📄 আমল নিয়ে চিন্তা-ফিকির
নবম অনুচ্ছেদ
আমল নিয়ে চিন্তা-ফিকির
ফিতনার পূর্বেই মৃত্যুবরণকারীদের সৌভাগ্য
২৬৯. তারিক ইবনু শিহাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "যাঁরা ফিতনার প্রাদুর্ভাব ঘটার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের কী সৌভাগ্য!” বর্ণনাকারী বলেন, আমি তারিককে জিজ্ঞেস করলাম, শব্দের অর্থ কী? তিনি বললেন, "আমার মনে হয় আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু এটা দিয়ে নতুন ইসলাম গ্রহণ অথবা ইসলামের সূচনা বুঝিয়েছেন।”[৩০৫]
তিনটি গুণ কল্যাণের লক্ষণ
২৭০. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান তাকে তিনি তিনটি বৈশিষ্ট্য দান করেন : দ্বীনের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, দুনিয়ার প্রতি বিমুখতা এবং নিজের দোষ- ত্রুটির প্রতি সচেতনতা।”[৩০৬]
মানুষের দুটি মূর্খতামূলক স্বভাব
২৭১. ইমরান কুফি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম তাঁর সঙ্গীদের বলেছেন, “তোমরা যাদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দেবে তাদের থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারবে না, তবে তোমরা আমাকে যতটুকু দাও ততটুকুই নিতে পারবে। আর জমিনের লবণকে নষ্ট করো না; কোনো বস্তু পচে গেলে লবণ দিয়ে তার পচন রোধ করা যায়। কিন্তু লবণ নষ্ট হয়ে গেলে তার কোনো ঔষুধ নেই। জেনে রাখো, তোমাদের মধ্যে দুটি মূর্খতাসুলভ স্বভাব রয়েছে—কোনো কারণ ছাড়াই হাসা এবং রাত্রি না জাগা সত্ত্বেও সকালে ঘুমিয়ে থাকা।”[৩০৭]
জ্ঞানের বিনিময়ে ধন-সম্পদ ছেড়ে দেওয়া
২৭২. খালাফ ইবনু হাওশাব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম হাওয়ারিদের বলেছেন, “দুনিয়ার রাজা-বাদশাগণ যেমন তোমাদের জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছেড়ে দিয়েছেন, তেমনি তোমরাও তাদের জন্য দুনিয়া ছেড়ে দাও।”[৩০৮]
উত্তম আমল
২৭৩. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “সবচেয়ে উত্তম আমল হলো আল্লাহভীতি ও চিন্তা-ফিকির।”[৩০৯]
আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর উত্তম আমল
২৭৪. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, উন্মুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করলাম, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সবচেয়ে উত্তম আমল কী ছিল? তিনি বললেন, “চিন্তা-ফিকির ও উপদেশ গ্রহণ।”[৩১০]
দুটি সূরার তিলাওয়াত ও চিন্তা
২৭৫. আবদুর রহমান ইবনু মাওহাব বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব রহিমাহুল্লাহ- কে বলতে শুনেছি, "রাতের বেলা দ্রুতবেগে কুরআন পড়ার চেয়ে শুধু সূরা যিলযাল ও সূরা কারিআ সারা রাত পুনরাবৃত্তি করে তিলাওয়াত করা ও তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা আমার কাছে বেশি প্রিয়।"[৩১১]
উদাসীন মন নিয়ে সালাতে ফায়দা নেই
২৭৬. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "উদাসীন মন নিয়ে সারা রাত সালাতে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে মনোযোগ ও চিন্তার সঙ্গে পরিমিত দুই রাকআত সালাত উত্তম।”[৩১২]
সত্যপন্থী দানশীলের বৈশিষ্ট্য
২৭৭. আবূ আবদুল করিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “যে ব্যক্তি তিনটি কাজ করেন তিনি পরিমিত দানশীল: ১. আল্লাহ তাআলার ফরয সালাতগুলো যথাযথভাবে আদায় করা; ২. খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকা; ৩. এবং খুব কমই উদাসীন থাকা। তিনটি বিষয়কে তুচ্ছ ভেবো না: ১. যে কল্যাণ তুমি খুঁজে বেড়াচ্ছ; ২. যে মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে চাও; ৩. এতবেশি পাপ না করা, যাতে ক্ষমা প্রার্থনা করা সম্ভব হয় না। অহেতুক কাজকর্ম ও খেলতামাশা থেকে অবশ্যই দূরে থাকবে। কারণ, এটা দিয়ে না দুনিয়া অর্জন করা যায়, না আখিরাত; আর না আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণে জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহর অসন্তুষ্টির ব্যাপারে কিন্তু খুবই সাবধান!”[৩১৩]
সত্য ও মিথ্যার তুলনা
২৭৮. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “সত্য হলো ভারী ও আনন্দদায়ক। আর মিথ্যা হলো হালকা ও রোগের কারণ। কত ক্ষণের কুপ্রবৃত্তি দীর্ঘতম দুঃখের জন্ম দিয়ে থাকে।”[৩১৪]
ওজুহীন অবস্থায় না থাকা
২৭৯. উসামা ইবনু যাইদ থেকে বর্ণিত, নাফি' রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে কখনও ওজুহীন অবস্থায় বসে থাকতে দেখিনি।”[৩১৫]
কখনও অপবিত্র অবস্থায় না থাকা
২৮০. হানাশ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (পবিত্র হওয়ার জন্য) পানির খোঁজে বের হতেন, এরপর মাটি দিয়েই মাসাহ (তায়াম্মুম) করে নিতেন। আমি বলতাম, আল্লাহর রাসূল, পানি তো আপনার কাছেই ছিল। তিনি বলতেন-
وَمَا يُدْرِينِي؟ لَعَلَّى لَا أَبْلُغُهُ
“(মৃত্যুর আগে যে) ওই পানি পর্যন্ত পৌঁছতে পারব, তার নিশ্চয়তা কী?”[৩১৬]
সব সময় ওজু অবস্থায় থাকা
২৮১. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার কাছে এই হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে যে, “নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ইসতিঞ্জাখানার বাইরে কখনও ওজুহীন অবস্থায় দেখা যায়নি।”[৩১৭]
নিজেকে উটের চেয়েও তুচ্ছ মনে করা
২৮২. সাওর ইবনু ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত আছে, খালিদ ইবনু মা'দান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রজ্ঞাবান হতে পারবে না যতক্ষণ সে মানুষকে আল্লাহ তাআলার হকের ব্যাপারে উটের মতো মনে করবে। আর যখন নিজের কথা চিন্তা করবে, তখন নিজেকে উটের চেয়েও তুচ্ছ মনে হবে।”[৩১৮]
নিজেকে নির্বোধ মনে করা
২৮৩. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে না যতক্ষণ না সে মানুষকে দ্বীনের ক্ষেত্রে নির্বোধ মনে করবে (তারপর নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আরও বেশি নির্বোধ মনে করবে।)”[৩১৯]
নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি
২৮৪. গাইলান ইবনু জারীর বলেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ একদিন আমাদের কাছে এসে বললেন, “যদি আমি নিজের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকতাম, তা হলে তোমাদেরকে অপছন্দ করতাম। কিন্তু আমি নিজের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নই।”[৩২০]
বান্দা তার প্রতিপালক ও শয়তানের মধ্যে নিক্ষিপ্ত থাকে
২৮৫. মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, "আমি বান্দাকে তার প্রতিপালক ও শয়তানের মাঝখানে পড়ে থাকতে দেখি। যদি তার প্রতিপালক তাকে উদ্ধার করেন তবে সে মুক্তি পেয়ে যাবে, আর যদি শয়তানের জন্য তাকে ছেড়ে দেন তবে শয়তান তাকে নিয়ে যাবে।”[৩২১]
টিকাঃ
[৩০৫] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৩০৬] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১১/২৩৭, ১৩/৫১৫, দঈফ।
[৩০৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৭৩; ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/১৯৮।
[৩০৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৭৪।
[৩০৯] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৬৫, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩১০] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩০৭, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৩১১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৩/২১৪, ২১৫, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩১২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩১৩] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩১৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/১৩৪, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩১৫] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩১৬] হাদীসটির সনদ সহীহ।
[৩১৭] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[৩১৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২১২, সনদ সহীহ, মাওকুফ। অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহ তাআলার হক আদায়ের ক্ষেত্রে অবহেলা করতে দেখলে তাদের প্রতি তার ক্রোধ ও ঘৃণা জন্ম নেবে। তারপর ভেবে দেখবে যে সে নিজে অন্যদের চেয়েও বেশি অবহেলা করছে, তখন তার নিজের প্রতিই প্রচণ্ড ক্রোধ ও ঘৃণা তৈরি হবে। (অনুবাদক)
[৩১৯] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩২৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩২০] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২১০, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩২১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২০১, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 নিজের হিসাব নিজে রাখা
দশম অনুচ্ছেদ
নিজের হিসাব নিজে রাখা
আদম-সন্তান পাপাচারী
২৮৬. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “বনি আদমকে পাপকারী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে আল্লাহ তাআলা যার প্রতি রহম করেন (পাপ ও অন্যায় থেকে বাঁচিয়ে রাখেন) তাঁর কথা ভিন্ন।”[৩২২]
সাজদায় পঠিত দুআ
২৮৭. আসিম ইবনু আবীন নুজুদ বলেন, আমি শাকিক ইবনু সালামা রহিমাহুল্লাহ-কে সাজদারত অবস্থায় এই দুআ পড়তে শুনেছি-
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي، إِنْ تَعْفُ عَنِّي فَطَوْلُ مِنْ قِبَلِكَ، وَإِنْ تُعَذِّبْنِي تُعَذِّبْنِي غَيْرَ ظَالِمٍ، وَلَا مَسْبُوقٍ
“হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন তা হলে তা আপনার পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ আর যদি শাস্তি দেন তা হলে আপনি জুলুমকারী নন এবং আপনার শাস্তি প্রতিহত করাও যায় না।” বর্ণনাকারী বলেন, “তারপর তিনি কাঁদতে শুরু করতেন, এমনকি মাসজিদের পেছন থেকে তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতাম।"[৩২৩]
পাপকাজ চোখের সামনে রাখা
২৮৮. সাঈদ ইবনু আবী সাঈদ মাকবুরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম বলতেন, “হে আদম-সন্তান, কোনো ভালো কাজ করলে তার ব্যাপারে আশ্বস্ত থেকো (অস্থিরতা কোরো না)। কারণ তা এমন-এক সত্তার কাছে সংরক্ষিত থাকে যিনি কখনও তা বিনষ্ট করেন না। তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন- لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنُ عَمَلًا (যে ব্যক্তি সৎকাজ করে নিশ্চয় আমি তার প্রতিদান বিনষ্ট করি না।) [৩২৪] আর যখন কোনো অন্যায় বা পাপকাজ করবে, তখন তা চোখের সামনে রাখবে (তার কথা মনে রাখবে, যেন তা থেকে তাওবা করতে পারো এবং তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে)।"
সকাল-সন্ধ্যায় তাওবা
২৮৯. তালক ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলার হক এত বড়ো যে, বান্দাগণ তা যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম নয়। আর আল্লাহ তাআলার নিয়ামাত এত বেশি যে, কখনও তা গুণে শেষ করা যাবে না। তাই ভোরে তাওবা করো, সন্ধ্যায়ও তাওবা করো।”[৩২৫]
ভীতি-প্রদর্শনকারীদের সাহচর্যই উত্তম
২৯০. মুআল্লা ইবনু যিয়াদ বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে একবার মুগীরা ইবনু মুখাদিশ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু সাঈদ, এমন মানুষদের সাহচর্যে কীভাবে থাকা যায়, যাদের কথা শুনলে অন্তর (ভয়ে) উড়ে যাবে?” জবাবে তিনি বললেন, “যাঁরা তোমাকে ভয় দেখিয়ে নিরাপদ রাখে, তাঁদের সাহচর্যে থেকো। যাঁরা আশ্বস্ত করতে করতে ভীতিকর বিষয়ের মাঝে ফেলে দেয়, তাঁদের সাহচর্যের চেয়ে ওটা উত্তম।”[৩২৬]
মুমিন বান্দা দুটি আশঙ্কার মাঝখানে রয়েছে
২৯১. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি জেনেছি যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ عَبْدُ بَيْنَ مَخَافَتَيْنِ، مِنْ ذَنْبٍ قَدْ مَضَى لَا يَدْرِي مَا يَصْنَعُ اللَّهُ فِيهِ، وَمِنْ عُمْرٍ قَدْ بَقِيَ لَا يَدْرِي مَاذَا يُصِيبُ فِيهِ مِنَ الْهَلَكَاتِ
"বান্দা হিসেবে মুমিন দুটি আশঙ্কার মাঝখানে রয়েছে: একটি হলো তার আগের করা পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করবেন, সে আশঙ্কা। আরেকটি হলো ভবিষ্যতে কী কী বিপদ চেপে বসবে, তার আশঙ্কা।”[৩২৭]
দীর্ঘ সাজদার ফলে দাঁত পড়ে যাওয়া
২৯২. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রহিমাহুল্লাহ এক দীর্ঘ সাজদা দিলেন, ফলে তাঁর সামনের দাঁত দুটি পড়ে গেল। আবূ ইয়াস তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বিষয়টি হালকা করে তুলতে চাইলেন। তখন মুসলিম ইবনু ইয়াসার রহিমাহুল্লাহ বড়োত্ব ও মহিমা প্রকাশ করে বললেন, “মানুষ যা চায়, তা খুঁজে বেড়ায়। আর যা ভয় পায়, তা থেকে দূরে থাকে। চাওয়া পূরণের পথে আসা বিপদে যে ধৈর্য ধরতে পারে না, তার চাওয়া আবার কেমন চাওয়া! আর ভয় থেকে বাঁচার জন্য যে প্রবৃত্তির দাবিকে দূরে ঠেলে দিতে পারে না, সেটা আবার কেমন ভয়!”[৩২৮]
নিজেই নিজের হিসাব গ্রহণ
২৯৩. মালিক ইবনু মিগওয়াল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব নিয়ে নাও। তা হলে কিয়ামাতের দিন তোমাদের হিসাব দেওয়া সহজ হবে। তোমাদের পরিমাপ করার আগে নিজেরাই নিজেদের পরিমাপ করে নাও। আর মহাবিচারের জন্য প্রস্তুতি নাও। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ
“সেইদিন উপস্থিত করা হবে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না।”[৩২৯]-[৩৩০]
মুমিন বান্দার গুণাবলি
২৯৪. ইয়াহইয়া ইবনু মুখতার থেকে বর্ণিত হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মুমিন বান্দা নিজের ওপর কর্তৃত্বশীল। সে আল্লাহ তাআলার জন্য নিজের হিসাব-নিকাশ নিয়ে থাকে (কী ভালো কাজ করল আর কী মন্দ কাজ করল)। যারা দুনিয়াতে নিজেদের হিসাব নেয়, কিয়ামাতের দিন তাদের হিসাব সহজ হবে। আর যারা দুনিয়ায় নিজেদের কর্মকাণ্ডের কোনো হিসাব রাখে না, কিয়ামাতের দিন তাদের হিসাব হবে খুব কঠিন। মুমিন বান্দার সাথে হঠাৎ ভালো কিছু হলে সে বিস্মিত হয়ে বলে, আল্লাহর কসম, আমি তোমাকেই চাইছিলাম। তুমি আমার প্রয়োজনও ছিলে। কিন্তু, আল্লাহর কসম, তোমার কাছে পৌঁছার কোনো পথ ছিল না। কতই না দূরে ছিলে, কতই না দূরে ছিলে। আমার ও তোমার মধ্যে প্রতিবন্ধক ছিল। আর যখন মুমিন বান্দা থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো মন্দ কাজ প্রকাশ পায়, সে তার দায় নিজের ওপরই চাপিয়ে বলে, আমি এটা করতে চাইনি, এটার আমার কোনো প্রয়োজনই নেই। আল্লাহর কসম, এই কাজ আমি আর কখনোই করব না, ইন শা আল্লাহ। মুমিনরা এমন-এক জাতি কুরআন যাদের বন্ধন দৃঢ় রেখেছে; তাদের ও ধ্বংসের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। মুমিন বান্দা এই দুনিয়ায় বন্দি, সে তার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাতের আগে সে কোনো-কিছুকে নিরাপদ মনে করে না। সে জানে যে তাকে তার কান, মুখ ও অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।”[৩৩১]
শয়তানকে কখনও নিরাপদ মনে করা যাবে না
২৯৫. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, আতা ইবনু ইয়াসার বলেছেন, “একজন ব্যক্তির মৃত্যুর সময় শয়তান এসে উপস্থিত হলো। মরণাপন্ন ব্যক্তিকে বলল, “তুমি আমার থেকে রেহাই পেলে।” মরণাপন্ন ব্যক্তি বলল, "আমি কখনোই তোমাকে নিরাপদ মনে করিনি।”[৩৩২]
টিকাঃ
[৩২২] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১০২, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৪] সূরা কাহফ: ৩০।
[৩২৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪৮, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৫৯, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৮।
[৩২৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩২৯] সূরা আল-হাক্কা: ১৮।
[৩৩০] তিরমিযি, সুনান, হাদীস নং ২৪৫৯, মাওকুফ।
[৩৩১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৭, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৩২] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
একাদশ অনুচ্ছেদ
মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
২৯৬. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا
"তোমাদের প্রত্যেকেই তা [৩০০] অতিক্রম করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।”[৩৩৪]
বকর ইবনু আবদিল্লাহ মুযানি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, যখন এই আয়াত নাযিল হলো, আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাড়িতে গিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর স্ত্রী কাছে এসে তিনিও কাঁদতে শুরু করলেন। তারপর সেবিকা এসে সেও কাঁদতে শুরু করল। পরিবারের অন্য সদস্যরা এসে তারাও কাঁদতে শুরু করল। অশ্রু ফুরিয়ে এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আরে! তোমরা আবার কেন কাঁদলে?” তারা বলল, জানি না। আপনাকে কাঁদতে দেখে আমাদেরও কান্না পেল। তখন তিনি বললেন, “রাসূলের ওপর একটি আয়াত নাযিল হয়েছে। তাতে আমার প্রতিপালক জানিয়েছেন যে, আমি জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হবো। কিন্তু তা থেকে মুক্তি পাব কি না, তা জানাননি। এই ব্যাপারটাই আমাকে কাঁদিয়েছে।”[৩৩৫]
জাহান্নাম থেকে মুক্তির অনিশ্চয়তা
২৯৭. কাইস ইবনু আবী হাযিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু কাঁদলেন এবং দেখাদেখি তাঁর স্ত্রীও কাঁদলেন। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কাঁদলে কেন?” তিনি বললেন, “আপনাকে কাঁদতে দেখে আমারও কান্না পেল।” তখন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি জেনেছি যে আমাকে জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হতে হবে; কিন্তু তা থেকে মুক্তি পাব কি না, তা জানতে পারিনি।”[৩৩৬]
আমৃত্যু না হাসা
২৯৮. সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহ এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন যে, তাঁর ভাইকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাকে যে জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হতে হবে, এ ব্যাপারটা কি জানেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” লোকটি বললেন, "তা থেকে মুক্তি পাবেন কি না, সেটা জানেন?” তিনি বললেন, "না।” তখন লোকটি বললেন, “তা হলে এত হাসি কী জন্য?” হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই লোকটিকে হাসতে দেখা যায়নি।”[৩৩৭]
জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি
২৯৯. আবূ ইসহাক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবূ মাইসারাহ শয্যায় এসে বলতে লাগলেন, "ইশ, আমার মা যদি আমাকে জন্মই না দিতেন!” তাঁর স্ত্রী বললেন, "আবূ মাইসারাহ, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনাকে ইসলামের পথে হিদায়াত দিয়েছেন।” তিনি বললেন, “অবশ্যই। কিন্তু আল্লাহ জানিয়েছেন যে আমরা জাহান্নামের ওপর দিয়ে যাব; কিন্তু তা থেকে নাজাত পাব কি না, সেটা তিনি জানাননি।”[৩৩৮]
চারটি সময়ে উদাসীন না হওয়া
৩০০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, দাউদ আলাইহিস সালাম-এর পরিবারের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী হলো: বুদ্ধিমান ব্যক্তি চারটি সময়ে মোটেই উদাসীন হয় না : ১. প্রতিপালকের সঙ্গে গোপনে কথোপকথনের সময় (মুনাজাত); ২. নিজের হিসাব-নিকাশ গ্রহণের সময়; ৩. তার দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে তাকে সতর্ককারী এবং তার সম্পর্কে সত্য প্রকাশকারী বন্ধু-ভাইদের কাছে থাকার সময়; ৪. হালাল ও সুন্দর বিষয়গুলো উপভোগ করার সময়। কারণ, তার এ সময়টা অন্যান্য সময়ের জন্য সহায়ক এবং অন্তরের সৌন্দর্য ও আনন্দ বর্ধনকারী। নিজের যুগ সম্পর্কে সচেতন থাকা ও জিহ্বাকে হেফাজত করা বুদ্ধিমান ব্যক্তির অবশ্য-কর্তব্য। পূর্ণ সময়কালের পাথেয়, জীবনযাপনের জন্য আসবাবপত্র ও হালাল বিষয় উপভোগ—এই তিনটি বিষয় ছাড়া সফর না করাটা বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য আরেকটি আবশ্যক কর্তব্য।”[৩৩৯]
সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য
৩০১. সালিহ ইবনু মিসমার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারিস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করলেন—
كَيْفَ أَنْتَ؟ - أَوْ مَا أَنْتَ يَا حَارِثُ
কেমন আছ, হারিস? তিনি বললেন, “আমি মুমিন আছি, হে আল্লাহর রাসূল।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—
مُؤْمِنُ حَقًّا؟
"সত্যিকার মুমিন?” তিনি বললেন, “জি, সত্যিকার মুমিন।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—
فَإِنَّ لِكُلِّ حَقٍّ حَقِيقَةً، فَمَا حَقِيقَةُ ذَلِكَ؟
“প্রত্যেক সত্যের হাকীকত রয়েছে, ঈমানের হাকীকত কী?” তিনি বললেন, “আমার অন্তর দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; তাই আমি রাত জেগে ইবাদাত করি এবং দিনের বেলায় সাওম রাখি। আমি যেন আমার প্রতিপালকের আরশ দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি জান্নাতে ভ্রমণরত অধিবাসীদের। জাহান্নামবাসীদের আর্তচিৎকারও যেন শুনতে পাচ্ছি।” তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مُؤْمِنُ نَوَّرَ اللَّهُ قَلْبُهُ
“সত্যিকার মুমিনের অন্তরকে আল্লাহ তাআলা আলোয় পরিপূর্ণ করুন।”[৩৪০]
হৃদয়ে ইসলাম প্রবেশের পর যা ঘটে
৩০২. আমর ইবনু মুররা রহিমাহুল্লাহ আবু জাফর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ
“আল্লাহ তাআলা যার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন।”[৩৪১]
তারপর বললেন, “যখন কোনো অন্তরে আলো প্রবেশ করে তখন তা প্রশস্ত ধারণক্ষমতা-সম্পন্ন হয়।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “এটার কোনো লক্ষণ আছে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আছে। ধোঁকাপূর্ণ বসতি (দুনিয়া) থেকে বিমুখ হওয়া এবং চিরস্থায়ী আবাস (আখিরাতের) প্রতি ঝুঁকে পড়া এবং মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।”[৩৪২]
আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করা
৩০৩. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু এক খুতবায় মানুষদেরকে বললেন, “হে মুসলমানগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করো। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, নির্জন ভূমিতে ইস্তিনজা করতে যাওয়ার সময়ও আমি মাথা ঢেকে রাখি। কারণ আমি আমার মহান রবের প্রতি লজ্জাবোধ করি।”[৩৪৩]
জান্নাতে যেতে চাইলে যা করণীয়
৩০৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-রাসূল সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা সবাই কি জান্নাতে যেতে চাও?” তাঁরা বললেন, “জি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” তিনি বললেন, “তা হলে কম আকাঙ্ক্ষা পোষণ করো, সব সময় মৃত্যুর কথা মনে রেখো এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি যথাযথ লজ্জা পোষণ করো।” তাঁরা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সবাই আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জা পোষণ করি।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহর তাআলার প্রতি লজ্জা পোষণ করার অর্থ এটা নয়। এর অর্থ কবর ও ধ্বংসের (বা মৃত্যুর) কথা ভুলে না যাওয়া। পেট ও পেটে কী রয়েছে তা ভুলে না যাওয়া। মাথা ও মাথার ভেতরে কী রয়েছে, তাও ভুলে না যাওয়া। যে আখিরাতের মর্যাদা চায় সে দুনিয়ার চাকচিক্য পরিত্যাগ করে। এইভাবে বান্দা আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করে, এইভাবে বান্দা আল্লাহ তাআলার বন্ধুত্ব অর্জন করে।"[৩৪৪]
আল্লাহর আনুগত্যের ফল
৩০৫. মুহাম্মাদ ইবনু আমর বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আমি কোনো কোনো কিতাবে পেয়েছি যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমার বান্দা যখন আমার আনুগত্য করে তখন সে আমাকে ডাকার আগেই আমি তার (ডাকে) সাড়া দিই। সে আমার কাছে চাওয়ার আগেই আমি তাকে দিয়ে দিই। আমার বান্দা যখন আমার আনুগত্য করে তখন যদি আকাশ ও জমিনের অধিবাসীরা সবাই মিলেও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমি তার জন্য ওই বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ তৈরি করে দিই। আর আমার বান্দা যখন আমার নাফরমানি করে, আমি দুই হাত কেটে দিই যাতে সে আসমানের দরজাসমূহে হাত পাততে না পারে। এবং তাকে আমি শূন্যতায় স্থাপন করি, ফলে সে আমার সৃষ্টিজগতের কোনো-কিছু থেকে সাহায্য পায় না।”[৩৪৫]
নেক আমলকারীর জন্য অল্প দুআই যথেষ্ট
৩০৬. বকর ইবনু আবদিল্লাহ মুযানি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "খাবারের জন্য যতটুকু লবণ যথেষ্ট, নেক কাজের সঙ্গে (নেক আমলকারীর জন্য) ততটুকু দুআই যথেষ্ট।”[৩৪৬]
কৃতজ্ঞ হলে আল্লাহর অধিক আনুগত্য করা যায়
৩০৭. আল্লাহ তাআলার বাণী,
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
“তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দেব।”[৩৪]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আলি ইবনু সালিহ রহিমাহুল্লাহ- কে বলতে শুনেছি, তিনি আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “আমি আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্য বাড়িয়ে দেব।”[৩৪৮]
নাফরমানি করেও নিয়ামাত পাওয়ার রহস্য
৩০৮. হারমালাহ ইবনু ইমরান বলেন, আমি উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “কেউ আল্লাহ তাআলার নাফরমানিতে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও যদি আল্লাহ তাকে তার পছন্দনীয় জিনিস দিতে থাকেন, তা হলে বুঝতে হবে আল্লাহ তাআলা তাকে ধীরে ধীরে পাকড়াও করবেন।”[৩৪৯]
আমল না করে দুআ করে লাভ নেই
৩০৯. সিমাক ইবনু ফযল বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “আমল না করে দুআ করা আর ধনুক ছাড়া তির ছোড়া একই কথা।”[৩৫০]
মুমিন বান্দার কসম পূর্ণ করা হয়
৩১০. আবদুল্লাহ ইবনু আবী নাজিহ সাকাফি রহিমাহুমুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা (ইয়াসার মাক্কি) বলেছেন, “মুমিন বান্দা যদি কোনো ধরনের গুনাহ না করে, তারপর আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলে, তিনি যেন তার জন্য পাহাড় স্থানান্তরিত করেন তবে তিনি তা-ই করবেন।”[৩৫১]
টিকাঃ
[৩০০] অর্থাৎ পুলসিরাত, তা জাহান্নামের ওপর অবস্থিত। পুলসিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে। (অনুবাদক)
[৩৩৪] সূরা মারইয়াম: ৭১।
[৩৩৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৫৭, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৩৬] সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[৩৩৭] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৬/৮৪, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৩৮] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪১৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৩৯] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৪০] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত এবং দুর্বল সনদে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[৩৪১] সূরা যুমার: ২২।
[৩৪২] সনদ দুর্বল, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৩৪৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/৩৪, সনদ সহীহ, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৩৪৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২২৩, মুরসালরূপে বর্ণিত।
[৩৪৫] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/৩৮।
[৩৪৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/১৬৪, মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৪] সূরা ইবরাহীম: ৭।
[৩৪৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৪৯] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১৮/৩৩০, সনদ সহীহ, মাওকুফ ও মারফুরূপে বর্ণিত।
[৩৫০] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪৯৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
📄 আনুগত্যের ওপর অবিচল থাকা
দ্বাদশ অনুচ্ছেদ
আনুগত্যের ওপর অবিচল থাকা
আল্লাহর আনুগত্যের দ্বারা দৃঢ়তা অবলম্বন
৩১১. ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
“যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, তারপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা, তারপর বলে, তোমরা ভীত হোয়ো না, চিন্তিত হোয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হও।”[৩৫২]
তারপর বললেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা আল্লাহর জন্য তাঁর আনুগত্যের ওপর অবিচল থেকো। শেয়ালের মতো চাতুরি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ো না।”[৩৫৩]
আমৃত্যু আল্লাহর সঙ্গে কোনো-কিছু শরিক না করা
৩১২. সাঈদ ইবনু নিমরান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহ আনহু বলেছেন, “তাঁরা কখনোই আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোনো-কিছুকে শরিক করেননি।”[৩৫৪]
ভালো কাজের বিনিময়ে দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিদান
৩১৩. আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ الْمُؤْمِنَ حَسَنَتَهُ يُثَابُ عَلَيْهَا الرِّزْقَ فِي الدُّنْيَا، وَيُجْزَى بِهَا فِي الْآخِرَةِ
“আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার প্রতি তার ভালো কাজের প্রতিদান দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জুলুম করেন না; ভালো কাজের বিনিময়ে দুনিয়াতে রিযক দান করেন এবং আখিরাতে পুরস্কার প্রদান করেন।”[৩৫৫]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
৩১৪. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ-কে আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতে শুনেছি-
تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ
“তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা” অর্থাৎ, মৃত্যুর সময় ফেরেশতা নেমে আসেন;
أَلَّا تَخَافُوا
“তোমরা ভয় পেয়ো না।”, অর্থাৎ, তোমাদের সামনে যা রয়েছে তাকে ভয় পেয়ো না;
وَلَا تَحْزَنُوا
“এবং চিন্তিত হোয়ো না।”, অর্থাৎ, দুনিয়াতে তোমরা যে ভুলভ্রান্তি করেছ তার জন্য দুশ্চিন্তা কোরো না;
وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
"তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হও।”[৩৫৬],
অর্থাৎ, তাদেরকে তিনটি সুসংবাদ দেওয়া হবে: ১. মৃত্যুর সময়, ২. কবর থেকে পুনরুত্থিত করার সময় এবং ৩. যখন তারা ভয় পাবে তখন।
نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়া জীবনে ও আখিরাতে।”[৩৫৭], অর্থাৎ, তাঁরা তাদের সঙ্গে থাকবেন।”[৩৫৮]
কিয়ামাত-দিবসের সঙ্গী
৩১৫. আল্লাহ তাআলার বাণী,
نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে।”[৩৫৯]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তাদের সঙ্গী (ফেরেশতাগণ) কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং বলবেন, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত আমরা তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হব না।”[৩৬০]
কারও সততার দ্বারা তার সন্তান ও পরবর্তী বংশধর সৎ হয়
৩১৬. মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদির রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা বান্দার সততার দ্বারা তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদেরও সৎ বানান। আল্লাহ তাকে তার ঘরে নিরাপদ রাখেন এবং তার আশেপাশে যত ঘর আছে, সে যতদিন ওখানে থাকে, সেগুলোকেও নিরাপদ রাখেন।”[৩৬১]
সৎ বান্দাদের ঘর থাকে শয়তানমুক্ত
৩১৭. তালহা ইবনু মুসাররাফ বলেন, আমি খাইসামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি “আল্লাহ তাআলা সৎ বান্দার ওসিলায় ঘর থেকে শয়তানকে বিতাড়িত করেন।”[৩৬২]
পিতার সততার কারণে বালকেরা নিরাপদ
৩১৮. আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا
“এবং তাদের পিতা ছিল সৎ।”[৩৬৩]
সাঈদ ইবনু যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহ আনহুমা আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “ছেলে দুটিকে তাদের বাবার সততার কারণে নিরাপদ রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদের নিজেদের কোনো সততার কোনো কথা বলা হয়নি।”[৩৬৪]
টিকাঃ
[৩৫২] সূরা হা-মিম আস-সাজদা : ৩০।
[৩৫৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এই সনদের রাবীগণ সিকাহ (বিশ্বস্ত)।
[৩৫৪] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৪/৭৩, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৩৫৫] মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৮; আহমাদ, ৩/১২৫।
[৩৫৬] সূরা হা-মিম আস-সাজদা: ৩০।
[৩৫৭] সূরা হা-মিম আস-সাজদা : ৩১।
[৩৫৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৩৫৯] সূরা হা-মিম আস-সাজদা : ৩১।
[৩৬০] এই হাদীসের সনদ দুর্বল।
[৩৬১] আহমাদ, ৪/২৮৬, ২৮৮; আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৩/১৪৮, সনদ সহীহ।
[৩৬২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১১৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৩৬৩] সূরা আল-কাহফ: ৮২।
[৩৬৪] আবূ দাউদ, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩৪৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।