📄 মুসলমানের দৈনন্দিন জীবন
মুসলমানের দৈনন্দিন যদি একটি বরকতপূর্ণ জীবন পেতে চায়, তাহলে তাকে ইসলাম নির্ধারিত দৈনন্দিন জীবন-পদ্ধতির পথে হাঁটতে হবে। এই জীবন-পদ্ধতির দাবি হলো- সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং সকাল সকাল ঘুমাতে যাওয়া।
তার দিন শুরু হবে ফজরের সাথে সাথে অথবা অতঃপর সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে থেকে। পাপবিদ্ধের নিঃশ্বাস বাতাসে কলুষিত করার আগেই সে পবিত্র নির্মল বাতাসে হোঁচায় হোঁচায় সকাল পার করবে। পাপিষ্ঠরা দিনের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার আগে ঘুমের ওপর বিজয়ী হতে পারে না।
এভাবে একজন মুসলিম প্রত্যুষে উঠে তার দিনকে বরণ করে নেবে। রাসূল ﷺ এ সময়টিতে তার উম্মাহর ওপর বরকত ঢেলে দেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেছেন। তার দুআটি ছিল- 'হে আল্লাহ! আমার উম্মাতের ওপর ভোরবেলায় বরকত বর্ষণ করো।' ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানরা তাদের দিনের রুটিন বদলে ফেলেছে। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকে। ফলে ফজর কাজা হয়ে যায়। সালাফরা অনেকে আশ্চর্য হয়ে বলতেন, 'যে সূর্যোদয়ের পর ফজর নামাজ পড়ে, সে কীভাবে রিজিকপ্রাপ্ত হয়! আশ্চর্য!'
ইমাম বুখারি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'ঘুমানোর পর শয়তান তোমাদের ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। সে প্রত্যেক গিঁটের ওপর প্রহার করে বলে, "তোমার সামনে একটি লম্বা রাত; প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়ে থাকো।" অতঃপর যখন কেউ জাগ্রত হয় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে, তার একটি গিঁট খুলে যায়। যখন সে সালাত আদায় করে, তখন তার তৃতীয় গিঁটও খুলে যায়। ফলে সে সহজ এবং পবিত্র মনের অধিকারী এক সকাল অতিবাহিত করে। অন্যথায় তার সকালটি হয় আলস্যময় এবং দুঃখিত মনের।' বুখারি : ১১৪২
দুই ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য কত বিশাল। যার ঘাড়ের ওপর থেকে শয়তানের সকল গিঁট খুলে গেল, সে প্রত্যুষে আল্লাহর স্মরণ, পবিত্রতা ও সালাতের মাধ্যমে দিন শুরু করল এবং জীবনযুদ্ধের ময়দানে চাঙ্গা শরীর, পবিত্র মন, এবং প্রশস্ত বক্ষে হাজির হলো। আর যে আপন ঘাড়ের ওপর শয়তানের গিঁট নিয়ে দিনাতিপাত করল, তার সকালটি ঘুমে কাটল। যার পদক্ষেপে হেলে-দুলে পদচারণা করল। তার মন থাকল কলুষিত হয়ে; আর শরীরটা ভারী আর অলস হলো।
একজন মুসলিম তার দিন দিন শুরু করে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। ফরজ ও সুন্নাত সালাত আদায়, রাসূল থেকে বর্ণিত দুআসমূহ পাঠ করার মাধ্যমে মুমিনের দিন শুরু হবে। রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত কয়েকটি দুআ হলো-
اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার (প্রদত্ত নিয়ামত) রাতের প্রস্থান এবং দিনের মুহূর্ত এবং আপনার প্রার্থনাকারী বান্দাদের প্রার্থনার আওয়াজ সম্মত হওয়ার মুহূর্ত; (এই মুহূর্তের বরকতে) আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।' সুনানে তিরমিজি : ৩৫৮৯, আবু দাউদ : ৫৩০
اللَّهُمَّ مَا أَصْبَحَ بِي مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنْكَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ.
'হে আল্লাহ! প্রভাতে আপনার যে নেয়ামত আমি লাভ করি অথবা আপনার বান্দাদের কেউ লাভ করে, তা তো আপনারই পক্ষ থেকে। আপনি একক, আপনার কোনো অংশীদার নেই। সুতরাং প্রশংসা আপনারই এবং কৃতজ্ঞতাও আপনার।' আবু দাউদ : ৫০৭৩
অতঃপর কুরআনুল কারিম থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করে। গভীর ধ্যানের সাথে বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'এই কিতাব (আল কুরআন) আমরা নাজিল করেছি, যেন মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।' সূরা সোয়াদ : ২৯
এরপর পরিমিত পরিমাণ সকালের নাস্তা গ্রহণ করে। নাস্তা শেষে জীবিকা অন্বেষণ এবং রিজিকের সন্ধানে ছুটে চলে। নিজেকে কোনো একটি হালাল কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য সাধনা করে। আর এই হালাল কাজে তার কম-বেশি যা-ই হোক, সে পরিতৃপ্ত থাকে। সাধারণ কোনো ব্যবস্থাপনা বা পর্যবেক্ষণর কাজ হলেও সে করে। কারণ, মুক্ত ও অবাধ সম্পদ ছুরির তৈরি করে দেয়।
এ জন্যই ইসলাম সুদ হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ, সুদ কোনো বিবর্তন ছাড়াই সম্পদ থেকে সম্পদ বাড়ায়। যেখানে কোনো পরিশ্রম, শরিকানা কিংবা লাভের আশা নেই; স্বয়ংক্রিয় সম্পদ বাড়তে থাকে। সুদখোর শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বসে থাকে-শতকরা দশ টাকা কিংবা হাজারে একশো আসবে। ছোটোখাটো কোনো দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া এই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে। এটা ইসলামের দর্শনের বিপরীত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন কাজ এবং দুনিয়াকে আবাদ করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন- 'তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন জমিন থেকে এবং তাতেই তোমাদের তামির (প্রতিষ্ঠিত) করেছেন।' সূরা হুদ : ৬১
মানুষ যেহেতু সমাজ ও জীবন থেকে কিছু গ্রহণ করে, তাই তাকে সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে; সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে। যেহেতু সে ভোগ করে, তাই তাকে কিছু উৎপাদনও করতে হবে। বেকার ভবঘুরে হতে পারে না, থাকে কোনো কোনো কাজ না- এমনটা হতে পারে না। তা যদি আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্য কর্মমুক্তির দাবি হয়, তারপরেও নয়। কারণ, ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই।
ইমাম বায়হাকি আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন- 'দুনিয়ায় সবচেয়ে খারাপ জিনিস হলো বেকারত্ব।'
আল্লামা মানাবি তার ফয়জুল কাদির গ্রন্থে এর ব্যাখ্যায় বলেছেন- 'যখন মানুষ কর্মশূন্য বা বেকার থাকে, তখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়মানুযায়ী কিছু কাজ করতে থাকে যার দ্বারা সে আপন ধর্মের কাছে সাহায্য কামনা করে। বাহ্যিকভাবে সে কাজ-কর্ম থেকে মুক্ত থাকে, কিন্তু তার ভেতরটা খালি থাকে না। শয়তান সেখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। অন্য যেকোনো প্রজাতির তুলনায় দ্রুত বংশ বিস্তার করে।'
আর যে ব্যক্তি কোনো পেশায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে মানব সমাজে কোনো উপকারে আসতে পারে না, সে মানবসমাজ থেকে কেবল সুবিধাই গ্রহণ করে। সে মানব সমাজের জীবনধারণের উপকরণ সংকীর্ণ করে তোলে। পানি ঘোলা করা এবং দ্রব্যমূল্য বাড়ানো ছাড়া সে মানব সমাজের কোনো উপকার করে না।
আমিরুল মুমিনিন উমর কোনো সবলকে দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, তার কি কোনো উপার্জনের উপায় নেই? উত্তর 'না' শুনলে, তাঁর চক্ষু দিয়ে জলের ধারা নেমে আসত। বাস্তবে তিনি ব্যাপারটিকে এভাবে মূল্যায়ন করতেন। যারা নিজ সম্পদ অপচয়, অপব্যয়ের মাধ্যমে খরচ করে, তিনি তাদের নিন্দা করতেন। তাহলে যারা অপরের সম্পদ নীরবে ভক্ষণ করে, তাদের অবস্থা কী দাঁড়ায়?
সালেফে সালেহিনদের কেউ কেউ সফিদের ধ্বংসাবশেষে বসবাসকারী নিশ্চুপ প্যাঁচার সঙ্গে তুলনা করেছেন; যে প্যাঁচা কারও কোনো উপকারে আসে না।
একজন মুসলিম তার দুনিয়াবি কাজকেও ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদত ও জিহাদ মনে করে; যতক্ষণ তার নিয়ত শুদ্ধ থাকে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে না যায়, বলিষ্ঠতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে তার কর্ম সম্পাদন করে। কর্মে বলিষ্ঠতা সকল মুসলিমের ওপর আবশ্যক। যেমনটি রাসূল বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা সবকিছুর মাঝেই নৈপুণ্যতা রেখেছেন।'
ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বলিষ্ঠ হাতের নিপুণ কাজগুলো পছন্দ করেন।' মুসলিম : ১৯৭৫
দৈনন্দিন যে কাজটি মুসলিমদের ভুলে যাওয়া কিংবা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই তা হলো- সমাজকল্যাণমূলক কাজ। সমাজের লোকদের সহযোগিতা, প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের জীবন ঘনিষ্ঠ ব্যাপারগুলো সহজীকরণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হয়। এ কাজগুলো তার নিজের ওপর সাদাকা এবং সালাত।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু মুসা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'নবি ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সাদাকা করা ফরজ। সাহাবিরা বললেন, যদি তার কিছু না থাকে? তিনি বললেন, সে নিজ হাতে উপার্জন করবে। সেখান থেকে নিজেও উপকৃত হবে এবং দান করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও করতে সক্ষম না হয় বা না করে? তিনি বলেন, তাহলে অভাবগ্রস্ত দুঃখী ব্যক্তিকে সহযোগিতা করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজের আদেশ দেবে। তারা বলেন, যদি তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এটাও সাদাকা।' বুখারি : ১৪৪৫
এই সাদাকা বা সমাজকর্ম প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দৈনন্দিন ফরজ; বরং সহিহ হাদিসের ব্যাখ্যানুযায়ী এটি দিনের প্রতিটি অংশে কিংবা প্রতি সুযোগেই ফরজ। প্রতিটি সূর্যোদয় এই ফরজটি নিয়ে আসে। এ ফরজ কাজ আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম হবে একটি ঝরনা; যা থেকে তার আশেপাশের সকল জীব ও জড় পদার্থের স্রোতধারার গতিতে কল্যাণ, উপকার ও প্রশান্তি লাভ করবে।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- রাসূল ﷺ বলেছেন- 'প্রত্যেক দুজন মানুষের মাঝেও সাদাকা হতে পারে। প্রতিদিন সূর্য উদিত হলে দুজন লোকের মাঝে সুবিচার করা সাদাকা, কাউকে সাহায্য করে সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়া সাদাকা, ভালো কথা বলা সাদাকা, সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি পদক্ষেপে সাদাকা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদাকা।' বুখারি : ২৯৮৯
হাদিসে ব্যবহৃত 'সুলামি' শব্দ দ্বারা হাড্ডি, গিরা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বোঝানো হয়েছে। এর সমর্থনে অন্য হাদিস রয়েছে। এগুলো সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সর্বোত্তম করে তার চেহারা সাজিয়েছেন। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক দায়িত্ব হলো- আল্লাহর শোকর আদায় করা। আর এ শোকর আদায়ের মাধ্যম হলো, সেগুলোকে (শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) আল্লাহর আনুগত্য এবং তার বান্দাদের কল্যাণে ব্যবহার করা অথবা সম্ভাব্য কোনো একটা উপায়ে তাদের কল্যাণে লাগানো।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সাথে সাথে যোহরের আজান ভেসে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে একজন মুসলিম ঘুম থেকে এবং সবর হলে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করার জন্য ছুটে আসে। প্রথম ওয়াক্তে আল্লাহর নেয়ামত রয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা কল্যাণের কাজে ছুটে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তা ছাড়া আল্লাহর রাসূল ﷺ জামায়াতে শামিল না হওয়া কিছু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। জামায়াতে সালাতকে একাকী সালাতের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাবান করেছেন; যদিও সে সালাত মসজিদে একাকী হয়।
একজন মুসলিম দিনের মধ্যভাগে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে। আর খাবার হবে পরিমিত ও পরিমাণমতো। এত বেশি হবে না, যাতে বদহজমজনিত পীড়া হয়। আর এত কমও হবে না, যাতে ক্ষুধা রয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- 'হে আদম সন্তান! প্রত্যেক মসজিদের (সালাতের) সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরবে। আর আহার করবে, পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না। কারণ, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' সূরা আরাফ : ৩১
'হে নবি! বলো, "আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সুন্দর বস্ত্র আর উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করল কে?" বলো, "সেগুলো তো মুমিনদেরই জন্য এই দুনিয়ার জীবনে, বিশেষ করে কিয়ামতেরকালে।" এভাবেই আমরা সুস্পষ্টভাবে আয়াতগুলো বর্ণনা করি, যারা জ্ঞান রাখে তাদের জন্য।' সূরা আরাফ : ৩২
গরমের দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, অনেকে দুপুরে বিশ্রামে অভ্যস্ত। তারা এ সময় কিছুটা বিশ্রাম নেয়। এটা তাদের রাতের সালাত এবং প্রত্যুষে বিছানা ত্যাগে সহায়ক হয়। এর দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে এসেছে- 'দুপুরে যখন তোমাদের পোশাক খুলে রাখো।' সূরা নূর : ৫৮
এরপর যখন আসরের সময় হয়, মুয়াজ্জিন 'হাইয়া আলাস সালাহ' বলে ডাক দেয়, তখন কোনো মুসলিম বিশ্রামে থাকলে উঠে পড়ে। আর কাজে ডুবে থাকলে কাজ ছেড়ে দিনের মধ্যম সালাত হিসেবে পরিচিত আসরের সালাতের জন্য ছুটে যায়। এ সময় মুসলিমদের বেচাকেনা, ব্যবসা বা বিনোদনে ডুবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কুরআনে বর্ণিত নিচের গুণগুলোতে যারা গুণান্বিত, তারাই প্রকৃত মুসলমান।
'সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর জিকির, সালাত কায়েম ও জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনটিকে, যেদিন মানুষের অন্তর আর চোখ উল্টে যাবে।' সূরা নূর : ৩৭
মুসলমানদের পক্ষে অবহেলায় আসরের সালাতকে সূর্য হলুদ হওয়া বা সূর্যাস্তের কাছাকাছি পর্যন্ত দেরি করা সাজে না। কারণ, এটা মুনাফিকদের সালাত। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! তাদের একজন বসে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে। যখন সে হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং শয়তানের শিংয়ের সঙ্গে মিলিত হয়, সে উঠে এবং চার চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই থাকে।' মুসলিম : ৬২২
সূর্য ডোবার সাথে সাথে একজন মুসলিম প্রথম সময়ে মাগরিবের সালাত আদায় করে। উল্লেখ্য মাগরিবের সালাতের সময় সংকীর্ণ। ফরজ ও সুন্নাত সালাত শেষে সে হাদিসে বর্ণিত সান্ধ্যকালীন মাসনুন দুআগুলো পাঠ করবে। যেমন- اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! এটা হচ্ছে আপনার রাত আসার সময়, আপনার দিন বিদায়ের মুহূর্ত এবং আপনাকে আহ্বানকারীর ডাক শোনার সময়। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' আবু দাউদ : ৫৩০
এ ছাড়া ফজরের দুআগুলোও পাঠ করবে। তবে শুধু এর জায়গায় (أَصْبَحْنَا) পড়বে।
একজন মুসলমান অপচয় ও কার্পণ্যমুক্ত রাতের খাবার গ্রহণ করবে। এরপর সালাতুল এশা আদায় করে সুন্নাত সালাতগুলো আদায় করবে। যদি তাহাজ্জুদে জাগার অভ্যাস থাকে, তবে তখনই বিতর আদায় করবে; নতুবা ঘুমানোর পূর্বে বিতর আদায় করে নেবে।
কখনো কখনো রাতের খাবার এশার পরে হতে পারে। তবে যদি রাতের খাবার এবং এশার নামাজ একসঙ্গে উপস্থিত হয়, আগে রাতের খাবার গ্রহণ করবে। হাদিসের নির্দেশনা এ রকমই। যাতে তার নামাজ আল্লাহর স্মরণমুক্ত না হয়। একজন মুসলিম চাইলে ঘুমানোর পূর্বে কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। যেমন : কারও সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ভদ্রতামূলক দায়িত্বসমূহ।
তাকে দৈনিক পরিকল্পিত একটা সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞানগত ও প্রজ্ঞাগত প্রবৃদ্ধি অর্জন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলতে শিখিয়েছেন- 'আমার প্রভু! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করো।' সূরা ত্ব-হা : ১১৪
তাকে দুনিয়াবি ও দ্বীনি দিক থেকে উপকৃত করবে- এমন বই এবং সাময়িকী বাছাই করে নিতে হবে। প্রখ্যাত দার্শনিক হাকিমের একটি উক্তি রয়েছে- 'আমাকে তোমার অধ্যয়ন সম্পর্কে বলো, আমি তোমার পরিচয় বলে দেবো।'
মুসলিমদের জন্য বৈধ খেলাধুলা বা শরিয়তসম্মত বিনোদনে অংশ নেওয়া দোষের কিছু নয়; তা দিন কিংবা রাতের যেকোনো সময় হতে পারে। কিন্তু তার কারণে যাতে রবের হক তথা ইবাদত, চোখের হক তথা ঘুম, শরীরের হক তথা বিশ্রামে ব্যাঘাত না ঘটে কিংবা পরিবারের দেখাশোনা, কর্মের দ্রুততা অথবা অন্য কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ না হয়। অনুরূপভাবে দীর্ঘ রাত্রি জাগরণও ঠিক নয়। যাতে ফজরের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকারগুলোতে বাধাগ্রস্ত না হয়। যদিও সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই অধিকারগুলোর সাথে খেয়ানত না করে, তবুও প্রত্যেক বাড়াবাড়ির অপর প্রান্তে নিশ্চিত কোনো ক্ষতি বিদ্যমান।
আর এই কাজটি রহমাতের আদেশ এবং কুরআনের আয়াতের বিপরীতও যায়। 'যাতে তোমরা পরিমাণে সীমালঙ্ঘন না করো। ওজনে ন্যায় মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না।' সূরা আর রহমান : ৮-৯
মুসলমানকে বয়ে যাওয়া প্রত্যেকটি দিন থেকে একটা জিনিস স্মরণে রাখতে হবে, যা কখনোই ভুলে যাওয়া চলবে না তা হলো, আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত দশটি অধিকার যথাযথ আদায় করা। তিনি বলেছেন- 'তোমরা সবাই এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করো এবং আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম-মিসকিন, আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্বস্থ সাথি, ভ্রমণপথে সাক্ষাৎ লাভকারী পথিক এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস- দাসীদের প্রতিও ইহসান করো।' সূরা নিসা : ৩৬
সুতরাং প্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হকটি হলো সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা, সব আদেশের মালিক, জীবনদাতা এবং নিয়ামতদাতা আল্লাহর হক।
'তোমাদের সাথে যত নেয়ামত রয়েছে, সবই তো আল্লাহর প্রদত্ত।' সূরা নাহল : ৫৩
সুতরাং একজন মুসলিমের পক্ষে তার অধিকারের অবহেলা এবং তা থেকে অন্যমনস্ক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে দৃশ্যমান দৈনিক ইবাদত হচ্ছে সালাত। মুমিনের গুণ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা সালাতে খুশুকে (বিনয়) প্রথমে রেখেছেন। 'যারা তাদের সালাতে বিনয়ী হয়।' সূরা মুমিনুন : ২
আর শেষে রেখেছেন সালাতের হিফাজতকে- 'তা ছাড়া তাঁরা তাদের সালাতের প্রতি যত্নবান থাকে।' সূরা মুমিনুন : ৯
আর যারা সালাত ছেড়ে অন্য কাজে মত্ত হয় হলো যে সালাতের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল, তিনি তাদের জন্য নিশ্চিত ধ্বংস লিখে রেখেছেন। 'সুতরাং ওই মুসল্লিদের জন্য রয়েছে ধ্বংস, যারা তাদের সালাতের ব্যাপারে গাফিলতি করে।' মাউন : ৪-৫
দ্বিতীয় অধিকার হলো পিতা-মাতার অধিকার। তাদের প্রতি ইহসান করার কথা কুরআনুল কারিমে তাওহিদ এবং আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠতার পাশাপাশি এসেছে।
কুরআন ও সুন্নাহ মায়ের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়েছে। কারণ, তাঁর অধিকার একটু বেশিই গুরুত্বের দাবি রাখে। তা ছাড়া তাঁর পরিচর্যার প্রয়োজনটিও বেশি এবং সন্তানের জন্য কষ্টটিও তিনিই বেশি করেছেন। তাঁর কষ্টের সাথে আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না।
'তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে কষ্টের সাথে, প্রসব করেছে কষ্টের সাথে। তাকে গর্ভে ধারণ এবং তার বুকের দুধ ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫
ইসলাম মায়ের জন্য 'মা দিবস' নামে একটি দিন বরাদ্দ রাখাকে যথেষ্ট মনে করে না; এটি ইসলামের মূলনীতির বিপরীত।
এরপর নিকটাত্মীয়দের কথা; ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা, ছেলেমেয়েসহ অন্যান্য রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনদের অধিকার।
আসে সমাজের দুর্বল অংশ যেমন ইয়াতিম, মিসকিন, অর্থ-শূন্যতায় পড়া মুসাফিরের অধিকার। আরও আসে নিকট ও দূরের প্রতিবেশীদের অধিকার। অল্প সময় কিংবা বছরের পর বছর ধরে সফর অথবা নিজ ভূমিতে যাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তাদের অধিকার। আর আওতায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং তাদের পারস্পরিক অধিকারও চলে আসে।
আর শেষ অধিকারটি হলো- যার মালিকানা বা দায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত, তার অধিকার। কুরআনে এসেছে- 'এবং যার মালিকানা তোমাদের হাতে।'
দাসপ্রথা যতদিন ছিল, এর দ্বারা ততদিন দাস এবং তাদের অধিকার নির্দেশ করত। তবে তা আ'ম অর্থাৎ মালিকানায় থাকা সবকিছুর অধিকার বোঝায়। যেমন : মানুষের মালিকানায় থাকা পশু, আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ইত্যাদি সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং একজন মুসলিম এসবের ব্যাপারে সদাচারণব্দ। এগুলো সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন, সেগুলো অপকর্মে ব্যবহার না করা। কারণ, সেগুলোর শুধু মালিক নয়; রক্ষকও বটে।
ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে কিছু দায়িত্ব থাকে। দায়িত্ব নয়; বরং মুস্তাহাব কাজ। তা হলো, পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা। তারপর ডান পাশের ওপর ভর দিয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করে শুয়ে পড়া। রাসূল ﷺ -এর শোয়ার পদ্ধতি বর্ণনায় হাদিসে এসেছে- তিনি ঘুমানোর আগে নিচের দুআটি পড়তেন- بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي وَبِاسْمِكَ أَرْفَعُهُ إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ.
'তোমার নামে আমার পার্শ্ব বিছানায় রাখছি। তোমার নামে উঠব। যদি আমি জীবিত হয়ে ফিরে আসি, আমাকে ক্ষমা করো। আর যদি তোমার দরবারে চলে যাই, তবে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের মতো আমার আত্মাকে সংরক্ষণ করো।' বুখারি : ৬৩২০
সকাল-সন্ধ্যা, দিন-রাত বা বিভিন্ন সময়ের আমল ও দুআ সম্পর্কে লিখিত বেশ কিছু বই রয়েছে। মুসলিমদের সেগুলোর নির্দেশনা থেকে উপকৃত হতে হবে।
এ বিষয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বই হলো- ইমাম নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আলিমায় নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আল কালিমুত তাইয়িব, আল্লামা ইবনুল জাজারি রচিত আল হিসনুল হাসিন এবং শাওকানির করা এ বইয়ের ব্যাখ্যা তুহফাতুজ জাকেরিন ইত্যাদি। আর সমসাময়িক আলিমদের রচিত বইগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ইমাম হাসান আল বান্না রচিত রিসালাতুল মা'সুরাত।
মুসলমানের দৈনন্দিন যদি একটি বরকতপূর্ণ জীবন পেতে চায়, তাহলে তাকে ইসলাম নির্ধারিত দৈনন্দিন জীবন-পদ্ধতির পথে হাঁটতে হবে। এই জীবন-পদ্ধতির দাবি হলো- সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং সকাল সকাল ঘুমাতে যাওয়া।
তার দিন শুরু হবে ফজরের সাথে সাথে অথবা অতঃপর সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে থেকে। পাপবিদ্ধের নিঃশ্বাস বাতাসে কলুষিত করার আগেই সে পবিত্র নির্মল বাতাসে হোঁচায় হোঁচায় সকাল পার করবে। পাপিষ্ঠরা দিনের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার আগে ঘুমের ওপর বিজয়ী হতে পারে না।
এভাবে একজন মুসলিম প্রত্যুষে উঠে তার দিনকে বরণ করে নেবে। রাসূল ﷺ এ সময়টিতে তার উম্মাহর ওপর বরকত ঢেলে দেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেছেন। তার দুআটি ছিল- 'হে আল্লাহ! আমার উম্মাতের ওপর ভোরবেলায় বরকত বর্ষণ করো।' ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানরা তাদের দিনের রুটিন বদলে ফেলেছে। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকে। ফলে ফজর কাজা হয়ে যায়। সালাফরা অনেকে আশ্চর্য হয়ে বলতেন, 'যে সূর্যোদয়ের পর ফজর নামাজ পড়ে, সে কীভাবে রিজিকপ্রাপ্ত হয়! আশ্চর্য!'
ইমাম বুখারি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'ঘুমানোর পর শয়তান তোমাদের ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। সে প্রত্যেক গিঁটের ওপর প্রহার করে বলে, "তোমার সামনে একটি লম্বা রাত; প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়ে থাকো।" অতঃপর যখন কেউ জাগ্রত হয় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে, তার একটি গিঁট খুলে যায়। যখন সে সালাত আদায় করে, তখন তার তৃতীয় গিঁটও খুলে যায়। ফলে সে সহজ এবং পবিত্র মনের অধিকারী এক সকাল অতিবাহিত করে। অন্যথায় তার সকালটি হয় আলস্যময় এবং দুঃখিত মনের।' বুখারি : ১১৪২
দুই ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য কত বিশাল। যার ঘাড়ের ওপর থেকে শয়তানের সকল গিঁট খুলে গেল, সে প্রত্যুষে আল্লাহর স্মরণ, পবিত্রতা ও সালাতের মাধ্যমে দিন শুরু করল এবং জীবনযুদ্ধের ময়দানে চাঙ্গা শরীর, পবিত্র মন, এবং প্রশস্ত বক্ষে হাজির হলো। আর যে আপন ঘাড়ের ওপর শয়তানের গিঁট নিয়ে দিনাতিপাত করল, তার সকালটি ঘুমে কাটল। যার পদক্ষেপে হেলে-দুলে পদচারণা করল। তার মন থাকল কলুষিত হয়ে; আর শরীরটা ভারী আর অলস হলো।
একজন মুসলিম তার দিন দিন শুরু করে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। ফরজ ও সুন্নাত সালাত আদায়, রাসূল থেকে বর্ণিত দুআসমূহ পাঠ করার মাধ্যমে মুমিনের দিন শুরু হবে। রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত কয়েকটি দুআ হলো-
اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার (প্রদত্ত নিয়ামত) রাতের প্রস্থান এবং দিনের মুহূর্ত এবং আপনার প্রার্থনাকারী বান্দাদের প্রার্থনার আওয়াজ সম্মত হওয়ার মুহূর্ত; (এই মুহূর্তের বরকতে) আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।' সুনানে তিরমিজি : ৩৫৮৯, আবু দাউদ : ৫৩০
اللَّهُمَّ مَا أَصْبَحَ بِي مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنْكَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ.
'হে আল্লাহ! প্রভাতে আপনার যে নেয়ামত আমি লাভ করি অথবা আপনার বান্দাদের কেউ লাভ করে, তা তো আপনারই পক্ষ থেকে। আপনি একক, আপনার কোনো অংশীদার নেই। সুতরাং প্রশংসা আপনারই এবং কৃতজ্ঞতাও আপনার।' আবু দাউদ : ৫০৭৩
অতঃপর কুরআনুল কারিম থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করে। গভীর ধ্যানের সাথে বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'এই কিতাব (আল কুরআন) আমরা নাজিল করেছি, যেন মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।' সূরা সোয়াদ : ২৯
এরপর পরিমিত পরিমাণ সকালের নাস্তা গ্রহণ করে। নাস্তা শেষে জীবিকা অন্বেষণ এবং রিজিকের সন্ধানে ছুটে চলে। নিজেকে কোনো একটি হালাল কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য সাধনা করে। আর এই হালাল কাজে তার কম-বেশি যা-ই হোক, সে পরিতৃপ্ত থাকে। সাধারণ কোনো ব্যবস্থাপনা বা পর্যবেক্ষণর কাজ হলেও সে করে। কারণ, মুক্ত ও অবাধ সম্পদ ছুরির তৈরি করে দেয়।
এ জন্যই ইসলাম সুদ হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ, সুদ কোনো বিবর্তন ছাড়াই সম্পদ থেকে সম্পদ বাড়ায়। যেখানে কোনো পরিশ্রম, শরিকানা কিংবা লাভের আশা নেই; স্বয়ংক্রিয় সম্পদ বাড়তে থাকে। সুদখোর শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বসে থাকে-শতকরা দশ টাকা কিংবা হাজারে একশো আসবে। ছোটোখাটো কোনো দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া এই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে। এটা ইসলামের দর্শনের বিপরীত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন কাজ এবং দুনিয়াকে আবাদ করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন- 'তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন জমিন থেকে এবং তাতেই তোমাদের তামির (প্রতিষ্ঠিত) করেছেন।' সূরা হুদ : ৬১
মানুষ যেহেতু সমাজ ও জীবন থেকে কিছু গ্রহণ করে, তাই তাকে সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে; সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে। যেহেতু সে ভোগ করে, তাই তাকে কিছু উৎপাদনও করতে হবে। বেকার ভবঘুরে হতে পারে না, থাকে কোনো কোনো কাজ না- এমনটা হতে পারে না। তা যদি আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্য কর্মমুক্তির দাবি হয়, তারপরেও নয়। কারণ, ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই।
ইমাম বায়হাকি আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন- 'দুনিয়ায় সবচেয়ে খারাপ জিনিস হলো বেকারত্ব।'
আল্লামা মানাবি তার ফয়জুল কাদির গ্রন্থে এর ব্যাখ্যায় বলেছেন- 'যখন মানুষ কর্মশূন্য বা বেকার থাকে, তখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়মানুযায়ী কিছু কাজ করতে থাকে যার দ্বারা সে আপন ধর্মের কাছে সাহায্য কামনা করে। বাহ্যিকভাবে সে কাজ-কর্ম থেকে মুক্ত থাকে, কিন্তু তার ভেতরটা খালি থাকে না। শয়তান সেখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। অন্য যেকোনো প্রজাতির তুলনায় দ্রুত বংশ বিস্তার করে।'
আর যে ব্যক্তি কোনো পেশায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে মানব সমাজে কোনো উপকারে আসতে পারে না, সে মানবসমাজ থেকে কেবল সুবিধাই গ্রহণ করে। সে মানব সমাজের জীবনধারণের উপকরণ সংকীর্ণ করে তোলে। পানি ঘোলা করা এবং দ্রব্যমূল্য বাড়ানো ছাড়া সে মানব সমাজের কোনো উপকার করে না।
আমিরুল মুমিনিন উমর কোনো সবলকে দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, তার কি কোনো উপার্জনের উপায় নেই? উত্তর 'না' শুনলে, তাঁর চক্ষু দিয়ে জলের ধারা নেমে আসত। বাস্তবে তিনি ব্যাপারটিকে এভাবে মূল্যায়ন করতেন। যারা নিজ সম্পদ অপচয়, অপব্যয়ের মাধ্যমে খরচ করে, তিনি তাদের নিন্দা করতেন। তাহলে যারা অপরের সম্পদ নীরবে ভক্ষণ করে, তাদের অবস্থা কী দাঁড়ায়?
সালেফে সালেহিনদের কেউ কেউ সফিদের ধ্বংসাবশেষে বসবাসকারী নিশ্চুপ প্যাঁচার সঙ্গে তুলনা করেছেন; যে প্যাঁচা কারও কোনো উপকারে আসে না।
একজন মুসলিম তার দুনিয়াবি কাজকেও ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদত ও জিহাদ মনে করে; যতক্ষণ তার নিয়ত শুদ্ধ থাকে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে না যায়, বলিষ্ঠতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে তার কর্ম সম্পাদন করে। কর্মে বলিষ্ঠতা সকল মুসলিমের ওপর আবশ্যক। যেমনটি রাসূল বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা সবকিছুর মাঝেই নৈপুণ্যতা রেখেছেন।'
ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বলিষ্ঠ হাতের নিপুণ কাজগুলো পছন্দ করেন।' মুসলিম : ১৯৭৫
দৈনন্দিন যে কাজটি মুসলিমদের ভুলে যাওয়া কিংবা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই তা হলো- সমাজকল্যাণমূলক কাজ। সমাজের লোকদের সহযোগিতা, প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের জীবন ঘনিষ্ঠ ব্যাপারগুলো সহজীকরণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হয়। এ কাজগুলো তার নিজের ওপর সাদাকা এবং সালাত।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু মুসা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'নবি ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সাদাকা করা ফরজ। সাহাবিরা বললেন, যদি তার কিছু না থাকে? তিনি বললেন, সে নিজ হাতে উপার্জন করবে। সেখান থেকে নিজেও উপকৃত হবে এবং দান করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও করতে সক্ষম না হয় বা না করে? তিনি বলেন, তাহলে অভাবগ্রস্ত দুঃখী ব্যক্তিকে সহযোগিতা করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজের আদেশ দেবে। তারা বলেন, যদি তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এটাও সাদাকা।' বুখারি : ১৪৪৫
এই সাদাকা বা সমাজকর্ম প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দৈনন্দিন ফরজ; বরং সহিহ হাদিসের ব্যাখ্যানুযায়ী এটি দিনের প্রতিটি অংশে কিংবা প্রতি সুযোগেই ফরজ। প্রতিটি সূর্যোদয় এই ফরজটি নিয়ে আসে। এ ফরজ কাজ আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম হবে একটি ঝরনা; যা থেকে তার আশেপাশের সকল জীব ও জড় পদার্থের স্রোতধারার গতিতে কল্যাণ, উপকার ও প্রশান্তি লাভ করবে।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- রাসূল ﷺ বলেছেন- 'প্রত্যেক দুজন মানুষের মাঝেও সাদাকা হতে পারে। প্রতিদিন সূর্য উদিত হলে দুজন লোকের মাঝে সুবিচার করা সাদাকা, কাউকে সাহায্য করে সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়া সাদাকা, ভালো কথা বলা সাদাকা, সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি পদক্ষেপে সাদাকা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদাকা।' বুখারি : ২৯৮৯
হাদিসে ব্যবহৃত 'সুলামি' শব্দ দ্বারা হাড্ডি, গিরা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বোঝানো হয়েছে। এর সমর্থনে অন্য হাদিস রয়েছে। এগুলো সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সর্বোত্তম করে তার চেহারা সাজিয়েছেন। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক দায়িত্ব হলো- আল্লাহর শোকর আদায় করা। আর এ শোকর আদায়ের মাধ্যম হলো, সেগুলোকে (শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) আল্লাহর আনুগত্য এবং তার বান্দাদের কল্যাণে ব্যবহার করা অথবা সম্ভাব্য কোনো একটা উপায়ে তাদের কল্যাণে লাগানো।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সাথে সাথে যোহরের আজান ভেসে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে একজন মুসলিম ঘুম থেকে এবং সবর হলে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করার জন্য ছুটে আসে। প্রথম ওয়াক্তে আল্লাহর নেয়ামত রয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা কল্যাণের কাজে ছুটে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তা ছাড়া আল্লাহর রাসূল ﷺ জামায়াতে শামিল না হওয়া কিছু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। জামায়াতে সালাতকে একাকী সালাতের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাবান করেছেন; যদিও সে সালাত মসজিদে একাকী হয়।
একজন মুসলিম দিনের মধ্যভাগে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে। আর খাবার হবে পরিমিত ও পরিমাণমতো। এত বেশি হবে না, যাতে বদহজমজনিত পীড়া হয়। আর এত কমও হবে না, যাতে ক্ষুধা রয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- 'হে আদম সন্তান! প্রত্যেক মসজিদের (সালাতের) সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরবে। আর আহার করবে, পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না। কারণ, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' সূরা আরাফ : ৩১
'হে নবি! বলো, "আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সুন্দর বস্ত্র আর উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করল কে?" বলো, "সেগুলো তো মুমিনদেরই জন্য এই দুনিয়ার জীবনে, বিশেষ করে কিয়ামতেরকালে।" এভাবেই আমরা সুস্পষ্টভাবে আয়াতগুলো বর্ণনা করি, যারা জ্ঞান রাখে তাদের জন্য।' সূরা আরাফ : ৩২
গরমের দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, অনেকে দুপুরে বিশ্রামে অভ্যস্ত। তারা এ সময় কিছুটা বিশ্রাম নেয়। এটা তাদের রাতের সালাত এবং প্রত্যুষে বিছানা ত্যাগে সহায়ক হয়। এর দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে এসেছে- 'দুপুরে যখন তোমাদের পোশাক খুলে রাখো।' সূরা নূর : ৫৮
এরপর যখন আসরের সময় হয়, মুয়াজ্জিন 'হাইয়া আলাস সালাহ' বলে ডাক দেয়, তখন কোনো মুসলিম বিশ্রামে থাকলে উঠে পড়ে। আর কাজে ডুবে থাকলে কাজ ছেড়ে দিনের মধ্যম সালাত হিসেবে পরিচিত আসরের সালাতের জন্য ছুটে যায়। এ সময় মুসলিমদের বেচাকেনা, ব্যবসা বা বিনোদনে ডুবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কুরআনে বর্ণিত নিচের গুণগুলোতে যারা গুণান্বিত, তারাই প্রকৃত মুসলমান।
'সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর জিকির, সালাত কায়েম ও জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনটিকে, যেদিন মানুষের অন্তর আর চোখ উল্টে যাবে।' সূরা নূর : ৩৭
মুসলমানদের পক্ষে অবহেলায় আসরের সালাতকে সূর্য হলুদ হওয়া বা সূর্যাস্তের কাছাকাছি পর্যন্ত দেরি করা সাজে না। কারণ, এটা মুনাফিকদের সালাত। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! তাদের একজন বসে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে। যখন সে হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং শয়তানের শিংয়ের সঙ্গে মিলিত হয়, সে উঠে এবং চার চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই থাকে।' মুসলিম : ৬২২
সূর্য ডোবার সাথে সাথে একজন মুসলিম প্রথম সময়ে মাগরিবের সালাত আদায় করে। উল্লেখ্য মাগরিবের সালাতের সময় সংকীর্ণ। ফরজ ও সুন্নাত সালাত শেষে সে হাদিসে বর্ণিত সান্ধ্যকালীন মাসনুন দুআগুলো পাঠ করবে। যেমন- اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! এটা হচ্ছে আপনার রাত আসার সময়, আপনার দিন বিদায়ের মুহূর্ত এবং আপনাকে আহ্বানকারীর ডাক শোনার সময়। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' আবু দাউদ : ৫৩০
এ ছাড়া ফজরের দুআগুলোও পাঠ করবে। তবে শুধু এর জায়গায় (أَصْبَحْنَا) পড়বে।
একজন মুসলমান অপচয় ও কার্পণ্যমুক্ত রাতের খাবার গ্রহণ করবে। এরপর সালাতুল এশা আদায় করে সুন্নাত সালাতগুলো আদায় করবে। যদি তাহাজ্জুদে জাগার অভ্যাস থাকে, তবে তখনই বিতর আদায় করবে; নতুবা ঘুমানোর পূর্বে বিতর আদায় করে নেবে।
কখনো কখনো রাতের খাবার এশার পরে হতে পারে। তবে যদি রাতের খাবার এবং এশার নামাজ একসঙ্গে উপস্থিত হয়, আগে রাতের খাবার গ্রহণ করবে। হাদিসের নির্দেশনা এ রকমই। যাতে তার নামাজ আল্লাহর স্মরণমুক্ত না হয়। একজন মুসলিম চাইলে ঘুমানোর পূর্বে কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। যেমন : কারও সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ভদ্রতামূলক দায়িত্বসমূহ।
তাকে দৈনিক পরিকল্পিত একটা সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞানগত ও প্রজ্ঞাগত প্রবৃদ্ধি অর্জন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলতে শিখিয়েছেন- 'আমার প্রভু! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করো।' সূরা ত্ব-হা : ১১৪
তাকে দুনিয়াবি ও দ্বীনি দিক থেকে উপকৃত করবে- এমন বই এবং সাময়িকী বাছাই করে নিতে হবে। প্রখ্যাত দার্শনিক হাকিমের একটি উক্তি রয়েছে- 'আমাকে তোমার অধ্যয়ন সম্পর্কে বলো, আমি তোমার পরিচয় বলে দেবো।'
মুসলিমদের জন্য বৈধ খেলাধুলা বা শরিয়তসম্মত বিনোদনে অংশ নেওয়া দোষের কিছু নয়; তা দিন কিংবা রাতের যেকোনো সময় হতে পারে। কিন্তু তার কারণে যাতে রবের হক তথা ইবাদত, চোখের হক তথা ঘুম, শরীরের হক তথা বিশ্রামে ব্যাঘাত না ঘটে কিংবা পরিবারের দেখাশোনা, কর্মের দ্রুততা অথবা অন্য কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ না হয়। অনুরূপভাবে দীর্ঘ রাত্রি জাগরণও ঠিক নয়। যাতে ফজরের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকারগুলোতে বাধাগ্রস্ত না হয়। যদিও সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই অধিকারগুলোর সাথে খেয়ানত না করে, তবুও প্রত্যেক বাড়াবাড়ির অপর প্রান্তে নিশ্চিত কোনো ক্ষতি বিদ্যমান।
আর এই কাজটি রহমাতের আদেশ এবং কুরআনের আয়াতের বিপরীতও যায়। 'যাতে তোমরা পরিমাণে সীমালঙ্ঘন না করো। ওজনে ন্যায় মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না।' সূরা আর রহমান : ৮-৯
মুসলমানকে বয়ে যাওয়া প্রত্যেকটি দিন থেকে একটা জিনিস স্মরণে রাখতে হবে, যা কখনোই ভুলে যাওয়া চলবে না তা হলো, আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত দশটি অধিকার যথাযথ আদায় করা। তিনি বলেছেন- 'তোমরা সবাই এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করো এবং আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম-মিসকিন, আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্বস্থ সাথি, ভ্রমণপথে সাক্ষাৎ লাভকারী পথিক এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস- দাসীদের প্রতিও ইহসান করো।' সূরা নিসা : ৩৬
সুতরাং প্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হকটি হলো সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা, সব আদেশের মালিক, জীবনদাতা এবং নিয়ামতদাতা আল্লাহর হক।
'তোমাদের সাথে যত নেয়ামত রয়েছে, সবই তো আল্লাহর প্রদত্ত।' সূরা নাহল : ৫৩
সুতরাং একজন মুসলিমের পক্ষে তার অধিকারের অবহেলা এবং তা থেকে অন্যমনস্ক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে দৃশ্যমান দৈনিক ইবাদত হচ্ছে সালাত। মুমিনের গুণ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা সালাতে খুশুকে (বিনয়) প্রথমে রেখেছেন। 'যারা তাদের সালাতে বিনয়ী হয়।' সূরা মুমিনুন : ২
আর শেষে রেখেছেন সালাতের হিফাজতকে- 'তা ছাড়া তাঁরা তাদের সালাতের প্রতি যত্নবান থাকে।' সূরা মুমিনুন : ৯
আর যারা সালাত ছেড়ে অন্য কাজে মত্ত হয় হলো যে সালাতের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল, তিনি তাদের জন্য নিশ্চিত ধ্বংস লিখে রেখেছেন। 'সুতরাং ওই মুসল্লিদের জন্য রয়েছে ধ্বংস, যারা তাদের সালাতের ব্যাপারে গাফিলতি করে।' মাউন : ৪-৫
দ্বিতীয় অধিকার হলো পিতা-মাতার অধিকার। তাদের প্রতি ইহসান করার কথা কুরআনুল কারিমে তাওহিদ এবং আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠতার পাশাপাশি এসেছে।
কুরআন ও সুন্নাহ মায়ের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়েছে। কারণ, তাঁর অধিকার একটু বেশিই গুরুত্বের দাবি রাখে। তা ছাড়া তাঁর পরিচর্যার প্রয়োজনটিও বেশি এবং সন্তানের জন্য কষ্টটিও তিনিই বেশি করেছেন। তাঁর কষ্টের সাথে আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না।
'তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে কষ্টের সাথে, প্রসব করেছে কষ্টের সাথে। তাকে গর্ভে ধারণ এবং তার বুকের দুধ ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫
ইসলাম মায়ের জন্য 'মা দিবস' নামে একটি দিন বরাদ্দ রাখাকে যথেষ্ট মনে করে না; এটি ইসলামের মূলনীতির বিপরীত।
এরপর নিকটাত্মীয়দের কথা; ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা, ছেলেমেয়েসহ অন্যান্য রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনদের অধিকার।
আসে সমাজের দুর্বল অংশ যেমন ইয়াতিম, মিসকিন, অর্থ-শূন্যতায় পড়া মুসাফিরের অধিকার। আরও আসে নিকট ও দূরের প্রতিবেশীদের অধিকার। অল্প সময় কিংবা বছরের পর বছর ধরে সফর অথবা নিজ ভূমিতে যাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তাদের অধিকার। আর আওতায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং তাদের পারস্পরিক অধিকারও চলে আসে।
আর শেষ অধিকারটি হলো- যার মালিকানা বা দায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত, তার অধিকার। কুরআনে এসেছে- 'এবং যার মালিকানা তোমাদের হাতে।'
দাসপ্রথা যতদিন ছিল, এর দ্বারা ততদিন দাস এবং তাদের অধিকার নির্দেশ করত। তবে তা আ'ম অর্থাৎ মালিকানায় থাকা সবকিছুর অধিকার বোঝায়। যেমন : মানুষের মালিকানায় থাকা পশু, আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ইত্যাদি সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং একজন মুসলিম এসবের ব্যাপারে সদাচারণব্দ। এগুলো সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন, সেগুলো অপকর্মে ব্যবহার না করা। কারণ, সেগুলোর শুধু মালিক নয়; রক্ষকও বটে।
ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে কিছু দায়িত্ব থাকে। দায়িত্ব নয়; বরং মুস্তাহাব কাজ। তা হলো, পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা। তারপর ডান পাশের ওপর ভর দিয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করে শুয়ে পড়া। রাসূল ﷺ -এর শোয়ার পদ্ধতি বর্ণনায় হাদিসে এসেছে- তিনি ঘুমানোর আগে নিচের দুআটি পড়তেন- بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي وَبِاسْمِكَ أَرْفَعُهُ إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ.
'তোমার নামে আমার পার্শ্ব বিছানায় রাখছি। তোমার নামে উঠব। যদি আমি জীবিত হয়ে ফিরে আসি, আমাকে ক্ষমা করো। আর যদি তোমার দরবারে চলে যাই, তবে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের মতো আমার আত্মাকে সংরক্ষণ করো।' বুখারি : ৬৩২০
সকাল-সন্ধ্যা, দিন-রাত বা বিভিন্ন সময়ের আমল ও দুআ সম্পর্কে লিখিত বেশ কিছু বই রয়েছে। মুসলিমদের সেগুলোর নির্দেশনা থেকে উপকৃত হতে হবে।
এ বিষয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বই হলো- ইমাম নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আলিমায় নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আল কালিমুত তাইয়িব, আল্লামা ইবনুল জাজারি রচিত আল হিসনুল হাসিন এবং শাওকানির করা এ বইয়ের ব্যাখ্যা তুহফাতুজ জাকেরিন ইত্যাদি। আর সমসাময়িক আলিমদের রচিত বইগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ইমাম হাসান আল বান্না রচিত রিসালাতুল মা'সুরাত।
📄 অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের মধ্যে সময়
যে সময়কে ঘিরে মানুষের বসবাস, তাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। অন্য ভাষায় বলতে গেলে গতকাল, আজ ও আগামীকাল।
সময় বা তার কোনো একটা অংশের সাথে মানুষের আচরণের বিবেচনায় মানুষকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যারা প্রত্যেককেই একটি প্রান্তিক ও বাড়াবাড়ির জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তারা সময়ের সাথে সুষ্ঠু আচরণ করতে পারে না।
তাদের একটি অংশ অতীতের জিজ্ঞাসায় আবদ্ধ। একটি অংশ বর্তমানের গোলামিতে লিপ্ত। আরেকটি ভবিষ্যতের পূজারি।
তবে আশার কথা হলো, কিছু মানুষ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে চলে। তারা নিজ সময়কে মেপে মেপে খরচ করে এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাথে সুখম আচরণ করে। কোনো একটি কালের সাথে বাড়াবাড়ি বা অবহেলা তাদের চরিত্রের সাথে যায় না। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হলো, তাদের সংখ্যা নগণ্য।
যে সময়কে ঘিরে মানুষের বসবাস, তাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। অন্য ভাষায় বলতে গেলে গতকাল, আজ ও আগামীকাল।
সময় বা তার কোনো একটা অংশের সাথে মানুষের আচরণের বিবেচনায় মানুষকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যারা প্রত্যেককেই একটি প্রান্তিক ও বাড়াবাড়ির জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তারা সময়ের সাথে সুষ্ঠু আচরণ করতে পারে না।
তাদের একটি অংশ অতীতের জিজ্ঞাসায় আবদ্ধ। একটি অংশ বর্তমানের গোলামিতে লিপ্ত। আরেকটি ভবিষ্যতের পূজারি।
তবে আশার কথা হলো, কিছু মানুষ মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে চলে। তারা নিজ সময়কে মেপে মেপে খরচ করে এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাথে সুখম আচরণ করে। কোনো একটি কালের সাথে বাড়াবাড়ি বা অবহেলা তাদের চরিত্রের সাথে যায় না। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হলো, তাদের সংখ্যা নগণ্য।
📄 ভবিষ্যতের পূজারি
সময় নষ্টকারী অতীতমুখীদের বিপরীতে আমরা আরেক দল লোক দেখি। এই দলের লোকজন তারাই, যারা ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি ব্যস্ত হতে গিয়ে অতীতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তারা নিজেদের অতীত ঐতিহ্যকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করছে। আপন জাতি এবং দুনিয়ার অন্য জাতিগুলোর ইতিহাসকে উপেক্ষা করছে। এভাবে বরং সমগ্র মানবতার ইতিহাস এড়িয়ে চলছে। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে উপেক্ষা করছে এবং এগুলোর মধ্যে হক-বাতিল, হালাল-হারাম, উপকারী-ক্ষতিকর ইত্যাদির বাদ-বিচার করছে না।
তাদের ভাষ্য হলো, আমরা পূর্বপুরুষ কিংবা অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না। তাদের অনুকরণ থেকে আমরা মুক্তি চাই। যারা মরে গেছে, মৃত্যু যাদের নিঃশেষ করে দিয়েছে, তাদের নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানেই হয় না! আমাদেরকে যুবকদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে; যুবকরা আগামী দিনের কর্ণধার। শিশুদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে; তারা আগামী দিনের যুবক। সুযোগ থাকলে জ্ঞান নিয়ে গবেষণায় মনোযোগী হতে হবে। কারণ, এই জ্ঞান থেকে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি হবে।
তারা আরও বলে, আমাদের চক্ষু পেছনের দিকে ফিট করা হয়নি। সুতরাং আমরা পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকব কেন? চক্ষু তো সামনে রাখা হয়েছে, যেন আমরা সামনের জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে পারি। তাহলে আমাদের পেছনের দিকে তাকাতে বাধ্য করা হবে কেন; যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন, গতিশীল উন্নতি এবং পথ চলার পদে পদে বাধা।
তারা এ ধরনের অনেক কথাই বলে। এই কথাগুলো কিছু ক্ষেত্রে সঠিক। যেমন : কেউ একজন অতীতের কারাগারে বন্দি; ঠিক এমন বন্দির মতো, যাকে নির্যাতনও করা হচ্ছে না, আবার বেরোনোর সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। এমন বন্দিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, যার দিনের বাস্তবতার প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, আগামীর কর্তব্যের প্রতি নেই কোনো চেতনা।
কিন্তু এর উদ্দেশ্য যদি হয় অতীতকে গোড়া থেকে ভুলে যাওয়া, যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করা, চাক্ষুষ ও ক্লীয় বুদ্ধিকে ঐতিহাসিক সকল জ্ঞান, শিক্ষা ও দৃষ্টান্তের ওপর সন্দেহাতীতভাবে বিবেচনা করা, তাহলে এ কথাগুলো সত্য নয় অথবা 'কথা সত্য, কিন্তু মতলব খারাপ' টাইপের সত্য। আল্লাহ তাআলা অতীতের শিক্ষা থেকে ফায়দা নেওয়ার জন্য পবিত্র কুরআনে খুব চমৎকার কিছু কথা বলেছেন-
📄 ভবিষ্যৎ নিয়ে নৈরাশ্য : এক অশুভ চিন্তা
আরেকদল মানুষের চিন্তা শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সদা চিন্তিত। তাদের চিন্তা সব সময় হতাশাজনক। তাদের চোখের সামনে সর্বদা একটি কুচকুচে কালো চশমা থাকে। তারা তা দিয়েই দুনিয়াকে দেখে; জীবন, সময় ও অবস্থাকে মূল্যায়ন করে। সে 'আগামী' সম্পর্কে হতাশ। সাফল্যের ব্যাপারে নিরুৎসাহী। তাদের বদ্ধমূল ধারণা- পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে। জীবন এক অমানিশার কালো রাত্রি, যা কখনো সুবহে সাদিকের আলো দেখবে না। কোনো সূর্য তার অন্ধকার মুছে দেবে না।
নিঃসন্দেহে এটি মারাত্মক পর্যায়ের ধ্বংসাত্মক চিন্তা। মানুষ্য ব্যক্তিসত্তার জন্য ধ্বংসাত্মক; জীবন, সমাজ এবং তার পারিপার্শ্বিক সবকিছুর জন্য ধ্বংসাত্মক।
আশাবিহীন কোনো জীবন, ব্যক্তির জীবন আর্থিক কিংবা সুদের ছিদ্রের চেয়েও সংকীর্ণ। জনৈক কবি বলেছেন- ما أضيق العيش لولا فسحة الامل
'জীবন কত-না সংকীর্ণ!
যখন অনুপস্থিত আশার আলো!'
আর আশার আলোবিহীন সামাজিক জীবন একটা মৃত, নিষ্প্রাণ জীবন। যার মাঝে কোনো রুহ নেই, নেই কোনো স্পন্দন। যদি আশা না থাকত, স্থপতি কোনো স্থাপনা নির্মাণ করত না, কোনো কৃষক গাছ লাগাত না, জ্ঞান-বিজ্ঞান সামনের দিকে এক ইঞ্চিও অগ্রসর হতো না।
বাস্তবতা হলো- দ্বীন, ইতিহাস এবং চলমান ঘটনাপুঞ্জ আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, হতাশার সাথে জীবনের কোনো অর্থ নেই। আবার জীবনের সাথেও হতাশার কোনো মানে হয় না। দুঃখের পরেই সুখ। রাতের পরেই ফজরের আলো। একই অবস্থা চিরকাল থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন- 'আল্লাহর রহমত থেকে কাফিররা ছাড়া আর কেউই নিরাশ হয় না।' সূরা ইউসুফ : ৮৭
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- 'বিভ্রান্তরা ছাড়া কে নিরাশ হয় তার প্রভুর রহমত থেকে?' সূরা হিজর : ৫৬
কবি বলেছেন- ورب نازلة يضيق بها الفتى * ذرعا وعند الله منها المخرج
ضاقت فلما استحكمت حلقاتها * فرجت وكنت أظنها لا تفرج
'বিপদ বনি আদমকে আটকে ফেলে অক্টোপাসের মতো,
আল্লাহর কাছে আছে উত্তরণের উপায় যত;
তারপর গ্রন্থি যখন হলো সংকীর্ণ, অবশেষে সেটা গেল ভেঙে পড়ে।
অথচ আমি তো ভেবেছিলাম কখনোই হবে না তার অবসান।'
আরেক কবি বলেছেন- اشتدي ازمة تنفرجي
قد اذن ليلك بالبلج
'ইচ্ছাশক্তি মজবুত করো। আশার আলো দেখবেই।
রাত্রি তোমাকে শুভ কিছুর আভাস দিয়ে যাচ্ছেই।'
হতাশা ও নৈরাশ্যের আরেকটি চিত্র হলো, আজকাল সিংহভাগ মুসলিম বিশ্বাস করে, আমরা সামান্য চলে এসেছি। কিয়ামতের আলামত প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যা কিছু কল্যাণকর সব পেছনে ফেলে এসেছি। সামনে কেবল অনিষ্টতার অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। দ্বীনি মূল্যবোধের আলো দিন দিন স্তিমিত হয়ে হয়ে যাবে। গোটা দুনিয়া। আর কিয়ামত আসবে কাফিরদের সন্তান কাফিরদের ওপর। এ রকম চিন্তা একবার শুরু হলে, তখন সমাধানের কোনো আশা থাকে না; সংশোধনের ইচ্ছাও না।
তারা এই নৈরাশ্যবাদী চিন্তার সমর্থনে ফিতনা এবং কিয়ামতের আলামতসংক্রান্ত হাদিসসমূহকে দলিল হিসেবে পেশ করে।
কিন্তু বাস্তবতা তাদের এই বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সীমিত বুঝ থেকে যোজন যোজন দূরে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত কিয়ামতের নিকটবর্তী এবং দূরবর্তী আলামতগুলো প্রকাশ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, কিয়ামত আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে; বরং কিয়ামতের নিকটবর্তী কিংবা দূরবর্তী এ আলামতগুলো আপেক্ষিক। কে জানে, হয়তো আমাদের এবং কিয়ামতের মাঝে হাজার হাজার বছরের ব্যবধান; যা কেবল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না অথবা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি নিকটবর্তী কিংবা সংকুচিত হতে পারে। কুরআন এ ব্যাপারে শুধু এতটুকুই বলেছে- 'তা তুমি জানবে কী করে? হয়তো-বা কিয়ামত খুব শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হবে।' সূরা আহজাব : ৬৩
'বস্তুত কিয়ামত নিকটবর্তী।' সূরা শূরা : ১৭
': সেটা তোমাদের কাছে আসবে একেবারেই আকস্মিক।' সূরা আরাফ : ১৮৭
আমাদের নবি ﷺ-এর আবির্ভাবও কিয়ামতের একটা আলামত। তিনি বলেছেন- 'আমাকে এবং কিয়ামতকে ঠিক এ দুটোর মতোই কাছাকাছি পাঠানো হয়েছে।' (এমন কথা বলার সময় তিনি নিজের মধ্যমা এবং তর্জনী আঙুল পাশাপাশি করে দেখালেন)। বুখারি ও মুসলিম
সুতরাং কিয়ামতের অপেক্ষায় ইসলামি শরিয়ত, মুসলিম উম্মাহ এবং ইসলামি রাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ থেকে গুটিয়ে রেখে আমরা শেষ যুগে আছি-এরূপ মনে করে বসে থাকা দ্বীনি বিবেচনায় খুবই নিন্দনীয় কাজ।
একজন মুসলিমকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সৎকাজ এবং জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এটি মুসলিম উম্মাহর সকল সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য। এই আদেশ তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জারি থাকবে। আর এটা ঘটবে পৃথিবীর বয়স যখন একেবারে শেষ প্রান্তে উপনীত হবে। যখন আল্লাহ নির্ধারিত বছরের হিসাব এলোমেলো হয়ে যাবে, সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হবে।
'কুরআনের ভাষায়- 'সেদিন ওই ব্যক্তি ঈমান আনলে তার কোনো ফায়দা হবে না, যে ব্যক্তি তার ঈমানের ভিত্তিতে কল্যাণ অর্জন করেনি।' সূরা আনআম : ১৫৮
রাসূল ﷺ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দুনিয়াবি কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও দ্বীনের দৃষ্টিতে দুনিয়াবি কাজ তুচ্ছ। তিনি বলেন- 'যদি কিয়ামত শুরু হয়ে যায় আর তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে এবং সে তা রোপণ করতে সক্ষম, তার উচিত তা রোপণ করে ফেলা।' মুসনাদে আহমদ : ১২৯০২
একজন মুসলিমকে ফুঁ শোনার পরেও গাছ রোপণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সে যেন তার কাজ সম্পাদন করে। যদিও এর দ্বারা সে কিংবা তার পরে অন্য কেউই উপকৃত হবে না! তাহলে আমরা কীভাবে নির্দিষ্ট হতে পারি! অথচ আমাদের এবং কিয়ামতের মাঝে অজানা এক সময়ের ব্যবধান। বিশ্বজাহানের স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়া কেউই তার সঠিক সময় জানে না।
ফলাফল আসুক আর না আসুক, মানুষকে কাজ করতে হবে। যদি সে নগদ ফল লাভ করে, তবে সে দুটো কল্যাণ লাভ করল। অন্যথায় তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট- সে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, পরিশ্রম ও কর্তব্য আদায় করেছে। যেখানে আটকে গেছে, সেখানে আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা পেশ করেছে। বিপরীত চিন্তার লোকদের কাছে প্রমাণ পেশ করে দাঁড়িয়ে গেছে। আল্লাহর দরবারে তাদের (যারা নির্দিষ্ট) কোনো আপত্তি চলবে না। এ বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এখানে কিছু হাদিস উল্লেখ করছি।
১. ইমাম তিরমিজি আলি ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, 'আমার পরে আমানিশার অন্ধকারের মতো এক ভয়ংকর ফিতনার জন্য হবে।' আমি বললাম, 'তা থেকে উত্তরণের পথ, হে আল্লাহর রাসূল?' তিনি বলেন, 'আল্লাহর কিতাব। সেখানে রয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের সংবাদ, পরবর্তীদের খবর এবং তোমাদের বিধিবিধানসমূহ।'
২. 'তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করো। অচিরেই ফিতনাসমূহের আবির্ভাব হবে ঘন নিকশ অন্ধকারের মতো। একই ব্যক্তি সকালে মুমিন হবে তো সন্ধ্যায় কাফির হবে এবং সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়াবি সামগ্রীর বিনিময়ে আখিরাতকে বিক্রি করে দেবে।'
৩. আবু দাউদ, তিরমিজি এবং ইবনে মাজাহ আবু সালাবা আল খুশানি থেকে বর্ণনা করেন- 'তোমাদের সামনে সবরের দিন। সেই দিনগুলোতে সবর হবে জলন্ত কয়লা হাতে নেওয়ার মতো। সে সময় যারা কাজ করবে, তাদের কর্মের প্রতিদান তাদের মাঝে কাজ করা ৫০ জনের সমান হবে। আমি বললাম, তাদের মাঝে কাজ করা ৫০ জনের সমান? তিনি বলেন, তোমাদের মাঝে কাজ করা ৫০ জনের সমান।'
কিছু কিছু বর্ণনায় প্রতিদানের এই বাহুল্যর কারণ বর্ণনায় এসেছে তাঁর (নবিজির) কথা- 'তোমরা তো কল্যাণকর কাজে সহযোগী পাও। তারা কোনো সহযোগী পাবে না।'
৪. ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু হুযায়ফা আল ইয়ামান থেকে বর্ণনা করেছেন- 'তিনি বলেন, মানুষ রাসূল ﷺ-কে কল্যাণের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করত। আমি জিজ্ঞাস করতাম ক্ষতি সম্পর্কে। ভয় ছিল, সেটা আমাকে পেয়ে বসে কি না! আমি রাসূলকে ﷺ বললাম, "আমরা জাহেলি যুগে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের এই কল্যাণ দান করলেন। এই কল্যাণের পরে কি কোনো অকল্যাণ/ক্ষতি আছে?"
তিনি বলেন, "হ্যাঁ"। আমি বললাম, "ওই ক্ষতির পর কি আবার কল্যাণ আছে?" তিনি বলেন, "হ্যাঁ। তবে সেটাতে ধোঁয়াশা রয়েছে।" আমি বললাম, "কী সেই ধোঁয়াশা?" তিনি বলেন, "এক দল লোক আমার সুন্নাতের বাইরে সুন্নাত খুঁজে নেবে। আমার আনীত হেদায়েতের বাইরে হেদায়েত সন্ধান করবে।" আমি বললাম, "সেই কল্যাণের পরে কি কোনো অকল্যাণ আছে?" তিনি বলেন, "হ্যাঁ। জাহান্নামের দরজায় আহ্বানকারীরা। যারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে, তারা সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে।"
আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! তাদের গুণগুলো বর্ণনা করুন।" তিনি বলেন, "তারা আমাদের মতো চামড়ার মানুষ এবং আমাদের ভাষায় কথা বলবে।"'
এই হাদিসগুলোতে কি ক্ষতিকর বিষয়গুলোর ব্যাপারে সতর্কতা, কল্যাণের কাজে উৎসাহ, সত্যের সাথে লেগে থাকা, আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরা, আনুগত্যের কাজে ধৈর্য প্রদর্শন, তার রুজুকে আঁকড়ে ধরা এবং জাহান্নামের দরজায় দাঁড়িয়ে আহ্বানকারীদের (তাদের ডাকে যারা সাড়া দেবে, জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে) মোকাবিলা ভিন্ন অন্য কিছু দেখা যাচ্ছে?