📄 দীর্ঘ হায়াত
হাদিসটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর গুরুত্ব বোঝার জন্য একটু বিরাম নেব। রাসূল ﷺ কেন কিয়ামত উপস্থিত হওয়ার পরও সুযোগ পেলে চারাগাছ রোপণ করার আদেশ দিলেন?
সেই ব্যক্তি এই গাছের ফল আসা পর্যন্ত জীবিত থাকবে না। সুতরাং স্পষ্টতই ভবিষ্যতে ফল পাওয়ার আশায় এই গাছ রোপণ করবে না। তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ গাছ থেকে ফল পাবে? এ সম্ভাবনাও এখানে নেই। যেমন : একজন মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ একটি জায়তুনের গাছ রোপণ করেছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি এ গাছটি কেন রোপণ করছেন? আপনার এক পা তো কবরে।' জবাবে তিনি বলেন, 'আমাদের আগে যারা রোপণ করেছে, তা থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি। আর তাই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রোপণ করে যাচ্ছি।'
কিন্তু হাদিসে যে অবস্থার বর্ণনা এসেছে, তাতে সে দিন যা রোপণ করা হবে, তা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য পরের দিন কেউ বেঁচে থাকবে না। কারণ, কিয়ামত এসে গেছে বা আসার উপক্রম হয়েছে; কারও বাঁচার আশা অবশিষ্ট নেই। সুতরাং এ মুহূর্তে বৃক্ষরোপণের আদেশ কেন?
বিষয়টি এখানে খুবই স্পষ্ট; কর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। কোনো মুহূর্ত হোক না নি উপকার, কাজ করতেই হবে- এ রকম নির্দেশনা। এখানে উপলব্ধি জাগত করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, একজন মুসলিম ব্যক্তির কখনো উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী একটি মুহূর্তও কর্মবিহীন থাকা জায়েজ নেই। আর তা ঐ ইসরাফিল ফুঁ দেওয়ার উদ্দেশ্যে শিং হাতে নেওয়ার পরও নয়, যদিও একটু পরেই দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ রকম একটি অবস্থায় গাছের চারা রোপণের আদেশ প্রদানের মাধ্যমে রাসূল ﷺ মূলত প্রত্যেকটি সময় যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অতীত বা ভবিষ্যৎ যাই হোক, চলমান মুহূর্তটি সর্বোত্তম কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্বভাবগতভাবে মানুষ বেঁচে থাকতে পছন্দ করে; জীবন দীর্ঘ করতে চায়। সম্ভব হলে চিরঞ্জীব হতে চায়। এই সহজাত বাসনার কারণেই ইবলিস আদি পিতা আদম (আ.)-এর ভেতরে প্রবেশ করে এবং ধোঁকাবাজির মাধ্যমে তাঁকে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণে প্ররোচিত করতে পারে। 'তখন শয়তান তাকে আশ্বাস দিলো। সে বলল, হে আদম! আমি কি আপনাকে সংবাদ দেবো এক অমর বৃক্ষের এবং এক অক্ষয় সাম্রাজ্যের?' সূরা ত্ব-হা : ১২০
আমাদের দ্বীনেও হায়াতকে নেয়ামত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যদি তা সত্যের বিজয় এবং নেক কাজে ব্যবহৃত হয়। নবি ﷺ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- 'কোন মানুষ সর্বোত্তম? জবাবে তিনি বলেন, যার জীবন দীর্ঘ হয়েছে এবং কর্ম সুন্দর হয়েছে।' তিরমিজি, তাবরানি, হাকিম
কিন্তু মৃত্যু হঠাৎ উপস্থিত হয়ে মানুষের সকল পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ভণ্ডুল করে দেয়। কত যুবককে যৌবনের শুরুতেই উঠিয়ে নেয়। কত নববিবাহিতাকে বিবাহের প্রথম দিনই গ্রাস করে। পরিবারের আদরের সন্তানকে মৃত্যু পেয়ে বসে। কত বিলাসী ধনীকে প্রাচুর্য ভরা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন থেকে কেড়ে নেয়।
কত শাসককে নিরাপত্তা ও অনুচরদের মাঝ থেকে নিয়ে যায়। এ কারণেই মৃত্যুকে বলা হয় 'বিলাস ছিনতাইকারী' এবং 'সমষ্টি বিচ্ছিন্নকারী'।
মৃত্যুই যখন আমাদের বিচারণার এবং জীবনের একমাত্র সমাপ্তি, তখন সন্দেহাতীতভাবে জীবন খুবই সীমিত। মানুষের আকাঙ্ক্ষা যতই দীর্ঘ হোক না কেন, জীবন যতই লম্বা হোক না কেন, বাস্তবে তা গণনারযোগ্য কিছুদিন; সীমিত কিছু নিঃশ্বাসের সমষ্টি, মৃত্যু কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই যাকে শেষ করে দেবে।
حكم المنية في البرية جار * ما هذه الدنيا بدار قرار
بينا يرى الانسان فيها مخبرا * حتى يرى خبرا من الاخبار
'বৃক্ষহীন কোনো প্রান্তরেও আশার বীজ বোনা যায়, কিন্তু দুনিয়া স্থির কোনো আবাস নয়।
এখানে মানুষ শত সংবাদ বহন করে, একদিন সে নিজেই (শোক) সংবাদে পরিণত হয়।'
হাদিসে এসেছে- 'তোমার যেভাবে ইচ্ছা জীবনযাপন করো। কারণ, একদিন তুমি মৃত। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসো, তার থেকে তোমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যা ইচ্ছা করতে থাকো। তার প্রতিদানই তোমাকে দেওয়া হবে, তুমি তারই ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।' তাবরানি
আবুল আতাহিয়্যাহ সঠিকভাবে বলেছেন- بين عينى كل حي * علم الموت يلوح
يا مسكين ان كنت تنوح * لتموتن وان عمرت ما عمر نوح
'একেকটি মৃত্যু সংবাদ তোমাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, যদি তোমার কান্না আসে তবে নিজের জন্য কাঁদো,
তোমাকে মরতেই হবে, নূহের মতো লম্বা জীবন পেলেও।'
যে চিকিৎসাবিজ্ঞান হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, যে বিজ্ঞান চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, সেই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান বার্ধক্য মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। রাসূলের উক্তিটি এখানে যথোপযুক্ত- 'আল্লাহ সকল রোগের সাথে শেফা নাজিল করেছেন; শুধু বার্ধক্য ছাড়া।'
মানুষের শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য-এ চক্রেই বন্দি। তাহলে কীভাবে সে তার জীবনকে লম্বা করতে পারে? সত্যি বলতে মানুষের আসল জীবন জন্মদিন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের সমষ্টি নয়; প্রকৃত জীবন হলো আল্লাহর খাতায় লিখিত তার সৎ ও কল্যাণকর কাজের যোগফল।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- এমন মানুষও পাওয়া যাবে যার জীবনকাল একশো বছরের চেয়ে বেশি, কিন্তু তাকওয়া ও সৎকাজের অর্জন শূন্য বা তারও নিচে। লেনদেনের ভাষায় সে উল্টো ঋণী। আবার কোনো লোককে যুবক অবস্থায় মারা যেতে দেখা যায়, কিন্তু প্রাচুর্য হওয়ার পর তার ক্ষুদ্র নামীয় কর্মী মর্যাদাপূর্ণ কর্মে ভরপুর।
আবুকার আল হিকাম বলেন- 'বহু জীবন আছে যার সময়সীমা অনেক লম্বা, কিন্তু প্রাপ্তি অর্জনের পরিধি খুবই সীমিত। আবার বহু কম সময় পাওয়া জীবনে অর্জন বেশি সমৃদ্ধ। যার জীবনে বরকত দেওয়া হয়, সে স্বল্প সময়ে বর্ণনাতীত এবং অভাবনীয় রহমত লাভ করতে সক্ষম হয়।'
সুতরাং কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর সৃষ্টির ওপর ইহসান করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে জীবনকে লম্বা করতে পারে। আর বান্দার কর্মনিষ্ঠা ও সততায় পরিপূর্ণ হলে তার মর্যাদা এবং প্রতিদান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য বেড়ে যায়।
আর যাদের কর্মে অন্যায় ও উপকৃত বা প্রভাবিত হয়, তাদের কর্মের মূল্যায়ন সেই উপকার বা প্রভাবের বিস্তৃতি অনুযায়ী হবে। সেই ব্যক্তি বা সমষ্টিকে সৎপথ প্রদর্শন, তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, কারও বিপদ দূরীকরণে সহায়তা, কারও ওপর থেকে জুলুম উঠিয়ে নেওয়া বা তাদের শত্রুকে প্রতিহত করা ইত্যাদি কাজের নানামুখী ফলাফল রয়েছে। এ কাজগুলো থেকে কখনো শুধু একজন লোক উপকৃত হয়, কখনো একটি গ্রুপ উপকার পায়, আবার কখনো বিশাল সংখ্যক মানুষ এ থেকে ধারাবাহিক সুবিধা পেতে থাকে।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, দাওয়াহ ইলাল্লাহ এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মতো অবস্থানে বিবেচনায় আল্লাহর কাছে শীর্ষে। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'যে সত্যের দিকে ডাকে, তার জন্য যারা তাকে অনুসরণ করবে, তাদের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে অনুসরণকারীদের প্রতিদানে কোনো কমতি হবে না।' মুসলিম
তিনি আরও বলেন- 'জান্নাতে একশোটি স্তর আছে। এগুলো আল্লাহ তাঁর পথে জিহাদকারীর জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। প্রত্যেকটি স্তরের মাঝে পার্থক্য আসমান-জমিন পার্থক্যের সমান।' বুখারি
অনুরূপভাবে, শাসক এবং প্রশাসকদের ন্যায়পরায়ণতা, যাতে রয়েছে বিশাল সংখ্যক মানুষ তথা কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর কল্যাণ। রয়েছে নফসের সাথে জিহাদ, প্রকৃতি সৃষ্ট বিতর্কের মোকাবিলা। এ কারণেই হাদিসে এসেছে- 'একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের একদিন ষাট বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম।' তাবরানি
'একদিন রাসূল ﷺ -এর এক সাহাবি এক গিরিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে একটি মিষ্টি পানির ঝরনা ছিল। জায়গাটা তাঁর খুবই পছন্দ হয়। তিনি বলেন, "আমি যদি মানবসমাজ পরিত্যাগ করে নির্জনবাস গ্রহণ করি, তবে এই গিরিপথেই অবস্থান করব (ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জন্য)। কিন্তু আমি রাসূলের ﷺ অনুমতি ব্যতীত তা করব না।" তিনি আল্লাহর রাসূলকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, রাসূল ﷺ বলেন, "তুমি এটা করো না। কারণ, আল্লাহর রাস্তায় অবস্থান করা, আপন ঘরে সত্তর বছর সালাত আদায় করার চেয়ে উত্তম। তোমরা কি চাও না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন এবং জান্নাতে প্রবেশ করান? আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। যে আল্লাহর পথে উটের দুধ দোহনের বিরতিকাল সমান সময় যুদ্ধ করে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।"' তিরমিজি ও হাকিম
এভাবেই মানুষের কর্ম একটির চেয়ে অন্যটি মর্যাদায় কম-বেশি হয়। তার প্রভাব বিভিন্ন রকমের হয়। আর সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে সর্বোত্তম বাক্যের ওপর গুরুত্ব দেয়।
আল্লাহর বাণী- 'বান্দাদের সুসংবাদ দাও, যারা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং সর্বোত্তমটার অনুসরণ করে।' সূরা জুমার : ১৭-১৮
বহু মানুষ খুবই অল্প সময়ে বড়ো বড়ো কাজ করে চমক লাগিয়ে দিয়েছেন। তাদের কারও কারও সাফল্যকে অলৌকিক মনে করা হয়, কিন্তু তা মোটেও অলৌকিক নয়; তা বরকত এবং আল্লাহ প্রদত্ত তৌফিকের ফল।
এতটুকু বর্ণনা যথেষ্ট যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ মানবজাতিকে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বের করে আলোর সোনার তোরার দিকে নিয়ে আসেন। তিনি মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে, বর্তমান অবস্থায় নিয়ে আসেন। তিনি মাত্র তেইশ বছর সময় নিয়েছিলেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি একটি নতুন দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন; অনন্য চরিত্রের প্রজন্ম গড়ে তুলেছেন। একটি উপমাযোগ্য উম্মাহর গোড়াপত্তন করেছেন, বিশ্বজয়ী চরিত্রের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি এসব কিছু করেছেন মাত্র কয়েকটি বছরের মধ্যেই। যদিও প্রথম দিন থেকেই তাঁর পথ নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতায় ফিরে রেখেছিল।
এটা বলবেন না যে, রাসূল ﷺ তো মুজিজা দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁর মতো কে আছে? তাঁর তুলনায় আমরা কারা?
বাস্তবতা হলো, আল্লাহর রাসূলের ﷺ দাওয়াতি ও জিহাদি জীবন ছিল সম্পূর্ণ সাধারণ মানবীয় পদ্ধতির আলোকে। তাঁর মুজিজাগুলো সাধারণ মানুষের বুদ্ধিকে অচল করে দেওয়ার মতো অলৌকিক কিছু ছিল না। তাঁর মুজিজা ছিল আল কুরআন। আর মুজিজা আসে দুনিয়াবি সকল প্রচেষ্টা ও উপকরণ ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ার পর। যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ব্যতীত কোনো উপায় থাকে না। যেমন : হিজরতের দিন আল্লাহ তাকে প্রশান্তির চাদর দিয়েছিলেন। এক অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী দিয়ে শক্তিশালী করেছিলেন। অনুরূপভাবে বদর যুদ্ধের দিন সকল প্রকার বৈষয়িক প্রস্তুতি সম্পন্নর পর আল্লাহ তাদের পেছনে এক হাজার ফেরেশতার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।
'আল্লাহ এ ব্যবস্থা করেন একটি শুভ সংবাদ হিসেবে এবং এর ফলে যেন তোমাদের মন প্রশান্তি লাভ করে।' সূরা আনফাল : ১০
খোলাফায়ে রাশেদিন, তাদের সহযোগী সাহাবিগণ ও তাবেয়িদের জীবনচরিতের দিকে তাকান। তারা কীভাবে জ্যামিতিক হারে দেশের পর দেশ জয় করেছে? কীভাবে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে? কীভাবে পৃথিবীর জাতি-গোষ্ঠীগুলোকে শিক্ষিত করে তুলেছে? মাত্র কয়েক দশকে কীভাবে তাদের জাহেলি ধর্ম, নিজস্ব আচার-আচরণ এবং ঐতিহ্য থেকে বের করে এনেছে? ইতিহাসবেত্তারা এখানে এসে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। এক শতাব্দীরও কম সময়ের মাঝে ইসলাম কীভাবে বিশ্বব্যাপী একটি ধর্মীয়, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনগত সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিপ্লব সম্পাদন করেছিল?
উমর ইবনে আব্দুল আজিজের খিলাফতের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। যিনি খিলাফতকে তার মূলধারায় ফিরিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া অধিকারসমূহ উপযুক্ত ব্যক্তিদের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। আমানতসমূহ প্রাপ্ত মালিকের কাছে ফেরত দিতে চাইলেন। আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি মাত্র আড়াই বছর সময় পেয়েছিলেন। এটাই ছিল তাঁর পূর্ণ খিলাফত। তিনি আল্লাহর জমিনে ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারে ভরপুর করে দিলেন।
যখন সত্য পথে চলার প্রতিবন্ধকতা বেড়ে যায়, তখন দ্বীনি মানদণ্ডে তার ওজনও বেড়ে যায়। যখন কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তার প্রতিদানও সমান্তরাল গতিতে বাড়তে থাকে। তার চলার সাথি যখন কমে যায়, আল্লাহর দরবারে তার প্রতিদানও বেড়ে যায়।
এখানেই পরবর্তী সময়ের লোকদের ওপর সাহাবিদের শ্রেষ্ঠত্ব। কারণ, তারা ঈমান এনেছিল; যদিও সে সময় অধিকাংশ মানুষই ছিল কাফির। তারা রাসূলের বাণীকে সত্যায়ন করেছিল, যখন মানুষ একে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। একইভাবে মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে যারা শুরুর দিকে ঈমান এনেছে, তাদের মর্যাদা পরবর্তী সময়ের সাহাবিদের তুলনায় অনেক বেশি। মক্কা বিজয়ের আগের সাহাবি এবং পরের সাহাবিদের মর্যাদায় পার্থক্য এখানেই। পার্থক্য আছে যারা ইসলামে শক্তি প্রকাশ হওয়ার আগে ও পরে ঈমান এনেছে তাদের মধ্যে। এ ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্য- 'তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের ব্যয় করেছে এবং এরপর যুদ্ধ করেছে, তারা ওইসব লোকদের চেয়ে মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, যারা ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে বিজয়ের পরে। তবে আল্লাহ উভয়ের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন।' সূরা হাদিদ : ১০
একই কারণে অস্তিত্বশীল পরিবেশে সংস্কারধর্মী কাজ আল্লাহর কাছে উচ্চমানের মর্যাদাপূর্ণ। শাসকরা সীমালঙ্ঘনে ব্যস্ত, ধনীরা বিলাসিতায় নিমজ্জিত, ক্ষমতাবানরা জোর-জবরদস্তিতে মগ্ন, গোলামরা তোষামোদিতে লিপ্ত, পাপাচারে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে, সর্বত্র অন্যায়ের সয়লাব হয়ে সৎকর্ম চাপা পড়ে গেছে। এটা সেই সময়, যাকে আলিমগণ 'ফিতনা এবং ফাসাদের সময়' বলে অভিহিত করেছেন। আমরা এর নাম দিয়েছি 'আধুনিক জাহেলিয়াত'। এ রকম এক সময়ে যারা আল্লাহর দ্বীনের যথাযথ অনুসরণ করবে এবং তাঁর দ্বীনের জন্য কাজ করবে, তারা যেন 'আধুনিক সাহাবি'। সময়টা এতই ভয়ানক যে, দ্বীনের যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে; সামনে শুধু জাহেলিয়াত।
সহিহ হাদিসে এসেছে, নবি ﷺ বলেছেন- 'হারজ' অবস্থায় ইবাদত আমার দিকে হিজরতের মতো।' মুসলিম, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ
হাফেজ আল মুনজির (র) বলেন, 'হারজ হলো ফিতনা ও ইখতিলাফ।' কোনো কোনো হাদিসে তিনি হারজকে কতল (হত্যা) শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। কারণ, ফিতনা ও ইখতিলাফ কতল-এর একটি উপাদান। তিনি হারজকে তার উপাদানের জায়গায় নিয়ে এসেছেন।
আর উমাইয়া আশ-শাবানি থেকে বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন- 'আমি আবু সালাবার নিকট গেলাম। বললাম, এ আয়াতকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? তিনি বলেন, কোন আয়াত? আমি আয়াতটি তিলাওয়াত করলাম। "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা করো। তোমরা যখন সৎ পথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রষ্ট হলে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই।" সূরা মায়েদা : ১০৫
তিনি জবাবে বলেন, তুমি এ ব্যাপারে জানা লোককেই প্রশ্ন করেছ। এ নিয়ে আমি আল্লাহর রাসূলকে ﷺ প্রশ্ন করেছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন, তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজে নিষেধ করতে থাকো। তোমাদের পরে এমন এক যুগ আসবে, যখন তুমি লোকদের কল্পনার আনুগত্য করতে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে, পার্থিব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে এবং প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে নিজের বুদ্ধিমত্তায় নিয়ে অহংকার করতে দেখবে। আর তুমি এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার থাকবে না। এরূপ পরিস্থিতিতে তুমি নিজের হেফাজত করো এবং সর্বসাধারণের চিন্তা ছেড়ে দাও। তোমাদের পরে আসবে কঠিন ধৈর্যের পরীক্ষা যুগ। তখন ধৈর্যধারণ করাটা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার মতো কঠিন হবে। সে যুগে কেউ নেক আমল করলে তার সমকক্ষ পঞ্চাশ ব্যক্তির সওয়াব তাকে দান করা হবে।' তিরমিজি, ইবনে মাজাহ
ইমাম আবু দাউদের বর্ণনায় আরেকটি কথা বেশি এসেছে। তা হলো- 'জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রাসূল! আমাদের পঞ্চাশজন নাকি তাদের পঞ্চাশজনের সমান। তিনি বলেন, তোমাদের পঞ্চাশজনের সমান।'
বিভিন্ন বর্ণনায় প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় রাসূলের একটি হাদিস এসেছে। তিনি বলেন- 'তোমরা কল্যাণকর কাজে সহযোগী পাও, কিন্তু তারা কোনো সহযোগী পাবে না।'
হাদিসের ভাষ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসলাম প্রসারিত হওয়ার পর যখন মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছিল এবং এবং সৎকাজে যথেষ্ট সংখ্যক সঙ্গী পাচ্ছিল।
তবে প্রথম যুগে মুহাজির ও আনসারদের কথা ভিন্ন। তারা ইসলামের পথে চলার সময় কোনো সাহায্যকারী পায়নি; বরং পদে পদে বাধা ছিল। গোটা আরব এক হয়ে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সুতরাং মর্যাদায় তাদের নিকটবর্তী কেউ-ই হতে পারে না।
হাদিসটি আমার বিন মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারকে ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়াজিব করে দিয়েছে, যতক্ষণ দ্বীনের শ্রবণশক্তি থাকবে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন থাকবে কিংবা কোনোভাবে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বাকি থাকে। কিন্তু যখন সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়, সকল উপকরণ অকেজো হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি শক্তি ও সম্ভাবনার বাইরে চলে যায়, তখন বলা হয়েছে- 'আর তুমি এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার থাকবে না...'
অর্থাৎ পরিস্থিতি যখন তোমার সামর্থ্য ও ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এ সময় মুমিন لا حول ولا قوة الا بالله ছাড়া অন্য কিছুর মালিক নয়, যতক্ষণ না আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোনো ফয়সালা চলে না আসে।
আর সবার মানে নেতিবাচক কোনোকিছু নয়; বরং মানসিকতাকে তীব্র কষ্ট সত্ত্বেও স্থিরচিত্তে অবস্থানে অবস্থান। এ অপেক্ষার ঠিক আগুনের ওপর পাতিলের অবস্থার মতো। আর একারণেই হাদিসে এই সবরকে জলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এখানে সবরের মানে হীনমন্যতামূলক গর্তে চিন্তায় মগ্ন হওয়া; যা জাহেলিয়াতকে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে সক্ষম। সত্যিকারের মুমিনরা এ কাজে একে অপরকে সহায়তা করে। কারণ, তা একাকী করা অসম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সামষ্টিক প্রচেষ্টায় সহজ হয়। মানুষ একত্রিত হলে তা সামাজিক মহীরুহে আকার ধারণ করতে সক্ষম। আর আল্লাহর হাত সকল সামষ্টিক প্রচেষ্টার সাথে।
সম্ভবত একজনকে পঞ্চাশজনের সমান প্রতিদান দেওয়া সংক্রান্ত হাদিসের অর্থ এটাই- পঞ্চাশজন মিলে একজনের সমান কাজ করে। ভিন্ন কথায় একই পঞ্চাশজনের সমান কাজ করে কিংবা পঞ্চাশজন সাহাবির সমান প্রতিদানের অর্থ হলো উল্লেখিত আমলগুলো সাহাবিদের আমলের মতোই। যেমন : সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকা, ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে একত্রিত হওয়া, জাহেলিয়াতের মোকাবিলায় নিঃশেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া এবং এসব কাজে সবর করার পাশাপাশি সবরের প্রতিযোগিতা করা। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।
📄 মানুষের দ্বিতীয় জীবন
যেভাবে মানুষ তার জীবনকে লম্বা করতে পারে, একইভাবে মৃত্যুপবর্তী সময়েও জীবনকে প্রসারিত করতে পারে। সে মৃত হয়েও জীবিত থাকে; কবর থেকেই জীবন্ত মানুষের জন্য বার্তা পাঠাতে থাকে।
আর এটা তখনই সম্ভব হয়, যখন তার রেখে যাওয়া কিছু থেকে মানুষ উপকৃত হয়। যেমন : উপকারী জ্ঞান, উত্তম আমল, ভালো কোনো নিদর্শন কিংবা সুন্দর কোনো রীতি-রেওয়াজ, যা মানুষ অনুসরণ করে। যা থেকে সুফল আসতে থাকে অথবা তার নেক সন্তান- যাকে সে উত্তমভাবে গড়ে তুলেছে। ফলে সে সুন্দর চরিত্র নিয়ে জীবনকাল অতিক্রম করছে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রা থেকে আল্লাহর রাসূলের ﷺ একটি হাদিস বর্ণনা করেন- 'আদম সন্তানের মৃত্যুর সাথে সাথে আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি বিষয় ছাড়া; সাদাকায়ে জারিয়া, উপকৃত হওয়া যায় এমন জ্ঞান এবং সৎকর্মশীল সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে।'
অন্য একটি হাদিসে এই তিনটি বিস্তারিত এসেছে- হজরত আবু হুরায়রা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন- 'নিশ্চয় ঈমানদারের মৃত্যুর পরেও তার আমল ও পুণ্যকর্ম থেকে যে সমস্ত বিষয় (তার আমলনামায়) যুক্ত হতে থাকবে। তা হচ্ছে-
১. এমন ইলম ও জ্ঞান, যা সে অন্যকে শিখিয়েছে এবং প্রসার করেছে।
২. সৎ সন্তান, যা সে দুনিয়ায় রেখে গেছে।
৩. কুরআন মাজিদ, যা সে তার উত্তরসূরিদের জন্য ছেড়ে এসেছে।
৪. মসজিদ, যা সে নির্মাণ করেছে।
৫. সরাইখানা, যা সে বানিয়েছে।
৬. নদী, যা সে খনন করেছে।
৭. এমন সাদাকা, যা সে তার সম্পদ থেকে সুস্থাবস্থায় স্থায়ী জীবদ্দশায় দান করেছে।'
এমন বিষয়গুলোর সওয়াব মৃত্যুর পরেও তার আমলনামায় যুক্ত হবে।
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিমে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন- 'যে একটি সুন্দর রীতি চালু করল, সে তার প্রতিদান পাবে। সাথে সাথে কিয়ামত পর্যন্ত যারা এর ওপর আমল করবে, তার প্রতিদানও সে পাবে।' ইবনে মাজাহ : ২৪২
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি।' সূরা ইয়াসিন : ১২
'সেদিন মানুষকে জানানো হবে, সে কী আগে পাঠিয়েছে আর কী পেছনে রেখে এসেছে।' সূরা কিয়ামাহ : ১৩
আর এ ব্যাপারে মানুষ একমত যে, মৃত্যুর পর উত্তম কাজের প্রশংসা তার অন্য একটি জীবন। সীমিত সময়ের জীবনে সন্নিবেশিত অনির্ধারিত এক জীবন। মুতানাব্বি বলেছেন- ذكر الفتى عمره الثاني, وحاجته
ما قاته, وفضول العيش أشغال
'মৃত্যু পরবর্তী স্মরণ মানুষের দ্বিতীয় জীবন, এটা তার আমলনামাকে মোটাতাজা করে।
তাকে অতিরিক্ত কর্মময় জীবন উপহার দেয়।'
আহমদ শাওকি এই ভাবটি ধারণ করে তাকে আরও জীবন্ত শব্দে ব্যক্ত করেন- তিনি মুস্তাফা কামালের শোকগাথায় বলেন- ان الحياة دقائق وثوان
فارفع لنفسك بعد موتك ذكرها * فالذكر للانسان عمر ثان
'অন্তরের ধুকধুকানি তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবন কিছু মিনিট আর সেকেন্ড।
মৃত্যুর পর তোমার জিকির (স্মরণ) আয়োজন করো।
জিকির মানুষের দ্বিতীয় জীবন।'
আবুল আম্বিয়া ইবরাহিম খালিফুল্লাহর দুআ ছিল- 'এবং আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে সত্যভাষী করো।' সূরা শুআরা : ৮৪
দুজন লোকের মাঝে কত তফাত! একজন মৃত্যুবরণ করার পর আশেপাশের সব হৃদয় ব্যথিত, চোখগুলো ক্রন্দনরত। সবার মুখে তার প্রশংসা উচ্চারিত হচ্ছে, দুআ করা হচ্ছে। আর আরেকজন মৃত্যুবরণ করল, কিন্তু কোনো চোখ তার জন্য কাঁদল না, তার বিয়োগে কোনো হৃদয় ব্যথিত হলো না। কোনো কণ্ঠ তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করল না। এটা তাদের ক্ষেত্রে হয়, যারা নেতিবাচক মানসিকতায় জীবন কাটিয়ে দেয় কিংবা মানুষের সঙ্গে জুলুম-জবরদস্তি করে। তাদের ব্যাপারে কবি বলেন- فذاك اذ ان عاش لم ينتفع به
وان مات لم تحزن عليه اقاربه!
'এই হলো সে, যতদিন জীবিত ছিল, কারও উপকারে আসেনি।
আর যখন সে মরল, স্বজনরাও ব্যথা পায়নি।'
আর কুরআনে তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে- 'তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান, কত ঝরনা, কত সুরম্য স্থান! কত সুখের উপকরণ; যাতে তারা উল্লাস করত। অতঃপর আমি এগুলোর মালিক বানিয়েছিলাম আরেক সম্প্রদায়কে। তাদের জন্য ক্রন্দন করেনি আকাশ-জমিনের কেউ। তারা কোনো অবকাশও পায়নি।' সূরা দুখান : ২৫-২৯
অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু তাদের জুলুম ও পাপাচার মৃত্যুবরণ করে না। তাদের কুফরি ও ভ্রষ্টপথ থেকে যায়। তাদের ছাত্র ও অনুসারীরা এগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পায় এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করে।
যে ব্যক্তি কোনো উত্তম সুন্নাহ (রীতি) চালু করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত তার সওয়াব পেতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোনো খারাপ সুন্নাহ (রীতি) চালু করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত তার শাস্তি ভোগ করবে। যেহেতু উপকারী জ্ঞান রেখে যাওয়ায় ব্যক্তির উত্তম আমল জারি থাকে, তাই খারাপ কোনো নিদর্শন রেখে গেলে বা ভ্রষ্ট কোনো চিন্তা রেখে গেলে, তারও মন্দ আমল জারি থাকবে।
তাদের কত খারাপ অবস্থা না হবে! মাটি যাদের ঠিকানা হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের পাপাচার কর্ম, অন্যায় কথাবার্তা এবং বিদ্রোহ ও বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা বিভিন্ন বই-পুস্তক, প্রবন্ধ, ডকুমেন্টারি, ফিল্ম, ক্যাসেটে রেকর্ড, বিভিন্ন প্রযুক্তির কল্যাণে রয়ে গেছে। এগুলো মানুষের চিন্তা ও মননে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যাচ্ছে। আর অন্যদিকে জাহান্নামও তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এ কারণেই সালেহিনরা বলেন- 'সুসংবাদ তার জন্য, যে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার পাপগুলোও মৃত্যুবরণ করেছে। আর ধ্বংস তার জন্য, যে মরে গেছে, কিন্তু তার পাপাচার রয়ে গেছে।'
📄 সময় নষ্ট হয় যেভাবে
বেশ কয়েকটি কারণে আমাদের সময়গুলো নষ্ট হয়ে যায়। এগুলোর ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে; নতুবা এই কারণগুলো আমাদের জীবনকে গিলে ফেলবে। জীবন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমরা কোনো পাথেয় সংগ্রহ করতে পারব না। এগুলো মধ্যে রয়েছে-
অন্যমনস্কতা : এটা এমন এক রোগ, যা মানুষের বোধশক্তি ও মননকে আচ্ছন্ন করে বসে। চলমান ঘটনাপুঞ্জ এবং দিন- রাত নিয়ে কোনো খবর থাকে না। সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও পরিণামদর্শিতা হারিয়ে থাকে; তাত্ত্বিক বিষয়গুলো মাথায় ঢোকে না। চিন্তায় মৌলিক কোনো অর্থপূর্ণ বিষয় আসে না: কেবল খোসা নিয়েই ভাবতে থাকে; শ্বাস- প্রশ্বাস নিয়ে চিন্তা পৌঁছে না। শুধু খোল নিয়ে পড়ে থাকে, তারপরে কী হবে জানে না।
কুরআনুল কারিমে অন্যমনস্কতা নিয়ে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এটা তাদের জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত করবে। আর বানাবে নির্বাক জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে বেশি ভ্রষ্ট।
'আমরা জাহান্নামের জন্যই তৈরি করেছি জিন ও ইনসানের অনেককে। তাদের অন্তর আছে, তবে তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে, তবে তা দিয়ে দেখে না। তাদের কান আছে, তবে তা দিয়ে তারা শোনে না। এরা হলো পশুর মতো; বরং আরও অধিক বিভ্রান্ত এবং অচেতন।' সূরা আরাফ : ১৭৯
যারা মৌলিকত্ব ও নির্যাস বাদ দিয়ে বাহ্যিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেয়, কুরআন তাদের অভিযুক্ত করে বলেছে- 'তবে অধিকাংশ মানুষই জানে না। তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিকটাই জানে আর আখিরাত সম্পর্কে তারা একেবারেই গাফিল-অজ্ঞ।' সূরা রুম : ৬-৭
রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেছে- 'তোমার প্রভুকে স্মরণ করো মনে মনে, বিনয়ের সাথে, অন্তরের ভয় নিয়ে, অনুচ্চ স্বরে, সকালে এবং সন্ধ্যায়। আর তুমি (এ ব্যাপারে) উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।' সূরা আরাফ : ২০৫
অন্য একটি আয়াতে এসেছে- 'তুমি এমন কারও আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমরা আমাদের জিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, আর যার কর্মকাণ্ডও সীমালঙ্ঘনমূলক।' সূরা কাহফ : ২৮
বিপদজনক ব্যাপার হলো, আমাদের উম্মাহর ওপর দিয়ে পাহাড় নাড়িয়ে দেওয়া ভূমিকম্পের ন্যায় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু এ উম্মাহ সেখান থেকে কোনো কোনো শিক্ষাই নিচ্ছে না। তাদের কর্মে কোনো পরিবর্তন আনছে না, তাদের প্রশান্ত চিন্তাকে নাড়া দিতে পারছে না। যেন এটা একটা পুতুল; যেভাবে নাঁচায় সেভাবে নাঁচেতেই থাকে। এ কারণেই আবু বকর দুআ করতেন- اللَّهُمْ لَا تَدَعْنِيْ فِيْ غَمْرَةٍ وَلا تَأْخُذْنِيْ عَلَى غِرَّةٍ وَلاَ تَجْعَلْنِيْ مَعَ الْغَافِلِينَ.
'হে আল্লাহ! অজ্ঞতার অন্ধকারে ছেড়ে দেবেন না। আকস্মিক পাকড়াও করবেন না। আমাদের অসতর্কদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।'
সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ বলতেন, তিন প্রকারের মানুষের সাহচর্য থেকে সতর্ক থেক। তোষামোদকারী পাঠক (জ্ঞানী), জ্ঞানবিমুখ মূর্খ সুফি এবং বেচারাকারী অন্যমনস্ক।
ভবিষ্যতের জন্য রাখা : এখানে আরও বেশি ক্ষতিকর একটি আপদ রয়েছে, যা মানুষকে আজকের দিন এবং বর্তমান থেকে উপকৃত হতে দেয় না। তা হলো কালক্ষেপণ, দীর্ঘসূত্রিতা বা গতিহীনতা। এটা মানুষের চরিত্র ও অভ্যাসের সাথে এমন একটি বাক্যকে যুক্ত করে দেয় যে- হুম! আমরা কাজটা করব, অচিরেই করব; বিষয়টা চিন্তায় আছে।
সে যুগের একজন অভিজ্ঞ জ্ঞানী লোককে বলা হলো, 'আমাদের কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বললেন, 'তোমরা সওফ (শীঘ্রই) শব্দ উচ্চারণ থেকে দূরে থেক।' (আরবি সওফ শব্দটি ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার অর্থ দেয়।)
আরেকজন বলল- সওফ হলো ইবলিসের সেনাবাহিনীর এক সৈন্য।
এটা তোমার আজকের দিনের অধিকার। তা উপকারী জ্ঞান অর্জন কিংবা ভালো কোনো কাজে আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখবে না।
বর্তমান তোমাকে ফাঁকি দিয়ে অতীত হয়ে যাবে। আর অতীত কখনো ফিরে আসে না। সুতরাং তোমার আজকের দিনকে কাজে লাগাও, যাতে আগামীতে তার ফসল তুলতে পারো। নচেৎ তোমাকে অনুশোচনা করতে হবে। কোনো কাজে আসবে না। যদিও সে সময় অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না।
فما لك يوم الحشر شيء سوى الذى * تزودته قبل الممات الى الحشر
اذا انت لم تزرع وابصرت حاصدا * ندمت على التفريط في زمن البذر
'মৃত্যুর পূর্বেই যা কিছু অর্জন করেছ, তা বিনা কিছুই পাশে পাবে না হাশরের মাঠে।
চাষাবাদ না করে ফসল আনলে যত ধন্যবাদ না করে যদি ফসল আনতে যাও অলসতার জন্য পস্তাবে তুমি বপনের দিনে।'
ইমাম হাসান বসরি বলেন- 'কোনো কাজ কালকের জন্য ফেলে রেখ না। আজকের দিনটি তোমার এবং কালকের দিন তোমার নয়। যদি কালকের দিন হয়, তাহলে ঠিক একই রকম হওয়া উচিত, যেমন হওয়া উচিত আজকের দিনটি। যদি তুমি কালকের দিনটি না পাও, তাহলে আজকের অবহেলার জন্য তোমাকে আফসোস করতে হবে না।'
পর্যটক মুহাম্মদ ইবনে সামিরা ইউসুফ ইবনে আসবাতকে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটির ভাষ্য হলো- 'আমার ভাই! তোমার মন এবং হৃদয়ের ওপর গড়িমসিকে প্রাধান্য বিস্তার করতে দিয়ো না। এটা অবসাদ এবং ধ্বংসের কারণ। এর মাধ্যমে উদ্যমতা মরে যায়। জীবন হেলায়-ফেলায় চলে। যদি তুমি গড়িমসি করতে শুরু করো, তবে তা তোমার ইচ্ছাশক্তির ওপর চেপে বসবে। তোমার সংকল্পের ওপর কামনা-বাসনা কর্তৃত্ব স্থাপন করবে। শরীরের ওপর চেপে বসা অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তোমার শরীর যেন আরাম না খোঁজে। তোমার কাজ দ্রুত সম্পাদন করো। দ্রুততার প্রতিযোগিতায় নামো। তুমিই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। কর্মে ঐকান্তিক হও। প্রতিটি কাজেই মর্যাদার। অলসতা ছেড়ে দাও। উচ্ছ্বাসী জীবনে অভ্যস্ত হও, সতর্ক হও। কেউ তোমাকে ভিন্ন পথে ঠেলে দিচ্ছে না একটু চিন্তা করে দেখ। নিয়মিত আত্মসমালোচনা করো। তোমার অর্জন কী? কোথায় শিথিলতা করেছ? কোনটা অন্যায়? কোনটা সফলতা? সকল কর্মের লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। তোমার মৃত্যুর আগেই আমলনামাকে সমৃদ্ধ করার কাজে নেমে পড়ো, যাতে পরে অনুশোচনা করতে না হয়।'
গড়িমসি ভয়াবহতা : গড়িমসি এবং আজকের কাজকে আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখার অনেকগুলো ভয়াবহ দিক রয়েছে। যথা :
এক. তুমি কাল পর্যন্ত বাঁচবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
একজন শাসক জনৈক সালেহ ব্যক্তিকে খাবারের টেবিলে আহ্বান করলেন। তিনি বলেন, 'আমি রোজাদার।' শাসক বললেন, 'আজ আমাদের সাথে খাও। কাল রোজা রেখ।' তিনি জবাবে বলেন, 'আপনি কি আমার কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারেন?'
একজন মানুষ কীভাবে অন্য মানুষের জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারে? মৃত্যু তো যেকোনো সময় হাজির হয়ে মানুষকে থামিয়ে দেয়। প্রথিতযশা এক কবি বলেছেন- تزود من التقوى فانك لا تدرى * اذا جن ليل هل تعيش الى الفجر
فكم من سليم مات من غير علة * وكم من سقيم عاش حينا من الدهر
وكم من فتى يمسى ويصبح امنا * وقد نسجت اكفانه وهو لا يدرى
'তাকওয়ার রসদ সংগ্রহ করো। কারণ, তুমি তো জানো না
রাতের শেষে ফজরের পর বাঁচবে কি না?
অথচ কত সুস্থ যুবক বিনা কারণে গেছে চলে,
আর অসুস্থরা ঠিকই শেষ বয়সের ঘানি টানে।
তরতাজা বালক রাত্রি কাটিয়ে ভোরের আলোর স্বপ্নে বিভোর,
কিন্তু সে জানে না বোনা হয়ে গেছে তার কাফনের কাপড়।'
বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনন্য উন্নতির যুগে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেঁচে বয়ে কমেনি। এই চিকিৎসাবিজ্ঞান হার্ট অ্যাটাক, শ্বাসরোধ ইত্যাদি পদ্ধতিতে মৃত্যু ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থা আবিষ্কার করতে পারেনি। কোনো প্রযুক্তি সফল নতুন নতুন সমস্যা ডেকে এনেছে। শিল্প বিকাশের আগে মানুষ এ সকল মৃত্যুদূত থেকে নিরাপদ ছিল।
দুই. যদি তুমি আগামীকাল পর্যন্ত জীবনের গ্যারান্টি দিতে না পারো, আকস্মিক কোনো অসুস্থতা, ব্যস্ততা কিংবা বিপদ ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা থেকে নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা দিতে না পারো, তবে বুদ্ধিমানের কাজ হলো- কল্যাণধর্মী কাজ নিজ দায়িত্বে প্রথম সুযোগেই সম্পন্ন করে ফেলা। পক্ষান্তরে অলসতা ও সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এতে মানুষ হতাশ হয়ে আত্মহননের উপায় খুঁজে থাকে।
কবি বলেছেন- ولا اؤخر شغل اليوم عن كسل
الى غد ان يوم العاجزين غد
'শুধু অলসতায় আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য রেখে দিলে!
জেনে রেখ, আগামী দিন শুধু অক্ষমদের দিন।'
আরেক কবির ভাষ্য হলো- عليك بأمر اليوم, لا تنتظر غدا
فمن لغد من حادث بمخيل
'দিনের দায়িত্বের সাথে লেগে থাকো। কালকের জন্য অপেক্ষা কেন করবে?
কালকের কাজের জামিনদার কে হবে? তুমি তো জানো না কাল কী ঘটবে।'
রাসূল ﷺ এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন- 'পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের পূর্বে গনিমত হিসেবে গ্রহণ করো।
মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে
অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে
ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে
বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে
অভাবের পূর্বে সচ্ছলতাকে।'
কোনো এক আলিম জনৈক যুবকদের বলছিলেন- 'কর্মক্ষমতা হারানোর পূর্বেই কাজগুলো সেরে ফেলো। আমি আজ বহু কাজ করতে চাই, কিন্তু আমার কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।'
হাফসা বিনতে শিরিন বলতেন- 'হে যুবক সম্প্রদায়! তোমরা কর্মে মগ্ন হও। যৌবনই করার সময়।'
তিন. প্রত্যেকটি দিনের কিছু কর্ম থাকে। প্রত্যেকটি সময়ে কিছু নতুন দায়িত্ব ঘাড়ে আসে। কোনো সময়ই কর্মহীন থাকার জন্য নয়। উমর ইবনে আব্দুল আজিজ একদিন কাজের চাপে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাকে বলা হলো- 'আজ রাখুন, বাকিটা কাল সেরে নিতে পারবেন।' তিনি উত্তর দেন, 'একদিনের কাজ আমাকে কাবু করে ফেলেছে। তাহলে দুইদিনের কাজ একসঙ্গে জমা হলে কী হবে?'
ইবনে আতা হিকাম বলেন- 'সময়ের মাঝে কিছু অধিকার আদায় সম্ভব, কিন্তু সময়ের অধিকার আদায় সম্ভব নয়। আল্লাহর কসম! প্রত্যেকটি নতুন সময়ে নতুন কিছু কর্তব্য এবং জরুরি কিছু বিষয় রয়েছে। তাহলে কীভাবে অন্য সময়ের কর্তব্য সেই সময়ে আদায় করতে কোথায় যাবে?'
চার. দেরি ও গড়িমসি মানব মনকে কাজ এবং নেক আমল ত্যাগে অভ্যস্ত করে তোলে। আর একবার চেপে বসলে তা স্বভাব হয়ে পড়ে। তা থেকে উত্তরণ খুবই কঠিন। এমনকী মানুষ যদি সময়মতো ফরজ কাজ এবং নেক আমল করতে মানসিক পরিতৃপ্তি পায়, তবে তা সে কেন করছে? উদ্দেশ্যই-বা কী সে তা জানে না। কিন্তু কাজ ত্যাগ করতে সে কষ্ট অনুভব করে। সে যখন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়ন করার আগ পর্যন্ত যেন পিঠে একটি পাহাড় নিয়ে হাঁটছে।
একইভাবে আমরা দেখি গোনাহ ও পাপাচার থেকে তওবার ক্ষেত্রেও। যার আত্মা পাপাচার অভ্যস্ত হয়ে গেছে, প্রবৃত্তির দাসত্বে মগ্ন হয়ে গেছে, তার কাছে পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়া বাচ্চাদের বুকের দুধ ছাড়ানোর চেয়েও কঠিন মনে হয়। প্রতিদিন আসক্তি বেড়ে যায়, অষ্টপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে; পাপাচারের বহরও বাড়তে থাকে। আর এর প্রভাব গুরুতর হতে থাকে, একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে থাকে। পাপের তার মূল্যবোধকে দৃষ্টিশক্তিহীন করে দেয়। তার কাছে হেদায়েতের আলোকরশ্মি কিংবা সত্যের আলো পৌঁছতে পারে না।
হাদিসে এসেছে- 'মুমিন যখন কোনো পাপ করে, তখন তার কলবে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর যখন সে তওবা করে এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ইস্তিগফার করে, তখন তার কলব দাগমুক্ত চকচকে হয়ে ওঠে। আর পাপাচার বেশি হলে কালো দাগও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে কলব বন্ধ হয়ে যায়। মরিচার কথা যা আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াতে উল্লেখ করেছেন। "কখনোই নয়; বরং তাদের কর্মই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।"' তিরমিজি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ : ৪২৪৪
পাঁচ. কর্মই হলো জীবিত মানুষের মিশন। যে মানুষ কোনো কাজ করে না, তার জীবিত থাকার অধিকার নেই। যতক্ষণ তার মাঝে জীবনের স্পন্দন আছে, ততক্ষণ তাকে কোনো না কোনো কাজ করতেই হবে; হোক তা দ্বীনি কিংবা দুনিয়াবি।
মুসলিমদের কাছে প্রসিদ্ধ প্রবাদটি বলেছে- 'দুনিয়ার সাথে এমন আচরণ করো, যেন তুমি সর্বদা বেঁচে থাকবে। আর আখিরাতের সাথে এমন আচরণ করো, যেন কালই তোমার মৃত্যু হবে।'
কালের প্রতি নিন্দাবাদ করা : আরেকটি নিষিদ্ধ ও নেতিবাচক কাজ হলো যুগকে দোষারোপ করা। সকল কাজে সময়ের জুলুম ও যুগের রুক্ষতাকে দায়ী করা। এমনকী অনেকে মনে করে- সময়ই তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সময় তার চরম শত্রু। সময় তার অগ্রগতিতে প্রধান বাধা। তাদের ধারণা- সময় হলো কোনো জালিম শাসক, যে নিরপরাধকে শাস্তি দিচ্ছে এবং পাপিষ্ঠের পক্ষ অবলম্বন করছে। সময়ই ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাচ্ছে এবং সে কোনো কারণ ছাড়াই এগুলো নিজের খেয়াল-খুশিমতো করছে কিংবা রাতকানা মতো এটা-সেটা করেই যাচ্ছে। একবার ঠিক করছে তো দশবার ভুল করছে।
এ ধরনের ভাবনাগুলো জাবরিয়্যাহ দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; যারা মানুষ ও সমাজকে দায়িত্বমুক্তির দিয়ে পাপাচারের দায় অন্য কিছুর ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। তারা নিজেদের কর্ম ও ভুলের দায় নিতে অস্বীকার করে; নিজ কর্মের দায় সময়, ভাগ্য, নসিব, তাকদির, বাস্তবতা কিংবা অন্য কিছুর ওপর চাপানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু তাদের উচিত তারা সকল বিপদ এবং যে সকল নেয়ামত থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা। বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে সমস্যার গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করা। সমস্যার কারণের সাথে পরিণতির আর পদক্ষেপের সাথে ফলাফল পাশাপাশি রেখে আল্লাহ নির্ধারিত সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ করা। সময় মূলত নিছক ক্রিয়ার আধার। আর সকল ক্রিয়াও আল্লাহর নির্ধারিত চিরন্তন নিয়মনীতি এবং সুন্নাত মেনে সংঘটিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সহিহ হাদিসে এসেছে- 'তোমরা সময়কে গালি দিয়ো না। কেননা, আল্লাহ নিজেই সময়।' (অর্থাৎ তিনিই সকল রীতি-নীতির উদ্ভাবক এবং সঞ্চালক।) মুসলিম : ৫৭০১
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমরা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। তাদের সাথে রাসূল ﷺ ও ছিলেন। সত্তরজন বীর সাহাবি এ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পারস্পরিক আলোচনায় প্রসঙ্গ উঠেছিল, কেন তারা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন? কেন তাদের ওপর ঘাত-বিপদ নেমে এলো? তাদের এ সকল আলোচনার জবাব কুরআন দিয়েছে নিজস্ব ভাষায়- 'যখন তোমাদের ওপর কোনো মুসিবত এসে পৌঁছাল, অথচ তোমরা তার পূর্বে দ্বিগুণ কষ্টে আক্রান্ত, তখন কি তোমরা বলবে, এটা কোথা থেকে এলো? তখন তুমি তাদের বলে দাও, এ কষ্ট তোমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের ওপর ক্ষমতাশীল।' সূরা আলে ইমরান : ১৬৫
আরেকটি আয়াতে বিষয়টা আরও স্পষ্ট করে এসেছে- 'তার কারণ এই যে, আল্লাহ কখনো সেসব নেয়ামত পরিবর্তন করেন না, যা তিনি কোনো জাতিকে দান করেছিলেন। যতক্ষণ না সে জাতি নিজের জন্য নির্ধারিত বিষয় নিজেই পরিবর্তিত করে দেয়।' সূরা আনফাল : ৫৩
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের উচিত হবে কালকে বা সময়কে দোষারোপ করার আগে, সামাজিক অসংগতি এবং বিশৃঙ্খলা দূর করার আগে নিজের অবদান মূল্যায়ন করা; নিজের দোষটা দেখা।
এক জ্ঞানী ব্যক্তির কথা ছিল- ان الجديدين في طول اختلافهما
لا يفسدان ولكن يفسد الناس
'দুটো নতুনের মাঝে যত পার্থক্যই থাকুক না কেন, তারা ফ্যাসাদ দাঁড় করায় না।' ফ্যাসাদ মানুষই দাঁড় করায়।'
অন্য কবির ভাষায়- نعيب زماننا والعيب فينا * وما لزماننا عيب سوانا
ونهجو ذا الزمان بغير ذنب * ولو نطق الزمان بنا هجانا
'আমরা আমাদের সময়কে করছি দোষারোপ, অথচ আমাদের নিজেদেরই তো সকল দোষ।
আমরাই আমাদের সময়ের কলঙ্ক।
কী হবে দোষারোপ করে সময়ের মালিককে, সময় যদি বলা শুরু করে আমাদের কী হবে?'
আমরা কবি- সাহিত্যিকদের বিদ্রোহী উচ্চারণে সামাজিক পাপাচার এবং শাসকদের বাড়াবাড়ির দায় সময়ের ওপর চাপাতে দেখি। তারা মূলত সময় দ্বারা সেই সময়ের লোকজন এবং শাসকদের উদ্দেশ্য করেন। এক কবি বলেছেন- ساءت زمانی وهو بالجمل مولع * وبالبحث مختص
فقلت له: هل لك : فقال: سبيلاء* الى سبيل الى العلاء والنقص
সে হেসে বলল : মূর্খতা এবং অবক্ষয়ের উন্নতি ঠিকই হবে।'
'আমার সময়টি জাহেলিয়াতে আসক্ত, সে পাপাচার নিয়ে গর্ব করছে
অশ্লীলতা হয়ে পড়েছে তার অলঙ্কার, তাকে প্রশ্ন করলাম : তোমার কি কোনো উন্নতি হবে না?
কোনো এক জালিম বাদশাহর ব্যাপারে কথিত আছে- তিনি বলেছেন, 'সময় মানেই সুলতান।' তোমাদের কেউ সময়কে গালি দিলে (সুলতানকে গালি দেওয়ার অপরাধে) সাজাপ্রাপ্ত হবে।
কোনো মুসলিম যখন কোনো অপছন্দনীয় কাজ বা খারাপ বাক্য ব্যবহার করে, তার উচিত স্বীয় বিবেকবোধের কাছে ফিরে আসা এবং তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে রবের দরজায় কড়া নাড়া। সে আদি পিতা-মাতা আদম-হাওয়ার ভাষায় বলতে পারে- رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ.
'হে আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের দয়া না করো, তাহলে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল হয়ে পড়ব।' সূরা আরাফ : ২৩
তাদের যখন জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তখন তারা এ বাক্যে আল্লাহর দরবারে তওবা করেছিলেন।
অথবা তারা নবি মুসা কালিমুল্লাহর ভাষায় আল্লাহর দরবারে ধরনা দিতে পারে। যখন তিনি তাঁর রবের সান্নিধ্য থেকে নিজ কওমের কাছে ফিরে এলেন, তিনি দেখলেন কওমের লোকেরা তাঁর অবর্তমানে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। তারা এক লম্বা হাম্বা রব তোলা একটি গাড়ীর বাছুরের উপাসনা শুরু করেছে। আর তাঁর ভাই হারুন (আ.)-কে হিসেবে মানছে না। তাকে দুর্বল পেয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। তিনি মিনতি এবং দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেন- رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ.
'হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার ভাইকে। আর আমাদের দাখিল করো তোমার রহমতের মধ্যে। তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ রহমওয়ালা।' সূরা আরাফ : ১৫১
অথবা আল্লাহভীরু বান্দাদের ভাষায়- যখন তাদের ঈমানের নিদর্শন উপস্থাপনের প্রয়োজন এসে পড়ল, তারা নবিদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। আল্লাহর পথে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, কিন্তু ক্লান্তও হয়নি বা দমেও যায়নি। তাদের একটা কথা ছিল- رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.
'হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দাও। আমাদের কার্যক্রমের সীমালঙ্ঘন তুমি ক্ষমা করে দাও। আমাদের কদমকে মজবুত রাখো এবং কাফির কওমের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।' সূরা আলে ইমরান : ১৪৭
অতঃপর আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম সকল প্রতিদান দান করেছেন।