📄 গোপনীয় আমল ও যিকর
সপ্তম অনুচ্ছেদ
গোপনীয় আমল ও যিকর
আত্মপ্রশংসার নিন্দা
১৩০. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “হায়, (লোকেরা) একত্রে সমবেত হওয়ার সময় যদি তারা নিজেদের ব্যাপারে ভালো আলোচনা করা বা আত্মপ্রশংসার বিষয়টা অপছন্দ করত![১৪৬]
আমলের গোপনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ
১৩১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যদি এমন হতো যে, কেউ কুরআনের জ্ঞান অর্জন করলে তার প্রতিবেশী জানতে না পারত; কেউ অনেক বেশি ফিকহী ইলম অর্জন করলেও লোকেরা তা টের না পেত; কেউ নিজ বাড়িতে দীর্ঘ সালাত পড়লেও ওখানে উপস্থিত লোকেরা তা বুঝতে না পারত।
আমি একদল মানুষের কথা জানি, তারা দুনিয়ার বুকে প্রতিটা আমল গোপনীয়তার সাথে করত, কখনও তা প্রকাশ হতো না। মুসলমানগণ প্রাণপণে দুআ করতেন; কিন্তু কোনো আওয়াজ শোনা যেত না। কেবল তাদের ও তাদের রবের মধ্যে এক ধরনের গুঞ্জরণ সৃষ্টি হতো। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
'তোমরা বিনয়ের সঙ্গে ও গোপনে তোমাদের রবকে ডাকো।[১৪৭]
আর আল্লাহ তাআলা তাঁর এক সৎ বান্দার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার কথায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا
'যখন (যাকারিয়্যা) তার প্রতিপালককে ডেকেছিল গোপনে।'”[১৪৮]-[১৪৯]
আমলের কথা লোকদের বলে বেড়ানোর পরিণাম
১৩২. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন-
مَنْ سَمَّعَ النَّاسَ بعلمه، سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ سَامِعَ خَلْقِهِ، وَحَقَّرَهُ وَصَغَرَهُ
"কেউ যদি তার জ্ঞানের কথা লোকদের কাছে বলে বেড়ায়, আল্লাহও তার (গোপন) কথা মানুষকে শুনিয়ে দেন; তাকে অপমানিত ও অপদস্থ করেন।”[১৫০]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, এই হাদীস বর্ণনা করার পর ইবনু উমরের চোখ-দুটি ভিজে গেল।
আমলের আগে নিয়ত ঠিক করে নেওয়া
১৩৩. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে কিছু লোকের আলোচনা করে বলা হলো যে, তাঁরা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বললেন, “তোমরা যা বলছ ও ভাবছ, বিষয়টি তেমন নয়। যখন দুটি দল মুখোমুখি হয় তখন ফেরেশতাগণ নেমে এসে প্রত্যেক মানুষকে তাদের নিজ নিজ স্তরে লিপিবদ্ধ করেন: অমুক দুনিয়া লাভের জন্য জিহাদ করেছে; অমুক রাজত্ব লাভের জন্য জিহাদ করেছে; অমুক যশখ্যাতির জন্য জিহাদ করেছে, ইত্যাদি; আর অমুক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের আশায় জিহাদ করে, সে জান্নাতে যাবে।"[১৫১]
লোক-দেখানো বিনয় ও নম্রতা
১৩৪. আবূ ইয়াহইয়া থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু অথবা আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "লোক-দেখানো বিনয় ও নম্রতা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাও।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, সেটা কী জিনিস? তিনি বললেন, "দেহ বিনয়ী দেখালেও অন্তরে বিনয় নেই।"[১৫২]
আমলে কঠোরতা সত্ত্বেও পারস্পরিক সৌজন্য
১৩৫. আওযাঈ থেকে বর্ণিত, বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমি তাঁদেরকে দেখেছি যে, তাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে (ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে) কঠোর ছিলেন। তবে তাঁরা পরস্পরকে দেখে (মুচকি) হাসতেন। রাত শুরু হলেই মগ্ন হয়ে যেতেন আল্লাহর ইবাদাতে।”[১৫৩]
মুচকি হাসি
১৩৬. উবাইদুল্লাহ ইবনুল মুগীরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি : “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখিনি।"[১৫৪]
পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাকানো
১৩৭. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মুচকি হাসি হাসতেন (অট্টহাসি দিতেন না) এবং কারও দিকে তাকালে পরিপূর্ণভাবে তাকাতেন।”[১৫৫]
ধীরস্থিরভাবে কথা বলা
১৩৮. মিসআর বলেন, একজন শাইখ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রদিয়াল্লাহু আনহু অথবা আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা- কে বলতে শুনেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাবার্তায় ধীরতা ও স্থিরতা ছিল।”[১৫৬]
দাঁত বের করে না হাসা
১৩৯. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও এমনভাবে হাসতেন না যে, তাঁর সামনের দাঁতগুলো বেরিয়ে যেত; বরং তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।"[১৫৭]
রোজা রাখা অবস্থায় পরিপাটি থাকা
১৪০. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যেদিন তোমাদের কেউ সাওম রাখবে, সে যেন দিনের বেলা চুল পরিপাটি রাখে।"[১৫৮] (যাতে কেউ বুঝতে না পারে সে রোজাদার।)
মানুষকে জানতে না-দেওয়া
১৪১. হিলাল ইবনু ইয়াসাফ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম বলেছেন, “রোজা রাখা অবস্থায়ও মাথার চুল ও দাড়িতে তেল লাগিয়ো, ঠোঁট মুছে রেখো। যাতে মানুষ বুঝতে না পারে, তুমি রোজাদার। ডান হাত দিয়ে দান করলে নিজের বাম হাত থেকেও তা লুকিয়ে রেখো। আর সালাত পড়ার সময় ঘরের দরজায় পর্দা টানিয়ে রেখো। কারণ, আল্লাহ তাআলা যেভাবে রিযক বণ্টন করেন, ঠিক সেভাবে প্রশংসাও বণ্টন করেন।"[১৫৯]
গোপনে পড়ায় বেশি সাওয়াব
১৪২. খালিদ ইবনু মুহাজির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি : “যেমনিভাবে ফরজ সালাত একাকী পড়ার চেয়ে জামাআতে পড়া উত্তম, তেমনিভাবে নফল সালাত প্রকাশ্যে পড়ার চেয়ে গোপনে পড়া উত্তম।”[১৬০]
প্রতিদানের প্রত্যাশা
১৪৩. কাসিম আবূ আবদুর রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا أَجْرَ لِمَنْ لَا حِسْبَةً لَهُ
“যে ব্যক্তি (আল্লাহ তাআলার কাছে) প্রতিদান প্রত্যাশা করে না, সে কোনো প্রতিদান পায় না।”[১৬১]
বলে বেড়ালে ইবাদাত নষ্ট হয়ে যায়
১৪৪. আবূ সালামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলল, “আমি চার বছর ধরে একটানা রোজা রেখেছি।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لَا صُمْتَ، وَلَا أَفْطَرْتَ
“তুমি রোজা রাখোনি, রোজা ভাঙোওনি।”[১৬২] কারণ, তুমি তা বলে বেড়াচ্ছ।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়
১৪৫. হাবীব ইবনু সুহাইব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا تَقَرَّبَ الْعَبْدُ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى بِشَيْءٍ أَفْضَلَ مِنْ سُجُودٍ خَفِي
"বান্দা যে-সকল (আমলের) মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো গোপন সাজদা।"[১৬৩]
গোপনীয়তার সঙ্গে যিকর
১৪৬. দামরাতা ইবনু হাবীব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اذْكُرُوا اللَّهَ تَعَالَى ذِكْرًا خَامِلًا قَالَ: فَقِيلَ: وَمَا الذِّكْرُ الْخَامِلُ؟ قَالَ: الذِّكْرُ الْخَفِيُّ
"যিকরুন খামিলের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করো।” জিজ্ঞেস করা হলো, যিকরুন খামিল কী? তিনি বললেন, “গোপনীয় যিকর।”[১৬৪]
ঘরে কান্নাকাটি করা
১৪৭. মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবূ উমামা বাহিলি রদিয়াল্লাহু আনহু একবার মাসজিদে এসে দেখলেন, এক ব্যক্তি সাজদায় পড়ে কান্নাকাটি করছে এবং আল্লাহকে ডাকছে। তিনি তাকে বললেন, "আহ, এটা যদি তোমার ঘরে করতে!"[১৬৫]
টিকাঃ
[১৪৬] আবূ খাইসামাহ, কিতাবুল ইলম, ৩৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৪৭] সূরা আরাফ: ৫৫।
[১৪৮] সূরা মারইয়াম: ০৩।
[১৪৯] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ৩৩৮, মাকতু।
[১৫০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৪৪, সনদ দঈফ; তবে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[১৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৫২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[১৫৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৫৪] তিরমিযি, ৩৬৪১, হাদীসটি হাসান। আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৫৫] তিরমিযি, ৩৬৪২, মু'দাল এবং অন্য কিতাবে হাসান সনদে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে। আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৫৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৪৪, হাদীসটি দঈফ, তবে এর সমার্থবোধক হাদীস হাসান সনদেও বর্ণিত হয়েছে।
[১৫৭] সনদ দঈফ। তবে হাদীসটি অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় সহীহ। বুখারি, ৫৭৪১।
[১৫৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ। ইমাম বুখারি 'সাওম' অধ্যায়ে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।
[১৫৯] হিলাল ইবনু ইয়াসাফ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসটির বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
[১৬০] এখানে হাদীসটি মাকতু, তবে এর সমার্থবোধক হাদীস মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[১৬১] সনদ হাসান, মুরসাল।
[১৬২] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৩] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/১৪০, সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 দুনিয়াতে ভীত হলে, আখিরাতে স্বস্তি মেলে
অষ্টম অনুচ্ছেদ
দুনিয়াতে ভীত হলে, আখিরাতে স্বস্তি মেলে
দুনিয়াতে ভয়, আখিরাতে স্বস্তি
১৪৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي لَا أَجْمَعُ عَلَى عَبْدِى خَوْفَيْنِ، وَلَا أَجْمَعُ لَهُ أَمْنَيْنِ، إِذَا أَمِنَنِي فِي الدُّنْيَا أَخَفْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَإِذَا خَافَنِي فِي الدُّنْيَا أَمَّنْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"আল্লাহ তাআলা বলেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার কোনো বান্দাকে দুটি ভীতি অথবা দুটি স্বস্তি একসাথে দেব না। সে যদি দুনিয়াতে আমার ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে পড়ে, তবে কিয়ামাতের দিন আমি তাকে ভীতসন্ত্রস্ত করব। আর দুনিয়াতে যদি আমাকে ভয় করে চলে, তবে কিয়ামাতের দিন তাকে নিরাপদে রাখব।"[১৬৬]
মুক্তি না-পাওয়ার আশঙ্কা
১৪৯. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কেউ যদি সত্তর-জন নবির সমপরিমাণ আমলও করে, তারপরও কিয়ামাত-দিবসের আযাব থেকে মুক্তি না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”[১৬৭]
কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা
১৫০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “অতীতে এমন-একদল মানুষ গত হয়েছেন যাঁরা এই প্রস্তর-খণ্ডের পরিমাণ সম্পদ দান করার পরও, কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাবেন না বলে আশঙ্কা করতেন।”[১৬৮]
গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহভীরুতা
১৫১. উরওয়া ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কিয়ামতের দিন বান্দার সামনে তার সব গুনাহ উপস্থিত করা হবে। সে তার গুনাহ বহন করে নিয়ে যেতে থাকবে এবং বলবে, (হে আল্লাহ, দুনিয়াতে) আমি তোমার ব্যাপারে ভীত ছিলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন।”[১৬৯]
পাপকাজ করেও জান্নাতী
১৫২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيُذْنِبُ الذَّنْبَ فَيَدْخُلُ بِهِ الْجَنَّةَ، قِيلَ : كَيْفَ؟ قَالَ: يَكُونُ نُصْبَ عَيْنَيْهِ ثابتًا، قَارًا، حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ
“বান্দা পাপ করবে; কিন্তু ওই পাপের কারণেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “ওই পাপকাজ তার চোখের সামনে স্থির হয়ে থাকবে, (আর সে পাপ স্বীকার করবে ও তাওবা করবে।) ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[১৭০]
নেই ভরসা
১৫৩. আবূ ইমরান থেকে বর্ণিত আছে, আবু আইয়ুব আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "কেউ কেউ নেক আমলের ওপর ভরসা করে ছোটো ছোটো পাপ কাজ করতে থাকে। এর ফলে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময়ে, তার ওই (পাপকাজগুলো) তাকে ঘিরে ধরবে। আর কেউ কেউ পাপকাজ করে বটে, তবে সে (তওবা করে) ওই পাপ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে নিরাপদে।"[১৭১]
অনুশোচনার গুরুত্ব
১৫৪. আবূ মূসা থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কোনো কোনো বান্দা গুনাহ করে বটে, তবে তার জন্য তাদের মন দুঃখভারাক্রান্ত থাকে। ফলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করে।" আবূ হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কারও কারও গুনাহ তার নেক আমলের চেয়ে উপকারী হয়ে যায়, আবার কারও কারও নেক আমল তার গুনাহের চেয়ে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।"[১৭৩]
পাপের স্বীকারোক্তি এবং ক্ষমা
১৫৫. আবূ ওয়াইল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন বান্দার গুনাহ গোপন করে রেখে তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি যে গুনাহের কাজ করেছ, তা কি তুমি স্বীকার করো? সে বলবে, জি, স্বীকার করি। ফলে আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।"[১৭৪]
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার গোপন কথা
১৫৬. সাফওয়ান ইবনু মুহাররায রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে হাঁটছিলাম। এ সময় একজন লোক এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ইবনু উমর, আপনি (কিয়ামাতের দিন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে) গোপনীয় কথা সম্পর্কে রাসূল থেকে কিছু শুনেছেন? ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
يَدْنُو الْمُؤْمِنُ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَضَعَ عَلَيْهِ كَنَفَهُ، فَذَكَرَ صَحِيفَتَهُ ، قَالَ: فَيُقَرِّرُهُ ذُنُوبَهُ، هَلْ تَعْرِفُ فَيَقُولُ: رَبِّ أَعْرِفُ، فَيَقُولُ: هَلْ تَعْرِفُ؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ، رَبِّ أَعْرِفُ، حَتَّى يَبْلُغَهُ بِهِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَبْلُغَ، ثُمَّ يَقُولُ: إِنِّي سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ، وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ، قَالَ: فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُنَادَى عَلَى رُءُوسِ الْأَشْهَادِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“(কিয়ামাতের দিন) মুমিন বান্দা তার রবের নিকটবর্তী হবে। তখন আল্লাহ তাআলা তার ওপর একটি পর্দা ফেলে দেবেন। বান্দার আমলনামা তার সামনে পেশ করবেন এবং তার গুনাহের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি নেবেন। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার গুনাহের কথা স্বীকার করো? সে বলবে, জি, হে আমার রব, স্বীকার করি। আবার জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার গুনাহের কথা স্বীকার করো? সে বলবে, জি, হে আমার রব, স্বীকার করি। এরপর আল্লাহ তাআলা (তার প্রশ্নোত্তর) যতটুকু নিতে চাইবেন, ততটুকু নেবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমার গুনাহ গোপন করে রেখেছিলাম। আজ আমি সেসব গুনাহ ক্ষমা করে দিলাম। এরপর তাকে নেক আমালনামা দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে কাফিরদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীদের উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“এরাই তাদের প্রতিপালকের বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করেছিল। সাবধান! জালিমদের ওপর আল্লাহর লানত।”[১৭৫]-[১৭৬]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
১৫৭. আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ
“সেই চরম ভীতিকর অবস্থা তাদেরকে একটুও পেরেশান করবে না।”[১৭৭]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "যখন তাদেরকে জাহান্নাম বেষ্টন করে ফেলবে।"[১৭৮]
আল্লাহভীরুতার অর্থ
১৫৮. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
“তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি নিয়ে এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।”[১৭৯]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ 'ভীতি'-এর অর্থ বলেছেন, “অন্তরে সদা জাগ্রত ভীতি।"[১৮০]
খুশু-খুযুর অর্থ
১৫৯. আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
“যারা নিজেদের সালাতে বিনয়াবত।”[১৮১]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "ধীরস্থিরতা।"[১৮২]
যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে
১৬০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
“এবং যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ থেকে বিরত থাকে।”[১৮৩]
সাঈদ ইবনু আবী আরুবা থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশ এলেও বাতিল ও অহেতুক কাজ থেকে বিরত থাকে না, তারা এমন নয়।”[১৮৪]
বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে?
১৬১. শাদ্দাদ ইবনু আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا، وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে আয়ত্তে রেখেছে এবং মৃত্যুপরবর্তী সময়ের জন্য নেক আমল করেছে, সে-ই প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান। আর যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেও আল্লাহর প্রতি (ক্ষমার) আশা পোষণ করে সে নির্বোধ।”[১৮৫]
আমানত ও বিনম্রতা উঠে যাওয়া
১৬২. দামরাতা ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ شَيْءٍ يُرْفَعُ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ الْأَمَانَةُ وَالْخُشُوعُ، حَتَّى لَا تَكَادَ تَرَى خَاشِعًا
“সর্বপ্রথম এই উম্মত থেকে যে জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে, তা হলো আমানত ও বিনয়। এমনকি একজনও বিনয়ী খুঁজে পাওয়া যাবে না।”[১৮৬]
বিনম্রতা ও একাগ্রতার চিহ্ন
১৬৩. আল্লাহ তাআলা বলেন,
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ
"তাদের চেহারায় সাজদার চিহ্ন থাকবে।”[১৮৭]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, "তা হলো বিনম্রতা ও একাগ্রতার চিহ্ন।"[১৮৮]
ললাটে বিনয় নম্রতার চিহ্ন
১৬৪. হুমাইদ আ'রাজ থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “(কপালে সাজদার চিহ্ন) হলো বিনয় ও নম্রতার চিহ্ন।”[১৮৯]
সবার আগে যা উঠিয়ে নেওয়া হবে
১৬৫. জারীর ইবনু আবী হাযিম বলেন, আমি আবূ ইয়াযীদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: "বলা হতো যে, এই উম্মত থেকে বিনম্রতা সবার আগে উঠিয়ে নেওয়া হবে।"[১৯০]
বিনীতদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ
১৬৬. আবূ আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু যখনই রবী' ইবনু খুসাইমকে দেখতেন, তখনই এই আয়াত পাঠ করতেন:
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
"এবং সুসংবাদ দাও বিনয়ীদের।”[১৯১]
চির-অটল
১৬৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি এমন-একদল মানুষকে (অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামকে) দেখেছি যারা জীবনেও তৃপ্তি-ভরে খেতেন না। স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু খেতেন। গড়নে তাঁরা ছিলেন হালকা-পাতলা, আর নিজের সংকল্প ও হিম্মতের ওপর ছিলেন চির-অটল।”[১৯২]
সালফে সালিহীনের বৈশিষ্ট্য
১৬৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, এমনও দেখেছি যে, তাঁদের একেকজন গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু কখনও তাঁদের জন্য নতুন কাপড় সেলাই করেননি, পরিবারকে তাঁদের জন্য খাবার তৈরির নির্দেশ দেননি এবং নিজেদের মধ্যে ও জমিনের মধ্যে কোনো আড়াল রাখেননি (জুতা পরেননি)।”[১৯৩]
শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার
১৬৯. রবীআ ইবনু ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ ইদরিস খাওলানি রহিমাহুল্লাহ- কে বলতে শুনেছেন: মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার হলো ধীরস্থিরতা।[১৯৪]
টিকাঃ
[১৬৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৩০৮, সনদ হাসান, মুরসাল। অন্য কিতাবে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[১৬৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৬৮] বুখারি, আত-তারিখুল কাবীর, ১/১৫, মাকতু।
[১৬৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৭০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৭৭, মুরসাল।
[১৭১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৭২] ইবনু হায়াওয়াইহ বর্ণনা করেছেন, কোনো কোনো লোক।
[১৭৩] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৭৪] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৭৫] সূরা হুদ: ১৮।
[১৭৬] বুখারি, ৪৪০৮; মুসলিম, ২৭৬৮।
[১৭৭] সূরা আম্বিয়া: ১০৩।
[১৭৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৭/৭৮, মাওকুফ।
[১৭৯] সূরা আম্বিয়া: ৯০।
[১৮০] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৮১] সূরা মুমিনুন: ২।
[১৮২] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৮/৩, মাকতু।
[১৮৩] সূরা মুমিনুন: ৩।
[১৮৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৩৩৯, মাওকুফ।
[১৮৫] তিরমিযি, ৪২৬০, সনদ দঈফ।
[১৮৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২/১৩৬, সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৮৭] সূরা ফাতহ: ২৯।
[১৮৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৬/৭০, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৮৯] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৮২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৯১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১০৬, সনদ মুনকাতি, মাকতু।
[১৯২] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫২৭, মাওকুফ।
[১৯৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫০৮, মাওকুফ।
[১৯৪] সনদ সহীহ, মাকতু।
📄 দুনিয়াবি ফিতনায় প্রতারিত হওয়া
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়াবি ফিতনায় প্রতারিত হওয়া
পরিশ্রমী হয়েও খেলতামাশায় লিপ্ত
১৭০. লাইস ইবনু আবী সুলাইম থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যারা দুনিয়ার ব্যাপারে বেশি পরিশ্রমী, তারা যেন নিতান্ত ক্রীড়াকৌতুকে লিপ্ত।"[১৯৫]
সবাই আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার
১৭১. আওযাঈ বলেন, আমি বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি : "তোমাদের মধ্যে যারা দুনিয়াবিমুখ (তারা আসলে দুনিয়ার প্রতি) আসক্ত; তোমাদের কঠোর পরিশ্রমীরা (আখিরাতের ক্ষেত্রে) অবহেলাকারী; তোমাদের আলিমরা মূর্খ; এবং তোমাদের মূর্খরা আত্মপ্রতারণায় লিপ্ত।"[১৯৬]
মারাত্মক কাজকেও তুচ্ছ মনে করা
১৭২. আবু কাতাদা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাদা ইবনু কুরস লাইসি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে আমরা যে কাজগুলোকে মারাত্মক মনে করতাম, তোমারা সেগুলোকে চুলের চেয়েও তুচ্ছ ভাবো।”[১৯৭]
হুমাইদ ইবনু হিলাল বলেন, আমি আবূ কাতাদা রহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, যদি কুরস লাইসি রদিয়াল্লাহু আনহু এই যুগ পেতেন, তা হলে কেমন হতো? তিনি বললেন, “তা হলে তো এ কথা তিনি আরও জোর দিয়ে বলতেন।”
সঙ্গদোষে লজ্জিত হওয়া
১৭৩. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “এই জমিন এমন-একদল মানুষকে লুকিয়ে রেখেছে, তাঁরা যদি দেখতেন আমি তোমাদের সঙ্গে বসে আছি তবে আমাকে লজ্জা পেতে হতো।"[১৯৮]
কবি লাবীদের একটি উক্তি
১৭৪. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা-কে বলতে শুনেছি, কবি লাবীদ বলেন,
যারা ছায়া হয়ে ছিলেন তাঁরা গত হয়ে গেছেন,
আমিই খোস-পাঁচড়ার মতো পেছনে পড়ে রয়েছি।
এখন সবার কথা স্বার্থ ও ভয়ের কারণে হয়,
কেউ সমালোচনা করতে গেলে (উল্টো) তাকে দোষারোপ করা হয়,
যদিও সে কারও সাথে গোলযোগ সৃষ্টি করেনি।
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা এই কবিতা আবৃত্তি করার পর বলতেন, “লাবীদ যদি আজকের যুগের মানুষদের দেখতেন, তা হলে না-জানি কী বলতেন!”[১৯৯]
ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা যদি আমাদের যুগের মানুষদের দেখতেন, তা হলে না-জানি কেমন হতো!”
ইবাদাতে মনোযোগ
১৭৫. সা'দ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “এই উম্মাহর প্রথম যুগের দুজন মানুষ যদি মুসহাফ (অর্থাৎ মুদ্রিত কুরআন) হাতে নিয়ে এখানকার কোনো-একটি নির্জন উপত্যকায় চলে আসতেন, আর এই যুগের লোকদের পেয়ে যেতেন—তারপরও তারা জানতে পারতেন না যে, তারা কোন যুগে আছেন।”[২০০] (অর্থাৎ, তাঁরা ইবাদাতে এতটাই নিমগ্ন থাকতেন।)
বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করা
১৭৬. সুফইয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত আছে, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজকালকার মানুষদের ওপর خُبْزُ ثَقْلَةٍ। (প্রবাদটি পুরোপুরি খাটে)। (প্রবাদটির অর্থ : মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় বেশি ঘাঁটতে যেয়ো না, তা হলে তোমার দৃষ্টিতে তাকে অনেক হেয় মনে হবে।) "[২০১]
এক শ উট, শূন্য বাহন
১৭৭. সালিম ইবনু আবদিল্লাহ তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا النَّاسُ كَالْإِبِلِ الْمِائَةِ، لَا تَجِدُ فِيهَا رَاحِلَةً
"এমন মানুষজন দেখবে, যারা এক শ উটের মতো, কিন্তু একটি উটও ভার বহন করার উপযুক্ত নয়।”[২০২]
দুনিয়ার ফিতনা
১৭৮. আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ মুআফিরি থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “বর্তমান সময়ে কোনো আমলের ওপর দৃঢ় থাকার চেয়ে আগের যুগে তার সামান্য কিছু করাটা আমার কাছে প্রিয় ছিল। কারণ, আমরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম তখন আখিরাতের কাজেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু বর্তমান যুগে দুনিয়া আমাদেরকে ফিতনায় ডুবিয়ে দিয়েছে।”[২০৩]
টিকাঃ
[১৯৫] আবু নুআইম, হিলইয়া, ৩/২৬৯, সহীহ। আবূ নুআইম উবাইদ ইবনু উমাইর থেকে সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
[১৯৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯৭] হাদীসটি সহীহ। এই হাদীস অন্য সনদে বুখারিতেও বর্ণিত হয়েছে, বুখারি, ৬৪৯২।
[১৯৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯৯] বুখারি, আত-তারিখুস সগির, ১/৫৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২০০] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[২০১] সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[২০২] বুখারি, ৬১৩৩; মুসলিম, ২৫৪৭। অর্থাৎ, মানুষ শত শত থাকবে; কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো একজনও থাকবে না। (অনুবাদক)
[২০৩] সনদ হাসান, মাওকুফ। বুখারিতে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বুখারি, ১১০২।
📄 ইখলাস ও নিয়ত
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
ইখলাস ও নিয়ত
নিয়তই আসল
১৭৯. উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ، فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا، أَوِ امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ.
“নিয়তের ওপরই সমস্ত আমল নির্ভর করে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তা-ই রয়েছে, যা সে ইচ্ছা করে। তাই যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিয়তে হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশেই পরিগণিত হয়। আর যে ব্যক্তি হিজরত করে দুনিয়া লাভ করা অথবা কোনো নারীকে বিবাহ করার নিয়তে, তার হিজরত হয় তারই উদ্দেশে, যার নিয়তে সে হিজরত করেছে।”[২০৪]
আমলের মূলভিত্তি
১৮০. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, আমি জাফর ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: “সকল কাজের (বা আমলের) ভিত্তি হলো নিয়ত। নিয়তের দ্বারা যে ফজিলত লাভ হয়, আমলের দ্বারা তা হয় না।”[২০৫]
আল্লাহর ভালোবাসার প্রভাব
১৮১. আনাবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সালিহ ইবনু আবদির রহমান আমাকে সুলাইমান ইবনু আবদিল মালিকের কাছে পাঠালেন। ওখানে গিয়ে উমর ইবনু আবদিল আযীযকে বললাম, সালিহের কাছে কি আপনার কোনো প্রয়োজন আছে? তিনি বললেন, তাকে বলবেন, এমন কাজে আত্মনিয়োগ করুন, যা আল্লাহর কাছে আপনার জন্য অবশিষ্ট থাকবে। আপনার জন্য যা আল্লাহর কাছে থাকবে, তা মানুষের কাছেও থাকবে। আর আপনার জন্য যা আল্লাহর কাছে থাকবে না, তা মানুষের কাছেও থাকবে না।”[২০৬]
আল্লাহই যথেষ্ট
১৮২. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এই চিঠি পাঠালেন: “পরসমাচার এই যে, আল্লাহকে ভয় করুন, তা হলে মানুষের বিরুদ্ধে তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন। আর যদি মানুষকে ভয় করেন, তবে কেউই আল্লাহর বিরুদ্ধে আপনার জন্য যথেষ্ট হবে না।”[২০৭]
লোক-দেখানো আল্লাহভীরুতা
১৮৩. মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বলেছেন, “ছেলে আমার, তুমি আল্লাহকে ভয় করো; অন্তর পাপকাজে কলুষিত থাকার পরও মানুষের সম্মান পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহভীরুতা দেখিয়ে বেড়িয়ো না।”[২০৮]
সর্বদা নিজের ভুল নিয়ে চিন্তিত থাকা
১৮৪. উমারা ইবনু গাযিয়্যাহ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু উরওয়াহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ তাআলার কাছে আমার এমন দোষত্রুটির ব্যাপারে অনুযোগ জানাই, যা আমি ত্যাগ করতে পারিনি। এমন প্রশংসার ব্যাপারেও (অনুযোগ জানাই), যার যোগ্য না হয়েও আমি তা পেয়ে গেছি। আমরা তো দ্বীনের দ্বারা দুনিয়া পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করি।”[২০৯]
আল্লাহর বড়োত্বের কাছে বান্দার বড়োত্ব কতটুকু?
১৮৫. মুকবিল ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আতা ইবনু ইয়াযীদ লাইসীর কাছে অনেক লোক ভিড় জমাল এবং তাকে প্রশ্ন করতে লাগল। তখন তিনি বললেন, “আপনি এই ব্যাপারে কী মনে করেন, এই ব্যাপারে আপনার কী মত-এই ধরনের কথা তোমরা বেশি বলে থাকো। আল্লাহর থেকে প্রতিদান আশা করে আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য কাজ কোরো না। তোমাদের কারও ভালো কাজ যেন তাকে গর্বিত করে না তোলে, তা যত বেশিই হোক না কেন। কারণ, আল্লাহ তাআলার বড়োত্বের কাছে বান্দার বড়োত্ব মাছির একটি পায়ের সমানও নয়।”[২১০]
প্রত্যেক কাজে সাওয়াবের নিয়ত
১৮৬. যুবাইদ ইবনু হারিস রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমাকে এ ব্যাপারটি আনন্দ দেয় যে, আমি আমার প্রতিটি কাজে নিয়ত করি; এমনকি খাওয়া এবং ঘুমেও।”[২১১]
হৃদ্যতা ও কথা-কাজের মিল
১৮৭. জারীর ইবনু হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। আমরা এত বেশি ছিলাম যে, তাঁর ঘরের মেঝে ভরে গেল। তিনি আমাদের সবার চেহারার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “চোখ দেখতে পাচ্ছি কিন্তু হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব দেখতে পাচ্ছি না। বিদ্যা দেখতে পাচ্ছি কিন্তু কথা ও কাজের মিল দেখতে পাচ্ছি না। কেবল কাপড়-পরিহিত কিছু চেহারা দেখতে পাচ্ছি।”[২১২]
গায়ের ত্বক সুন্দর হলেও অন্তর পাষাণ
১৮৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “তুমি ইচ্ছে করলে এমন লোক দেখতে পাবে, যার গায়ের ত্বক মসৃণ ও শুভ্র আর সে বাকপটু। সে কথায় পটু হলেও তার অন্তর ও আমল মৃত। সে নিজেকে যতটুকু দেখতে পায়, তুমি তাকে তার চেয়ে বেশি দেখতে পাবে। কেবল দেহ দেখতে পাবে, হৃদয় দেখতে পাবে না। আওয়াজ শুনতে পাবে; কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ কথা শুনতে পাবে না। তাদের জবান সজীব ভূমির মতো; কিন্তু হৃদয় পাষাণ।”[২১৩]
পশমওয়ালা ভেড়ার পালের মতো ক্বারী
১৮৯. শাকীক ইবনু সালামা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এ যুগের ক্বারীরা হবে পশমওয়ালা ভেড়ার পালের মতো, যেগুলো জীর্ণশীর্ণ, সেগুলো টক খেয়েছে এবং পানি পান করেছে, ফলে কোমর মোটা হয়ে গেছে। মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে লোকজন ওদের দেখে অবাক হয়। (কোমর মোটা দেখে) ওখান থেকে একটি ভেড়া নিয়ে জবাই করে, কিন্তু দেখে তাতে গোশত-চর্বি কিছুই নেই। ফলে আরেকটি ভেড়া নিয়ে জবাই করে। কিন্তু সেটিরও একই অবস্থা। অবশেষে লোকটি বলে, ধুর, তোর জন্য পুরো দিনটিই মাটি করলাম।”[২১৪]
আল্লাহর ক্রোধের বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইলে
১৯০. আবদুল ওয়াহ্হাব ইবনুল ওয়ারদ মদীনার একজন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে একটি চিঠি লিখলেন এবং অনুরোধ জানালেন : “আপনি আমাকে অল্প কথায় উপদেশ দিয়ে একটি পত্র লিখুন।” আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা লিখলেন : “আয়িশার পক্ষ থেকে মুআবিয়ার প্রতি, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মানুষের ক্রোধের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইবে, মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধের বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইবে, আল্লাহ তাআলা তাকে মানুষের মুখাপেক্ষী বানাবেন। ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”[২১৫]
প্রশংসাকারীরা নিন্দুকে পরিণত হয়
১৯১. আব্বাস ইবনু যুরাইহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা মুআবিয়া রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে (পাঠানো চিঠিতে) লিখলেন : “কেউ আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজ করলে, তার প্রশংসাকারীরা নিন্দুক হয়ে ওঠে।”[২১৬]
অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে আয়োজন
১৯২. হুমাইদ ইবনু নুআইম রহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার উমর ও উসমান রদিয়াল্লাহ আনহুমা-কে খাবার খাওয়ার জন্য দাওয়াত করা হলো। তাঁরা রাজি হলেন। তারপর তারা বের হলেন। (পথিমধ্যে) উমর রদিয়াল্লাহু আনহু উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, এমন ভোজের আয়োজন দেখেছি, যা দেখে মনে হয়েছে যে, ইশ! যদি ওই খাবার দেখতেই না পেতাম। উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, তা কেন? উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, কেননা আমি ভয় করছি, সেটা অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।[২১৭]
অহংকারের ভাব দেখা দিলে কথা বলা অথবা চুপ থাকা
১৯৩. হাজ্জাজ ইবনু শাদ্দাদ থেকে বর্ণিত, উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী জাফর বা আবদুল্লাহ ইবনু জাফর একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেন, “কথা বলার সময় গর্ব অনুভূত হলে বক্তা যেন চুপ হয়ে যায়। আর যদি চুপ করে থাকাটা তাকে গর্বিত করে তোলে, তবে সে যেন কথা বলে।”[২১৮]
আল্লাহ তাআলা যে সালাতের প্রশংসা করেন
১৯৪. সাঈদ ইবনু ইয়াস জুরাইরি থেকে বর্ণিত, আবুল আলা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমাকে বলা হয়েছে যে, যখন কোনো বান্দা নির্জন ভূমিতে সালাত আদায় করে এবং খুশু-খুযুর সঙ্গে সালাত শেষ করে, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এই সালাত আমার জন্য। আমার এই বান্দা সালাত আদায় করেছে; কিন্তু তাকে কেউ দেখেনি এবং সেও কাউকে দেখাতে চায়নি।”[২১৯]
কল্যাণকামিতাই উত্তম ইবাদাত
১৯৫. আবূ উমামা বাহিলি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবি সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَحَبُّ مَا تَعَبَّدَنِي بِهِ عَبْدِيَ إِلَيَّ النُّصْحُ
“আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার জন্য যে-সকল ইবাদাত করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো কল্যাণকামিতা।”[২২০]
আলহামদু লিল্লাহ বলা
১৯৬. আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-কে এক ব্যক্তি সালাম দিল। তিনি সালামের জবাব দিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছ?” লোকটি জবাব দিল, “আলহামদু লিল্লাহ, ভালো আছি।” উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি তোমার থেকে এমনটাই আশা করেছিলাম।”[২২১]
সর্বাবস্থায় আল্লাহর তাআলার শুকরিয়া
১৯৭. সাঈদ ইবনু যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর তাআলার প্রশংসা করে, তাদেরকে সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য আহবান করা হবে।” অথবা তিনি বলেছেন, "যারা সুদিনে ও দুর্দিনে আল্লাহর প্রশংসা করে।”[২২২]
দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়
১৯৮. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "আমরা সম্ভব হলে দিনে কয়েকবার পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করতাম এবং ভালো-মন্দ জিজ্ঞাসা করতাম। কেবল আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করার জন্যই আমরা এমনটি করতাম।”[২২৩]
তুচ্ছ ক্রীতদাসরূপে আল্লাহর আনুগত্য
১৯৯. আবুল বাখতারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি এমনভাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করতে চাই, যেন আমি একটি তুচ্ছ ক্রীতদাস।”[২২৪]
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে বুঝেছে সে দুনিয়াবিমুখ হয়েছে
২০০. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, হাজ্জাজ ইবনু ফারাফাসা আমাকে লিখলেন যে, বুদাইল ওকাইলি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার রবকে চিনেছে, সে তাঁকে ভালোবেসেছে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে দুনিয়াবিমুখ হয়েছে। মুমিন বান্দা কখনও অপ্রয়োজনীয় কাজে এমনভাবে লিপ্ত হয় না যে (আল্লাহ থেকে) গাফেল হয়ে পড়ে; যখন সে তার (কৃতকর্মের) কথা ভাবে, দুঃখিত হয়।”[২২৫]
আল্লাহকে ডাকার পরও মানুষ তাঁকে ভুলে যায়
২০১. জাফর ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, কোনো কোনো কিতাবে আছে, (আল্লাহ তাআলা বলেন,) "হে আদম-সন্তান, তুমি আমাকে ডাকো, আবার আমার থেকে পালিয়ে যাও; আমাকে স্মরণ করো, আবার আমাকে ভুলে যাও (কীভাবে?)।”[২২৬]
অন্যের সামান্য দোষও বড়ো করে দেখা
২০২. জাফর ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হে আদম-সন্তান, তুমি তোমার ভাইয়ের চোখে সামান্য ময়লা থাকলেও তা দেখতে পাও; কিন্তু নিজের দুই চোখে গাছের গুঁড়ি পড়ে থাকলেও দেখতে পাও না।”[২২৭]
টিকাঃ
[২০৪] বুখারি, ৬৯৭২; মুসলিম, ৫০৩৬।
[২০৫] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২০৬] হাদীসটি হাসান সনদে বর্ণিত।
[২০৭] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৪/৬১, মাওকুফ। ইমাম তিরমিযি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
[২০৮] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২১৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২০৯] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/৬৭৩, মাওকুফ।
[২১০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২১১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২১২] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২১৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫৮, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২১৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১০৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২১৫] ইবনু হিব্বান, সহীহ, ১/৫১০, সনদ দঈফ, তবে অনান্য সূত্রেও বর্ণিত হওয়ায় হাদীসটি সহীহ।
[২১৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৬৫, সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[২১৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২১৮] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[২১৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২২০] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/৮৭, দঈফ।
[২২১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২২] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/৬৯, সনদ দঈফ, মারফু।
[২২৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[২২৪] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২৫] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৪/৪৯, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[২২৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১০৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২২৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৭৮, মাকুত। কিন্তু অন্য কিতাবে সনদ সহীহ ও মারফুরূপে বর্ণিত।