📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 জবানকে সংযত রাখা

📄 জবানকে সংযত রাখা


দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
জবানকে সংযত রাখা

আল্লাহকে ভয় করে কথা বলা
৩৫৩. উমর ইবনু যর রহিমাহুমুল্লাহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى عِنْدَ لِسَانِ كُلِّ قَابِلٍ فَاتَّقَى اللَّهَ امْرُؤٌ عَلِمَ مَا يَقُولُ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বক্তার জিহ্বার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। তাই প্রত্যেকেই যেন আল্লাহকে ভয় করে চলে। কারণ, সে যা বলে আল্লাহ তাআলা তা সবই জানেন।”[৪০১]

ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা
৩৫৪. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ، مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
“আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি যে বিশ্বাস স্থাপন করেছে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি যে বিশ্বাস স্থাপন করেছে সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে। আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি যে বিশ্বাস স্থাপন করেছে সে যেন ভালো কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।"[৪০২]

জিহ্বা ধরে অনুশোচনা
৩৫৫. যাইদ ইবনু আসলাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জিহ্বা টেনে ধরে বলেছেন, "এটাই আমার সর্বনাশ করেছে।”[৪০৩]

জিহ্বার প্রতি বান্দার ক্রোধ
৩৫৬. সাঈদ ইবনু ইয়াস জুরাইরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে দেখলাম তিনি ঘরের খুঁটি ও দরজার মাঝখানে তাঁর জিহ্বার ডগা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আর বলছেন, "আফসোস তোমার জন্য, সত্য ও ভালো কথা বলো, তা হলে লাভবান হবে। অথবা মিথ্যা ও খারাপ কথা বলা থেকে বিরত থাকো, তা হলে নিরাপদ থাকবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, "হে ইবনু আব্বাস, কী ব্যাপার? আপনি জিহ্বা ধরে আছেন যে?” তিনি বললেন, "আমি জানতে পেরেছি যে, কিয়ামাতের দিন বান্দা তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্রুদ্ধ হবে তার জিহ্বার ওপর।”[৪০৪]

খেলতে যেতে অনুমতি না দেওয়া
৩৫৭. বকর ইবনু মাঈয থেকে বর্ণিত, রবী' ইবনু খুসাইম রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে তাঁর মেয়ে এসে বলল, “আব্বু, খেলতে যাই?” তিনি কোনো জবাব দিলেন না। মেয়েটি বারবার একই কথা বলতে লাগল। তাঁর কোনো কোনো সঙ্গী বললেন, অনুমতি দিয়ে দিন না! খেলতে চলে যাক। তখন তিনি বললেন, “ওকে খেলতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া আমার ওপর এখন ফরয না।”[৪০৫]

কল্যাণকর কথা বলা অথবা চুপ থাকা
৩৫৮. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ، مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও বিচার-দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও বিচার-দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও বিচার-দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন কল্যাণকর কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।”[৪০৬]

সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের কারণ জিহ্বা
৩৫৯. আদি ইবনু হাতিম রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তার দুই চোয়ালের মাঝখানে রয়েছে। আর সেটা হলো তার জিহ্বা।”[৪০৭]

কবিতা লিখে রাখা অপছন্দ করা
৩৬০. আবুদ দুহা বলেন, মাসরুক রহিমাহুল্লাহ-কে একটি কবিতার লাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি ব্যাপারটি অপছন্দ করলেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আমার পাণ্ডুলিপিতে কবিতা লেখা থাকুক, এমনটা আমার পছন্দ নয়।”[৪০৮]

বাচ্চাদের সাথেও মিথ্যে কথা না বলা
৩৬১. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “কেউ যদি তার বাচ্চাকে এভাবে লোভ দেখিয়ে ডাকে, “আসো, তোমাকে একটা মজার জিনিস দেব।” তারপর না দেয়, তা হলে তার নামে একটি মিথ্যাচার লেখা হয়।”[৪০৯]

অহেতুক কথাবার্তা থেকে সতর্কতা
৩৬২. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “অহেতুক কথা বোলো না, খবরদার। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু বলাই যথেষ্ট।”[৪১০]

উদ্দেশ্য-সাধনের নিকৃষ্ট পন্থা
৩৬৩. আবূ কিলাবা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবূ মাসউদ আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “মানুষের ধারণাভিত্তিক দাবির ব্যাপারে আপনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কী বলতে শুনেছেন? তিনি বললেন, রাসূল বলেছেন,
بِئْسَ مَطِيَّةُ الرَّجُلِ
"তা মানুষের উদ্দেশ্যসাধনের নিকৃষ্ট পন্থা।”[৪১১]

বেশি কথায় বেশি পাপ
৩৬৪. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “কিয়ামাতের দিন ওইসব লোকের পাপ সবচেয়ে বেশি হবে, যারা অহেতুক কথাবার্তায় নিজেদেরকে ডুবিয়ে রাখে।”[৪১২]

যা শোনে তা-ই বলা মিথ্যাচারী হওয়ার জন্য যথেষ্ট
৩৬৫. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কারও মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, সে যা শোনে তা-ই অন্যদের কাছে বলে বেড়ায়।”[৪১৩]

যে চুপ থাকে সে বেঁচে যায়
৩৬৬. খালিদ ইবনু আবী ইমরান রহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেকক্ষণ তাঁর জিহ্বা ধরে রাখলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন,
أَتَخَوَّفُ عَلَيْكُمْ هَذَا، رَحِمَ اللَّهُ عَبْدًا قَالَ خَيْرًا وَغَنِمَ، أَوْ سَكَتْ عَنْ سُوءٍ فَسَلِمَ
“এটা নিয়ে তোমাদের জন্য দুশ্চিন্তা হয়। আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার প্রতি রহম করেছেন যে ভালো কথা বলেছে ও লাভবান হয়েছে অথবা খারাপ কথা না বলে চুপ থেকেছে, ফলে বেঁচে গেছে।”[৪১৪]

কথার মাধ্যমে কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেললে করণীয়
৩৬৭. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে একদল লোক এসে তাদের জন্য সুপারিশ করতে অনুরোধ জানাল। তাঁর সঙ্গে যে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে সে কথাও উল্লেখ করল। উমর ইবনু আবদিল আযীয কেবল বললেন, হুঁ। তারপর তারা তাদের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করল। তখন তিনি বললেন, 'দেখা যাক।' এই কথা শুনে তারা যেন মনে কষ্ট পেয়ে চলে গেল। পরে তিনি তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে দিলেন।"[৪১৫]

দ্বীন খুইয়ে ঘরে ফেরা
৩৬৮. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কেউ কেউ দ্বীনকে সাথে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়, তারপর এর পুরোটাই হারিয়ে ঘরে ফেরে। সে এমন লোকের কাছে যায়, যে তার জন্য বা তার নিজের জন্য কোনো উপকার করার বা কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। তারই উদ্দেশে সে (কসম খেয়ে) বলে, "আপনি তো এটা পারেন, ওটা পারেন।” কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে, তার প্রয়োজনের কিছুই পূরণ করতে পারে না। এভাবে সে নিজের ওপর আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে।”[৪১৬] (ফলে সে তার দ্বীন খুইয়ে ফেলে।)

কথাকে কাজেরই অংশ মনে করা
৩৬৯. উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কথাকে যে কাজের অংশ মনে করে, তার কথা কমে যায়।”[৪১৭]

জিহ্বাকে অধিকাংশ সময় বন্দি করে রাখা দরকার
৩৭০. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যে জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কারাবন্দি করে রাখা দরকার, তা হলো জিহ্বা।”[৪১৮]

চুপ থাকলে মুক্তি মেলে
৩৭১. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ صَمَتَ نَجًا
“যে চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়।”[৪১৯]

নিরাপত্তার দুআ
৩৭২. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা হাদীস থেকে জেনেছি যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর একটি অংশ ছিল এরকম-
اللَّهُمَّ سَلَّمْ سَلَّمْ
“হে আল্লাহ, নিরাপদ রাখুন, নিরাপদ রাখুন।”[৪২০]

মুমিনের হৃদয় কোমল
৩৭৩. মাকহুল ইবনু আবী মুসলিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُؤْمِنُونَ هَيِّنُونَ لَيِّنُونَ، كَالْجَمَلِ الْأَنِفِ الَّذِي إِنْ قِيدَ انْقَادَ، وَإِذَا أُنِيخَ عَلَى صَخْرَةٍ اسْتَنَاخَ
“মুমিনরা হলো সহজ-সরল ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী; শান্তশিষ্ট উটের মতো, যখন তাকে সামনে চালানো হয়, সে চলে। যখন তাকে পাথুরে ভূমির ওপর বসানো হয়, সে বসে।”[৪২১]

আল্লাহর বড়োত্ব ও মহিমা প্রকাশের কিছু পন্থা
৩৭৪. আবূ মূসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مِنْ إِجْلَالِ اللَّهِ إِكْرَامُ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ، وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ، وَلَا الْجَافِي عَنْهُ، وَذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ
“আল্লাহ তাআলার বড়োত্ব ও মহিমা প্রকাশের কিছু উপায় হলো বৃদ্ধ মুসলমানকে সম্মান করা; কুরআনের যে বাহক কুরআনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে না এবং একে পরিত্যাগ করে না, তাকে সম্মান করা এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে শ্রদ্ধা করা।”[৪২২]

মূর্খ লোকের অন্তর থাকে তার জিভের ডগায়
৩৭৫. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “পূর্বসূরিরা বলতেন, বুদ্ধিমান ব্যক্তির জিহ্বা থাকে তার অন্তরের পেছেন। যখন সে কথা বলতে চায়, ভেবেচিন্তে বলে। কথায় (উপকার) থাকলে তা ব্যক্ত করে, (অপকার) থাকলে চুপ থাকে। আর মূর্খ ব্যক্তির অন্তর থাকে তার জিভের ডগায়। মুখে যা আসে তা-ই বলে ফেলে, একটুও ভাবনা-চিন্তা করে না।”[৪২৩]
আবুল আশহাব বলেন, পূর্বসূরিরা বলতেন, “জিহ্বাকে যে সংযত রাখতে পারে না, তার দ্বীনের বুঝ নেই।”

টিকাঃ
[৪০১] বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, ৯/২৮৭, হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৪০২] বুখারি, ৫৬৭২, ৩১৫৩; মুসলিম, ১৮২, ৪৬১০।
[৪০৩] মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ২/৯৮৮, হাদীস নং ১৭৮৮, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪০৪] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ১৮৯, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪০৫] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ১১২৮, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৪০৬] এই হাদীসের সনদ দুর্বল। তবে অনুরূপ হাদীস সহীহ সনদের সঙ্গে ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
[৪০৭] হাদীসটি দুর্বল সনদের সঙ্গে মাওকুফরূপে বর্ণিত। তবে ভিন্ন সনদে মারফুরূপেও বর্ণিত হয়েছে। সেই সনদের রাবীগণ সবাই সহীহ হাদীসের রাবী।
[৪০৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এই সনদের রাবীগণ সিকাহ (বিশ্বস্ত)।
[৪০৯] দারিমি, সুনান, ২/২৯৯; হাকিম, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪১০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এই সনদের রাবীগণ সিকাহ (বিশ্বস্ত)।
[৪১১] বুখারি, আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ৭৬২, সনদ সহীহ। আলবানি, আস-সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস নং ৮৬৬।
[৪১২] হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৪১৩] মুসলিম, ৭, ৯,১০, ১১; আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৬২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪১৪] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/২৮৬, ২৮৭, হাদীসটি মুরসাল বা মু'দালরূপে বর্ণিত। হাদীসটি বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ, যদিও তাঁরা তা সংকলন করেননি। ইমাম যাহাবি তাঁকে সমর্থন করেছেন।
[৪১৫] সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ সরাসরি উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ থেকে হাদীস শোনেননি।
[৪১৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮/১১৮, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪১৭] ইবনু আবী আসিম, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৬১, দঈফ।
[৪১৮] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ১৬২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪১৯] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৫০১, সনদ হাসান। আলবানি, আস-সিলসিলাতুস সহীহা, ৫৩৬।
[৪২০] অনুরূপ অর্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
[৪২১] ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৪৩, মুরসালরূপে বর্ণিত; তবে সহীহ সনদের সঙ্গে মুত্তাসিলরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৪২২] আবূ দাউদ, সুনান, হাদীস নং ৪৮৪৩, হাদীসটি হাসান।
[৪২৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৪/৩৮, ৩৯; সনদ সহীহ, মাওকুফ।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 রহমানের বান্দা যারা

📄 রহমানের বান্দা যারা


তৃতীয় অনুচ্ছেদ
রহমানের বান্দা যারা

চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
৩৭৬. মাকহুল ইবনু আবী মুসলিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا تَكُونُوا عَيَّابِينَ، وَلَا مَدَّاحِينَ، وَلَا طَعَانِينَ، وَلَا مُتَمَاوِتِينَ
“মানুষের দোষ ধরে বেড়িয়ো না; অতিরিক্ত প্রশংসাও কোরো না; অপবাদ দিয়ো না এবং মরে যাওয়ার ভান কোরো না।”[৪২৪]

মানুষের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ প্রদান
৩৭৭. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কেউ সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি মুসাফাহা করতেন। তিনি কখনও নিজের হাত আগে ছাড়িয়ে নিতেন না; ওই লোক চেহারা ঘুরিয়ে নেবার আগে নিজের চেহারা ঘুরিয়ে নিতেন না। তাঁর সঙ্গে বসা লোকের দুই হাতের সামনে কখনও নিজের দুই হাঁটু বাড়িয়ে দেননি তিনি।”[৪২৫]

বিনয় ও নম্রতা শ্রেষ্ঠ ইবাদাত
৩৭৮. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “তোমরা বিনয় ও নম্রতা নামক শ্রেষ্ঠ ইবাদাতকে উপেক্ষা করছ।”[৪২৬]

যার পেছনে মানুষ হাঁটে
৩৭৯. হাইসাম ইবনু খালিদ বলেন, আমি আমার চাচা সুলাইম-এর পেছনে ছিলাম। বাহনে চড়ে তখন আমাদের পাশে এলেন কুরাইব ইবনু আবরাহা, তার পেছন পেছন আসছিল একটি উটের বাচ্চা। সুলাইম চাচা তাকে বললেন, আবূ রিশদিন, উটের বাচ্চাটিকে আপনার পেছনে বহন করে নিতে পারলেন না? তিনি বললেন, এটাকে আবার বহন করার কী আছে? চাচা বললেন, তা হলে উটের বাচ্চাটিকে মাসজিদের ফটক পর্যন্ত আপনার সামনে রাখুন। তিনি বললেন, কেন? চাচা বললেন, ছোটো একটি বাচ্চা দেখলে কি তাকে আপনার পেছনে বহন করতেন না? তিনি বললেন, তা কেন করব? সুলাইম চাচা বললেন, আমি আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি, "বান্দার পেছনে যতক্ষণ কেউ হাঁটে, বান্দা ততক্ষণ আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।”[৪২৭]

অন্যের আত্মা আপন আত্মার মতোই
৩৮০. আবূ মুহাযযিম তামীমি বলেন, "আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন একটি লোক বাহনে চড়ে আসছে এবং একটি বালক তার পেছনে দৌড়ে দৌড়ে আসছে। তিনি তখন লোকটিকে বললেন, এই যে আল্লাহর বান্দা! ছেলেটাকে বাহনে তুলে নাও, সে তো তোমার ভাই। তার আত্মা তোমার আত্মার মতোই। ফলে লোকটি ছেলেটিকে বাহনে উঠিয়ে নিল।”[৪২৮]

অশ্লীল কথা ও গালি পরিহার করা
৩৮১. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গালি-গালাজ করতেন না, অশ্লীল কথা বলতেন না।”[৪২৯]
ইবনু হাইওয়াহ বলেছেন, حاشا -এর জায়গায় فاجا বলেছেন। অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খারাপ কথা বলতেন না। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদের কেউ কারও দোষারোপ করতে চাইলে বলতেন, “তার কপাল তো লাভবান হয়নি।”

রহমানের বান্দাগণের বৈশিষ্ট্য
৩৮২. ইয়াহইয়া ইবনু মুখতার থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا
“রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে বিচরণ করে বিনম্রভাবে।” তারপর বললেন, “মুসলিমরা হলো বিনয়ী জাতি। আল্লাহর কসম, তাদের কান, চোখ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে বিনয় প্রকাশ পায়। এমনকি মূর্খরা তাদের অসুস্থ ভাবে। আল্লাহর কসম, তাদের মধ্যে কোনো অসুস্থতা নেই। নিশ্চয় তারা সবচেয়ে পরি্শুদ্ধ অন্তরের অধিকারী। তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি রয়েছে, যা অন্যদের মধ্যে নেই। আখিরাতের জ্ঞান তাদেরকে দুনিয়া থেকে বিমুখ করে দিয়েছে। (রহমানের বান্দারা) বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের দুঃখ দূর করেছেন।' আল্লাহর কসম, এটা মানুষের সাধারণ দুঃখ নয়। যে-সকল (আমল) দিয়ে (আল্লাহর বান্দারা) দিয়ে তারা জান্নাত প্রত্যাশা করে তা তাদের কাছে কঠিন ও দুঃসাধ্য হয় না। জাহান্নামের ভয় তাদেরকে কাঁদায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর তাআলার পক্ষ থেকে সান্ত্বনা পায় না, দুনিয়ার ওপর আফসোসের কারণে তার অন্তর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। খাদ্য বা পানীয় ছাড়া আল্লাহ তাআলার আর কোনো নিয়ামাত সে দেখতে পায় না, তার জ্ঞান কমে যায় এবং তার কাছে শান্তি উপস্থিত হয়।”[৪৩০]

আল্লাহ তাআলা সবাইকে লক্ষ করছেন
৩৮৩. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি একটি নতুন চাদর পরে সেটা দেখতে লাগলাম। তখন আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি কি জানো না যে আল্লাহ তাআলা তোমাকে দেখছেন?”[৪৩১]

পর্দা দেখে দুনিয়ার কথা মনে পড়া
৩৮৪. আযরা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা-এর ঘরে ঢুকে দরজায় একটি পর্দা দেখতে পেলেন। তাতে বিভিন্ন ছবি আঁকা ছিল। তখন তিনি বলেন-
يَا عَائِشَةُ، أَخْرِيهِ فَإِنِّي إِذَا رَأَيْتُهُ ذَكَرْتُ الدُّنْيَا
“আয়িশা, পর্দাটা নামিয়ে ফেলো। এটা দেখলেই দুনিয়ার কথা মনে পড়ে যায়।”[৪৩২]

জুতার ফিতার কারণে মনোযোগে ব্যঘাত
৩৮৫. আবুন নাদর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেল। কেউ একজন নতুন জুতার ফিতা নিয়ে এল। তিনি তখন সালাত পড়ছিলেন। সালাতে থেকেই তিনি নতুন ফিতাগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন। সালাত শেষ করে তিনি বললেন,
انْزَعُوا هَذَا، وَاجْعَلُوا الْأَوَّلَ
"এই নতুনগুলো নিয়ে যাও, তার জায়গায় আগের (ফিতাগুলোই) লাগিয়ে দাও।” জিজ্ঞেস করা হলো, তা কেন ইয়া রাসূলাল্লাহ?” তিনি বললেন,
إِنِّى كُنْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَأَنَا أُصَلَّى
"সালাত পড়া অবস্থায় সেগুলোর দিকে দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল।"[৪৩৩]

টিকাঃ
[৪২৪] সনদ হাসান, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৪২৫] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৪৯০, গরীব হাদীস।
[৪২৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ১৬৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪২৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/২২১, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪২৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪২৯] বুখারি, হাদীস নং ৩৩৬৬, ৩৫৪৯, ৫৬৮২, ৫৬৮৮।
[৪৩০] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৯/২২, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪৩১] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪৩২] হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[৪৩৩] হাদীসটির সনদ সহীহ এবং মুরসালরূপে বর্ণিত।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 সালাতে যাওয়া ও মাসজিদে অবস্থান করার ফজিলত

📄 সালাতে যাওয়া ও মাসজিদে অবস্থান করার ফজিলত


চতুর্থ অনুচ্ছেদ
সালাতে যাওয়া ও মাসজিদে অবস্থান করার ফজিলত

সালাতের উদ্দেশে প্রতিটি পদক্ষেপ একটি সদাকা
৩৮৬. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ تَخْطُوهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ
"প্রতিটি ভালো কথা এক একটি সদাকা। সালাতের উদ্দেশে প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি সদাকা।”[৪৩৪]

আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মাসজিদে আসা
৩৮৭. হাবীব ইবনু আবী সাবিত রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আগেকার সময়ে) এই কথা বলা হতো, "তোমরা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য তাঁর ঘরে এসো। আল্লাহর ঘরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটাই উত্তম। আসলে আল্লাহ তাআলাই সত্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন।”[৪৩৫]

মাসজিদে উঁচু আওয়াজে কথা বলা যাবে না
৩৮৮. সা'দ ইবনু ইবরাহীম তাঁর পিতা রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু মাসজিদে বসে থাকা এক ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন। তার উদ্দেশে তিনি বললেন, “তুমি কি জানো এখন তুমি কোথায় আছো?"[৪৩৬]

মাসজিদে অনর্থক কথা না বলা
৩৮৯. উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী জাফর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَجَابَ دَاعِيَ اللهِ، وَأَحْسَنَ عِمَارَةَ مَسَاجِدِ اللَّهِ، كَانَتْ تُحْفَتُهُ بِذَلِكَ مِنَ اللَّهِ الْجَنَّةَ ، فَقِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا حُسْنُ عِمَارَةِ مَسَاجِدِ اللَّهِ؟ قَالَ: لَا يُرْفَعُ فِيهَا صَوْتُ، وَلَا يُتَكَلَّمُ فِيهَا بِالرَّفْتِ.
“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেয়, আল্লাহ তাআলার মাসজিদগুলোর কাঠামো (পরিবেশ) সুন্দর রাখে, এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপহার হলো জান্নাত।" জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাআলার মাসজিদসমূহের পরিবেশ সুন্দর রাখার অর্থ কী? তিনি বললেন: “মাসজিদে কণ্ঠস্বর উঁচু না করা এবং অশ্লীল কথাবার্তা না বলা।”[৪৩৭]

সালাতের অপেক্ষায় থাকার ফজিলত
৩৯০. সুহাইল ইবনু হাসসান কালবি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “বান্দা যতক্ষণ মাসজিদে বসে থাকে ততক্ষণে একটি তেজি ঘোড়া পুরো পা ছড়িয়ে দৌড়ে জান্নাতে যতটুকু জায়গা অতিক্রম করতে পারবে, আল্লাহ তাকে (জান্নাতে) ততটুকু জায়গা দান করবেন। এবং ফেরেশতাগণ তার ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষণের দুআ করতে থাকবে। আর তার নামে আল্লাহর পথে পাহারা দেওয়ার সাওয়াব লেখা হবে।”[৪৩৮]

যুদ্ধের প্রস্তুতি
৩৯১. আল্লাহ তাআলার বাণী,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা করো এবং সদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো।"[৪৩৯]
দাউদ ইবনু সালিহ বলেন, আবূ সালামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, “ভাতিজা, আয়াতটি কেন নাযিল হয়েছে, জানো?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে সারাক্ষণই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা লাগত। যেন এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষা করার মতো।”[৪৪০]

পাপ ঝরে পড়ে যেসব আমলের জন্য
৩৯২. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عِنْدَ الْمَكَارِهِ مِنَ الْكَفَّارَاتِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ مِنَ الْكَفَّارَاتِ، وَانتَظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ مِنَ الْكَفَّارَاتِ، وَذَلِكَ الرِّبَاطُ، وَذَلِكَ الرباط
"কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও ভালোভাবে ওজু করলে পাপ মুছে যায়। বেশি বেশি মাসজিদে গেলে পাপ ঝরে পড়ে। এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষা করলেও পাপ ঝরে যায়। তা আল্লাহর পথে পাহারার সমতুল্য, তা আল্লাহর পথে পাহারার সমতুল্য।”[৪৪১]

প্রতিটি পদক্ষেপের বদলে দশটি নেকি
৩৯৩. উকবা ইবনু আমির জুহানি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ إِلَى الْمَسْجِدِ، كَتَبَ لَهُ كَاتِبَاهُ بِكُلِّ خُطْوَةٍ يَخْطُوهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ، وَالْقَاعِدُ فِي الْمَسْجِدِ يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ كَالْقَانِتِ، وَيُكْتَبُ مِنَ الْمُصَلِّينَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَى بَيْتِهِ
“যে ব্যক্তি মাসজিদের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হয়, তার সঙ্গের দুইজন লেখক ফেরেশতা মাসজিদের পথে প্রতিটি পদক্ষেপের বদলে তার জন্য দশটি নেকি লেখেন। আর যে ব্যক্তি মাসজিদে সালাতের অপেক্ষায় বসে আছে সে ইবাদাতকারীর মতোই; সে বাড়িতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাকে মুসল্লি হিসেবে গণ্য করা হয়।”[৪৪২]

সালাতের জন্য অপেক্ষাকারীও সালাতের মধ্যে রয়েছে
৩৯৪. মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মাসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে সালাতরত ব্যক্তির সমতুল্য যে মনে করে না, সে জ্ঞানী নয়।"[৪৪৩]

আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দা
৩৯৫. খালিদ ইবনু মা'দান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ أَحَبُّ عِبَادِي إِلَى الْمُتَحَابُّونَ بِحُتِي، وَالْمُعَلَّقَةُ قُلُوبُهُمْ فِي الْمَسَاجِدِ، وَالْمُسْتَغْفِرُونَ بِالْأَسْحَارِ أُولَبِكَ الَّذِينَ إِذَا أَرَدْتُ أَهْلَ الْأَرْضِ بِعُقُوبَتِهِمْ ذَكَرْتُهُمْ، فَصَرَفْتُ الْعُقُوبَةَ عَنْهُمْ بِهِمْ
"আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তারাই যারা আমার ভালোবাসার কারণেই পরস্পরকে ভালোবাসে, যাদের অন্তর মাসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে, যারা ভোরবেলায় ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমি জমিনের বাসিন্দাদেরকে শাস্তি দিতে চাইলে, ওই বান্দাদের কথা উল্লেখ করি, তারপর তাদের কারণে সবার থেকে শাস্তি ফিরিয়ে নিই।”[৪৪৪]

পাঁচ জিনিস থেকে মাসজিদকে পবিত্র রাখতে হবে
৩৯৬. মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মাসজিদগুলোকে অবশ্যই পাঁচটি জিনিস থেকে পবিত্র রাখতে হবে : ১. মাসজিদে দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করা যাবে না; ২. খুন-জখমের কিসাস গ্রহণ করা যাবে না; ৩. কবিতা আবৃত্তি করা যাবে না; ৪. হারানো-বস্তুর ঘোষণা দেওয়া যাবে না এবং ৫. মাসজিদকে বাজারে পরিণত করা যাবে না।”[৪৪৫]

মাসজিদে পাশের-জনের সাথেও কথা না বলা
৩৯৭. মূসা ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কখনও কখনও আমি আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ ও আনসারি সাহাবি ইয়াযীদ ইবনু শুরাহবীল আমিরি রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে আসরের পর মাসজিদে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখেছি। কিন্তু সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত তাঁরা একে অন্যের সাথে কথা বলতেন না।”[৪৪৬]

তিন ব্যক্তির কথা বাদে সব কথাই অনর্থক
৩৯৮. আবদুল্লাহ ইবনু মুহাইরিয রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “তিন ব্যক্তির কথা ছাড়া মাসজিদে সব ধরনের কথাই অনর্থক: ১. সালাতরত ব্যক্তি (সালাতে যা কিছু বলে থাকে); ২. আল্লাহর যিকরকারী এবং ৩. অধিকার আদান-প্রদানকারী।”[৪৪৭]

মাসজিদে বান্দা আল্লাহর সঙ্গে ওঠাবসা করে
৩৯৯. আবদুল্লাহ মুআযযিন বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি মাসজিদে বসল, সে যেন তার রবের সঙ্গেই বসল।" মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম বলেন, “মাসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তির দায়িত্ব হলো শুধুই কল্যাণকর কথা বলা।”[৪৪৮]

উদাসীনভাবে মাসজিদে না যাওয়া
৪০০. আবদুর রহমান ইবনু জুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহ আনহু একটি সেনাবাহিনীকে শামে পাঠাতে প্রস্তুত করলেন। তাদের উদ্দেশে বললেন, “তোমরা শামে যাচ্ছ, তা এমন ভূমি যাতে অনেক কল্যাণ রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সেই ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করবেন, তোমরা ওখানে অনেক মাসজিদ নির্মাণ করবে। যদি অবহেলা-ভরে ও উদাসীনভাবে মাসজিদে যাও, তা হলে কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা জানবেন। অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে দূরে থেকো।”[৪৪৯]

কিয়ামাতের দিন পরিপূর্ণ আলোর ব্যবস্থা
৪০১. ইদরীস খাওলানি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “যারা অন্ধকারে মাসজিদে যায়, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের পেছনে পরিপূর্ণ আলোর ব্যবস্থা করবেন।”[৪৫০]

অসুস্থ অবস্থায় ও বৈরী আবহাওয়ায় মাসজিদে যাওয়া
৪০২. সা'দ ইবনু উবাইদা বলেন, "আবূ আবদুর রহমান সুলামি রহিমাহুল্লাহ অসুস্থ থাকা অবস্থায় বৃষ্টি ও কাদার মধ্যেও তাঁকে মাসজিদে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন।”[৪৫১]

সালাতের জন্য অপেক্ষার ফজিলত
৪০৩. আতা ইবনু সায়িব বলেন, আমরা আবূ আবদুর রহমান সুলামি-র কাছে গেলাম। তিনি তখন মাসজিদে ছিলেন। তাঁকে বললাম, বিছানায় গিয়ে বিশ্রাম নিলেই তো পারতেন, ক্লান্তিও দূর হতো। তিনি তখন বললেন, জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا يَزَالُ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاةٍ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ
"যতক্ষণ কেউ সালাতের স্থানে সালাতের অপেক্ষায় থাকে, ততক্ষণ সে সালাতরত বলেই গণ্য হয়।”[৪৫২]

অন্ধকার রাতে মাসজিদে যাওয়ার প্রতিদান
৪০৪. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “পূর্বসূরিরা বলতেন, অন্ধকার রাতে (মাসজিদে) গেলে (জান্নাত) আবশ্যক হয়ে যায়।”[৪৫৩]

মানুষ জানে না কোনটাতে রয়েছে কল্যাণ
৪০৫. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আমি কি আমার পছন্দনীয় নাকি অপছন্দনীয় অবস্থায় সকালে উপনীত হলাম, তা নিয়ে কোনো পরোয়া করি না। কারণ, আমার পছন্দনীয় বিষয়ে কল্যাণ আছে নাকি অপছন্দনীয় বিষয়ে, তা তো আমি জানি না।”[৪৫৪]

প্রাপ্তি বড়ো নাকি অপ্রাপ্তি?
৪০৬. মা'মার থেকে বর্ণিত। সালিহ ইবনু মিসমারকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে যেসব নিয়ামাত দিয়েছেন, সেগুলো বড়ো? নাকি যা আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন, সেগুলো বড়ো?-তা আমি জানি না।”[৪৫৫]

টিকাঃ
[৪৩৪] বুখারি, ২৭৩৪, ২৮২৭; মুসলিম, ২৩৮২।
[৪৩৫] আবু নুআইম, হিলইয়া, ১/৬১, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৩৬] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৩৭] সনদ সহীহ, মুরসাল।
[৪৩৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত। এই প্রসঙ্গে বহু সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
[৪৩৯] সূরা আল ইমরান: ২০০।
[৪৪০] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৪/১৪৮, মাওকুফ।
[৪৪১] মুসলিম, হাদীস নং ৬১০; নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১/৮৯, ৯০, হাদীস নং ১৩৯। হাদীসটির সনদ মুনকাতি; কিন্তু হাদীসের মতন সহীহ।
[৪৪২] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/২১১, সনদ হাসান।
[৪৪৩] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৪৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২১২, খালিদ ইবনু মা'দান পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৪৪৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৪৬] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৪৭] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৪৪৮] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[৪৪৯] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪৫০] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত; এটির সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদের সঙ্গে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। আবূ দাউদ, সুনান, হাদীস নং ৫৫৭; ইবনু মাজাহ, সুনান, হাদীস নং ৭৭৯।
[৪৫১] হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৪৫২] হাদীসটির সনদ সালিহ।
[৪৫৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/২২৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৫৪] হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৫৫] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 অন্তিম মুহূর্তের উপদেশ

📄 অন্তিম মুহূর্তের উপদেশ


পঞ্চম অনুচ্ছেদ
অন্তিম মুহূর্তের উপদেশ

আল্লাহর ওপর ভরসাই সবকিছু
৪০৭. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সালমান ফারিসি ও আবদুল্লাহ ইবনু সালাম রদিয়াল্লাহু আনহুমা একত্র হলেন। তাঁদের একজন অপরজনকে বললেন, "আপনি যদি আমার আগেই আপনার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তা হলে (স্বপ্নযোগে) আমার সাথে দেখা করে জানাবেন কেমন আছেন। আর আমি যদি আপনার আগে আমার রবের সাক্ষাতে চলে যাই, তা হলে আমি স্বপ্নযোগে আপনার সাথে দেখা করে জানাব।" তাঁদের একজন মারা যাওয়ার পর অপরজনের সাথে স্বপ্নযোগে সাক্ষাৎ করে বললেন, “তাওয়াক্কুল করুন, আর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমি তাওয়াক্কুলের মতো আর কিছু দেখিনি।” কথাটি তিনি তিনবার বললেন।”[৪৫৬]

একটি গুরুত্বপূর্ণ দুআ
৪০৮. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু ইয়ায়িদ রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي حُبَّكَ وَحُبَّ مَا يَنْفَعُنِي حُبُّهُ عِنْدَكَ، اللَّهُمَّ مَا رَزَقْتَنِي مِمَّا أُحِبُّ، فَاجْعَلْهُ لِي قُوَّةً فِيمَا تُحِبُّ، وَمَا زَوَيْتَ عَنِّي مَا أُحِبُّ، فَاجْعَلْهُ لِي فَرَاغًا فِيمَا تُحِبُّ
“হে আল্লাহ, আমাকে আপনার ভালোবাসা দান করুন। যা কিছুর ভালোবাসা আমার উপকারে আসবে, সে-সবকিছুর ভালোবাসা দান করুন। হে আল্লাহ, আমার পছন্দের যা কিছু আপনি আমাকে দিয়েছেন, আপনার পছন্দের কাজ করার ক্ষেত্রে সেসবকে আমার জন্য শক্তিতে পরিণত করুন। আমার পছন্দের যা কিছু আপনি দূরে সরিয়ে নিয়েছেন সেসব শূন্য জায়গায় আপনার পছন্দের সবকিছু বসিয়ে দিন।”[৪৫৭]

মজলিস থেকে ওঠার দুআ
৪০৯. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার সময় এই দুআগুলো পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا يَحُولُ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيْكَ، وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ رَحْمَتَكَ، وَمِنَ الْيَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا مُصِيبَاتِ الدُّنْيَا، وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا، وَاجْعَلْهُ الْوَارِثَ مِنَّا، وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا، وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا، وَلَا تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا، وَلَا تَجْعَلِ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا، وَلَا تُسَلِّطْ عَلَيْنَا مَنْ لَا يَرْحَمُنَا
"হে আল্লাহ! আমাদেরকে তোমার এমন ভয় দান করো, যা আমাদের ও তোমার অবাধ্যতার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে; তোমার এমন আনুগত্য করার সামর্থ্য দাও, যা আমাদেরকে তোমার জান্নাতে পৌঁছে দেবে; এমন সন্দেহমুক্ত ঈমান দাও, যা দুনিয়ার মুসিবতগুলোকে আমাদের কাছে তুচ্ছ করে দেবে! আমাদের শ্রবণশক্তি দিয়ে উপকৃত হতে দাও, দৃষ্টিশক্তি ও শারীরিক শক্তি থেকে উপকৃত হতে দাও, যতদিন তুমি আমাদের বাঁচিয়ে রাখো! এসব শক্তিকে আমাদের ওয়ারিশ বানিয়ে দাও! আমাদের জালিমদের বিরুদ্ধে আমাদের ক্রুদ্ধ করে তোলো! আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো; আমাদের দ্বীন-পালনে কোনো মুসিবত রেখো না; দুনিয়া যেন আমাদের সবচেয়ে বড়ো ভাবনার বস্তু না হয়; আমাদের জ্ঞানের লক্ষ্য যেন দুনিয়া না হয়; আমাদের ওপর এমন কাউকে চাপিয়ে দিয়ো না, যে আমাদের ওপর দয়া করবে না!”[৪৫৮]

মৃত্যুর আগে বান্দার শাস্তি প্রত্যক্ষ করা
৪১০. কাসীর ইবনু সুওয়াইদ রহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছেন, “বান্দাকে যে শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে, সেই শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত কোনো বান্দাই দুনিয়া থেকে বেরিয়ে যাবে না (বা মৃত্যুবরণ করবে না)।”[৪৫৯]

মৃত্যুসংবাদ প্রচার না করার অনুরোধ
৪১১. রবী' ইবনু খুসাইম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমার (মৃত্যুর) ব্যাপারে কাউকে টের পেতে দিয়ো না। আমাকে আমার রবের কাছে গোপনে রেখে এসো।”[৪৬০]

কবরের ভীতি
৪১২. শা'বী রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু যখন আহত হলেন, তখন তাঁর জন্য দুধ পাঠানো হলো। তিনি দুধ পান করলেন, কিন্তু জখম দিয়ে বেরিয়ে গেল। তিনি বললেন, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। তাঁর পাশে যাঁরা বসে ছিলেন, তারা তাঁর প্রশংসা করতে শুরু করলেন। তখন তিনি বললেন, আমি দুনিয়াতে যেভাবে এসেছি সেভাবেই খালি হাতে বেরিয়ে যেতে চাই। বিশ্বের সবকিছুই যদি আজ আমার মালিকানায় থাকত, তবে কবরের ভীতি থেকে বাঁচার জন্য আমি তা সদাকা করে দিতাম।[৪৬১]

মৃত্যুর পর দ্রুত দাফন করার নির্দেশ
৪১৩. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু- এর মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। আমি তাঁর মাথা উঠিয়ে কোলের ওপর রাখলাম। এরপর তাঁর জ্ঞান ফিরে এল। তিনি বললেন, আমার মাথাটা মাটিতে রাখো। এই বলে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলেন। আমি তাঁর মাথা কোলে নিলাম। আবার তাঁর জ্ঞান ফিরে এল। বললেন, যা করতে বলেছি, তা-ই করো। আমার মাথা জমিনে রাখো। তখন আমি বললাম, আব্বু, আমার কোল ও জমিন তো একই কথা! তিনি বললেন, “হারিয়ে যাক তোমার মা, যা করতে বলেছি, তা-ই করো। আমার মাথা জমিনে রাখো। আর শোনো, আমি মারা গেলে খুব দ্রুত আমাকে কবরে রেখে আসবে। যেখানে আমাকে রেখে আসছ সেটা হয়তো কল্যাণকর হবে; অথবা হবে অকল্যাণকর—যে অকল্যাণ তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে (কবরে) নামিয়ে রাখছ।”[৪৬২]

ক্ষমা না করা হলে ধ্বংস অনিবার্য
৪১৪. উসামা ইবনু যাইদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মৃত্যুর সময় তাঁর ছেলেকে বললেন, “ছেলে আমার, আমার মুখমণ্ডল মাটির ওপর রেখে দাও। হয়তো আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি রহম করবেন।” আবদুল্লাহ ইবনু উমর মাটি দিয়ে তাঁর দুই গাল মুছে দিলেন। তারপর তিনি একেবারে হুঁশ হারিয়ে ফেললেন। ইবনু উমর বলেন, “আমি তাঁর মাথা কোলের ওপর রাখলাম। তখন তিনি হুঁশ ফিরে পেয়ে বললেন, আমার মুখমণ্ডল মাটির ওপর রেখে দাও, হয়তো আল্লাহ তাআলা আমাকে রহম করবেন। তারপর বললেন, ধ্বংস হোক উমর, ধ্বংস হোক তার মা, যদি তাকে ক্ষমা না করা হয়।”[৪৬৩]

আল্লাহর পক্ষ থেকে দূতের অপেক্ষায়
৪১৫. মা'মার বলেন, ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ মৃত্যুর সময় কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কাঁদছেন কেন? তিনি বলেন, “আমি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একজন দূতের অপেক্ষা করছি, যিনি আমাকে হয়তো জান্নাতের সংবাদ দেবেন নয়তো জাহান্নামের।”[৪৬৪]

মানুষের মৃত্যুই কিয়ামাত
৪১৬. হাম্মাদ ইবনু সাঈদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন আবূ আতিয়্যার মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হলো, আপনি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছেন? তিনি বললেন, পাব না কেন? মৃত্যুই তো কিয়ামাত। এরপর আমার অবস্থা কী হবে, তা তো আমি জানি না।”[৪৬৫]

আল্লাহর ক্ষমা ছাড়া আর কিছু যথেষ্ট নয়
৪১৭. আবূ নাওফাল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুশয্যায় গালে হাত রেখে বললেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যা কিছুর নির্দেশ দিয়েছেন তা আমরা ছেড়ে দিয়েছি এবং যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন তা আমরা করে ফেলেছি। তাই আপনার ক্ষমা ছাড়া কোনো-কিছুই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট নয়। তিনি কথাগুলো বারবার বলছিলেন আর এই অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করলেন।”[৪৬৬]

মৃত্যুর আগে আমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কথা
৪১৮. আবদুর রহমান ইবনু শিমাসা বলেন, আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু-এর মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তখন আবদুল্লাহ তাঁকে বললেন, কাঁদছেন কেন? মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছেন নাকি? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছি না; কিন্তু মৃত্যুর পরে (কী ঘটবে তার জন্য ভয় পাচ্ছি)। আবদুল্লাহ তাঁকে বললেন, আপনি তো ভালো কাজ করতেন ও সত্যপথের ওপর (অটল) ছিলেন। তিনি তাঁকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য ও শামদেশ বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। তখন আমর ইবনুল আস রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি তো (একসময়) এর চেয়েও বড়ো জিনিস ছেড়ে দিয়েছি। তা হলো 'লা ইলাহা ইল্লালাহ'র সাক্ষ্য। ভালো করেই জানি যে, আমি তিনটি অবস্থায় ছিলাম। প্রথমে ছিলাম কাফির। তখন আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সবচেয়ে কঠোর ছিলাম। সে সময় মারা গেলে জাহান্নাম আমার জন্য অবধারিত হয়ে যেত। তারপর যখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বাইআত নিলাম, তখন আমি তাঁর প্রতি সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীল ছিলাম। লজ্জার কারণে দুচোখ-ভরে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখতে পারিনি। সে সময় আমি মারা গেলে মানুষ বলত, 'আমরের কল্যাণ হোক। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং সত্যের ওপর (অটল) থেকেছে। সে উত্তম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। আশা করা যায় যে সে জান্নাত পাবে।' কিন্তু তারপর আমি এমন সব বিষয়ে জড়িয়ে গেছি যে, আমি জানি না সেগুলো আমার পক্ষে গেছে নাকি বিপক্ষে। তাই আমি মারা গেলে (তোমরা) আমার জন্য বিলাপ করবে না। আমাকে জাহান্নামের অনুগামী বানিয়ো না। গায়ের ওপর আমার চাদর ভালো করে বেঁধে দেবে। আমি অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হব। আমার ওপর হালকাভাবে মাটি ছড়িয়ে দেবে। আমার ডান পাশ বাম পাশের চেয়ে বেশি মাটির হকদার নয়। আমার কবরে তোমরা কাঠ বা পাথর কিছুই দিয়ো না। উট জবাই করে তার গোশত কাটতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় শুধু আমার কবরের পাশে বসবে। আমি তোমাদের থেকে ভালোবাসা কামনা করি।”[৪৬৭]

টিকাঃ
[৪৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/২০৫, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৫৭] হাদীসটির সনদ হাসান। তিরমিযি, সুনান, ৩৪৯০। তিনি বলেছেন, এটা হাসান গরীব হাদীস।
[৪৫৮] হাদীসটির সনদ হাসান। তিরমিযি, সুনান, ৩৫০২। তিনি বলেছেন, এটা হাসান গরীব হাদীস।
[৪৫৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৪৬০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৪০, হাদীসটির সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৪৬১] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৩/৫, হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৬২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত; অন্য সনদে এর সমার্থবোধক হাদীস মুত্তাসিলরূপে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৩/৩৬০ ও ৩/৩৫৯।
[৪৬৩] হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৬৪] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/২২৪, হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৪৬৫] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৫/১৪, হাদীসটির সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[৪৬৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ মুনকাতি।
[৪৬৭] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৪/২৫৮, হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ সহীহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00