📄 দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে ইলম শেখার ভয়াবহ পরিণাম
জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না যারা
৩৮. ইয়াহইয়া ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইরাকের একদল মুসাফির আবূ যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে হাদীস বর্ণনা করার অনুরোধ জানায়। তিনি তাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি তাদের বলেন, “তোমরা জানো যে, হাদীস শিক্ষা করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করা হয়। তাই কেউই দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে তা শিখবে না।” অথবা তিনি বলেছেন, “কেউ যদি পার্থিব উদ্দেশ্যে হাদীস শেখে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৪৪]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ দাবি করেছেন যে, عزف শব্দের অর্থ হলো ঘ্রাণ।
খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করা
৩৯. আয়িযুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কেউ যদি খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন বা হাদীস শিক্ষা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৪৫]
আল্লাহ তাআলার ভয়ই ইলম হিসেবে যথেষ্ট
৪০. কাসিম ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আল্লাহ তাআলার ভয়ই ইলম হিসেবে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে ধোঁকায় পতিত হওয়া মূর্খতা হিসেবে যথেষ্ট।”[৪৬]
পূর্বসূরিদের পথ আঁকড়ে ধরা
৪১. ইবরাহীম নাখঈ থেকে বর্ণিত। হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “হে ক্বারীগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের পূর্বসূরিগণের পথ আঁকড়ে ধরো। আল্লাহ তাআলার কসম, যদি তাঁদের পথে অটল থাকো তবে অনেক দূর এগিয়ে যাবে; আর সে পথ ছেড়ে ডানে-বাঁয়ে চললে অবশ্যই চরমভাবে পথভ্রষ্ট হবে।”[৪৭]
আলিমের ফিতনা
৪২. ইয়াযীদ ইবনু আবী হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফকীহ আলিমের একটি ফিতনা এই যে, তিনি অন্যের কথা শোনার চেয়ে নিজে বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন, যদিও কথা বলার মতো যথেষ্ট ব্যক্তি রযেছেন। অন্যের কথা শোনাটাই নিরাপদ এবং তাতে ইলম বাড়ে। শ্রোতা বক্তার অংশীদার। আল্লাহ তাআলা যদি রক্ষা না করেন, তবে অধিক কথায় রয়েছে পেরেশানি, পরিশ্রম, অতিরঞ্জন ও ক্ষতি। এমনও আলিম আছেন যারা মনে করেন, বংশমর্যাদা ও চেহারা-সুরতের কারণে একে অন্যের চেয়ে কথা বলার বেশি অধিকার রাখে। তারা দরিদ্রদেরকে হেয়জ্ঞান করেন। তাদের কাছে গরিবদের কোনো স্থান নেই। কেউ কেউ তো ইলমকে কুক্ষিগত করে রাখতে ভালোবাসেন। তারা মনে করেন, ইলম শিক্ষা দেওয়াটা একটা অপচয়। ইলম আমার নিজের কাছেই থাকুক- এটাই তাদের পছন্দ। এমনও আলিম আছেন যারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী শাসকের মতো আচরণ করেন; তাদের বক্তব্যের বিরুদ্ধমত প্রকাশ করলে বা তাদের অধিকারের ব্যাপারে অসচেতন হলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো কোনো আলিম নিজেকে মুফতির পদে বসিয়েছেন; তার জ্ঞান নেই-এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে-'আমি জানি না' বলতে লজ্জাবোধ করেন। ফলে আন্দাজে ঢিল ছোড়েন এবং যারা বানিয়ে কথা বলেন তাদের কথা লিখে দেন। কেউ কেউ তো আবার যা শোনেন তা-ই বর্ণনা করেন। এমনকি মর্যাদার আশায় তারা ইয়াহুদি-নাসারাদের কথাও বর্ণনা করেন।” [৪৮]
কিচ্ছা বর্ণনাকারীদের জন্য দুর্ভোগ
৪৩. মাইমুন ইবনু মিহরান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিচ্ছা-কাহিনি বর্ণনাকারীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে দুর্যোগের অপেক্ষায় থাকে, আর শ্রোতা রহমতের প্রতীক্ষায় থাকে।” [৪৯]
দ্বীনদারি দেখিয়ে দুনিয়া অর্জন করা
৪৪. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ رِجَالٌ يَخْتُلُونَ الدُّنْيَا بِالدِّينِ، يَلْبَسُونَ لِلنَّاسِ جُلُودَ الضَّأْنِ مِنَ الدِّينِ، أَلْسِنَتُهُمْ أَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ، وَقُلُوبُهُمْ قُلُوبُ الذِّتَابِ، يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَفَبِي تَغْتَرُّونَ، أَمْ عَلَى تَجْتَرِئُونَ، فَبِي حَلَفْتُ لَأَبْعَثَنَّ عَلَى أُولَبِكَ مِنْهُمْ فِتْنَةً تَدَعُ الْحَلِيمَ مِنْهُمْ حَيْرَانَ
"শেষ জামানায় এমন-কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা দ্বীনের দ্বারা দুনিয়া অর্জন করবে। (অর্থাৎ, দ্বীনদারি প্রকাশ করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলবে।) মানুষের চোখে বিনয়ী সাজতে মেষ-দুম্বার চামড়া পরবে (অর্থাৎ, মোটা কম্বল বা পোশাক পরে দ্বীনদার সাজবে)। তাদের মুখের ভাষা হবে মধুর চেয়ে মিষ্টি; পক্ষান্তরে অন্তর হবে বাঘের মতো (হিংস্র)। আল্লাহ তাআলা এদের সম্পর্কে বলেন, এরা কি আমাকে ধোঁকা দিতে চায় নাকি আমার ওপর ধৃষ্টতা পোষণ করে? (জেনে রাখো), আমি শপথ করে বলছি, তাদের ওপর এমন বিপদ পাঠাব যাতে তাদের বিচক্ষণ-বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণও দিশেহারা হয়ে পড়বে।”[৫০]
না জানলে 'আমি জানি না' বলা
৪৫. নাফি' বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলো। জবাবে তিনি বললেন, আমি তা জানি না।”[৫১]
না বুঝে ফাতওয়া দেওয়ার ভয়াবহতা
৪৬. উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি তো তা জানি না। তাঁকে আবারও একই বিষয় জিজ্ঞেস করা হলো। এবার তিনি বললেন, তোমরা কি আমাদের পিঠকে তোমাদের জন্য জাহান্নামের সাঁকো বানাতে চাও? তোমরা কি বলতে চাও যে, ইবনু উমর আমাদেরকে এ ব্যাপারে ফাতওয়া দিয়েছেন?”[৫২]
হাদীস বর্ণনায় ভীতি
৪৭. ইবনু শুবরুমাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু লোকদের হাদীস শোনাচ্ছিলেন। তখন তামীম ইবনু হাযলামকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বললেন, হে তামীম ইবনু হাযলাম, তুমি নিজে যদি মুহাদ্দিস হতে পারো তবে তা-ই করো।”[৫৩]
বক্তার ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা
৪৮. হাইওয়াতা ইবনু শুরাইহ বলেন, আমি ইয়াযীদ ইবনু আবী হাবীব রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “বক্তা ফিতনার আশঙ্কায় থাকে এবং চুপ-থাকা ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকে।”[৫৪]
আলোচনার মজলিস ছোটো হওয়া
৪৯. হাইওয়াতা ইবনু শুরাইহ বলেন, আমি উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “দু-একজন কী বড়োজোর তিন-চারজনের সাথে ইলমি আলোচনা করা যায়। কিন্তু লোকসংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে গেলেই চুপ থাকবে বা উঠে চলে আসবে।” [৫৫]
ইলমের অহংকার
৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সম্পদের কারণে (মানুষ) যেমন সীমালঙ্ঘন করে, তেমনই ইলমের কারণেও করে থাকে।”[৫৬]
অন্যদের প্রাধান্য দেওয়া
৫১. আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক শ বিশজন সাহাবিকে পেয়েছি। তাদের কেউই নিজেকে মুহাদ্দিস (ভাবতেন) না, তবে মনে করতেন— তাঁর ভাই-ই হাদীস বর্ণনার জন্য যথেষ্ট। আর তাঁদের কেউই নিজেকে মুফতি (ভাবতেন) না, তবে মনে করতেন—তাঁর ভাই-ই ফাতওয়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি বলেছেন, মাসজিদে তাদের পেয়েছি।) [৫৭]
বিশেষ বিশেষ কথা বলে দুআ করা
৫২. দাউদ ইবনু শাবূর বলেন, “আমরা তাউস রহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, আপনি এই এই কথা বলে আমাদের জন্য দুআ করুন। তিনি বললেন, তাতে কোনো সাওয়াব আছে বলে মনে করি না।”[৫৮]
হাদীস বর্ণনায় অনীহা
৫৩. সা'দ ইবনু মাসউদ বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক সাহাবিকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি অমুক অমুক লোকের মতো হাদীস বর্ণনা করেন না কেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁরা যা শুনেছেন আমিও তার অনুরূপ শুনেছি এবং তাঁরা যেখানে যেখানে উপস্থিত ছিলেন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু পরে সেসব বিষয় (আমি বর্ণনা না করলেও) গোপন থাকেনি এবং মানুষও সেগুলো (অন্যের মাধ্যমে জানার দ্বারা) আঁকড়ে ধরেছে। তাই আমি এমন ব্যক্তিদের পেয়ে গেছি যাঁরা আমার (পরিবর্তে এই কাজের) জন্য যথেষ্ট। তা ছাড়া আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীতে কম-বেশি করতে চাই না। আল্লাহর কসম, কেউ আমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতে এত আগ্রহ বোধ করি, যেন তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ঠান্ডা পানি চাইছি; কিন্তু হেরফের হওয়ার আশঙ্কায় জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকি।"[৫৯]
কিয়ামাতের আলামত
৫৪. আবু উমাইয়া লাখমী[৬০] রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ ثَلَاثًا: إِحْدَاهُنَّ أَنْ يُلْتَمَسَ الْعِلْمُ عِنْدَ الْأَصَاغِرِ
"কিয়ামাতের আলামত তিনটি। তার একটি হলো মনগড়া ফাতওয়া- প্রদানকারীদের কাছ থেকে ইলম শেখা।”[৬১]
আমল ব্যতীত ইলমের প্রতিদান নেই
৫৫. ইয়াযীদ ইবনু জাবির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
اعْلَمُوا مَا شِئْتُمْ أَنْ تَعْلَمُوهَا؛ فَلَنْ يَأْجُرَكُمُ اللَّهُ بِعِلْمٍ حَتَّى تَعْمَلُوا
"যা যা চাও, শিখে নাও। কিন্তু আমল ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনো ইলমের প্রতিদান দেবেন না।”[৬২]
কোনো কোনো প্রশ্ন সমস্যা বাড়িয়ে দেয়
৫৬. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে বললেন, “কী প্রশ্ন করেছ, ভেবে দেখো। তুমি আমাকে এমন-এক বিষয়ে প্রশ্ন করেছ যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তোমার সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেবেন।”[৬৩]
অন্যকে তালীম দেয় অথচ নিজে করে না
৫৭. ইসমাঈল ইবনু আবী খালিদ থেকে বর্ণিত। শা'বী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "জান্নাতীদের কিছু লোক একদল জাহান্নামীকে দেখে জিজ্ঞেস করবে, আরে! তোমরা জাহান্নামে গেলে কী করে? অথচ তোমরা আমাদের যে আদব ও ইলম শিখিয়েছ তারই কল্যাণে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করেছি। তারা জবাব দেবে, আমরা সৎকাজের আদেশ দিতাম ঠিকই; কিন্তু নিজেরা তা করতাম না।”[৬৪]
নেক মজলিস
৫৮. আবদুর রহমান ইবনু রাযীন বলেন, “আমি আবদুর রহমান ইবনু আবী হিলাল রহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা একটি জানাযা দেখলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন, এমন মজলিস খোঁজো, যেখানে অন্যের কথাই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। আর আমরা সেখানে বসে (কথা শুনব)।”[৬৫]
টিকাঃ
[৪৪] ইবনু মাজাহ, ২৫২, সনদ দুর্বল, মাওকুফ। তবে এর সমার্থবোধক হাসান মারফু হাদীস রয়েছে।
[৪৫] সনদ হাসান, মাকতু। তবে এর সমার্থবোধক হাদীস হাসান মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৪৬] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ৮৯২৭। এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে।
[৪৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৯৭, সহীহ।
[৪৮] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৩৬-১৩৭, মাওকুফ।
[৪৯] সনদ হাসান।
[৫০] তিরমিযি, ২৫১৫।
[৫১] আত-তাবাকাত, ৪/১৪৪, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৫২] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৫৩] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/১৬৩, মুনকাতি। অর্থাৎ, যদি সম্ভব হয়, তবে তুমিও হাদীসচর্চা করো।
[৫৪] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৩৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/৫, মাওকুফ।
[৫৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৬৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০] অথবা, জুমাহী থেকে বর্ণিত।
[৬১] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৫৭-১৫৮, হাসান।
[৬২] ইবনু আদি, আল-কামিল ফি যুআফায়ির রিজাল, ২/২৫-২৬, মাওকুফ।
[৬৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ; তবে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৬৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 পাপের মন্দ পরিণতি
অধিক পুণ্য বনাম কম পাপ
৫৯. কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে এক লোক জিজ্ঞেস করল, কোন ব্যক্তিকে দেখে আপনি বিস্মিত হন?-যে ব্যক্তি কম আমল করে ও কম গুনাহ করে? নাকি বেশি আমল করে ও বেশি গুনাহ করে? ইবনু আব্বাস জবাব দিলেন, পাপ থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম।[৬৬]
পাপের স্বল্পতাই উত্তম
৬০. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “(নেকির দিক থেকে) একনিষ্ঠ ইবাদাতগুজারকে ছাড়িয়ে যেতে চাইলে পাপ থেকে নিজেকে বিরত রেখো। (কারণ) পাপের স্বল্পতার চেয়ে উত্তম কিছু নেই, যা নিয়ে তোমরা আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হতে পারবে।”[৬৭]
মুমিন বান্দা ছোটো পাপকেও বড়ো করে দেখে
৬১. আবুল আহওয়াস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “মুমিন বান্দার কাছে পাপ এমন—যেন সে বিশাল শিলাখণ্ডের নিচে বসে আছে আর ভয় করছে, তা এক্ষুনি ভেঙে পড়বে। আর কাফিরের কাছে পাপ হলো—নাকের ওপর দিয়ে ওড়ে যাওয়া সামান্য মাছির মতো।”[৬৮]
নাকের ওপর দিয়ে যাওয়া মাছি
৬২. হারিস ইবনু সুওয়াইদ থেকে বর্ণিত, “মুমিন বান্দার কাছে পাপ এমন—যেন সে বিশাল পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর ভয় করছে, তা এক্ষুনি ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারীর কাছে পাপ হলো নাকের ওপর দিয়ে ওড়ে যাওয়া সামান্য মাছির মতো।”[৬৯]
আল্লাহ যার কল্যাণ চান
৬৩. সুলাইমান ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, গুনাহকে তার জন্য কষ্টসাধ্য বানিয়ে দেন। আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তার সামনে পাপকে সুশোভিত করে তোলা হয়।”[৭০]
আল্লাহর অবাধ্যতা!
৬৪. আবদুর রহমান ইবনু আমর আওযাঈ বলেন, আমি বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: “পাপের নগণ্যতার দিকে তাকিয়ো না; বরং যাঁর অবাধ্যতা করেছ তাঁর (বড়োত্বের) দিকে তাকাও।”[৭১]
আত্মার ছটফটানি
৬৫. আমর ইবনুল হারিস থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “চড়ুই (পাখি) খাঁচায় বন্দি হলে যতটা ছটফট করে, মুমিনের আত্মা গুনাহর কারণে তার চেয়েও বেশি ছটফট করে।”[৭২]
খুঁটিতে-বাঁধা ঘোড়া
৬৬. আবূ সাঈদ খুদরি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ وَمَثَلُ الْإِيمَانِ كَمَثَلِ الْفَرَسِ فِي آخِيَّتِهِ، يَجُولُ ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى آخِيَّتِهِ. وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَسْهُو ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى الْإِيمَانِ، فَأَطْعِمُوا طَعَامَكُمُ الْأَنْقِيَاءَ، وَأَوْلُوا مَعْرُوفَكُمُ الْمُؤْمِنِينَ
“ঈমানদার ব্যক্তি ও ঈমান যেন খুঁটিতে-বাঁধা ঘোড়ার মতো। চক্কর দিতে দিতে তা অবশেষে খুঁটির কাছেই ফিরে আসে। একইভাবে কোনো মুমিন (কখনও কখনও) ভুল করে, আবার ঈমানের দিকেই ফিরে আসে। তাই তোমাদের খাদ্যবস্তু পরহেজগার ব্যক্তিদেরকে খাওয়াও এবং তোমাদের দান-খয়রাত ঈমানদারগণকে দাও।”[৭৩]
আমলে রয়েছে নিরাপত্তা
৬৭. আবূ আমর কাইস ইবনু রাফি' রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কয়েকজন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে সমবেত হলেন। কল্যাণমূলক কথাবার্তা বলতে বলতে তাদের অন্তর গলে গেল। কিন্তু ওয়াকিদ ইবনু হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু চুপ থাকলেন। অন্যরা তাঁকে বললেন, আবুল হারিস, আপনি কিছু বললেন না যে? তিনি বললেন, আপনারা কথা যা বলেছেন যথেষ্ট। অন্যরা বললেন, আমাদের জীবনের শপথ, আপনি কথা বলুন! আপনি তো আমাদের চেয়ে বয়সে ছোটো নন। ওয়াকিদ ইবনু হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি কথা শুনি, কারণ কথা বলায় রয়েছে শঙ্কা। আর আমলের দিকে দৃষ্টি দিই, কারণ আমলে রয়েছে নিরাপত্তা। [৭৪]
কথা-কাজে মিল
৬৮. ইমরান ইবনু আবিল জা'দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “সকলেই ভালো ভালো কথা বলে। তবে যার কথা ও কাজে মিল রয়েছে, সে-ই সফল। আর যার কথা ও কাজে গরমিল থাকে, সে তো নিজেকেই তিরস্কৃত করল।”[৭৫]
অজানা বিষয়ে ফাতওয়া দেওয়ার নিন্দা
৬৯. সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “অনেকেই এমন বিষয়ে পারদর্শী, যে অনুযায়ী তারা নিজেরাই আমল করে না।”[৭৬]
কথা নয়, কাজেই পরিচয়
৭০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "মানুষকে তাদের কথা নয়, কাজ দিয়ে বিচার করো। কারণ, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কথার ব্যাপারে কর্মের দলিল প্রতিষ্ঠা করেন। ওই দলিল তার কথাকে সত্যায়ন করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। (অর্থাৎ, কেউ কোনো কথা বলার পর সে অনুযায়ী কাজ করল কি না, তা আল্লাহ তাআলা দেখেন।) কোনো ভালো কথা শুনলে বক্তাকে কিছুটা সময় দিয়ো। যদি তার কথার সাথে কাজ মিলে যায়, তবে তা কতই না চমৎকার ও চক্ষুশীতলকারী! তাকে ভাই আর বন্ধু বানিয়ে ভালোবাসো। যদি তার কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকে, তা হলে তার আর কোন বিষয়টি তোমাকে ধাঁধায় ফেলছে? তার কোন জিনিসটি তোমার কাছে গোপন থাকছে? তার ব্যাপারে সাবধান! তার থেকে দূরে সরে যেয়ো। বনি আদম যেভাবে ধোঁকা খেয়েছে সে যেন তোমাকে সেভাবে ধোঁকা না দেয়। তোমারও কথা ও কাজ আছে; কথার ওপর কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ো। গোপনীয় আমল আছে, প্রকাশ্য আমলও আছে; এর মাঝে গোপনীয় আমল অগ্রাধিকার পাবে। পার্থিব কর্ম আছে ও পরকালীন কর্ম আছে; অগ্রাধিকার পাবে পরকালীন কর্ম।”[৭৭]
আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেন
৭১. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে বলল, আমাকে উপদেশ দিন। হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বললেন, “আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকামকে সম্মান করো, আল্লাহও তোমাকে সম্মান দেবেন।”[৭৮]
ইলম অনুযায়ী আমল
৭২. হিশাম ইবনু হাসসান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করে, তার খুশু-খুজু-চোখ-জিহ্বা-হাত-সালাত-আলোচনা ও পরহেজগারিতায় (সেই ইলমের) প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। (অর্থাৎ, প্রতিটি কাজ ইলম অনুযায়ী করার চেষ্টা করে)। কোনো ব্যক্তি যখন ইলমের একটি দিক অর্জন করে এবং সে ইলম অনুযায়ী আমল করে, তা হলে তা পুরো দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তা আখিরাতের জন্য ব্যয় করে দেওয়ার চেয়েও বেশি কল্যাণকর হয়।”[৭৯]
কুরআনের দুটি আয়াতই যথেষ্ট
৭৩. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সা'সা[৮০] বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে এই আয়াতগুলো পাঠ করতে শুনলাম :
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
"কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ-কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।”[৮১]
তা শুনে বললাম—“এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি কিছু শুনতে চাই না।”[৮২]
পাপের ব্যাপারে সচেতনতা
৭৪. যাইদ ইবনু আসলাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এক লোক রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, প্রত্যেকেই কি অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা দেখতে পাবে? এবং অণু পরিমাণ অসৎ-কাজ করলে তা-ও দেখতে পাবে? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ'। লোকটি তখন এই কথা বলতে বলতে চলে গেল, হায় হায়! আমার কত গুনাহ! তার কথা শুনে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, آمَن الرَّجُلُ ‘লোকটি নিরাপদ রয়েছে।'”[৮৩]
কুরআনের দুটি আয়াতই উপদেশ হিসেবে যথেষ্ট
৭৫. মা'মার থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ “কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ-কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।" আয়াত দুটি নাযিল হওয়ার পর একজন মুসলিম বললেন, “এটাই আমার জন্য যথেষ্ট! কারণ, অণু পরিমাণ সৎকাজ ও অসৎ-কাজ করলে তা দেখতে পাব। আমার আর কোনো উপদেশের প্রয়োজন নেই।”[৮৪]
পাপকাজের কারণে ইলম ভুলে যাওয়া
৭৬. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি ওই ব্যক্তির কথা ভাবি, যে পাপের কারণে আগের অর্জিত ইলম ভুলে গেছে।”[৮৫]
কুরআন ভুলে যাওয়া ভয়াবহ বিপদ
৭৭. দাহ্হাক ইবনু মুযাহিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআন শেখার পর তা ভুলে যাওয়া শুধু পাপকাজেরই ফল। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ “তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।”[৮৬] আর কুরআন ভুলে যাওয়া একটি ভয়াবহ বিপদ।[৮৭]
পাপকাজের কারণে রিযক থেকে বঞ্চিত করা হয়
৭৮. সাওবান রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
“মানুষ তার পাপকর্মের কারণে রিযক থেকে বঞ্চিত হয়।”[৮৮]
আমলে মিথ্যা কথার কুপ্রভাব
৭৯. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, “আমি কোনো মিথ্যা বললে আমার আমলে সেটা ধরা পড়ে।”[৮৯]
নিজেকে চেনার উপায়
৮০. শুআইব ইবনু আবী সাঈদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, কীভাবে জানব যে আমি নিজে কেমন? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
إِذَا رَأَيْتَ كُلَّمَا طَلَبْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الْآخِرَةِ وَابْتَغَيْتَهُ يُسَرَ لَكَ، وَإِذَا أَرَدْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَابْتَغَيْتَهُ عُسْرَ عَلَيْكَ، فَاعْلَمْ أَنَّكَ عَلَى حَالٍ حَسَنَةٍ. فَإِذَا رَأَيْتَ كُلَّمَا طَلَبْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الْآخِرَةِ وَابْتَغَيْتَهُ عُسْرَ عَلَيْكَ، وَإِذَا طَلَبْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَابْتَغَيْتَهُ يُسْرَ لَكَ، فَأَنْتَ عَلَى حَالٍ قَبِيحَةٍ
"যদি তুমি এমন অবস্থায় থাকো যে, তুমি আখিরাতের কোনো বিষয় চাইলে তা তোমার জন্য সহজ করে দেওয়া হয় এবং দুনিয়াবি কোনো বিষয় চাইলে তা তোমার জন্য কঠিন করে দেওয়া হয়, তবে তুমি উত্তম অবস্থায় আছ। আর যদি এমন অবস্থায় থাকো যে, আখিরাতের কোনো বিষয় চাইলে তা তোমার জন্য কঠিন করে দেওয়া হয় এবং দুনিয়াবি কোনো বিষয় চাইলে তোমার জন্য তা সহজ করে দেওয়া হয়, তবে তুমি নিকৃষ্ট অবস্থায় আছ।”[৯০]
জিহ্বাকে সংযত রাখা
৮১. হুমাইদ ইবনু হিলাল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দাও। অর্থহীন বিষয়ে কখনও কথা বোলো না। যেভাবে টাকা-পয়সা সংরক্ষণ করো, সেভাবে নিজের জিহ্বা সংরক্ষণ করো।” [৯১]
ভালো কাজের মর্যাদা
৮২. আল্লাহ তাআলা বলেন, إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ "তাঁর কাছে শুধুমাত্র পবিত্র কথাই ওপরের দিকে আরোহণ করে এবং সৎকাজ তাকে ওপরে ওঠায়।"[৯২]
আবুস সিনান শাইবানি বলেন, আমি দাহহাক ইবনু মুযাহিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “সৎকাজ পবিত্র কথাকে ওপরের দিকে ওঠায়। "[৯৩]
ভালো কথার সঙ্গে ভালো কাজ
৮৩. মা'মার থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “সৎকাজ ভালো কথাকে আল্লাহর দিকে উঠিয়ে নেয়। কিন্তু কারও কথা যদি ভালো হয় আর কাজ খারাপ হয়, তবে ওই কথাকে কাজের ওপর ছুড়ে ফেলা হয়। কারণ, কথার চেয়ে কাজ করাই অধিক সঙ্গত।”
মা'মার বলেন, কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ (এবং সৎকাজ তাকে ওপরে ওঠায়)[৯৪] -এর অর্থ হলো, "আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির সৎকাজ কবুল করে নেন।"[৯৫]
টিকাঃ
[৬৬] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৬৯, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৬৫, মাওকুফ।
[৬৮] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ৭/১২৯, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৬৯] বুখারি, ৫৯৫৯।
[৭০] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৭১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৭২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৭৩] আহমাদ, ৩/৫৫, সনদ দঈফ।
[৭৪] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৭৫] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৬০, হাসান লি-গাইরিহি, মাওকুফ।
[৭৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৭৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৬-৭, মাকতু।
[৭৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫২, মাওকুফ, মুনকাতি।
[৭৯] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৬১, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৮০] ফারাযদাকের দাদা অথবা চাচা ছিলেন তিনি।
[৮১] সূরা যিলযাল: ৭-৮।
[৮২] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/৫২১, এই হাদীসের রাবীগণ সিকাহ।
[৮৩] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৩৮১, মুরসাল।
[৮৪] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৩৮২, মুরসাল।
[৮৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/১৯৯, মাওকুফ।
[৮৬] সূরা শুরা: ৩০।
[৮৭] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ৯৫, সনদ হাসান, মুরসাল।
[৮৮] ইবনু হিব্বান, সহীহ, ১০৯০, সনদ হাসান।
[৮৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৯০] হাদীসটি মুরসাল। এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে।
[৯১] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৫২, সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[৯২] সূরা ফাতির: ১০।
[৯৩] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৫/৩৪৬, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৯৪] সূরা ফাতির: ১০।
[৯৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
📄 সাহাবি ও তাবিয়িদের সালাত
চতুর্থ অনুচ্ছেদ
সাহাবি ও তাবিয়িদের সালাত
রহমতের দুআ
৮৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ قَوْمًا يَحْسَبُهُمُ النَّاسُ مَرْضَى، وَمَا هُمْ بِمَرْضَى
“আল্লাহ তাআলা ওই কওমকে রহম করুন, যাদেরকে মানুষ অসুস্থ ভাবে, অথচ তারা অসুস্থ নয়।”[১৬]
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা (অত্যধিক) ইবাদাতে মশগুল থাকে (যার ফলে মানুষ তাদের অসুস্থ মনে করে)।”
মুনাফিক রাত জেগে ইবাদাত করতে পারে না
৮৫. কাতাদা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “(আমাদের সময়) একটি কথা বলা হতো, “মুনাফিক কখনও (ইবাদাতের মাধ্যমে) রাত্রি জাগরণ করতে পারে না।”[১৭]
তামীম দারী রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সালাত
৮৬. মাসরুক রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন, “এটা ছিল তোমার ভাই তামীম দারী রদিয়াল্লাহু আনহু-এর (সালাত পড়ার) জায়গা। এক রাতে তিনি ভোর বা ভোর হয়ে যায় যায় এমন সময় পর্যন্ত রুকু, সাজদা আর আল্লাহর কিতাব থেকে এই আয়াত পড়ে পড়ে কাঁদছিলেন :
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
“যেসব লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করে নিয়েছে যে, আমি তাদেরকে এবং মুমিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ভুক্ত করে দেব যে তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যাবে? তারা যে ফয়সালা করে তা অত্যন্ত জঘন্য।”[৯৮]-[৯৯]
মাসরুক রহিমাহুল্লাহ-এর সালাত
৮৭. মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মাসরুক রহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী বলেছেন, “মাসরুককে কখনও কখনও এমন অবস্থায় পাওয়া যেত যে, দীর্ঘ সালাত পড়ার কারণে তাঁর পা দুটি ফুলে গেছে। আল্লাহর শপথ! তার পেছনে বসলে আমার এত মায়া লাগত যে, আমি কেঁদেই ফেলতাম।”[১০০]
যারা নিজেদের জন্য কাঁদে
৮৮. ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর বলেন, কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ একজন লোকের কুরআন তিলাওয়াত অথবা দুআ-যিকর শুনছিলেন, (তখন লোকটি কাঁদছিল)। তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর যেতে যেতে বললেন, “কিয়ামাত হওয়ার আগেই যারা নিজেদের জন্য কাঁদে, তাদের কল্যাণ হোক।”[১০১]
সালাত পড়ে রাত কাটানো
৮৯. উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “সবার চোখ ঘুমে অবশ হয়ে এলে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু সালাতে দাঁড়াতেন। আমি মৌমাছির গুনগুনের মতো তাঁর (কুরআন তিলাওয়াতের) আওয়াজ শুনতাম। এভাবে ভোর হয়ে যেত।”[১০২]
আখিরাতের ব্যাপারে সাহাবিদের ভয়
৯০. আবুল আহওয়াস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কেউ যখন (সাহাবিদের) তাঁবুর দরজায় গিয়ে দাঁড়াত, ওখানে মৌমাছির গুনগুনের মতো (যিকর-আযকারের) আওয়াজ শুনতে পেত। (এখনকার) লোকদের কী হলো যে এরা (আখিরাতের বিষয়ে) নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে, যে বিষয়ে পূর্ববর্তীরা ছিলেন ভীতসন্ত্রস্ত?”[১০৩]
মর্যাদায় তারতম্য
৯১. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা একটি দলকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন; তাদেরকে নিয়ামাত দান করবেন এবং তারা ভোগ করবে। আরেক-দল লোক মর্যাদায় তাদের ওপরের স্তরে থাকবে। এরা তাদেরকে দেখে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, ওরা আমাদের চেয়ে বেশি মর্যাদা পেল যে? এরা তো আমাদের ভাই, আমরা তো তাদের সাথেই ছিলাম। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, অসম্ভব! তোমরা যখন পরিতৃপ্ত হতে তখন তারা ক্ষুধার্ত থাকত, যখন তোমরা তৃষ্ণা নিবারণ করতে তখন তারা পিপাসার্ত থাকত, যখন তোমরা ঘুমিয়ে থাকতে তখন তারা সালাতে দাঁড়াত, যখন তারা (আমলের কারণে) ওপরের দিকে উঠত তখন তোমরা (গোনাহের কারণে) নিচের দিকে নামতে।"[১০৪]
জান্নাতে মর্যাদার তারতম্য
৯২. আবুল মুতাওয়াক্কিল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الدَّرَجَةَ فِي الْجَنَّةِ فَوْقَ الدَّرَجَةِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيُرْفَعُ بَصَرَهُ فَيَلْمَعُ لَهُ بَرْقُ يَكَادُ يَخْطَفُ بَصَرَهُ، فَيُفَزَعُ لِذَلِكَ فَيَقُولُ: مَا هَذَا؟ فَيُقَالُ لَهُ: هَذَا نُورُ أَخِيكَ فُلَانٍ، فَيَقُولُ: أَخِي فُلَانٌ، كُنَّا نَعْمَلُ فِي الدُّنْيَا جَمِيعًا، وَقَدْ فُضْلَ عَلَى هَكَذَا؟ قَالَ: فَيُقَالُ لَهُ: إِنَّهُ كَانَ أَفْضَلَ مِنْكَ عَمَلًا، ثُمَّ يُجْعَلُ فِي قَلْبِهِ الرِّضَا حَتَّى يَرْضَى
"জান্নাতে মর্যাদার (বিভিন্ন) স্তর থাকবে, যেমন আসমান ও জমিনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জান্নাতে কেউ ওপরের দিকে তাকাবে, তার সামনে এমন বিজলি চমকে উঠবে যে তার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। সে ভয় পেয়ে যাবে এবং বলবে, এটা কী? তাকে বলা হবে, এটা তোমার অমুক ভাইয়ের আলো। সে বলবে, আমার অমুক ভাই, দুনিয়াতে তো আমরা একসঙ্গে আমল করতাম। আজ তাকে আমার চেয়ে এতবেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে? তাকে বলা হবে, আমলের ক্ষেত্রে সে তোমার চেয়ে উত্তম ছিল। এরপর তার অন্তরে সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে দেওয়া হবে, ফলে সে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।”[১০৫]
টিকাঃ
[১৬] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।
[১৭] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৯৮] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ২১।
[৯৯] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৮২, মাসরুক পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[১০০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১০১] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৫৩, মাওকুফ এবং এর রাবীগণ সিকাহ।
[১০২] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৫৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১০৩] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৪৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১০৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/২৪৭, সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[১০৫] হাদীসটির সবগুলো সনদ সহীহ, মুরসাল।
📄 নবিজির ইবাদাত
পঞ্চম অনুচ্ছেদ
নবিজির ইবাদাত
নবিজির সালাত
৯৩. হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি রাতের বেলা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে সালাত পড়লেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত শুরু করার পর বললেন,
اللَّهُ أَكْبَرُ ذُو الْمَلَكُوتِ، وَالْجَبَرُوتِ، وَالْكِبْرِيَاءِ، وَالْعَظَمَةِ
‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, যিনি সকল রাজত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী, যিনি বড়োত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী।’
এরপর সূরা বাকারা পাঠ করলেন। তারপর রুকূ করলেন, রুকূ ছিল তাঁর প্রায় কুরআন পাঠের সমান। রুকূতে তিনি বললেন, سُبْحَانَ رَبِّ الْعَظِيمِ ‘আমার মহান রবের মহিমা প্রকাশ করছি।’ তারপর দাঁড়ালেন এবং রুকূর সমান দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর সাজদায় গিয়ে বললেন, سُبْحَانَ رَبِّ الْأَعْلَى ‘আমার সমুন্নত রবের মহিমা প্রকাশ করছি।’ সাজদা থেকে মাথা তুললেন এবং দুই সাজদার মাঝখানে সাজদার সমান (সময়) অবস্থান করলেন এবং বললেন, رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي ‘রব আমার, আমাকে ক্ষমা করে দাও! রব আমার, আমাকে ক্ষমা করে দাও!’ এভাবে তিনি সূরা বাকারা, সূরা আল ইমরান, সূরা নিসা, সূরা মাইদা ও সূরা আনআম পাঠ করলেন।”[১০৬]
শু'বা বলেন, বর্ণনাকারী সূরা মাইদা নাকি সূরা আনআম বলেছিলেন, তা ঠিক মনে নেই।
ভোরে যেমন থাকতেন নবিজি
৯৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলতেন, “ভোরবেলায় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা কখনও থাকত উৎফুল্ল, উজ্জ্বল এবং মন থাকত প্রশান্ত; আবার কোনো কোনো দিন ভোরে তাঁর চেহারায় থাকত ঘুমঘুম ভাব। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে ভালো জানেন।"[১০৭]
ভারসাম্যপূর্ণ সালাত
৯৫. ইয়াযীদ রাকাশি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালাত ছিল সমান সমান, ভারসাম্যপূর্ণ।"[১০৮]
সালাতে একটি আয়াতের পুনরাবৃত্তি
৯৬. আবুল মুতাওয়াক্কিল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক রাতে সালাতে দাঁড়ালেন এবং কুরআনের একটি আয়াতই পুনরাবৃত্তি করতে থাকলেন।[১০৯]
নবিজির সালাত পর্যবেক্ষণ
৯৭. ইসহাক ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলেছেন, “এক রাতে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সালাত দেখতে আমার ইচ্ছে হলো। সে রাতে তিনি ইশার সালাত পড়ার পর অল্প কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেন। এরপর উঠে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারলেন। তারপর হাওদার পেছন দিকে গিয়ে ওখান থেকে তাঁর মিসওয়াক নিলেন। দাঁত মেজে ওজু করে (সালাতে দাঁড়ালেন)। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, তিনি রুকূ দিলেন না, দাঁড়িয়েই থাকলেন, এ অবস্থায় রাতের কত অংশ যে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। একসময় ঘুম আমার চোখে পাহাড়ের মতো চেপে বসল।”[১১০]
নবিজির রাত্রিকালীন যিকর
৯৮. রবীআ ইবনু কা'ব আসলামি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুজরার পাশে রাত্রিযাপন করলাম। শুনতে পেলাম যে, তিনি রাতে উঠে (সালাতের মধ্যে) দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে বললেন سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আল্লাহ ত্রুটিমুক্ত, তিনি মহাবিশ্বের শাসক'; তারপর দীর্ঘক্ষণ বললেন سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ 'আল্লাহ ত্রুটিমুক্ত, আর প্রশংসা কেবল তাঁরই'।"[১১১]
পায়ের পাতা ফেটে রক্ত বেরোল
৯৯. মুগীরা ইবনু শু'বা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (একবার তাহাজ্জুদের সালাতে) এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন যে তাঁর দুই পায়ের পাতা ফেটে গিয়ে রক্ত বের হলো। তাঁকে বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। (তবুও কেন এমনটা করেন?) জবাবে তিনি বললেন, أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا 'আমি কি আল্লাহর একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?'”[১১২]
সালাতে দাঁড়িয়ে ক্রন্দন
১০০. মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, "আমি একবার নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলাম, তখন তিনি সালাত পড়ছিলেন আর পাত্রে (গরম পানি) ফোটার মতো শব্দ হচ্ছিল তাঁর বুকে। (অর্থাৎ, তিনি কাঁদছিলেন)।"[১১৩]
কুরআন তিলাওয়াত শুনে কান্না
১০১. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, اقْرَأْ عَلَيَّ 'আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও।' আমি বললাম, আপনার সামনে আমি কুরআন পড়ব, অথচ তা আপনার ওপরই নাযিল হয়েছে। তিনি বললেন, إِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي 'আমি তা অন্যের মুখে শুনতে ভালোবাসি।' তারপর আমি সূরা নিসা পাঠ করতে শুরু করলাম। যখন আমি এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলাম :
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
“তবে কেমন হবে যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের বিরুদ্ধে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব এদের বিরুদ্ধে।”[১১৪]
তখন দেখলাম, তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। তিনি বললেন, ‘হাসবুক’ ‘এবার থামো।”[১১৫]
কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে যাওয়া
১০২. খালিদ ইবনু ইয়াসার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “একবার আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন, তিনি তখন কাঁদলেন এবং তাঁর কান্না তীব্র হলো। এরপর তিনি মাথা ঢেকে দাঁড়ালেন এবং তাঁর ঘরে চলে গেলেন।"[১১৬]
সালাতে হাই তুলতে দেখা যায়নি
১০৩. ইয়াযীদ ইবনুল আসাম্ম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কখনও সালাতে হাই তুলতে দেখা যায়নি।"[১১৭]
মুত্তাকিদের থেকে তিলাওয়াত শোনা
১০৪. তাউস রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا يُسْمَعُ الْقُرْآنُ مِنْ رَجُلٍ أَشْهَى مِنْهُ مِمَّنْ يَخْشَى اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তার কাছ থেকে কুরআন তিলাওয়াত শোনা সবচেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত।”[১১৮]
যার তিলাওয়াত সুমধুর
১০৫. ইমাম ইবনু শিহাব যুহরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এই হাদীস পৌঁছেছে যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَحْسَنِ النَّاسِ صَوْتًا بِالْقُرْآنِ، الَّذِي إِذَا سَمِعْتَهُ يَقْرَأُ، أُرِيتَ أَنَّهُ يَخْشَى اللَّهَ
"কারও তিলাওয়াত শুনলে দেখবে-আল্লাহকে যে যথাযথ ভয় করে-তার তিলাওয়াতই সুমধুর হয়ে থাকে।"[১১৯]
স্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত
১০৬. মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাযি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হরফে হরফে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।” (অর্থাৎ, প্রতিটি হরফ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন)[১২০]
প্রতি হরফ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ
১০৭. উম্মু সালামা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরআন তিলাওয়াতের প্রশংসায় বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি হরফ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন।”[১২১]
সুযোগের সদ্ব্যবহার
১০৮. হাকীম ইবনু উমাইর রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ فُتِحَ لَهُ بَابٌ مِنَ الْخَيْرِ فَلْيَنْتَهِزْهُ، فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَتَى يُغْلَقُ عَنْهُ
"যার জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে সে যেন (কল্যাণকে) ভালোভাবে ব্যবহার করে। কারণ সে জানে না কখন তার জন্য তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।"[১২২]
রাত কাটে ঘুমিয়ে, দিন কাটে খেয়ে
১০৯. খাইসামাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “কেউ কেউ রাতের বেলায় মৃতদেহ এবং দিনের বেলায় কুকুরের মতো (আচরণ করে)।”[১২৩]
একাগ্রতার সঙ্গে সালাত আদায়
১১০. সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু যখন সালাতে দাঁড়াতেন, তখন তাকে ফেলে দেওয়া কাপড়ের মতো মনে হতো।” (তিনি এতটাই একাগ্র হয়ে সালাত আদায় করতেন।)[১২৪]
বিনম্রভাবে সালাত আদায়
১১১. আবু উবাইদা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু যখন সালাতে দাঁড়াতেন, দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর ও হাত সংযত রাখতেন।”[১২৫] (অত্যন্ত খুশু-খুযুর সঙ্গে সালাত আদায় করতেন।)
আল্লাহ যার কথা শোনেন এবং যার কথা শোনেন না
১১২. দাউদ ইবনু আবী সালিহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি সালাতের মধ্যে মনোযোগ-সহকারে (তিলাওয়াত) শোনে, তার কথাও শোনা হয়; এবং যে তা উপেক্ষা করে, তার কথাও উপেক্ষা করা হয়।”[১২৬]
আল্লাহ যার প্রতি মনোযোগ দেন
১১৩. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “বান্দা যখন সালাতে দাঁড়ায় এবং তাতে খুব মনোযোগ দেয়, আল্লাহ তাআলাও তার প্রতি মনোযোগ দেন। আর সালাতে অমনোযোগী হলে আল্লাহ তাআলাও তার প্রতি অমনোযোগী হন।”[১২৭]
টিকাঃ
[১০৬] তায়ালিসি, মুসনাদ, ৪১৬, এই হাদীসের রাবীগণ সিকাহ।
[১০৭] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।
[১০৮] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।
[১০৯] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত হয়েছে। আলবানি বলেছেন, হাদীসটির সনদ সহীহ।
[১১০] সনদ সহীহ, মুরসাল।
[১১১] মুসলিম, ৪৮৯।
[১১২] হাদীসটি সহীহ। বুখারি ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
[১১৩] আবূ দাউদ, ৮৯০, সনদ সহীহ।
[১১৪] সূরা নিসা: ৪১।
[১১৫] হাদীসটি সহীহ।
[১১৬] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১১৭] সনদ সহীহ, মুরসাল।
[১১৮] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৭/১৭০, মুরসাল।
[১১৯] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।
[১২০] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১২১] আবূ দাউদ, ১৪৫৩, হাসান।
[১২২] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১২৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/১৩০, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১২৪] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২/১৩৬, মাওকুফ।
[১২৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২/১৩৬, মাওকুফ।
[১২৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১২৭] সনদ সহীহ, মাওকুফ。