📄 ইখলাস ও নিয়ত
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
ইখলাস ও নিয়ত
নিয়তই আসল
১৭৯. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ، فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا، أَوِ امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ.
“নিয়তের ওপরই সমস্ত আমল নির্ভর করে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তা-ই রয়েছে, যা সে ইচ্ছা করে। তাই যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিয়তে হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশেই পরিগণিত হয়। আর যে ব্যক্তি হিজরত করে দুনিয়া লাভ করা অথবা কোনো নারীকে বিবাহ করার নিয়তে, তার হিজরত হয় তারই উদ্দেশে, যার নিয়তে সে হিজরত করেছে।”[২০৪]
আমলের মূলভিত্তি
১৮০. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, আমি জাফর ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: “সকল কাজের (বা আমলের) ভিত্তি হলো নিয়ত। নিয়তের দ্বারা যে ফজিলত লাভ হয়, আমলের দ্বারা তা হয় না।”[২০৫]
আল্লাহর ভালোবাসার প্রভাব
১৮১. আনাবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সালিহ ইবনু আবদির রহমান আমাকে সুলাইমান ইবনু আবদিল মালিকের কাছে পাঠালেন। ওখানে গিয়ে উমর ইবনু আবদিল আযীযকে বললাম, সালিহের কাছে কি আপনার কোনো প্রয়োজন আছে? তিনি বললেন, তাকে বলবেন, এমন কাজে আত্মনিয়োগ করুন, যা আল্লাহর কাছে আপনার জন্য অবশিষ্ট থাকবে। আপনার জন্য যা আল্লাহর কাছে থাকবে, তা মানুষের কাছেও থাকবে। আর আপনার জন্য যা আল্লাহর কাছে থাকবে না, তা মানুষের কাছেও থাকবে না।”[২০৬]
আল্লাহই যথেষ্ট
১৮২. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এই চিঠি পাঠালেন: “পরসমাচার এই যে, আল্লাহকে ভয় করুন, তা হলে মানুষের বিরুদ্ধে তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন। আর যদি মানুষকে ভয় করেন, তবে কেউই আল্লাহর বিরুদ্ধে আপনার জন্য যথেষ্ট হবে না।”[২০৭]
লোক-দেখানো আল্লাহভীরুতা
১৮৩. মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বলেছেন, “ছেলে আমার, তুমি আল্লাহকে ভয় করো; অন্তর পাপকাজে কলুষিত থাকার পরও মানুষের সম্মান পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহভীরুতা দেখিয়ে বেড়িয়ো না।”[২০৮]
সর্বদা নিজের ভুল নিয়ে চিন্তিত থাকা
১৮৪. উমারা ইবনু গাযিয়্যাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উরওয়াহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ তাআলার কাছে আমার এমন দোষত্রুটির ব্যাপারে অনুযোগ জানাই, যা আমি ত্যাগ করতে পারিনি। এমন প্রশংসার ব্যাপারেও (অনুযোগ জানাই), যার যোগ্য না হয়েও আমি তা পেয়ে গেছি। আমরা তো দ্বীনের দ্বারা দুনিয়া পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করি।”[২০৯]
আল্লাহর বড়োত্বের কাছে বান্দার বড়োত্ব কতটুকু?
১৮৫. মুকবিল ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আতা ইবনু ইয়াযীদ লাইসীর কাছে অনেক লোক ভিড় জমাল এবং তাকে প্রশ্ন করতে লাগল। তখন তিনি বললেন, “আপনি এই ব্যাপারে কী মনে করেন, এই ব্যাপারে আপনার কী মত-এই ধরনের কথা তোমরা বেশি বলে থাকো। আল্লাহর থেকে প্রতিদান আশা করে আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য কাজ কোরো না। তোমাদের কারও ভালো কাজ যেন তাকে গর্বিত করে না তোলে, তা যত বেশিই হোক না কেন। কারণ, আল্লাহ তাআলার বড়োত্বের কাছে বান্দার বড়োত্ব মাছির একটি পায়ের সমানও নয়।”[২১০]
প্রত্যেক কাজে সাওয়াবের নিয়ত
১৮৬. যুবাইদ ইবনু হারিস রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমাকে এ ব্যাপারটি আনন্দ দেয় যে, আমি আমার প্রতিটি কাজে নিয়ত করি; এমনকি খাওয়া এবং ঘুমেও।”[২১১]
হৃদ্যতা ও কথা-কাজের মিল
১৮৭. জারীর ইবনু হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। আমরা এত বেশি ছিলাম যে, তাঁর ঘরের মেঝে ভরে গেল। তিনি আমাদের সবার চেহারার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “চোখ দেখতে পাচ্ছি কিন্তু হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব দেখতে পাচ্ছি না। বিদ্যা দেখতে পাচ্ছি কিন্তু কথা ও কাজের মিল দেখতে পাচ্ছি না। কেবল কাপড়-পরিহিত কিছু চেহারা দেখতে পাচ্ছি।”[২১২]
গায়ের ত্বক সুন্দর হলেও অন্তর পাষাণ
১৮৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “তুমি ইচ্ছে করলে এমন লোক দেখতে পাবে, যার গায়ের ত্বক মসৃণ ও শুভ্র আর সে বাকপটু। সে কথায় পটু হলেও তার অন্তর ও আমল মৃত। সে নিজেকে যতটুকু দেখতে পায়, তুমি তাকে তার চেয়ে বেশি দেখতে পাবে। কেবল দেহ দেখতে পাবে, হৃদয় দেখতে পাবে না। আওয়াজ শুনতে পাবে; কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ কথা শুনতে পাবে না। তাদের জবান সজীব ভূমির মতো; কিন্তু হৃদয় পাষাণ।”[২১৩]
পশমওয়ালা ভেড়ার পালের মতো ক্বারী
১৮৯. শাকীক ইবনু সালামা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এ যুগের ক্বারীরা হবে পশমওয়ালা ভেড়ার পালের মতো, যেগুলো জীর্ণশীর্ণ, সেগুলো টক খেয়েছে এবং পানি পান করেছে, ফলে কোমর মোটা হয়ে গেছে। মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে লোকজন ওদের দেখে অবাক হয়। (কোমর মোটা দেখে) ওখান থেকে একটি ভেড়া নিয়ে জবাই করে, কিন্তু দেখে তাতে গোশত-চর্বি কিছুই নেই। ফলে আরেকটি ভেড়া নিয়ে জবাই করে। কিন্তু সেটিরও একই অবস্থা। অবশেষে লোকটি বলে, ধুর, তোর জন্য পুরো দিনটিই মাটি করলাম।”[২১৪]
আল্লাহর ক্রোধের বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইলে
১৯০. আবদুল ওয়াহ্হাব ইবনুল ওয়ারদ মদীনার একজন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে একটি চিঠি লিখলেন এবং অনুরোধ জানালেন : “আপনি আমাকে অল্প কথায় উপদেশ দিয়ে একটি পত্র লিখুন।” আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা লিখলেন : “আয়িশার পক্ষ থেকে মুআবিয়ার প্রতি, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মানুষের ক্রোধের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইবে, মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধের বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইবে, আল্লাহ তাআলা তাকে মানুষের মুখাপেক্ষী বানাবেন। ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”[২১৫]
প্রশংসাকারীরা নিন্দুকে পরিণত হয়
১৯১. আব্বাস ইবনু যুরাইহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে (পাঠানো চিঠিতে) লিখলেন : “কেউ আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজ করলে, তার প্রশংসাকারীরা নিন্দুক হয়ে ওঠে।”[২১৬]
অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে আয়োজন
১৯২. হুমাইদ ইবনু নুআইম রহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার উমর ও উসমান রদিয়াল্লাহ আনহুমা-কে খাবার খাওয়ার জন্য দাওয়াত করা হলো। তাঁরা রাজি হলেন। তারপর তারা বের হলেন। (পথিমধ্যে) উমর রদিয়াল্লাহু আনহু উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, এমন ভোজের আয়োজন দেখেছি, যা দেখে মনে হয়েছে যে, ইশ! যদি ওই খাবার দেখতেই না পেতাম। উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, তা কেন? উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, কেননা আমি ভয় করছি, সেটা অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।[২১৭]
অহংকারের ভাব দেখা দিলে কথা বলা অথবা চুপ থাকা
১৯৩. হাজ্জাজ ইবনু শাদ্দাদ থেকে বর্ণিত, উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী জাফর বা আবদুল্লাহ ইবনু জাফর একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেন, “কথা বলার সময় গর্ব অনুভূত হলে বক্তা যেন চুপ হয়ে যায়। আর যদি চুপ করে থাকাটা তাকে গর্বিত করে তোলে, তবে সে যেন কথা বলে।”[২১৮]
আল্লাহ তাআলা যে সালাতের প্রশংসা করেন
১৯৪. সাঈদ ইবনু ইয়াস জুরাইরি থেকে বর্ণিত, আবুল আলা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমাকে বলা হয়েছে যে, যখন কোনো বান্দা নির্জন ভূমিতে সালাত আদায় করে এবং খুশু-খুযুর সঙ্গে সালাত শেষ করে, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এই সালাত আমার জন্য। আমার এই বান্দা সালাত আদায় করেছে; কিন্তু তাকে কেউ দেখেনি এবং সেও কাউকে দেখাতে চায়নি।”[২১৯]
কল্যাণকামিতাই উত্তম ইবাদাত
১৯৫. আবূ উমামা বাহিলি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবি সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَحَبُّ مَا تَعَبَّدَنِي بِهِ عَبْدِيَ إِلَيَّ النُّصْحُ
“আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার জন্য যে-সকল ইবাদাত করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো কল্যাণকামিতা।”[২২০]
আলহামদু লিল্লাহ বলা
১৯৬. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-কে এক ব্যক্তি সালাম দিল। তিনি সালামের জবাব দিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছ?” লোকটি জবাব দিল, “আলহামদু লিল্লাহ, ভালো আছি।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি তোমার থেকে এমনটাই আশা করেছিলাম।”[২২১]
সর্বাবস্থায় আল্লাহর তাআলার শুকরিয়া
১৯৭. সাঈদ ইবনু যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর তাআলার প্রশংসা করে, তাদেরকে সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য আহবান করা হবে।” অথবা তিনি বলেছেন, "যারা সুদিনে ও দুর্দিনে আল্লাহর প্রশংসা করে।”[২২২]
দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়
১৯৮. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "আমরা সম্ভব হলে দিনে কয়েকবার পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করতাম এবং ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করতাম। কেবল আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করার জন্যই আমরা এমনটি করতাম।”[২২৩]
তুচ্ছ ক্রীতদাসরূপে আল্লাহর আনুগত্য
১৯৯. আবুল বাখতারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি এমনভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করতে চাই, যেন আমি একটি তুচ্ছ ক্রীতদাস।”[২২৪]
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে বুঝেছে সে দুনিয়াবিমুখ হয়েছে
২০০. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, হাজ্জাজ ইবনু ফারাফাসা আমাকে লিখলেন যে, বুদাইল ওকাইলি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার রবকে চিনেছে, সে তাঁকে ভালোবেসেছে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে দুনিয়াবিমুখ হয়েছে। মুমিন বান্দা কখনও অপ্রয়োজনীয় কাজে এমনভাবে লিপ্ত হয় না যে (আল্লাহ থেকে) গাফেল হয়ে পড়ে; যখন সে তার (কৃতকর্মের) কথা ভাবে, দুঃখিত হয়।”[২২৫]
আল্লাহকে ডাকার পরও মানুষ তাঁকে ভুলে যায়
২০১. জাফর ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, কোনো কোনো কিতাবে আছে, (আল্লাহ তাআলা বলেন,) "হে আদম-সন্তান, তুমি আমাকে ডাকো, আবার আমার থেকে পালিয়ে যাও; আমাকে স্মরণ করো, আবার আমাকে ভুলে যাও (কীভাবে?)।”[২২৬]
অন্যের সামান্য দোষও বড়ো করে দেখা
২০২. জাফর ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হে আদম-সন্তান, তুমি তোমার ভাইয়ের চোখে সামান্য ময়লা থাকলেও তা দেখতে পাও; কিন্তু নিজের দুই চোখে গাছের গুঁড়ি পড়ে থাকলেও দেখতে পাও না।”[২২৭]
টিকাঃ
[২০৪] বুখারি, ৬৯৭২; মুসলিম, ৫০৩৬।
[২০৫] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২০৬] হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণিত।
[২০৭] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৪/৬১, মাওকুফ। ইমাম তিরমিযি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
[২০৮] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২১৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২০৯] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/৬৭৩, মাওকুফ।
[২১০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২১১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২১২] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২১৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৮, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২১৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১০৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২১৫] ইবনু হিব্বান, সহীহ, ১/৫১০, সনদ দঈফ, তবে অনান্য সূত্রেও বর্ণিত হওয়ায় হাদীসটি সহীহ।
[২১৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৬৫, সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[২১৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২১৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২১৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২২০] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/৮৭, দঈফ।
[২২১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৬৯, সনদ দঈফ, মারফু।
[২২৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২২৪] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৪/৪৯, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[২২৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১০৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৭৮, মাকুত। কিন্তু অন্য কিতাবে সনদ সহীহ ও মারফুরূপে বর্ণিত।
📄 বান্দা হয়ে বেঁচে থাকা
তৃতীয় অনুচ্ছেদ
বান্দা হয়ে বেঁচে থাকা
আমানতের কসম খাওয়া নিষিদ্ধ
২০৩. খুনাস ইবনু সুহাইম অথবা জাবালাহ ইবনু সুহাইম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি যিয়াদ ইবনু হুদাইর আসাদীর সাথে একটি ভাগাড়ের কাছাকাছি এলাম এবং আমি বললাম, না, আমানতের কসম! এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যিয়াদ কাঁদতে শুরু করলেন। অনেক কাঁদলেন। ভাবলাম বিরাট অন্যায় করে ফেলেছি। জিজ্ঞেস করলাম, এ ধরনের কথা কি অপছন্দনীয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু আমানতের কসম খেতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।[২২৮]
আল্লাহর নামের মাহাত্ম্য বজায় রাখার নির্দেশ
২০৪. মুতাররিফ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলার নামের মাহাত্ম্য যেন তোমাদের অন্তরে বদ্ধমূল থাকে। 'হে আল্লাহ, এই কুকুরটাকে লাঞ্ছিত করো, বা গাধাটাকে, ছাগলটাকে অপদস্থ করো'-তোমাদের এই ধরনের কথায় আল্লাহর নাম উচ্চারণ কোরো না।”[২২৯]
আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান না দেখানো নাফরমানি
২০৫. আল্লাহ তাআলার বাণী,
وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ
“আর যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে [২৩০] সম্মান প্রদর্শন করবে, নিঃসন্দেহে সেটা হবে (তাদের) অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।”[২৩১]
আতা ইবনু আবী রাবাহ রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “(আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান না দেখানো) নাফরমানির শামিল।”[২৩২]
আল্লাহ তাআলার প্রকৃত প্রিয়ভাজন
২০৬. মা'মার কুরাইশের এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে বললেন, "হে আমার রব, আপনি আপনার প্রকৃত প্রিয়ভাজনদের সম্পর্কে আমাকে জানান।” আল্লাহ বললেন, "তারা হলো ওই সকল ব্যক্তি যারা আমার সন্তুষ্টির জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার মাসজিদ আবাদ রাখে, প্রত্যুষে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারা যখন আমাকে স্মরণ করে আমি তাদেরকে স্মরণ করি; আমি যখন তাদেরকে স্মরণ করি তারা আমাকে স্মরণ করে। তারা আমার আনুগত্যের দিকে এমনভাবে ছুটে আসে, যেভাবে ইগল তার বাসার দিকে ছোটে। আমার নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে হালাল মনে করা হলে তারা লড়াকু নেকড়ের মতো রেগে যায়।"[২৩৩]
আল্লাহর ওলিদের পরিচয়
২০৭. সাঈদ ইবনু জুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহ তাআলার ওলি কারা? তিনি বললেন,
الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ
"যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।"[২৩৪]
জান্নাতের আশায় ইবাদাতে লজ্জাবোধ
২০৮. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, একজন প্রজ্ঞাবান মনীষী বলেছেন, “জান্নাত লাভের আশায় আমার রবের ইবাদাত করছি, এমনটা ভাবতে আমার লজ্জা করে। যেমন: পারিশ্রমিক পেলে কোনো শ্রমিক কাজ করবে, না হলে করবে না। জাহান্নামের ভয়েও আমার রবের ইবাদাত করতে লজ্জাবোধ করি। এ কেমন দুশ্চরিত্র বান্দা, যে কিনা ভয় দেখালে আমল করে, আর ভয় না দেখালে আমল করে না! বরং আমি আমার রবের ইবাদাত করি এ কারণে যে, তিনি ইবাদাতের উপযুক্ত। আমার ভেতর থেকে আমার রবের ভালোবাসা এমনভাবে উৎসারিত হয়, অন্য কিছুই সেভাবে উৎসারিত হয় না।”[২৩৫]
নবি হয়েও বান্দা
২০৯. উতারিদ ইবনু হাজিব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবির সাথে ছিলেন। এমন সময় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিঠে খোঁচা দিলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فَذَهَبَ بِي إِلَى شَجَرَةٍ فِيهَا مِثْلُ وَكْرَى الطَّيْرِ، فَقَعَدَ فِي إِحْدَاهُمَا، وَقَعَدْتُ فِي أُخْرَى، فَنَشَأَتْ بِنَا حَتَّى مَلَاتِ الْأُفُقَ، فَلَوْ بَسَطْتُ يَدِي إِلَى السَّمَاءِ لَنِلْتُهَا، ثُمَّ دُلِّيَ بِسَبَبٍ فَهَبَطَ النُّوْرُ ، فَوَقَعَ جَبْرَبِيلُ مَغْشِيًّا عَلَيْهِ، كَأَنَّهُ حِلْسٌ، فَعَرَفْتُ فَضْلَ خَشْيَتِهِ عَلَى خَشْيَتِي، فَأُوْحِيَ إِلَى: أَنَبِيًّا عَبْدًا أَمْ نَبِيًّا مَلِكًا؟ فَإِلَى الْجَنَّةِ مَا أَنْتَ، فَأَوْمَا جَبْرَبِيلُ وَهُوَ مُضْطَجِعُ: بَلْ نَبِيُّ عَبْدُ
"জিবরাঈল আমাকে নিয়ে একটি গাছের কাছে গেলেন। তাতে পাখির বাসার মতো দুটি জিনিস ছিল। তার একটিতে তিনি বসলেন, অন্যটিতে আমি বসলাম। গাছটি বেড়ে উঠে দিগন্তে ছড়িয়ে গেল। মনে হলো যেন হাত বাড়ালেই আকাশ ছুঁতে পারব। তারপর একটি রশি ফেলা হলো এবং আলো নেমে এল। আলো দেখে জিবরাঈল সংজ্ঞা হারিয়ে পশমি কাপড়ের মতো পড়ে রইলেন। বুঝতে পারলাম যে, আমার চেয়ে তাঁর আল্লাহভীতি বেশি। তারপর আমার কাছে ওহি প্রেরণ করা হলো যে, আমি কি নবি এবং বান্দা হয়ে থাকতে চাই, নাকি নবি এবং বাদশা হয়ে থাকতে চাই। আর যে নবিই হই, আমাকে জান্নাত দেওয়া হবে। তখনও জিবরাঈল পড়েই ছিলেন, তিনি ইশারা দিয়ে বললেন, বরং আপনি নবি এবং বান্দা হয়েই থাকুন।”[২৩৬]
জিবরাঈল আলাইহিস সালাম-এর আকৃতি
২১০. ইবনু শিহাব যুহরি রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল আলাইহিস সালাম-কে তাঁর সামনে তাঁর স্বরূপ প্রকাশ করতে অনুরোধ জানালেন। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, “আপনি তো তা সহ্য করতে পারবেন না।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, إِنِّي أُحِبُّ أَنْ تَفْعَلَ "আপনি এটা করলে আমার কাছে খুব ভালো লাগবে।” এক পূর্ণিমার রাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসজিদে গেলেন। সেখানে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তাঁর স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর দেখলেন জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তাঁকে ধরে বসে আছেন। তাঁর একটি হাত রাসূলের বুকের ওপর, আরেকটি হাত কাঁধের ওপর। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, سُبْحَانَ اللَّهِ مَا كُنْتُ أَرَى أَنَّ شَيْئًا مِنَ الْخَلْقِ هَكَذَا "সুবহানাল্লাহ! আমি সৃষ্টিজগতের মধ্যে এমনকিছু কখনও দেখিনি।”
জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, “আপনি ইসরাফীলকে দেখলে যে কী হতো! তার বারোটি ডানা আছে। একটি ডানা পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তে, আরেকটি পশ্চিমে। আরশ তো তাঁর কাঁধের ওপর। আল্লাহর বড়োত্বের কাছে তিনি খুবই ক্ষুদ্র; যেন চড়ুইয়ের চেয়েও ছোটো একটি পাখি। আল্লাহর আরশ তো মূলত আল্লাহর বড়োত্ব বহন করে।”[২৩৭]
ফেরেশতাদের একটি দুআ
২১১. আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ফেরেশতাগণের একটি দুআ এরকম-
اللَّهُمَّ مَا لَمْ يَبْلُغْهُ قُلُوبُنَا مِنْ خَشْيَتِكَ يَوْمَ نِقْمَتِكَ مِنْ أَعْدَابِكَ، فَاغْفِرْ لَنَا
“হে আল্লাহ, আপনি যেদিন আপনার শত্রুদেরকে শাস্তি দেবেন সেইদিন কী ভীতিকর অবস্থা হবে, সে সম্পর্কে আমরা অবহিত নই! সুতরাং আপনি আমাদের ক্ষমা করুন।” বা অনুরূপ একটি দুআ।[২৩৮]
জ্ঞানীরাই আল্লাহকে বেশি ভয় করে
২১২. আতা ইবনু আবী রাবাহ রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার রব, আপনার কোন বান্দারা আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে? আল্লাহ তাআলা বললেন, “যারা আমার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানে।[২৩৯]
সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে কিয়ামাত পর্যন্ত সাজদা
২১৩. আবূ ঈসা ইয়াহইয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর কুরসীতে সমাসীন হয়েছেন তখন একজন ফেরেশতা সাজদায় অবনত হয়েছে। সে এখনও মাথা তোলেনি। কিয়ামাত-দিবসের আগে সে মাথা তুলবে না। কিয়ামাতের দিন সে বলবে, হে আমার রব, আমি আপনার যথাযথ আনুগত্য করতে পারিনি। তবে আমি আপনার সঙ্গে কাউকে শরীক করিনি এবং আপনাকে ছাড়া অন্য-কাউকে অভিভাবক বানাইনি।”[২৪০]
টিকাঃ
[২২৮] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/২৯৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/২০৯, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২৩০] নিদর্শন বলতে, হরম শরীফ এবং হাজ্জ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি বোঝানো হয়েছে। অথবা এর অর্থ আল্লাহর হুকুম-আহকামও হতে পারে।-অনুবাদক
[২৩১] সূরা হাজ্জ: ৩২।
[২৩২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৩৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২০৮।
[২৩৪] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৭৮, সনদ হাসান, মুরসাল।
[২৩৫] ওয়াহাব পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[২৩৬] বাযযার, মুসনাদ, ৫৮, সনদ হাসান, মুরসাল।
[২৩৭] সনদ হাসান, মুরসাল।
[২৩৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২৩৯] সনদ সহীহ।
[২৪০] আবুশ শাইখ আসবাহানি, আল-আযমাহ, ২৫৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 কিয়ামাতের ভয়াবহতা
চতুর্থ অনুচ্ছেদ
কিয়ামাতের ভয়াবহতা
ভীতি ও আনন্দের সংবাদ
২১৪. শুরাইহ ইবনু উবাইদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, “হে কা'ব, আমাদেরকে (আল্লাহ) ভীতির কথা বলো।” কা'ব রহিমাহুল্লাহু বললেন, একদল ফেরেশতা তাদের সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে দাঁড়িয়ে আছেন, মেরুদণ্ড একটুও অবনত করেননি; আরেক-দল ফেরেশেতা রুকূ অবস্থায় আছেন, তাঁরা তাঁদের মেরুদণ্ড সোজা করেননি; আরেক-দল আছেন সাজদা অবস্থায়, একবারও মাথা তোলেননি। শিঙ্গায় শেষ ফুৎকার দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা এই অবস্থাতেই থাকবেন। কিয়ামাতের দিন তাঁরা সবাই মাথা তুলে বলবেন, সকল পবিত্রতা ও প্রশংসা আপনার, যেভাবে আপনার ইবাদাত করা উচিত, আমরা তো সেভাবে করতে পারিনি।” এই কথাগুলো বলার পর কা'ব আহবার বললেন, “আল্লাহর কসম, যদি কারও আমল সত্তর-জন নবির আমলের সমপরিমাণও হয়, তারপরও কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা দেখে এই আমলকে তুচ্ছ মনে করবে। আল্লাহর কসম, জাহান্নামের এক বালতি গরম পানি যদি সূর্যোদয়ের স্থানে রেখে দেওয়া হয় তা হলে তার তাপের কারণে পশ্চিমপ্রান্তের লোকদের মগজ ফুটতে থাকবে। আল্লাহর কসম, জাহান্নাম ভয়ঙ্করভাবে ফুসতে থাকবে। এমনকি নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা-সহ সবাই হাঁটুগেড়ে বসে বলতে থাকবে, ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। এমনকি আমাদের নবি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও ইসহাক আলাইহিস সালাম-ও। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বলতে থাকবেন, হে আমার রব, আমি আপনার বন্ধু ইবরাহীম!” রাবী বলেন, এই পর্যন্ত শোনার পর উপস্থিত লোকেরা কাঁদতে শুরু করলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল। উমর রদিয়াল্লাহু আনহু এই অবস্থা দেখে বললেন, কা'ব, কিছু সুসংবাদ দাও। কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ বললেন, “সুখবর গ্রহণ করুন! আল্লাহ তাআলার তিন শ চৌদ্দটি শারীআত রয়েছে। কেউ যদি তার একটিও ইখলাসের সাথে পালন করে তা হলে আল্লাহ তাআলা নিজ রহমত ও অনুগ্রহে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহর কসম, তোমরা যদি আল্লাহর সকল রহমত জানতে তবে আমল করা ছেড়ে দিতে। আল্লাহর কসম, যদি কোনো জান্নাতী নারী ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে আমাদের এই আকাশে আত্মপ্রকাশ করে তবে গোটা দুনিয়া পূর্ণিমার রাতের চেয়েও বেশি আলোকিত হয়ে উঠবে এবং জগদ্বাসী তার সুঘ্রাণ পাবে। আল্লাহর কসম, জান্নাতবাসীরা যেসব কাপড় পরবে তার একটি কাপড় যদি আজ দুনিয়ায় প্রকাশ করা হয় তবে যে-ই তার দিকে তাকাবে তার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে এবং মানুষের দৃষ্টিশক্তি তা সহ্য করতে পারবে না।”[২৪১]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
২১৫. আল্লাহ তাআলার বাণী,
فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا
“যখন তার রব পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল।”[২৪২]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “পাহাড় জমিনে ডেবে গেল, এমনকি তা সমুদ্রে পড়ে বিলীন হয়ে গেল।”[২৪৩]
জিবরাঈল আলাইহিস সালাম-এর সাথে কথোপকথন
২১৬. ইসমাঈল ইবনু রাজা থেকে বর্ণিত, ইমাম শা'বী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম-এর সাথে জিবরাঈল দেখা করলেন। বললেন, আস-সালামু আলাইকুম ইয়া রূহাল্লাহ (হে আল্লাহর রূহ, আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)! ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, ওয়া আলাইকুম সালাম ইয়া রূহাল্লাহ (আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, হে আল্লাহর রূহ)! ঈসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামাত কখন হবে? জিবরীল আলাইহিস সালাম তখন তাঁর পাখা নেড়ে বললেন, যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি কিছু জানে না। তারপর এই আয়াত পড়লেন-
إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً
“এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে। শুধু তিনিই যথাসময়ে তা প্রকাশ করবেন। আর তা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা হবে। আকস্মিকভাবেই তা তোমাদের ওপর আসবে।”[২৪৪]-[২৪৫]
কিয়ামাতের কথা শুনে চিৎকার
২১৭. মুগীরা থেকে বর্ণিত, ইমাম শা'বী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম-এর কাছে কিয়ামাতের কথা উল্লেখ করা হলে চিৎকার করে উঠতেন এবং বলতেন, ইবনু মারইয়ামের কাছে কিয়ামাতের আলোচনা করা উচিত নয়। এ কথা বলে চুপ থাকতেন।”[২৪৬]
মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করে
২১৮. আল্লাহ তাআলার বাণী,
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ
“আমি তো মানুষকে কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।”[২৪৭]
আলি ইবনু আলি রিফায়ি থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াত পাঠ করে বললেন, “আমি এমন কোনো সৃষ্টির কথা জানি না, যা মানুষের মতো কষ্ট ক্লেশ ভোগ করে।”[২৪৮]
মানুষ দুনিয়াতে কষ্ট ভোগ করে, আখিরাতেও করবে
২১৯. সাঈদ ইবনু আবিল হাসান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ ওপরের আয়াতটি পড়ে বললেন, “মানুষ দুনিয়াতেও দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে, আখিরাতেও করবে।”[২৪৯]
কবরের বিপদ সবচেয়ে ভয়াবহ
২২০. হারুন ইবনু রিয়াব বলেন, আসআস ইবনু সালামা রহিমাহুল্লাহ তাঁর সঙ্গীদের বললেন, একটা কবিতা শোনাই। সঙ্গীরা তাঁর দিকে তাকাতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, আপনি আবার কী কবিতা শোনাবেন? তখন তিনি আবৃত্তি করলেন—
'তুমি যদি (কবরের) বিপদ থেকে বেঁচে যাও তবে তো ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে গেলে। আর যদি বাঁচতে না পারো, তবে আমি তোমার ভাই, আমিও তো বাঁচতে পারব না।”[২৫০]
এটি শোনার পর তাঁর সঙ্গীরা কাঁদতে শুরু করলেন। সেদিন তাঁরা যেভাবে কেঁদেছেন, অন্য-কোনো দিন কোনো কারণে তাঁদেরকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি।”[২৫১]
কান্না না করা নিন্দনীয়
২২১. ইমরান ইবনু হুদাইর রহিমাহুল্লাহ আনযাহ গোত্রের এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আমরা আমাদের মতো কাউকে দেখিনি। কারণ, আমাদের গোত্রগুলো একসঙ্গে কাঁদে না।”[২৫২]
ইট হয়ে জন্ম নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা
২২২. আমির ইবনু রবীআ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু জমিন থেকে একটা ইট হাতে নিয়ে বললেন, “ইশ, আমি যদি ইট হতাম! যদি কিছুই না হতাম! আহ, মা যদি আমাকে জন্মই না দিতেন! যদি একেবারে বিস্মৃত হয়ে যেতে পারতাম।”[২৫৩]
সৃষ্টিই না-হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
২২৩. যিয়াদ ইবনু মিখরাক রহিমাহুল্লাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু এক লোককে এই আয়াত পড়তে শুনলেন:
هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَذْكُورًا
“মানুষ একটা সময় উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না।”[২৫৪] শুনে বললেন, “ইশ, ওভাবেই যদি সব শেষ হয়ে যেত![২৫৫]
সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য
২২৪. আবান ইবনু উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “মুমূর্ষু অবস্থায় উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমাকে ক্ষমা করা না হলে আমার দুর্ভাগ্য, আমার মায়ের দুর্ভাগ্য! এ কথা বলতে বলতে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।”[২৫৬]
ঘাস হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
২২৫. হুমাইদ ইবনু হিলাল রহিমাহুল্লাহ বলেন, হারিম ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ ও আবদুল্লাহ ইবনু আমির একসঙ্গে বের হলেন। তারা তাদের উটে চড়ে যাচ্ছিলেন। সামনে ঘাস দেখে উট দুটি সেদিকে ছুটে গেল এবং একটি উট ঘাসগুলো খেয়ে ফেলল। তখন হারিম বললেন, “তুমি কি ঘাস হতে পছন্দ করো, উট তোমাকে খেয়ে ফেলবে আর তুমি শেষ হয়ে যাবে?” জবাবে ইবনু আমির বললেন, “আল্লাহর কসম, তা চাই না। আল্লাহ তাআলা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, এমনটাই আমি প্রত্যাশা করি। এমনটাই প্রত্যাশা করি, এমনটাই প্রত্যাশা করি।"
'তাঁর কথা শুনে হারিম বললেন, “আল্লাহর কসম, আগে যদি জানতাম যে আমার বিচার হবে, তা হলে আমি এই ঘাসই হতে চাইতাম। আমাকে এই উট খেয়ে ফেলত আর আমি নিঃশেষ হয়ে যেতাম।”[২৫৭]
মেষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
২২৬. যিয়াদ ইবনু মিখরাক থেকে বর্ণিত আছে, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, "ইশ, আমি যদি আমার পরিবারের মেষ হতাম! তাদের কাছে মেহমান এলে তারা আমার গলার রগগুলো কেটে ফেলত। মেহমানদারি হতো এবং মেহমানেরা আমাকে খেয়ে ফেলত।"[২৫৮]
গাছের পাতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
২২৭. ইবরাহীম নাখঈ বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা একটি গাছের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, "ইশ, আমি যদি এই গাছের পাতা হতাম!”[২৫৯]
গাছের ফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
২২৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু গাছের ওপর একটি পাখি দেখে বললেন, "পাখি, তোমার কত সুখ! ফলমূল খাও আর গাছেই থাকো। ইশ, আমি যদি গাছের ফল হতাম আর পাখি তা খেয়ে ফেলত!”[২৬০]
মেষ হওয়ার ইচ্ছে
২২৯. কাতাদা থেকে বর্ণিত আছে আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "ইশ, যদি আমি মেষ হতাম; আমার পরিবার আমাকে জবাই করে গোশত খেয়ে ফেলত এবং ঝোল চুষে নিত!”[২৬১]
ইমরান ইবনু হুছাইন রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আহ, আমি যদি ছাই হতাম, এক তুমুল ঝড়ের রাতের বাতাস যদি উড়িয়ে নিয়ে যেত আমায়!"[২৬২]
উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল
২৩০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা বড়ো বড়ো আশা পোষণ করে। তারা অনেক উচ্চাশা রাখে। তারপর কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি না পেয়ে চেষ্টা-তদবির করতে থাকে!"
টিকাঃ
[২৪১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৩৬৮, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২৪২] সূরা আ'রাফ: ১৪৩।
[২৪৩] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৯/৩৭, মাওকুফ।
[২৪৪] সূরা আ'রাফ: আয়াত ১৮৭।
[২৪৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২৪৬] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/১৯৮, দঈফ।
[২৪৭] সূরা বালাদ: ৪।
[২৪৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৩০/১২৬, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[২৪৯] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৩০/১০৮, সনদে সমস্যা নেই, মাওকুফ।
[২৫০] গায়লান ইবনু আকাবা (৭৭-১১৭ হিজরি) এই কবিতার রচয়িতা। তিনি যু আর-রুম্মাহ নামে পরিচিত। শোকগ্রস্ত মানুষ কবরের কাছে দাঁড়িয়ে এই কবিতা পাঠ করত।
[২৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত এবং এর সনদ দুর্বল।
[২৫২] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২৫৩] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৩/৩৬০, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৫৪] সূরা আদ-দাহর: ১।
[২৫৫] হাদীসটির সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৫২, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৫৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১২০, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২৫৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৫৯] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৬২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২৬০] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৫৯, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৬১] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ১৮৩, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৬২] ইবনু সা'দ, আত-তাবাকাত, ৪/২৮৮, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
📄 জানায়া দেখে উপদেশ গ্রহণ
পঞ্চম অনুচ্ছেদ
জানাযা দেখে উপদেশ গ্রহণ
তিনটি অবস্থায় থাকার আকাঙ্ক্ষা
২৩১. আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসাইদ ইবনু হুদাইর খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন, "ইশ, আমি তিন অবস্থায় যেমন থাকি যদি সব সময় তেমন থাকতে পারতাম! কুরআন পাঠরত অবস্থায় অথবা কুরআন তিলাওয়াত শোনা অবস্থায় যেমন থাকি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুতবা শোনার সময় যেমন থাকি এবং জানাযায় অংশগ্রহণ করার সময় যেমন থাকি। জানাযায় অংশগ্রহণের সময় আমি মনে মনে এ কথাই ভাবি-এই মৃতব্যক্তির সাথে কী আচরণ করা হবে এবং তার পরিণতি কী হবে।”[২৬৩]
নবিজি যেভাবে জানাযার সঙ্গে যেতেন
২৩২. আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জানাযার সঙ্গে যেতেন, অধিকাংশ সময়ই চুপ করে থাকতেন। নিজে নিজে কথা বলতেন। সবাই দেখতে পেত যে, তিনি আপন-মনেই মৃত্যু নিয়ে ও মৃত্যু-পরবর্তী বিষয় নিয়ে এবং মৃত ব্যক্তি কী কী প্রশ্নের সম্মুখীন হবে তা নিয়ে মগ্ন আছেন।”[২৬৪]
জানাযা নিজের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়
২৩৩. বুদাইল উকায়লি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুতাররিফ রহিমাহুল্লাহ তাঁর এক বিশেষ বন্ধুর জানাযায় অংশ নিলেন। তিনি ওই জানাযায় যেতে চাননি; কিন্তু যতই দূরে সরে যেতে চাইছিলেন ততই নিজেকে সমর্পিত করছিলেন। অবশেষে তিনি যে কাজে ব্যস্ত ছিলেন ওই কাজেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।”[২৬৫]
জানাযায় অংশগ্রহণ করে দুঃখভারাক্রান্ত থাকা
২৩৪. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “(সাহাবিরা) কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করলে সারাদিন দুঃখভারাক্রান্ত থাকতেন। চেহারায় দুঃখভাব ফুটে উঠত।”[২৬৬]
তিনটি সময় কণ্ঠস্বর নিচু রাখা
২৩৫. কাইস ইবনু উবাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণ তিনটি সময় কণ্ঠস্বর নিচু রাখতেন : যুদ্ধের সময়, কুরআন তিলাওয়াতের সময় এবং জানাযায় অংশগ্রহণের সময়।”[২৬৭]
অসুস্থদের দেখতে যাওয়া ও জানাযায় অংশগ্রহণের নির্দেশ
২৩৬. আবূ সাঈদ খুদরি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
عُودُوا الْمَرْضَى، وَاتَّبِعُوا الْجَنَابِزَ يُذَكِّرْكُمُ الْآخِرَةَ
“তোমরা অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যাও এবং জানাযায় অংশগ্রহণ করো। এ দুটি বিষয় তোমাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।”[২৬৮]
তিনটি বিষয় হাসায় ও তিনটি বিষয় কাঁদায়
২৩৭. মুআবিয়া ইবনু কুররা থেকে বর্ণিত আছে আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “তিনটি বিষয় দেখে হাসি পায়। ওই দুনিয়া-প্রত্যাশী ব্যক্তি, মৃত্যু যাকে খুঁজছে; ওই গাফেল যার থেকে মৃত্যু গাফেল নয়; আর যে ব্যক্তি কোনো-কিছুর পূর্ণতা পেয়ে হাসছে, অথচ সে জানে না আল্লাহকে কি সে সন্তুষ্ট করেছে নাকি অসন্তুষ্ট করেছে। আর তিনটি বিষয় আমাকে আমাকে কাঁদায়। প্রিয়ভাজনদের-মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদের-বিচ্ছেদ; মৃত্যু-যন্ত্রণার সময়কার ভীতি; আর যেদিন প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল বিষয় প্রকাশিত হয়ে পড়বে, সেইদিন আল্লাহ তাআলার সামনে দণ্ডায়মান হওয়া। জানি না তখন আমার কী পরিণতি হবে: জান্নাত নাকি জাহান্নাম।”[২৬৯]
ধারণাতীত ভয়াবহতা
২৩৮. আবদুর রহমান ইবনু নাওফাল থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহধর্মিণী সাওদা রদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি মারা গেলে উসমান ইবনু মাযউন আমার জানাযার সালাত পড়াবেন। পরে আপনি আমার সঙ্গে মিলিত হবেন।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لَوْ تَعْلَمِينَ عِلْمَ الْمَوْتِ يَا بِنْتَ زَمْعَةَ ، لَعَلِمْتِ أَنَّهُ أَشَدُّ مِمَّا تَقْدِرِينَ عَلَيْهِ
“হে বিনতু যামআ, মৃত্যু কখন ঘটবে তা যদি তুমি জানতে, তবে বুঝতে পারতে মৃত্যু তোমার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।”[২৭০]
কেবল সে-ই মুক্তি পাবে
২৩৯. মুহাম্মাদ ইবনু উরওয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক নারী সাহাবি মৃত্যুবরণ করল। লোকে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। বিলাল রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যাক, সে মুক্তি পেয়েছে। তাঁর কথা শুনে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, إِنَّمَا يَسْتَرِيحُ مَنْ غُفِرَ لَهُ আল্লাহ যাকে ক্ষমা করবেন, কেবল সে-ই মুক্তি পাবে।”[২৭১]
টিকাঃ
[২৬৩] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৯/৩১০, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৬৪] হাদীসটি মু'দালরূপে বর্ণিত।
[২৬৫] হাদীসটির সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৬৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ৩৬৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২৬৭] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১২/১১৬, মাওকুফ।
[২৬৮] ইবনু হিব্বান, হাদীস নং ২৯৫৫, সনদ হাসান।
[২৬৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/২০৭, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২৭০] হাদীসটির সনদ দুর্বল।
[২৭১] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত এবং অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ার কারণে সহীহ।