📄 নিজের হিসাব নিজে রাখা
দশম অনুচ্ছেদ
নিজের হিসাব নিজে রাখা
আদম-সন্তান পাপাচারী
২৮৬. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “বনি আদমকে পাপকারী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে আল্লাহ তাআলা যার প্রতি রহম করেন (পাপ ও অন্যায় থেকে বাঁচিয়ে রাখেন) তাঁর কথা ভিন্ন।”[৩২২]
সাজদায় পঠিত দুআ
২৮৭. আসিম ইবনু আবীন নুজুদ বলেন, আমি শাকিক ইবনু সালামা রহিমাহুল্লাহ-কে সাজদারত অবস্থায় এই দুআ পড়তে শুনেছি-
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي، إِنْ تَعْفُ عَنِّي فَطَوْلُ مِنْ قِبَلِكَ، وَإِنْ تُعَذِّبْنِي تُعَذِّبْنِي غَيْرَ ظَالِمٍ، وَلَا مَسْبُوقٍ
“হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন তা হলে তা আপনার পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ আর যদি শাস্তি দেন তা হলে আপনি জুলুমকারী নন এবং আপনার শাস্তি প্রতিহত করাও যায় না।” বর্ণনাকারী বলেন, “তারপর তিনি কাঁদতে শুরু করতেন, এমনকি মাসজিদের পেছন থেকে তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতাম।"[৩২৩]
পাপকাজ চোখের সামনে রাখা
২৮৮. সাঈদ ইবনু আবী সাঈদ মাকবুরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম বলতেন, “হে আদম-সন্তান, কোনো ভালো কাজ করলে তার ব্যাপারে আশ্বস্ত থেকো (অস্থিরতা কোরো না)। কারণ তা এমন-এক সত্তার কাছে সংরক্ষিত থাকে যিনি কখনও তা বিনষ্ট করেন না। তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন- لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنُ عَمَلًا (যে ব্যক্তি সৎকাজ করে নিশ্চয় আমি তার প্রতিদান বিনষ্ট করি না।) [৩২৪] আর যখন কোনো অন্যায় বা পাপকাজ করবে, তখন তা চোখের সামনে রাখবে (তার কথা মনে রাখবে, যেন তা থেকে তাওবা করতে পারো এবং তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে)।"
সকাল-সন্ধ্যায় তাওবা
২৮৯. তালক ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলার হক এত বড়ো যে, বান্দাগণ তা যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম নয়। আর আল্লাহ তাআলার নিয়ামাত এত বেশি যে, কখনও তা গুণে শেষ করা যাবে না। তাই ভোরে তাওবা করো, সন্ধ্যায়ও তাওবা করো।”[৩২৫]
ভীতি-প্রদর্শনকারীদের সাহচর্যই উত্তম
২৯০. মুআল্লা ইবনু যিয়াদ বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে একবার মুগীরা ইবনু মুখাদিশ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু সাঈদ, এমন মানুষদের সাহচর্যে কীভাবে থাকা যায়, যাদের কথা শুনলে অন্তর (ভয়ে) উড়ে যাবে?” জবাবে তিনি বললেন, “যাঁরা তোমাকে ভয় দেখিয়ে নিরাপদ রাখে, তাঁদের সাহচর্যে থেকো। যাঁরা আশ্বস্ত করতে করতে ভীতিকর বিষয়ের মাঝে ফেলে দেয়, তাঁদের সাহচর্যের চেয়ে ওটা উত্তম।”[৩২৬]
মুমিন বান্দা দুটি আশঙ্কার মাঝখানে রয়েছে
২৯১. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি জেনেছি যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ عَبْدُ بَيْنَ مَخَافَتَيْنِ، مِنْ ذَنْبٍ قَدْ مَضَى لَا يَدْرِي مَا يَصْنَعُ اللَّهُ فِيهِ، وَمِنْ عُمْرٍ قَدْ بَقِيَ لَا يَدْرِي مَاذَا يُصِيبُ فِيهِ مِنَ الْهَلَكَاتِ
"বান্দা হিসেবে মুমিন দুটি আশঙ্কার মাঝখানে রয়েছে: একটি হলো তার আগের করা পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করবেন, সে আশঙ্কা। আরেকটি হলো ভবিষ্যতে কী কী বিপদ চেপে বসবে, তার আশঙ্কা।”[৩২৭]
দীর্ঘ সাজদার ফলে দাঁত পড়ে যাওয়া
২৯২. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রহিমাহুল্লাহ এক দীর্ঘ সাজদা দিলেন, ফলে তাঁর সামনের দাঁত দুটি পড়ে গেল। আবূ ইয়াস তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বিষয়টি হালকা করে তুলতে চাইলেন। তখন মুসলিম ইবনু ইয়াসার রহিমাহুল্লাহ বড়োত্ব ও মহিমা প্রকাশ করে বললেন, “মানুষ যা চায়, তা খুঁজে বেড়ায়। আর যা ভয় পায়, তা থেকে দূরে থাকে। চাওয়া পূরণের পথে আসা বিপদে যে ধৈর্য ধরতে পারে না, তার চাওয়া আবার কেমন চাওয়া! আর ভয় থেকে বাঁচার জন্য যে প্রবৃত্তির দাবিকে দূরে ঠেলে দিতে পারে না, সেটা আবার কেমন ভয়!”[৩২৮]
নিজেই নিজের হিসাব গ্রহণ
২৯৩. মালিক ইবনু মিগওয়াল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব নিয়ে নাও। তা হলে কিয়ামাতের দিন তোমাদের হিসাব দেওয়া সহজ হবে। তোমাদের পরিমাপ করার আগে নিজেরাই নিজেদের পরিমাপ করে নাও। আর মহাবিচারের জন্য প্রস্তুতি নাও। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ
“সেইদিন উপস্থিত করা হবে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না।”[৩২৯]-[৩৩০]
মুমিন বান্দার গুণাবলি
২৯৪. ইয়াহইয়া ইবনু মুখতার থেকে বর্ণিত হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মুমিন বান্দা নিজের ওপর কর্তৃত্বশীল। সে আল্লাহ তাআলার জন্য নিজের হিসাব-নিকাশ নিয়ে থাকে (কী ভালো কাজ করল আর কী মন্দ কাজ করল)। যারা দুনিয়াতে নিজেদের হিসাব নেয়, কিয়ামাতের দিন তাদের হিসাব সহজ হবে। আর যারা দুনিয়ায় নিজেদের কর্মকাণ্ডের কোনো হিসাব রাখে না, কিয়ামাতের দিন তাদের হিসাব হবে খুব কঠিন। মুমিন বান্দার সাথে হঠাৎ ভালো কিছু হলে সে বিস্মিত হয়ে বলে, আল্লাহর কসম, আমি তোমাকেই চাইছিলাম। তুমি আমার প্রয়োজনও ছিলে। কিন্তু, আল্লাহর কসম, তোমার কাছে পৌঁছার কোনো পথ ছিল না। কতই না দূরে ছিলে, কতই না দূরে ছিলে। আমার ও তোমার মধ্যে প্রতিবন্ধক ছিল। আর যখন মুমিন বান্দা থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো মন্দ কাজ প্রকাশ পায়, সে তার দায় নিজের ওপরই চাপিয়ে বলে, আমি এটা করতে চাইনি, এটার আমার কোনো প্রয়োজনই নেই। আল্লাহর কসম, এই কাজ আমি আর কখনোই করব না, ইন শা আল্লাহ। মুমিনরা এমন-এক জাতি কুরআন যাদের বন্ধন দৃঢ় রেখেছে; তাদের ও ধ্বংসের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। মুমিন বান্দা এই দুনিয়ায় বন্দি, সে তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাতের আগে সে কোনো-কিছুকে নিরাপদ মনে করে না। সে জানে যে তাকে তার কান, মুখ ও অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।”[৩৩১]
শয়তানকে কখনও নিরাপদ মনে করা যাবে না
২৯৫. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, আতা ইবনু ইয়াসার বলেছেন, “একজন ব্যক্তির মৃত্যুর সময় শয়তান এসে উপস্থিত হলো। মরণাপন্ন ব্যক্তিকে বলল, “তুমি আমার থেকে রেহাই পেলে।” মরণাপন্ন ব্যক্তি বলল, "আমি কখনোই তোমাকে নিরাপদ মনে করিনি।”[৩৩২]
টিকাঃ
[৩২২] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১০২, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৪] সূরা কাহফ: ৩০।
[৩২৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪৮, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৫৯, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৮।
[৩২৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৯] সূরা আল-হাক্কা: ১৮।
[৩৩০] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৪৫৯, মাওকুফ।
[৩৩১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৭, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৩২] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
একাদশ অনুচ্ছেদ
মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
২৯৬. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا
"তোমাদের প্রত্যেকেই তা [৩০০] অতিক্রম করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।”[৩৩৪]
বকর ইবনু আবদিল্লাহ মুযানি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যখন এই আয়াত নাযিল হলো, আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাড়িতে গিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর স্ত্রী কাছে এসে তিনিও কাঁদতে শুরু করলেন। তারপর সেবিকা এসে সেও কাঁদতে শুরু করল। পরিবারের অন্য সদস্যরা এসে তারাও কাঁদতে শুরু করল। অশ্রু ফুরিয়ে এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আরে! তোমরা আবার কেন কাঁদলে?” তারা বলল, জানি না। আপনাকে কাঁদতে দেখে আমাদেরও কান্না পেল। তখন তিনি বললেন, “রাসূলের ওপর একটি আয়াত নাযিল হয়েছে। তাতে আমার প্রতিপালক জানিয়েছেন যে, আমি জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হবো। কিন্তু তা থেকে মুক্তি পাব কি না, তা জানাননি। এই ব্যাপারটাই আমাকে কাঁদিয়েছে।”[৩৩৫]
জাহান্নাম থেকে মুক্তির অনিশ্চয়তা
২৯৭. কাইস ইবনু আবী হাযিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু কাঁদলেন এবং দেখাদেখি তাঁর স্ত্রীও কাঁদলেন। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কাঁদলে কেন?” তিনি বললেন, “আপনাকে কাঁদতে দেখে আমারও কান্না পেল।” তখন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি জেনেছি যে আমাকে জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হতে হবে; কিন্তু তা থেকে মুক্তি পাব কি না, তা জানতে পারিনি।”[৩৩৬]
আমৃত্যু না হাসা
২৯৮. সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহ এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন যে, তাঁর ভাইকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাকে যে জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হতে হবে, এ ব্যাপারটা কি জানেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” লোকটি বললেন, "তা থেকে মুক্তি পাবেন কি না, সেটা জানেন?” তিনি বললেন, "না।” তখন লোকটি বললেন, “তা হলে এত হাসি কী জন্য?” হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই লোকটিকে হাসতে দেখা যায়নি।”[৩৩৭]
জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি
২৯৯. আবূ ইসহাক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবূ মাইসারাহ শয্যায় এসে বলতে লাগলেন, "ইশ, আমার মা যদি আমাকে জন্মই না দিতেন!” তাঁর স্ত্রী বললেন, "আবূ মাইসারাহ, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনাকে ইসলামের পথে হিদায়াত দিয়েছেন।” তিনি বললেন, “অবশ্যই। কিন্তু আল্লাহ জানিয়েছেন যে আমরা জাহান্নামের ওপর দিয়ে যাব; কিন্তু তা থেকে নাজাত পাব কি না, সেটা তিনি জানাননি।”[৩৩৮]
চারটি সময়ে উদাসীন না হওয়া
৩০০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম-এর পরিবারের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী হলো: বুদ্ধিমান ব্যক্তি চারটি সময়ে মোটেই উদাসীন হয় না : ১. প্রতিপালকের সঙ্গে গোপনে কথোপকথনের সময় (মুনাজাত); ২. নিজের হিসাব-নিকাশ গ্রহণের সময়; ৩. তার দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে তাকে সতর্ককারী এবং তার সম্পর্কে সত্য প্রকাশকারী বন্ধু-ভাইদের কাছে থাকার সময়; ৪. হালাল ও সুন্দর বিষয়গুলো উপভোগ করার সময়। কারণ, তার এ সময়টা অন্যান্য সময়ের জন্য সহায়ক এবং অন্তরের সৌন্দর্য ও আনন্দ বর্ধনকারী। নিজের যুগ সম্পর্কে সচেতন থাকা ও জিহ্বাকে হেফাজত করা বুদ্ধিমান ব্যক্তির অবশ্য-কর্তব্য। পূর্ণ সময়কালের পাথেয়, জীবনযাপনের জন্য আসবাবপত্র ও হালাল বিষয় উপভোগ—এই তিনটি বিষয় ছাড়া সফর না করাটা বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য আরেকটি আবশ্যক কর্তব্য।”[৩৩৯]
সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য
৩০১. সালিহ ইবনু মিসমার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারিস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করলেন—
كَيْفَ أَنْتَ؟ - أَوْ مَا أَنْتَ يَا حَارِثُ
কেমন আছ, হারিস? তিনি বললেন, “আমি মুমিন আছি, হে আল্লাহর রাসূল।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—
مُؤْمِنُ حَقًّا؟
"সত্যিকার মুমিন?” তিনি বললেন, “জি, সত্যিকার মুমিন।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—
فَإِنَّ لِكُلِّ حَقٍّ حَقِيقَةً، فَمَا حَقِيقَةُ ذَلِكَ؟
“প্রত্যেক সত্যের হাকীকত রয়েছে, ঈমানের হাকীকত কী?” তিনি বললেন, “আমার অন্তর দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; তাই আমি রাত জেগে ইবাদাত করি এবং দিনের বেলায় সাওম রাখি। আমি যেন আমার প্রতিপালকের আরশ দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি জান্নাতে ভ্রমণরত অধিবাসীদের। জাহান্নামবাসীদের আর্তচিৎকারও যেন শুনতে পাচ্ছি।” তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مُؤْمِنُ نَوَّرَ اللَّهُ قَلْبُهُ
“সত্যিকার মুমিনের অন্তরকে আল্লাহ তাআলা আলোয় পরিপূর্ণ করুন।”[৩৪০]
হৃদয়ে ইসলাম প্রবেশের পর যা ঘটে
৩০২. আমর ইবনু মুররা রহিমাহুল্লাহ আবু জাফর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ
“আল্লাহ তাআলা যার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন।”[৩৪১]
তারপর বললেন, “যখন কোনো অন্তরে আলো প্রবেশ করে তখন তা প্রশস্ত ধারণক্ষমতা-সম্পন্ন হয়।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “এটার কোনো লক্ষণ আছে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আছে। ধোঁকাপূর্ণ বসতি (দুনিয়া) থেকে বিমুখ হওয়া এবং চিরস্থায়ী আবাস (আখিরাতের) প্রতি ঝুঁকে পড়া এবং মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।”[৩৪২]
আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করা
৩০৩. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু এক খুতবায় মানুষদেরকে বললেন, “হে মুসলমানগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করো। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, নির্জন ভূমিতে ইস্তিনজা করতে যাওয়ার সময়ও আমি মাথা ঢেকে রাখি। কারণ আমি আমার মহান রবের প্রতি লজ্জাবোধ করি।”[৩৪৩]
জান্নাতে যেতে চাইলে যা করণীয়
৩০৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা সবাই কি জান্নাতে যেতে চাও?” তাঁরা বললেন, “জি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” তিনি বললেন, “তা হলে কম আকাঙ্ক্ষা পোষণ করো, সব সময় মৃত্যুর কথা মনে রেখো এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি যথাযথ লজ্জা পোষণ করো।” তাঁরা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সবাই আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জা পোষণ করি।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহর তাআলার প্রতি লজ্জা পোষণ করার অর্থ এটা নয়। এর অর্থ কবর ও ধ্বংসের (বা মৃত্যুর) কথা ভুলে না যাওয়া। পেট ও পেটে কী রয়েছে তা ভুলে না যাওয়া। মাথা ও মাথার ভেতরে কী রয়েছে, তাও ভুলে না যাওয়া। যে আখিরাতের মর্যাদা চায় সে দুনিয়ার চাকচিক্য পরিত্যাগ করে। এইভাবে বান্দা আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করে, এইভাবে বান্দা আল্লাহ তাআলার বন্ধুত্ব অর্জন করে।"[৩৪৪]
আল্লাহর আনুগত্যের ফল
৩০৫. মুহাম্মাদ ইবনু আমর বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আমি কোনো কোনো কিতাবে পেয়েছি যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমার বান্দা যখন আমার আনুগত্য করে তখন সে আমাকে ডাকার আগেই আমি তার (ডাকে) সাড়া দিই। সে আমার কাছে চাওয়ার আগেই আমি তাকে দিয়ে দিই। আমার বান্দা যখন আমার আনুগত্য করে তখন যদি আকাশ ও জমিনের অধিবাসীরা সবাই মিলেও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমি তার জন্য ওই বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ তৈরি করে দিই। আর আমার বান্দা যখন আমার নাফরমানি করে, আমি দুই হাত কেটে দিই যাতে সে আসমানের দরজাসমূহে হাত পাততে না পারে। এবং তাকে আমি শূন্যতায় স্থাপন করি, ফলে সে আমার সৃষ্টিজগতের কোনো-কিছু থেকে সাহায্য পায় না।”[৩৪৫]
নেক আমলকারীর জন্য অল্প দুআই যথেষ্ট
৩০৬. বকর ইবনু আবদিল্লাহ মুযানি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "খাবারের জন্য যতটুকু লবণ যথেষ্ট, নেক কাজের সঙ্গে (নেক আমলকারীর জন্য) ততটুকু দুআই যথেষ্ট।”[৩৪৬]
কৃতজ্ঞ হলে আল্লাহর অধিক আনুগত্য করা যায়
৩০৭. আল্লাহ তাআলার বাণী,
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
“তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দেব।”[৩৪]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আলি ইবনু সালিহ রহিমাহুল্লাহ- কে বলতে শুনেছি, তিনি আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “আমি আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্য বাড়িয়ে দেব।”[৩৪৮]
নাফরমানি করেও নিয়ামাত পাওয়ার রহস্য
৩০৮. হারমালাহ ইবনু ইমরান বলেন, আমি উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “কেউ আল্লাহ তাআলার নাফরমানিতে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও যদি আল্লাহ তাকে তার পছন্দনীয় জিনিস দিতে থাকেন, তা হলে বুঝতে হবে আল্লাহ তাআলা তাকে ধীরে ধীরে পাকড়াও করবেন।”[৩৪৯]
আমল না করে দুআ করে লাভ নেই
৩০৯. সিমাক ইবনু ফযল বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আমল না করে দুআ করা আর ধনুক ছাড়া তির ছোড়া একই কথা।”[৩৫০]
মুমিন বান্দার কসম পূর্ণ করা হয়
৩১০. আবদুল্লাহ ইবনু আবী নাজিহ সাকাফি রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা (ইয়াসার মাক্কি) বলেছেন, “মুমিন বান্দা যদি কোনো ধরনের গুনাহ না করে, তারপর আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলে, তিনি যেন তার জন্য পাহাড় স্থানান্তরিত করেন তবে তিনি তা-ই করবেন।”[৩৫১]
টিকাঃ
[৩০০] অর্থাৎ পুলসিরাত, তা জাহান্নামের ওপর অবস্থিত। পুলসিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে। (অনুবাদক)
[৩৩৪] সূরা মারইয়াম: ৭১।
[৩৩৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৫৭, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৩৬] সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[৩৩৭] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৬/৮৪, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৩৮] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪১৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৩৯] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৪০] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত এবং দুর্বল সনদে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৩৪১] সূরা যুমার: ২২।
[৩৪২] সনদ দুর্বল, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৩৪৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/৩৪, সনদ সহীহ, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৩৪৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২২৩, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৩৪৫] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/৩৮।
[৩৪৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/১৬৪, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৪] সূরা ইবরাহীম: ৭।
[৩৪৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৪৯] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১৮/৩৩০, সনদ সহীহ, মাওকুফ ও মারফুরূপে বর্ণিত।
[৩৫০] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪৯৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
📄 আনুগত্যের ওপর অবিচল থাকা
দ্বাদশ অনুচ্ছেদ
আনুগত্যের ওপর অবিচল থাকা
আল্লাহর আনুগত্যের দ্বারা দৃঢ়তা অবলম্বন
৩১১. ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
“যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, তারপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা, তারপর বলে, তোমরা ভীত হোয়ো না, চিন্তিত হোয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হও।”[৩৫২]
তারপর বললেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা আল্লাহর জন্য তাঁর আনুগত্যের ওপর অবিচল থেকো। শেয়ালের মতো চাতুরি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ো না।”[৩৫৩]
আমৃত্যু আল্লাহর সঙ্গে কোনো-কিছু শরিক না করা
৩১২. সাঈদ ইবনু নিমরান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহ আনহু বলেছেন, “তাঁরা কখনোই আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোনো-কিছুকে শরিক করেননি।”[৩৫৪]
ভালো কাজের বিনিময়ে দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিদান
৩১৩. আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ الْمُؤْمِنَ حَسَنَتَهُ يُثَابُ عَلَيْهَا الرِّزْقَ فِي الدُّنْيَا، وَيُجْزَى بِهَا فِي الْآخِرَةِ
“আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার প্রতি তার ভালো কাজের প্রতিদান দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জুলুম করেন না; ভালো কাজের বিনিময়ে দুনিয়াতে রিযক দান করেন এবং আখিরাতে পুরস্কার প্রদান করেন।”[৩৫৫]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
৩১৪. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ-কে আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতে শুনেছি-
تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ
“তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা” অর্থাৎ, মৃত্যুর সময় ফেরেশতা নেমে আসেন;
أَلَّا تَخَافُوا
“তোমরা ভয় পেয়ো না।”, অর্থাৎ, তোমাদের সামনে যা রয়েছে তাকে ভয় পেয়ো না;
وَلَا تَحْزَنُوا
“এবং চিন্তিত হোয়ো না।”, অর্থাৎ, দুনিয়াতে তোমরা যে ভুলভ্রান্তি করেছ তার জন্য দুশ্চিন্তা কোরো না;
وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
"তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হও।”[৩৫৬],
অর্থাৎ, তাদেরকে তিনটি সুসংবাদ দেওয়া হবে: ১. মৃত্যুর সময়, ২. কবর থেকে পুনরুত্থিত করার সময় এবং ৩. যখন তারা ভয় পাবে তখন।
نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়া জীবনে ও আখিরাতে।”[৩৫৭], অর্থাৎ, তাঁরা তাদের সঙ্গে থাকবেন।”[৩৫৮]
কিয়ামাত-দিবসের সঙ্গী
৩১৫. আল্লাহ তাআলার বাণী,
نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে।”[৩৫৯]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তাদের সঙ্গী (ফেরেশতাগণ) কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং বলবেন, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত আমরা তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হব না।”[৩৬০]
কারও সততার দ্বারা তার সন্তান ও পরবর্তী বংশধর সৎ হয়
৩১৬. মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদির রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা বান্দার সততার দ্বারা তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদেরও সৎ বানান। আল্লাহ তাকে তার ঘরে নিরাপদ রাখেন এবং তার আশেপাশে যত ঘর আছে, সে যতদিন ওখানে থাকে, সেগুলোকেও নিরাপদ রাখেন।”[৩৬১]
সৎ বান্দাদের ঘর থাকে শয়তানমুক্ত
৩১৭. তালহা ইবনু মুসাররাফ বলেন, আমি খাইসামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি “আল্লাহ তাআলা সৎ বান্দার ওসিলায় ঘর থেকে শয়তানকে বিতাড়িত করেন।”[৩৬২]
পিতার সততার কারণে বালকেরা নিরাপদ
৩১৮. আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا
“এবং তাদের পিতা ছিল সৎ।”[৩৬৩]
সাঈদ ইবনু যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহ আনহুমা আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “ছেলে দুটিকে তাদের বাবার সততার কারণে নিরাপদ রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদের নিজেদের কোনো সততার কোনো কথা বলা হয়নি।”[৩৬৪]
টিকাঃ
[৩৫২] সূরা হা-মিম আস-সাজদা : ৩০।
[৩৫৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এই সনদের রাবীগণ সিকাহ (বিশ্বস্ত)।
[৩৫৪] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৪/৭৩, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৫৫] মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৮; আহমাদ, ৩/১২৫।
[৩৫৬] সূরা হা-মিম আস-সাজদা: ৩০।
[৩৫৭] সূরা হা-মিম আস-সাজদা : ৩১।
[৩৫৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৫৯] সূরা হা-মিম আস-সাজদা : ৩১।
[৩৬০] এই হাদীসের সনদ দুর্বল।
[৩৬১] আহমাদ, ৪/২৮৬, ২৮৮; আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৩/১৪৮, সনদ সহীহ।
[৩৬২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১১৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৬৩] সূরা আল-কাহফ: ৮২।
[৩৬৪] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩৪৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 মুমিনের জন্য জমিনের আবেগ
ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদ
মুমিনের জন্য জমিনের আবেগ
পাহাড় ও জমিন ভালো-মন্দ কথা শোনে
৩১৯. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “এক পাহাড় আরেক পাহাড়কে বলে, তোমার পাশ দিয়ে কি আজ আল্লাহর কোনো যিকরকারী গিয়েছে? ওই পাহাড় যদি জবাব দেয়, হ্যাঁ, গিয়েছে, তবে সে আনন্দিত হয়।” তারপর আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু তিলাওয়াত করলেন-
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِذًا تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا *
“তারা বলে, দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন। তারা তো এমন-এক বিভৎস বিষয়ের অবতারণা করেছে, যাতে আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ডবিখণ্ড হবে এবং পর্বতরাজি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে, কারণ তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে।”[৩৬৫]
তারপর তিনি বললেন, “তুমি কি ভেবেছ যে এগুলো (আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়) শুধু মিথ্যা কথাই শোনে, সত্য ও ভালো কথা শোনে না?”[৩৬৬] (অর্থাৎ, এগুলো মিথ্যা কথা যেমন শোনে, তেমনি সত্য ও ভালো কথাও শোনে।)
সাজদার ব্যাপারে জমিনের সাক্ষ্য
৩২০. সাওর ইবনু ইয়াযীদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত হুযাইল গোত্রের একজন আযাদকৃত গোলাম বলেছেন, “বান্দা যে ভূখণ্ডে কপাল রেখে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে সাজদা দেয়, কিয়ামাতের দিন ওই ভূখণ্ড তার সাজদার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। শুধু তা-ই নয়, তার মৃত্যুর দিন সে ভূমি কান্নাও করবে।” তিনি বলেছেন, “একদল মানুষ কোনো স্থানে যাত্রাবিরতি করলে ওই স্থান হয় তাদের জন্য শান্তি ও বরকতের দুআ করে আর নয়তো অভিসম্পাত করে।”[৩৬৭] (যদি তারা নেক আমল করে তবে তাদের জন্য শান্তি ও বরকতের দুআ করে, আর যদি বদ আমল করে তা হলে তাদের অভিসম্পাত করে।)
মাটির কথোপকথন
৩২১. জাফর ইবনু যাইদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “প্রতি সকালে ও প্রতি সন্ধ্যায় ভূখণ্ডগুলো পরস্পর ডাকাডাকি করে: অ্যাই প্রতিবেশী, তোমার ওপর কি আজ কোনো বান্দা আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে সালাত পড়েছে? অথবা তোমার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় আল্লাহর যিকর করেছে?” কোনো ভূখণ্ড বলে, হ্যাঁ, কোনো ভূখণ্ড বলে, না। যদি কোনো ভূখণ্ড হ্যাঁ বলে, তবে প্রশ্নকারী ভূখণ্ড নিজের ওপর তাকে মর্যাদাবান মনে করে।”[৩৬৮]
সৎ বান্দার মৃত্যুতে জমিনের কান্না
৩২২. আলি ইবনু আবী তালিব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কোনো সৎ বান্দা মারা গেলে যে জমিনের ওপর সে সালাত পড়ত ওই জমিনটুকু তার জন্য কাঁদে। আসমান ও জমিনের যে পথ দিয়ে তার আমলনামা ওঠানো হতো, সে পথটিও কাঁদে।” তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنْظَرِينَ
“আকাশ এবং পৃথিবী কেউই তাদের জন্য কাঁদেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হয়নি।”[৩৬৯]-[৩৭০]
আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার ফলে জমিনের অনুর্বরতা
৩২৩. গালিব ইবনু আজরাদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মাসজিদে মিনায় বসে সিরিয়ার এক লোক আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টি করলেন এবং পৃথিবীতে গাছপালা সৃষ্টি করলেন। তখন আদম-সন্তানেরা পৃথিবীর যে গাছের কাছেই যেত, তা থেকেই উপকৃত হতো। অথবা, ওই গাছে তাদের জন্য উপকারী বিষয় থাকত। পৃথিবী ও গাছপালার অবস্থাটা এমনই ছিল। কিন্তু একসময় আদম-সন্তানদের পাপাচারী লোকেরা ওই ভয়াবহ ও জঘন্য বাক্য উচ্চারণ করল, তারা বলল, 'আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।' যখন তারা এই কথা বলল, তখন থেকেই জমিন শুকিয়ে অনুর্বর হয়ে পড়ল এবং গাছপালা হয়ে গেল কাঁটাযুক্ত।”[৩৭১]
জমিন চল্লিশ দিন কাঁদে
৩২৪. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “জমিন মুমিন বান্দার মৃত্যুতে চল্লিশ সকাল কাঁদে।”[৩৭২]
বান্দার যিকরে উদ্বেলিত জমিন
৩২৫. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন কোনো ভূখণ্ডে সালাতের দ্বারা আল্লাহকে স্মরণ করা হয় অথবা আল্লাহর যিকর করা হয়, তখন ওই ভূখণ্ড আশপাশের ভূখণ্ডের ওপর গৌরববোধ করে। আল্লাহর যিকরের দ্বারা জমিন তার সাত স্তর পর্যন্ত আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। বান্দা সালাতে দাঁড়ালে ওই ভূখণ্ড তার জন্য সজ্জিত হয়।”[৩৭৩]
বান্দার মৃত্যু, জমিনের কান্না
৩২৬. আওযাঈ থেকে বর্ণিত, আতা খুরাসানি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “বান্দা জমিনের যে অংশে আল্লাহর উদ্দেশে সাজদাবনত হয়, ওই ভূখণ্ড কিয়ামাতের দিন তার সাজদার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে। এমনকি সে যেদিন মারা যাবে, সেদিন ওই ভূখণ্ড কাঁদবেও।”[৩৭৪]
ফেরেশতাদের ইমামতি
৩২৭. সালমান ফারিসি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন কোনো ব্যক্তি নির্জন ভূমিতে থাকে এবং ওজু করে, ওজুর পানি না পেলে তায়াম্মুম করে, তারপর আযান দেয়, তারপর ইকামাত দিয়ে সালাত পড়ে, তা হলে সে- তার দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত—আল্লাহর সৈনিকদের (ফেরেশতাদের) একটি কাতারের ইমামতি করে।”[৩৭৫]
সালাতে বান্দার অনুকরণে ফেরেশতা
৩২৮. সালমান ফারিসি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহর সৈনিকেরা (অর্থাৎ ফেরেশতারা) তার রুকূ করার সঙ্গে সঙ্গে রুকূ করে, তার সাজদা করার সঙ্গে সঙ্গে সাজদা করে এবং তার দুআর সঙ্গে সঙ্গে আমীন বলে।”[৩৭৬]
নির্জন ভূমিতে সালাত
৩২৯. কাসামা ইবনু যুহাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের কেউ যদি নির্জন ভূমিতে থাকাবস্থায় সালাত কায়েম করে, তা হলে যতদূর মাটি দেখা যায় ততদূর পর্যন্ত ফেরেশতারা তার পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়।”[৩৭৭]
দিগন্ত পর্যন্ত ফেরেশতাদের সালাত
৩৩০. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি সফর অবস্থায় আযান ও ইকামত দিয়ে সালাত পড়ে, তার পেছনে সুদূর দিগন্ত পর্যন্ত ফেরেশতারা সালাত পড়ে। আর যে ব্যক্তি আযান না দিয়ে শুধু ইকামত দেয়, তার সঙ্গে কেবল তার সঙ্গী দুই ফেরেশতা সালাত পড়ে।”[৩৭৮]
সালাত আদায়কারীর জন্য সজ্জিত জমিন
৩৩১. হারুন ইবনু রিয়াব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "নিশ্চয় জমিন সালাত আদায়কারীর জন্য সজ্জিত হয়। তোমাদের কেউ যেন সালাতের মধ্যে তা স্পর্শ না করে। যদি বাধ্য হয়ে স্পর্শ করতেই হয়, তবে একবারই। জমিনকে ওইভাবে রেখে দেওয়া তার জন্য এক শ উট মান্নত করা থেকেও উত্তম।”[৩৭৯]
টিকাঃ
[৩৬৫] সূরা মারইয়াম: ৮৮-৯১।
[৩৬৬] সূরা মারইয়াম: ৮৮-৯১। হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৭৯, মাওকুফ।
[৩৬৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৬৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৬৯] সূরা দুখান: ২৯।
[৩৭০] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৭১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৭২] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৮৩, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৭৩] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৭৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/১৯৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৭৫] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/২০৪, ২০৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৭৬] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৭৭] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৭৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৬/৩২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৭৯] হাদীসটির সনদ সহীহ, মাওকুফ ও মারফুরূপেও বর্ণিত। অর্থাৎ জমিন থেকে কোনো কঙ্কর বা পাথর না সরানোটাই তার জন্য উত্তম। কারণ, হাদীসে এসেছে যে ব্যক্তি নামাযে কঙ্কর স্পর্শ করল সে অহেতুক কাজ করল। (বিস্তারিত ফাতহুল বারি, ইবনু রজব হাম্বলি, অধ্যায়: আস-সালাত)-অনুবাদক।