালাতে মনে হলো, যেন তিনি জীবিত এবং মৃতদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন। তারপর তিনি মিম্বরে উঠে বললেন,
إِنِّي بَيْنَ أَيْدِيكُمْ فَرَطٌ ، وَأَنَا عَلَيْكُمْ شَهِيدٌ، وَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْحَوْضُ، وَإِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَيْهِ وَأَنَا فِي مَقَامِي هَذَا، وَإِنِّي لَسْتُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا أَنْ تَنَافَسُوهَا
“(হাশরের ময়দানে) আমি তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হব। আমি হব তোমাদের পক্ষে সাক্ষী এবং তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের স্থান হলো হাউযে কাউসার। আমি এখন এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাউযে কাউসার দেখতে পাচ্ছি। আমার পরে তোমরা সবাই শিরকে লিপ্ত হবে, এরকম কোনো আশঙ্কা নেই; কিন্তু ভয় হয় যে, তোমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।”
উকবা ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এটাই ছিল রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।”[৫২৯]

টিকাঃ
[৫২৪] দক্ষিণ ইরাকের একটি শহর।
[৫২৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫২৬] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/৩১৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৫২৭] বুখারি, ২৯৮৮; মুসলিম, ৭৬১৪। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৮] বুখারি, ২৯৭৪, ৫০৪০, ৬০৭৬; মুসলিম, ২৪৩৫। হাদীসটি সহীহ ও মুত্তাফাকুন আলাইহি।
[৫২৯] বুখারি, ৩৮১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00