📄 সময় বিন্যাস
একজন মুমিন-মুসলমানকে তার দুনিয়াবি ও দ্বীনি কাজের অভ্যাসকে এবং আরও অন্যান্য যেসব কাজ করতে হয়, তার আলোকে সময়কে গুছিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়; যেন একটি অনুভূতির ওপর অন্যটির প্রাধান্য না পায়। গুরুত্বপূর্ণ কাজের ওপর তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রাধান্য না পায় কিংবা সাধারণ কাজের কিছু অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিছুর ওপর প্রাধান্য না পায়। সময়ের মাঝে শেষ করতে হবে-এমন কিছু বাধ্যতামূলক কাজের ওপর ঐচ্ছিক কাজের প্রাধান্য না পায়। যে কাজটি তাৎক্ষণিক করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্য কাজ বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিক সেই কাজ করতে হবে। আর যে কাজের একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, সে কাজ যথাসময়ে করতে হবে।
নবিজি ﷺ ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফা থেকে বর্ণনা করে বলেন- 'একজন বিবেকবানের ৪টি সময় থাকবে (যতক্ষণ সে প্রকৃতি বিবেকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না)।
একটি সময় সে তার রবের কাছে চাওয়া-পাওয়ার কথা বলবে।
একটি সময় সে নিজেকে মূল্যায়ন করবে।
একটা সময় আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাববে।
আর একটা সময় তার খাবার-পানীয়ের জন্য খালি রাখবে।¹⁸
মানুষের মধ্যে যারা অধিকতর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন; যাদের নিয়মিত ব্যস্ততা আছে, তারা সময় ভাগ করে নেওয়া এবং বিন্যাসের অধিকতর মুখাপেক্ষী। কারণ, তাদের দায়িত্বের গণ্ডি সাধারণের চেয়ে ব্যাপক। তারা ভালো করেই উপলব্ধি করেন, সময়ের চেয়ে দায়িত্বের ভার অনেক বেশি।
'সময়' বিন্যাসের সময় একটা অংশ বিশ্রাম এবং একটা অংশ বিনোদনের জন্য রাখতে হবে। কারণ, লম্বা সময় ধরে একনাগাড়ে কাজ করার পর আত্মা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শরীরের মতো অন্তরেরও ক্লান্তি আসে। তাই যে সুযোগ পাবে, সে হালাল বিনোদনের সুযোগগুলো গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে আলি বলেছেন- 'নিয়মিত বিরতিতে তোমাদের হৃদয়-মনের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করো। কারণ, মনের ওপর জবরদস্তি হলে সে অন্ধ (দিশেহারা) হয়ে পড়ে।'
একজন মুসলিম ব্যক্তির উচিত হবে না নফসের ওপর বাড়াবাড়ি রকমের চাপ নেওয়া। এই বাড়তি চাপ মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে; যা স্বাভাবিক গতিকে পরিবর্তন করে দেবে। তার নিজের, পরিবার ও সমাজের অধিকার গোপনে করে দেবে। এই বাড়াবাড়ি আল্লাহ ইবাদত তথা সিয়াম, তাহাজ্জুদ কিংবা দুনিয়াবিমুখতা অথবা ত্যাগঃ যেকোনো ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত নয়!
এ জন্যই নবি ﷺ যখন দেখলেন, সাহাবিরা তার পেছনে রাতের নামাজে দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে, তখন তিনি তাদের বললেন- 'তোমরা তোমাদের সাধ্যের আলোকে নেক কাজ করো। কারণ, আল্লাহ তাতে বিরক্ত হবেন না। আর আল্লাহর দরবারে সর্বোত্তম নেক কাজ হলো যা নিয়মিত করা হয়, তা পরিমাণে কম হলেও।' বুখারি ও মুসলিম
অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেন- 'নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে, দ্বীন তার ওপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো এবং (মধ্যমপন্থার) নিকটবর্তী থাকো। আশান্বিত থাকো এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদত সহযোগে) সাহায্য চাও।' বুখারি ও নাসায়ি
আর যারা কুরআন তিলাওয়াত, রাতের সালাত এবং সিয়ামে বাড়াবাড়ি করেন, তাদের তিনি মধ্যপন্থা ও ন্যায়নিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন- 'তোমার ওপর তোমার শরীরের কিছু অধিকার রয়েছে। তোমার পরিবারের কিছু অধিকার রয়েছে। তোমার স্ত্রীর কিছু অধিকার রয়েছে।' বুখারি, মুসলিম
আনুগত্য এবং তাপস্যাকারী একটি দলকে উদ্দেশ্য করে রাসূল ﷺ বলেন- 'আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু এবং মুত্তাকি। কিন্তু আমি রাতে সালাতে দাঁড়াই আবার ঘুমাই। সাওম পালন করি আবার সাওম ভঙ্গ করি। আমি নারীদের বিবাহ করেছি। যে আমার চলার পথ (সুন্নাহ) থেকে বিমুখ হলো, সে আমার দলভুক্ত নয়।' বুখারি : ৫০৬৩, মুসলিম : ১৪০১
এটাই নবির সুন্নাহ। এটাই নবি করিম ﷺ -এর চলার পথ। এই পথ আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুর মাঝে সমন্বয় তৈরি করে। আর এটাই হলো আত্মা ও আত্মার প্রশান্তি এবং প্রতিপালকের অধিকারের ভারসাম্য তৈরির পথ।
এখন থেকে বোঝা গেল, সময়ের একটা অংশ বৈধ বিনোদনের কাজে ব্যয় করা দূষণীয় নয়। তা সকল প্রকার বৈধ প্রাকৃতিক, আকর্ষণ, উপভোগ্য কিছু অথবা খেলাধুলা হতে পারে। আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর সাহাবি হানজালা নিজের ওপর মুনাফিকের অপরাধ দিলেন। ঘর-সংসার, সন্তান-সন্ততি এবং রাসূলের সাথে নিজ সম্পর্কের তুলনা করে তার এরূপ মনে হয়েছিল। রাসূল ﷺ তাকে বললেন- 'হানজালা! যদি তোমরা আমার সাথে যে অবস্থার ওপর অটল থাকো, তবে ফেরেশতারা পদে পদে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করবে। কিন্তু হানজালা, সেটা ঘণ্টায় ঘণ্টায়।' মুসলিম
এখানে 'ঘণ্টায় ঘণ্টায়' অর্থ-এক ঘণ্টা তার রবের জন্য। আরেক ঘণ্টা তার নিজের জন্য। এটাই মুসলমানের চরিত্র। এর সমর্থনে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে।
আছমায়ি বর্ণনা করেন- 'তিনি একটি উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক মহিলাকে দেখলেন, তার হাতে তসবিহ জমামালা। তিনি সেটিতে কারুকার্য করছেন। তাতে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করছেন। তিনি তাকে বললেন, আমি তাকে বললাম- "কোথায় এই কাজ আর কোথায় সেই কাজ?" অর্থাৎ এই সৌন্দর্য কিংবা বিনোদনমূলক কাজ তোমাকে ইবাদত এবং তসবিহ পাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। তখন মহিলা একটি শ্লোক শোনালেন- ولله مني جانب لا أضيعه
وللهو مني والبطالة جانب
"একগুচ্ছ সময় আল্লাহর জন্য কোনো খেলা করি না তাতে আর একগুচ্ছ সময় রেখেছি বিনোদন ও নৈপুণ্য প্রদর্শনে"'
আছমায়ি বলেন, আমি বুঝলাম তিনি একজন সৎকর্মশীল মহিলা। তিনি তার স্বামীর জন্য কিছু উপকারী কাজ করছেন।'
একজন মুমিন-মুসলমানকে তার দুনিয়াবি ও দ্বীনি কাজের অভ্যাসকে এবং আরও অন্যান্য যেসব কাজ করতে হয়, তার আলোকে সময়কে গুছিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়; যেন একটি অনুভূতির ওপর অন্যটির প্রাধান্য না পায়। গুরুত্বপূর্ণ কাজের ওপর তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রাধান্য না পায় কিংবা সাধারণ কাজের কিছু অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিছুর ওপর প্রাধান্য না পায়। সময়ের মাঝে শেষ করতে হবে-এমন কিছু বাধ্যতামূলক কাজের ওপর ঐচ্ছিক কাজের প্রাধান্য না পায়। যে কাজটি তাৎক্ষণিক করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্য কাজ বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিক সেই কাজ করতে হবে। আর যে কাজের একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, সে কাজ যথাসময়ে করতে হবে।
নবিজি ﷺ ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফা থেকে বর্ণনা করে বলেন- 'একজন বিবেকবানের ৪টি সময় থাকবে (যতক্ষণ সে প্রকৃতি বিবেকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না)।
একটি সময় সে তার রবের কাছে চাওয়া-পাওয়ার কথা বলবে।
একটি সময় সে নিজেকে মূল্যায়ন করবে।
একটা সময় আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাববে।
আর একটা সময় তার খাবার-পানীয়ের জন্য খালি রাখবে।¹⁸
মানুষের মধ্যে যারা অধিকতর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন; যাদের নিয়মিত ব্যস্ততা আছে, তারা সময় ভাগ করে নেওয়া এবং বিন্যাসের অধিকতর মুখাপেক্ষী। কারণ, তাদের দায়িত্বের গণ্ডি সাধারণের চেয়ে ব্যাপক। তারা ভালো করেই উপলব্ধি করেন, সময়ের চেয়ে দায়িত্বের ভার অনেক বেশি।
'সময়' বিন্যাসের সময় একটা অংশ বিশ্রাম এবং একটা অংশ বিনোদনের জন্য রাখতে হবে। কারণ, লম্বা সময় ধরে একনাগাড়ে কাজ করার পর আত্মা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শরীরের মতো অন্তরেরও ক্লান্তি আসে। তাই যে সুযোগ পাবে, সে হালাল বিনোদনের সুযোগগুলো গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে আলি বলেছেন- 'নিয়মিত বিরতিতে তোমাদের হৃদয়-মনের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করো। কারণ, মনের ওপর জবরদস্তি হলে সে অন্ধ (দিশেহারা) হয়ে পড়ে।'
একজন মুসলিম ব্যক্তির উচিত হবে না নফসের ওপর বাড়াবাড়ি রকমের চাপ নেওয়া। এই বাড়তি চাপ মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে; যা স্বাভাবিক গতিকে পরিবর্তন করে দেবে। তার নিজের, পরিবার ও সমাজের অধিকার গোপনে করে দেবে। এই বাড়াবাড়ি আল্লাহ ইবাদত তথা সিয়াম, তাহাজ্জুদ কিংবা দুনিয়াবিমুখতা অথবা ত্যাগঃ যেকোনো ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত নয়!
এ জন্যই নবি ﷺ যখন দেখলেন, সাহাবিরা তার পেছনে রাতের নামাজে দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে, তখন তিনি তাদের বললেন- 'তোমরা তোমাদের সাধ্যের আলোকে নেক কাজ করো। কারণ, আল্লাহ তাতে বিরক্ত হবেন না। আর আল্লাহর দরবারে সর্বোত্তম নেক কাজ হলো যা নিয়মিত করা হয়, তা পরিমাণে কম হলেও।' বুখারি ও মুসলিম
অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেন- 'নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে, দ্বীন তার ওপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো এবং (মধ্যমপন্থার) নিকটবর্তী থাকো। আশান্বিত থাকো এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদত সহযোগে) সাহায্য চাও।' বুখারি ও নাসায়ি
আর যারা কুরআন তিলাওয়াত, রাতের সালাত এবং সিয়ামে বাড়াবাড়ি করেন, তাদের তিনি মধ্যপন্থা ও ন্যায়নিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন- 'তোমার ওপর তোমার শরীরের কিছু অধিকার রয়েছে। তোমার পরিবারের কিছু অধিকার রয়েছে। তোমার স্ত্রীর কিছু অধিকার রয়েছে।' বুখারি, মুসলিম
আনুগত্য এবং তাপস্যাকারী একটি দলকে উদ্দেশ্য করে রাসূল ﷺ বলেন- 'আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু এবং মুত্তাকি। কিন্তু আমি রাতে সালাতে দাঁড়াই আবার ঘুমাই। সাওম পালন করি আবার সাওম ভঙ্গ করি। আমি নারীদের বিবাহ করেছি। যে আমার চলার পথ (সুন্নাহ) থেকে বিমুখ হলো, সে আমার দলভুক্ত নয়।' বুখারি : ৫০৬৩, মুসলিম : ১৪০১
এটাই নবির সুন্নাহ। এটাই নবি করিম ﷺ -এর চলার পথ। এই পথ আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুর মাঝে সমন্বয় তৈরি করে। আর এটাই হলো আত্মা ও আত্মার প্রশান্তি এবং প্রতিপালকের অধিকারের ভারসাম্য তৈরির পথ।
এখন থেকে বোঝা গেল, সময়ের একটা অংশ বৈধ বিনোদনের কাজে ব্যয় করা দূষণীয় নয়। তা সকল প্রকার বৈধ প্রাকৃতিক, আকর্ষণ, উপভোগ্য কিছু অথবা খেলাধুলা হতে পারে। আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর সাহাবি হানজালা নিজের ওপর মুনাফিকের অপরাধ দিলেন। ঘর-সংসার, সন্তান-সন্ততি এবং রাসূলের সাথে নিজ সম্পর্কের তুলনা করে তার এরূপ মনে হয়েছিল। রাসূল ﷺ তাকে বললেন- 'হানজালা! যদি তোমরা আমার সাথে যে অবস্থার ওপর অটল থাকো, তবে ফেরেশতারা পদে পদে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করবে। কিন্তু হানজালা, সেটা ঘণ্টায় ঘণ্টায়।' মুসলিম
এখানে 'ঘণ্টায় ঘণ্টায়' অর্থ-এক ঘণ্টা তার রবের জন্য। আরেক ঘণ্টা তার নিজের জন্য। এটাই মুসলমানের চরিত্র। এর সমর্থনে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা রয়েছে।
আছমায়ি বর্ণনা করেন- 'তিনি একটি উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক মহিলাকে দেখলেন, তার হাতে তসবিহ জমামালা। তিনি সেটিতে কারুকার্য করছেন। তাতে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করছেন। তিনি তাকে বললেন, আমি তাকে বললাম- "কোথায় এই কাজ আর কোথায় সেই কাজ?" অর্থাৎ এই সৌন্দর্য কিংবা বিনোদনমূলক কাজ তোমাকে ইবাদত এবং তসবিহ পাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। তখন মহিলা একটি শ্লোক শোনালেন- ولله مني جانب لا أضيعه
وللهو مني والبطالة جانب
"একগুচ্ছ সময় আল্লাহর জন্য কোনো খেলা করি না তাতে আর একগুচ্ছ সময় রেখেছি বিনোদন ও নৈপুণ্য প্রদর্শনে"'
আছমায়ি বলেন, আমি বুঝলাম তিনি একজন সৎকর্মশীল মহিলা। তিনি তার স্বামীর জন্য কিছু উপকারী কাজ করছেন।'
📄 উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত কাজ
সকল মুসলিমকে জানতে হবে-সময় তার মন, জবান, শরীর কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাছে কোন কাজটি দাবি করছে। তাকে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কাজে মনোনিবেশ করতে হবে এবং বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যেন গুরুত্ব এবং আয়োজনভেদে সবকিছু যথাস্থানে রাখতে পারে। আর তা আল্লাহর দরবারে যথাযথভাবে কবুল হয়।
আবু বকর উমর -কে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার সময় উপদেশ দিয়ে বলেছেন- 'শোনো! দিনে আল্লাহর কিছু কাজ রয়েছে, যা রাতে কবুল হবে না। আর রাতের কিছু কাজ রয়েছে, যা দিনে কবুল হবে না।'
স্থান-কাল-পাত্র চিন্তা না করে কাজ হাতে পেলেই করে ফেলা-এটা ঠিক নয়। সঠিক পদ্ধতি হলো, প্রতিটি কাজ উপযুক্ত সময়ে করা। এর জন্যই আল্লাহ তাআলা অনেক ইবাদত এবং ফরজ কাজের সময়কে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যা সময়ের আগেও জায়েজ নয় আবার পরেও সুযোগ নেই। তিনি এর দ্বারা আমাদের বুঝিয়েছেন, কোনো কাজ তার নির্দিষ্ট সময়ের আগেও করা হবে না, পরেও না। আল্লাহ তাআলা সালাত সম্পর্কে বলেন- 'নিশ্চয় নামাজ মুসলমানদের ওপর ফরজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।' সূরা নিসা : ১০৩
সওম সম্পর্কে বলেন- 'কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসে রোজা রাখবে।' সূরা বাকারা : ১৮৫
হজ সম্পর্কে বলেন- 'হজে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত।' সূরা বাকারা : ১৯৮
জাকাত সম্পর্কে বলেন- 'তার অংশ ফসল সংগ্রহের দিন পরিশোধ করে দাও।' সূরা আনআম : ১৪১
অন্তরের কর্মও জীবনের কর্মের মতো। এটাও নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্টকালে করতে হয়।
জ্ঞানীগণ বলেন, বান্দার সময় চার ধরনের হবে, যাতে পঞ্চম বলে কিছু নেই।
নিয়ামত
বিপদ
আনুগত্য
অবাধ্যতা।
এগুলোর প্রত্যেকটিতেই আল্লাহর দাসত্বের সুযোগ রয়েছে। রব হিসেবে তার যে অধিকার, সেই দাবি এগুলোর প্রত্যেকটিতেই রয়েছে।
যার সময় আনুগত্যের মাঝে চলে, তার পক্ষে রবের অধিকার আদায়ের পথ হচ্ছে, তার ওপর বর্ষিত আল্লাহর দয়া ও করুণার সাক্ষ্য দেওয়া। কারণ, আল্লাহ তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। তার ওপর অবিচল থাকার সুযোগ দিয়েছেন।
যার সময় নেয়ামতের মধ্য দিয়ে চলে, তার পথ হচ্ছে শোকর আদায় করা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। যার সময় অবাধ্যতায় চলে, তার পথ হচ্ছে তওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনা।
যার সময় বিপদের মধ্য দিয়ে চলে, তার ওপর রবের অধিকার হচ্ছে সন্তুষ্টি ও সবর। এখানে সন্তুষ্টির অর্থ-আল্লাহর আরোপিত সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা। আর সবরের অর্থ-আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হৃদয়ে অবিচলতা ধরে রাখা। জ্ঞানী ব্যক্তির এই কথাটি কুরআন-হাদিসের কথাই সমর্থক।
আনুগত্যের জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'হে নবি! বলো, এটি (কুরআন) এসেছে আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তার দয়ায়। সুতরাং এর জন্য তারা উৎফুল্ল ও আনন্দিত হোক। তারা যা জমা করে, এটি তার চাইতে উত্তম।' সূরা ইউনুস : ৫৮
নিয়ামতের জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'তাদের (সাবা নগরবাসীদের) বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া জীবিকা ভোগ করো আর তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। কত উত্তম নগরী এটি এবং ক্ষমাশীল (এ নগরীর) প্রভু।' সূরা সাবা : ১৫
অবাধ্যতার জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'হে নবি! লোকদেরকে আমার এ কথা বলে দাওঃ হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের প্রতি জুলুম-অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত পাপই ক্ষমা করে দেবেন। কারণ, তিনি তো পরম ক্ষমাশীল এবং অতীব দয়াবান।' সূরা জুমার : ৫৩
বিপদের জায়গায় আল্লাহ বলেন- 'আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা নেব ভয়-ভীতি দিয়ে, ক্ষুধা- অনাহার দিয়ে এবং অর্থ-সম্পদ, জান-প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দিয়ে। তবে সুসংবাদ দাও সবর অবলম্বনকারীদের।
বিপদ-মসিবতে আক্রান্ত হলে বলে- 'নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই তাঁরই কাছে ফিরে যাব।' সূরা বাকারা : ১৫৫-১৫৬
সহিহ মুসলিমে নবি ﷺ থেকে এসেছে- 'মুসলমানের ধর্ম আসলেই বিস্ময়কর! ভালো-মন্দ সব অবস্থায় নিজ কল্যাণের সুযোগ রয়েছে। মুসলিম ভিন্ন অন্য কারও এ সুযোগটি নেই। যখন তার মাঝে এ সুযোগটি আসে, আর সে শোকর আদায় করে, এটা তাকে কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়। আবার যখন তাকে দুঃখ-কষ্ট গ্রাস করে, তখন সে সবরের পথ গ্রহণ করে। এখানেও নিশ্চিত কল্যাণ।'
সকল মুসলিমকে জানতে হবে-সময় তার মন, জবান, শরীর কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাছে কোন কাজটি দাবি করছে। তাকে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কাজে মনোনিবেশ করতে হবে এবং বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যেন গুরুত্ব এবং আয়োজনভেদে সবকিছু যথাস্থানে রাখতে পারে। আর তা আল্লাহর দরবারে যথাযথভাবে কবুল হয়।
আবু বকর উমর -কে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার সময় উপদেশ দিয়ে বলেছেন- 'শোনো! দিনে আল্লাহর কিছু কাজ রয়েছে, যা রাতে কবুল হবে না। আর রাতের কিছু কাজ রয়েছে, যা দিনে কবুল হবে না।'
স্থান-কাল-পাত্র চিন্তা না করে কাজ হাতে পেলেই করে ফেলা-এটা ঠিক নয়। সঠিক পদ্ধতি হলো, প্রতিটি কাজ উপযুক্ত সময়ে করা। এর জন্যই আল্লাহ তাআলা অনেক ইবাদত এবং ফরজ কাজের সময়কে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যা সময়ের আগেও জায়েজ নয় আবার পরেও সুযোগ নেই। তিনি এর দ্বারা আমাদের বুঝিয়েছেন, কোনো কাজ তার নির্দিষ্ট সময়ের আগেও করা হবে না, পরেও না। আল্লাহ তাআলা সালাত সম্পর্কে বলেন- 'নিশ্চয় নামাজ মুসলমানদের ওপর ফরজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।' সূরা নিসা : ১০৩
সওম সম্পর্কে বলেন- 'কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসে রোজা রাখবে।' সূরা বাকারা : ১৮৫
হজ সম্পর্কে বলেন- 'হজে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত।' সূরা বাকারা : ১৯৮
জাকাত সম্পর্কে বলেন- 'তার অংশ ফসল সংগ্রহের দিন পরিশোধ করে দাও।' সূরা আনআম : ১৪১
অন্তরের কর্মও জীবনের কর্মের মতো। এটাও নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্টকালে করতে হয়।
জ্ঞানীগণ বলেন, বান্দার সময় চার ধরনের হবে, যাতে পঞ্চম বলে কিছু নেই।
নিয়ামত
বিপদ
আনুগত্য
অবাধ্যতা।
এগুলোর প্রত্যেকটিতেই আল্লাহর দাসত্বের সুযোগ রয়েছে। রব হিসেবে তার যে অধিকার, সেই দাবি এগুলোর প্রত্যেকটিতেই রয়েছে।
যার সময় আনুগত্যের মাঝে চলে, তার পক্ষে রবের অধিকার আদায়ের পথ হচ্ছে, তার ওপর বর্ষিত আল্লাহর দয়া ও করুণার সাক্ষ্য দেওয়া। কারণ, আল্লাহ তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। তার ওপর অবিচল থাকার সুযোগ দিয়েছেন।
যার সময় নেয়ামতের মধ্য দিয়ে চলে, তার পথ হচ্ছে শোকর আদায় করা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। যার সময় অবাধ্যতায় চলে, তার পথ হচ্ছে তওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনা।
যার সময় বিপদের মধ্য দিয়ে চলে, তার ওপর রবের অধিকার হচ্ছে সন্তুষ্টি ও সবর। এখানে সন্তুষ্টির অর্থ-আল্লাহর আরোপিত সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা। আর সবরের অর্থ-আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হৃদয়ে অবিচলতা ধরে রাখা। জ্ঞানী ব্যক্তির এই কথাটি কুরআন-হাদিসের কথাই সমর্থক।
আনুগত্যের জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'হে নবি! বলো, এটি (কুরআন) এসেছে আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তার দয়ায়। সুতরাং এর জন্য তারা উৎফুল্ল ও আনন্দিত হোক। তারা যা জমা করে, এটি তার চাইতে উত্তম।' সূরা ইউনুস : ৫৮
নিয়ামতের জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'তাদের (সাবা নগরবাসীদের) বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া জীবিকা ভোগ করো আর তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। কত উত্তম নগরী এটি এবং ক্ষমাশীল (এ নগরীর) প্রভু।' সূরা সাবা : ১৫
অবাধ্যতার জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'হে নবি! লোকদেরকে আমার এ কথা বলে দাওঃ হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের প্রতি জুলুম-অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত পাপই ক্ষমা করে দেবেন। কারণ, তিনি তো পরম ক্ষমাশীল এবং অতীব দয়াবান।' সূরা জুমার : ৫৩
বিপদের জায়গায় আল্লাহ বলেন- 'আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা নেব ভয়-ভীতি দিয়ে, ক্ষুধা- অনাহার দিয়ে এবং অর্থ-সম্পদ, জান-প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দিয়ে। তবে সুসংবাদ দাও সবর অবলম্বনকারীদের।
বিপদ-মসিবতে আক্রান্ত হলে বলে- 'নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই তাঁরই কাছে ফিরে যাব।' সূরা বাকারা : ১৫৫-১৫৬
সহিহ মুসলিমে নবি ﷺ থেকে এসেছে- 'মুসলমানের ধর্ম আসলেই বিস্ময়কর! ভালো-মন্দ সব অবস্থায় নিজ কল্যাণের সুযোগ রয়েছে। মুসলিম ভিন্ন অন্য কারও এ সুযোগটি নেই। যখন তার মাঝে এ সুযোগটি আসে, আর সে শোকর আদায় করে, এটা তাকে কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়। আবার যখন তাকে দুঃখ-কষ্ট গ্রাস করে, তখন সে সবরের পথ গ্রহণ করে। এখানেও নিশ্চিত কল্যাণ।'
📄 মর্যাদাবান সময় অনুসন্ধান
একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানের উচিত হবে, কল্যাণের কাজে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। কিছু সময়কে অন্য সময়ের ওপর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এ সময়গুলো আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। এ সময়ে নেক কাজ তাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে। হাদিসে এসেছে- 'তোমাদের রব তোমাদের সময়ের কিছু অংশে সুশোভিত করেছেন, তাকে গ্রহণ করো।'
এই বিশেষায়িতর শুধু তার উলুহিয়াতের সাথে যায়। তিনি তাঁর দয়া-কৃপা যাকে ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা ঢালতে পারেন।
এটা ঠিক, আল্লাহ তাআলা কিছু লোককে অন্যদের ওপর মর্যাদাবান করেছেন, কিছু জাতিকে অপর জাতিগুলোর ওপর মর্যাদাবান করেছেন, কিছু জায়গাকে অন্য জায়গাগুলোর ওপরে স্থান দিয়েছেন। কুরআনের ভাষায়- 'তোমার প্রভু যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। এতে তাদের কোনো কোনো এখতিয়ার হাত নেই। আল্লাহ সেসব থেকে পবিত্র ও মহান, যাদের তারা তার সাথে শরিক করে।' সূরা কাসাস : ৬৮
আল্লাহ তাআলা রাতের শেষ তিন ভাগের একভাগ তথা শেষরাতের অংশকে মর্যাদাবান করেছেন।
এ সময় তিনি প্রতি রাতে বান্দাদের নিকট আত্মপ্রকাশ করেন এবং তার স্বীয় মহিমায় পদ্ধতিতে তাদের কাছে নেমে আসেন। আর ঘোষণা করেন- 'হে আমার বান্দারা! তোমাদের মাঝে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থী আছে? আমি তাকে ক্ষমা করতে ইচ্ছুক। কোনো তওবাকারী আছে? আমি তার তওবা কবুল করব। কোনো সাহায্যপ্রার্থী আছে? কোনো আহ্বানকারী আছে?' মুসলিম, মুসনাদে আহমদ
তিনি এভাবেই ফজর পর্যন্ত ডাকতে থাকেন।
এ কারণেই আল্লাহ মুত্তাকি-মুহসিনদের গুণ বর্ণনায় বলেছেন- 'মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতে আর ঝরনা ধারায়। তারা সেখানে উপভোগ করবে তাদের রবের দেওয়া নেয়ামতরাজি। কারণ, ইতিপূর্বে (পৃথিবীর জীবনে) তারা ছিল কল্যাণপরায়ণ পুণ্যবান। তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় ব্যয় করত, শেষ রাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।' সূরা জারিয়াত : ১৫-১৮
সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে তিনি জুমার দিনকে মর্যাদাবান করেছেন। এই দিনটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ। এতে রয়েছে জুমার সালাত, রয়েছে জুমার উপলক্ষে মিলনমেলা। আর এতে রয়েছে এমন একটি সময়, যে সময়ে মুসলমানরা আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে তিনি তাতে সাড়া দেন।
হাদিসে এসেছে- 'যে প্রথম সময়ে জুমায় শামিল হলো, সে যেন একটি হৃষ্টপুষ্ট উট কুরবানি দিলো। যে দ্বিতীয় সময়ে এলো, সে যেন একটি গরু কুরবানি দিলো। এরপর যে এলো, সে যেন একটি মুরগি এবং সবশেষে যে এলো, সে ডিম কুরবানির সমান নেকি অর্জন করল। অতঃপর যখন খতিব মিম্বরে আরোহণ করার সময় হয়, ফেরেশতারা তাদের কাতারগুলো গুটিয়ে খুতবা শুনতে ফিরে যায়।' বুখারি : ৮৮১
আল্লাহ তাআলা বছরের দিনগুলোর মধ্যে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে মর্যাদাবান করেছেন। আর এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী আরাফার দিন। বলা যায়, এটা সারা বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন। ইবনে আব্বাসের সূত্রে সহিহ সনদে রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে- 'আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোতে (আরাফার দশ দিন) নেক আমলের চেয়ে অধিকতর পছন্দনীয় কোনো আমল নেই। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও কি নয়? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে তার জীবন এবং সম্পদ নিয়ে জিহাদে বের হলো এবং আর ফিরে এলো না; তার কথা ভিন্ন।' বুখারি
একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানের উচিত হবে, কল্যাণের কাজে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। কিছু সময়কে অন্য সময়ের ওপর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এ সময়গুলো আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। এ সময়ে নেক কাজ তাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে। হাদিসে এসেছে- 'তোমাদের রব তোমাদের সময়ের কিছু অংশে সুশোভিত করেছেন, তাকে গ্রহণ করো।'
এই বিশেষায়িতর শুধু তার উলুহিয়াতের সাথে যায়। তিনি তাঁর দয়া-কৃপা যাকে ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা ঢালতে পারেন।
এটা ঠিক, আল্লাহ তাআলা কিছু লোককে অন্যদের ওপর মর্যাদাবান করেছেন, কিছু জাতিকে অপর জাতিগুলোর ওপর মর্যাদাবান করেছেন, কিছু জায়গাকে অন্য জায়গাগুলোর ওপরে স্থান দিয়েছেন। কুরআনের ভাষায়- 'তোমার প্রভু যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। এতে তাদের কোনো কোনো এখতিয়ার হাত নেই। আল্লাহ সেসব থেকে পবিত্র ও মহান, যাদের তারা তার সাথে শরিক করে।' সূরা কাসাস : ৬৮
আল্লাহ তাআলা রাতের শেষ তিন ভাগের একভাগ তথা শেষরাতের অংশকে মর্যাদাবান করেছেন।
এ সময় তিনি প্রতি রাতে বান্দাদের নিকট আত্মপ্রকাশ করেন এবং তার স্বীয় মহিমায় পদ্ধতিতে তাদের কাছে নেমে আসেন। আর ঘোষণা করেন- 'হে আমার বান্দারা! তোমাদের মাঝে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থী আছে? আমি তাকে ক্ষমা করতে ইচ্ছুক। কোনো তওবাকারী আছে? আমি তার তওবা কবুল করব। কোনো সাহায্যপ্রার্থী আছে? কোনো আহ্বানকারী আছে?' মুসলিম, মুসনাদে আহমদ
তিনি এভাবেই ফজর পর্যন্ত ডাকতে থাকেন।
এ কারণেই আল্লাহ মুত্তাকি-মুহসিনদের গুণ বর্ণনায় বলেছেন- 'মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতে আর ঝরনা ধারায়। তারা সেখানে উপভোগ করবে তাদের রবের দেওয়া নেয়ামতরাজি। কারণ, ইতিপূর্বে (পৃথিবীর জীবনে) তারা ছিল কল্যাণপরায়ণ পুণ্যবান। তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় ব্যয় করত, শেষ রাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।' সূরা জারিয়াত : ১৫-১৮
সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে তিনি জুমার দিনকে মর্যাদাবান করেছেন। এই দিনটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ। এতে রয়েছে জুমার সালাত, রয়েছে জুমার উপলক্ষে মিলনমেলা। আর এতে রয়েছে এমন একটি সময়, যে সময়ে মুসলমানরা আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে তিনি তাতে সাড়া দেন।
হাদিসে এসেছে- 'যে প্রথম সময়ে জুমায় শামিল হলো, সে যেন একটি হৃষ্টপুষ্ট উট কুরবানি দিলো। যে দ্বিতীয় সময়ে এলো, সে যেন একটি গরু কুরবানি দিলো। এরপর যে এলো, সে যেন একটি মুরগি এবং সবশেষে যে এলো, সে ডিম কুরবানির সমান নেকি অর্জন করল। অতঃপর যখন খতিব মিম্বরে আরোহণ করার সময় হয়, ফেরেশতারা তাদের কাতারগুলো গুটিয়ে খুতবা শুনতে ফিরে যায়।' বুখারি : ৮৮১
আল্লাহ তাআলা বছরের দিনগুলোর মধ্যে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে মর্যাদাবান করেছেন। আর এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী আরাফার দিন। বলা যায়, এটা সারা বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন। ইবনে আব্বাসের সূত্রে সহিহ সনদে রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে- 'আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোতে (আরাফার দশ দিন) নেক আমলের চেয়ে অধিকতর পছন্দনীয় কোনো আমল নেই। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও কি নয়? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে তার জীবন এবং সম্পদ নিয়ে জিহাদে বের হলো এবং আর ফিরে এলো না; তার কথা ভিন্ন।' বুখারি
📄 মুসলমানের দৈনন্দিন জীবন
মুসলমানের দৈনন্দিন যদি একটি বরকতপূর্ণ জীবন পেতে চায়, তাহলে তাকে ইসলাম নির্ধারিত দৈনন্দিন জীবন-পদ্ধতির পথে হাঁটতে হবে। এই জীবন-পদ্ধতির দাবি হলো- সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং সকাল সকাল ঘুমাতে যাওয়া।
তার দিন শুরু হবে ফজরের সাথে সাথে অথবা অতঃপর সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে থেকে। পাপবিদ্ধের নিঃশ্বাস বাতাসে কলুষিত করার আগেই সে পবিত্র নির্মল বাতাসে হোঁচায় হোঁচায় সকাল পার করবে। পাপিষ্ঠরা দিনের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার আগে ঘুমের ওপর বিজয়ী হতে পারে না।
এভাবে একজন মুসলিম প্রত্যুষে উঠে তার দিনকে বরণ করে নেবে। রাসূল ﷺ এ সময়টিতে তার উম্মাহর ওপর বরকত ঢেলে দেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেছেন। তার দুআটি ছিল- 'হে আল্লাহ! আমার উম্মাতের ওপর ভোরবেলায় বরকত বর্ষণ করো।' ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানরা তাদের দিনের রুটিন বদলে ফেলেছে। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকে। ফলে ফজর কাজা হয়ে যায়। সালাফরা অনেকে আশ্চর্য হয়ে বলতেন, 'যে সূর্যোদয়ের পর ফজর নামাজ পড়ে, সে কীভাবে রিজিকপ্রাপ্ত হয়! আশ্চর্য!'
ইমাম বুখারি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'ঘুমানোর পর শয়তান তোমাদের ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। সে প্রত্যেক গিঁটের ওপর প্রহার করে বলে, "তোমার সামনে একটি লম্বা রাত; প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়ে থাকো।" অতঃপর যখন কেউ জাগ্রত হয় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে, তার একটি গিঁট খুলে যায়। যখন সে সালাত আদায় করে, তখন তার তৃতীয় গিঁটও খুলে যায়। ফলে সে সহজ এবং পবিত্র মনের অধিকারী এক সকাল অতিবাহিত করে। অন্যথায় তার সকালটি হয় আলস্যময় এবং দুঃখিত মনের।' বুখারি : ১১৪২
দুই ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য কত বিশাল। যার ঘাড়ের ওপর থেকে শয়তানের সকল গিঁট খুলে গেল, সে প্রত্যুষে আল্লাহর স্মরণ, পবিত্রতা ও সালাতের মাধ্যমে দিন শুরু করল এবং জীবনযুদ্ধের ময়দানে চাঙ্গা শরীর, পবিত্র মন, এবং প্রশস্ত বক্ষে হাজির হলো। আর যে আপন ঘাড়ের ওপর শয়তানের গিঁট নিয়ে দিনাতিপাত করল, তার সকালটি ঘুমে কাটল। যার পদক্ষেপে হেলে-দুলে পদচারণা করল। তার মন থাকল কলুষিত হয়ে; আর শরীরটা ভারী আর অলস হলো।
একজন মুসলিম তার দিন দিন শুরু করে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। ফরজ ও সুন্নাত সালাত আদায়, রাসূল থেকে বর্ণিত দুআসমূহ পাঠ করার মাধ্যমে মুমিনের দিন শুরু হবে। রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত কয়েকটি দুআ হলো-
اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার (প্রদত্ত নিয়ামত) রাতের প্রস্থান এবং দিনের মুহূর্ত এবং আপনার প্রার্থনাকারী বান্দাদের প্রার্থনার আওয়াজ সম্মত হওয়ার মুহূর্ত; (এই মুহূর্তের বরকতে) আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।' সুনানে তিরমিজি : ৩৫৮৯, আবু দাউদ : ৫৩০
اللَّهُمَّ مَا أَصْبَحَ بِي مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنْكَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ.
'হে আল্লাহ! প্রভাতে আপনার যে নেয়ামত আমি লাভ করি অথবা আপনার বান্দাদের কেউ লাভ করে, তা তো আপনারই পক্ষ থেকে। আপনি একক, আপনার কোনো অংশীদার নেই। সুতরাং প্রশংসা আপনারই এবং কৃতজ্ঞতাও আপনার।' আবু দাউদ : ৫০৭৩
অতঃপর কুরআনুল কারিম থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করে। গভীর ধ্যানের সাথে বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'এই কিতাব (আল কুরআন) আমরা নাজিল করেছি, যেন মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।' সূরা সোয়াদ : ২৯
এরপর পরিমিত পরিমাণ সকালের নাস্তা গ্রহণ করে। নাস্তা শেষে জীবিকা অন্বেষণ এবং রিজিকের সন্ধানে ছুটে চলে। নিজেকে কোনো একটি হালাল কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য সাধনা করে। আর এই হালাল কাজে তার কম-বেশি যা-ই হোক, সে পরিতৃপ্ত থাকে। সাধারণ কোনো ব্যবস্থাপনা বা পর্যবেক্ষণর কাজ হলেও সে করে। কারণ, মুক্ত ও অবাধ সম্পদ ছুরির তৈরি করে দেয়।
এ জন্যই ইসলাম সুদ হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ, সুদ কোনো বিবর্তন ছাড়াই সম্পদ থেকে সম্পদ বাড়ায়। যেখানে কোনো পরিশ্রম, শরিকানা কিংবা লাভের আশা নেই; স্বয়ংক্রিয় সম্পদ বাড়তে থাকে। সুদখোর শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বসে থাকে-শতকরা দশ টাকা কিংবা হাজারে একশো আসবে। ছোটোখাটো কোনো দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া এই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে। এটা ইসলামের দর্শনের বিপরীত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন কাজ এবং দুনিয়াকে আবাদ করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন- 'তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন জমিন থেকে এবং তাতেই তোমাদের তামির (প্রতিষ্ঠিত) করেছেন।' সূরা হুদ : ৬১
মানুষ যেহেতু সমাজ ও জীবন থেকে কিছু গ্রহণ করে, তাই তাকে সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে; সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে। যেহেতু সে ভোগ করে, তাই তাকে কিছু উৎপাদনও করতে হবে। বেকার ভবঘুরে হতে পারে না, থাকে কোনো কোনো কাজ না- এমনটা হতে পারে না। তা যদি আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্য কর্মমুক্তির দাবি হয়, তারপরেও নয়। কারণ, ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই।
ইমাম বায়হাকি আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন- 'দুনিয়ায় সবচেয়ে খারাপ জিনিস হলো বেকারত্ব।'
আল্লামা মানাবি তার ফয়জুল কাদির গ্রন্থে এর ব্যাখ্যায় বলেছেন- 'যখন মানুষ কর্মশূন্য বা বেকার থাকে, তখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়মানুযায়ী কিছু কাজ করতে থাকে যার দ্বারা সে আপন ধর্মের কাছে সাহায্য কামনা করে। বাহ্যিকভাবে সে কাজ-কর্ম থেকে মুক্ত থাকে, কিন্তু তার ভেতরটা খালি থাকে না। শয়তান সেখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। অন্য যেকোনো প্রজাতির তুলনায় দ্রুত বংশ বিস্তার করে।'
আর যে ব্যক্তি কোনো পেশায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে মানব সমাজে কোনো উপকারে আসতে পারে না, সে মানবসমাজ থেকে কেবল সুবিধাই গ্রহণ করে। সে মানব সমাজের জীবনধারণের উপকরণ সংকীর্ণ করে তোলে। পানি ঘোলা করা এবং দ্রব্যমূল্য বাড়ানো ছাড়া সে মানব সমাজের কোনো উপকার করে না।
আমিরুল মুমিনিন উমর কোনো সবলকে দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, তার কি কোনো উপার্জনের উপায় নেই? উত্তর 'না' শুনলে, তাঁর চক্ষু দিয়ে জলের ধারা নেমে আসত। বাস্তবে তিনি ব্যাপারটিকে এভাবে মূল্যায়ন করতেন। যারা নিজ সম্পদ অপচয়, অপব্যয়ের মাধ্যমে খরচ করে, তিনি তাদের নিন্দা করতেন। তাহলে যারা অপরের সম্পদ নীরবে ভক্ষণ করে, তাদের অবস্থা কী দাঁড়ায়?
সালেফে সালেহিনদের কেউ কেউ সফিদের ধ্বংসাবশেষে বসবাসকারী নিশ্চুপ প্যাঁচার সঙ্গে তুলনা করেছেন; যে প্যাঁচা কারও কোনো উপকারে আসে না।
একজন মুসলিম তার দুনিয়াবি কাজকেও ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদত ও জিহাদ মনে করে; যতক্ষণ তার নিয়ত শুদ্ধ থাকে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে না যায়, বলিষ্ঠতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে তার কর্ম সম্পাদন করে। কর্মে বলিষ্ঠতা সকল মুসলিমের ওপর আবশ্যক। যেমনটি রাসূল বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা সবকিছুর মাঝেই নৈপুণ্যতা রেখেছেন।'
ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বলিষ্ঠ হাতের নিপুণ কাজগুলো পছন্দ করেন।' মুসলিম : ১৯৭৫
দৈনন্দিন যে কাজটি মুসলিমদের ভুলে যাওয়া কিংবা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই তা হলো- সমাজকল্যাণমূলক কাজ। সমাজের লোকদের সহযোগিতা, প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের জীবন ঘনিষ্ঠ ব্যাপারগুলো সহজীকরণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হয়। এ কাজগুলো তার নিজের ওপর সাদাকা এবং সালাত।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু মুসা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'নবি ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সাদাকা করা ফরজ। সাহাবিরা বললেন, যদি তার কিছু না থাকে? তিনি বললেন, সে নিজ হাতে উপার্জন করবে। সেখান থেকে নিজেও উপকৃত হবে এবং দান করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও করতে সক্ষম না হয় বা না করে? তিনি বলেন, তাহলে অভাবগ্রস্ত দুঃখী ব্যক্তিকে সহযোগিতা করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজের আদেশ দেবে। তারা বলেন, যদি তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এটাও সাদাকা।' বুখারি : ১৪৪৫
এই সাদাকা বা সমাজকর্ম প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দৈনন্দিন ফরজ; বরং সহিহ হাদিসের ব্যাখ্যানুযায়ী এটি দিনের প্রতিটি অংশে কিংবা প্রতি সুযোগেই ফরজ। প্রতিটি সূর্যোদয় এই ফরজটি নিয়ে আসে। এ ফরজ কাজ আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম হবে একটি ঝরনা; যা থেকে তার আশেপাশের সকল জীব ও জড় পদার্থের স্রোতধারার গতিতে কল্যাণ, উপকার ও প্রশান্তি লাভ করবে।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- রাসূল ﷺ বলেছেন- 'প্রত্যেক দুজন মানুষের মাঝেও সাদাকা হতে পারে। প্রতিদিন সূর্য উদিত হলে দুজন লোকের মাঝে সুবিচার করা সাদাকা, কাউকে সাহায্য করে সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়া সাদাকা, ভালো কথা বলা সাদাকা, সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি পদক্ষেপে সাদাকা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদাকা।' বুখারি : ২৯৮৯
হাদিসে ব্যবহৃত 'সুলামি' শব্দ দ্বারা হাড্ডি, গিরা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বোঝানো হয়েছে। এর সমর্থনে অন্য হাদিস রয়েছে। এগুলো সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সর্বোত্তম করে তার চেহারা সাজিয়েছেন। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক দায়িত্ব হলো- আল্লাহর শোকর আদায় করা। আর এ শোকর আদায়ের মাধ্যম হলো, সেগুলোকে (শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) আল্লাহর আনুগত্য এবং তার বান্দাদের কল্যাণে ব্যবহার করা অথবা সম্ভাব্য কোনো একটা উপায়ে তাদের কল্যাণে লাগানো।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সাথে সাথে যোহরের আজান ভেসে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে একজন মুসলিম ঘুম থেকে এবং সবর হলে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করার জন্য ছুটে আসে। প্রথম ওয়াক্তে আল্লাহর নেয়ামত রয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা কল্যাণের কাজে ছুটে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তা ছাড়া আল্লাহর রাসূল ﷺ জামায়াতে শামিল না হওয়া কিছু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। জামায়াতে সালাতকে একাকী সালাতের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাবান করেছেন; যদিও সে সালাত মসজিদে একাকী হয়।
একজন মুসলিম দিনের মধ্যভাগে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে। আর খাবার হবে পরিমিত ও পরিমাণমতো। এত বেশি হবে না, যাতে বদহজমজনিত পীড়া হয়। আর এত কমও হবে না, যাতে ক্ষুধা রয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- 'হে আদম সন্তান! প্রত্যেক মসজিদের (সালাতের) সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরবে। আর আহার করবে, পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না। কারণ, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' সূরা আরাফ : ৩১
'হে নবি! বলো, "আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সুন্দর বস্ত্র আর উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করল কে?" বলো, "সেগুলো তো মুমিনদেরই জন্য এই দুনিয়ার জীবনে, বিশেষ করে কিয়ামতেরকালে।" এভাবেই আমরা সুস্পষ্টভাবে আয়াতগুলো বর্ণনা করি, যারা জ্ঞান রাখে তাদের জন্য।' সূরা আরাফ : ৩২
গরমের দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, অনেকে দুপুরে বিশ্রামে অভ্যস্ত। তারা এ সময় কিছুটা বিশ্রাম নেয়। এটা তাদের রাতের সালাত এবং প্রত্যুষে বিছানা ত্যাগে সহায়ক হয়। এর দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে এসেছে- 'দুপুরে যখন তোমাদের পোশাক খুলে রাখো।' সূরা নূর : ৫৮
এরপর যখন আসরের সময় হয়, মুয়াজ্জিন 'হাইয়া আলাস সালাহ' বলে ডাক দেয়, তখন কোনো মুসলিম বিশ্রামে থাকলে উঠে পড়ে। আর কাজে ডুবে থাকলে কাজ ছেড়ে দিনের মধ্যম সালাত হিসেবে পরিচিত আসরের সালাতের জন্য ছুটে যায়। এ সময় মুসলিমদের বেচাকেনা, ব্যবসা বা বিনোদনে ডুবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কুরআনে বর্ণিত নিচের গুণগুলোতে যারা গুণান্বিত, তারাই প্রকৃত মুসলমান।
'সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর জিকির, সালাত কায়েম ও জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনটিকে, যেদিন মানুষের অন্তর আর চোখ উল্টে যাবে।' সূরা নূর : ৩৭
মুসলমানদের পক্ষে অবহেলায় আসরের সালাতকে সূর্য হলুদ হওয়া বা সূর্যাস্তের কাছাকাছি পর্যন্ত দেরি করা সাজে না। কারণ, এটা মুনাফিকদের সালাত। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! তাদের একজন বসে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে। যখন সে হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং শয়তানের শিংয়ের সঙ্গে মিলিত হয়, সে উঠে এবং চার চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই থাকে।' মুসলিম : ৬২২
সূর্য ডোবার সাথে সাথে একজন মুসলিম প্রথম সময়ে মাগরিবের সালাত আদায় করে। উল্লেখ্য মাগরিবের সালাতের সময় সংকীর্ণ। ফরজ ও সুন্নাত সালাত শেষে সে হাদিসে বর্ণিত সান্ধ্যকালীন মাসনুন দুআগুলো পাঠ করবে। যেমন- اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! এটা হচ্ছে আপনার রাত আসার সময়, আপনার দিন বিদায়ের মুহূর্ত এবং আপনাকে আহ্বানকারীর ডাক শোনার সময়। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' আবু দাউদ : ৫৩০
এ ছাড়া ফজরের দুআগুলোও পাঠ করবে। তবে শুধু এর জায়গায় (أَصْبَحْنَا) পড়বে।
একজন মুসলমান অপচয় ও কার্পণ্যমুক্ত রাতের খাবার গ্রহণ করবে। এরপর সালাতুল এশা আদায় করে সুন্নাত সালাতগুলো আদায় করবে। যদি তাহাজ্জুদে জাগার অভ্যাস থাকে, তবে তখনই বিতর আদায় করবে; নতুবা ঘুমানোর পূর্বে বিতর আদায় করে নেবে।
কখনো কখনো রাতের খাবার এশার পরে হতে পারে। তবে যদি রাতের খাবার এবং এশার নামাজ একসঙ্গে উপস্থিত হয়, আগে রাতের খাবার গ্রহণ করবে। হাদিসের নির্দেশনা এ রকমই। যাতে তার নামাজ আল্লাহর স্মরণমুক্ত না হয়। একজন মুসলিম চাইলে ঘুমানোর পূর্বে কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। যেমন : কারও সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ভদ্রতামূলক দায়িত্বসমূহ।
তাকে দৈনিক পরিকল্পিত একটা সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞানগত ও প্রজ্ঞাগত প্রবৃদ্ধি অর্জন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলতে শিখিয়েছেন- 'আমার প্রভু! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করো।' সূরা ত্ব-হা : ১১৪
তাকে দুনিয়াবি ও দ্বীনি দিক থেকে উপকৃত করবে- এমন বই এবং সাময়িকী বাছাই করে নিতে হবে। প্রখ্যাত দার্শনিক হাকিমের একটি উক্তি রয়েছে- 'আমাকে তোমার অধ্যয়ন সম্পর্কে বলো, আমি তোমার পরিচয় বলে দেবো।'
মুসলিমদের জন্য বৈধ খেলাধুলা বা শরিয়তসম্মত বিনোদনে অংশ নেওয়া দোষের কিছু নয়; তা দিন কিংবা রাতের যেকোনো সময় হতে পারে। কিন্তু তার কারণে যাতে রবের হক তথা ইবাদত, চোখের হক তথা ঘুম, শরীরের হক তথা বিশ্রামে ব্যাঘাত না ঘটে কিংবা পরিবারের দেখাশোনা, কর্মের দ্রুততা অথবা অন্য কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ না হয়। অনুরূপভাবে দীর্ঘ রাত্রি জাগরণও ঠিক নয়। যাতে ফজরের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকারগুলোতে বাধাগ্রস্ত না হয়। যদিও সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই অধিকারগুলোর সাথে খেয়ানত না করে, তবুও প্রত্যেক বাড়াবাড়ির অপর প্রান্তে নিশ্চিত কোনো ক্ষতি বিদ্যমান।
আর এই কাজটি রহমাতের আদেশ এবং কুরআনের আয়াতের বিপরীতও যায়। 'যাতে তোমরা পরিমাণে সীমালঙ্ঘন না করো। ওজনে ন্যায় মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না।' সূরা আর রহমান : ৮-৯
মুসলমানকে বয়ে যাওয়া প্রত্যেকটি দিন থেকে একটা জিনিস স্মরণে রাখতে হবে, যা কখনোই ভুলে যাওয়া চলবে না তা হলো, আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত দশটি অধিকার যথাযথ আদায় করা। তিনি বলেছেন- 'তোমরা সবাই এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করো এবং আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম-মিসকিন, আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্বস্থ সাথি, ভ্রমণপথে সাক্ষাৎ লাভকারী পথিক এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস- দাসীদের প্রতিও ইহসান করো।' সূরা নিসা : ৩৬
সুতরাং প্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হকটি হলো সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা, সব আদেশের মালিক, জীবনদাতা এবং নিয়ামতদাতা আল্লাহর হক।
'তোমাদের সাথে যত নেয়ামত রয়েছে, সবই তো আল্লাহর প্রদত্ত।' সূরা নাহল : ৫৩
সুতরাং একজন মুসলিমের পক্ষে তার অধিকারের অবহেলা এবং তা থেকে অন্যমনস্ক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে দৃশ্যমান দৈনিক ইবাদত হচ্ছে সালাত। মুমিনের গুণ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা সালাতে খুশুকে (বিনয়) প্রথমে রেখেছেন। 'যারা তাদের সালাতে বিনয়ী হয়।' সূরা মুমিনুন : ২
আর শেষে রেখেছেন সালাতের হিফাজতকে- 'তা ছাড়া তাঁরা তাদের সালাতের প্রতি যত্নবান থাকে।' সূরা মুমিনুন : ৯
আর যারা সালাত ছেড়ে অন্য কাজে মত্ত হয় হলো যে সালাতের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল, তিনি তাদের জন্য নিশ্চিত ধ্বংস লিখে রেখেছেন। 'সুতরাং ওই মুসল্লিদের জন্য রয়েছে ধ্বংস, যারা তাদের সালাতের ব্যাপারে গাফিলতি করে।' মাউন : ৪-৫
দ্বিতীয় অধিকার হলো পিতা-মাতার অধিকার। তাদের প্রতি ইহসান করার কথা কুরআনুল কারিমে তাওহিদ এবং আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠতার পাশাপাশি এসেছে।
কুরআন ও সুন্নাহ মায়ের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়েছে। কারণ, তাঁর অধিকার একটু বেশিই গুরুত্বের দাবি রাখে। তা ছাড়া তাঁর পরিচর্যার প্রয়োজনটিও বেশি এবং সন্তানের জন্য কষ্টটিও তিনিই বেশি করেছেন। তাঁর কষ্টের সাথে আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না।
'তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে কষ্টের সাথে, প্রসব করেছে কষ্টের সাথে। তাকে গর্ভে ধারণ এবং তার বুকের দুধ ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫
ইসলাম মায়ের জন্য 'মা দিবস' নামে একটি দিন বরাদ্দ রাখাকে যথেষ্ট মনে করে না; এটি ইসলামের মূলনীতির বিপরীত।
এরপর নিকটাত্মীয়দের কথা; ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা, ছেলেমেয়েসহ অন্যান্য রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনদের অধিকার।
আসে সমাজের দুর্বল অংশ যেমন ইয়াতিম, মিসকিন, অর্থ-শূন্যতায় পড়া মুসাফিরের অধিকার। আরও আসে নিকট ও দূরের প্রতিবেশীদের অধিকার। অল্প সময় কিংবা বছরের পর বছর ধরে সফর অথবা নিজ ভূমিতে যাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তাদের অধিকার। আর আওতায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং তাদের পারস্পরিক অধিকারও চলে আসে।
আর শেষ অধিকারটি হলো- যার মালিকানা বা দায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত, তার অধিকার। কুরআনে এসেছে- 'এবং যার মালিকানা তোমাদের হাতে।'
দাসপ্রথা যতদিন ছিল, এর দ্বারা ততদিন দাস এবং তাদের অধিকার নির্দেশ করত। তবে তা আ'ম অর্থাৎ মালিকানায় থাকা সবকিছুর অধিকার বোঝায়। যেমন : মানুষের মালিকানায় থাকা পশু, আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ইত্যাদি সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং একজন মুসলিম এসবের ব্যাপারে সদাচারণব্দ। এগুলো সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন, সেগুলো অপকর্মে ব্যবহার না করা। কারণ, সেগুলোর শুধু মালিক নয়; রক্ষকও বটে।
ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে কিছু দায়িত্ব থাকে। দায়িত্ব নয়; বরং মুস্তাহাব কাজ। তা হলো, পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা। তারপর ডান পাশের ওপর ভর দিয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করে শুয়ে পড়া। রাসূল ﷺ -এর শোয়ার পদ্ধতি বর্ণনায় হাদিসে এসেছে- তিনি ঘুমানোর আগে নিচের দুআটি পড়তেন- بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي وَبِاسْمِكَ أَرْفَعُهُ إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ.
'তোমার নামে আমার পার্শ্ব বিছানায় রাখছি। তোমার নামে উঠব। যদি আমি জীবিত হয়ে ফিরে আসি, আমাকে ক্ষমা করো। আর যদি তোমার দরবারে চলে যাই, তবে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের মতো আমার আত্মাকে সংরক্ষণ করো।' বুখারি : ৬৩২০
সকাল-সন্ধ্যা, দিন-রাত বা বিভিন্ন সময়ের আমল ও দুআ সম্পর্কে লিখিত বেশ কিছু বই রয়েছে। মুসলিমদের সেগুলোর নির্দেশনা থেকে উপকৃত হতে হবে।
এ বিষয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বই হলো- ইমাম নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আলিমায় নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আল কালিমুত তাইয়িব, আল্লামা ইবনুল জাজারি রচিত আল হিসনুল হাসিন এবং শাওকানির করা এ বইয়ের ব্যাখ্যা তুহফাতুজ জাকেরিন ইত্যাদি। আর সমসাময়িক আলিমদের রচিত বইগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ইমাম হাসান আল বান্না রচিত রিসালাতুল মা'সুরাত।
মুসলমানের দৈনন্দিন যদি একটি বরকতপূর্ণ জীবন পেতে চায়, তাহলে তাকে ইসলাম নির্ধারিত দৈনন্দিন জীবন-পদ্ধতির পথে হাঁটতে হবে। এই জীবন-পদ্ধতির দাবি হলো- সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং সকাল সকাল ঘুমাতে যাওয়া।
তার দিন শুরু হবে ফজরের সাথে সাথে অথবা অতঃপর সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে থেকে। পাপবিদ্ধের নিঃশ্বাস বাতাসে কলুষিত করার আগেই সে পবিত্র নির্মল বাতাসে হোঁচায় হোঁচায় সকাল পার করবে। পাপিষ্ঠরা দিনের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার আগে ঘুমের ওপর বিজয়ী হতে পারে না।
এভাবে একজন মুসলিম প্রত্যুষে উঠে তার দিনকে বরণ করে নেবে। রাসূল ﷺ এ সময়টিতে তার উম্মাহর ওপর বরকত ঢেলে দেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে নিবেদন করেছেন। তার দুআটি ছিল- 'হে আল্লাহ! আমার উম্মাতের ওপর ভোরবেলায় বরকত বর্ষণ করো।' ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানরা তাদের দিনের রুটিন বদলে ফেলেছে। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকে। ফলে ফজর কাজা হয়ে যায়। সালাফরা অনেকে আশ্চর্য হয়ে বলতেন, 'যে সূর্যোদয়ের পর ফজর নামাজ পড়ে, সে কীভাবে রিজিকপ্রাপ্ত হয়! আশ্চর্য!'
ইমাম বুখারি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'ঘুমানোর পর শয়তান তোমাদের ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। সে প্রত্যেক গিঁটের ওপর প্রহার করে বলে, "তোমার সামনে একটি লম্বা রাত; প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়ে থাকো।" অতঃপর যখন কেউ জাগ্রত হয় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে, তার একটি গিঁট খুলে যায়। যখন সে সালাত আদায় করে, তখন তার তৃতীয় গিঁটও খুলে যায়। ফলে সে সহজ এবং পবিত্র মনের অধিকারী এক সকাল অতিবাহিত করে। অন্যথায় তার সকালটি হয় আলস্যময় এবং দুঃখিত মনের।' বুখারি : ১১৪২
দুই ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য কত বিশাল। যার ঘাড়ের ওপর থেকে শয়তানের সকল গিঁট খুলে গেল, সে প্রত্যুষে আল্লাহর স্মরণ, পবিত্রতা ও সালাতের মাধ্যমে দিন শুরু করল এবং জীবনযুদ্ধের ময়দানে চাঙ্গা শরীর, পবিত্র মন, এবং প্রশস্ত বক্ষে হাজির হলো। আর যে আপন ঘাড়ের ওপর শয়তানের গিঁট নিয়ে দিনাতিপাত করল, তার সকালটি ঘুমে কাটল। যার পদক্ষেপে হেলে-দুলে পদচারণা করল। তার মন থাকল কলুষিত হয়ে; আর শরীরটা ভারী আর অলস হলো।
একজন মুসলিম তার দিন দিন শুরু করে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। ফরজ ও সুন্নাত সালাত আদায়, রাসূল থেকে বর্ণিত দুআসমূহ পাঠ করার মাধ্যমে মুমিনের দিন শুরু হবে। রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত কয়েকটি দুআ হলো-
اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার (প্রদত্ত নিয়ামত) রাতের প্রস্থান এবং দিনের মুহূর্ত এবং আপনার প্রার্থনাকারী বান্দাদের প্রার্থনার আওয়াজ সম্মত হওয়ার মুহূর্ত; (এই মুহূর্তের বরকতে) আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।' সুনানে তিরমিজি : ৩৫৮৯, আবু দাউদ : ৫৩০
اللَّهُمَّ مَا أَصْبَحَ بِي مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنْكَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ.
'হে আল্লাহ! প্রভাতে আপনার যে নেয়ামত আমি লাভ করি অথবা আপনার বান্দাদের কেউ লাভ করে, তা তো আপনারই পক্ষ থেকে। আপনি একক, আপনার কোনো অংশীদার নেই। সুতরাং প্রশংসা আপনারই এবং কৃতজ্ঞতাও আপনার।' আবু দাউদ : ৫০৭৩
অতঃপর কুরআনুল কারিম থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করে। গভীর ধ্যানের সাথে বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'এই কিতাব (আল কুরআন) আমরা নাজিল করেছি, যেন মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।' সূরা সোয়াদ : ২৯
এরপর পরিমিত পরিমাণ সকালের নাস্তা গ্রহণ করে। নাস্তা শেষে জীবিকা অন্বেষণ এবং রিজিকের সন্ধানে ছুটে চলে। নিজেকে কোনো একটি হালাল কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য সাধনা করে। আর এই হালাল কাজে তার কম-বেশি যা-ই হোক, সে পরিতৃপ্ত থাকে। সাধারণ কোনো ব্যবস্থাপনা বা পর্যবেক্ষণর কাজ হলেও সে করে। কারণ, মুক্ত ও অবাধ সম্পদ ছুরির তৈরি করে দেয়।
এ জন্যই ইসলাম সুদ হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ, সুদ কোনো বিবর্তন ছাড়াই সম্পদ থেকে সম্পদ বাড়ায়। যেখানে কোনো পরিশ্রম, শরিকানা কিংবা লাভের আশা নেই; স্বয়ংক্রিয় সম্পদ বাড়তে থাকে। সুদখোর শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বসে থাকে-শতকরা দশ টাকা কিংবা হাজারে একশো আসবে। ছোটোখাটো কোনো দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া এই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে। এটা ইসলামের দর্শনের বিপরীত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন কাজ এবং দুনিয়াকে আবাদ করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন- 'তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন জমিন থেকে এবং তাতেই তোমাদের তামির (প্রতিষ্ঠিত) করেছেন।' সূরা হুদ : ৬১
মানুষ যেহেতু সমাজ ও জীবন থেকে কিছু গ্রহণ করে, তাই তাকে সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে; সমাজ ও জীবনের জন্য কিছু একটা করতে হবে। যেহেতু সে ভোগ করে, তাই তাকে কিছু উৎপাদনও করতে হবে। বেকার ভবঘুরে হতে পারে না, থাকে কোনো কোনো কাজ না- এমনটা হতে পারে না। তা যদি আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্য কর্মমুক্তির দাবি হয়, তারপরেও নয়। কারণ, ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই।
ইমাম বায়হাকি আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন- 'দুনিয়ায় সবচেয়ে খারাপ জিনিস হলো বেকারত্ব।'
আল্লামা মানাবি তার ফয়জুল কাদির গ্রন্থে এর ব্যাখ্যায় বলেছেন- 'যখন মানুষ কর্মশূন্য বা বেকার থাকে, তখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়মানুযায়ী কিছু কাজ করতে থাকে যার দ্বারা সে আপন ধর্মের কাছে সাহায্য কামনা করে। বাহ্যিকভাবে সে কাজ-কর্ম থেকে মুক্ত থাকে, কিন্তু তার ভেতরটা খালি থাকে না। শয়তান সেখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। অন্য যেকোনো প্রজাতির তুলনায় দ্রুত বংশ বিস্তার করে।'
আর যে ব্যক্তি কোনো পেশায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে মানব সমাজে কোনো উপকারে আসতে পারে না, সে মানবসমাজ থেকে কেবল সুবিধাই গ্রহণ করে। সে মানব সমাজের জীবনধারণের উপকরণ সংকীর্ণ করে তোলে। পানি ঘোলা করা এবং দ্রব্যমূল্য বাড়ানো ছাড়া সে মানব সমাজের কোনো উপকার করে না।
আমিরুল মুমিনিন উমর কোনো সবলকে দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, তার কি কোনো উপার্জনের উপায় নেই? উত্তর 'না' শুনলে, তাঁর চক্ষু দিয়ে জলের ধারা নেমে আসত। বাস্তবে তিনি ব্যাপারটিকে এভাবে মূল্যায়ন করতেন। যারা নিজ সম্পদ অপচয়, অপব্যয়ের মাধ্যমে খরচ করে, তিনি তাদের নিন্দা করতেন। তাহলে যারা অপরের সম্পদ নীরবে ভক্ষণ করে, তাদের অবস্থা কী দাঁড়ায়?
সালেফে সালেহিনদের কেউ কেউ সফিদের ধ্বংসাবশেষে বসবাসকারী নিশ্চুপ প্যাঁচার সঙ্গে তুলনা করেছেন; যে প্যাঁচা কারও কোনো উপকারে আসে না।
একজন মুসলিম তার দুনিয়াবি কাজকেও ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদত ও জিহাদ মনে করে; যতক্ষণ তার নিয়ত শুদ্ধ থাকে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে না যায়, বলিষ্ঠতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে তার কর্ম সম্পাদন করে। কর্মে বলিষ্ঠতা সকল মুসলিমের ওপর আবশ্যক। যেমনটি রাসূল বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা সবকিছুর মাঝেই নৈপুণ্যতা রেখেছেন।'
ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বলিষ্ঠ হাতের নিপুণ কাজগুলো পছন্দ করেন।' মুসলিম : ১৯৭৫
দৈনন্দিন যে কাজটি মুসলিমদের ভুলে যাওয়া কিংবা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই তা হলো- সমাজকল্যাণমূলক কাজ। সমাজের লোকদের সহযোগিতা, প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের জীবন ঘনিষ্ঠ ব্যাপারগুলো সহজীকরণে প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হয়। এ কাজগুলো তার নিজের ওপর সাদাকা এবং সালাত।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম আবু মুসা থেকে বর্ণনা করেছেন- 'নবি ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সাদাকা করা ফরজ। সাহাবিরা বললেন, যদি তার কিছু না থাকে? তিনি বললেন, সে নিজ হাতে উপার্জন করবে। সেখান থেকে নিজেও উপকৃত হবে এবং দান করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও করতে সক্ষম না হয় বা না করে? তিনি বলেন, তাহলে অভাবগ্রস্ত দুঃখী ব্যক্তিকে সহযোগিতা করবে। তারা বলেন, যদি সে তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজের আদেশ দেবে। তারা বলেন, যদি তাও না করে? তিনি বলেন, তাহলে সে কাজ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এটাও সাদাকা।' বুখারি : ১৪৪৫
এই সাদাকা বা সমাজকর্ম প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দৈনন্দিন ফরজ; বরং সহিহ হাদিসের ব্যাখ্যানুযায়ী এটি দিনের প্রতিটি অংশে কিংবা প্রতি সুযোগেই ফরজ। প্রতিটি সূর্যোদয় এই ফরজটি নিয়ে আসে। এ ফরজ কাজ আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম হবে একটি ঝরনা; যা থেকে তার আশেপাশের সকল জীব ও জড় পদার্থের স্রোতধারার গতিতে কল্যাণ, উপকার ও প্রশান্তি লাভ করবে।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- রাসূল ﷺ বলেছেন- 'প্রত্যেক দুজন মানুষের মাঝেও সাদাকা হতে পারে। প্রতিদিন সূর্য উদিত হলে দুজন লোকের মাঝে সুবিচার করা সাদাকা, কাউকে সাহায্য করে সওয়ারিতে আরোহণ করিয়ে দেওয়া বা তার ওপরে তার মালপত্র তুলে দেওয়া সাদাকা, ভালো কথা বলা সাদাকা, সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি পদক্ষেপে সাদাকা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সাদাকা।' বুখারি : ২৯৮৯
হাদিসে ব্যবহৃত 'সুলামি' শব্দ দ্বারা হাড্ডি, গিরা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বোঝানো হয়েছে। এর সমর্থনে অন্য হাদিস রয়েছে। এগুলো সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সর্বোত্তম করে তার চেহারা সাজিয়েছেন। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক দায়িত্ব হলো- আল্লাহর শোকর আদায় করা। আর এ শোকর আদায়ের মাধ্যম হলো, সেগুলোকে (শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) আল্লাহর আনুগত্য এবং তার বান্দাদের কল্যাণে ব্যবহার করা অথবা সম্ভাব্য কোনো একটা উপায়ে তাদের কল্যাণে লাগানো।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সাথে সাথে যোহরের আজান ভেসে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে একজন মুসলিম ঘুম থেকে এবং সবর হলে জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করার জন্য ছুটে আসে। প্রথম ওয়াক্তে আল্লাহর নেয়ামত রয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা কল্যাণের কাজে ছুটে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তা ছাড়া আল্লাহর রাসূল ﷺ জামায়াতে শামিল না হওয়া কিছু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। জামায়াতে সালাতকে একাকী সালাতের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাবান করেছেন; যদিও সে সালাত মসজিদে একাকী হয়।
একজন মুসলিম দিনের মধ্যভাগে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে। আর খাবার হবে পরিমিত ও পরিমাণমতো। এত বেশি হবে না, যাতে বদহজমজনিত পীড়া হয়। আর এত কমও হবে না, যাতে ক্ষুধা রয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- 'হে আদম সন্তান! প্রত্যেক মসজিদের (সালাতের) সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরবে। আর আহার করবে, পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না। কারণ, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' সূরা আরাফ : ৩১
'হে নবি! বলো, "আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সুন্দর বস্ত্র আর উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করল কে?" বলো, "সেগুলো তো মুমিনদেরই জন্য এই দুনিয়ার জীবনে, বিশেষ করে কিয়ামতেরকালে।" এভাবেই আমরা সুস্পষ্টভাবে আয়াতগুলো বর্ণনা করি, যারা জ্ঞান রাখে তাদের জন্য।' সূরা আরাফ : ৩২
গরমের দেশে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে, অনেকে দুপুরে বিশ্রামে অভ্যস্ত। তারা এ সময় কিছুটা বিশ্রাম নেয়। এটা তাদের রাতের সালাত এবং প্রত্যুষে বিছানা ত্যাগে সহায়ক হয়। এর দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে এসেছে- 'দুপুরে যখন তোমাদের পোশাক খুলে রাখো।' সূরা নূর : ৫৮
এরপর যখন আসরের সময় হয়, মুয়াজ্জিন 'হাইয়া আলাস সালাহ' বলে ডাক দেয়, তখন কোনো মুসলিম বিশ্রামে থাকলে উঠে পড়ে। আর কাজে ডুবে থাকলে কাজ ছেড়ে দিনের মধ্যম সালাত হিসেবে পরিচিত আসরের সালাতের জন্য ছুটে যায়। এ সময় মুসলিমদের বেচাকেনা, ব্যবসা বা বিনোদনে ডুবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কুরআনে বর্ণিত নিচের গুণগুলোতে যারা গুণান্বিত, তারাই প্রকৃত মুসলমান।
'সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর জিকির, সালাত কায়েম ও জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনটিকে, যেদিন মানুষের অন্তর আর চোখ উল্টে যাবে।' সূরা নূর : ৩৭
মুসলমানদের পক্ষে অবহেলায় আসরের সালাতকে সূর্য হলুদ হওয়া বা সূর্যাস্তের কাছাকাছি পর্যন্ত দেরি করা সাজে না। কারণ, এটা মুনাফিকদের সালাত। রাসূল ﷺ বলেছেন- 'এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! এটা মুনাফিকের সালাত! তাদের একজন বসে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে। যখন সে হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং শয়তানের শিংয়ের সঙ্গে মিলিত হয়, সে উঠে এবং চার চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই থাকে।' মুসলিম : ৬২২
সূর্য ডোবার সাথে সাথে একজন মুসলিম প্রথম সময়ে মাগরিবের সালাত আদায় করে। উল্লেখ্য মাগরিবের সালাতের সময় সংকীর্ণ। ফরজ ও সুন্নাত সালাত শেষে সে হাদিসে বর্ণিত সান্ধ্যকালীন মাসনুন দুআগুলো পাঠ করবে। যেমন- اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ فَاغْفِرْ لِي.
'হে আল্লাহ! এটা হচ্ছে আপনার রাত আসার সময়, আপনার দিন বিদায়ের মুহূর্ত এবং আপনাকে আহ্বানকারীর ডাক শোনার সময়। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' আবু দাউদ : ৫৩০
এ ছাড়া ফজরের দুআগুলোও পাঠ করবে। তবে শুধু এর জায়গায় (أَصْبَحْنَا) পড়বে।
একজন মুসলমান অপচয় ও কার্পণ্যমুক্ত রাতের খাবার গ্রহণ করবে। এরপর সালাতুল এশা আদায় করে সুন্নাত সালাতগুলো আদায় করবে। যদি তাহাজ্জুদে জাগার অভ্যাস থাকে, তবে তখনই বিতর আদায় করবে; নতুবা ঘুমানোর পূর্বে বিতর আদায় করে নেবে।
কখনো কখনো রাতের খাবার এশার পরে হতে পারে। তবে যদি রাতের খাবার এবং এশার নামাজ একসঙ্গে উপস্থিত হয়, আগে রাতের খাবার গ্রহণ করবে। হাদিসের নির্দেশনা এ রকমই। যাতে তার নামাজ আল্লাহর স্মরণমুক্ত না হয়। একজন মুসলিম চাইলে ঘুমানোর পূর্বে কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। যেমন : কারও সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ভদ্রতামূলক দায়িত্বসমূহ।
তাকে দৈনিক পরিকল্পিত একটা সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞানগত ও প্রজ্ঞাগত প্রবৃদ্ধি অর্জন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলতে শিখিয়েছেন- 'আমার প্রভু! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করো।' সূরা ত্ব-হা : ১১৪
তাকে দুনিয়াবি ও দ্বীনি দিক থেকে উপকৃত করবে- এমন বই এবং সাময়িকী বাছাই করে নিতে হবে। প্রখ্যাত দার্শনিক হাকিমের একটি উক্তি রয়েছে- 'আমাকে তোমার অধ্যয়ন সম্পর্কে বলো, আমি তোমার পরিচয় বলে দেবো।'
মুসলিমদের জন্য বৈধ খেলাধুলা বা শরিয়তসম্মত বিনোদনে অংশ নেওয়া দোষের কিছু নয়; তা দিন কিংবা রাতের যেকোনো সময় হতে পারে। কিন্তু তার কারণে যাতে রবের হক তথা ইবাদত, চোখের হক তথা ঘুম, শরীরের হক তথা বিশ্রামে ব্যাঘাত না ঘটে কিংবা পরিবারের দেখাশোনা, কর্মের দ্রুততা অথবা অন্য কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ না হয়। অনুরূপভাবে দীর্ঘ রাত্রি জাগরণও ঠিক নয়। যাতে ফজরের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকারগুলোতে বাধাগ্রস্ত না হয়। যদিও সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই অধিকারগুলোর সাথে খেয়ানত না করে, তবুও প্রত্যেক বাড়াবাড়ির অপর প্রান্তে নিশ্চিত কোনো ক্ষতি বিদ্যমান।
আর এই কাজটি রহমাতের আদেশ এবং কুরআনের আয়াতের বিপরীতও যায়। 'যাতে তোমরা পরিমাণে সীমালঙ্ঘন না করো। ওজনে ন্যায় মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না।' সূরা আর রহমান : ৮-৯
মুসলমানকে বয়ে যাওয়া প্রত্যেকটি দিন থেকে একটা জিনিস স্মরণে রাখতে হবে, যা কখনোই ভুলে যাওয়া চলবে না তা হলো, আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত দশটি অধিকার যথাযথ আদায় করা। তিনি বলেছেন- 'তোমরা সবাই এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করো এবং আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম-মিসকিন, আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্বস্থ সাথি, ভ্রমণপথে সাক্ষাৎ লাভকারী পথিক এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস- দাসীদের প্রতিও ইহসান করো।' সূরা নিসা : ৩৬
সুতরাং প্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হকটি হলো সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা, সব আদেশের মালিক, জীবনদাতা এবং নিয়ামতদাতা আল্লাহর হক।
'তোমাদের সাথে যত নেয়ামত রয়েছে, সবই তো আল্লাহর প্রদত্ত।' সূরা নাহল : ৫৩
সুতরাং একজন মুসলিমের পক্ষে তার অধিকারের অবহেলা এবং তা থেকে অন্যমনস্ক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে দৃশ্যমান দৈনিক ইবাদত হচ্ছে সালাত। মুমিনের গুণ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা সালাতে খুশুকে (বিনয়) প্রথমে রেখেছেন। 'যারা তাদের সালাতে বিনয়ী হয়।' সূরা মুমিনুন : ২
আর শেষে রেখেছেন সালাতের হিফাজতকে- 'তা ছাড়া তাঁরা তাদের সালাতের প্রতি যত্নবান থাকে।' সূরা মুমিনুন : ৯
আর যারা সালাত ছেড়ে অন্য কাজে মত্ত হয় হলো যে সালাতের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল, তিনি তাদের জন্য নিশ্চিত ধ্বংস লিখে রেখেছেন। 'সুতরাং ওই মুসল্লিদের জন্য রয়েছে ধ্বংস, যারা তাদের সালাতের ব্যাপারে গাফিলতি করে।' মাউন : ৪-৫
দ্বিতীয় অধিকার হলো পিতা-মাতার অধিকার। তাদের প্রতি ইহসান করার কথা কুরআনুল কারিমে তাওহিদ এবং আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠতার পাশাপাশি এসেছে।
কুরআন ও সুন্নাহ মায়ের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়েছে। কারণ, তাঁর অধিকার একটু বেশিই গুরুত্বের দাবি রাখে। তা ছাড়া তাঁর পরিচর্যার প্রয়োজনটিও বেশি এবং সন্তানের জন্য কষ্টটিও তিনিই বেশি করেছেন। তাঁর কষ্টের সাথে আর কোনো কিছুরই তুলনা চলে না।
'তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে কষ্টের সাথে, প্রসব করেছে কষ্টের সাথে। তাকে গর্ভে ধারণ এবং তার বুকের দুধ ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫
ইসলাম মায়ের জন্য 'মা দিবস' নামে একটি দিন বরাদ্দ রাখাকে যথেষ্ট মনে করে না; এটি ইসলামের মূলনীতির বিপরীত।
এরপর নিকটাত্মীয়দের কথা; ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা, ছেলেমেয়েসহ অন্যান্য রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনদের অধিকার।
আসে সমাজের দুর্বল অংশ যেমন ইয়াতিম, মিসকিন, অর্থ-শূন্যতায় পড়া মুসাফিরের অধিকার। আরও আসে নিকট ও দূরের প্রতিবেশীদের অধিকার। অল্প সময় কিংবা বছরের পর বছর ধরে সফর অথবা নিজ ভূমিতে যাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তাদের অধিকার। আর আওতায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং তাদের পারস্পরিক অধিকারও চলে আসে।
আর শেষ অধিকারটি হলো- যার মালিকানা বা দায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত, তার অধিকার। কুরআনে এসেছে- 'এবং যার মালিকানা তোমাদের হাতে।'
দাসপ্রথা যতদিন ছিল, এর দ্বারা ততদিন দাস এবং তাদের অধিকার নির্দেশ করত। তবে তা আ'ম অর্থাৎ মালিকানায় থাকা সবকিছুর অধিকার বোঝায়। যেমন : মানুষের মালিকানায় থাকা পশু, আসবাবপত্র, সরঞ্জাম ইত্যাদি সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং একজন মুসলিম এসবের ব্যাপারে সদাচারণব্দ। এগুলো সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন, সেগুলো অপকর্মে ব্যবহার না করা। কারণ, সেগুলোর শুধু মালিক নয়; রক্ষকও বটে।
ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে কিছু দায়িত্ব থাকে। দায়িত্ব নয়; বরং মুস্তাহাব কাজ। তা হলো, পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা। তারপর ডান পাশের ওপর ভর দিয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করে শুয়ে পড়া। রাসূল ﷺ -এর শোয়ার পদ্ধতি বর্ণনায় হাদিসে এসেছে- তিনি ঘুমানোর আগে নিচের দুআটি পড়তেন- بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي وَبِاسْمِكَ أَرْفَعُهُ إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ.
'তোমার নামে আমার পার্শ্ব বিছানায় রাখছি। তোমার নামে উঠব। যদি আমি জীবিত হয়ে ফিরে আসি, আমাকে ক্ষমা করো। আর যদি তোমার দরবারে চলে যাই, তবে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের মতো আমার আত্মাকে সংরক্ষণ করো।' বুখারি : ৬৩২০
সকাল-সন্ধ্যা, দিন-রাত বা বিভিন্ন সময়ের আমল ও দুআ সম্পর্কে লিখিত বেশ কিছু বই রয়েছে। মুসলিমদের সেগুলোর নির্দেশনা থেকে উপকৃত হতে হবে।
এ বিষয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বই হলো- ইমাম নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আলিমায় নাসায়ির দিবা-রাত্রির আমল, একই শিরোনামে তাঁর ছাত্র হাফেজ ইবনুস সুন্নির বই, ইমাম নববির আল আজকার, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আল কালিমুত তাইয়িব, আল্লামা ইবনুল জাজারি রচিত আল হিসনুল হাসিন এবং শাওকানির করা এ বইয়ের ব্যাখ্যা তুহফাতুজ জাকেরিন ইত্যাদি। আর সমসাময়িক আলিমদের রচিত বইগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ইমাম হাসান আল বান্না রচিত রিসালাতুল মা'সুরাত।