📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 সময় নষ্ট হয় যেভাবে

📄 সময় নষ্ট হয় যেভাবে


বেশ কয়েকটি কারণে আমাদের সময়গুলো নষ্ট হয়ে যায়। এগুলোর ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে; নতুবা এই কারণগুলো আমাদের জীবনকে গিলে ফেলবে। জীবন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমরা কোনো পাথেয় সংগ্রহ করতে পারব না। এগুলো মধ্যে রয়েছে-
অন্যমনস্কতা : এটা এমন এক রোগ, যা মানুষের বোধশক্তি ও মননকে আচ্ছন্ন করে বসে। চলমান ঘটনাপুঞ্জ এবং দিন- রাত নিয়ে কোনো খবর থাকে না। সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও পরিণামদর্শিতা হারিয়ে থাকে; তাত্ত্বিক বিষয়গুলো মাথায় ঢোকে না। চিন্তায় মৌলিক কোনো অর্থপূর্ণ বিষয় আসে না: কেবল খোসা নিয়েই ভাবতে থাকে; শ্বাস- প্রশ্বাস নিয়ে চিন্তা পৌঁছে না। শুধু খোল নিয়ে পড়ে থাকে, তারপরে কী হবে জানে না।
কুরআনুল কারিমে অন্যমনস্কতা নিয়ে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এটা তাদের জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত করবে। আর বানাবে নির্বাক জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে বেশি ভ্রষ্ট।
'আমরা জাহান্নামের জন্যই তৈরি করেছি জিন ও ইনসানের অনেককে। তাদের অন্তর আছে, তবে তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে, তবে তা দিয়ে দেখে না। তাদের কান আছে, তবে তা দিয়ে তারা শোনে না। এরা হলো পশুর মতো; বরং আরও অধিক বিভ্রান্ত এবং অচেতন।' সূরা আরাফ : ১৭৯
যারা মৌলিকত্ব ও নির্যাস বাদ দিয়ে বাহ্যিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেয়, কুরআন তাদের অভিযুক্ত করে বলেছে- 'তবে অধিকাংশ মানুষই জানে না। তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিকটাই জানে আর আখিরাত সম্পর্কে তারা একেবারেই গাফিল-অজ্ঞ।' সূরা রুম : ৬-৭
রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেছে- 'তোমার প্রভুকে স্মরণ করো মনে মনে, বিনয়ের সাথে, অন্তরের ভয় নিয়ে, অনুচ্চ স্বরে, সকালে এবং সন্ধ্যায়। আর তুমি (এ ব্যাপারে) উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।' সূরা আরাফ : ২০৫
অন্য একটি আয়াতে এসেছে- 'তুমি এমন কারও আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমরা আমাদের জিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, আর যার কর্মকাণ্ডও সীমালঙ্ঘনমূলক।' সূরা কাহফ : ২৮
বিপদজনক ব্যাপার হলো, আমাদের উম্মাহর ওপর দিয়ে পাহাড় নাড়িয়ে দেওয়া ভূমিকম্পের ন্যায় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু এ উম্মাহ সেখান থেকে কোনো কোনো শিক্ষাই নিচ্ছে না। তাদের কর্মে কোনো পরিবর্তন আনছে না, তাদের প্রশান্ত চিন্তাকে নাড়া দিতে পারছে না। যেন এটা একটা পুতুল; যেভাবে নাঁচায় সেভাবে নাঁচেতেই থাকে। এ কারণেই আবু বকর দুআ করতেন- اللَّهُمْ لَا تَدَعْنِيْ فِيْ غَمْرَةٍ وَلا تَأْخُذْنِيْ عَلَى غِرَّةٍ وَلاَ تَجْعَلْنِيْ مَعَ الْغَافِلِينَ.
'হে আল্লাহ! অজ্ঞতার অন্ধকারে ছেড়ে দেবেন না। আকস্মিক পাকড়াও করবেন না। আমাদের অসতর্কদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।'
সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ বলতেন, তিন প্রকারের মানুষের সাহচর্য থেকে সতর্ক থেক। তোষামোদকারী পাঠক (জ্ঞানী), জ্ঞানবিমুখ মূর্খ সুফি এবং বেচারাকারী অন্যমনস্ক।
ভবিষ্যতের জন্য রাখা : এখানে আরও বেশি ক্ষতিকর একটি আপদ রয়েছে, যা মানুষকে আজকের দিন এবং বর্তমান থেকে উপকৃত হতে দেয় না। তা হলো কালক্ষেপণ, দীর্ঘসূত্রিতা বা গতিহীনতা। এটা মানুষের চরিত্র ও অভ্যাসের সাথে এমন একটি বাক্যকে যুক্ত করে দেয় যে- হুম! আমরা কাজটা করব, অচিরেই করব; বিষয়টা চিন্তায় আছে।
সে যুগের একজন অভিজ্ঞ জ্ঞানী লোককে বলা হলো, 'আমাদের কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বললেন, 'তোমরা সওফ (শীঘ্রই) শব্দ উচ্চারণ থেকে দূরে থেক।' (আরবি সওফ শব্দটি ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার অর্থ দেয়।)
আরেকজন বলল- সওফ হলো ইবলিসের সেনাবাহিনীর এক সৈন্য।
এটা তোমার আজকের দিনের অধিকার। তা উপকারী জ্ঞান অর্জন কিংবা ভালো কোনো কাজে আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখবে না।
বর্তমান তোমাকে ফাঁকি দিয়ে অতীত হয়ে যাবে। আর অতীত কখনো ফিরে আসে না। সুতরাং তোমার আজকের দিনকে কাজে লাগাও, যাতে আগামীতে তার ফসল তুলতে পারো। নচেৎ তোমাকে অনুশোচনা করতে হবে। কোনো কাজে আসবে না। যদিও সে সময় অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না।
فما لك يوم الحشر شيء سوى الذى * تزودته قبل الممات الى الحشر
اذا انت لم تزرع وابصرت حاصدا * ندمت على التفريط في زمن البذر
'মৃত্যুর পূর্বেই যা কিছু অর্জন করেছ, তা বিনা কিছুই পাশে পাবে না হাশরের মাঠে।
চাষাবাদ না করে ফসল আনলে যত ধন্যবাদ না করে যদি ফসল আনতে যাও অলসতার জন্য পস্তাবে তুমি বপনের দিনে।'
ইমাম হাসান বসরি বলেন- 'কোনো কাজ কালকের জন্য ফেলে রেখ না। আজকের দিনটি তোমার এবং কালকের দিন তোমার নয়। যদি কালকের দিন হয়, তাহলে ঠিক একই রকম হওয়া উচিত, যেমন হওয়া উচিত আজকের দিনটি। যদি তুমি কালকের দিনটি না পাও, তাহলে আজকের অবহেলার জন্য তোমাকে আফসোস করতে হবে না।'
পর্যটক মুহাম্মদ ইবনে সামিরা ইউসুফ ইবনে আসবাতকে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটির ভাষ্য হলো- 'আমার ভাই! তোমার মন এবং হৃদয়ের ওপর গড়িমসিকে প্রাধান্য বিস্তার করতে দিয়ো না। এটা অবসাদ এবং ধ্বংসের কারণ। এর মাধ্যমে উদ্যমতা মরে যায়। জীবন হেলায়-ফেলায় চলে। যদি তুমি গড়িমসি করতে শুরু করো, তবে তা তোমার ইচ্ছাশক্তির ওপর চেপে বসবে। তোমার সংকল্পের ওপর কামনা-বাসনা কর্তৃত্ব স্থাপন করবে। শরীরের ওপর চেপে বসা অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তোমার শরীর যেন আরাম না খোঁজে। তোমার কাজ দ্রুত সম্পাদন করো। দ্রুততার প্রতিযোগিতায় নামো। তুমিই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। কর্মে ঐকান্তিক হও। প্রতিটি কাজেই মর্যাদার। অলসতা ছেড়ে দাও। উচ্ছ্বাসী জীবনে অভ্যস্ত হও, সতর্ক হও। কেউ তোমাকে ভিন্ন পথে ঠেলে দিচ্ছে না একটু চিন্তা করে দেখ। নিয়মিত আত্মসমালোচনা করো। তোমার অর্জন কী? কোথায় শিথিলতা করেছ? কোনটা অন্যায়? কোনটা সফলতা? সকল কর্মের লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। তোমার মৃত্যুর আগেই আমলনামাকে সমৃদ্ধ করার কাজে নেমে পড়ো, যাতে পরে অনুশোচনা করতে না হয়।'
গড়িমসি ভয়াবহতা : গড়িমসি এবং আজকের কাজকে আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখার অনেকগুলো ভয়াবহ দিক রয়েছে। যথা :
এক. তুমি কাল পর্যন্ত বাঁচবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
একজন শাসক জনৈক সালেহ ব্যক্তিকে খাবারের টেবিলে আহ্বান করলেন। তিনি বলেন, 'আমি রোজাদার।' শাসক বললেন, 'আজ আমাদের সাথে খাও। কাল রোজা রেখ।' তিনি জবাবে বলেন, 'আপনি কি আমার কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারেন?'
একজন মানুষ কীভাবে অন্য মানুষের জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারে? মৃত্যু তো যেকোনো সময় হাজির হয়ে মানুষকে থামিয়ে দেয়। প্রথিতযশা এক কবি বলেছেন- تزود من التقوى فانك لا تدرى * اذا جن ليل هل تعيش الى الفجر
فكم من سليم مات من غير علة * وكم من سقيم عاش حينا من الدهر
وكم من فتى يمسى ويصبح امنا * وقد نسجت اكفانه وهو لا يدرى
'তাকওয়ার রসদ সংগ্রহ করো। কারণ, তুমি তো জানো না
রাতের শেষে ফজরের পর বাঁচবে কি না?
অথচ কত সুস্থ যুবক বিনা কারণে গেছে চলে,
আর অসুস্থরা ঠিকই শেষ বয়সের ঘানি টানে।
তরতাজা বালক রাত্রি কাটিয়ে ভোরের আলোর স্বপ্নে বিভোর,
কিন্তু সে জানে না বোনা হয়ে গেছে তার কাফনের কাপড়।'
বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনন্য উন্নতির যুগে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেঁচে বয়ে কমেনি। এই চিকিৎসাবিজ্ঞান হার্ট অ্যাটাক, শ্বাসরোধ ইত্যাদি পদ্ধতিতে মৃত্যু ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থা আবিষ্কার করতে পারেনি। কোনো প্রযুক্তি সফল নতুন নতুন সমস্যা ডেকে এনেছে। শিল্প বিকাশের আগে মানুষ এ সকল মৃত্যুদূত থেকে নিরাপদ ছিল।
দুই. যদি তুমি আগামীকাল পর্যন্ত জীবনের গ্যারান্টি দিতে না পারো, আকস্মিক কোনো অসুস্থতা, ব্যস্ততা কিংবা বিপদ ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা থেকে নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা দিতে না পারো, তবে বুদ্ধিমানের কাজ হলো- কল্যাণধর্মী কাজ নিজ দায়িত্বে প্রথম সুযোগেই সম্পন্ন করে ফেলা। পক্ষান্তরে অলসতা ও সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এতে মানুষ হতাশ হয়ে আত্মহননের উপায় খুঁজে থাকে।
কবি বলেছেন- ولا اؤخر شغل اليوم عن كسل
الى غد ان يوم العاجزين غد
'শুধু অলসতায় আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য রেখে দিলে!
জেনে রেখ, আগামী দিন শুধু অক্ষমদের দিন।'
আরেক কবির ভাষ্য হলো- عليك بأمر اليوم, لا تنتظر غدا
فمن لغد من حادث بمخيل
'দিনের দায়িত্বের সাথে লেগে থাকো। কালকের জন্য অপেক্ষা কেন করবে?
কালকের কাজের জামিনদার কে হবে? তুমি তো জানো না কাল কী ঘটবে।'
রাসূল ﷺ এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন- 'পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের পূর্বে গনিমত হিসেবে গ্রহণ করো।
মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে
অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে
ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে
বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে
অভাবের পূর্বে সচ্ছলতাকে।'
কোনো এক আলিম জনৈক যুবকদের বলছিলেন- 'কর্মক্ষমতা হারানোর পূর্বেই কাজগুলো সেরে ফেলো। আমি আজ বহু কাজ করতে চাই, কিন্তু আমার কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।'
হাফসা বিনতে শিরিন বলতেন- 'হে যুবক সম্প্রদায়! তোমরা কর্মে মগ্ন হও। যৌবনই করার সময়।'
তিন. প্রত্যেকটি দিনের কিছু কর্ম থাকে। প্রত্যেকটি সময়ে কিছু নতুন দায়িত্ব ঘাড়ে আসে। কোনো সময়ই কর্মহীন থাকার জন্য নয়। উমর ইবনে আব্দুল আজিজ একদিন কাজের চাপে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাকে বলা হলো- 'আজ রাখুন, বাকিটা কাল সেরে নিতে পারবেন।' তিনি উত্তর দেন, 'একদিনের কাজ আমাকে কাবু করে ফেলেছে। তাহলে দুইদিনের কাজ একসঙ্গে জমা হলে কী হবে?'
ইবনে আতা হিকাম বলেন- 'সময়ের মাঝে কিছু অধিকার আদায় সম্ভব, কিন্তু সময়ের অধিকার আদায় সম্ভব নয়। আল্লাহর কসম! প্রত্যেকটি নতুন সময়ে নতুন কিছু কর্তব্য এবং জরুরি কিছু বিষয় রয়েছে। তাহলে কীভাবে অন্য সময়ের কর্তব্য সেই সময়ে আদায় করতে কোথায় যাবে?'
চার. দেরি ও গড়িমসি মানব মনকে কাজ এবং নেক আমল ত্যাগে অভ্যস্ত করে তোলে। আর একবার চেপে বসলে তা স্বভাব হয়ে পড়ে। তা থেকে উত্তরণ খুবই কঠিন। এমনকী মানুষ যদি সময়মতো ফরজ কাজ এবং নেক আমল করতে মানসিক পরিতৃপ্তি পায়, তবে তা সে কেন করছে? উদ্দেশ্যই-বা কী সে তা জানে না। কিন্তু কাজ ত্যাগ করতে সে কষ্ট অনুভব করে। সে যখন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়ন করার আগ পর্যন্ত যেন পিঠে একটি পাহাড় নিয়ে হাঁটছে।
একইভাবে আমরা দেখি গোনাহ ও পাপাচার থেকে তওবার ক্ষেত্রেও। যার আত্মা পাপাচার অভ্যস্ত হয়ে গেছে, প্রবৃত্তির দাসত্বে মগ্ন হয়ে গেছে, তার কাছে পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়া বাচ্চাদের বুকের দুধ ছাড়ানোর চেয়েও কঠিন মনে হয়। প্রতিদিন আসক্তি বেড়ে যায়, অষ্টপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে; পাপাচারের বহরও বাড়তে থাকে। আর এর প্রভাব গুরুতর হতে থাকে, একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে থাকে। পাপের তার মূল্যবোধকে দৃষ্টিশক্তিহীন করে দেয়। তার কাছে হেদায়েতের আলোকরশ্মি কিংবা সত্যের আলো পৌঁছতে পারে না।
হাদিসে এসেছে- 'মুমিন যখন কোনো পাপ করে, তখন তার কলবে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর যখন সে তওবা করে এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ইস্তিগফার করে, তখন তার কলব দাগমুক্ত চকচকে হয়ে ওঠে। আর পাপাচার বেশি হলে কালো দাগও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে কলব বন্ধ হয়ে যায়। মরিচার কথা যা আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াতে উল্লেখ করেছেন। "কখনোই নয়; বরং তাদের কর্মই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।"' তিরমিজি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ : ৪২৪৪
পাঁচ. কর্মই হলো জীবিত মানুষের মিশন। যে মানুষ কোনো কাজ করে না, তার জীবিত থাকার অধিকার নেই। যতক্ষণ তার মাঝে জীবনের স্পন্দন আছে, ততক্ষণ তাকে কোনো না কোনো কাজ করতেই হবে; হোক তা দ্বীনি কিংবা দুনিয়াবি।
মুসলিমদের কাছে প্রসিদ্ধ প্রবাদটি বলেছে- 'দুনিয়ার সাথে এমন আচরণ করো, যেন তুমি সর্বদা বেঁচে থাকবে। আর আখিরাতের সাথে এমন আচরণ করো, যেন কালই তোমার মৃত্যু হবে।'
কালের প্রতি নিন্দাবাদ করা : আরেকটি নিষিদ্ধ ও নেতিবাচক কাজ হলো যুগকে দোষারোপ করা। সকল কাজে সময়ের জুলুম ও যুগের রুক্ষতাকে দায়ী করা। এমনকী অনেকে মনে করে- সময়ই তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সময় তার চরম শত্রু। সময় তার অগ্রগতিতে প্রধান বাধা। তাদের ধারণা- সময় হলো কোনো জালিম শাসক, যে নিরপরাধকে শাস্তি দিচ্ছে এবং পাপিষ্ঠের পক্ষ অবলম্বন করছে। সময়ই ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাচ্ছে এবং সে কোনো কারণ ছাড়াই এগুলো নিজের খেয়াল-খুশিমতো করছে কিংবা রাতকানা মতো এটা-সেটা করেই যাচ্ছে। একবার ঠিক করছে তো দশবার ভুল করছে।
এ ধরনের ভাবনাগুলো জাবরিয়্যাহ দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; যারা মানুষ ও সমাজকে দায়িত্বমুক্তির দিয়ে পাপাচারের দায় অন্য কিছুর ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। তারা নিজেদের কর্ম ও ভুলের দায় নিতে অস্বীকার করে; নিজ কর্মের দায় সময়, ভাগ্য, নসিব, তাকদির, বাস্তবতা কিংবা অন্য কিছুর ওপর চাপানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু তাদের উচিত তারা সকল বিপদ এবং যে সকল নেয়ামত থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা। বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে সমস্যার গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করা। সমস্যার কারণের সাথে পরিণতির আর পদক্ষেপের সাথে ফলাফল পাশাপাশি রেখে আল্লাহ নির্ধারিত সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ করা। সময় মূলত নিছক ক্রিয়ার আধার। আর সকল ক্রিয়াও আল্লাহর নির্ধারিত চিরন্তন নিয়মনীতি এবং সুন্নাত মেনে সংঘটিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সহিহ হাদিসে এসেছে- 'তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কেননা, আল্লাহ নিজেই সময়।' (অর্থাৎ তিনিই সকল রীতি-নীতির উদ্ভাবক এবং সঞ্চালক।) মুসলিম : ৫৭০১
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমরা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। তাদের সাথে রাসূল ﷺ ও ছিলেন। সত্তরজন বীর সাহাবি এ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পারস্পরিক আলোচনায় প্রসঙ্গ উঠেছিল, কেন তারা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন? কেন তাদের ওপর ঘাত-বিপদ নেমে এলো? তাদের এ সকল আলোচনার জবাব কুরআন দিয়েছে নিজস্ব ভাষায়- 'যখন তোমাদের ওপর কোনো মুসিবত এসে পৌঁছাল, অথচ তোমরা তার পূর্বে দ্বিগুণ কষ্টে আক্রান্ত, তখন কি তোমরা বলবে, এটা কোথা থেকে এলো? তখন তুমি তাদের বলে দাও, এ কষ্ট তোমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের ওপর ক্ষমতাশীল।' সূরা আলে ইমরান : ১৬৫
আরেকটি আয়াতে বিষয়টা আরও স্পষ্ট করে এসেছে- 'তার কারণ এই যে, আল্লাহ কখনো সেসব নেয়ামত পরিবর্তন করেন না, যা তিনি কোনো জাতিকে দান করেছিলেন। যতক্ষণ না সে জাতি নিজের জন্য নির্ধারিত বিষয় নিজেই পরিবর্তিত করে দেয়।' সূরা আনফাল : ৫৩
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের উচিত হবে কালকে বা সময়কে দোষারোপ করার আগে, সামাজিক অসংগতি এবং বিশৃঙ্খলা দূর করার আগে নিজের অবদান মূল্যায়ন করা; নিজের দোষটা দেখা।
এক জ্ঞানী ব্যক্তির কথা ছিল- ان الجديدين في طول اختلافهما
لا يفسدان ولكن يفسد الناس
'দুটো নতুনের মাঝে যত পার্থক্যই থাকুক না কেন, তারা ফ্যাসাদ দাঁড় করায় না।' ফ্যাসাদ মানুষই দাঁড় করায়।'
অন্য কবির ভাষায়- نعيب زماننا والعيب فينا * وما لزماننا عيب سوانا
ونهجو ذا الزمان بغير ذنب * ولو نطق الزمان بنا هجانا
'আমরা আমাদের সময়কে করছি দোষারোপ, অথচ আমাদের নিজেদেরই তো সকল দোষ।
আমরাই আমাদের সময়ের কলঙ্ক।
কী হবে দোষারোপ করে সময়ের মালিককে, সময় যদি বলা শুরু করে আমাদের কী হবে?'
আমরা কবি- সাহিত্যিকদের বিদ্রোহী উচ্চারণে সামাজিক পাপাচার এবং শাসকদের বাড়াবাড়ির দায় সময়ের ওপর চাপাতে দেখি। তারা মূলত সময় দ্বারা সেই সময়ের লোকজন এবং শাসকদের উদ্দেশ্য করেন। এক কবি বলেছেন- ساءت زمانی وهو بالجمل مولع * وبالبحث مختص
فقلت له: هل لك : فقال: سبيلاء* الى سبيل الى العلاء والنقص
সে হেসে বলল : মূর্খতা এবং অবক্ষয়ের উন্নতি ঠিকই হবে।'
'আমার সময়টি জাহেলিয়াতে আসক্ত, সে পাপাচার নিয়ে গর্ব করছে
অশ্লীলতা হয়ে পড়েছে তার অলঙ্কার, তাকে প্রশ্ন করলাম : তোমার কি কোনো উন্নতি হবে না?
কোনো এক জালিম বাদশাহর ব্যাপারে কথিত আছে- তিনি বলেছেন, 'সময় মানেই সুলতান।' তোমাদের কেউ সময়কে গালি দিলে (সুলতানকে গালি দেওয়ার অপরাধে) সাজাপ্রাপ্ত হবে।
কোনো মুসলিম যখন কোনো অপছন্দনীয় কাজ বা খারাপ বাক্য ব্যবহার করে, তার উচিত স্বীয় বিবেকবোধের কাছে ফিরে আসা এবং তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে রবের দরজায় কড়া নাড়া। সে আদি পিতা-মাতা আদম-হাওয়ার ভাষায় বলতে পারে- رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ.
'হে আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের দয়া না করো, তাহলে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল হয়ে পড়ব।' সূরা আরাফ : ২৩
তাদের যখন জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তখন তারা এ বাক্যে আল্লাহর দরবারে তওবা করেছিলেন।
অথবা তারা নবি মুসা কালিমুল্লাহর ভাষায় আল্লাহর দরবারে ধরনা দিতে পারে। যখন তিনি তাঁর রবের সান্নিধ্য থেকে নিজ কওমের কাছে ফিরে এলেন, তিনি দেখলেন কওমের লোকেরা তাঁর অবর্তমানে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। তারা এক লম্বা হাম্বা রব তোলা একটি গাড়ীর বাছুরের উপাসনা শুরু করেছে। আর তাঁর ভাই হারুন (আ.)-কে হিসেবে মানছে না। তাকে দুর্বল পেয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। তিনি মিনতি এবং দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেন- رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ.
'হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার ভাইকে। আর আমাদের দাখিল করো তোমার রহমতের মধ্যে। তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ রহমওয়ালা।' সূরা আরাফ : ১৫১
অথবা আল্লাহভীরু বান্দাদের ভাষায়- যখন তাদের ঈমানের নিদর্শন উপস্থাপনের প্রয়োজন এসে পড়ল, তারা নবিদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। আল্লাহর পথে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, কিন্তু ক্লান্তও হয়নি বা দমেও যায়নি। তাদের একটা কথা ছিল- رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.
'হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দাও। আমাদের কার্যক্রমের সীমালঙ্ঘন তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাদের কদমকে মজবুত রাখো এবং কাফির কওমের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।' সূরা আলে ইমরান : ১৪৭
অতঃপর আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম সকল প্রতিদান দান করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00