📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মগ্ন হওয়া

📄 আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মগ্ন হওয়া


দুটি নিয়ামাতকে গুরুত্ব দেওয়া
০১. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
“দুটি নিয়ামাত (কাজে লাগানোর) ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে। নিয়ামাত দুটি হলো সুস্থতা ও অবসর।"[১]

পাঁচটি বড়ো নিয়ামাত
০২. উমর ইবনু মাইমূন আওদী রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন,
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ، وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ
“পাঁচটি বিষয় আসার আগে পাঁচটি বিষয়কে মূল্যায়ন করো : ১. বার্ধ্যকের পূর্বে যৌবনকে; ২. অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে; ৩. দরিদ্রতার পূর্বে স্বচ্ছলতাকে; ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।”[২]

চারটি উপদেশ
০৩. গুনাইম ইবনু কাইস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “ইসলামের শুরুর দিকে একে অপরকে উপদেশ দিতে গিয়ে আমরা চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা বলতাম : যৌবনে কাজ করো বার্ধ্যকের জন্য, অবসরে কাজ করো ব্যস্ত সময়ের জন্য, সুস্থ অবস্থায় কাজ করো অসুস্থকালীন সময়ের জন্য, আর জীবিত অবস্থাতেই আমল করো মৃত্যু (-পরবর্তী সময়ের) জন্য।”[৩]

দুনিয়ায় রয়েছে বিপদ-আপদ
০৪. আবূ মূসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “দুনিয়ার জীবনে আমরা যন্ত্রণাদায়ক বিপদ-আপদ অথবা ফিতনার অপেক্ষায় থাকি।”[৪]

দুনিয়ার উপমা
০৫. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “দুনিয়ার উপমা দুনিয়াই।”[৫]

বিপজ্জনক সচ্ছলতা
০৬. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا يَنْتَظِرُ أَحَدُكُمْ إِلَّا غِنِّى مُطْعِيًا ، أَوْ فَقْرًا مُنْسِيًا، أَوْ مَرَضًا مُفْسِدًا، أَوْ هَرَمًا مُفْنِدًا، أَوْ مَوْتًا مُجْهِرًا، أَوِ الدَّجَّالَ، فَالدَّجَّالُ شَرُّ غَابِبٍ يُنْتَظَرُ، أَوِ السَّاعَةَ، وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ.
“তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন সচ্ছলতা কামনা করে, যা তাকে পাপাচারে লিপ্ত করবে। অথবা এমন দরিদ্রতা (কামনা করে), যা আল্লাহকে ভুলিয়ে দেবে। অথবা এমন ব্যাধি, যা তাকে নিঃশেষ করে দেবে। অথবা এমন বার্ধক্য, যা হিতাহিত-জ্ঞান শূন্য করে ফেলবে। অথবা এমন মৃত্যু, যা হঠাৎ আগমন করবে। অথবা দাজ্জালের (ফিতনা কামনা করে)। আর দাজ্জাল তো আসন্ন অদৃশ্য বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। অথবা কিয়ামাত (কামনা করে), অথচ কিয়ামাত হলো অত্যন্ত কঠিন ও তিক্ত।”[৬]

গড়িমসি ও জীবনের প্রতি লালসা
০৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলতেন, “হে আদম-সন্তান, গড়িমসি কোরো না। কারণ তুমি আজ জীবিত আছ, আগামীকাল হয়তো থাকবে না। যদি আগামীকাল বেঁচে থাকো, তবে আরও বিচক্ষণ হও, যেমন আজ হয়েছ। তা না হলে আজ যে ঢিলেমি করছ তার জন্য পস্তাতে হবে।” তিনি আরও বলতেন, “আমি এমন মানুষদের সাক্ষাৎ পেয়েছি যারা দীনার দিরহামের চেয়েও নিজের হায়াতের ব্যাপারে অধিক যত্নশীল ছিলেন।”[৭]

ধৈর্য ও স্থিরতা
০৮. আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যে ব্যক্তি (অধৈর্য হয়ে) তালাশ করে সে হারায়। আর যে ব্যক্তি বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে না সে অক্ষম হয়ে পড়ে।”[৮]

উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি ঘৃণা
০৯. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলতেন, “কত মানুষ আজকের দিনটির অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু তা পায়নি। কত মানুষ আগামীকালের অপেক্ষায় রয়েছে, কিন্তু হয়তো তা পাবে না। যদি মৃত্যু ও তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করো, তবে অবশ্যই উচ্চাশা ও তার প্রতারণাকে ঘৃণা করবে।”[৯]

গড়িমসি থেকে সতর্কতা
১০. আবূ ইসহাক রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "আবদু কাইস গোত্রের এক ব্যক্তিকে তার অসুস্থতার সময় বলা হলো, আমাদের উপদেশ দিন। লোকটি বলল, খবরদার! কখনোই গড়িমসি কোরো না।” [১০]

মৃত্যুর পূর্বেই সময়কে কাজে লাগানো
১১. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার শরীরে হাত রেখে বলেছেন,
كُنْ كَأَنَّكَ غَرِيبٌ فِي الدُّنْيَا، أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ، وَعُدَّ نَفْسَكَ فِي أَهْلِ الْقُبُورِ
"দুনিয়াতে অচেনা অথবা মুসাফিরের মতো থেকো। নিজেকে কবরবাসীদের একজন মনে কোরো।”[১১]
ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা আরও বলেছেন, "যখন ভোর হবে তখন সন্ধ্যা যাপন করার চিন্তা কোরো না এবং যখন সন্ধ্যা হবে তখন ভোর যাপন করার চিন্তা কোরো না। অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে কাজে লাগাও, মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে কাজে লাগাও। হে আল্লাহর বান্দা, তুমি তো জানো না, আগামীকাল তোমার কী অবস্থা হবে।”

দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি থেকে উপদেশ গ্রহণ
১২. জারীর ইবনু হাযিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “তুমি যদি এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাউকে দেখতে পাও যার ধৈর্য নেই (তবে তার কাছ থেকে উপদেশ নিয়ো না)। (শুধু এমন ব্যক্তির কাছ থেকেই উপদেশ নেবে) যিনি একইসাথে ধৈর্যশীল এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। "[১২]

সাধ্যায়নুযায়ী সৎকাজ করা
১৩. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ
"তাদের যা দান করার তা দান করে।" [১৩]
জাফর ইবনু হাইয়ান বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তাদের যা দান করার সামর্থ্য রয়েছে তা তারা দান করে।” আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ
"এবং তাদের অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত।" [১৪]
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তারা সাধ্যানুযায়ী সৎকাজ ও নেক আমল করে এবং পাশাপাশি এই আশঙ্কা করে যে, এই সৎকাজ ও নেক আমল তাদেরকে প্রতিপালকের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না।" [১৫]

অহংকারবশত প্রতিশোধ নেওয়ার পরিণতি
১৪. উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ ইয়াযীদ ইবনু আবদিল মালিকের উদ্দেশে লেখেন: “অবহেলা ও অহংকারের বশে প্রতিশোধ নিতে যেয়ো না। তা হলে তোমার অপরাধ ক্ষমা করা হবে না এবং জবাবদিহিও করতে পারবে না। যাকে তোমার উত্তরাধিকারী বানাবে, সে তোমার প্রশংসা করবে না। যার কাছেই যাবে, কেউই তোমার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কোনোরূপ আপত্তি শুনবে না। আসসালামু আলাইকুম।”[১৬]

আল্লাহর দিদারে মুমিনের সুখ
১৫. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ ব্যতীত মুমিনের কোনো প্রশান্তি নেই। আর যার প্রশান্তি আল্লাহর সাক্ষাতে, সে যেন তা পেয়েই গেল।”[১৭]

আমলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
১৬. জারীর ইবনু হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “হে লোকসকল, তোমরা আমলের ব্যাপারে ধারাবাহিকতা বজায় রেখো। কারণ, মুমিনের আমলের সমাপ্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা মৃত্যু ছাড়া আর কোনো-কিছুকে নির্ধারণ করেননি।”[১৮]

আমৃত্যু ইবাদাত
১৭. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
“ইয়াকীন চলে আসা পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদাত করো।”[১৯]
মুবারাক ইবনু ফুদালা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় (ইয়াকীন) শব্দটির অর্থ বলেছেন, মৃত্যু।” [২০]

সুযোগ দিলে শয়তান পেয়ে বসে
১৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, "শয়তান যখন দেখে যে, তুমি আল্লাহর আনুগত্যে (ইবাদাতে) ধারাবাহিকতা বজায় রাখছ তখন সে বারবার তোমাকে কামনা করে। আবারও যখন দেখে যে তুমি ধারাবাহিকতা বজায় রাখছ, তখন সে বিরত হয় এবং তোমাকে ত্যাগ করে। কিন্তু তুমি যদি সামান্য এদিক-সেদিক করো তবে সে তোমাকে পেয়ে বসে।”[২১]

প্রতিপালকের দরজায় কড়া নাড়া
১৯. মুররা ইবনু শুরাহবীল থেকে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “বান্দা যতক্ষণ সালাতে থাকে ততক্ষণ সে তার প্রতিপালকের দরজায় কড়া নাড়ে; আর যে বান্দা তাঁর প্রতিপালকের দরজায় অবিরত কড়া নাড়তে থাকে তার জন্য ওই দরজা খুলে দেওয়া হয়।”[২২]

আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করার অর্থ
২০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করো।”[২৩]
মুররা ইবনু শুরাহবীল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যথার্থভাবে ভয় করার অর্থ হলো সব সময় আল্লাহর আনুগত্য করা, কখনও তাঁর অবাধ্য না হওয়া; আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া; আল্লাহর যিকর করা আর তাঁকে ভুলে না যাওয়া।”[২৪]

রাতের সালাতে ফজিলত বেশি
২১. মুররা ইবনু শুরাহবীল বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “প্রকাশ্যে দান করার চেয়ে গোপনে দান করার ফজিলত যেমন বেশি, দিবসের (নফল) সালাতের চেয়ে রাতের (নফল) সালাতের ফজিলত তেমনই বেশি।” [২৫]

সম্পদের প্রতি ভালোবাসার অর্থ
২২. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ
"সম্পদের ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও দান করে।” [২৬]
মুররা ইবনু শুরাহবীল বলেন, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “কৃপণ, হিসেবী, সচ্ছলতার আকাঙ্ক্ষা কিংবা দরিদ্রতার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও দান করা।” [২৭]

আল্লাহর শ্রমিকের শক্তি
২৩. তাউস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন : আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহ আনহুমা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার পর একবার এক গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তখন পাথর ভাঙছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এরা কী করছে? সঙ্গী জবাব দিলেন, পাথর ভাঙছে। ইবনু আব্বাস তখন বললেন, আল্লাহ তাআলার শ্রমিকেরা এদের চাইতেও অনেক বেশি শক্তিশালী।[২৮]

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জান্নাত পাওয়া যাবে না
২৪. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا رَأَيْتُ مِثْلَ النَّارِ نَامَ هَارِبُهَا، وَلَا مِثْلَ الْجَنَّةِ نَامَ طَالِبُهَا
"জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী কিংবা জান্নাত প্রত্যাশাকারী এমন কাউকেই আমি দেখিনি, যে কিনা ঘুমিয়ে আছে।”[২৯]

জান্নাত পেতে হলে
২৫. হারিম ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী কিংবা জান্নাত প্রত্যাশাকারী-এমন কাউকেই আমি দেখিনি, যে কিনা ঘুমিয়ে আছে।”[৩০]

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্না
২৬. ঈসা ইবনু উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমর ইবনু উতবা রহিমাহুল্লাহ একবার ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন এবং রাতের বেলা একটি গোরস্থানের পাশে থামলেন। বললেন, হে কবরবাসীরা, সহীফার (কুরআন মাজীদের) পৃষ্ঠাগুলো গুটিয়ে ফেলা হয়েছে এবং (তোমাদের) সমস্ত আমল উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ কথা বলে তিনি কাঁদলেন। পায়ের ওপর ভর করে কাটিয়ে দিলেন সারা রাত। ভোর হলে সেখান থেকে ফিরে এসে ফজরের সালাতে অংশ নিলেন।[৩১]

জীবদ্দশাতেই আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা
২৭. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর একজন আযাদকৃত দাস থেকে বর্ণিত আছে : আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা কোথাও যাওয়ার সময় একটি গোরস্থান দেখতে পেলেন। তা দেখে বাহন থেকে নেমে দুই রাকআত সালাত আদায় করলেন। তাঁকে বলা হলো, এমন কাজ তো এর আগে কখনও আপনি করেননি। তিনি জবাব দিলেন, “কবরবাসীদের সাথে আমার কী পার্থক্য, তা নিয়ে ভাবলাম কিছুক্ষণ। তাই দুই রাকআত সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য পেতে চাইলাম।”[৩২]

মৃত্যুর আগ মুহূর্তে
২৮. ইসমাঈল ইবনু উবাইদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, উন্মুদ দারদা বলেন, আবুদ দারদা বেহুঁশ হয়ে কিছুক্ষণ পর আবার জ্ঞান ফিরে পেলেন। তাঁর ছেলে বিলাল তাঁর কাছেই ছিল। তিনি (বিলালকে) বললেন, যাও, এখান থেকে চলে যাও। তারপর বললেন, এমন শয্যা আর কার হবে এবং সময় আর কার হবে? এরপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন—
وَنُقَلِّبُ أَفْبِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
"প্রথম বারে যেমন তারা এর প্রতি ঈমান আনেনি ঠিক তেমনিভাবেই আমি তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি এদেরকে এদের বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার মধ্যে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দিচ্ছি।”[৩৩]
তারপর বললেন, তোমরা তা অস্বীকার করছ। আবার তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে আগের কথাগুলোই বলতে লাগলেন। এসব কথা বলতে বলতেই মৃত্যুবরণ করলেন তিনি।” [৩৪]

মৃত্যুর পর সকলেই আফসোস করে
২৯. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ أَحَدٍ يَمُوتُ إِلَّا نَدِمَ، قَالُوا: وَمَا نَدَامَتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ مُحْسِنًا نَدِمَ أَنْ لَا يَكُونَ ازْدَادَ، وَإِنْ كَانَ مُسِيئًا نَدِمَ أَنْ لَا يَكُونَ نَزَعَ
“প্রত্যেকেই মৃত্যুর পর অনুতপ্ত হয়।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কোন বিষয় নিয়ে সে অনুতাপ করে? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “যদি নেক আমলকারী হয় তবে কেন আরও বেশি নেক আমল করল না তার জন্য অনুতপ্ত হয়। আর যদি বদ আমলকারী হয় তবে কেন বদ আমল থেকে বিরত থাকল না তার জন্য অনুতপ্ত হয়।”[৩৫]

অধিক আমলের আকাঙ্ক্ষা
৩০. মুহাম্মাদ ইবনু আবী উমায়রাহ রদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন সাহাবি। তিনি বলেন, “যদি কোনো বান্দা জন্মের পর থেকে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে মাথা নত করে থাকে, তবুও তা কিয়ামাতের দিন তার কাছে তুচ্ছ মনে হবে। তার মনে হবে, 'ইশ! যদি দুনিয়ায় ফিরে গিয়ে আরও আমল করতে পারতাম, তা হলে আমার প্রতিদান আরও বেড়ে যেত।”[৩৬]

আগামীকালের জন্য ফেলে রেখো না
৩১. হুরাইছ ইবনু কাইস রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ভালো কাজ করতে চাইলে আগামীকালের জন্য তা ফেলে রেখো না; যদি আখিরাতের কাজে থাকো তবে যতক্ষণ সম্ভব তাতেই মগ্ন থাকো; দুনিয়াবি কাজে থাকলে তা দ্রুত সেরে ফেলো; সালাতরত অবস্থায় শয়তান তোমাকে ধোঁকা দিতে পারে, তাই সালাতকে দীর্ঘায়িত করো।”[৩৭]

মনোযোগসহ শোনা
৩২. আউন ইবনু আবদিল্লাহ ও মা'ন ইবনু আবদির রহমান থেকে বা তাঁদের একজন থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে বলল, আমার থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করুন।
তিনি বললেন, “যখন এই ধরনের কোনো আয়াত শুনবে— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا “হে ঈমানদারগণ...", তখন তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে; কারণ তা কল্যাণকর কাজের আদেশ দেয় অথবা অকল্যাণকর কাজ থেকে নিষেধ করে।”[৩৮]

নিজেকে কুরআনের সামনে উপস্থাপন
৩৩. সালিম মাক্কী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কেউ যদি জানতে চায় যে আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন কি না, তবে সে যেন কুরআনের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করে।” [৩৯]

নিভৃতে আল্লাহ তাআলার জিজ্ঞাসাবাদ
৩৪. আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু একবার মাসজিদে বসে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কথা শুরু করার আগে তিনি আল্লাহর নামে শপথ করে বলেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রত্যেককে নিভৃতে ডেকে নেবেন, যেভাবে তোমরা পূর্ণিমার রাতে চাঁদের সঙ্গে নিভৃতচারী হও। তারপর জিজ্ঞেস করবেন, হে আদম-সন্তান, কোন জিনিস তোমাকে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে? হে আদম-সন্তান, তুমি যে ইলম অর্জন করেছ সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ? হে আদম-সন্তান, তুমি নবিগণকে কী জবাব দিয়েছ?” [৪০]

ইলম অনুযায়ী আমল করা
৩৫. হুমাইদ ইবনু হিলাল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "পরকালে হিসেব-নিকেশের সময় আমাদের জিজ্ঞেস করা হবে, 'তুমি তোমার ইলম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ?' ব্যাপারটা নিয়ে আমার খুব ভয় হচ্ছে, তাই এ ব্যাপারে (তোমাদের) সতর্ক করছি।”[৪১]

নিকৃষ্ট স্তরের আলিম
৩৬. আবূ কাবশাহ সালুলি বলেন, আমি আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি: "কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে নিকৃষ্ট স্তরের মানুষ হিসেবে গণ্য হবে ওই আলিম, যার ইলম দ্বারা কেউ উপকৃত হয় না।"[৪২]

ভাবিয়া করিয়ো কাজ
৩৭. আবু জাফর (আবদুল্লাহ হাশিমি) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে মুসলমানদের বরকত দান করুন। আপনার বিশেষ কল্যাণকর দিক হতে আমাকে কিছু বলুন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مُسْتَوْصٍ أَنْتَ؟
"তুমি কি উপদেশ চাচ্ছ?” (কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন।)
লোকটি বলল, জি। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
اجْلِسُ، إِذَا أَرَدْتَ أَمْرًا فَتَدَبَّرْ عَاقِبَتَهُ، فَإِنْ كَانَ خَيْرًا فَأَمْضِهِ، وَإِنْ كَانَ شَرًّا فَانْتَهِ
"বসো। কোনো কাজ করার সময় তার পরিণাম নিয়ে চিন্তা করবে। যদি কাজটির পরিণাম কল্যাণকর হয় তবে তা কোরো। আর অনিষ্টকর হলে তা থেকে বিরত থেকো।” [৪৩]

টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, ৪১৭০, বুখারি ও মুসলিমের শর্তে সহীহ।
[২] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১৩/৩২৮, মুরসাল।
[৩] বাগাবি, আল-জা'দিয়্যাত, ১৪৫১, সহীহ।
[৪] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, ৫০৫, সহীহ, মাওকুফ।
[৫] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬] বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৪/২২৪, বুখারি ও মুসলিমের শর্তে সহীহ।
[৭] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/২৪৩, সহীহ, মাওকুফ।
[১০] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ২৬৩, সহীহ, মাওকুফ।
[১১] ইবনু মাজাহ, সুনান, ৪১৭০, সনদ দঈফ। কিন্তু অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় সহীহ।
[১২] ইসনাদটি সহীহ।
[১৩] সূরা আল মুমিনুন: ৬০।
[১৪] সূরা আল মুমিনুন: ৬০।
[১৫] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৩/২৪৮, ইসনাদটি সহীহ।
[১৬] ইসনাদটি সহীহ।
[১৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/১৩৬, সহীহ, মাওকুফ।
[১৮] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৭২, ইসনাদটি সহীহ।
[১৯] সূরা হিজর: ৯৯। اليقين শব্দের অর্থ নিশ্চিত-বিশ্বাস। এই আয়াতে মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে (কুরতুবি, জালালাইন) প্রভৃতি।
[২০] হাদীসটির সনদ দঈফ। কিন্তু এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
[২১] হাদীসটির সনদ দঈফ, মাকতু।
[২২] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ৮৯৯৬, সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৩] সূরা আল ইমরান: ১০২।
[২৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৯৭; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৫] সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৬] সূরা বাকারা: ১৭৭।
[২৭] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৯৮; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৮] সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৯] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৪১২, হাসান।
[৩০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৩১, মাওকুফ।
[৩১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১৫৮, মাওকুফ।
[৩২] সনদটি দঈফ, মাওকুফ। গোরস্থানে ও গোরস্থানের উদ্দেশে নামায পড়া নিষিদ্ধ। এই হাদীস যদি তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েই থাকে, তা হলে এটা সুনিশ্চিত যে, তিনি কবরস্থান পেরিয়ে গিয়ে নামায পড়েছেন। (অনুবাদক)
[৩৩] সূরা আনআম: ১১০।
[৩৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩১৪; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[৩৫] তিরমিযি, সুনান, ২৪০৩; সনদ দুর্বল।
[৩৬] আহমাদ, ৪/১৮৫; সনদটি সহীহ।
[৩৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৬০; মাওকুফ।
[৩৮] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৫৮, সনদ সহীহ।
[৩৯] সনদ দঈফ।
[৪০] সনদটি সহীহ, মাওকুফ ও মারফু।
[৪১] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৩৬; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[৪২] হিলইয়া, ১/২২৩, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪৩] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ১৬, মুরসাল।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে ইলম শেখার ভয়াবহ পরিণাম

📄 দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে ইলম শেখার ভয়াবহ পরিণাম


জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না যারা
৩৮. ইয়াহইয়া ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইরাকের একদল মুসাফির আবূ যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে হাদীস বর্ণনা করার অনুরোধ জানায়। তিনি তাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি তাদের বলেন, “তোমরা জানো যে, হাদীস শিক্ষা করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করা হয়। তাই কেউই দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে তা শিখবে না।” অথবা তিনি বলেছেন, “কেউ যদি পার্থিব উদ্দেশ্যে হাদীস শেখে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৪৪]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ দাবি করেছেন যে, عزف শব্দের অর্থ হলো ঘ্রাণ।

খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করা
৩৯. আয়িযুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কেউ যদি খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন বা হাদীস শিক্ষা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৪৫]

আল্লাহ তাআলার ভয়ই ইলম হিসেবে যথেষ্ট
৪০. কাসিম ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আল্লাহ তাআলার ভয়ই ইলম হিসেবে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে ধোঁকায় পতিত হওয়া মূর্খতা হিসেবে যথেষ্ট।”[৪৬]

পূর্বসূরিদের পথ আঁকড়ে ধরা
৪১. ইবরাহীম নাখঈ থেকে বর্ণিত। হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “হে ক্বারীগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের পূর্বসূরিগণের পথ আঁকড়ে ধরো। আল্লাহ তাআলার কসম, যদি তাঁদের পথে অটল থাকো তবে অনেক দূর এগিয়ে যাবে; আর সে পথ ছেড়ে ডানে-বাঁয়ে চললে অবশ্যই চরমভাবে পথভ্রষ্ট হবে।”[৪৭]

আলিমের ফিতনা
৪২. ইয়াযীদ ইবনু আবী হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফকীহ আলিমের একটি ফিতনা এই যে, তিনি অন্যের কথা শোনার চেয়ে নিজে বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন, যদিও কথা বলার মতো যথেষ্ট ব্যক্তি রযেছেন। অন্যের কথা শোনাটাই নিরাপদ এবং তাতে ইলম বাড়ে। শ্রোতা বক্তার অংশীদার। আল্লাহ তাআলা যদি রক্ষা না করেন, তবে অধিক কথায় রয়েছে পেরেশানি, পরিশ্রম, অতিরঞ্জন ও ক্ষতি। এমনও আলিম আছেন যারা মনে করেন, বংশমর্যাদা ও চেহারা-সুরতের কারণে একে অন্যের চেয়ে কথা বলার বেশি অধিকার রাখে। তারা দরিদ্রদেরকে হেয়জ্ঞান করেন। তাদের কাছে গরিবদের কোনো স্থান নেই। কেউ কেউ তো ইলমকে কুক্ষিগত করে রাখতে ভালোবাসেন। তারা মনে করেন, ইলম শিক্ষা দেওয়াটা একটা অপচয়। ইলম আমার নিজের কাছেই থাকুক- এটাই তাদের পছন্দ। এমনও আলিম আছেন যারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী শাসকের মতো আচরণ করেন; তাদের বক্তব্যের বিরুদ্ধমত প্রকাশ করলে বা তাদের অধিকারের ব্যাপারে অসচেতন হলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো কোনো আলিম নিজেকে মুফতির পদে বসিয়েছেন; তার জ্ঞান নেই-এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে-'আমি জানি না' বলতে লজ্জাবোধ করেন। ফলে আন্দাজে ঢিল ছোড়েন এবং যারা বানিয়ে কথা বলেন তাদের কথা লিখে দেন। কেউ কেউ তো আবার যা শোনেন তা-ই বর্ণনা করেন। এমনকি মর্যাদার আশায় তারা ইয়াহুদি-নাসারাদের কথাও বর্ণনা করেন।” [৪৮]

কিচ্ছা বর্ণনাকারীদের জন্য দুর্ভোগ
৪৩. মাইমুন ইবনু মিহরান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিচ্ছা-কাহিনি বর্ণনাকারীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে দুর্যোগের অপেক্ষায় থাকে, আর শ্রোতা রহমতের প্রতীক্ষায় থাকে।” [৪৯]

দ্বীনদারি দেখিয়ে দুনিয়া অর্জন করা
৪৪. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ رِجَالٌ يَخْتُلُونَ الدُّنْيَا بِالدِّينِ، يَلْبَسُونَ لِلنَّاسِ جُلُودَ الضَّأْنِ مِنَ الدِّينِ، أَلْسِنَتُهُمْ أَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ، وَقُلُوبُهُمْ قُلُوبُ الذِّتَابِ، يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَفَبِي تَغْتَرُّونَ، أَمْ عَلَى تَجْتَرِئُونَ، فَبِي حَلَفْتُ لَأَبْعَثَنَّ عَلَى أُولَبِكَ مِنْهُمْ فِتْنَةً تَدَعُ الْحَلِيمَ مِنْهُمْ حَيْرَانَ
"শেষ জামানায় এমন-কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা দ্বীনের দ্বারা দুনিয়া অর্জন করবে। (অর্থাৎ, দ্বীনদারি প্রকাশ করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলবে।) মানুষের চোখে বিনয়ী সাজতে মেষ-দুম্বার চামড়া পরবে (অর্থাৎ, মোটা কম্বল বা পোশাক পরে দ্বীনদার সাজবে)। তাদের মুখের ভাষা হবে মধুর চেয়ে মিষ্টি; পক্ষান্তরে অন্তর হবে বাঘের মতো (হিংস্র)। আল্লাহ তাআলা এদের সম্পর্কে বলেন, এরা কি আমাকে ধোঁকা দিতে চায় নাকি আমার ওপর ধৃষ্টতা পোষণ করে? (জেনে রাখো), আমি শপথ করে বলছি, তাদের ওপর এমন বিপদ পাঠাব যাতে তাদের বিচক্ষণ-বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণও দিশেহারা হয়ে পড়বে।”[৫০]

না জানলে 'আমি জানি না' বলা
৪৫. নাফি' বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলো। জবাবে তিনি বললেন, আমি তা জানি না।”[৫১]

না বুঝে ফাতওয়া দেওয়ার ভয়াবহতা
৪৬. উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি তো তা জানি না। তাঁকে আবারও একই বিষয় জিজ্ঞেস করা হলো। এবার তিনি বললেন, তোমরা কি আমাদের পিঠকে তোমাদের জন্য জাহান্নামের সাঁকো বানাতে চাও? তোমরা কি বলতে চাও যে, ইবনু উমর আমাদেরকে এ ব্যাপারে ফাতওয়া দিয়েছেন?”[৫২]

হাদীস বর্ণনায় ভীতি
৪৭. ইবনু শুবরুমাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু লোকদের হাদীস শোনাচ্ছিলেন। তখন তামীম ইবনু হাযলামকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বললেন, হে তামীম ইবনু হাযলাম, তুমি নিজে যদি মুহাদ্দিস হতে পারো তবে তা-ই করো।”[৫৩]

বক্তার ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা
৪৮. হাইওয়াতা ইবনু শুরাইহ বলেন, আমি ইয়াযীদ ইবনু আবী হাবীব রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “বক্তা ফিতনার আশঙ্কায় থাকে এবং চুপ-থাকা ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকে।”[৫৪]

আলোচনার মজলিস ছোটো হওয়া
৪৯. হাইওয়াতা ইবনু শুরাইহ বলেন, আমি উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “দু-একজন কী বড়োজোর তিন-চারজনের সাথে ইলমি আলোচনা করা যায়। কিন্তু লোকসংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে গেলেই চুপ থাকবে বা উঠে চলে আসবে।” [৫৫]

ইলমের অহংকার
৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সম্পদের কারণে (মানুষ) যেমন সীমালঙ্ঘন করে, তেমনই ইলমের কারণেও করে থাকে।”[৫৬]

অন্যদের প্রাধান্য দেওয়া
৫১. আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক শ বিশজন সাহাবিকে পেয়েছি। তাদের কেউই নিজেকে মুহাদ্দিস (ভাবতেন) না, তবে মনে করতেন— তাঁর ভাই-ই হাদীস বর্ণনার জন্য যথেষ্ট। আর তাঁদের কেউই নিজেকে মুফতি (ভাবতেন) না, তবে মনে করতেন—তাঁর ভাই-ই ফাতওয়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি বলেছেন, মাসজিদে তাদের পেয়েছি।) [৫৭]

বিশেষ বিশেষ কথা বলে দুআ করা
৫২. দাউদ ইবনু শাবূর বলেন, “আমরা তাউস রহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, আপনি এই এই কথা বলে আমাদের জন্য দুআ করুন। তিনি বললেন, তাতে কোনো সাওয়াব আছে বলে মনে করি না।”[৫৮]

হাদীস বর্ণনায় অনীহা
৫৩. সা'দ ইবনু মাসউদ বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক সাহাবিকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি অমুক অমুক লোকের মতো হাদীস বর্ণনা করেন না কেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁরা যা শুনেছেন আমিও তার অনুরূপ শুনেছি এবং তাঁরা যেখানে যেখানে উপস্থিত ছিলেন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু পরে সেসব বিষয় (আমি বর্ণনা না করলেও) গোপন থাকেনি এবং মানুষও সেগুলো (অন্যের মাধ্যমে জানার দ্বারা) আঁকড়ে ধরেছে। তাই আমি এমন ব্যক্তিদের পেয়ে গেছি যাঁরা আমার (পরিবর্তে এই কাজের) জন্য যথেষ্ট। তা ছাড়া আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীতে কম-বেশি করতে চাই না। আল্লাহর কসম, কেউ আমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতে এত আগ্রহ বোধ করি, যেন তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ঠান্ডা পানি চাইছি; কিন্তু হেরফের হওয়ার আশঙ্কায় জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকি।"[৫৯]

কিয়ামাতের আলামত
৫৪. আবু উমাইয়া লাখমী[৬০] রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ ثَلَاثًا: إِحْدَاهُنَّ أَنْ يُلْتَمَسَ الْعِلْمُ عِنْدَ الْأَصَاغِرِ
"কিয়ামাতের আলামত তিনটি। তার একটি হলো মনগড়া ফাতওয়া- প্রদানকারীদের কাছ থেকে ইলম শেখা।”[৬১]

আমল ব্যতীত ইলমের প্রতিদান নেই
৫৫. ইয়াযীদ ইবনু জাবির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
اعْلَمُوا مَا شِئْتُمْ أَنْ تَعْلَمُوهَا؛ فَلَنْ يَأْجُرَكُمُ اللَّهُ بِعِلْمٍ حَتَّى تَعْمَلُوا
"যা যা চাও, শিখে নাও। কিন্তু আমল ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনো ইলমের প্রতিদান দেবেন না।”[৬২]

কোনো কোনো প্রশ্ন সমস্যা বাড়িয়ে দেয়
৫৬. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে বললেন, “কী প্রশ্ন করেছ, ভেবে দেখো। তুমি আমাকে এমন-এক বিষয়ে প্রশ্ন করেছ যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তোমার সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেবেন।”[৬৩]

অন্যকে তালীম দেয় অথচ নিজে করে না
৫৭. ইসমাঈল ইবনু আবী খালিদ থেকে বর্ণিত। শা'বী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "জান্নাতীদের কিছু লোক একদল জাহান্নামীকে দেখে জিজ্ঞেস করবে, আরে! তোমরা জাহান্নামে গেলে কী করে? অথচ তোমরা আমাদের যে আদব ও ইলম শিখিয়েছ তারই কল্যাণে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করেছি। তারা জবাব দেবে, আমরা সৎকাজের আদেশ দিতাম ঠিকই; কিন্তু নিজেরা তা করতাম না।”[৬৪]

নেক মজলিস
৫৮. আবদুর রহমান ইবনু রাযীন বলেন, “আমি আবদুর রহমান ইবনু আবী হিলাল রহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা একটি জানাযা দেখলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন, এমন মজলিস খোঁজো, যেখানে অন্যের কথাই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। আর আমরা সেখানে বসে (কথা শুনব)।”[৬৫]

টিকাঃ
[৪৪] ইবনু মাজাহ, ২৫২, সনদ দুর্বল, মাওকুফ। তবে এর সমার্থবোধক হাসান মারফু হাদীস রয়েছে।
[৪৫] সনদ হাসান, মাকতু। তবে এর সমার্থবোধক হাদীস হাসান মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৪৬] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ৮৯২৭। এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে।
[৪৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৯৭, সহীহ।
[৪৮] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৩৬-১৩৭, মাওকুফ।
[৪৯] সনদ হাসান।
[৫০] তিরমিযি, ২৫১৫।
[৫১] আত-তাবাকাত, ৪/১৪৪, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৫২] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৫৩] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/১৬৩, মুনকাতি। অর্থাৎ, যদি সম্ভব হয়, তবে তুমিও হাদীসচর্চা করো।
[৫৪] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৩৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/৫, মাওকুফ।
[৫৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৬৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০] অথবা, জুমাহী থেকে বর্ণিত।
[৬১] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৫৭-১৫৮, হাসান।
[৬২] ইবনু আদি, আল-কামিল ফি যুআফায়ির রিজাল, ২/২৫-২৬, মাওকুফ।
[৬৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ; তবে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৬৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 পাপের মন্দ পরিণতি

📄 পাপের মন্দ পরিণতি


অধিক পুণ্য বনাম কম পাপ
৫৯. কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে এক লোক জিজ্ঞেস করল, কোন ব্যক্তিকে দেখে আপনি বিস্মিত হন?-যে ব্যক্তি কম আমল করে ও কম গুনাহ করে? নাকি বেশি আমল করে ও বেশি গুনাহ করে? ইবনু আব্বাস জবাব দিলেন, পাপ থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম।[৬৬]

পাপের স্বল্পতাই উত্তম
৬০. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “(নেকির দিক থেকে) একনিষ্ঠ ইবাদাতগুজারকে ছাড়িয়ে যেতে চাইলে পাপ থেকে নিজেকে বিরত রেখো। (কারণ) পাপের স্বল্পতার চেয়ে উত্তম কিছু নেই, যা নিয়ে তোমরা আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হতে পারবে।”[৬৭]

মুমিন বান্দা ছোটো পাপকেও বড়ো করে দেখে
৬১. আবুল আহওয়াস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “মুমিন বান্দার কাছে পাপ এমন—যেন সে বিশাল শিলাখণ্ডের নিচে বসে আছে আর ভয় করছে, তা এক্ষুনি ভেঙে পড়বে। আর কাফিরের কাছে পাপ হলো—নাকের ওপর দিয়ে ওড়ে যাওয়া সামান্য মাছির মতো।”[৬৮]

নাকের ওপর দিয়ে যাওয়া মাছি
৬২. হারিস ইবনু সুওয়াইদ থেকে বর্ণিত, “মুমিন বান্দার কাছে পাপ এমন—যেন সে বিশাল পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর ভয় করছে, তা এক্ষুনি ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারীর কাছে পাপ হলো নাকের ওপর দিয়ে ওড়ে যাওয়া সামান্য মাছির মতো।”[৬৯]

আল্লাহ যার কল্যাণ চান
৬৩. সুলাইমান ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, গুনাহকে তার জন্য কষ্টসাধ্য বানিয়ে দেন। আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তার সামনে পাপকে সুশোভিত করে তোলা হয়।”[৭০]

আল্লাহর অবাধ্যতা!
৬৪. আবদুর রহমান ইবনু আমর আওযাঈ বলেন, আমি বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: “পাপের নগণ্যতার দিকে তাকিয়ো না; বরং যাঁর অবাধ্যতা করেছ তাঁর (বড়োত্বের) দিকে তাকাও।”[৭১]

আত্মার ছটফটানি
৬৫. আমর ইবনুল হারিস থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “চড়ুই (পাখি) খাঁচায় বন্দি হলে যতটা ছটফট করে, মুমিনের আত্মা গুনাহর কারণে তার চেয়েও বেশি ছটফট করে।”[৭২]

খুঁটিতে-বাঁধা ঘোড়া
৬৬. আবূ সাঈদ খুদরি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ وَمَثَلُ الْإِيمَانِ كَمَثَلِ الْفَرَسِ فِي آخِيَّتِهِ، يَجُولُ ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى آخِيَّتِهِ. وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَسْهُو ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى الْإِيمَانِ، فَأَطْعِمُوا طَعَامَكُمُ الْأَنْقِيَاءَ، وَأَوْلُوا مَعْرُوفَكُمُ الْمُؤْمِنِينَ
“ঈমানদার ব্যক্তি ও ঈমান যেন খুঁটিতে-বাঁধা ঘোড়ার মতো। চক্কর দিতে দিতে তা অবশেষে খুঁটির কাছেই ফিরে আসে। একইভাবে কোনো মুমিন (কখনও কখনও) ভুল করে, আবার ঈমানের দিকেই ফিরে আসে। তাই তোমাদের খাদ্যবস্তু পরহেজগার ব্যক্তিদেরকে খাওয়াও এবং তোমাদের দান-খয়রাত ঈমানদারগণকে দাও।”[৭৩]

আমলে রয়েছে নিরাপত্তা
৬৭. আবূ আমর কাইস ইবনু রাফি' রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কয়েকজন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে সমবেত হলেন। কল্যাণমূলক কথাবার্তা বলতে বলতে তাদের অন্তর গলে গেল। কিন্তু ওয়াকিদ ইবনু হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু চুপ থাকলেন। অন্যরা তাঁকে বললেন, আবুল হারিস, আপনি কিছু বললেন না যে? তিনি বললেন, আপনারা কথা যা বলেছেন যথেষ্ট। অন্যরা বললেন, আমাদের জীবনের শপথ, আপনি কথা বলুন! আপনি তো আমাদের চেয়ে বয়সে ছোটো নন। ওয়াকিদ ইবনু হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি কথা শুনি, কারণ কথা বলায় রয়েছে শঙ্কা। আর আমলের দিকে দৃষ্টি দিই, কারণ আমলে রয়েছে নিরাপত্তা। [৭৪]

কথা-কাজে মিল
৬৮. ইমরান ইবনু আবিল জা'দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “সকলেই ভালো ভালো কথা বলে। তবে যার কথা ও কাজে মিল রয়েছে, সে-ই সফল। আর যার কথা ও কাজে গরমিল থাকে, সে তো নিজেকেই তিরস্কৃত করল।”[৭৫]

অজানা বিষয়ে ফাতওয়া দেওয়ার নিন্দা
৬৯. সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “অনেকেই এমন বিষয়ে পারদর্শী, যে অনুযায়ী তারা নিজেরাই আমল করে না।”[৭৬]

কথা নয়, কাজেই পরিচয়
৭০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "মানুষকে তাদের কথা নয়, কাজ দিয়ে বিচার করো। কারণ, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কথার ব্যাপারে কর্মের দলিল প্রতিষ্ঠা করেন। ওই দলিল তার কথাকে সত্যায়ন করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। (অর্থাৎ, কেউ কোনো কথা বলার পর সে অনুযায়ী কাজ করল কি না, তা আল্লাহ তাআলা দেখেন।) কোনো ভালো কথা শুনলে বক্তাকে কিছুটা সময় দিয়ো। যদি তার কথার সাথে কাজ মিলে যায়, তবে তা কতই না চমৎকার ও চক্ষুশীতলকারী! তাকে ভাই আর বন্ধু বানিয়ে ভালোবাসো। যদি তার কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকে, তা হলে তার আর কোন বিষয়টি তোমাকে ধাঁধায় ফেলছে? তার কোন জিনিসটি তোমার কাছে গোপন থাকছে? তার ব্যাপারে সাবধান! তার থেকে দূরে সরে যেয়ো। বনি আদম যেভাবে ধোঁকা খেয়েছে সে যেন তোমাকে সেভাবে ধোঁকা না দেয়। তোমারও কথা ও কাজ আছে; কথার ওপর কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ো। গোপনীয় আমল আছে, প্রকাশ্য আমলও আছে; এর মাঝে গোপনীয় আমল অগ্রাধিকার পাবে। পার্থিব কর্ম আছে ও পরকালীন কর্ম আছে; অগ্রাধিকার পাবে পরকালীন কর্ম।”[৭৭]

আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেন
৭১. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে বলল, আমাকে উপদেশ দিন। হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বললেন, “আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকামকে সম্মান করো, আল্লাহও তোমাকে সম্মান দেবেন।”[৭৮]

ইলম অনুযায়ী আমল
৭২. হিশাম ইবনু হাসসান থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করে, তার খুশু-খুজু-চোখ-জিহ্বা-হাত-সালাত-আলোচনা ও পরহেজগারিতায় (সেই ইলমের) প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। (অর্থাৎ, প্রতিটি কাজ ইলম অনুযায়ী করার চেষ্টা করে)। কোনো ব্যক্তি যখন ইলমের একটি দিক অর্জন করে এবং সে ইলম অনুযায়ী আমল করে, তা হলে তা পুরো দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তা আখিরাতের জন্য ব্যয় করে দেওয়ার চেয়েও বেশি কল্যাণকর হয়।”[৭৯]

কুরআনের দুটি আয়াতই যথেষ্ট
৭৩. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সা'সা[৮০] বলেছেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলাম এবং তাঁকে এই আয়াতগুলো পাঠ করতে শুনলাম :
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
"কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ-কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।”[৮১]
তা শুনে বললাম—“এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি কিছু শুনতে চাই না।”[৮২]

পাপের ব্যাপারে সচেতনতা
৭৪. যাইদ ইবনু আসলাম রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এক লোক রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, প্রত্যেকেই কি অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা দেখতে পাবে? এবং অণু পরিমাণ অসৎ-কাজ করলে তা-ও দেখতে পাবে? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ'। লোকটি তখন এই কথা বলতে বলতে চলে গেল, হায় হায়! আমার কত গুনাহ! তার কথা শুনে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, آمَن الرَّجُلُ ‘লোকটি নিরাপদ রয়েছে।'”[৮৩]

কুরআনের দুটি আয়াতই উপদেশ হিসেবে যথেষ্ট
৭৫. মা'মার থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ “কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ-কাজ করলেও সে তা দেখতে পাবে।" আয়াত দুটি নাযিল হওয়ার পর একজন মুসলিম বললেন, “এটাই আমার জন্য যথেষ্ট! কারণ, অণু পরিমাণ সৎকাজ ও অসৎ-কাজ করলে তা দেখতে পাব। আমার আর কোনো উপদেশের প্রয়োজন নেই।”[৮৪]

পাপকাজের কারণে ইলম ভুলে যাওয়া
৭৬. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি ওই ব্যক্তির কথা ভাবি, যে পাপের কারণে আগের অর্জিত ইলম ভুলে গেছে।”[৮৫]

কুরআন ভুলে যাওয়া ভয়াবহ বিপদ
৭৭. দাহ্হাক ইবনু মুযাহিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআন শেখার পর তা ভুলে যাওয়া শুধু পাপকাজেরই ফল। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ “তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।”[৮৬] আর কুরআন ভুলে যাওয়া একটি ভয়াবহ বিপদ।[৮৭]

পাপকাজের কারণে রিযক থেকে বঞ্চিত করা হয়
৭৮. সাওবান রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
“মানুষ তার পাপকর্মের কারণে রিযক থেকে বঞ্চিত হয়।”[৮৮]

আমলে মিথ্যা কথার কুপ্রভাব
৭৯. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, “আমি কোনো মিথ্যা বললে আমার আমলে সেটা ধরা পড়ে।”[৮৯]

নিজেকে চেনার উপায়
৮০. শুআইব ইবনু আবী সাঈদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, কীভাবে জানব যে আমি নিজে কেমন? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
إِذَا رَأَيْتَ كُلَّمَا طَلَبْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الْآخِرَةِ وَابْتَغَيْتَهُ يُسَرَ لَكَ، وَإِذَا أَرَدْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَابْتَغَيْتَهُ عُسْرَ عَلَيْكَ، فَاعْلَمْ أَنَّكَ عَلَى حَالٍ حَسَنَةٍ. فَإِذَا رَأَيْتَ كُلَّمَا طَلَبْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الْآخِرَةِ وَابْتَغَيْتَهُ عُسْرَ عَلَيْكَ، وَإِذَا طَلَبْتَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَابْتَغَيْتَهُ يُسْرَ لَكَ، فَأَنْتَ عَلَى حَالٍ قَبِيحَةٍ
"যদি তুমি এমন অবস্থায় থাকো যে, তুমি আখিরাতের কোনো বিষয় চাইলে তা তোমার জন্য সহজ করে দেওয়া হয় এবং দুনিয়াবি কোনো বিষয় চাইলে তা তোমার জন্য কঠিন করে দেওয়া হয়, তবে তুমি উত্তম অবস্থায় আছ। আর যদি এমন অবস্থায় থাকো যে, আখিরাতের কোনো বিষয় চাইলে তা তোমার জন্য কঠিন করে দেওয়া হয় এবং দুনিয়াবি কোনো বিষয় চাইলে তোমার জন্য তা সহজ করে দেওয়া হয়, তবে তুমি নিকৃষ্ট অবস্থায় আছ।”[৯০]

জিহ্বাকে সংযত রাখা
৮১. হুমাইদ ইবনু হিলাল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দাও। অর্থহীন বিষয়ে কখনও কথা বোলো না। যেভাবে টাকা-পয়সা সংরক্ষণ করো, সেভাবে নিজের জিহ্বা সংরক্ষণ করো।” [৯১]

ভালো কাজের মর্যাদা
৮২. আল্লাহ তাআলা বলেন, إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ "তাঁর কাছে শুধুমাত্র পবিত্র কথাই ওপরের দিকে আরোহণ করে এবং সৎকাজ তাকে ওপরে ওঠায়।"[৯২]
আবুস সিনান শাইবানি বলেন, আমি দাহহাক ইবনু মুযাহিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “সৎকাজ পবিত্র কথাকে ওপরের দিকে ওঠায়। "[৯৩]

ভালো কথার সঙ্গে ভালো কাজ
৮৩. মা'মার থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “সৎকাজ ভালো কথাকে আল্লাহর দিকে উঠিয়ে নেয়। কিন্তু কারও কথা যদি ভালো হয় আর কাজ খারাপ হয়, তবে ওই কথাকে কাজের ওপর ছুড়ে ফেলা হয়। কারণ, কথার চেয়ে কাজ করাই অধিক সঙ্গত।”
মা'মার বলেন, কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ (এবং সৎকাজ তাকে ওপরে ওঠায়)[৯৪] -এর অর্থ হলো, "আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির সৎকাজ কবুল করে নেন।"[৯৫]

টিকাঃ
[৬৬] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৬৯, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৬৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৬৫, মাওকুফ।
[৬৮] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ৭/১২৯, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৬৯] বুখারি, ৫৯৫৯।
[৭০] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৭১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৭২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৭৩] আহমাদ, ৩/৫৫, সনদ দঈফ।
[৭৪] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৭৫] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৬০, হাসান লি-গাইরিহি, মাওকুফ।
[৭৬] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৭৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৬-৭, মাকতু।
[৭৮] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/১৫২, মাওকুফ, মুনকাতি।
[৭৯] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৬১, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৮০] ফারাযদাকের দাদা অথবা চাচা ছিলেন তিনি।
[৮১] সূরা যিলযাল: ৭-৮।
[৮২] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/৫২১, এই হাদীসের রাবীগণ সিকাহ।
[৮৩] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৩৮১, মুরসাল।
[৮৪] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৩৮২, মুরসাল।
[৮৫] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১/১৯৯, মাওকুফ।
[৮৬] সূরা শুরা: ৩০।
[৮৭] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ৯৫, সনদ হাসান, মুরসাল।
[৮৮] ইবনু হিব্বান, সহীহ, ১০৯০, সনদ হাসান।
[৮৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৯০] হাদীসটি মুরসাল। এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে।
[৯১] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩৫২, সনদ মুনকাতি, মাওকুফ।
[৯২] সূরা ফাতির: ১০।
[৯৩] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৫/৩৪৬, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৯৪] সূরা ফাতির: ১০।
[৯৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।

📘 মুমিনের পাথেয় > 📄 সাহাবি ও তাবিয়িদের সালাত

📄 সাহাবি ও তাবিয়িদের সালাত


চতুর্থ অনুচ্ছেদ
সাহাবি ও তাবিয়িদের সালাত

রহমতের দুআ
৮৪. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ قَوْمًا يَحْسَبُهُمُ النَّاسُ مَرْضَى، وَمَا هُمْ بِمَرْضَى
“আল্লাহ তাআলা ওই কওমকে রহম করুন, যাদেরকে মানুষ অসুস্থ ভাবে, অথচ তারা অসুস্থ নয়।”[১৬]
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা (অত্যধিক) ইবাদাতে মশগুল থাকে (যার ফলে মানুষ তাদের অসুস্থ মনে করে)।”

মুনাফিক রাত জেগে ইবাদাত করতে পারে না
৮৫. কাতাদা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “(আমাদের সময়) একটি কথা বলা হতো, “মুনাফিক কখনও (ইবাদাতের মাধ্যমে) রাত্রি জাগরণ করতে পারে না।”[১৭]

তামীম দারী রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সালাত
৮৬. মাসরুক রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন, “এটা ছিল তোমার ভাই তামীম দারী রদিয়াল্লাহু আনহু-এর (সালাত পড়ার) জায়গা। এক রাতে তিনি ভোর বা ভোর হয়ে যায় যায় এমন সময় পর্যন্ত রুকু, সাজদা আর আল্লাহর কিতাব থেকে এই আয়াত পড়ে পড়ে কাঁদছিলেন :
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
“যেসব লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করে নিয়েছে যে, আমি তাদেরকে এবং মুমিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ভুক্ত করে দেব যে তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যাবে? তারা যে ফয়সালা করে তা অত্যন্ত জঘন্য।”[৯৮]-[৯৯]

মাসরুক রহিমাহুল্লাহ-এর সালাত
৮৭. মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মাসরুক রহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী বলেছেন, “মাসরুককে কখনও কখনও এমন অবস্থায় পাওয়া যেত যে, দীর্ঘ সালাত পড়ার কারণে তাঁর পা দুটি ফুলে গেছে। আল্লাহর শপথ! তার পেছনে বসলে আমার এত মায়া লাগত যে, আমি কেঁদেই ফেলতাম।”[১০০]

যারা নিজেদের জন্য কাঁদে
৮৮. ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর বলেন, কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ একজন লোকের কুরআন তিলাওয়াত অথবা দুআ-যিকর শুনছিলেন, (তখন লোকটি কাঁদছিল)। তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর যেতে যেতে বললেন, “কিয়ামাত হওয়ার আগেই যারা নিজেদের জন্য কাঁদে, তাদের কল্যাণ হোক।”[১০১]

সালাত পড়ে রাত কাটানো
৮৯. উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “সবার চোখ ঘুমে অবশ হয়ে এলে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু সালাতে দাঁড়াতেন। আমি মৌমাছির গুনগুনের মতো তাঁর (কুরআন তিলাওয়াতের) আওয়াজ শুনতাম। এভাবে ভোর হয়ে যেত।”[১০২]

আখিরাতের ব্যাপারে সাহাবিদের ভয়
৯০. আবুল আহওয়াস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কেউ যখন (সাহাবিদের) তাঁবুর দরজায় গিয়ে দাঁড়াত, ওখানে মৌমাছির গুনগুনের মতো (যিকর-আযকারের) আওয়াজ শুনতে পেত। (এখনকার) লোকদের কী হলো যে এরা (আখিরাতের বিষয়ে) নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে, যে বিষয়ে পূর্ববর্তীরা ছিলেন ভীতসন্ত্রস্ত?”[১০৩]

মর্যাদায় তারতম্য
৯১. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা একটি দলকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন; তাদেরকে নিয়ামাত দান করবেন এবং তারা ভোগ করবে। আরেক-দল লোক মর্যাদায় তাদের ওপরের স্তরে থাকবে। এরা তাদেরকে দেখে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, ওরা আমাদের চেয়ে বেশি মর্যাদা পেল যে? এরা তো আমাদের ভাই, আমরা তো তাদের সাথেই ছিলাম। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, অসম্ভব! তোমরা যখন পরিতৃপ্ত হতে তখন তারা ক্ষুধার্ত থাকত, যখন তোমরা তৃষ্ণা নিবারণ করতে তখন তারা পিপাসার্ত থাকত, যখন তোমরা ঘুমিয়ে থাকতে তখন তারা সালাতে দাঁড়াত, যখন তারা (আমলের কারণে) ওপরের দিকে উঠত তখন তোমরা (গোনাহের কারণে) নিচের দিকে নামতে।"[১০৪]

জান্নাতে মর্যাদার তারতম্য
৯২. আবুল মুতাওয়াক্কিল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الدَّرَجَةَ فِي الْجَنَّةِ فَوْقَ الدَّرَجَةِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيُرْفَعُ بَصَرَهُ فَيَلْمَعُ لَهُ بَرْقُ يَكَادُ يَخْطَفُ بَصَرَهُ، فَيُفَزَعُ لِذَلِكَ فَيَقُولُ: مَا هَذَا؟ فَيُقَالُ لَهُ: هَذَا نُورُ أَخِيكَ فُلَانٍ، فَيَقُولُ: أَخِي فُلَانٌ، كُنَّا نَعْمَلُ فِي الدُّنْيَا جَمِيعًا، وَقَدْ فُضْلَ عَلَى هَكَذَا؟ قَالَ: فَيُقَالُ لَهُ: إِنَّهُ كَانَ أَفْضَلَ مِنْكَ عَمَلًا، ثُمَّ يُجْعَلُ فِي قَلْبِهِ الرِّضَا حَتَّى يَرْضَى
"জান্নাতে মর্যাদার (বিভিন্ন) স্তর থাকবে, যেমন আসমান ও জমিনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জান্নাতে কেউ ওপরের দিকে তাকাবে, তার সামনে এমন বিজলি চমকে উঠবে যে তার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। সে ভয় পেয়ে যাবে এবং বলবে, এটা কী? তাকে বলা হবে, এটা তোমার অমুক ভাইয়ের আলো। সে বলবে, আমার অমুক ভাই, দুনিয়াতে তো আমরা একসঙ্গে আমল করতাম। আজ তাকে আমার চেয়ে এতবেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে? তাকে বলা হবে, আমলের ক্ষেত্রে সে তোমার চেয়ে উত্তম ছিল। এরপর তার অন্তরে সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে দেওয়া হবে, ফলে সে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।”[১০৫]

টিকাঃ
[১৬] হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণিত।
[১৭] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৯৮] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ২১।
[৯৯] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৮২, মাসরুক পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ।
[১০০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৫, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১০১] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৫৩, মাওকুফ এবং এর রাবীগণ সিকাহ।
[১০২] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৫৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১০৩] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৪৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১০৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/২৪৭, সনদ দুর্বল, মাওকুফ।
[১০৫] হাদীসটির সবগুলো সনদ সহীহ, মুরসাল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00