📄 ভবিষ্যতের কল্পনা-বিলাস এবং দিবাস্বপ্ন
ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও বিষণ্ণতার নেতিবাচক এই দৃশ্যের পাশাপাশি আরেকটি নেতিবাচক অবস্থা দেখা যায়। তা হলো, ভবিষ্যৎ নিয়ে দিবাস্বপ্ন বা কল্পনা-বিলাস। যার সাথে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, বাস্তব কর্ম এবং পরিকল্পনার কোনো মিল নেই।
কল্পনা বিলাস মহান কিছু তৈরি করার পথে বিন্দুমাত্র সহায়ক নয়। এটি আশার আলোতে দেখাতে সক্ষম নয়। কবি বিন জুবাইরের কথার মতোই- 'কল্পনা বিলাস এবং দিবাস্বপ্ন ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়।'
এক লোক ইবনে সিরিনকে বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখেছি, পানি ছাড়া সাঁতার কাটছি। ডানা ছাড়া উড়ে বেড়াচ্ছি। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী?' জবাবে তিনি বলেন, 'তুমি এত বেশি স্বপ্ন দেখ কেন?'
আলি ইবনে আবি তালিব তাঁর ছেলেকে বলেন, 'তুমি অতি উৎসাহী চিন্তা থেকে বিরত থাকো, কারণ, এটা বোকা লোকের কাজ।'
কবি বলেছেন- أعلل النفس بالآمال أرقبها * ما أضيق العيش لولا فسحة الأمل
'সম্ভবনার কোনো কল্পনা-বিলাস আমার উপলব্ধিকে কি রেখেছে ভুলিয়ে?
আমি তো কল্পনায় মত্ত হয়ে সকল উৎকণ্ঠা ভুলে রয়েছি বিশ্রামে!
আমি জানি, তোমার ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই কোনো
তাটা নেই কোনো আকাঙ্ক্ষাও তবুও।'
আরেক কবির কথা- ولا تكن بالممنى فالمنى
رءوس أموال المفاليس!
'কল্পনার পূজারি হয়ো না হে মানুষ, অবাস্তব কল্পনা করে দেবে দেউলিয়া আর বেহুশ।'
কুরআন আহলে কিতাব তথা ইহুদি-নাসারাদের তিরস্কার করেছে। তারা কোনো কারণ- উপকরণ ছাড়া জান্নাতে প্রবেশের স্বপ্ন দেখত। জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যমে তথা সঠিক ঈমান এবং সৎকর্ম ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তারা আরও বলে : জান্নাতে কেবল সে-ই যাবে! যে নিজেকে পূর্ণরূপে সঁপে দিয়েছে আল্লাহর জন্য (আল্লাহর বিধান ও নির্দেশের কাছে) এবং বাস্তবতার সুন্দর ও কল্যাণের পথ অবলম্বন করেছে। তার প্রভুর কাছে অবশ্যই তার জন্য পুরস্কার রয়েছে। তা ছাড়া এ ধরনের লোকদের কোনো ভয়ও থাকবে না এবং তারা দুঃখও পাবে না।' সূরা বাকারা : ১১১-১১২
কুরআনে শুধু আহলে কিতাবদের তিরস্কার করা হয়নি। তাদের মতো যে মুসলিমরা কেবল মুসলিম নাম ধারণ করার কারণেই জান্নাতে প্রবেশ করবে বলে ধরে নিয়েছে, তাদেরও তিরস্কার করেছে।
তারা কোনো সৎ কাজ করে না! এমনকী জান্নাতে প্রবেশের উপায়-উপকরণ নিয়েও তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, অথচ নাজাতের আশা করে বসে আছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তোমাদের খেয়াল-খুশি কিংবা আহলে কিতাবের খেয়াল-খুশিমতো কাজ হবে না। যে মন্দ কাজ করবে, তার প্রতিফল সে পাবেই এবং সে আল্লাহর পরিবর্তে কোনো অলি বা সাহায্যকারী পাবে না। যেকোনো পুরুষ বা নারী মুমিন অবস্থায় আমলে সালেহ করবে, তারা অবশ্যই জান্নাতে দাখিল হবে এবং তাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণ অবিচার হবে না।' সূরা নিসা : ১২৩-১২৪
কুরআন কল্পনা-বিলাসকে অপছন্দ করেছে; উচ্চাশাকে নয়। এ দুটোর মাঝে পার্থক্য হলো- উচ্চাশার সঙ্গে কর্মের সংযোগ থাকে, আর যার সঙ্গে কর্মের কোনো সংযোগ নেই, সেটাই কল্পনা- বিলাস।
যারা আল্লাহর ক্ষমা, মার্জনা ও দয়ার প্রশস্ততার ওপর নির্ভর করে নাজাত পাবে বলে নিশ্চিত হয়ে বসে আছে; আর প্রকৃতির দাসত্ব এবং কামনার পেছনে ছুটছে। কুরআন তাদের কাজকে বোকামি এবং দুর্বলতা বলে ব্যাখ্যা করেছে।
আল্লাহর বাণী হচ্ছে- 'নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।' সূরা আরাফ : ৫৬
তিনি আরও বলেন- 'আমার রহমত সবকিছু ওপর পরিব্যাপ্ত। তা আমি বিশেষভাবে লিখে দেবো সেই সব লোকদের জন্য, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত পরিশোধ করে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান রাখে।' সূরা আরাফ : ১৫৬
এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে- 'বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মণ্য সেই ব্যক্তি, যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করে।' আহমদ, ইবনে মাজাহ
আর (রাজাজাহ) বা প্রত্যাশা এবং তার ধারক সম্পর্কে কুরআনে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহর বাণীতে সংগৃহিত আছে- '(পরবর্তীদের) যারা ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে, আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই আশা করে (করতে পারে) আল্লাহর রহমত। আল্লাহ (তাদের ব্যাপারে) অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াবান।' সূরা বাকারা : ২১৮
সালাফদের সালেহ বান্দারা বলতেন, সৎকর্ম ছাড়া জান্নাতের আশা করা এক ধরনের পাপ কাজ। সুন্নাতের অনুসরণ ছাড়া কিয়ামতের দিনে সুপারিশ লাভের চিন্তা একপ্রকার প্রতারণা। আর নাফরমানির সাথে আল্লাহর রহমতের আশা করা বোকামি এবং মূর্খতা।
হাসান বসরি বলেন- 'ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা একটি দলকে দেবাজ্ঞা আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তারা যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখন তাদের আমলনামায় ভালো কিছু ছিল না। একজন বলছিল, "আমি আমার রবের ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করি।" সে মূলত মিথ্যা বলেছে। যদি সে তার রবের ব্যাপারে ভালো ধারণাই করত, তবে তাঁর সামনে ভালো আমল পেশ করত।'
অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন- 'তোমাদের প্রভু সম্পর্কে এ ধারণাই তোমাদের ডুবিয়েছে। ফলে তোমরা হয়েছ চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত।' সূরা হা-মিম : ২৩
তিনি আরও বলেন- 'হে মানব সন্তানরা! তোমরা বেশি কল্পনা-বিলাস থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, এই জগতটা হলো নির্বোধ লোকদের। তারা সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আল্লাহ তায়ালার কসম! তিনি কোনো বান্দাহকে কল্পনা-বিলাসের মাধ্যমে দুনিয়া কিংবা আখিরাতে কোনো কল্যাণ প্রদান করেননি।'
📄 ‘বর্তমান’-এর প্রেমিক
কিছু মানুষ আছে, যারা অতীতের দিকেও তাকায় না, ভবিষ্যতের দিকেও দৃষ্টিপাত করে না। বর্তমানকে নিয়েই মত্ত থাকে; বর্তমান-কে ঘিরেই তাদের সকল আয়োজন। তারা বলে, 'অতীত তো হারিয়ে গেছে। যা হারিয়ে গেছে তা মৃত্যুর সমতুল্য। আর মৃত কোনো জিনিস নিয়ে ব্যস্ত হওয়া বা চিন্তা করা মানানসই নয়।'
তাদের কাছে ভবিষ্যৎ মানেই অজানা-অদৃশ্য কিছু। আর অজানা মানেই অজ্ঞাত। একজন সম্মত জীবন্ত মানুষ কেন অজ্ঞাত কিছুর সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে? এটা তো বালি দিয়ে বাঁধা দেওয়া কিংবা বাতাসের ওপর লেখার মতো।
বর্তমানের মাঝে ডুবে থেকে থেকে তারা ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে ভুলে গেছে। একইভাবে তারা অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেও নারাজ।
তাদের দাবি, তারা সময়ের সন্তান। তারা শুধু বর্তমানকে যথেষ্ট মনে করে। আখিরাতের ব্যাপারে তাদের কোনো মনোযোগ নেই; কারণ, সেটাও ভবিষ্যৎ। তারা নগদকে বাকির বিনিময়ে বিক্রি করতে নারাজ। তাদের চোখের সামনে থাকা লাভকে ভবিষ্যতে অধিক লাভের আশায় বিনিয়োগ করতে চায় না। তারা ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখতে চায় না। কারণ, তা অতীত এবং তার উপযোগিতা ফুরিয়ে গেছে।
'তারা সময়ের সন্তান' কথাটির অর্থ-তারা বর্তমান চলমান সময় ছাড়া অন্য সময়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। সেটা নিয়ে চিন্তা করতেও ইচ্ছুক নয়। তারা বর্তমানকে সবটুকু উপভোগ করে। অতীতকে স্মরণ না করে ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে তাদের সকল মনোযোগের কেন্দ্র উপস্থিত মুহূর্তকে ঘিরে।
আরবি কবিতার এই পঙ্ক্তিটি এ ধারার লোকদের প্রতিনিধিত্ব করছে- ما مضى فات, والمؤمل غيب
ولك الساعة التي أنت فيه
'যা যাওয়ার তা গেছে, প্রত্যাশাটা অন্ধকারে,
তুমি যে সময়ে আছ, তোমারই আছে।'
কথাটি সত্য, যখন তা দৃঢ় চিত্তের মুমিন বা সর্বহারা কেউ উচ্চারণ করে। মানুষের কাছে যদি শুধু একটা ঘণ্টা বাকি থাকে, সে কেন তা নষ্ট করবে? কেন তা আল্লাহর আনুগত্যে বিনিয়োগ করবে না? কেন তা সত্যের সহযোগিতা, উত্তম কাজ ও কল্যাণের বিস্তারে লাগাবে না?
যে কারণে নিচের পঙ্ক্তিটি অনেক প্রাচীন সালেহ ব্যক্তির কথার সঙ্গে মিলে যায়- انما هذه الحياة متاع * فالجهول المغرور من يصطفيها
ما مضى فائت والمؤمل غيب * ولك الساعة التي أنت فيه
'দুনিয়া সামান্য ভোগের সামগ্রী প্রতারিত ও নাদান সেইজন,
যে একে গ্রহণ আগ্রহী। যা অতিবাহিত হয়েছে তা তো হারিয়েই গেছে।
অনাগত আশা? সে তো গায়েবি ব্যাপার।
শুধু এতটুকুর মালিক হয়েছ- আজ যেখানে তুমি আছ।'
আর ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, বর্তমান আসলে অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝে একটা কাল্পনিক রেখা মাত্র। এ উপলব্ধি থেকেই কবি বলেছেন-
📄 সময়ের সাথে সঠিক আচরণ
কবি বলেছেন- ما الدهر الا ساعتان : تامل
فيما مضى وتفكر فيما بقى
'জীবন আসলে দুটো ঘণ্টার নাম।
এক ঘণ্টা অতীতকে পর্যবেক্ষণের, আর অন্য ঘণ্টা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার।'
কবি এখানে বর্তমানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। তবে জেনে রাখা উচিত, মানুষের চিন্তায় বর্তমান হলো উপস্থিত মুহূর্ত এবং তার সাথে মিশে থাকা ভবিষ্যতের ছোট একটি সময়। যেমন মানুষ বলে, 'সময় হয়ে গেছে' অর্থাৎ এখনই করতে হবে। কাজ করার সময়টা বর্তমানকাল। আর তা বর্তমান মুহূর্ত এবং ভবিষ্যতের কিছু অংশের সমন্বয়ে হয়ে থাকে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সময়ের প্রতি সঠিক আচরণই হচ্ছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ধারণ করা, মূল্যায়ন করা।
অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত : অতীতের ঘটনাপুঞ্জ এবং বিভিন্ন জাতির সাফল্য বা পরিণাম থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর অনুসৃত নীতি উপলব্ধি করতে হবে। অতীতের পাতায় মিশে আছে হাজারো ঘটনার সমাহার। কারও অতীত হলো শিক্ষা বা উপদেশের খনি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
'তোমাদের পূর্বে বহু সুন্নাহ (নিয়মত পথ) বিগত হয়েছে। সুতরাং পৃথিবীতে ভ্রমণ করে দেখ (আল্লাহর নিয়ম বিধানকে) অস্বীকারকারীদের পরিণতি কী হয়েছে। এটি (কুরআন) মানবজাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা এবং সতর্ক লোকদের জন্য জীবন- পদ্ধতি ও উপদেশ। তোমরা দুর্বল হয়ো না, আর দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমার মুমিন হও। তোমরা যদি আঘাত পেয়ে থাকো, তবে তারাও (প্রতিপক্ষ) পেয়েছে। মানুষের মাঝে সেই (ভালো-মন্দ) দিনগুলোর আমরা আবর্তন ঘটাই।' সূরা আলে ইমরান : ১৩৭-১৪০
'তারা কি জমিনের বুকে পরিভ্রমণ করে না? আর তাদের যদি আকলওয়ালা কলব থাকত এবং শোনার মতো কান থাকত! তাদের চোখ তো অন্ধ নয়, মূলত অন্ধ হলো তাদের বুকের মধ্যকার কলব (হৃদয়)।' সূরা হজ : ৪৬
'বহু নবি রাসূল (যুদ্ধ) করেছে, তাদের সাথে ছিল অনেক আল্লাহওয়ালা লোক। আল্লাহর পথে তাদের যেসব বিপদ-মসিবত ঘটেছিল, তাতে তারা দুর্বলও দেখায়নি এবং নতিও স্বীকার করেনি। আর আল্লাহ (ঈমানের ওপর) অটল-অবিচল থাকাদের ভালোবাসেন।' সূরা আলে ইমরান : ১৪৬
এরপর আসে অতীতের লোকদের রেখে যাওয়া বিজ্ঞান, সাহিত্য ও কারিগরি বিদ্যা থেকে উপকৃত হওয়ার প্রসঙ্গ। তবে এগুলো অবশ্যই যাচাই-বাছাই এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে হবে। যেটা আমাদের সময় ও অবস্থার সাথে যায়, সেটা গ্রহণ করতে হবে।
হাদিসে এসেছে- 'জ্ঞানের কথা মুসলমানের হারানো সম্পদ। যেখানেই তা পাওয়া যাবে, সেই তার অধিক হকদার।'
পুরাতনকে পুরাতন হওয়ার দোষে বর্জন করা হবে, এমনটা ঠিক নয়। কিছু জিনিস রয়েছে, পুরাতন হওয়াই যার বৈশিষ্ট্য। পুরাতন হওয়াই তার মর্যাদার প্রতীক। স্বভাবজাত কারণে সে নতুনত্ব গ্রহণ করতে পারে না।
কুরআনের মর্যাদা কি এ কারণে নয় যে তা আল্লাহর কালাম এবং কোনো নতুন বিকল্প সৃষ্টি হতে পারে না? সময়ের গতি এবং যুগের বিবর্তনের সাথে সে হারিয়ে যাবে না?
আবার গুরুত্ব কি এ কারণে নয় যে, এটা 'বায়তুল আতিক'; যুগের পর যুগ এখানে হজ পালন করা হয়েছিল। কুরআন নতুন করে আসতে পারে না, নতুন কোনো কাবা সৃষ্টি হতে পারে না। আমাদের চলার পথে বহু বাস্তবতা রয়েছে, যার কোনো নতুনত্ব নেই।
পুরাতন মানেই বর্জন করা হবে, আর সব নতুনকেই অভ্যর্থনা দেওয়া হবে-এই ধারণার সাথে চলতে গিয়ে নতুনত্বের সৈনিকরা বরাবরই সীমালঙ্ঘন করেছে। বহু পুরাতন জিনিস রয়েছে, যার উপকারিতা অসামান্য। অপরপক্ষে নতুন মানেই ভালো কিছু নয়। কিছু কিছু নতুন মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুনত্বের সৈনিকদের বিদ্রোহ করে প্রখ্যাত আরবি সাহিত্যিক মুস্তাফা সাদিক রাফেয়ি বলেন- তারা আমাদের দ্বীন, ভাষা, এমনকি চন্দ্র-সূর্যকেও নবায়ন করতে চায়!
কবিদের সম্রাট আহমদ শাওকি 'আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়'কে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতায় সংস্কারবাদীদের সমালোচনা করে বলেন-
لا تجد حذفون كل قديم * منكرا
ولو استطاعوا في المجامع انكروا * من مات من ابائهم او عمرا
واذا تقدم للبناية هدمه * واذا تقدم للبناية قصرا
'তোমারা মোহাবিষ্ট হয়ে তাদের অনুসরণ করো না। তারা প্রত্যেক পুরাতনের মাঝে জঘন্য কিছু খুঁজে পায়। সুযোগ পেলে এরা মজলিশে মৃত পূর্বপুরুষ এবং বয়স্ক জীবিতদের বাজে ধারণা করে বসে। অতীতের সকল উদ্যোগ এবং ব্যর্থতা তাদের চোখে নিন্দনীয়, আর সকল উন্নতি তুচ্ছ।'
আসলে নতুন ও পুরাতন-দুটোই আপেক্ষিক ব্যাপার। এক জাতির কাছে যা পুরাতন, অন্য জাতির কাছে তা নতুনও হতে পারে। এক এলাকায় যা নতুন, অন্য এলাকায় তা পুরাতন। আর নতুন সব সময় নতুন থাকে না। সময় তা পুরাতন করে দেয়। আজ যা পুরাতন, গতকাল তা ছিল নতুন। আবার আজকের নতুন আগামীকালের পুরাতন।
আমাদের দিনগুলো তার নিজ গতিতে চলছে। প্রতিটি দিনে একটি সময় নির্দিষ্ট থাকা উচিত, যেখানে মানুষ নিজের সম্পর্কে পর্যালোচনা করবে। আজ সে কী করেছে? কেন করেছে? কী করেনি? কেন করেনি? আর এই পর্যালোচনার সময় হওয়া উচিত ঘুমানোর পূর্বে।
আত্মসমালোচনা এ সময়টি মানবিক উন্নতিতে খুবই সহায়ক। এর মাধ্যমে মানুষ কামনার দাসত্ব থেকে বুদ্ধি ও মননকে মুক্ত করতে পারে। তার ঈমানকে বানাতে পারে পর্যবেক্ষণশীল, রক্ষী, নিরীক্ষক এবং কর্মের ওপর বিচারক। আর এভাবেই সে নফসকে কুমন্ত্রণাদানকারী অবস্থা থেকে অনুশোচনাকারী নফসে উন্নীত করবে যে নফস তাকে পূর্বজীবনে করা নিষিদ্ধ কর্ম এবং ছেড়ে দেওয়া করণীয় কর্মের ব্যাপারে ভর্ৎসনা করে।
ইতিপূর্বে আমরা একটি হাদিস উল্লেখ করেছি। যার ভাষ্য ছিল, মানুষ তার সময়কে চার ভাগে ভাগ করবে। তার মধ্যে একটি ভাগ হলো, সে কর্মের মূল্যায়ন করবে, আত্মসমালোচনা করবে।
আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব বলেন- 'তোমরা পরকালীন হিসাব-নিকাশের পূর্বে নিজেদের হিসাব করে নাও। তোমাদের কর্ম দ্বারা তোমাদের ওজন দেওয়ার পূর্বে নিজ কর্মকে ওজন দিয়ে নাও।'
প্রতিদিন সন্ধ্যায় অন্ধকার ছেয়ে যাওয়ার পর তিনি চাবুক দিয়ে স্বীয় পদযুগলে আঘাত করতেন। আর নিজেকে প্রশ্ন করতেন, আজ তুমি কী করেছ?
প্রখ্যাত তাবেয়ি মায়মুন ইবনে মাহরান বলেন- 'আমি তাকে নিজের ব্যাপারে একজন অত্যাচারী শাসক এবং কৃপণ ব্যবসায়ীর চেয়ে বেশি হিসাবি দেখতে পেয়েছি।'
হাসান বসরি বলেন- 'মুমিন তার প্রবৃত্তির ওপর প্রভাব বিস্তারকারী। যে জাতি দুনিয়ায় নিজেদের ব্যাপারে হিসাবি, বিচার দিবসে তাদের হিসাব সহজ করা হবে। আর যারা আত্মসমালোচনা ছাড়া অবাধ জীবনযাপন করতে থাকে, তাদের কিয়ামতের দিনের হিসাব হবে বড়ই কঠিন।'
তিনি আত্মসমালোচনা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন- 'মানুষের সামনে যখন আকর্ষণীয় কোনো ব্যাপার আসে, তখন সে বলে, "তুমি আমাকে আকৃষ্ট করেছ, তোমার সাথে আমার মিশে যাওয়া উচিত। আফসোস! তোমার সাথে আমার মিলন অসম্ভব।"' (এটা কর্মের পূর্বের হিসাব)।
তিনি আরও বলেন- 'যে কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলে এবং তারপর তার বিবেকের কাছে ফিরে যায়- সে বলে, "হ্যাঁ, আমি এটা কেন করলাম? আল্লাহর কসম এ ব্যাপারে আমার কোনো অজুহাত সমর্থন করতে পারব না। তার কসম! এই কাজ আমি আর কখনো করব না, ইনশাআল্লাহ।"' (কাজ করার পরের আত্মসমালোচনা)
যে ব্যক্তি প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করতে সক্ষম নয়, তার উচিত কয়েকদিন পরপর করা; অন্তত সপ্তাহে একবার। কেবল আত্মসমালোচনার মাধ্যমে কেউ ভালো করতে পারলে তার প্রতি কৌতূহল, তার দায়িত্বের কী কী বাকি আছে?
আর প্রত্যেক মাসের শেষে লম্বা সময় নিয়ে বসে আত্মসমালোচনা করতে হবে। প্রত্যেক বছর বিদায় জানানো এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সময় বেশি বিশ্লেষণমূলক আত্মসমালোচনা করতে হবে। বিগত বছরে যা কিছু হারিয়েছে, তার পর্যালোচনা এবং যা কিছু পেয়েছে, তার উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; ঠিক ব্যবসায়ীদের বার্ষিক হালখাতার মতো।
Happy New Year কিংবা Happy Birthday পশ্চিমাদের একটি নতুন আবিষ্কার! দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিমদের একটি অংশ আজ এটা অনুসরণ করছে। তাদের জীবন থেকে প্রতিটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা একটি জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে সুস্বাদু ও উন্নত খাবার এবং পানীয়ের ব্যবস্থা করা হয়। মানুষ আজকাল পশ্চিমাদের এ আচার- আচরণগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা সাল গণনার এ সময়টিতে সমাবেত অর্জন করতে এবং নাটকীয় কায়দায় তা নিভিয়ে ফেলছে।
জন্মদিনের এই সময়টিতে শুভেচ্ছা ও উপহার বিনিময় করছে।
এটা অন্ধ অনুসরণ; যার কোনো অর্থ কিংবা উপকারিতা নেই! একজন বুদ্ধিমান মানুষের উচিত হবে, জীবনের একটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগটির সদ্ব্যবহার করা। জীবনটাকে সুন্দর পরিপাটি করে গুছিয়ে নেওয়ার নিমিত্তে হিসাব-নিকাশে সময় দেওয়া। মাথায় চিন্তা- ভাবনা করা; ঠিক জাত ব্যবসায়ীর মতো। একজন জাত ব্যবসায়ী বছর শেষে হিসাব-নিকাশ নিয়ে বসে। হিসাবের খাতা খুলে মজুদ পণ্যগুলোর হিসাব করে এবং ঋণের পরিমাণটা দেখে নেয়। যাতে সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, তার কী দেনা-পাওনা আছে। সে কতটুকু লাভ করেছে, আর কতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
তার উচিত হবে আল্লাহর কাছে নিজের জন্য ধারণা দেওয়া, যেন আজকের দিন গতকালের চেয়ে ভালো হয়। আর আগামী দিন হয় আজকের চেয়েও উন্নত।
একজন বুদ্ধিমান মানুষের উচিত, জীবন থেকে খসে পড়া পূর্ণ একটি বছর কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করা; যার ব্যাপারে আল্লাহ অচিরেই তাকে জিজ্ঞাসা করবেন। আর এটা মোটেই কম সময় নয়। পুরো একটি বছর! অর্থাৎ বারো মাস। প্রতি মাসে ত্রিশটি দিন। দিনে চব্বিশটি ঘণ্টা। ঘণ্টায় ষাটটি মিনিট। মিনিটে ষাট সেকেন্ড। আর প্রতিটি সেকেন্ডে আল্লাহর কিছু নেয়ামত রয়েছে; প্রতিটি সেকেন্ডেই তাঁর পক্ষ থেকে আমানত।
প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের উচিত হবে জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে আফসোস করা। জীবনের বরাদ্দ সময় থেকে যা নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো নিয়ে অনুশোচনা করা। অতিবাহিত প্রতিটি দিন জীবনবৃক্ষের ঝরে পড়া একেকটি পাতা।
আল্লাহ হাসান বসরির ওপর রহম করুন। তিনি বলেছেন- 'হে আদম সন্তান! তুমি কিছু দিনের সমষ্টি। যখনই একটি একটি দিন চলে যায়, তোমার একটি অংশ হারিয়ে যায়।'
আর আলি আদ-দাক্কাক গানের সুরে বলতেন- كل يوم يمر يأخذ بعضي
يورث القلب حسرة ثم يمضي!
'প্রত্যেকটি দিন জীবনের কিছু অংশ ছিনিয়ে নেয়।
আমাকে কিছু স্মৃতি উপহার দিয়ে হারিয়ে যায়।'
অন্য এক কবি বলেছেন- يسر المرء ما ذهب الليالي
وكان ذهابهن له ذهابا
'রাত্রি কেটে গেলে মানুষ খুশি হয়। অথচ এটা মূলত তার নিজের জীবনের একটা অংশ চলে যাওয়া।'
আরেক কবি ভাষ্য- انا لنفرح بالايام نقطعها
وكل يوم مضى جزء من العمر
'আমরা হাসিখুশিতে দিন কাটিয়ে দিই, কাটিয়ে দেওয়া প্রতিটি দিন জীবনেরই একটি অংশ, তা ভাবি কজনই।'
📄 ভবিষ্যতে দৃষ্টিদান
মানুষ স্বভাবগতভাবে ভবিষ্যতের সাথে বাঁধা। সে ভবিষ্যতের ব্যাপারে অমনোযোগী হতে পারে না। তা দৃষ্টি আড়াল করে চলতে পারে না। অতীতের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মানুষ্য জীবিকার অর্জনের সঙ্গে জড়িত। একইভাবে ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে পারা বা পরিকল্পনা সাজানো কিংবা তাতে কী ঘটবে; তার ওপরও জীবিকার বেশ কিছু বিষয় নির্ভর করে।
ভবিষ্যতের বৈশিষ্ট্য হলো তা অজ্ঞাত ও অজানা। কেউই জানে না, ভবিষ্যতের বুকে কোন জিনিস লুকিয়ে আছে? কোন রহস্য আছে? তাতে কি কল্যাণকর কিছু আছে, নাকি অজানা অকল্যাণ!
'কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে।' সূরা লুকমান : ৩৪
ভবিষ্যতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- তাতে আগমনকারী সবকিছু খুবই নিকটবর্তী। যদিও মানুষের ধারণা, ভবিষ্যৎ দূরবর্তী কোনো সময় বা সম্ভাবনা। এ কারণেই বলা হয়, আজকের সাথে আগামী দিন মিশে আছে। পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তির জন্য আগামী দিন খুবই কাছে।
আল্লাহই কুরআনে কাছে- 'কিয়ামতের ব্যাপারটি তো এমন, যেমন চোখের পলক অথবা তার চাইতেও নিকটবর্তী।' সূরা নাহল : ৭৭
সেই ব্যক্তিই বুদ্ধিমান, যে ভবিষ্যতের ব্যাপারে সতর্ক থাকে এবং মোকাবিলায় সরঞ্জাম মজুদ রাখে; ঘটনা ঘটার আগেই তার জন্য প্রস্তুত থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তিই যেন ভেবে দেখে, সে আগামীকালের (পরকালের) জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে?' সূরা হাশর : ১৮
যারা মনে করে দ্বীন মানুষকে পশ্চাৎপদ করে রাখে, তারা আসলে দ্বীনের মৌলিকত্ব এবং তার গুরুত্ব উপলব্ধিতে ভুল করেছে। দ্বীনের মিশনই হলো মানুষকে চিরস্থায়ী জিন্দেগির জন্য প্রস্তুত করা। অর্থাৎ তাকে ভবিষ্যতের এমন আবাসের জন্য প্রস্তুত করা, যা বর্তমান আবাসের তুলনায় বহুগুণ উত্তম ও স্থায়ী।
সুতরাং ভবিষ্যতের দর্শনই হচ্ছে দ্বীনের মৌলিক বুনিয়াদ।
হাদিসে এসেছে- 'বান্দার বসবাস দুটো শত্রুর মাঝে। একটি অতিবাহিত সময়। সে জানে না তার এবং আল্লাহর মাঝে কোনো ধোঁকা সংঘটিত হয়েছে কি না? আরেকটি হলো অনাগত ভবিষ্যৎ। সে জানে না, আল্লাহ তার কী বিচার করবেন? সুতরাং বান্দাকে আত্মসত্তা বিকিয়ে নিজের জন্য রসদ সংগ্রহ করতে হবে। দুনিয়া থেকে আখিরাতের জন্য পাথেয় অর্জন করতে হবে। বার্ধক্য আসার আগে যৌবন থেকে আখিরাত গুছিয়ে নিতে হবে। যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! মৃত্যুর পরে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। দুনিয়ার পরে জান্নাত এবং জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই।'
এ কথাগুলোর মানে এই নয়, একজন দ্বীনদার মানুষ কেবল পরকালীন ভবিষ্যৎকেই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে এবং তার দুনিয়াবি ভবিষ্যৎ নিয়ে অমনোযোগী থাকবে। ইসলাম তাকে আগামী দিনগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে শিখিয়েছে। আগামীর জন্য পুঁজি সঞ্চয় করতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে সচেতনভাবে ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুদ করতে। আর এটা দুনিয়াবি ও দ্বীনি- উভয় প্রকারের বিষয়াবলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রাসূল ﷺ মুমিনদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। আমরা তাঁকে দাওয়াতি কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, অনুসন্ধান এবং গবেষণা করতে দেখেছি। তিনি আগে আওস ও খাজরাজ গোত্র থেকে দ্বীন রক্ষার বায়আত গ্রহণ করেছেন এবং তারপর হিজরতের চিন্তা করেছেন। এসবই ছিল শরিয়া এবং ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর নীতির অংশ।
আকাবায় প্রথম ও দ্বিতীয় বায়আত নেওয়া, তারপর ইয়াসরিবে হিজরতের জন্য প্রস্তুতি-এগুলো ইসলামের ভবিষ্যতের জন্য ধারাবাহিক পরিকল্পিত কার্যকর পদক্ষেপ। আর জাগতিক বিষয়ে দেখতে পাই, তিনি পরিবারের জন্য এক বছরের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করেছিলেন। তিনি এই কাজকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেননি। কারণ, তাওয়াক্কুল কোনো উপায়-উপকরণ অবলম্বনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।