📄 নাজাতের উপায়
ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ
নাজাতের উপায়
মুমিনের জন্য কারাগার
১১৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ
"দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।”
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই হাদীস বর্ণনা করার পর বলেন, “দুনিয়াতে প্রত্যেক মুমিন বিষণ্ণ ও ভারাক্রান্ত থাকে। কারণ, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মুমিন বান্দাকে জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হতে হবে। জাহান্নাম পার হওয়ার সময় সে তা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে, এরকম সংবাদ তো তার কাছে আসেনি। আল্লাহর কসম, মুমিন বান্দার যত অসুখ হয়, বিপদে পড়ে, কঠিন বিষয়ের মুখোমুখি হয়, জুলমের শিকার হয় কিন্তু কোনো প্রতিকার করতে পারে না, এসবের জন্য সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান আশা করে। এভাবেই সে দুনিয়াতে দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে দিনযাপন করে এবং একসময় দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রশান্তি ও সম্মান প্রদান করা হয়।"[১২৮]
কল্যাণ লাভের একটি উপায়
১১৫. সালিম ইবনু আবিল জা'দ থেকে বর্ণিত আছে, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম বলেছেন,
طُوبَى لِمَنْ خَزَنَ لِسَانَهُ، وَوَسِعَهُ بَيْتُهُ، وَبَكَى عَلَى خَطِيئَتِهِ
“ওই ব্যক্তির কল্যাণ হোক যে তার জিহ্বাকে সংযত রেখেছে, যার গৃহ তার (ইবাদাতের) জন্য প্রশস্ত এবং যে তার পাপকাজের জন্য (অনুতপ্ত হয়ে) কান্না করেছে।"[১২৯]
সে আলিম হওয়ার উপযুক্ত নয়
১১৬. আবদুল আ'লা তাইমি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যাকে ইলম দান করা হয়েছে, অথচ ওই ইলম তাকে কাঁদায় না, তা হলে সে উপকারী ইলম পাওয়ার উপযুক্তই নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা আলিমগণের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবে-
إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِن قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ سُجَّدًا وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِن كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
"যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদেরকে যখন এটা শুনানো হয় তখন তারা সাজদায় লুটিয়ে পড়ে। এবং বলে ওঠে—পবিত্র আমাদের রব, আমাদের রবের প্রতিশ্রুতি তো পূর্ণ হয়েই থাকে। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং তা শুনে তাদের বিনয় আরও বেড়ে যায়।"[১৩০]-[১৩১]
দুঃখ-যাতনাও ইবাদাত
১১৭. মালিক ইবনু মিগওয়াল এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “মনের দীর্ঘ দুঃখ-যাতনাও আল্লাহর ইবাদাত।”[১৩২]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
১১৮. মুবারাক ইবনু ফুদালা থেকে বর্ণিত আছে, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ
“তোমরা কি এই কথায় বিস্ময়বোধ করছ! এবং হাসি-ঠাট্টা করছ! কান্না করছ না?”[১৩৩]
তারপর বললেন, "আল্লাহর কসম, এই ব্যাপারে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বুদ্ধিমান যে কেঁদেছে। তাই তোমরা (তোমাদের) হৃদয়গুলোকে কাঁদাও। (নিজেদের) কর্মের জন্য কেঁদে দুঃখপ্রকাশ করো। কাঁদলে দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। (না কাঁদলে) তার হৃদয় পাষাণ।”[১৩৪]
প্রতিদান হবে ধৈর্যের সমপরিমাণ
১১৯. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “মনের কষ্ট নির্ভর করে অন্তর্দৃষ্টির ওপর।"[১৩৫]
কান্নার ব্যাপারে পাপীর অভিনয়
১২০. শুআইব জুবায়ি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন মানুষের পাপ পূর্ণতা পায়, তখন চোখ তার আয়ত্তে চলে আসে। যখনই সে কাঁদতে চায় কাঁদতে পারে।"[১৩৬]
তিনটি উপদেশ
১২১. আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলল, “হে আবূ আবদুর রহমান, আমাকে উপদেশ দিন।” আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “তোমার বাড়ি যেন কঠোর সাধনার (জায়গা) হয়, তোমার পাপকাজের কথা মনে করে কান্না করো এবং জিহ্বাকে সংযত রাখো।”[১৩৭]
কাঁদতে না পারলে কান্নার ভান করা
১২২. আরফাজাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “কেউ কাঁদতে পারলে সে যেন কাঁদে; আর যে কাঁদতে পারে না, সে যেন কান্নার ভান করে।”[১৩৮]
তাওবাকারীদের মন সবচেয়ে নরম
১২৩. আউন ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “তোমরা তাওবাকারীদের সান্নিধ্যে বসো, কারণ তাদের মন সবচেয়ে নরম।”[১৩৯]
আল্লাহর নিয়ামাতের বর্ণনা
১২৪. মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াযীদ ইবনু শাযারাহ রহিমাহুল্লাহ আমাদের উপদেশ দিতেন এবং কাঁদতেন। তাঁর কান্না ছিল তাঁর আমলের অনুরূপ। তিনি বলতেন, হে লোকসকল, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যেসব নিয়ামাত দান করেছেন তা স্মরণ করো। তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামাতের কতই না চমৎকার প্রভাব রয়েছে! হায়! (জিহাদের) লাল, হলুদ, সাদা ও কালো বাহনগুলোর মধ্যে আমি যা দেখতে পাই, তোমরা যদি তা দেখতে পেতে! যখন সালাত কায়েম করা হয় তখন আসমান, জান্নাত এবং জাহান্নামের সব দরজা খুলে দেওয়া হয়। আবার (জিহাদে) যখন দুটি দল মুখোমুখি হয় তখনও আসমানের দরজা এবং জান্নাত ও জাহান্নামের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আয়তলোচনা হুরদেরকে সাজানো হয়। তারা তাকিয়ে দেখতে থাকে। যখন কোনো ব্যক্তি এগিয়ে যায়, তারা বলতে থাকে, হে আল্লাহ, তুমি তাকে সাহায্য করো, তাকে দৃঢ়পদ রাখো। যখন কেউ পিছু হটে তারা মুখ ঢেকে ফেলে এবং বলে, হে আল্লাহ, তুমি তাকে ক্ষমা করো। হে জাতির বিশিষ্ট লোকেরা, তোমরা ঝাঁপিয়ে পড়ো। তোমাদের প্রতি আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক! তোমরা আয়তলোচনা হুরদেরকে লাঞ্ছিত কোরো না। শহীদের দেহ থেকে নির্গত প্রথম রক্তফোঁটাটি এমনভাবে তার পাপ মুছতে থাকে, যেভাবে গাছের ডাল থেকে পাতা ঝরতে থাকে। দুইজন আয়তলোচনা হুর তার কাছে নেমে আসে এবং তার চেহারা থেকে ধুলোবালি মুছে দেয়। তারা বলে, এখন তোমার সময় হয়েছে। সেও তাদেরকে বলে, এখন তোমাদের সময় হয়েছে। তারপর তাকে এক শ সেট কাপড় পরানো হয়, যেগুলোকে দুই আঙুলের মাঝে গুঁজে রাখা সম্ভব। এই কাপড় কোনো মানুষের বোনা নয়; বরং তা জান্নাতে উৎপাদিত।[১৪০]
নাজাত পাওয়ার উপায়
১২৫. উকবা ইবনু আমির জুহানি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, নাজাত কী? (কীভাবে নাজাত পাওয়া সম্ভব?) তিনি বললেন,
أَمْلِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
“তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখো। তোমার ঘর যেন কঠোর সাধনার (জায়গা) হয়, আর তোমার পাপকাজের কথা মনে করে কান্নাকাটি করো।”[১৪১]
জাতির উদ্দেশে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপদেশ
১২৬. মালিক ইবনু আনাস রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার কাছে এই বাণী পৌঁছেছে যে, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম তাঁর জাতিকে বলেছেন, "আল্লাহর যিকর ছাড়া অন্য কথা বেশি বোলো না। কারণ এতে তোমাদের হৃদয় পাষাণ হয়ে যাবে। আর পাষাণ হৃদয় আল্লাহ তাআলা থেকে অনেক দূরে কিন্তু তোমরা তা জানো না। আর মানুষের পাপের দিকে ধর্মগুরুদের দৃষ্টিতে তাকিয়ো না; বরং একজন বান্দার মতো তাদের পাপকাজগুলো দেখো। মানুষ তো দুই পর্যায়ে রয়েছে: একদল সমস্যায় আক্রান্ত, আর আরেক দলকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। যারা সমস্যায় আক্রান্ত তাদের প্রতি মমতা দেখাও এবং ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর প্রশংসা করো।"[১৪২]
কথা অনুযায়ী কাজের হিসেব
১২৭. ইমাম শা'বী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বক্তা (দুনিয়াতে) যে বক্তৃতা দেবে, কিয়ামাতের দিন তার কাছে তা পেশ করা হবে।"[১৪৩]
অধিক কথা বলায় অহংকার প্রকাশ পায়
১২৮. উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ-এর অনুলেখক নুআইম ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "অহংকার ও গৌরবের ভয় আমাকে বেশি কথা বলা থেকে বিরত রাখে।"[১৪৪]
খ্যাতি ও প্রসিদ্ধির ভয়
১২৯. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি বসরার এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "আমি একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। তাদের কারও কাছে প্রজ্ঞা ও হিকমতের কথা বলা হলে খ্যাতির ভয়ে সেগুলো প্রচার করা থেকে বিরত থাকতেন। অথচ তা প্রচার করলে তাদের সঙ্গীদের উপকার হতো। রাস্তার ওপর কোনো কষ্টদায়ক বস্তু দেখলে খ্যাতির ভয়ে তারা সেটা সরাতেন না।"[১৪৫]
টিকাঃ
[১২৮] মুসলিম, ২৯৫৬, প্রথম অংশ মুরসাল, দ্বিতীয় অংশ মাওকুফ।
[১২৯] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৫৫, সনদ সালিম পর্যন্ত সহীহ।
[১৩০] সূরা বনী ইসরাইল: ১০৭-১০৯।
[১৩১] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৫/১২১, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৩২] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৮৪, মাকতু।
[১৩৩] সূরা নাজম: ৫৯-৬০।
[১৩৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫০৫, মাকতু।
[১৩৫] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৩৬] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ৪৭৪, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[১৩৭] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ৯/১০৫, মাওকুফ।
[১৩৮] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১০৮, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৩৯] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৭২, সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[১৪০] আবদুর রাজ্জাক, মুসান্নাফ, ৯৫৩৮, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৪১] তিরমিযি, ২৪০৬, হাসান। সনদটি দঈফ। কিন্তু অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় হাদীসটি হাসান।
[১৪২] মালিক, মুআত্তা, ২/৯৮৬, প্রথম অংশটি মারফুরূপে বর্ণিত।
[১৪৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/৩১২, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[১৪৪] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩০১, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[১৪৫] হাদীসটি মাকতু'রূপে বর্ণিত। এই আসার ও তার আগেরাটির অর্থে আপত্তি রয়েছে। বান্দাকে অবশ্যই আত্মগরিমা, খ্যাতি-কামনা ও লৌকিকতা থেকে দূরে থাকতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, তা তাকে সৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। বরং বান্দার কর্তব্য হলো কল্যাণের উদ্দেশ্যে সৎকাজ করা এবং খ্যাতির বাসনা ও লোক-দেখানোর মনোভাব থেকে সংযত থাকা। (অনুবাদক)।
📄 গোপনীয় আমল ও যিকর
সপ্তম অনুচ্ছেদ
গোপনীয় আমল ও যিকর
আত্মপ্রশংসার নিন্দা
১৩০. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “হায়, (লোকেরা) একত্রে সমবেত হওয়ার সময় যদি তারা নিজেদের ব্যাপারে ভালো আলোচনা করা বা আত্মপ্রশংসার বিষয়টা অপছন্দ করত![১৪৬]
আমলের গোপনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ
১৩১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যদি এমন হতো যে, কেউ কুরআনের জ্ঞান অর্জন করলে তার প্রতিবেশী জানতে না পারত; কেউ অনেক বেশি ফিকহী ইলম অর্জন করলেও লোকেরা তা টের না পেত; কেউ নিজ বাড়িতে দীর্ঘ সালাত পড়লেও ওখানে উপস্থিত লোকেরা তা বুঝতে না পারত।
আমি একদল মানুষের কথা জানি, তারা দুনিয়ার বুকে প্রতিটা আমল গোপনীয়তার সাথে করত, কখনও তা প্রকাশ হতো না। মুসলমানগণ প্রাণপণে দুআ করতেন; কিন্তু কোনো আওয়াজ শোনা যেত না। কেবল তাদের ও তাদের রবের মধ্যে এক ধরনের গুঞ্জরণ সৃষ্টি হতো। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
'তোমরা বিনয়ের সঙ্গে ও গোপনে তোমাদের রবকে ডাকো।[১৪৭]
আর আল্লাহ তাআলা তাঁর এক সৎ বান্দার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার কথায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا
'যখন (যাকারিয়্যা) তার প্রতিপালককে ডেকেছিল গোপনে।'”[১৪৮]-[১৪৯]
আমলের কথা লোকদের বলে বেড়ানোর পরিণাম
১৩২. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন-
مَنْ سَمَّعَ النَّاسَ بعلمه، سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ سَامِعَ خَلْقِهِ، وَحَقَّرَهُ وَصَغَرَهُ
"কেউ যদি তার জ্ঞানের কথা লোকদের কাছে বলে বেড়ায়, আল্লাহও তার (গোপন) কথা মানুষকে শুনিয়ে দেন; তাকে অপমানিত ও অপদস্থ করেন।”[১৫০]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, এই হাদীস বর্ণনা করার পর ইবনু উমরের চোখ-দুটি ভিজে গেল।
আমলের আগে নিয়ত ঠিক করে নেওয়া
১৩৩. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে কিছু লোকের আলোচনা করে বলা হলো যে, তাঁরা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বললেন, “তোমরা যা বলছ ও ভাবছ, বিষয়টি তেমন নয়। যখন দুটি দল মুখোমুখি হয় তখন ফেরেশতাগণ নেমে এসে প্রত্যেক মানুষকে তাদের নিজ নিজ স্তরে লিপিবদ্ধ করেন: অমুক দুনিয়া লাভের জন্য জিহাদ করেছে; অমুক রাজত্ব লাভের জন্য জিহাদ করেছে; অমুক যশখ্যাতির জন্য জিহাদ করেছে, ইত্যাদি; আর অমুক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের আশায় জিহাদ করে, সে জান্নাতে যাবে।"[১৫১]
লোক-দেখানো বিনয় ও নম্রতা
১৩৪. আবূ ইয়াহইয়া থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু অথবা আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "লোক-দেখানো বিনয় ও নম্রতা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাও।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, সেটা কী জিনিস? তিনি বললেন, "দেহ বিনয়ী দেখালেও অন্তরে বিনয় নেই।"[১৫২]
আমলে কঠোরতা সত্ত্বেও পারস্পরিক সৌজন্য
১৩৫. আওযাঈ থেকে বর্ণিত, বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমি তাঁদেরকে দেখেছি যে, তাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে (ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে) কঠোর ছিলেন। তবে তাঁরা পরস্পরকে দেখে (মুচকি) হাসতেন। রাত শুরু হলেই মগ্ন হয়ে যেতেন আল্লাহর ইবাদাতে।”[১৫৩]
মুচকি হাসি
১৩৬. উবাইদুল্লাহ ইবনুল মুগীরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি : “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখিনি।"[১৫৪]
পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাকানো
১৩৭. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মুচকি হাসি হাসতেন (অট্টহাসি দিতেন না) এবং কারও দিকে তাকালে পরিপূর্ণভাবে তাকাতেন।”[১৫৫]
ধীরস্থিরভাবে কথা বলা
১৩৮. মিসআর বলেন, একজন শাইখ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রদিয়াল্লাহু আনহু অথবা আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা- কে বলতে শুনেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাবার্তায় ধীরতা ও স্থিরতা ছিল।”[১৫৬]
দাঁত বের করে না হাসা
১৩৯. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও এমনভাবে হাসতেন না যে, তাঁর সামনের দাঁতগুলো বেরিয়ে যেত; বরং তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।"[১৫৭]
রোজা রাখা অবস্থায় পরিপাটি থাকা
১৪০. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যেদিন তোমাদের কেউ সাওম রাখবে, সে যেন দিনের বেলা চুল পরিপাটি রাখে।"[১৫৮] (যাতে কেউ বুঝতে না পারে সে রোজাদার।)
মানুষকে জানতে না-দেওয়া
১৪১. হিলাল ইবনু ইয়াসাফ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম বলেছেন, “রোজা রাখা অবস্থায়ও মাথার চুল ও দাড়িতে তেল লাগিয়ো, ঠোঁট মুছে রেখো। যাতে মানুষ বুঝতে না পারে, তুমি রোজাদার। ডান হাত দিয়ে দান করলে নিজের বাম হাত থেকেও তা লুকিয়ে রেখো। আর সালাত পড়ার সময় ঘরের দরজায় পর্দা টানিয়ে রেখো। কারণ, আল্লাহ তাআলা যেভাবে রিযক বণ্টন করেন, ঠিক সেভাবে প্রশংসাও বণ্টন করেন।"[১৫৯]
গোপনে পড়ায় বেশি সাওয়াব
১৪২. খালিদ ইবনু মুহাজির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি : “যেমনিভাবে ফরজ সালাত একাকী পড়ার চেয়ে জামাআতে পড়া উত্তম, তেমনিভাবে নফল সালাত প্রকাশ্যে পড়ার চেয়ে গোপনে পড়া উত্তম।”[১৬০]
প্রতিদানের প্রত্যাশা
১৪৩. কাসিম আবূ আবদুর রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا أَجْرَ لِمَنْ لَا حِسْبَةً لَهُ
“যে ব্যক্তি (আল্লাহ তাআলার কাছে) প্রতিদান প্রত্যাশা করে না, সে কোনো প্রতিদান পায় না।”[১৬১]
বলে বেড়ালে ইবাদাত নষ্ট হয়ে যায়
১৪৪. আবূ সালামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলল, “আমি চার বছর ধরে একটানা রোজা রেখেছি।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لَا صُمْتَ، وَلَا أَفْطَرْتَ
“তুমি রোজা রাখোনি, রোজা ভাঙোওনি।”[১৬২] কারণ, তুমি তা বলে বেড়াচ্ছ।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়
১৪৫. হাবীব ইবনু সুহাইব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا تَقَرَّبَ الْعَبْدُ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى بِشَيْءٍ أَفْضَلَ مِنْ سُجُودٍ خَفِي
"বান্দা যে-সকল (আমলের) মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো গোপন সাজদা।"[১৬৩]
গোপনীয়তার সঙ্গে যিকর
১৪৬. দামরাতা ইবনু হাবীব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اذْكُرُوا اللَّهَ تَعَالَى ذِكْرًا خَامِلًا قَالَ: فَقِيلَ: وَمَا الذِّكْرُ الْخَامِلُ؟ قَالَ: الذِّكْرُ الْخَفِيُّ
"যিকরুন খামিলের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করো।” জিজ্ঞেস করা হলো, যিকরুন খামিল কী? তিনি বললেন, “গোপনীয় যিকর।”[১৬৪]
ঘরে কান্নাকাটি করা
১৪৭. মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবূ উমামা বাহিলি রদিয়াল্লাহু আনহু একবার মাসজিদে এসে দেখলেন, এক ব্যক্তি সাজদায় পড়ে কান্নাকাটি করছে এবং আল্লাহকে ডাকছে। তিনি তাকে বললেন, "আহ, এটা যদি তোমার ঘরে করতে!"[১৬৫]
টিকাঃ
[১৪৬] আবূ খাইসামাহ, কিতাবুল ইলম, ৩৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৪৭] সূরা আরাফ: ৫৫।
[১৪৮] সূরা মারইয়াম: ০৩।
[১৪৯] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ৩৩৮, মাকতু।
[১৫০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৪৪, সনদ দঈফ; তবে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[১৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৫২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[১৫৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৫৪] তিরমিযি, ৩৬৪১, হাদীসটি হাসান। আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৫৫] তিরমিযি, ৩৬৪২, মু'দাল এবং অন্য কিতাবে হাসান সনদে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে। আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৫৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৪৪, হাদীসটি দঈফ, তবে এর সমার্থবোধক হাদীস হাসান সনদেও বর্ণিত হয়েছে।
[১৫৭] সনদ দঈফ। তবে হাদীসটি অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় সহীহ। বুখারি, ৫৭৪১।
[১৫৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ। ইমাম বুখারি 'সাওম' অধ্যায়ে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।
[১৫৯] হিলাল ইবনু ইয়াসাফ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসটির বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
[১৬০] এখানে হাদীসটি মাকতু, তবে এর সমার্থবোধক হাদীস মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[১৬১] সনদ হাসান, মুরসাল।
[১৬২] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৩] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/১৪০, সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 দুনিয়াতে ভীত হলে, আখিরাতে স্বস্তি মেলে
অষ্টম অনুচ্ছেদ
দুনিয়াতে ভীত হলে, আখিরাতে স্বস্তি মেলে
দুনিয়াতে ভয়, আখিরাতে স্বস্তি
১৪৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي لَا أَجْمَعُ عَلَى عَبْدِى خَوْفَيْنِ، وَلَا أَجْمَعُ لَهُ أَمْنَيْنِ، إِذَا أَمِنَنِي فِي الدُّنْيَا أَخَفْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَإِذَا خَافَنِي فِي الدُّنْيَا أَمَّنْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"আল্লাহ তাআলা বলেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার কোনো বান্দাকে দুটি ভীতি অথবা দুটি স্বস্তি একসাথে দেব না। সে যদি দুনিয়াতে আমার ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে পড়ে, তবে কিয়ামাতের দিন আমি তাকে ভীতসন্ত্রস্ত করব। আর দুনিয়াতে যদি আমাকে ভয় করে চলে, তবে কিয়ামাতের দিন তাকে নিরাপদে রাখব।"[১৬৬]
মুক্তি না-পাওয়ার আশঙ্কা
১৪৯. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কেউ যদি সত্তর-জন নবির সমপরিমাণ আমলও করে, তারপরও কিয়ামাত-দিবসের আযাব থেকে মুক্তি না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”[১৬৭]
কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা
১৫০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “অতীতে এমন-একদল মানুষ গত হয়েছেন যাঁরা এই প্রস্তর-খণ্ডের পরিমাণ সম্পদ দান করার পরও, কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাবেন না বলে আশঙ্কা করতেন।”[১৬৮]
গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহভীরুতা
১৫১. উরওয়া ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কিয়ামতের দিন বান্দার সামনে তার সব গুনাহ উপস্থিত করা হবে। সে তার গুনাহ বহন করে নিয়ে যেতে থাকবে এবং বলবে, (হে আল্লাহ, দুনিয়াতে) আমি তোমার ব্যাপারে ভীত ছিলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন।”[১৬৯]
পাপকাজ করেও জান্নাতী
১৫২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيُذْنِبُ الذَّنْبَ فَيَدْخُلُ بِهِ الْجَنَّةَ، قِيلَ : كَيْفَ؟ قَالَ: يَكُونُ نُصْبَ عَيْنَيْهِ ثابتًا، قَارًا، حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ
“বান্দা পাপ করবে; কিন্তু ওই পাপের কারণেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “ওই পাপকাজ তার চোখের সামনে স্থির হয়ে থাকবে, (আর সে পাপ স্বীকার করবে ও তাওবা করবে।) ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[১৭০]
নেই ভরসা
১৫৩. আবূ ইমরান থেকে বর্ণিত আছে, আবু আইয়ুব আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "কেউ কেউ নেক আমলের ওপর ভরসা করে ছোটো ছোটো পাপ কাজ করতে থাকে। এর ফলে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময়ে, তার ওই (পাপকাজগুলো) তাকে ঘিরে ধরবে। আর কেউ কেউ পাপকাজ করে বটে, তবে সে (তওবা করে) ওই পাপ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে নিরাপদে।"[১৭১]
অনুশোচনার গুরুত্ব
১৫৪. আবূ মূসা থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কোনো কোনো বান্দা গুনাহ করে বটে, তবে তার জন্য তাদের মন দুঃখভারাক্রান্ত থাকে। ফলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করে।" আবূ হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কারও কারও গুনাহ তার নেক আমলের চেয়ে উপকারী হয়ে যায়, আবার কারও কারও নেক আমল তার গুনাহের চেয়ে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।"[১৭৩]
পাপের স্বীকারোক্তি এবং ক্ষমা
১৫৫. আবূ ওয়াইল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন বান্দার গুনাহ গোপন করে রেখে তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি যে গুনাহের কাজ করেছ, তা কি তুমি স্বীকার করো? সে বলবে, জি, স্বীকার করি। ফলে আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।"[১৭৪]
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার গোপন কথা
১৫৬. সাফওয়ান ইবনু মুহাররায রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে হাঁটছিলাম। এ সময় একজন লোক এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ইবনু উমর, আপনি (কিয়ামাতের দিন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে) গোপনীয় কথা সম্পর্কে রাসূল থেকে কিছু শুনেছেন? ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
يَدْنُو الْمُؤْمِنُ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَضَعَ عَلَيْهِ كَنَفَهُ، فَذَكَرَ صَحِيفَتَهُ ، قَالَ: فَيُقَرِّرُهُ ذُنُوبَهُ، هَلْ تَعْرِفُ فَيَقُولُ: رَبِّ أَعْرِفُ، فَيَقُولُ: هَلْ تَعْرِفُ؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ، رَبِّ أَعْرِفُ، حَتَّى يَبْلُغَهُ بِهِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَبْلُغَ، ثُمَّ يَقُولُ: إِنِّي سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ، وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ، قَالَ: فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُنَادَى عَلَى رُءُوسِ الْأَشْهَادِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“(কিয়ামাতের দিন) মুমিন বান্দা তার রবের নিকটবর্তী হবে। তখন আল্লাহ তাআলা তার ওপর একটি পর্দা ফেলে দেবেন। বান্দার আমলনামা তার সামনে পেশ করবেন এবং তার গুনাহের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি নেবেন। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার গুনাহের কথা স্বীকার করো? সে বলবে, জি, হে আমার রব, স্বীকার করি। আবার জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার গুনাহের কথা স্বীকার করো? সে বলবে, জি, হে আমার রব, স্বীকার করি। এরপর আল্লাহ তাআলা (তার প্রশ্নোত্তর) যতটুকু নিতে চাইবেন, ততটুকু নেবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমার গুনাহ গোপন করে রেখেছিলাম। আজ আমি সেসব গুনাহ ক্ষমা করে দিলাম। এরপর তাকে নেক আমালনামা দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে কাফিরদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীদের উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“এরাই তাদের প্রতিপালকের বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করেছিল। সাবধান! জালিমদের ওপর আল্লাহর লানত।”[১৭৫]-[১৭৬]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
১৫৭. আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ
“সেই চরম ভীতিকর অবস্থা তাদেরকে একটুও পেরেশান করবে না।”[১৭৭]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "যখন তাদেরকে জাহান্নাম বেষ্টন করে ফেলবে।"[১৭৮]
আল্লাহভীরুতার অর্থ
১৫৮. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
“তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি নিয়ে এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।”[১৭৯]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ 'ভীতি'-এর অর্থ বলেছেন, “অন্তরে সদা জাগ্রত ভীতি।"[১৮০]
খুশু-খুযুর অর্থ
১৫৯. আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
“যারা নিজেদের সালাতে বিনয়াবত।”[১৮১]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "ধীরস্থিরতা।"[১৮২]
যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে
১৬০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
“এবং যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ থেকে বিরত থাকে।”[১৮৩]
সাঈদ ইবনু আবী আরুবা থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশ এলেও বাতিল ও অহেতুক কাজ থেকে বিরত থাকে না, তারা এমন নয়।”[১৮৪]
বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে?
১৬১. শাদ্দাদ ইবনু আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا، وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে আয়ত্তে রেখেছে এবং মৃত্যুপরবর্তী সময়ের জন্য নেক আমল করেছে, সে-ই প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান। আর যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেও আল্লাহর প্রতি (ক্ষমার) আশা পোষণ করে সে নির্বোধ।”[১৮৫]
আমানত ও বিনম্রতা উঠে যাওয়া
১৬২. দামরাতা ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ شَيْءٍ يُرْفَعُ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ الْأَمَانَةُ وَالْخُشُوعُ، حَتَّى لَا تَكَادَ تَرَى خَاشِعًا
“সর্বপ্রথম এই উম্মত থেকে যে জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে, তা হলো আমানত ও বিনয়। এমনকি একজনও বিনয়ী খুঁজে পাওয়া যাবে না।”[১৮৬]
বিনম্রতা ও একাগ্রতার চিহ্ন
১৬৩. আল্লাহ তাআলা বলেন,
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ
"তাদের চেহারায় সাজদার চিহ্ন থাকবে।”[১৮৭]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, "তা হলো বিনম্রতা ও একাগ্রতার চিহ্ন।"[১৮৮]
ললাটে বিনয় নম্রতার চিহ্ন
১৬৪. হুমাইদ আ'রাজ থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “(কপালে সাজদার চিহ্ন) হলো বিনয় ও নম্রতার চিহ্ন।”[১৮৯]
সবার আগে যা উঠিয়ে নেওয়া হবে
১৬৫. জারীর ইবনু আবী হাযিম বলেন, আমি আবূ ইয়াযীদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: "বলা হতো যে, এই উম্মত থেকে বিনম্রতা সবার আগে উঠিয়ে নেওয়া হবে।"[১৯০]
বিনীতদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ
১৬৬. আবূ আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু যখনই রবী' ইবনু খুসাইমকে দেখতেন, তখনই এই আয়াত পাঠ করতেন:
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
"এবং সুসংবাদ দাও বিনয়ীদের।”[১৯১]
চির-অটল
১৬৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি এমন-একদল মানুষকে (অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামকে) দেখেছি যারা জীবনেও তৃপ্তি-ভরে খেতেন না। স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু খেতেন। গড়নে তাঁরা ছিলেন হালকা-পাতলা, আর নিজের সংকল্প ও হিম্মতের ওপর ছিলেন চির-অটল।”[১৯২]
সালফে সালিহীনের বৈশিষ্ট্য
১৬৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, এমনও দেখেছি যে, তাঁদের একেকজন গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু কখনও তাঁদের জন্য নতুন কাপড় সেলাই করেননি, পরিবারকে তাঁদের জন্য খাবার তৈরির নির্দেশ দেননি এবং নিজেদের মধ্যে ও জমিনের মধ্যে কোনো আড়াল রাখেননি (জুতা পরেননি)।”[১৯৩]
শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার
১৬৯. রবীআ ইবনু ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ ইদরিস খাওলানি রহিমাহুল্লাহ- কে বলতে শুনেছেন: মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার হলো ধীরস্থিরতা।[১৯৪]
টিকাঃ
[১৬৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৩০৮, সনদ হাসান, মুরসাল। অন্য কিতাবে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[১৬৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৬৮] বুখারি, আত-তারিখুল কাবীর, ১/১৫, মাকতু।
[১৬৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৭০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৭৭, মুরসাল।
[১৭১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৭২] ইবনু হায়াওয়াইহ বর্ণনা করেছেন, কোনো কোনো লোক।
[১৭৩] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৭৪] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৭৫] সূরা হুদ: ১৮।
[১৭৬] বুখারি, ৪৪০৮; মুসলিম, ২৭৬৮।
[১৭৭] সূরা আম্বিয়া: ১০৩।
[১৭৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৭/৭৮, মাওকুফ।
[১৭৯] সূরা আম্বিয়া: ৯০।
[১৮০] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৮১] সূরা মুমিনুন: ২।
[১৮২] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৮/৩, মাকতু।
[১৮৩] সূরা মুমিনুন: ৩।
[১৮৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৩৩৯, মাওকুফ।
[১৮৫] তিরমিযি, ৪২৬০, সনদ দঈফ।
[১৮৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২/১৩৬, সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৮৭] সূরা ফাতহ: ২৯।
[১৮৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৬/৭০, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৮৯] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৮২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৯১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১০৬, সনদ মুনকাতি, মাকতু।
[১৯২] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫২৭, মাওকুফ।
[১৯৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫০৮, মাওকুফ।
[১৯৪] সনদ সহীহ, মাকতু।
📄 দুনিয়াবি ফিতনায় প্রতারিত হওয়া
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রথম অনুচ্ছেদ
দুনিয়াবি ফিতনায় প্রতারিত হওয়া
পরিশ্রমী হয়েও খেলতামাশায় লিপ্ত
১৭০. লাইস ইবনু আবী সুলাইম থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যারা দুনিয়ার ব্যাপারে বেশি পরিশ্রমী, তারা যেন নিতান্ত ক্রীড়াকৌতুকে লিপ্ত।"[১৯৫]
সবাই আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার
১৭১. আওযাঈ বলেন, আমি বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি : "তোমাদের মধ্যে যারা দুনিয়াবিমুখ (তারা আসলে দুনিয়ার প্রতি) আসক্ত; তোমাদের কঠোর পরিশ্রমীরা (আখিরাতের ক্ষেত্রে) অবহেলাকারী; তোমাদের আলিমরা মূর্খ; এবং তোমাদের মূর্খরা আত্মপ্রতারণায় লিপ্ত।"[১৯৬]
মারাত্মক কাজকেও তুচ্ছ মনে করা
১৭২. আবু কাতাদা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাদা ইবনু কুরস লাইসি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে আমরা যে কাজগুলোকে মারাত্মক মনে করতাম, তোমারা সেগুলোকে চুলের চেয়েও তুচ্ছ ভাবো।”[১৯৭]
হুমাইদ ইবনু হিলাল বলেন, আমি আবূ কাতাদা রহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, যদি কুরস লাইসি রদিয়াল্লাহু আনহু এই যুগ পেতেন, তা হলে কেমন হতো? তিনি বললেন, “তা হলে তো এ কথা তিনি আরও জোর দিয়ে বলতেন।”
সঙ্গদোষে লজ্জিত হওয়া
১৭৩. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “এই জমিন এমন-একদল মানুষকে লুকিয়ে রেখেছে, তাঁরা যদি দেখতেন আমি তোমাদের সঙ্গে বসে আছি তবে আমাকে লজ্জা পেতে হতো।"[১৯৮]
কবি লাবীদের একটি উক্তি
১৭৪. উরওয়া ইবনুয যুবাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা-কে বলতে শুনেছি, কবি লাবীদ বলেন,
যারা ছায়া হয়ে ছিলেন তাঁরা গত হয়ে গেছেন,
আমিই খোস-পাঁচড়ার মতো পেছনে পড়ে রয়েছি।
এখন সবার কথা স্বার্থ ও ভয়ের কারণে হয়,
কেউ সমালোচনা করতে গেলে (উল্টো) তাকে দোষারোপ করা হয়,
যদিও সে কারও সাথে গোলযোগ সৃষ্টি করেনি।
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা এই কবিতা আবৃত্তি করার পর বলতেন, “লাবীদ যদি আজকের যুগের মানুষদের দেখতেন, তা হলে না-জানি কী বলতেন!”[১৯৯]
ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা যদি আমাদের যুগের মানুষদের দেখতেন, তা হলে না-জানি কেমন হতো!”
ইবাদাতে মনোযোগ
১৭৫. সা'দ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “এই উম্মাহর প্রথম যুগের দুজন মানুষ যদি মুসহাফ (অর্থাৎ মুদ্রিত কুরআন) হাতে নিয়ে এখানকার কোনো-একটি নির্জন উপত্যকায় চলে আসতেন, আর এই যুগের লোকদের পেয়ে যেতেন—তারপরও তারা জানতে পারতেন না যে, তারা কোন যুগে আছেন।”[২০০] (অর্থাৎ, তাঁরা ইবাদাতে এতটাই নিমগ্ন থাকতেন।)
বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করা
১৭৬. সুফইয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত আছে, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আজকালকার মানুষদের ওপর خُبْزُ ثَقْلَةٍ। (প্রবাদটি পুরোপুরি খাটে)। (প্রবাদটির অর্থ : মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় বেশি ঘাঁটতে যেয়ো না, তা হলে তোমার দৃষ্টিতে তাকে অনেক হেয় মনে হবে।) "[২০১]
এক শ উট, শূন্য বাহন
১৭৭. সালিম ইবনু আবদিল্লাহ তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّمَا النَّاسُ كَالْإِبِلِ الْمِائَةِ، لَا تَجِدُ فِيهَا رَاحِلَةً
"এমন মানুষজন দেখবে, যারা এক শ উটের মতো, কিন্তু একটি উটও ভার বহন করার উপযুক্ত নয়।”[২০২]
দুনিয়ার ফিতনা
১৭৮. আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ মুআফিরি থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “বর্তমান সময়ে কোনো আমলের ওপর দৃঢ় থাকার চেয়ে আগের যুগে তার সামান্য কিছু করাটা আমার কাছে প্রিয় ছিল। কারণ, আমরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম তখন আখিরাতের কাজেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু বর্তমান যুগে দুনিয়া আমাদেরকে ফিতনায় ডুবিয়ে দিয়েছে।”[২০৩]
টিকাঃ
[১৯৫] আবু নুআইম, হিলইয়া, ৩/২৬৯, সহীহ। আবূ নুআইম উবাইদ ইবনু উমাইর থেকে সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
[১৯৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯৭] হাদীসটি সহীহ। এই হাদীস অন্য সনদে বুখারিতেও বর্ণিত হয়েছে, বুখারি, ৬৪৯২।
[১৯৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯৯] বুখারি, আত-তারিখুস সগির, ১/৫৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[২০০] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[২০১] সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[২০২] বুখারি, ৬১৩৩; মুসলিম, ২৫৪৭। অর্থাৎ, মানুষ শত শত থাকবে; কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো একজনও থাকবে না। (অনুবাদক)
[২০৩] সনদ হাসান, মাওকুফ। বুখারিতে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বুখারি, ১১০২।