📄 সালাতে যাওয়া ও মাসজিদে অবস্থান করার ফজিলত
চতুর্থ অনুচ্ছেদ
সালাতে যাওয়া ও মাসজিদে অবস্থান করার ফজিলত
সালাতের উদ্দেশে প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সদাকা
৩৮৬. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَخْطُوهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ
"প্রতিটি ভালো কথা এক একটি সদাকা। সালাতের উদ্দেশে প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি সদাকা।”[৪৩৪]
আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মাসজিদে আসা
৩৮৭. হাবীব ইবনু আবী সাবিত রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আগেকার সময়ে) এই কথা বলা হতো, "তোমরা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য তাঁর ঘরে এসো। আল্লাহর ঘরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটাই উত্তম। আসলে আল্লাহ তাআলাই সত্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন।”[৪৩৫]
মাসজিদে উঁচু আওয়াজে কথা বলা যাবে না
৩৮৮. সা'দ ইবনু ইবরাহীম তাঁর পিতা রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু মাসজিদে বসে থাকা এক ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন। তার উদ্দেশে তিনি বললেন, “তুমি কি জানো এখন তুমি কোথায় আছো?"[৪৩৬]
মাসজিদে অনর্থক কথা না বলা
৩৮৯. উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী জাফর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَجَابَ دَاعِيَ اللهِ، وَأَحْسَنَ عِمَارَةَ مَسَاجِدِ اللَّهِ، كَانَتْ تُحْفَتُهُ بِذَلِكَ مِنَ اللَّهِ الْجَنَّةَ ، فَقِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا حُسْنُ عِمَارَةِ مَسَاجِدِ اللَّهِ؟ قَالَ: لَا يُرْفَعُ فِيهَا صَوْتُ، وَلَا يُتَكَلَّمُ فِيهَا بِالرَّفْتِ.
“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেয়, আল্লাহ তাআলার মাসজিদগুলোর কাঠামো (পরিবেশ) সুন্দর রাখে, এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপহার হলো জান্নাত।" জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাআলার মাসজিদসমূহের পরিবেশ সুন্দর রাখার অর্থ কী? তিনি বললেন: “মাসজিদে কণ্ঠস্বর উঁচু না করা এবং অশ্লীল কথাবার্তা না বলা।”[৪৩৭]
সালাতের অপেক্ষায় থাকার ফজিলত
৩৯০. সুহাইল ইবনু হাসসান কালবি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “বান্দা যতক্ষণ মাসজিদে বসে থাকে ততক্ষণে একটি তেজি ঘোড়া পুরো পা ছড়িয়ে দৌড়ে জান্নাতে যতটুকু জায়গা অতিক্রম করতে পারবে, আল্লাহ তাকে (জান্নাতে) ততটুকু জায়গা দান করবেন। এবং ফেরেশতাগণ তার ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষণের দুআ করতে থাকবে। আর তার নামে আল্লাহর পথে পাহারা দেওয়ার সাওয়াব লেখা হবে।”[৪৩৮]
যুদ্ধের প্রস্তুতি
৩৯১. আল্লাহ তাআলার বাণী,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা করো এবং সদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো।"[৪৩৯]
দাউদ ইবনু সালিহ বলেন, আবূ সালামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, “ভাতিজা, আয়াতটি কেন নাযিল হয়েছে, জানো?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে সারাক্ষণই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা লাগত। যেন এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষা করার মতো।”[৪৪০]
পাপ ঝরে পড়ে যেসব আমলের জন্য
৩৯২. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عِنْدَ الْمَكَارِهِ مِنَ الْكَفَّارَاتِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ مِنَ الْكَفَّارَاتِ، وَانتَظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ مِنَ الْكَفَّارَاتِ، وَذَلِكَ الرِّبَاطُ، وَذَلِكَ الرباط
"কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও ভালোভাবে ওজু করলে পাপ মুছে যায়। বেশি বেশি মাসজিদে গেলে পাপ ঝরে পড়ে। এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষা করলেও পাপ ঝরে যায়। তা আল্লাহর পথে পাহারার সমতুল্য, তা আল্লাহর পথে পাহারার সমতুল্য।”[৪৪১]
প্রতিটি পদক্ষেপের বদলে দশটি নেকি
৩৯৩. উকবা ইবনু আমির জুহানি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ إِلَى الْمَسْجِدِ، كَتَبَ لَهُ كَاتِبَاهُ بِكُلِّ خُطْوَةٍ يَخْطُوهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ، وَالْقَاعِدُ فِي الْمَسْجِدِ يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ كَالْقَانِتِ، وَيُكْتَبُ مِنَ الْمُصَلِّينَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَى بَيْتِهِ
“যে ব্যক্তি মাসজিদের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হয়, তার সঙ্গের দুইজন লেখক ফেরেশতা মাসজিদের পথে প্রতিটি পদক্ষেপের বদলে তার জন্য দশটি নেকি লেখেন। আর যে ব্যক্তি মাসজিদে সালাতের অপেক্ষায় বসে আছে সে ইবাদাতকারীর মতোই; সে বাড়িতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাকে মুসল্লি হিসেবে গণ্য করা হয়।”[৪৪২]
সালাতের জন্য অপেক্ষাকারীও সালাতের মধ্যে রয়েছে
৩৯৪. মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মাসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে সালাতরত ব্যক্তির সমতুল্য যে মনে করে না, সে জ্ঞানী নয়।"[৪৪৩]
আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দা
৩৯৫. খালিদ ইবনু মা'দান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ أَحَبُّ عِبَادِي إِلَى الْمُتَحَابُّونَ بِحُتِي، وَالْمُعَلَّقَةُ قُلُوبُهُمْ فِي الْمَسَاجِدِ، وَالْمُسْتَغْفِرُونَ بِالْأَسْحَارِ أُولَبِكَ الَّذِينَ إِذَا أَرَدْتُ أَهْلَ الْأَرْضِ بِعُقُوبَتِهِمْ ذَكَرْتُهُمْ، فَصَرَفْتُ الْعُقُوبَةَ عَنْهُمْ بِهِمْ
"আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তারাই যারা আমার ভালোবাসার কারণেই পরস্পরকে ভালোবাসে, যাদের অন্তর মাসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে, যারা ভোরবেলায় ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমি জমিনের বাসিন্দাদেরকে শাস্তি দিতে চাইলে, ওই বান্দাদের কথা উল্লেখ করি, তারপর তাদের কারণে সবার থেকে শাস্তি ফিরিয়ে নিই।”[৪৪৪]
পাঁচ জিনিস থেকে মাসজিদকে পবিত্র রাখতে হবে
৩৯৬. মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মাসজিদগুলোকে অবশ্যই পাঁচটি জিনিস থেকে পবিত্র রাখতে হবে : ১. মাসজিদে দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করা যাবে না; ২. খুন-জখমের কিসাস গ্রহণ করা যাবে না; ৩. কবিতা আবৃত্তি করা যাবে না; ৪. হারানো-বস্তুর ঘোষণা দেওয়া যাবে না এবং ৫. মাসজিদকে বাজারে পরিণত করা যাবে না।”[৪৪৫]
মাসজিদে পাশের-জনের সাথেও কথা না বলা
৩৯৭. মূসা ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কখনও কখনও আমি আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ ও আনসারি সাহাবি ইয়াযীদ ইবনু শুরাহবীল আমিরি রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে আসরের পর মাসজিদে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখেছি। কিন্তু সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত তাঁরা একে অন্যের সাথে কথা বলতেন না।”[৪৪৬]
তিন ব্যক্তির কথা বাদে সব কথাই অনর্থক
৩৯৮. আবদুল্লাহ ইবনু মুহাইরিয রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “তিন ব্যক্তির কথা ছাড়া মাসজিদে সব ধরনের কথাই অনর্থক: ১. সালাতরত ব্যক্তি (সালাতে যা কিছু বলে থাকে); ২. আল্লাহর যিকরকারী এবং ৩. অধিকার আদান-প্রদানকারী।”[৪৪৭]
মাসজিদে বান্দা আল্লাহর সঙ্গে ওঠাবসা করে
৩৯৯. আবদুল্লাহ মুআযযিন বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি মাসজিদে বসল, সে যেন তার রবের সঙ্গেই বসল।" মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম বলেন, “মাসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তির দায়িত্ব হলো শুধুই কল্যাণকর কথা বলা।”[৪৪৮]
উদাসীনভাবে মাসজিদে না যাওয়া
৪০০. আবদুর রহমান ইবনু জুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহ আনহু একটি সেনাবাহিনীকে শামে পাঠাতে প্রস্তুত করলেন। তাদের উদ্দেশে বললেন, “তোমরা শামে যাচ্ছ, তা এমন ভূমি যাতে অনেক কল্যাণ রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সেই ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করবেন, তোমরা ওখানে অনেক মাসজিদ নির্মাণ করবে। যদি অবহেলা-ভরে ও উদাসীনভাবে মাসজিদে যাও, তা হলে কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা জানবেন। অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে দূরে থেকো।”[৪৪৯]
কিয়ামাতের দিন পরিপূর্ণ আলোর ব্যবস্থা
৪০১. ইদরীস খাওলানি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “যারা অন্ধকারে মাসজিদে যায়, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের পেছনে পরিপূর্ণ আলোর ব্যবস্থা করবেন।”[৪৫০]
অসুস্থ অবস্থায় ও বৈরী আবহাওয়ায় মাসজিদে যাওয়া
৪০২. সা'দ ইবনু উবাইদা বলেন, "আবূ আবদুর রহমান সুলামি রহিমাহুল্লাহ অসুস্থ থাকা অবস্থায় বৃষ্টি ও কাদার মধ্যেও তাঁকে মাসজিদে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন।”[৪৫১]
সালাতের জন্য অপেক্ষার ফজিলত
৪০৩. আতা ইবনু সায়িব বলেন, আমরা আবূ আবদুর রহমান সুলামি-র কাছে গেলাম। তিনি তখন মাসজিদে ছিলেন। তাঁকে বললাম, বিছানায় গিয়ে বিশ্রাম নিলেই তো পারতেন, ক্লান্তিও দূর হতো। তিনি তখন বললেন, জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا يَزَالُ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاةٍ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ
"যতক্ষণ কেউ সালাতের স্থানে সালাতের অপেক্ষায় থাকে, ততক্ষণ সে সালাতরত বলেই গণ্য হয়।”[৪৫২]
অন্ধকার রাতে মাসজিদে যাওয়ার প্রতিদান
৪০৪. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “পূর্বসূরিরা বলতেন, অন্ধকার রাতে (মাসজিদে) গেলে (জান্নাত) আবশ্যক হয়ে যায়।”[৪৫৩]
মানুষ জানে না কোনটাতে রয়েছে কল্যাণ
৪০৫. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আমি কি আমার পছন্দনীয় নাকি অপছন্দনীয় অবস্থায় সকালে উপনীত হলাম, তা নিয়ে কোনো পরোয়া করি না। কারণ, আমার পছন্দনীয় বিষয়ে কল্যাণ আছে নাকি অপছন্দনীয় বিষয়ে, তা তো আমি জানি না।”[৪৫৪]
প্রাপ্তি বড়ো নাকি অপ্রাপ্তি?
৪০৬. মা'মার থেকে বর্ণিত। সালিহ ইবনু মিসমারকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে যেসব নিয়ামাত দিয়েছেন, সেগুলো বড়ো? নাকি যা আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন, সেগুলো বড়ো?-তা আমি জানি না।”[৪৫৫]
টিকাঃ
[৪৩৪] বুখারি, ২৭৩৪, ২৮২৭; মুসলিম, ২৩৮২।
[৪৩৫] আবু নুআইম, হিলইয়া, ১/৬১, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৩৬] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৩৭] সনদ সহীহ, মুরসাল।
[৪৩৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত। এই প্রসঙ্গে বহু সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
[৪৩৯] সূরা আল ইমরান: ২০০।
[৪৪০] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৪/১৪৮, মাওকুফ।
[৪৪১] মুসলিম, হাদীস নং ৬১০; নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১/৮৯, ৯০, হাদীস নং ১৩৯। হাদীসটির সনদ মুনকাতি; কিন্তু হাদীসের মতন সহীহ।
[৪৪২] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/২১১, সনদ হাসান।
[৪৪৩] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৪৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২১২, খালিদ ইবনু মা'দান পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৪৪৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৪৬] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৪৭] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৪৪৮] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[৪৪৯] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪৫০] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত; এটির সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদের সঙ্গে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। আবূ দাউদ, সুনান, হাদীস নং ৫৫৭; ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৭৭৯।
[৪৫১] হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৪৫২] হাদীসটির সনদ সালিহ।
[৪৫৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/২২৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৫৪] হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৫৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 অন্তিম মুহূর্তের উপদেশ
পঞ্চম অনুচ্ছেদ
অন্তিম মুহূর্তের উপদেশ
আল্লাহর ওপর ভরসাই সবকিছু
৪০৭. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সালমান ফারিসি ও আবদুল্লাহ ইবনু সালাম রদিয়াল্লাহু আনহুমা একত্র হলেন। তাঁদের একজন অপরজনকে বললেন, "আপনি যদি আমার আগেই আপনার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তা হলে (স্বপ্নযোগে) আমার সাথে দেখা করে জানাবেন কেমন আছেন। আর আমি যদি আপনার আগে আমার রবের সাক্ষাতে চলে যাই, তা হলে আমি স্বপ্নযোগে আপনার সাথে দেখা করে জানাব।" তাঁদের একজন মারা যাওয়ার পর অপরজনের সাথে স্বপ্নযোগে সাক্ষাৎ করে বললেন, “তাওয়াক্কুল করুন, আর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমি তাওয়াক্কুলের মতো আর কিছু দেখিনি।” কথাটি তিনি তিনবার বললেন।”[৪৫৬]
একটি গুরুত্বপূর্ণ দুআ
৪০৮. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু ইয়ায়িদ রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي حُبَّكَ وَحُبَّ مَا يَنْفَعُنِي حُبُّهُ عِنْدَكَ، اللَّهُمَّ مَا رَزَقْتَنِي مِمَّا أُحِبُّ، فَاجْعَلْهُ لِي قُوَّةً فِيمَا تُحِبُّ، وَمَا زَوَيْتَ عَنِّي مَا أُحِبُّ، فَاجْعَلْهُ لِي فَرَاغًا فِيمَا تُحِبُّ
“হে আল্লাহ, আমাকে আপনার ভালোবাসা দান করুন। যা কিছুর ভালোবাসা আমার উপকারে আসবে, সে-সবকিছুর ভালোবাসা দান করুন। হে আল্লাহ, আমার পছন্দের যা কিছু আপনি আমাকে দিয়েছেন, আপনার পছন্দের কাজ করার ক্ষেত্রে সেসবকে আমার জন্য শক্তিতে পরিণত করুন। আমার পছন্দের যা কিছু আপনি দূরে সরিয়ে নিয়েছেন সেসব শূন্য জায়গায় আপনার পছন্দের সবকিছু বসিয়ে দিন।”[৪৫৭]
মজলিস থেকে ওঠার দুআ
৪০৯. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার সময় এই দুআগুলো পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا يَحُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيْكَ، وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ رَحْمَتَكَ، وَمِنَ الْيَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا مُصِيبَاتِ الدُّنْيَا، وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا، وَاجْعَلْهُ الْوَارِثَ مِنَّا، وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا، وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا، وَلَا تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا، وَلَا تَجْعَلِ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا، وَلَا تُسَلِّطْ عَلَيْنَا مَنْ لَا يَرْحَمُنَا
"হে আল্লাহ! আমাদেরকে তোমার এমন ভয় দান করো, যা আমাদের ও তোমার অবাধ্যতার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে; তোমার এমন আনুগত্য করার সামর্থ্য দাও, যা আমাদেরকে তোমার জান্নাতে পৌঁছে দেবে; এমন সন্দেহমুক্ত ঈমান দাও, যা দুনিয়ার মুসিবতগুলোকে আমাদের কাছে তুচ্ছ করে দেবে! আমাদের শ্রবণশক্তি দিয়ে উপকৃত হতে দাও, দৃষ্টিশক্তি ও শারীরিক শক্তি থেকে উপকৃত হতে দাও, যতদিন তুমি আমাদের বাঁচিয়ে রাখো! এসব শক্তিকে আমাদের ওয়ারিশ বানিয়ে দাও! আমাদের জালিমদের বিরুদ্ধে আমাদের ক্রুদ্ধ করে তোলো! আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো; আমাদের দ্বীন-পালনে কোনো মুসিবত রেখো না; দুনিয়া যেন আমাদের সবচেয়ে বড়ো ভাবনার বস্তু না হয়; আমাদের জ্ঞানের লক্ষ্য যেন দুনিয়া না হয়; আমাদের ওপর এমন কাউকে চাপিয়ে দিয়ো না, যে আমাদের ওপর দয়া করবে না!”[৪৫৮]
মৃত্যুর আগে বান্দার শাস্তি প্রত্যক্ষ করা
৪১০. কাসীর ইবনু সুওয়াইদ রহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছেন, “বান্দাকে যে শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে, সেই শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত কোনো বান্দাই দুনিয়া থেকে বেরিয়ে যাবে না (বা মৃত্যুবরণ করবে না)।”[৪৫৯]
মৃত্যুসংবাদ প্রচার না করার অনুরোধ
৪১১. রবী' ইবনু খুসাইম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমার (মৃত্যুর) ব্যাপারে কাউকে টের পেতে দিয়ো না। আমাকে আমার রবের কাছে গোপনে রেখে এসো।”[৪৬০]
কবরের ভীতি
৪১২. শা'বী রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু যখন আহত হলেন, তখন তাঁর জন্য দুধ পাঠানো হলো। তিনি দুধ পান করলেন, কিন্তু জখম দিয়ে বেরিয়ে গেল। তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। তাঁর পাশে যাঁরা বসে ছিলেন, তারা তাঁর প্রশংসা করতে শুরু করলেন। তখন তিনি বললেন, আমি দুনিয়াতে যেভাবে এসেছি সেভাবেই খালি হাতে বেরিয়ে যেতে চাই। বিশ্বের সবকিছুই যদি আজ আমার মালিকানায় থাকত, তবে কবরের ভীতি থেকে বাঁচার জন্য আমি তা সদাকা করে দিতাম।[৪৬১]
মৃত্যুর পর দ্রুত দাফন করার নির্দেশ
৪১৩. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু- এর মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। আমি তাঁর মাথা উঠিয়ে কোলের ওপর রাখলাম। এরপর তাঁর জ্ঞান ফিরে এল। তিনি বললেন, আমার মাথাটা মাটিতে রাখো। এই বলে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলেন। আমি তাঁর মাথা কোলে নিলাম। আবার তাঁর জ্ঞান ফিরে এল। বললেন, যা করতে বলেছি, তা-ই করো। আমার মাথা জমিনে রাখো। তখন আমি বললাম, আব্বু, আমার কোল ও জমিন তো একই কথা! তিনি বললেন, “হারিয়ে যাক তোমার মা, যা করতে বলেছি, তা-ই করো। আমার মাথা জমিনে রাখো। আর শোনো, আমি মারা গেলে খুব দ্রুত আমাকে কবরে রেখে আসবে। যেখানে আমাকে রেখে আসছ সেটা হয়তো কল্যাণকর হবে; অথবা হবে অকল্যাণকর—যে অকল্যাণ তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে (কবরে) নামিয়ে রাখছ।”[৪৬২]
ক্ষমা না করা হলে ধ্বংস অনিবার্য
৪১৪. উসামা ইবনু যাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মৃত্যুর সময় তাঁর ছেলেকে বললেন, “ছেলে আমার, আমার মুখমণ্ডল মাটির ওপর রেখে দাও। হয়তো আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি রহম করবেন।” আবদুল্লাহ ইবনু উমর মাটি দিয়ে তাঁর দুই গাল মুছে দিলেন। তারপর তিনি একেবারে হুঁশ হারিয়ে ফেললেন। ইবনু উমর বলেন, “আমি তাঁর মাথা কোলের ওপর রাখলাম। তখন তিনি হুঁশ ফিরে পেয়ে বললেন, আমার মুখমণ্ডল মাটির ওপর রেখে দাও, হয়তো আল্লাহ তাআলা আমাকে রহম করবেন। তারপর বললেন, ধ্বংস হোক উমর, ধ্বংস হোক তার মা, যদি তাকে ক্ষমা না করা হয়।”[৪৬৩]
আল্লাহর পক্ষ থেকে দূতের অপেক্ষায়
৪১৫. মা'মার বলেন, ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ মৃত্যুর সময় কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কাঁদছেন কেন? তিনি বলেন, “আমি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একজন দূতের অপেক্ষা করছি, যিনি আমাকে হয়তো জান্নাতের সংবাদ দেবেন নয়তো জাহান্নামের।”[৪৬৪]
মানুষের মৃত্যুই কিয়ামাত
৪১৬. হাম্মাদ ইবনু সাঈদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন আবূ আতিয়্যার মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হলো, আপনি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছেন? তিনি বললেন, পাব না কেন? মৃত্যুই তো কিয়ামাত। এরপর আমার অবস্থা কী হবে, তা তো আমি জানি না।”[৪৬৫]
আল্লাহর ক্ষমা ছাড়া আর কিছু যথেষ্ট নয়
৪১৭. আবূ নাওফাল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুশয্যায় গালে হাত রেখে বললেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যা কিছুর নির্দেশ দিয়েছেন তা আমরা ছেড়ে দিয়েছি এবং যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন তা আমরা করে ফেলেছি। তাই আপনার ক্ষমা ছাড়া কোনো-কিছুই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট নয়। তিনি কথাগুলো বারবার বলছিলেন আর এই অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করলেন।”[৪৬৬]
মৃত্যুর আগে আমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কথা
৪১৮. আবদুর রহমান ইবনু শিমাসা বলেন, আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু-এর মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তখন আবদুল্লাহ তাঁকে বললেন, কাঁদছেন কেন? মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছেন নাকি? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছি না; কিন্তু মৃত্যুর পরে (কী ঘটবে তার জন্য ভয় পাচ্ছি)। আবদুল্লাহ তাঁকে বললেন, আপনি তো ভালো কাজ করতেন ও সত্যপথের ওপর (অটল) ছিলেন। তিনি তাঁকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য ও শামদেশ বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। তখন আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি তো (একসময়) এর চেয়েও বড়ো জিনিস ছেড়ে দিয়েছি। তা হলো 'লা ইলাহা ইল্লালাহ'র সাক্ষ্য। ভালো করেই জানি যে, আমি তিনটি অবস্থায় ছিলাম। প্রথমে ছিলাম কাফির। তখন আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সবচেয়ে কঠোর ছিলাম। সে সময় মারা গেলে জাহান্নাম আমার জন্য অবধারিত হয়ে যেত। তারপর যখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বাইআত নিলাম, তখন আমি তাঁর প্রতি সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীল ছিলাম। লজ্জার কারণে দুচোখ-ভরে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখতে পারিনি। সে সময় আমি মারা গেলে মানুষ বলত, 'আমরের কল্যাণ হোক। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং সত্যের ওপর (অটল) থেকেছে। সে উত্তম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। আশা করা যায় যে সে জান্নাত পাবে।' কিন্তু তারপর আমি এমন সব বিষয়ে জড়িয়ে গেছি যে, আমি জানি না সেগুলো আমার পক্ষে গেছে নাকি বিপক্ষে। তাই আমি মারা গেলে (তোমরা) আমার জন্য বিলাপ করবে না। আমাকে জাহান্নামের অনুগামী বানিয়ো না। গায়ের ওপর আমার চাদর ভালো করে বেঁধে দেবে। আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হব। আমার ওপর হালকাভাবে মাটি ছড়িয়ে দেবে। আমার ডান পাশ বাম পাশের চেয়ে বেশি মাটির হকদার নয়। আমার কবরে তোমরা কাঠ বা পাথর কিছুই দিয়ো না। উট জবাই করে তার গোশত কাটতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় শুধু আমার কবরের পাশে বসবে। আমি তোমাদের থেকে ভালোবাসা কামনা করি।”[৪৬৭]
টিকাঃ
[৪৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/২০৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৫৭] হাদীসটির সনদ হাসান। তিরমিযি, সুনান, ৩৪৯০। তিনি বলেছেন, এটা হাসান গরীব হাদীস।
[৪৫৮] হাদীসটির সনদ হাসান। তিরমিযি, সুনান, ৩৫০২। তিনি বলেছেন, এটা হাসান গরীব হাদীস।
[৪৫৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৪৬০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৪০, হাদীসটির সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৪৬১] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৩/৫, হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৬২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত; অন্য সনদে এর সমার্থবোধক হাদীস মুত্তাসিলরূপে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৩/৩৬০ ও ৩/৩৫৯।
[৪৬৩] হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৬৪] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/২২৪, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৬৫] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৫/১৪, হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৬৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ মুনকাতি।
[৪৬৭] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৪/২৫৮, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
📄 মুমিনের শেষ পরিণতি
ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ
মুমিনের শেষ পরিণতি
মৃত্যুশয্যায় মানুষকে সুসংবাদ জানানো
৪১৯. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “মানুষকে জীবদ্দশায় তার রবের ভয় দেখিয়ো। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় তাকে সুসংবাদ জানাবে, যাতে সে আল্লাহর প্রতি সুধারণা নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে।”[৪৬৮]
মুমিন বান্দার জন্য মৃত্যুর সময় সুসংবাদ
৪২০. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন কোনো বান্দার আত্মা তার কণ্ঠনালীতে চলে আসে তখন ফেরেশতারা তার কাছে এসে বলে, হে আল্লাহর ওলি, আস-সালামু আলাইকুম। আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি সালাম প্রেরণ করেছেন। তারপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন-
الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيِّبِينَ يَقُولُونَ سَلَامٌ عَلَيْكُمُ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
“পবিত্র থাকা অবস্থায় [৪৬৯] ফেরেশতাগণ যাদেরকে (মৃত্যুর মাধ্যমে) গ্রহণ করবেন তাদেরকে বলবেন, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমাদের আমলের বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ করো।”[৪৭০]-[৪৭১]
মৃত্যুর পর রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের সাক্ষাৎ ও আলোচনা
৪২১. আবু আইয়ুব আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কোনো বান্দা মারা গেলে আল্লাহ তাআলার রহমত-প্রাপ্ত বান্দারা তাঁর সাথে দেখা করে, ঠিক যেভাবে তারা দুনিয়াতে সুসংবাদ-প্রদানকারীর সাথে দেখা করত। তারা তার কাছে এসে নানা বিষয় জিজ্ঞাসা করে। একজন আরেকজনকে বলে, ভাইটিকে বিশ্রাম নিতে দাও। সে অনেক বিপদের মধ্যে ছিল। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করে, অমুক পুরুষ কী করেছে? অমুক মহিলা কী করেছে? সে মহিলা কি বিয়ে করেছে? তার আগে মারা গেছে, এমন কারও ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, সে তো আমার আগেই মারা গেছে। তখন তারা বলে ওঠে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। সে তো হাবিয়া[৪৭২] নামক বাসস্থানে চলে গেছে। তা কতই না নিকৃষ্ট বাসস্থান, কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল। তারপর তাদের সামনে ওই বান্দার আমলনামা পেশ করা হয়। আমলনামা ভালো দেখলে তারা আনন্দিত ও উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, এটা আপনার বান্দার প্রতি আপনার নিয়ামাত। সুতরাং তা পূর্ণ করে দিন। যদি তা খারাপ দেখে তবে বলে, হে আল্লাহ, আপনি আপনার বান্দার (আমলনামা)-কে পুনরায় বিবেচনা করুন।”[৪৭৩]
জমিন মানুষের জন্য কাঁদে
৪২২. দাউদ ইবনু কাইস বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, "নিশ্চয় এই জমিন কারও কারণে কাঁদে আর কারও জন্যে কাঁদে। যে ব্যক্তি জমিনের ওপর আল্লাহর আনুগত্য করে জমিন তার জন্য কাঁদে। যে ব্যক্তি জমিনের ওপর নাফরমানি করে জমিন তার কারণে কাঁদে।” তারপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন, فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ
“আকাশ এবং পৃথিবী কেউই তাদের জন্য কাঁদেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হয়নি।”[৪৭৪]-[৪৭৫]
মুমিন বান্দাদের আত্মাগুলো পাখির আকৃতিতে থাকবে
৪২৩. খালিদ ইবনু মা'দান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস বলেছেন, “মুমিন বান্দাদের আত্মাগুলো যুরযুর [৪৭৬] পাখির মতো থাকে, তারা পরস্পরকে চিনতে পারে। জান্নাতের ফল থেকে তারা রিযক পায়।”[৪৭৭]
জীবিত ব্যক্তিদের সংবাদ মৃতদের কাছে পৌঁছায়
৪২৪. উসমান ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনু জুবাইর রহিমাহুল্লাহ তাঁকে বললেন, “আমার ভাতিজির সাথে একটু দেখা করতে চাই।” তিনি উসমানের স্ত্রী এবং আমর ইবনু আওসের মেয়ে। উসমান বলেন, “আমি অনুমতি দিলাম। এরপর তিনি আমার স্ত্রীর কাছে এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার স্বামী তোমার সাথে কেমন আচরণ করে?” আমার স্ত্রী জবাব দিলেন, “সাধ্যমতো আমার সাথে ভালো ব্যবহার করে।” এটুকু বলে স্ত্রী আমার দিকে তাকাল। তারপর সাঈদ ইবনু জুবাইর রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, “হে উসমান, তোমার স্ত্রীর সাথে সদাচার কোরো। তার সাথে যা-ই করো না কেন তার সংবাদ (তোমার মৃত-শ্বশুর) আমর ইবনু আওসের কাছে পৌঁছে যাবে।” আমি বললাম, “জীবিতদের সংবাদ কি মৃতদের কাছে পৌঁছায়?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, পৌঁছায়। মৃতব্যক্তির কাছে তার নিকটাত্মীয়দের সংবাদ পৌঁছানো হয়। সংবাদ যদি ভালো হয় তবে সে আনন্দিত হয়, উৎফুল্ল হয়, উচ্ছ্বসিত হয়। আর সংবাদ যদি খারাপ হয় তবে সে হতাশ হয়ে পড়ে, কষ্ট পায়। এমনকি সদ্য-মৃত-ব্যক্তি সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞেস করা হয়। বলা হয়, সে কি তোমাদের কাছে আসেনি? তারা বলে, তাকে হাবিয়া নামক বাসস্থানে নিক্ষেপ করা হয়েছে।”[৪৭৮]
টিকাঃ
[৪৬৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ মুনকাতি।
[৪৬৯] অর্থাৎ, শিরকের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র থাকা অবস্থায়।
[৪৭০] সূরা নাহল: আয়াত ৩২।
[৪৭১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৪৭২] হাবিয়া অর্থ গভীর গর্ত। এখানে জাহান্নামের নিম্নস্তর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
[৪৭৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ। আবু হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদের সঙ্গে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৪৭৪] সূরা দুখান: আয়াত ২৯।
[৪৭৫] আবু নুআইম, হিলইয়া, ৩/২৪২। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৭৬] স্টারলিং বা শালিক-জাতীয় পাখি।
[৪৭৭] মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ১/২৪০, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৭৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
📄 আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে
সপ্তম অনুচ্ছেদ
আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে
আত্মতৃপ্তির চেয়ে অনুশোচনা উত্তম
৪২৫. জাফর ইবনু হাইয়ান তাঁর কিছু সঙ্গী থেকে বর্ণনা করেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু শিখখির রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “রাত জেগে ইবাদাত করার পর আত্মতৃপ্তি নিয়ে ভোরে জেগে ওঠার চেয়ে রাতের বেলা ঘুমানো এবং অনুতপ্ত হয়ে ভোরে জেগে ওঠা আমার কাছে উত্তম।”[৪৭৯]
দান করে প্রশংসা চাওয়া ঘৃণ্য কাজ
৪২৬. আবুস সালীল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ- কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, “একজন মানুষ দান করে, ভালো কাজ করে; কিন্তু প্রতিদান ও প্রশংসা পেতে পছন্দ করে, তার ব্যাপারে আপনার কী মত?” জবাবে তিনি বললেন, “তুমি কি ঘৃণিত হতে পছন্দ করো?”[৪৮০]
জাহান্নামের জ্বালানি যারা
৪২৭. আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَظْهَرُ هَذَا الدِّينُ حَتَّى يُجَاوِزَ الْبِحَارَ، وَحَتَّى يُخَاضَ بِالْخَيْلِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، ثُمَّ يَأْتِي أَقْوَامٌ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ، فَإِذَا قَرَءُوهُ، قَالُوا: قَدْ قَرَأْنَا الْقُرْآنَ، فَمَنْ أَقْرَأُ مِنَّا؟ مَنْ أَعْلَمُ مِنَّا ثُمَّ الْتَفَتَ إِلَى أَصْحَابِهِ، فَقَالَ: هَلْ تَرَوْنَ فِي أُولَبِكَ مِنْ خَيْرٍ ۚ قَالُوا: لَا ، قَالَ: فَأُولَبِكَ مِنْكُمْ، وَأُولَبِكَ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ، وَأُولَبِكَ هُمْ وَقُودُ النَّارِ
“এই দ্বীন বিজয়ী হবে, এমনকি সাগর-সমুদ্র পেরিয়ে যাবে এবং আল্লাহর পথে (মুজাহিদগণ) ঘোড়া নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর এমন জাতির আগমন ঘটবে যারা কুরআন পাঠ করবে। তারা যখন কুরআন পাঠ করবে, বলবে, আমাদের চেয়ে ভালো কুরআনপাঠক (ক্বারী) আর কে আছে? আমাদের চেয়ে জ্ঞানী আর কে আছে?” তারপর তিনি তাঁর সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি ওইসব লোকের মধ্যে কোনো কল্যাণ দেখতে পাও?” তাঁরা বললেন, "না।” তিনি বললেন, "তারা তোমাদের মতোই; তারা এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। তারাই হবে জাহান্নামের লাকড়ি।”[৪৮১]
ক্বারীদের মধ্যে অধিকাংশ মুনাফিক
৪২৮. আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَكْثَرُ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا
“আমার উম্মতের অধিকাংশ মুনাফিক হলো ক্বারীরা।”[৪৮২]
আমল-ইবাদাত নিয়তের ওপর নির্ভরশীল
৪২৯. দামরাতা ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمَلَائِكَةَ يَرْفَعُونَ أَعْمَالَ الْعَبْدِ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ، يَسْتَكْثِرُونَهُ، وَيُزَكُونَهُ حَتَّى يَبْلُغُوا بِهِ إِلَى حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ مِنْ سُلْطَانِهِ، فَيُوحِى اللَّهُ إِلَيْهِمْ أَنَّكُمْ حَفَظَةٌ عَلَى عَمَلِ عَبْدِي، وَأَنَا رَقِيبٌ عَلَى مَا فِي نَفْسِهِ، إِنَّ عَبْدِي هَذَا لَمْ يُخْلِصُ لِي، وَلَمْ يُخْلِصُ عَمَلَهُ فَاجْعَلْهُ فِي سِجِّينٍ ، وَيَصْعَدُونَ بِعَمَلِ الْعَبْدِ يَسْتَقِلُّونَهُ ، وَيَحْقِرُونَهُ حَتَّى يَنْتَهُوا بِهِ إِلَى حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ مِنْ سُلْطَانِهِ ، فَيُوحِى اللَّهُ إِلَيْهِمْ أَنَّكُمْ حَفَظَةٌ عَلَى عَمَلٍ عَبْدِي ، وَأَنَا رَقِيبٌ عَلَى مَا فِي نَفْسِهِ ، إِنَّ عَبْدِي هَذَا أَخْلَصَ عَمَلَهُ فَاكْتُبُوهُ فِي عِلِّيِّينَ
"আল্লাহ তাআলার কোনো-এক বান্দার আমল ওপরে ওঠানোর সময় ফেরেশতাগণ তা ভারী এবং পবিত্র মনে করতে থাকেন। অবশেষে তাঁরা তার আমলকে আল্লাহ তাআলার দরবারে পৌঁছে দিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা তখন ফেরেশতাদের প্রতি ওহি পাঠান: তোমরা আমার বান্দার আমলের হেফাজতকারী ছিলে আর আমি তার অন্তরের ব্যাপারে সম্মক অবগত। আমার এই বান্দা আমার প্রতি একনিষ্ঠ ছিল না। তার ইবাদাতও ইখলাসপূর্ণ ছিল না। সুতরাং তাকে সিজ্জিনে [৪৮৩] রাখো। ফেরেশতাগণ আল্লাহর অপর-এক বান্দার আমল নিয়ে ওপরে ওঠার সময় তার আমলকে হালকা ও তুচ্ছ মনে করেন। কিন্তু আল্লাহর দরবারে নেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি ওহি পাঠান: তোমরা আমার বান্দার আমলের হেফাজতকারী ছিলে আর আমি তার অন্তরের ব্যাপারে সম্মক অবগত। আমার এই বান্দার ইবাদাত ইখলাসপূর্ণ ছিল। সুতরাং তার নাম ইল্লিয়িনে [৪৮৪] লিখে দাও।”[৪৮৫]
কোনো বান্দার জন্য মানুষের প্রশংসা স্থিতিশীল নয়
৪৩০. রবী' ইবনু যিয়াদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে কোনো বান্দার প্রশংসা ততক্ষণ স্থায়ী হয় না, যতক্ষণ না তার প্রশংসা আসমানের অধিবাসীদের কাছে স্থায়ী হয়।”[৪৮৬]
আল্লাহর সন্তুষ্টির সংবাদ দুনিয়াবাসীর কাছে পৌঁছে যায়
৪৩১. মুত্তালিব ইবনু হানতাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হলে জিবরাঈলকে ডাকেন। জিবরাঈল তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন, আল্লাহ যতক্ষণ চান, ততক্ষণ (তিনি ওই অবস্থাতেই থাকেন)। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর বলেন, হে রাব্বুল আলামিন, আমি উপস্থিত। আল্লাহ বলেন, আমি অমুক বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেছি। তখন ফেরেশতাগণ বলেন, আল্লাহ তাআলা অমুক বান্দার প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন। এই সংবাদ দুনিয়াতে পৌঁছে যায়।
ইমাম আওযাঈ বলেন, আমার ধারণা, মুত্তালিব ইবনু হানতাব আরও বলেছেন, “যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট হন তখনও অনুরূপ ঘটনা ঘটে।”[৪৮৭]
জান্নাতী ও জাহান্নামীর পরিচয়
৪৩২. আবুল জাওযা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ، وَأَهْلِ النَّارِ؟ أَهْلُ الْجَنَّةِ مَنْ مُلِئَتْ مَسَامِعُهُ مِنَ الثَّنَاءِ الْحَسَنِ وَهُوَ يَسْمَعُ، وَأَهْلُ النَّارِ مَنْ مُلِئَتْ مَسَامِعُهُ مِنَ الثَّنَاءِ السَّيِّئِ وَهُوَ يَسْمَعُ
"জান্নাত আর জাহান্নামের অধিবাসীদের কথা আমি কি তোমাদের জানাব না? সুন্দর প্রশংসা শুনতে শুনতে যাদের কান পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা তা শোনার উপযুক্ত, তারাই জান্নাতী। আর যাদের কান নিন্দনীয় কথা (শুনতে শুনতে) পরিপূর্ণ হয় এবং তারা তা শোনার উপযুক্ত, তারাই জাহান্নামী।”[৪৮৮]
রাসূলগণের প্রতি ও মুমিনগণের প্রতি নির্দেশ
৪৩৩. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওই নির্দেশই দিয়েছেন, যা তিনি দিয়েছিলেন নবিদেরকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا
“ওহে রাসূলগণ! পাক-পবিত্র জিনিস খাও এবং সৎকাজ করো।”[৪৮১] তিনি (আরও) বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদের যে-সমস্ত পাক-পবিত্র জিনিস দিয়েছি, সেগুলো খাও।”[৪৯০]
এরপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সফরের দরুন যার চুল উশকোখুশকো, চেহারা ধুলামলিন; সে হাত দুটি আকাশের দিকে তুলে ধরে বলছে 'রব আমার, রব আমার!' কিন্তু তার খাবার হারাম, পোশাক হারাম, তা হলে, কীভাবে তার ডাকে সাড়া দেওয়া হবে?'[৪৯১]
উদাসীন মন নিয়ে দুআ করলে তা কবুল হয় না
৪৩৪. সালিহ ইবনু মিসমার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, [৪৯২]
تَدْعُونِي وَقُلُوبُكُمْ مُعْرِضَةٌ، فَبَاطِلُ مَا تَرْهَبُونَ
"তোমরা যদি গাফেল অন্তর নিয়ে আমাকে ডাকো তা হলে তোমাদের (আল্লাহ)-ভীতির কোনো মূল্যই নেই।”[৪৯৩]
বিশেষ দলের জন্য দুআ কবুল হবে না
৪৩৫. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এমন-এক যুগ আসবে যখন মুমিন বান্দা একটি গোষ্ঠীর জন্য দুআ করবে। ফলে তার দুআ কবুল করা হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তুমি নিজের বিশেষ পরিস্থিতির জন্য দুআ করো, আমি তোমার দুআ কবুল করব।' আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, 'কারণ তারা আমাকে অসন্তুষ্ট করেছে।”[৪৯৪]
মুনাফিকের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য থাকে না
৪৩৬. মুহাম্মাদ ইবনু হামযা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
خَصْلَتَانِ لَا تَكُونَانِ فِي مُنَافِقٍ، حُسْنُ سَمْتٍ، وَلَا فِقْهُ فِي الدِّينِ
“মুনাফিকের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য থাকে না: সুন্দর আচরণ এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞান।”[৪৯৫]
রোজাদারের বৈশিষ্ট্য
৪৩৭. ইবনু জুরাইজ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুলাইমান ইবনু মূসা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “রোজা রাখলে নিজের কান, চোখ ও জিহ্বাকেও মিথ্যা থেকে বিরত রেখো। খাদেমকে কোনোরূপ কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থেকো। শান্ত ও ধীরস্থির থেকো। রোজা রাখার দিন ও রোজা না-রাখার দিনগুলোকে সমান পর্যায়ের কোরো না।”[৪৯৬]
প্রশ্নহীনভাবে তাকদীরকে মেনে নেওয়া
৪৩৮. মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি একদিন ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলাম। তাঁকে বললাম, আমি আপনাকে যে অবস্থায় দেখছি, তার কারণে আপনার কাছে আর আসব না। তিনি বললেন, তা করো না। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে অবস্থায় রাখতে চেয়েছেন, তা-ই আমার কাছে প্রিয়। জারীর বলেন, ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু-এর পেটে পানি জমে ফুলে গিয়েছিল। (এ কারণে তার ঘনঘন প্রস্রাব হতো।) ফলে ফুটোযুক্ত খাটে তিনি তিরিশ বছর অবস্থান করেছিলেন。[৪৯৭]
আল্লাহর কাছে যা প্রিয়, তা-ই প্রিয় করে নেওয়া
৪৩৯. জাফর ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু এর একটি কঠিন রোগ হয়। তাঁকে দেখতে আসা লোকেরা কেউ কেউ বলতেন, আপনার এখানে যা দেখি তা আপনার কাছে আসতে আমাদের বাধা দেয়। তিনি তখন বলতেন, “তোমরা তা কোরো না। আল্লাহ তাআলার কাছে যা কিছু প্রিয় তা-ই আমার কাছে প্রিয়।”[৪৯৮]
আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টি
৪৪. আবু হাইয়ান তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শামে এসে জিজ্ঞেস করলাম, সৈনিকদের মধ্যে কেউ কি অসুস্থ আছেন যাকে আমি দেখতে যেতে পারি? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, একজন আছেন। তিনি হলেন সুওয়াইদ হানযালি। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তাঁর স্ত্রী (স্বামীর উদ্দেশে) বলছিলেন, "আপনার জন্য আমার পরিবার কুরবান হোক। আপনি কী খেতে চান? কী পান করতে চান?"
তাঁর স্ত্রীকে যদি এই কথা বলতে না শুনতাম, তবে ওখানে কাপড় ছাড়া যে অন্যকিছু আছে, তা টেরই পারতাম না। আমি ভয়ই পেয়ে গেলাম। সুওয়াইদ টের পেয়ে তাঁর চেহারা থেকে কাপড় সরালেন। সুওয়াইদ আমাকে বললেন, "আমাকে এ অবস্থায় দেখে কষ্ট পেলেন নাকি?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, অবশ্যই, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই তাঁর কসম।” তিনি বললেন, "কষ্ট পাবেন না। আমার নিতম্বের ওপরিভাগের হাড় দুটো সরে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমি উপুড় হওয়া ছাড়া শুতে পারি না। যার হাতে সুওয়াইদের প্রাণ তাঁর কসম, নখের কাটা অংশ পরিমাণ যন্ত্রণা কমে গেলেও আমি আনন্দিত হব না।”[৪৯৯]
আল্লাহ বিপদ-আপদে ফেলে পরীক্ষা করেন
৪৪১. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ
“আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান, সে বিপদ-আপদে আক্রান্ত হয়।”[৫০০]
মৃত-সন্তান প্রতিদান-প্রাপ্তির মাধ্যম
৪৪২. ইয়াদ ইবন উকবা রহিমাহুল্লাহ এর এক ছেলে মারা গেল। যখন তিনি তার কবরে নামলেন, একজন ব্যক্তি তাকে বললেন, “আল্লাহর কসম, সে তো ছিল সেনাদলের নেতা। তাকে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার ওসিলা মনে করুন।” তখন তিনি বললেন, “অবশ্যই আমি তাকে ওসিলা মনে করি। গতকাল পর্যন্ত সে ছিল পার্থিব সৌন্দর্য, আর আজ সে (ওসিলা পাওয়ার) স্থায়ী সৎকর্ম।”[৫০১]
কষ্টের সময় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
৪৪৩. উমাইর ইবনু সাইফ খাওলানি থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ মুসলিম খাওলানিকে বলতে শুনেছেন, “আমার কোনো সন্তানের জন্ম হওয়া, আল্লাহর মেহেরবানিতে তার ভালোভাবে বেড়ে ওঠা, তারপর যৌবনে উপনীত হওয়া এবং আমার কাছে বিস্ময়কর বস্তুতে পরিণত হওয়া, অতঃপর আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাকে উঠিয়ে নেওয়া আমার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে তার থেকে উত্তম।”[৫০২]
বিপদ-আপদে সান্ত্বনা দেওয়া কর্তব্য
৪৪৪. আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لِيُعَزِّى الْمُسْلِمِينَ عَنْ مَصَابِبِهِمْ الْمُصِيبَةُ بِي
“মুসলমানদেরকে যেন তাদের বিপদ-আপদে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। আর আমার মৃত্যু হলো সবচেয়ে বড়ো বিপদ।”[৫০৩]
ধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ যেমন
৪৪৫. আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ
“শোকে তার চোখ দুটি সাদা (নিষ্প্রভ) হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন দুঃখভারাক্রান্ত।”[৫০৪]
মা'মার আযদি বলেন, এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন, “(ইউসুফ আলাইহিস সালাম) দুঃখ-যাতনা চেপে রেখেছিলেন এবং ভালো কথা ছাড়া কোনো কথা বলেননি।”[৫০৫]
প্রথম তিন জাহান্নামী
৪৪৬. শুফাইয়া ইবনু মাতি' রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার মদীনায় গেলাম। মাসজিদে ঢুকে দেখলাম যে লোকজন এক ব্যক্তিকে ঘিরে সমবেত হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? লোকেরা বলল, ইনি আবূ হুরায়রা। লোকেরা চলে যাওয়ার পর তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আবূ হুরায়রা, আপনি আমাকে এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করুন যা আপনি সরাসরি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন, যা আর কেউ শোনেনি। আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "হ্যাঁ, বলছি। অবশ্যই এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন এবং তা আর কেউ শোনেনি।” এ কথা বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, “হ্যাঁ, বলছি। অবশ্যই এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকেই বলেছেন এবং তা আর কোনো মানুষ শোনেনি।” দ্বিতীয়বার তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, “অবশ্যই এমন-একটি হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকেই বলেছেন এবং তা আর কোনো মানুষ শোনেনি।” তারপর তিনি তৃতীয়বার ও চতুর্থবারের মতো অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। এরপর জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, “বলছি। অবশ্যই তোমাকে এমন-একটি হাদীস বলব যা এই ঘরে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন। তখন আমার সঙ্গে আর কেউই ছিল না। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা বান্দাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন তাদের বিচার-ফয়সালা করার জন্য। সেদিন প্রত্যেক উম্মতই থাকবে নতজানু। প্রথম যে ব্যক্তিকে ডাকা হবে সে হলো কুরআনের হাফিজ (কুরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী)। আল্লাহ বলবেন, আমি আমার রাসূলের ওপর যা নাযিল করেছিলাম তোমাকে কি তার জ্ঞান দান করিনি?
সে বলবে, রব আমার, জি, অবশ্যই দিয়েছিলেন।
আল্লাহ বলবেন, তুমি যে জ্ঞান লাভ করেছিলে সে অনুসারে কী আমল করেছিলে? কুরআনের হাফিজ বলবে, রব আমার, আমি তো রাতদিন কুরআন নিয়েই ব্যাস্ত থেকেছি।
তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। ফেরেশতাগণও বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ।
আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, বরং তুমি চেয়েছিলে লোকেরা যেন তোমাকে বলে, অমুক লোক বড়ো ক্বারী। তোমাকে তা বলাও হয়েছে। তুমি যেতে পারো, আজ তোমার জন্য আমার কাছে কোনো প্রতিদান নেই।
তারপর ধনাঢ্য ব্যক্তিকে ডাকা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, হে আমার বান্দা, আমি কি তোমাকে নিয়ামাত দান করিনি? ধন-সম্পদ দান করিনি? তোমাকে প্রাচুর্য দিইনি?
সে বলবে, রব আমার, জি, অবশ্যই দিয়েছেন।
আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছি তা তুমি কোন কাজে ব্যায় করেছ?
ধনাঢ্য লোকটি বলবে, আমি তা দিয়ে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখেছি। দান-সদাকা করেছি। অমুক অমুক কাজ করেছি।
আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। ফেরেশতাগণও বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ।
আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, বরং তুমি চেয়েছিল লোকেরা যেন তোমাকে বলে, অমুক লোক বড়ো দানবীর। তোমাকে তা বলাও হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যেতে পারো, আজ আমার কাছে তোমার জন্য কোনো প্রতিদান নেই।
তারপর আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তিকে ডাকা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, কীভাবে তুমি নিহত হয়েছ?
সে বলবে, রব আমার, তোমার জন্য শহীদ হয়েছি। তোমার পথে নিহত হয়েছি।
তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। ফেরেশতাগণও বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ।
আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, বরং তুমি চেয়েছিলে যে, লোকেরা যেন তোমাকে বলে, অমুক লোক বিরাট বাহাদুর। তোমাকে তা বলাও হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যেতে পারো, আজ তোমার জন্য আমার কাছে কোনো প্রতিদান নেই।
আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তারপর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাঁটুতে তাঁর হাত চাপড়ালেন এবং বললেন, “আবূ হুরায়রা, এই তিনজন হলো আল্লাহ তাআলার ওইসব সৃষ্টি যাদেরকে কিয়ামাতের দিন জাহান্নাম সর্বপ্রথম দগ্ধ করবে।”
মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর তরবারি-বাহক আলা ইবনু হাকীম রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাতে এ হাদীসটি বর্ণনা করলেন। উকবা রহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারী শুফাইয়া-ই মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আসেন এবং হাদীসটি বর্ণনা করেন। তখন মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে ফেলেন এবং তাঁর কান্না তীব্র হয়ে ওঠে। তারপর শান্ত হয়ে বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন,
مَن كَانَ يُرِيدُ الحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যে-কেউ পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের পূর্ণফল দান করি এবং এখানে তাদেরকে কম দেওয়া হয় না। তাদের জন্য আখিরাতে আগুন ব্যতীত আর কিছু নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক।”[৫০৬]-[৫০৭]
বানী ইসরাঈলের উদ্দেশে আল্লাহ যা বলেছেন
৪৪৭. বাক্কার ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ তাআলা বানী ইসরাঈলের ধর্মগুরুদের দোষ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তোমরা দ্বীনি উদ্দেশ্য ছাড়া ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করো, আমল ছাড়া ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করো, আখিরাতের আমলের বিনিময়ে দুনিয়া ক্রয় করো। তোমরা মানুষকে প্রতারিত করার জন্য গায়ের ওপর ভেড়ার চামড়া জড়াও, কিন্তু বুকের মধ্যে নেকড়ের স্বভাব লুকিয়ে রাখো। তোমরা তোমাদের পানীয় থেকে ফুঁ দিয়ে ময়লা সরাও, অথচ পাহাড় পরিমাণ হারাম খেয়ে থাকো। তোমরা দ্বীনকে মানুষের ওপর পাহাড়ের মতো চাপিয়ে দাও, অথচ তাদেরকে কনিষ্ঠ আঙুল দিয়েও সাহায্য করো না। তোমরা সালাতকে দীর্ঘ করো, সাদা পোশাক পরিধান করো আর এগুলো দিয়ে ইয়াতীম ও বিধবাদের মাল আত্মসাৎ করো। আমার ইজ্জতের কসম, আমি তোমাদেরকে এমন-এক ফিতনায় নিমজ্জিত করব, যার ফলে তোমাদের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান লোকেরাও পথভ্রষ্ট হবে।”[৫০৮]
টিকাঃ
[৪৭৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২০০। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৪৮০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৮১] হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৪৮২] হাদীসটির সনদ সহীহ। বেশ কয়েকজন সাহাবি থেকে হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২২৮; মুসনাদ আহমাদ, ২/১৭৫।
[৪৮৩] সিজ্জিন: সপ্ত জমিনের নিচে অবস্থিত একটি স্থান।
[৪৮৪] ইল্লিয়িন: সপ্তম আকাশের নাম অথবা সৎ বান্দাদের আমল সংরক্ষণকারী ফেরেশতাদের দফতর।
[৪৮৫] হাদীসটি দুর্বল সনদের বর্ণিত।
[৪৮৬] আবু দাউদ, কিতাবুয যুহদ, ৪৭৫। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৮৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৮৮] আবু দাউদ, কিতাবুয যুহদ, ৫০৭। হাদীসটির মুরসালরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৪৮৯] সূরা আল-মু'মিনূন: আয়াত ৫১।
[৪৯০] সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৭২।
[৪৯১] মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৩; তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৯৮৯।
[৪৯২] একটি হাদীসে কুদসী।
[৪৯৩] সালিহ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৪৯৪] হাদীসটির মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ অত্যন্ত দুর্বল।
[৪৯৫] হাদীসটি মু'দালরূপে বর্ণিত; অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ার কারণে এটি সহীহ। তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৬৪৮; আলবানি, আস-সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস নং ১৫০৬।
[৪৯৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৪৯৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৪৮। হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৪৯৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ মুনকাতি।
[৪৯৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫০০] হাদীসটি সহীহ। বুখারি, ৫৩২১; মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ২/৯৪১।
[৫০১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৫০২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ হাসান।
[৫০৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।
[৫০৪] সূরা ইউসুফ: আয়াত ৮৪।
[৫০৫] হাদীসটি মাকতু।
[৫০৬] সূরা হুদ : আয়াত ১৫-১৬।
[৫০৭] হাদীসটির সনদ দুর্বল। অন্য কিতাবে হাসান সনদে সংক্ষিপ্তরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৫০৮] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।