📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 ভবিষ্যতের পূজারি

📄 ভবিষ্যতের পূজারি


সময় নষ্টকারী অতীতমুখীদের বিপরীতে আমরা আরেক দল লোক দেখি। এই দলের লোকজন তারাই, যারা ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি ব্যস্ত হতে গিয়ে অতীতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তারা নিজেদের অতীত ঐতিহ্যকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করছে। আপন জাতি এবং দুনিয়ার অন্য জাতিগুলোর ইতিহাসকে উপেক্ষা করছে। এভাবে বরং সমগ্র মানবতার ইতিহাস এড়িয়ে চলছে। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে উপেক্ষা করছে এবং এগুলোর মধ্যে হক-বাতিল, হালাল-হারাম, উপকারী-ক্ষতিকর ইত্যাদির বাদ-বিচার করছে না।
তাদের ভাষ্য হলো, আমরা পূর্বপুরুষ কিংবা অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না। তাদের অনুকরণ থেকে আমরা মুক্তি চাই। যারা মরে গেছে, মৃত্যু যাদের নিঃশেষ করে দিয়েছে, তাদের নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানেই হয় না! আমাদেরকে যুবকদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে; যুবকরা আগামী দিনের কর্ণধার। শিশুদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে; তারা আগামী দিনের যুবক। সুযোগ থাকলে জ্ঞান নিয়ে গবেষণায় মনোযোগী হতে হবে। কারণ, এই জ্ঞান থেকে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি হবে।
তারা আরও বলে, আমাদের চক্ষু পেছনের দিকে ফিট করা হয়নি। সুতরাং আমরা পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকব কেন? চক্ষু তো সামনে রাখা হয়েছে, যেন আমরা সামনের জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে পারি। তাহলে আমাদের পেছনের দিকে তাকাতে বাধ্য করা হবে কেন; যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন, গতিশীল উন্নতি এবং পথ চলার পদে পদে বাধা।
তারা এ ধরনের অনেক কথাই বলে। এই কথাগুলো কিছু ক্ষেত্রে সঠিক। যেমন : কেউ একজন অতীতের কারাগারে বন্দি; ঠিক এমন বন্দির মতো, যাকে নির্যাতনও করা হচ্ছে না, আবার বেরোনোর সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। এমন বন্দিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, যার দিনের বাস্তবতার প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, আগামীর কর্তব্যের প্রতি নেই কোনো চেতনা।
কিন্তু এর উদ্দেশ্য যদি হয় অতীতকে গোড়া থেকে ভুলে যাওয়া, যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করা, চাক্ষুষ ও ক্লীয় বুদ্ধিকে ঐতিহাসিক সকল জ্ঞান, শিক্ষা ও দৃষ্টান্তের ওপর সন্দেহাতীতভাবে বিবেচনা করা, তাহলে এ কথাগুলো সত্য নয় অথবা 'কথা সত্য, কিন্তু মতলব খারাপ' টাইপের সত্য। আল্লাহ তাআলা অতীতের শিক্ষা থেকে ফায়দা নেওয়ার জন্য পবিত্র কুরআনে খুব চমৎকার কিছু কথা বলেছেন-

📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 ভবিষ্যৎ নিয়ে নৈরাশ্য : এক অশুভ চিন্তা

📄 ভবিষ্যৎ নিয়ে নৈরাশ্য : এক অশুভ চিন্তা


আরেকদল মানুষের চিন্তা শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সদা চিন্তিত। তাদের চিন্তা সব সময় হতাশাজনক। তাদের চোখের সামনে সর্বদা একটি কুচকুচে কালো চশমা থাকে। তারা তা দিয়েই দুনিয়াকে দেখে; জীবন, সময় ও অবস্থাকে মূল্যায়ন করে। সে 'আগামী' সম্পর্কে হতাশ। সাফল্যের ব্যাপারে নিরুৎসাহী। তাদের বদ্ধমূল ধারণা- পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে। জীবন এক অমানিশার কালো রাত্রি, যা কখনো সুবহে সাদিকের আলো দেখবে না। কোনো সূর্য তার অন্ধকার মুছে দেবে না।
নিঃসন্দেহে এটি মারাত্মক পর্যায়ের ধ্বংসাত্মক চিন্তা। মানুষ্য ব্যক্তিসত্তার জন্য ধ্বংসাত্মক; জীবন, সমাজ এবং তার পারিপার্শ্বিক সবকিছুর জন্য ধ্বংসাত্মক।
আশাবিহীন কোনো জীবন, ব্যক্তির জীবন আর্থিক কিংবা সুদের ছিদ্রের চেয়েও সংকীর্ণ। জনৈক কবি বলেছেন- ما أضيق العيش لولا فسحة الامل
'জীবন কত-না সংকীর্ণ!
যখন অনুপস্থিত আশার আলো!'
আর আশার আলোবিহীন সামাজিক জীবন একটা মৃত, নিষ্প্রাণ জীবন। যার মাঝে কোনো রুহ নেই, নেই কোনো স্পন্দন। যদি আশা না থাকত, স্থপতি কোনো স্থাপনা নির্মাণ করত না, কোনো কৃষক গাছ লাগাত না, জ্ঞান-বিজ্ঞান সামনের দিকে এক ইঞ্চিও অগ্রসর হতো না।
বাস্তবতা হলো- দ্বীন, ইতিহাস এবং চলমান ঘটনাপুঞ্জ আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, হতাশার সাথে জীবনের কোনো অর্থ নেই। আবার জীবনের সাথেও হতাশার কোনো মানে হয় না। দুঃখের পরেই সুখ। রাতের পরেই ফজরের আলো। একই অবস্থা চিরকাল থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'আল্লাহর রহমত থেকে কাফিররা ছাড়া আর কেউই নিরাশ হয় না।' সূরা ইউসুফ : ৮৭
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- 'বিভ্রান্তরা ছাড়া কে নিরাশ হয় তার প্রভুর রহমত থেকে?' সূরা হিজর : ৫৬
কবি বলেছেন- ورب نازلة يضيق بها الفتى * ذرعا وعند الله منها المخرج
ضاقت فلما استحكمت حلقاتها * فرجت وكنت أظنها لا تفرج
'বিপদ বনি আদমকে আটকে ফেলে অক্টোপাসের মতো,
আল্লাহর কাছে আছে উত্তরণের উপায় যত;
তারপর গ্রন্থি যখন হলো সংকীর্ণ, অবশেষে সেটা গেল ভেঙে পড়ে।
অথচ আমি তো ভেবেছিলাম কখনোই হবে না তার অবসান।'
আরেক কবি বলেছেন- اشتدي ازمة تنفرجي
قد اذن ليلك بالبلج
'ইচ্ছাশক্তি মজবুত করো। আশার আলো দেখবেই।
রাত্রি তোমাকে শুভ কিছুর আভাস দিয়ে যাচ্ছেই।'
হতাশা ও নৈরাশ্যের আরেকটি চিত্র হলো, আজকাল সিংহভাগ মুসলিম বিশ্বাস করে, আমরা সামান্য চলে এসেছি। কিয়ামতের আলামত প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যা কিছু কল্যাণকর সব পেছনে ফেলে এসেছি। সামনে কেবল অনিষ্টতার অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। দ্বীনি মূল্যবোধের আলো দিন দিন স্তিমিত হয়ে হয়ে যাবে। গোটা দুনিয়া। আর কিয়ামত আসবে কাফিরদের সন্তান কাফিরদের ওপর। এ রকম চিন্তা একবার শুরু হলে, তখন সমাধানের কোনো আশা থাকে না; সংশোধনের ইচ্ছাও না।
তারা এই নৈরাশ্যবাদী চিন্তার সমর্থনে ফিতনা এবং কিয়ামতের আলামতসংক্রান্ত হাদিসসমূহকে দলিল হিসেবে পেশ করে।
কিন্তু বাস্তবতা তাদের এই বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সীমিত বুঝ থেকে যোজন যোজন দূরে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত কিয়ামতের নিকটবর্তী এবং দূরবর্তী আলামতগুলো প্রকাশ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, কিয়ামত আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে; বরং কিয়ামতের নিকটবর্তী কিংবা দূরবর্তী এ আলামতগুলো আপেক্ষিক। কে জানে, হয়তো আমাদের এবং কিয়ামতের মাঝে হাজার হাজার বছরের ব্যবধান; যা কেবল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না অথবা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি নিকটবর্তী কিংবা সংকুচিত হতে পারে। কুরআন এ ব্যাপারে শুধু এতটুকুই বলেছে- 'তা তুমি জানবে কী করে? হয়তো-বা কিয়ামত খুব শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হবে।' সূরা আহজাব : ৬৩
'বস্তুত কিয়ামত নিকটবর্তী।' সূরা শূরা : ১৭
': সেটা তোমাদের কাছে আসবে একেবারেই আকস্মিক।' সূরা আরাফ : ১৮৭
আমাদের নবি ﷺ-এর আবির্ভাবও কিয়ামতের একটা আলামত। তিনি বলেছেন- 'আমাকে এবং কিয়ামতকে ঠিক এ দুটোর মতোই কাছাকাছি পাঠানো হয়েছে।' (এমন কথা বলার সময় তিনি নিজের মধ্যমা এবং তর্জনী আঙুল পাশাপাশি করে দেখালেন)। বুখারি ও মুসলিম
সুতরাং কিয়ামতের অপেক্ষায় ইসলামি শরিয়ত, মুসলিম উম্মাহ এবং ইসলামি রাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ থেকে গুটিয়ে রেখে আমরা শেষ যুগে আছি-এরূপ মনে করে বসে থাকা দ্বীনি বিবেচনায় খুবই নিন্দনীয় কাজ।
একজন মুসলিমকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সৎকাজ এবং জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এটি মুসলিম উম্মাহর সকল সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য। এই আদেশ তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জারি থাকবে। আর এটা ঘটবে পৃথিবীর বয়স যখন একেবারে শেষ প্রান্তে উপনীত হবে। যখন আল্লাহ নির্ধারিত বছরের হিসাব এলোমেলো হয়ে যাবে, সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হবে।
'কুরআনের ভাষায়- 'সেদিন ওই ব্যক্তি ঈমান আনলে তার কোনো ফায়দা হবে না, যে ব্যক্তি তার ঈমানের ভিত্তিতে কল্যাণ অর্জন করেনি।' সূরা আনআম : ১৫৮
রাসূল ﷺ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দুনিয়াবি কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও দ্বীনের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কাজ তুচ্ছ। তিনি বলেন- 'যদি কিয়ামত শুরু হয়ে যায় আর তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে এবং সে তা রোপণ করতে সক্ষম, তার উচিত তা রোপণ করে ফেলা।' মুসনাদে আহমদ : ১২৯০২
একজন মুসলিমকে ফুঁ শোনার পরেও গাছ রোপণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সে যেন তার কাজ সম্পাদন করে। যদিও এর দ্বারা সে কিংবা তার পরে অন্য কেউই উপকৃত হবে না! তাহলে আমরা কীভাবে নির্দিষ্ট হতে পারি! অথচ আমাদের এবং কিয়ামতের মাঝে অজানা এক সময়ের ব্যবধান। বিশ্বজাহানের স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়া কেউই তার সঠিক সময় জানে না।
ফলাফল আসুক আর না আসুক, মানুষকে কাজ করতে হবে। যদি সে নগদ ফল লাভ করে, তবে সে দুটো কল্যাণ লাভ করল। অন্যথায় তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট- সে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, পরিশ্রম ও কর্তব্য আদায় করেছে। যেখানে আটকে গেছে, সেখানে আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা পেশ করেছে। বিপরীত চিন্তার লোকদের কাছে প্রমাণ পেশ করে দাঁড়িয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে তাদের (যারা নির্দিষ্ট) কোনো আপত্তি চলবে না। এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এখানে কিছু হাদিস উল্লেখ করছি।
১. ইমাম তিরমিজি আলি ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, 'আমার পরে আমানিশার অন্ধকারের মতো এক ভয়ংকর ফিতনার জন্য হবে।' আমি বললাম, 'তা থেকে উত্তরণের পথ, হে আল্লাহর রাসূল?' তিনি বলেন, 'আল্লাহর কিতাব। সেখানে রয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের সংবাদ, পরবর্তীদের খবর এবং তোমাদের বিধিবিধানসমূহ।'
২. 'তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করো। অচিরেই ফিতনাসমূহের আবির্ভাব হবে ঘন নিকশ অন্ধকারের মতো। একই ব্যক্তি সকালে মুমিন হবে তো সন্ধ্যায় কাফির হবে এবং সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়াবি সামগ্রীর বিনিময়ে আখিরাতকে বিক্রি করে দেবে।'
৩. আবু দাউদ, তিরমিজি এবং ইবনে মাজাহ আবু সালাবা আল খুশানি থেকে বর্ণনা করেন- 'তোমাদের সামনে সবরের দিন। সেই দিনগুলোতে সবর হবে জলন্ত কয়লা হাতে নেওয়ার মতো। সে সময় যারা কাজ করবে, তাদের কর্মের প্রতিদান তাদের মাঝে কাজ করা ৫০ জনের সমান হবে। আমি বললাম, তাদের মাঝে কাজ করা ৫০ জনের সমান? তিনি বলেন, তোমাদের মাঝে কাজ করা ৫০ জনের সমান।'
কিছু কিছু বর্ণনায় প্রতিদানের এই বাহুল্যর কারণ বর্ণনায় এসেছে তাঁর (নবিজির) কথা- 'তোমরা তো কল্যাণকর কাজে সহযোগী পাও। তারা কোনো সহযোগী পাবে না।'
৪. ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু হুযায়ফা আল ইয়ামান থেকে বর্ণনা করেছেন- 'তিনি বলেন, মানুষ রাসূল ﷺ-কে কল্যাণের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করত। আমি জিজ্ঞাস করতাম ক্ষতি সম্পর্কে। ভয় ছিল, সেটা আমাকে পেয়ে বসে কি না! আমি রাসূলকে ﷺ বললাম, "আমরা জাহেলি যুগে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের এই কল্যাণ দান করলেন। এই কল্যাণের পরে কি কোনো অকল্যাণ/ক্ষতি আছে?"
তিনি বলেন, "হ্যাঁ"। আমি বললাম, "ওই ক্ষতির পর কি আবার কল্যাণ আছে?" তিনি বলেন, "হ্যাঁ। তবে সেটাতে ধোঁয়াশা রয়েছে।" আমি বললাম, "কী সেই ধোঁয়াশা?" তিনি বলেন, "এক দল লোক আমার সুন্নাতের বাইরে সুন্নাত খুঁজে নেবে। আমার আনীত হেদায়েতের বাইরে হেদায়েত সন্ধান করবে।" আমি বললাম, "সেই কল্যাণের পরে কি কোনো অকল্যাণ আছে?" তিনি বলেন, "হ্যাঁ। জাহান্নামের দরজায় আহ্বানকারীরা। যারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে, তারা সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে।"
আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! তাদের গুণগুলো বর্ণনা করুন।" তিনি বলেন, "তারা আমাদের মতো চামড়ার মানুষ এবং আমাদের ভাষায় কথা বলবে।"'
এই হাদিসগুলোতে কি ক্ষতিকর বিষয়গুলোর ব্যাপারে সতর্কতা, কল্যাণের কাজে উৎসাহ, সত্যের সাথে লেগে থাকা, আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরা, আনুগত্যের কাজে ধৈর্য প্রদর্শন, তার রুজুকে আঁকড়ে ধরা এবং জাহান্নামের দরজায় দাঁড়িয়ে আহ্বানকারীদের (তাদের ডাকে যারা সাড়া দেবে, জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে) মোকাবিলা ভিন্ন অন্য কিছু দেখা যাচ্ছে?

📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 ভবিষ্যতের কল্পনা-বিলাস এবং দিবাস্বপ্ন

📄 ভবিষ্যতের কল্পনা-বিলাস এবং দিবাস্বপ্ন


ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও বিষণ্ণতার নেতিবাচক এই দৃশ্যের পাশাপাশি আরেকটি নেতিবাচক অবস্থা দেখা যায়। তা হলো, ভবিষ্যৎ নিয়ে দিবাস্বপ্ন বা কল্পনা-বিলাস। যার সাথে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, বাস্তব কর্ম এবং পরিকল্পনার কোনো মিল নেই।
কল্পনা বিলাস মহান কিছু তৈরি করার পথে বিন্দুমাত্র সহায়ক নয়। এটি আশার আলোতে দেখাতে সক্ষম নয়। কবি বিন জুবাইরের কথার মতোই- 'কল্পনা বিলাস এবং দিবাস্বপ্ন ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়।'
এক লোক ইবনে সিরিনকে বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখেছি, পানি ছাড়া সাঁতার কাটছি। ডানা ছাড়া উড়ে বেড়াচ্ছি। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী?' জবাবে তিনি বলেন, 'তুমি এত বেশি স্বপ্ন দেখ কেন?'
আলি ইবনে আবি তালিব তাঁর ছেলেকে বলেন, 'তুমি অতি উৎসাহী চিন্তা থেকে বিরত থাকো, কারণ, এটা বোকা লোকের কাজ।'
কবি বলেছেন- أعلل النفس بالآمال أرقبها * ما أضيق العيش لولا فسحة الأمل
'সম্ভবনার কোনো কল্পনা-বিলাস আমার উপলব্ধিকে কি রেখেছে ভুলিয়ে?
আমি তো কল্পনায় মত্ত হয়ে সকল উৎকণ্ঠা ভুলে রয়েছি বিশ্রামে!
আমি জানি, তোমার ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই কোনো
তাটা নেই কোনো আকাঙ্ক্ষাও তবুও।'
আরেক কবির কথা- ولا تكن بالممنى فالمنى
رءوس أموال المفاليس!
'কল্পনার পূজারি হয়ো না হে মানুষ, অবাস্তব কল্পনা করে দেবে দেউলিয়া আর বেহুশ।'
কুরআন আহলে কিতাব তথা ইহুদি-নাসারাদের তিরস্কার করেছে। তারা কোনো কারণ- উপকরণ ছাড়া জান্নাতে প্রবেশের স্বপ্ন দেখত। জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যমে তথা সঠিক ঈমান এবং সৎকর্ম ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তারা আরও বলে : জান্নাতে কেবল সে-ই যাবে! যে নিজেকে পূর্ণরূপে সঁপে দিয়েছে আল্লাহর জন্য (আল্লাহর বিধান ও নির্দেশের কাছে) এবং বাস্তবতার সুন্দর ও কল্যাণের পথ অবলম্বন করেছে। তার প্রভুর কাছে অবশ্যই তার জন্য পুরস্কার রয়েছে। তা ছাড়া এ ধরনের লোকদের কোনো ভয়ও থাকবে না এবং তারা দুঃখও পাবে না।' সূরা বাকারা : ১১১-১১২
কুরআনে শুধু আহলে কিতাবদের তিরস্কার করা হয়নি। তাদের মতো যে মুসলিমরা কেবল মুসলিম নাম ধারণ করার কারণেই জান্নাতে প্রবেশ করবে বলে ধরে নিয়েছে, তাদেরও তিরস্কার করেছে।
তারা কোনো সৎ কাজ করে না! এমনকী জান্নাতে প্রবেশের উপায়-উপকরণ নিয়েও তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, অথচ নাজাতের আশা করে বসে আছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'তোমাদের খেয়াল-খুশি কিংবা আহলে কিতাবের খেয়াল-খুশিমতো কাজ হবে না। যে মন্দ কাজ করবে, তার প্রতিফল সে পাবেই এবং সে আল্লাহর পরিবর্তে কোনো অলি বা সাহায্যকারী পাবে না। যেকোনো পুরুষ বা নারী মুমিন অবস্থায় আমলে সালেহ করবে, তারা অবশ্যই জান্নাতে দাখিল হবে এবং তাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণ অবিচার হবে না।' সূরা নিসা : ১২৩-১২৪
কুরআন কল্পনা-বিলাসকে অপছন্দ করেছে; উচ্চাশাকে নয়। এ দুটোর মাঝে পার্থক্য হলো- উচ্চাশার সঙ্গে কর্মের সংযোগ থাকে, আর যার সঙ্গে কর্মের কোনো সংযোগ নেই, সেটাই কল্পনা- বিলাস।
যারা আল্লাহর ক্ষমা, মার্জনা ও দয়ার প্রশস্ততার ওপর নির্ভর করে নাজাত পাবে বলে নিশ্চিত হয়ে বসে আছে; আর প্রকৃতির দাসত্ব এবং কামনার পেছনে ছুটছে। কুরআন তাদের কাজকে বোকামি এবং দুর্বলতা বলে ব্যাখ্যা করেছে।
আল্লাহর বাণী হচ্ছে- 'নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।' সূরা আরাফ : ৫৬
তিনি আরও বলেন- 'আমার রহমত সবকিছু ওপর পরিব্যাপ্ত। তা আমি বিশেষভাবে লিখে দেবো সেই সব লোকদের জন্য, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত পরিশোধ করে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান রাখে।' সূরা আরাফ : ১৫৬
এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে- 'বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মণ্য সেই ব্যক্তি, যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করে।' আহমদ, ইবনে মাজাহ
আর (রাজাজাহ) বা প্রত্যাশা এবং তার ধারক সম্পর্কে কুরআনে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহর বাণীতে সংগৃহিত আছে- '(পরবর্তীদের) যারা ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে, আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই আশা করে (করতে পারে) আল্লাহর রহমত। আল্লাহ (তাদের ব্যাপারে) অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াবান।' সূরা বাকারা : ২১৮
সালাফদের সালেহ বান্দারা বলতেন, সৎকর্ম ছাড়া জান্নাতের আশা করা এক ধরনের পাপ কাজ। সুন্নাতের অনুসরণ ছাড়া কিয়ামতের দিনে সুপারিশ লাভের চিন্তা একপ্রকার প্রতারণা। আর নাফরমানির সাথে আল্লাহর রহমতের আশা করা বোকামি এবং মূর্খতা।
হাসান বসরি বলেন- 'ক্ষমার আকাঙ্ক্ষা একটি দলকে দেবাজ্ঞা আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তারা যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখন তাদের আমলনামায় ভালো কিছু ছিল না। একজন বলছিল, "আমি আমার রবের ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করি।" সে মূলত মিথ্যা বলেছে। যদি সে তার রবের ব্যাপারে ভালো ধারণাই করত, তবে তাঁর সামনে ভালো আমল পেশ করত।'
অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন- 'তোমাদের প্রভু সম্পর্কে এ ধারণাই তোমাদের ডুবিয়েছে। ফলে তোমরা হয়েছ চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত।' সূরা হা-মিম : ২৩
তিনি আরও বলেন- 'হে মানব সন্তানরা! তোমরা বেশি কল্পনা-বিলাস থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, এই জগতটা হলো নির্বোধ লোকদের। তারা সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আল্লাহ তায়ালার কসম! তিনি কোনো বান্দাহকে কল্পনা-বিলাসের মাধ্যমে দুনিয়া কিংবা আখিরাতে কোনো কল্যাণ প্রদান করেননি।'

📘 মুমিন জীবনে সময় > 📄 ‘বর্তমান’-এর প্রেমিক

📄 ‘বর্তমান’-এর প্রেমিক


কিছু মানুষ আছে, যারা অতীতের দিকেও তাকায় না, ভবিষ্যতের দিকেও দৃষ্টিপাত করে না। বর্তমানকে নিয়েই মত্ত থাকে; বর্তমান-কে ঘিরেই তাদের সকল আয়োজন। তারা বলে, 'অতীত তো হারিয়ে গেছে। যা হারিয়ে গেছে তা মৃত্যুর সমতুল্য। আর মৃত কোনো জিনিস নিয়ে ব্যস্ত হওয়া বা চিন্তা করা মানানসই নয়।'
তাদের কাছে ভবিষ্যৎ মানেই অজানা-অদৃশ্য কিছু। আর অজানা মানেই অজ্ঞাত। একজন সম্মত জীবন্ত মানুষ কেন অজ্ঞাত কিছুর সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে? এটা তো বালি দিয়ে বাঁধা দেওয়া কিংবা বাতাসের ওপর লেখার মতো।
বর্তমানের মাঝে ডুবে থেকে থেকে তারা ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে ভুলে গেছে। একইভাবে তারা অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেও নারাজ।
তাদের দাবি, তারা সময়ের সন্তান। তারা শুধু বর্তমানকে যথেষ্ট মনে করে। আখিরাতের ব্যাপারে তাদের কোনো মনোযোগ নেই; কারণ, সেটাও ভবিষ্যৎ। তারা নগদকে বাকির বিনিময়ে বিক্রি করতে নারাজ। তাদের চোখের সামনে থাকা লাভকে ভবিষ্যতে অধিক লাভের আশায় বিনিয়োগ করতে চায় না। তারা ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখতে চায় না। কারণ, তা অতীত এবং তার উপযোগিতা ফুরিয়ে গেছে।
'তারা সময়ের সন্তান' কথাটির অর্থ-তারা বর্তমান চলমান সময় ছাড়া অন্য সময়কে গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। সেটা নিয়ে চিন্তা করতেও ইচ্ছুক নয়। তারা বর্তমানকে সবটুকু উপভোগ করে। অতীতকে স্মরণ না করে ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে তাদের সকল মনোযোগের কেন্দ্র উপস্থিত মুহূর্তকে ঘিরে।
আরবি কবিতার এই পঙ্ক্তিটি এ ধারার লোকদের প্রতিনিধিত্ব করছে- ما مضى فات, والمؤمل غيب
ولك الساعة التي أنت فيه
'যা যাওয়ার তা গেছে, প্রত্যাশাটা অন্ধকারে,
তুমি যে সময়ে আছ, তোমারই আছে।'
কথাটি সত্য, যখন তা দৃঢ় চিত্তের মুমিন বা সর্বহারা কেউ উচ্চারণ করে। মানুষের কাছে যদি শুধু একটা ঘণ্টা বাকি থাকে, সে কেন তা নষ্ট করবে? কেন তা আল্লাহর আনুগত্যে বিনিয়োগ করবে না? কেন তা সত্যের সহযোগিতা, উত্তম কাজ ও কল্যাণের বিস্তারে লাগাবে না?
যে কারণে নিচের পঙ্ক্তিটি অনেক প্রাচীন সালেহ ব্যক্তির কথার সঙ্গে মিলে যায়- انما هذه الحياة متاع * فالجهول المغرور من يصطفيها
ما مضى فائت والمؤمل غيب * ولك الساعة التي أنت فيه
'দুনিয়া সামান্য ভোগের সামগ্রী প্রতারিত ও নাদান সেইজন,
যে একে গ্রহণ আগ্রহী। যা অতিবাহিত হয়েছে তা তো হারিয়েই গেছে।
অনাগত আশা? সে তো গায়েবি ব্যাপার।
শুধু এতটুকুর মালিক হয়েছ- আজ যেখানে তুমি আছ।'
আর ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, বর্তমান আসলে অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝে একটা কাল্পনিক রেখা মাত্র। এ উপলব্ধি থেকেই কবি বলেছেন-

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00