📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 ভবিষ্যতে দৃষ্টিদান

📄 ভবিষ্যতে দৃষ্টিদান


মানুষ স্বভাবগতভাবে ভবিষ্যতের সাথে বাঁধা। সে ভবিষ্যতের ব্যাপারে অমনোযোগী হতে পারে না। তা দৃষ্টি আড়াল করে চলতে পারে না। অতীতের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মানুষ্য জীবিকার অর্জনের সঙ্গে জড়িত। একইভাবে ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে পারা বা পরিকল্পনা সাজানো কিংবা তাতে কী ঘটবে; তার ওপরও জীবিকার বেশ কিছু বিষয় নির্ভর করে।
ভবিষ্যতের বৈশিষ্ট্য হলো তা অজ্ঞাত ও অজানা। কেউই জানে না, ভবিষ্যতের বুকে কোন জিনিস লুকিয়ে আছে? কোন রহস্য আছে? তাতে কি কল্যাণকর কিছু আছে, নাকি অজানা অকল্যাণ!
'কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে।' সূরা লুকমান : ৩৪
ভবিষ্যতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- তাতে আগমনকারী সবকিছু খুবই নিকটবর্তী। যদিও মানুষের ধারণা, ভবিষ্যৎ দূরবর্তী কোনো সময় বা সম্ভাবনা। এ কারণেই বলা হয়, আজকের সাথে আগামী দিন মিশে আছে। পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তির জন্য আগামী দিন খুবই কাছে।
আল্লাহই কুরআনে কাছে- 'কিয়ামতের ব্যাপারটি তো এমন, যেমন চোখের পলক অথবা তার চাইতেও নিকটবর্তী।' সূরা নাহল : ৭৭
সেই ব্যক্তিই বুদ্ধিমান, যে ভবিষ্যতের ব্যাপারে সতর্ক থাকে এবং মোকাবিলায় সরঞ্জাম মজুদ রাখে; ঘটনা ঘটার আগেই তার জন্য প্রস্তুত থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তিই যেন ভেবে দেখে, সে আগামীকালের (পরকালের) জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে?' সূরা হাশর : ১৮
যারা মনে করে দ্বীন মানুষকে পশ্চাৎপদ করে রাখে, তারা আসলে দ্বীনের মৌলিকত্ব এবং তার গুরুত্ব উপলব্ধিতে ভুল করেছে। দ্বীনের মিশনই হলো মানুষকে চিরস্থায়ী জিন্দেগির জন্য প্রস্তুত করা। অর্থাৎ তাকে ভবিষ্যতের এমন আবাসের জন্য প্রস্তুত করা, যা বর্তমান আবাসের তুলনায় বহুগুণ উত্তম ও স্থায়ী।
সুতরাং ভবিষ্যতের দর্শনই হচ্ছে দ্বীনের মৌলিক বুনিয়াদ।
হাদিসে এসেছে- 'বান্দার বসবাস দুটো শত্রুর মাঝে। একটি অতিবাহিত সময়। সে জানে না তার এবং আল্লাহর মাঝে কোনো ধোঁকা সংঘটিত হয়েছে কি না? আরেকটি হলো অনাগত ভবিষ্যৎ। সে জানে না, আল্লাহ তার কী বিচার করবেন? সুতরাং বান্দাকে আত্মসত্তা বিকিয়ে নিজের জন্য রসদ সংগ্রহ করতে হবে। দুনিয়া থেকে আখিরাতের জন্য পাথেয় অর্জন করতে হবে। বার্ধক্য আসার আগে যৌবন থেকে আখিরাত গুছিয়ে নিতে হবে। যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! মৃত্যুর পরে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। দুনিয়ার পরে জান্নাত এবং জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই।'
এ কথাগুলোর মানে এই নয়, একজন দ্বীনদার মানুষ কেবল পরকালীন ভবিষ্যৎকেই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে এবং তার দুনিয়াবি ভবিষ্যৎ নিয়ে অমনোযোগী থাকবে। ইসলাম তাকে আগামী দিনগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে শিখিয়েছে। আগামীর জন্য পুঁজি সঞ্চয় করতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে সচেতনভাবে ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুদ করতে। আর এটা দুনিয়াবি ও দ্বীনি- উভয় প্রকারের বিষয়াবলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রাসূল ﷺ মুমিনদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। আমরা তাঁকে দাওয়াতি কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, অনুসন্ধান এবং গবেষণা করতে দেখেছি। তিনি আগে আওস ও খাজরাজ গোত্র থেকে দ্বীন রক্ষার বায়আত গ্রহণ করেছেন এবং তারপর হিজরতের চিন্তা করেছেন। এসবই ছিল শরিয়া এবং ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর নীতির অংশ।
আকাবায় প্রথম ও দ্বিতীয় বায়আত নেওয়া, তারপর ইয়াসরিবে হিজরতের জন্য প্রস্তুতি-এগুলো ইসলামের ভবিষ্যতের জন্য ধারাবাহিক পরিকল্পিত কার্যকর পদক্ষেপ। আর জাগতিক বিষয়ে দেখতে পাই, তিনি পরিবারের জন্য এক বছরের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করেছিলেন। তিনি এই কাজকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেননি। কারণ, তাওয়াক্কুল কোনো উপায়-উপকরণ অবলম্বনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 বর্তমানকে গুরুত্ব প্রদান

📄 বর্তমানকে গুরুত্ব প্রদান


একজন মুমিনকে অতীতের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপকৃত হতে হবে। তা মূল্যায়ন করে আত্মসমালোচনা করতে হবে। ভবিষ্যতের প্রতিও দৃষ্টিপাত করতে হবে, যেন ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং পাথেয় সংগ্রহ করা হয়। তাকে সচেতন থাকতে হবে-ভবিষ্যতের জন্য সে কী পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে তাকে বর্তমানের ব্যাপারে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে। সে যে সময়ে বসবাস করছে, তার ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে। তা ফুরিয়ে যাওয়ার আগে গনিমত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
ইমাম আবু হামিদ আল গাজালি তাঁর 'ইহইয়া'তে বলেন- 'সময় তিন প্রকার। এক প্রকার সময় মানুষকে ছেড়ে চলে যায়; কষ্টে বা বিলাসিতায় যেভাবেই কাটুক না কেন। আরেক প্রকার হলো- ভবিষ্যৎ। বান্দা জানে না, এ সময়ে সে থাকবে কি থাকবে না। সে এও জানে না, আল্লাহ তাআলা তার জন্য কী নির্ধারণ করে রেখেছেন! আরেক প্রকার সময় হলো- বর্তমান। বান্দার উচিত এই সময়ে কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য কিছু উপার্জন করা এবং রবের নির্দেশনা অনুসরণ করে চলা।
দ্বিতীয় প্রকারের সময় যদি না আসে, তবে তার জন্য আফসোস করতে হবে না। আর যদি এসে পড়ে, তবে করণীয় হবে তা থেকে রসদ সংগ্রহ করা। যেমন করণীয় ছিল প্রথম প্রকার সময়ের সাথে। তার আকাঙ্ক্ষা পঞ্চাশ বছর দীর্ঘ হওয়া উচিত নয়। এটা তাকে ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা পর্যবেক্ষণের চিন্তায় মোহাচ্ছন্ন করে দেবে এবং তাৎক্ষণিক সংকল্প বাধাগ্রস্ত হবে; বরং তার উচিত বর্তমান সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা; যেন এটাই শেষ সময়, শেষ মুহূর্ত।'
যেহেতু বর্তমানের মুহূর্তটি শেষ মুহূর্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যেহেতু উচিত হবে এই সময়টা সকল করণীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ আদায় করে রাখা; যেন হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা যায়। অবস্থা হওয়া উচিত ওই আবু জার থেকে বর্ণিত হাদিসের তিন অবস্থার কোনো এক অবস্থার মতো। তিনি রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন- 'মুমিন সব সময় ইবাদতে মশগুল থাকবে না; বরং তার অবস্থা তিন অবস্থার কোনো একটি হবে। কখনো পরকালীন জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করবে, কখনো দুনিয়ার জীবনে উন্নতির জন্য কাজ করবে, আর কখনো হালাল নিয়ামত উপভোগ করবে।' আল কাফি : ৫/৮৭
একই বিষয়ে তাঁর থেকে আরেকটি বর্ণনা এসেছে- 'বিবেকবান মানুষের চার ধরনের সময় থাকা উচিত।
একটা সময় গোপনে রবের কাছে প্রার্থনা করবে।
একটা সময়, হিসাব-নিকাশ ও আত্মসমালোচনায় ব্যয় করবে।
একটা সময় আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করবে।
একটা সময় খাবার ও পানীয় সংগ্রহের জন্য ব্যয় করবে।'
এ সময়গুলো তার অন্যান্য সময়গুলোর জন্য সহায়ক। যে সময় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খাবার ও পানীয় সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকে, তখন একটি মূল্যবান আমল থেকে বিরত থাকা উচিত হবে না। তা হলো জিকির ও ফিকির। যেমন : সে খাবার গ্রহণ করছে, তাতেও বহু শারিরীক কর্ম থেকে বেশি ফলদায়ক।
কবি বলেছেন- مضى أمسك الماضي شهيدا معدلا * وأصبحت في يوم عليك شهيد
فان كنت بالامس اقترفت اساءة * فثن باحسان وأنت حميد
ولا ترج فعل الخير يوما الى غد * لعل غدا يأتي وأنت فقيد
فيومك ان اعتبته عاد نفعه * عليك, وماضى الامس ليس يعود
'অতীত চলে যাওয়ার জন্য, সে চলে গেছে। তাকে সুবিচারিত সাক্ষী হিসেবে ধারণ করো। আর সেও দিনে দিনে তোমার বিপক্ষে সাক্ষী হয়ে আছে।
যদি অতীতের সাথে জুলুম করে থাকো, প্রশংসিত চিত্তে তার প্রতি কিছু ইহসান ঢেলে দাও।
নেক কর্মকে আগামী এক দিনের জন্যও ফেলে রেখ না।
আগামী আসবে ঠিকই, হয়তো তুমি থাকবে না।
আজকের দিনকে যদি সন্তুষ্ট করতে পারো, সে তার উপকারী ফলাফলসহ আসবে ফিরে। চলে যাওয়া অতীত কখনো ফিরে আসবে না।'
আল্লাহর রাসূলের একটি চমৎকার হাদিস থেকে বর্তমানের ওপর জোর দেওয়ার নির্দেশনা পাওয়া যায়। হাদিসটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'কিয়ামত এসে উপস্থিত হয় আর তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তোমরা সুযোগ পেলে তা রোপণ করো।' আল কাফি : ৫/৮৭

📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 দীর্ঘ হায়াত

📄 দীর্ঘ হায়াত


হাদিসটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর গুরুত্ব বোঝার জন্য একটু বিরাম নেব। রাসূল ﷺ কেন কিয়ামত উপস্থিত হওয়ার পরও সুযোগ পেলে চারাগাছ রোপণ করার আদেশ দিলেন?
সেই ব্যক্তি এই গাছের ফল আসা পর্যন্ত জীবিত থাকবে না। সুতরাং স্পষ্টতই ভবিষ্যতে ফল পাওয়ার আশায় এই গাছ রোপণ করবে না। তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ গাছ থেকে ফল পাবে? এ সম্ভাবনাও এখানে নেই। যেমন : একজন মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ একটি জায়তুনের গাছ রোপণ করেছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি এ গাছটি কেন রোপণ করছেন? আপনার এক পা তো কবরে।' জবাবে তিনি বলেন, 'আমাদের আগে যারা রোপণ করেছে, তা থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি। আর তাই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রোপণ করে যাচ্ছি।'
কিন্তু হাদিসে যে অবস্থার বর্ণনা এসেছে, তাতে সে দিন যা রোপণ করা হবে, তা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য পরের দিন কেউ বেঁচে থাকবে না। কারণ, কিয়ামত এসে গেছে বা আসার উপক্রম হয়েছে; কারও বাঁচার আশা অবশিষ্ট নেই। সুতরাং এ মুহূর্তে বৃক্ষরোপণের আদেশ কেন?
বিষয়টি এখানে খুবই স্পষ্ট; কর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। কোনো মুহূর্ত হোক না নি উপকার, কাজ করতেই হবে- এ রকম নির্দেশনা। এখানে উপলব্ধি জাগত করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, একজন মুসলিম ব্যক্তির কখনো উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী একটি মুহূর্তও কর্মবিহীন থাকা জায়েজ নেই। আর তা ঐ ইসরাফিল ফুঁ দেওয়ার উদ্দেশ্যে শিং হাতে নেওয়ার পরও নয়, যদিও একটু পরেই দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ রকম একটি অবস্থায় গাছের চারা রোপণের আদেশ প্রদানের মাধ্যমে রাসূল ﷺ মূলত প্রত্যেকটি সময় যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অতীত বা ভবিষ্যৎ যাই হোক, চলমান মুহূর্তটি সর্বোত্তম কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্বভাবগতভাবে মানুষ বেঁচে থাকতে পছন্দ করে; জীবন দীর্ঘ করতে চায়। সম্ভব হলে চিরঞ্জীব হতে চায়। এই সহজাত বাসনার কারণেই ইবলিস আদি পিতা আদম (আ.)-এর ভেতরে প্রবেশ করে এবং ধোঁকাবাজির মাধ্যমে তাঁকে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণে প্ররোচিত করতে পারে। 'তখন শয়তান তাকে আশ্বাস দিলো। সে বলল, হে আদম! আমি কি আপনাকে সংবাদ দেবো এক অমর বৃক্ষের এবং এক অক্ষয় সাম্রাজ্যের?' সূরা ত্ব-হা : ১২০
আমাদের দ্বীনেও হায়াতকে নেয়ামত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যদি তা সত্যের বিজয় এবং নেক কাজে ব্যবহৃত হয়। নবি ﷺ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল- 'কোন মানুষ সর্বোত্তম? জবাবে তিনি বলেন, যার জীবন দীর্ঘ হয়েছে এবং কর্ম সুন্দর হয়েছে।' তিরমিজি, তাবরানি, হাকিম
কিন্তু মৃত্যু হঠাৎ উপস্থিত হয়ে মানুষের সকল পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ভণ্ডুল করে দেয়। কত যুবককে যৌবনের শুরুতেই উঠিয়ে নেয়। কত নববিবাহিতাকে বিবাহের প্রথম দিনই গ্রাস করে। পরিবারের আদরের সন্তানকে মৃত্যু পেয়ে বসে। কত বিলাসী ধনীকে প্রাচুর্য ভরা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন থেকে কেড়ে নেয়।
কত শাসককে নিরাপত্তা ও অনুচরদের মাঝ থেকে নিয়ে যায়। এ কারণেই মৃত্যুকে বলা হয় 'বিলাস ছিনতাইকারী' এবং 'সমষ্টি বিচ্ছিন্নকারী'।
মৃত্যুই যখন আমাদের বিচারণার এবং জীবনের একমাত্র সমাপ্তি, তখন সন্দেহাতীতভাবে জীবন খুবই সীমিত। মানুষের আকাঙ্ক্ষা যতই দীর্ঘ হোক না কেন, জীবন যতই লম্বা হোক না কেন, বাস্তবে তা গণনারযোগ্য কিছুদিন; সীমিত কিছু নিঃশ্বাসের সমষ্টি, মৃত্যু কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই যাকে শেষ করে দেবে।
حكم المنية في البرية جار * ما هذه الدنيا بدار قرار
بينا يرى الانسان فيها مخبرا * حتى يرى خبرا من الاخبار
'বৃক্ষহীন কোনো প্রান্তরেও আশার বীজ বোনা যায়, কিন্তু দুনিয়া স্থির কোনো আবাস নয়।
এখানে মানুষ শত সংবাদ বহন করে, একদিন সে নিজেই (শোক) সংবাদে পরিণত হয়।'
হাদিসে এসেছে- 'তোমার যেভাবে ইচ্ছা জীবনযাপন করো। কারণ, একদিন তুমি মৃত। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসো, তার থেকে তোমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যা ইচ্ছা করতে থাকো। তার প্রতিদানই তোমাকে দেওয়া হবে, তুমি তারই ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।' তাবরানি
আবুল আতাহিয়্যাহ সঠিকভাবে বলেছেন- بين عينى كل حي * علم الموت يلوح
يا مسكين ان كنت تنوح * لتموتن وان عمرت ما عمر نوح
'একেকটি মৃত্যু সংবাদ তোমাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, যদি তোমার কান্না আসে তবে নিজের জন্য কাঁদো,
তোমাকে মরতেই হবে, নূহের মতো লম্বা জীবন পেলেও।'
যে চিকিৎসাবিজ্ঞান হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, যে বিজ্ঞান চাঁদের বুকে মানুষের পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, সেই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান বার্ধক্য মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি। রাসূলের উক্তিটি এখানে যথোপযুক্ত- 'আল্লাহ সকল রোগের সাথে শেফা নাজিল করেছেন; শুধু বার্ধক্য ছাড়া।'
মানুষের শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য-এ চক্রেই বন্দি। তাহলে কীভাবে সে তার জীবনকে লম্বা করতে পারে? সত্যি বলতে মানুষের আসল জীবন জন্মদিন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের সমষ্টি নয়; প্রকৃত জীবন হলো আল্লাহর খাতায় লিখিত তার সৎ ও কল্যাণকর কাজের যোগফল।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো- এমন মানুষও পাওয়া যাবে যার জীবনকাল একশো বছরের চেয়ে বেশি, কিন্তু তাকওয়া ও সৎকাজের অর্জন শূন্য বা তারও নিচে। লেনদেনের ভাষায় সে উল্টো ঋণী। আবার কোনো লোককে যুবক অবস্থায় মারা যেতে দেখা যায়, কিন্তু প্রাচুর্য হওয়ার পর তার ক্ষুদ্র নামীয় কর্মী মর্যাদাপূর্ণ কর্মে ভরপুর।
আবুকার আল হিকাম বলেন- 'বহু জীবন আছে যার সময়সীমা অনেক লম্বা, কিন্তু প্রাপ্তি অর্জনের পরিধি খুবই সীমিত। আবার বহু কম সময় পাওয়া জীবনে অর্জন বেশি সমৃদ্ধ। যার জীবনে বরকত দেওয়া হয়, সে স্বল্প সময়ে বর্ণনাতীত এবং অভাবনীয় রহমত লাভ করতে সক্ষম হয়।'
সুতরাং কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর সৃষ্টির ওপর ইহসান করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে জীবনকে লম্বা করতে পারে। আর বান্দার কর্মনিষ্ঠা ও সততায় পরিপূর্ণ হলে তার মর্যাদা এবং প্রতিদান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য বেড়ে যায়।
আর যাদের কর্মে অন্যায় ও উপকৃত বা প্রভাবিত হয়, তাদের কর্মের মূল্যায়ন সেই উপকার বা প্রভাবের বিস্তৃতি অনুযায়ী হবে। সেই ব্যক্তি বা সমষ্টিকে সৎপথ প্রদর্শন, তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, কারও বিপদ দূরীকরণে সহায়তা, কারও ওপর থেকে জুলুম উঠিয়ে নেওয়া বা তাদের শত্রুকে প্রতিহত করা ইত্যাদি কাজের নানামুখী ফলাফল রয়েছে। এ কাজগুলো থেকে কখনো শুধু একজন লোক উপকৃত হয়, কখনো একটি গ্রুপ উপকার পায়, আবার কখনো বিশাল সংখ্যক মানুষ এ থেকে ধারাবাহিক সুবিধা পেতে থাকে।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, দাওয়াহ ইলাল্লাহ এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মতো অবস্থানে বিবেচনায় আল্লাহর কাছে শীর্ষে। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'যে সত্যের দিকে ডাকে, তার জন্য যারা তাকে অনুসরণ করবে, তাদের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে অনুসরণকারীদের প্রতিদানে কোনো কমতি হবে না।' মুসলিম
তিনি আরও বলেন- 'জান্নাতে একশোটি স্তর আছে। এগুলো আল্লাহ তাঁর পথে জিহাদকারীর জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। প্রত্যেকটি স্তরের মাঝে পার্থক্য আসমান-জমিন পার্থক্যের সমান।' বুখারি
অনুরূপভাবে, শাসক এবং প্রশাসকদের ন্যায়পরায়ণতা, যাতে রয়েছে বিশাল সংখ্যক মানুষ তথা কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর কল্যাণ। রয়েছে নফসের সাথে জিহাদ, প্রকৃতি সৃষ্ট বিতর্কের মোকাবিলা। এ কারণেই হাদিসে এসেছে- 'একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের একদিন ষাট বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম।' তাবরানি
'একদিন রাসূল ﷺ -এর এক সাহাবি এক গিরিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে একটি মিষ্টি পানির ঝরনা ছিল। জায়গাটা তাঁর খুবই পছন্দ হয়। তিনি বলেন, "আমি যদি মানবসমাজ পরিত্যাগ করে নির্জনবাস গ্রহণ করি, তবে এই গিরিপথেই অবস্থান করব (ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জন্য)। কিন্তু আমি রাসূলের ﷺ অনুমতি ব্যতীত তা করব না।" তিনি আল্লাহর রাসূলকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, রাসূল ﷺ বলেন, "তুমি এটা করো না। কারণ, আল্লাহর রাস্তায় অবস্থান করা, আপন ঘরে সত্তর বছর সালাত আদায় করার চেয়ে উত্তম। তোমরা কি চাও না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন এবং জান্নাতে প্রবেশ করান? আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। যে আল্লাহর পথে উটের দুধ দোহনের বিরতিকাল সমান সময় যুদ্ধ করে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।"' তিরমিজি ও হাকিম
এভাবেই মানুষের কর্ম একটির চেয়ে অন্যটি মর্যাদায় কম-বেশি হয়। তার প্রভাব বিভিন্ন রকমের হয়। আর সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে সর্বোত্তম বাক্যের ওপর গুরুত্ব দেয়।
আল্লাহর বাণী- 'বান্দাদের সুসংবাদ দাও, যারা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং সর্বোত্তমটার অনুসরণ করে।' সূরা জুমার : ১৭-১৮
বহু মানুষ খুবই অল্প সময়ে বড়ো বড়ো কাজ করে চমক লাগিয়ে দিয়েছেন। তাদের কারও কারও সাফল্যকে অলৌকিক মনে করা হয়, কিন্তু তা মোটেও অলৌকিক নয়; তা বরকত এবং আল্লাহ প্রদত্ত তৌফিকের ফল।
এতটুকু বর্ণনা যথেষ্ট যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ মানবজাতিকে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বের করে আলোর সোনার তোরার দিকে নিয়ে আসেন। তিনি মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে, বর্তমান অবস্থায় নিয়ে আসেন। তিনি মাত্র তেইশ বছর সময় নিয়েছিলেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি একটি নতুন দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন; অনন্য চরিত্রের প্রজন্ম গড়ে তুলেছেন। একটি উপমাযোগ্য উম্মাহর গোড়াপত্তন করেছেন, বিশ্বজয়ী চরিত্রের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি এসব কিছু করেছেন মাত্র কয়েকটি বছরের মধ্যেই। যদিও প্রথম দিন থেকেই তাঁর পথ নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতায় ফিরে রেখেছিল।
এটা বলবেন না যে, রাসূল ﷺ তো মুজিজা দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁর মতো কে আছে? তাঁর তুলনায় আমরা কারা?
বাস্তবতা হলো, আল্লাহর রাসূলের ﷺ দাওয়াতি ও জিহাদি জীবন ছিল সম্পূর্ণ সাধারণ মানবীয় পদ্ধতির আলোকে। তাঁর মুজিজাগুলো সাধারণ মানুষের বুদ্ধিকে অচল করে দেওয়ার মতো অলৌকিক কিছু ছিল না। তাঁর মুজিজা ছিল আল কুরআন। আর মুজিজা আসে দুনিয়াবি সকল প্রচেষ্টা ও উপকরণ ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ার পর। যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ব্যতীত কোনো উপায় থাকে না। যেমন : হিজরতের দিন আল্লাহ তাকে প্রশান্তির চাদর দিয়েছিলেন। এক অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী দিয়ে শক্তিশালী করেছিলেন। অনুরূপভাবে বদর যুদ্ধের দিন সকল প্রকার বৈষয়িক প্রস্তুতি সম্পন্নর পর আল্লাহ তাদের পেছনে এক হাজার ফেরেশতার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।
'আল্লাহ এ ব্যবস্থা করেন একটি শুভ সংবাদ হিসেবে এবং এর ফলে যেন তোমাদের মন প্রশান্তি লাভ করে।' সূরা আনফাল : ১০
খোলাফায়ে রাশেদিন, তাদের সহযোগী সাহাবিগণ ও তাবেয়িদের জীবনচরিতের দিকে তাকান। তারা কীভাবে জ্যামিতিক হারে দেশের পর দেশ জয় করেছে? কীভাবে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে? কীভাবে পৃথিবীর জাতি-গোষ্ঠীগুলোকে শিক্ষিত করে তুলেছে? মাত্র কয়েক দশকে কীভাবে তাদের জাহেলি ধর্ম, নিজস্ব আচার-আচরণ এবং ঐতিহ্য থেকে বের করে এনেছে? ইতিহাসবেত্তারা এখানে এসে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। এক শতাব্দীরও কম সময়ের মাঝে ইসলাম কীভাবে বিশ্বব্যাপী একটি ধর্মীয়, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনগত সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিপ্লব সম্পাদন করেছিল?
উমর ইবনে আব্দুল আজিজের খিলাফতের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। যিনি খিলাফতকে তার মূলধারায় ফিরিয়ে দিতে মনস্থ করলেন। অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া অধিকারসমূহ উপযুক্ত ব্যক্তিদের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। আমানতসমূহ প্রাপ্ত মালিকের কাছে ফেরত দিতে চাইলেন। আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি মাত্র আড়াই বছর সময় পেয়েছিলেন। এটাই ছিল তাঁর পূর্ণ খিলাফত। তিনি আল্লাহর জমিনে ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারে ভরপুর করে দিলেন।
যখন সত্য পথে চলার প্রতিবন্ধকতা বেড়ে যায়, তখন দ্বীনি মানদণ্ডে তার ওজনও বেড়ে যায়। যখন কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তার প্রতিদানও সমান্তরাল গতিতে বাড়তে থাকে। তার চলার সাথি যখন কমে যায়, আল্লাহর দরবারে তার প্রতিদানও বেড়ে যায়।
এখানেই পরবর্তী সময়ের লোকদের ওপর সাহাবিদের শ্রেষ্ঠত্ব। কারণ, তারা ঈমান এনেছিল; যদিও সে সময় অধিকাংশ মানুষই ছিল কাফির। তারা রাসূলের বাণীকে সত্যায়ন করেছিল, যখন মানুষ একে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। একইভাবে মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে যারা শুরুর দিকে ঈমান এনেছে, তাদের মর্যাদা পরবর্তী সময়ের সাহাবিদের তুলনায় অনেক বেশি। মক্কা বিজয়ের আগের সাহাবি এবং পরের সাহাবিদের মর্যাদায় পার্থক্য এখানেই। পার্থক্য আছে যারা ইসলামে শক্তি প্রকাশ হওয়ার আগে ও পরে ঈমান এনেছে তাদের মধ্যে। এ ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্য- 'তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের ব্যয় করেছে এবং এরপর যুদ্ধ করেছে, তারা ওইসব লোকদের চেয়ে মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, যারা ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে বিজয়ের পরে। তবে আল্লাহ উভয়ের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন।' সূরা হাদিদ : ১০
একই কারণে অস্তিত্বশীল পরিবেশে সংস্কারধর্মী কাজ আল্লাহর কাছে উচ্চমানের মর্যাদাপূর্ণ। শাসকরা সীমালঙ্ঘনে ব্যস্ত, ধনীরা বিলাসিতায় নিমজ্জিত, ক্ষমতাবানরা জোর-জবরদস্তিতে মগ্ন, গোলামরা তোষামোদিতে লিপ্ত, পাপাচারে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে, সর্বত্র অন্যায়ের সয়লাব হয়ে সৎকর্ম চাপা পড়ে গেছে। এটা সেই সময়, যাকে আলিমগণ 'ফিতনা এবং ফাসাদের সময়' বলে অভিহিত করেছেন। আমরা এর নাম দিয়েছি 'আধুনিক জাহেলিয়াত'। এ রকম এক সময়ে যারা আল্লাহর দ্বীনের যথাযথ অনুসরণ করবে এবং তাঁর দ্বীনের জন্য কাজ করবে, তারা যেন 'আধুনিক সাহাবি'। সময়টা এতই ভয়ানক যে, দ্বীনের যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে; সামনে শুধু জাহেলিয়াত।
সহিহ হাদিসে এসেছে, নবি ﷺ বলেছেন- 'হারজ' অবস্থায় ইবাদত আমার দিকে হিজরতের মতো।' মুসলিম, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ
হাফেজ আল মুনজির (র) বলেন, 'হারজ হলো ফিতনা ও ইখতিলাফ।' কোনো কোনো হাদিসে তিনি হারজকে কতল (হত্যা) শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। কারণ, ফিতনা ও ইখতিলাফ কতল-এর একটি উপাদান। তিনি হারজকে তার উপাদানের জায়গায় নিয়ে এসেছেন।
আর উমাইয়া আশ-শাবানি থেকে বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন- 'আমি আবু সালাবার নিকট গেলাম। বললাম, এ আয়াতকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? তিনি বলেন, কোন আয়াত? আমি আয়াতটি তিলাওয়াত করলাম। "হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা করো। তোমরা যখন সৎ পথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রষ্ট হলে তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই।" সূরা মায়েদা : ১০৫
তিনি জবাবে বলেন, তুমি এ ব্যাপারে জানা লোককেই প্রশ্ন করেছ। এ নিয়ে আমি আল্লাহর রাসূলকে ﷺ প্রশ্ন করেছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন, তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজে নিষেধ করতে থাকো। তোমাদের পরে এমন এক যুগ আসবে, যখন তুমি লোকদের কল্পনার আনুগত্য করতে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে, পার্থিব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে এবং প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে নিজের বুদ্ধিমত্তায় নিয়ে অহংকার করতে দেখবে। আর তুমি এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার থাকবে না। এরূপ পরিস্থিতিতে তুমি নিজের হেফাজত করো এবং সর্বসাধারণের চিন্তা ছেড়ে দাও। তোমাদের পরে আসবে কঠিন ধৈর্যের পরীক্ষা যুগ। তখন ধৈর্যধারণ করাটা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার মতো কঠিন হবে। সে যুগে কেউ নেক আমল করলে তার সমকক্ষ পঞ্চাশ ব্যক্তির সওয়াব তাকে দান করা হবে।' তিরমিজি, ইবনে মাজাহ
ইমাম আবু দাউদের বর্ণনায় আরেকটি কথা বেশি এসেছে। তা হলো- 'জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রাসূল! আমাদের পঞ্চাশজন নাকি তাদের পঞ্চাশজনের সমান। তিনি বলেন, তোমাদের পঞ্চাশজনের সমান।'
বিভিন্ন বর্ণনায় প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় রাসূলের একটি হাদিস এসেছে। তিনি বলেন- 'তোমরা কল্যাণকর কাজে সহযোগী পাও, কিন্তু তারা কোনো সহযোগী পাবে না।'
হাদিসের ভাষ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসলাম প্রসারিত হওয়ার পর যখন মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছিল এবং এবং সৎকাজে যথেষ্ট সংখ্যক সঙ্গী পাচ্ছিল।
তবে প্রথম যুগে মুহাজির ও আনসারদের কথা ভিন্ন। তারা ইসলামের পথে চলার সময় কোনো সাহায্যকারী পায়নি; বরং পদে পদে বাধা ছিল। গোটা আরব এক হয়ে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সুতরাং মর্যাদায় তাদের নিকটবর্তী কেউ-ই হতে পারে না।
হাদিসটি আমার বিন মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারকে ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়াজিব করে দিয়েছে, যতক্ষণ দ্বীনের শ্রবণশক্তি থাকবে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন থাকবে কিংবা কোনোভাবে সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বাকি থাকে। কিন্তু যখন সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়, সকল উপকরণ অকেজো হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি শক্তি ও সম্ভাবনার বাইরে চলে যায়, তখন বলা হয়েছে- 'আর তুমি এমন সব গর্হিত কাজ হতে দেখবে, যা প্রতিহত করার সামর্থ্য তোমার থাকবে না...'
অর্থাৎ পরিস্থিতি যখন তোমার সামর্থ্য ও ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এ সময় মুমিন لا حول ولا قوة الا بالله ছাড়া অন্য কিছুর মালিক নয়, যতক্ষণ না আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোনো ফয়সালা চলে না আসে।
আর সবার মানে নেতিবাচক কোনোকিছু নয়; বরং মানসিকতাকে তীব্র কষ্ট সত্ত্বেও স্থিরচিত্তে অবস্থানে অবস্থান। এ অপেক্ষার ঠিক আগুনের ওপর পাতিলের অবস্থার মতো। আর একারণেই হাদিসে এই সবরকে জলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় রাখার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এখানে সবরের মানে হীনমন্যতামূলক গর্তে চিন্তায় মগ্ন হওয়া; যা জাহেলিয়াতকে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে সক্ষম। সত্যিকারের মুমিনরা এ কাজে একে অপরকে সহায়তা করে। কারণ, তা একাকী করা অসম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সামষ্টিক প্রচেষ্টায় সহজ হয়। মানুষ একত্রিত হলে তা সামাজিক মহীরুহে আকার ধারণ করতে সক্ষম। আর আল্লাহর হাত সকল সামষ্টিক প্রচেষ্টার সাথে।
সম্ভবত একজনকে পঞ্চাশজনের সমান প্রতিদান দেওয়া সংক্রান্ত হাদিসের অর্থ এটাই- পঞ্চাশজন মিলে একজনের সমান কাজ করে। ভিন্ন কথায় একই পঞ্চাশজনের সমান কাজ করে কিংবা পঞ্চাশজন সাহাবির সমান প্রতিদানের অর্থ হলো উল্লেখিত আমলগুলো সাহাবিদের আমলের মতোই। যেমন : সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকা, ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে একত্রিত হওয়া, জাহেলিয়াতের মোকাবিলায় নিঃশেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া এবং এসব কাজে সবর করার পাশাপাশি সবরের প্রতিযোগিতা করা। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।

📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 মানুষের দ্বিতীয় জীবন

📄 মানুষের দ্বিতীয় জীবন


যেভাবে মানুষ তার জীবনকে লম্বা করতে পারে, একইভাবে মৃত্যুপবর্তী সময়েও জীবনকে প্রসারিত করতে পারে। সে মৃত হয়েও জীবিত থাকে; কবর থেকেই জীবন্ত মানুষের জন্য বার্তা পাঠাতে থাকে।
আর এটা তখনই সম্ভব হয়, যখন তার রেখে যাওয়া কিছু থেকে মানুষ উপকৃত হয়। যেমন : উপকারী জ্ঞান, উত্তম আমল, ভালো কোনো নিদর্শন কিংবা সুন্দর কোনো রীতি-রেওয়াজ, যা মানুষ অনুসরণ করে। যা থেকে সুফল আসতে থাকে অথবা তার নেক সন্তান- যাকে সে উত্তমভাবে গড়ে তুলেছে। ফলে সে সুন্দর চরিত্র নিয়ে জীবনকাল অতিক্রম করছে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রা থেকে আল্লাহর রাসূলের ﷺ একটি হাদিস বর্ণনা করেন- 'আদম সন্তানের মৃত্যুর সাথে সাথে আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি বিষয় ছাড়া; সাদাকায়ে জারিয়া, উপকৃত হওয়া যায় এমন জ্ঞান এবং সৎকর্মশীল সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে।'
অন্য একটি হাদিসে এই তিনটি বিস্তারিত এসেছে- হজরত আবু হুরায়রা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন- 'নিশ্চয় ঈমানদারের মৃত্যুর পরেও তার আমল ও পুণ্যকর্ম থেকে যে সমস্ত বিষয় (তার আমলনামায়) যুক্ত হতে থাকবে। তা হচ্ছে-
১. এমন ইলম ও জ্ঞান, যা সে অন্যকে শিখিয়েছে এবং প্রসার করেছে।
২. সৎ সন্তান, যা সে দুনিয়ায় রেখে গেছে।
৩. কুরআন মাজিদ, যা সে তার উত্তরসূরিদের জন্য ছেড়ে এসেছে।
৪. মসজিদ, যা সে নির্মাণ করেছে।
৫. সরাইখানা, যা সে বানিয়েছে।
৬. নদী, যা সে খনন করেছে।
৭. এমন সাদাকা, যা সে তার সম্পদ থেকে সুস্থাবস্থায় স্থায়ী জীবদ্দশায় দান করেছে।'
এমন বিষয়গুলোর সওয়াব মৃত্যুর পরেও তার আমলনামায় যুক্ত হবে।
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিমে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন- 'যে একটি সুন্দর রীতি চালু করল, সে তার প্রতিদান পাবে। সাথে সাথে কিয়ামত পর্যন্ত যারা এর ওপর আমল করবে, তার প্রতিদানও সে পাবে।' ইবনে মাজাহ : ২৪২
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি।' সূরা ইয়াসিন : ১২
'সেদিন মানুষকে জানানো হবে, সে কী আগে পাঠিয়েছে আর কী পেছনে রেখে এসেছে।' সূরা কিয়ামাহ : ১৩
আর এ ব্যাপারে মানুষ একমত যে, মৃত্যুর পর উত্তম কাজের প্রশংসা তার অন্য একটি জীবন। সীমিত সময়ের জীবনে সন্নিবেশিত অনির্ধারিত এক জীবন। মুতানাব্বি বলেছেন- ذكر الفتى عمره الثاني, وحاجته
ما قاته, وفضول العيش أشغال
'মৃত্যু পরবর্তী স্মরণ মানুষের দ্বিতীয় জীবন, এটা তার আমলনামাকে মোটাতাজা করে।
তাকে অতিরিক্ত কর্মময় জীবন উপহার দেয়।'
আহমদ শাওকি এই ভাবটি ধারণ করে তাকে আরও জীবন্ত শব্দে ব্যক্ত করেন- তিনি মুস্তাফা কামালের শোকগাথায় বলেন- ان الحياة دقائق وثوان
فارفع لنفسك بعد موتك ذكرها * فالذكر للانسان عمر ثان
'অন্তরের ধুকধুকানি তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবন কিছু মিনিট আর সেকেন্ড।
মৃত্যুর পর তোমার জিকির (স্মরণ) আয়োজন করো।
জিকির মানুষের দ্বিতীয় জীবন।'
আবুল আম্বিয়া ইবরাহিম খালিফুল্লাহর দুআ ছিল- 'এবং আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে সত্যভাষী করো।' সূরা শুআরা : ৮৪
দুজন লোকের মাঝে কত তফাত! একজন মৃত্যুবরণ করার পর আশেপাশের সব হৃদয় ব্যথিত, চোখগুলো ক্রন্দনরত। সবার মুখে তার প্রশংসা উচ্চারিত হচ্ছে, দুআ করা হচ্ছে। আর আরেকজন মৃত্যুবরণ করল, কিন্তু কোনো চোখ তার জন্য কাঁদল না, তার বিয়োগে কোনো হৃদয় ব্যথিত হলো না। কোনো কণ্ঠ তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করল না। এটা তাদের ক্ষেত্রে হয়, যারা নেতিবাচক মানসিকতায় জীবন কাটিয়ে দেয় কিংবা মানুষের সঙ্গে জুলুম-জবরদস্তি করে। তাদের ব্যাপারে কবি বলেন- فذاك اذ ان عاش لم ينتفع به
وان مات لم تحزن عليه اقاربه!
'এই হলো সে, যতদিন জীবিত ছিল, কারও উপকারে আসেনি।
আর যখন সে মরল, স্বজনরাও ব্যথা পায়নি।'
আর কুরআনে তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে- 'তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান, কত ঝরনা, কত সুরম্য স্থান! কত সুখের উপকরণ; যাতে তারা উল্লাস করত। অতঃপর আমি এগুলোর মালিক বানিয়েছিলাম আরেক সম্প্রদায়কে। তাদের জন্য ক্রন্দন করেনি আকাশ-জমিনের কেউ। তারা কোনো অবকাশও পায়নি।' সূরা দুখান : ২৫-২৯
অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু তাদের জুলুম ও পাপাচার মৃত্যুবরণ করে না। তাদের কুফরি ও ভ্রষ্টপথ থেকে যায়। তাদের ছাত্র ও অনুসারীরা এগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পায় এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করে।
যে ব্যক্তি কোনো উত্তম সুন্নাহ (রীতি) চালু করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত তার সওয়াব পেতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোনো খারাপ সুন্নাহ (রীতি) চালু করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত তার শাস্তি ভোগ করবে। যেহেতু উপকারী জ্ঞান রেখে যাওয়ায় ব্যক্তির উত্তম আমল জারি থাকে, তাই খারাপ কোনো নিদর্শন রেখে গেলে বা ভ্রষ্ট কোনো চিন্তা রেখে গেলে, তারও মন্দ আমল জারি থাকবে।
তাদের কত খারাপ অবস্থা না হবে! মাটি যাদের ঠিকানা হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের পাপাচার কর্ম, অন্যায় কথাবার্তা এবং বিদ্রোহ ও বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা বিভিন্ন বই-পুস্তক, প্রবন্ধ, ডকুমেন্টারি, ফিল্ম, ক্যাসেটে রেকর্ড, বিভিন্ন প্রযুক্তির কল্যাণে রয়ে গেছে। এগুলো মানুষের চিন্তা ও মননে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যাচ্ছে। আর অন্যদিকে জাহান্নামও তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এ কারণেই সালেহিনরা বলেন- 'সুসংবাদ তার জন্য, যে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার পাপগুলোও মৃত্যুবরণ করেছে। আর ধ্বংস তার জন্য, যে মরে গেছে, কিন্তু তার পাপাচার রয়ে গেছে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00