📄 ইবাদাতে সময়ের মূল্য
ইসলামের ফরজ বিধানসমূহ সময়কে মূল্যায়ন করে প্রতিটি মিনিট ও সেকেন্ডকে গণনায় রাখে। ইসলামে দিন-রাত্রির পরিবর্তন, গ্রহসমূহের গতিধারা, কক্ষপথের বিবর্তন এবং দুনিয়ার কর্মকাণ্ডের সাথে সময়ের গুরুত্ব নিয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়। সেইসঙ্গে মানুষের চেতনা জাগরণের ওপর জোর দেয়।
যখন রাত বিদীর্ণ হয়ে সুবহে সাদিক তার চেহারাকে নেকাবমুক্ত করে, ঠিক তখন আল্লাহর পথে আহ্বানকারী দাঁড়িয়ে যায়, দিগন্ত বিস্তৃত দুনিয়ার বুকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে। অলসদের সতর্ক করে, ঘুমন্তদের জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তাআলার পদ্ধতিতে হাত থেকে পবিত্র ভোরের আবাহন গ্রহণ করার তস্তুতি তাদের মুখে ছড়িয়ে দেয়। তখন একটা ডাক আসে- আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম। কল্যাণের দিকে, ঘুম হতে নামাজ উত্তম। এই ডাকে জিকিরে অন্তস্থ জবান, শোকর আদায়কারী আত্মা এবং ওজুর মাধ্যমে পবিত্র তাওবাকারীগুলো সাড়া দেয়। তারা বলে, 'তুমি সত্য বলেছ, সত্যকে সমর্থন করেছ।' এরপর শয়তানের সকল গিঁট খুলে যায়। আল্লাহর বান্দারা তাড়াহুড়ো সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে।'
যখন মধ্যাহ্নে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে, সূর্য আকাশের বুক থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ে, মানুষ দুনিয়াবি কাজ এবং দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ডুবে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেই আহ্বানকারী আবার উঠে দাঁড়ায়। মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদ, নবি -এর রিসালাতসহ তাকবির-তাহলিলের সঙ্গে ডাকে, সালাত এবং কল্যাণের দিকে ডাকে। মানুষকে তার কর্মযজ্ঞ এবং রুটিন ওয়ার্ক থেকে টেনে বের করে আনে। যাতে তারা মহান স্রষ্টা, রিযিকদাতার এবং নিয়ন্ত্রকের সামনে একান্ত কিছু সময় কাটাতে পারে। দুনিয়ার অংশবিশেষ ভুলে যাওয়া এবং বস্তুর পেছনে ছোটা থেকে কিছুটা নিষ্কৃতি পেতে পারে। আর এটা হলো যোহরের চেহারা সালাত।
আবার যখন প্রত্যেকটি জিনিসের ছায়া তার দ্বিগুণ হয়ে পড়ে, সূর্য অস্তগামী হয়, সেই আহ্বানকারী তৃতীয়বারের মতো উঠে দাঁড়ায়। তখন আসরের সালাতের জন্য আহ্বান করে।
সূর্যের চাকতি যখন আত্মগোপন করে, তার চেহারা যখন দিগন্তে গায়েব হয়ে যায়, তখন আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী মুয়াজ্জিন চতুর্থবারের মতো আহ্বান করে সালাত-সালাতুল মাগরিব। আর যখন পশ্চিম আকাশ থেকে লালিম (লালচে আভা) মুছে যায়, ঠিক তখন দিনের শেষ সালাত এশার জন্য স্কীয় আহ্বান ভেসে আসে।
আর এভাবেই একজন মুসলিম তার দিনের শুরুটা সালাত দিয়ে করে, শেষটাও সালাত দিয়ে করে। পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং দিন-রাতের বিবর্তনের সময় সর্বদা সে রবের সঙ্গে নিত্য-নতুন সাক্ষাতে ডুবে থাকে।
আবার প্রতি সপ্তাহে জুমাবার আসে। সেদিন একই আহ্বানকারীর পক্ষ থেকে নতুন একটি ডাক আসে; সমবেত সাপ্তাহিক সালাতের ডাক। সেই সালাতের বিশেষ ধরন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এই সকল সালাতের বাইরে রয়েছে ভোর রাতের সালাত। রহমতের বান্দারা তখন উঠে দাঁড়িয়ে এবং রুকু-সিজদায় বাকি রাত কাটিয়ে দেয়। এ ছাড়াও রয়েছে সূর্যোদয়ের সালাত এবং দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ের নফল সালাত।
প্রতি মাসের শুরুতে নতুন চাঁদ উদিত হয়। মুসলমানরা তাকবির-তাহলিলের সঙ্গে এই নতুন অতিথি চাঁদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করতে করতে বরণ করে নেয়। তখন তারা বলে-
'আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাকে আমাদের মাঝে নিয়ে এসেছেন। তোমাকে করেছেন সৃষ্টিজগতের জন্য নিদর্শন। হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের নিরাপত্তা, ঈমান, ইসলাম ও প্রশান্তির কারণ বানিয়ে দাও। তার বর্তমানে তোমার পছন্দের কাজ করার তৌফিক দাও। এই চাঁদ! তোমার এবং আমার, আমাদের দুজনের রবই আল্লাহ।'
প্রতিবছরই রমজান আসে। জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানকে শৃঙ্খল পরানো হয়। এবার আর দুনিয়া থেকে নয়; আসমান থেকে একজন আহ্বানকারী ডাকতে শুরু করে-
'হে কল্যাণ প্রত্যাশী! তোমার (কল্যাণমূলক) কাজে মনোযোগী হও। হে অন্যায়ের আকাঙ্খী! তোমার (অন্যায়) কাজ থেকে বিরত থাকো।'
এ মাসে পাপীরা তওবা করে। আল্লাহবিমুখ মানুষ সৎকাজে আগ্রহী হয়। অমনোযোগী সতর্ক হয়ে যায়। বিদ্রোহ পলাতক আসামীরা আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতে ফিরে আসে। তারা একনিষ্ঠ সিয়াম-কিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মাগফিরাত খুঁজে শুরু করে। আল্লাহর রাসূল এ মাসে তাদের জন্য মাগফিরাতের ওয়াদা করেছেন- 'যে ব্যক্তি ঈমান এবং এহতেসাবের সাথে সিয়াম-সাধনা করে, তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আর যে ঈমান এবং এহতেসাবের সহিত কিয়ামুল লাইল আদায় করে, তারও পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।' বুখারি : ২০১৪
মুমিনের জন্য রমজান মাস একটি আধ্যাত্মিক সফর। তার পরপরই আসে আরও একটি সফর। আধ্যাত্মিক ও সাধারণ সফরের সমন্বয়ে হজের সফর। আর তার মাসগুলো শুরু হয় রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই।
'হজের মাসগুলো' (সাধারণভাবে) সবারই জানা আছে। এ সময় যে ব্যক্তি হজ করার ফয়সালা করবে, সে যেন হজের সময় (ইহরাম দিনগুলো) স্ত্রী সহবাস করা, পাপ কর্ম করা এবং ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকে। তোমরা যা কিছু কল্যাণের কাজই করো, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা (হজের সফরের প্রয়োজনীয়) পাথেয় সাথে নিও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া (মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহ ভীতি)। আর হে বুদ্ধি-বিবেকের অধিকারী লোকেরা! তোমরা কেবল আমাকেই ভয় করো।' সূরা বাকারা : ১৯৬
stellarরূপ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে দিনের সময়ের ওপরের 'দ্বীপশিখা' বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা হজকে জীবনের দায়িত্বপালন গণ্য করতেন। তাইতো-সবাই প্রত্যেকটি দিন কাজে লাগান। দিনের কাজ দিনে শেষ করুক। সপ্তাহের কাজ সপ্তাহে, মাসের কাজ মাসে শেষ করুক। কারও যদি দিনের কোনো কাজ ছুটে যায়, তা সপ্তাহের মাঝে সমন্বয় করে নেবে। সপ্তাহে কোনো কাজ ছুটে গেলে মাসের মাঝে শেষ করবে। এভাবেই দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর এবং পুরো জীবনকে কাজে লাগাবে। আর এটাই তাদের শেষ অবলম্বন।
এই সবগুলোর পাশাপাশি আসে আরেকটি ফরজ বিধান জাকাত, যা স্বাবলম্বী মুসলিমদের ওপর অধিকাংশ বছরেই ফরজ হয়। এই ফরজ হয় প্রতিটি ফল-ফসল সংগ্রহ বা মজুদের সময়। কুরআনের ঘোষণা-
'আর এটির হক দান করো সংগ্রহের সময়।' সূরা আনআম : ১৪১
এভাবেই একজন মুসলিমকে সময়ের গতির সাথে সচেতন থাকতে হয়। পরিবর্তনের সাথে সতর্ক পর্যবেক্ষক হতে হয়, যেন বছর শেষে কিংবা ফসল সংগ্রহের সময় জাকাতের নির্দিষ্ট সময় চলে না যায়।
📄 সময়ের বৈশিষ্ট্য
কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সময় অন্য সবকিছু থেকে ব্যতিক্রম। আমাদের সেজন্য উপলব্ধিতে এনে সময়ের সাথে আচরণ করতে হবে। সময়ের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১. ত্বরিত গতিতে চলমান হওয়া : সময় মেঘের গতিতে চলমান, বাতাসের গতিতে ধাবমান। সুখ বা আনন্দ, কিংবা বিষণ্নতা বা দুঃখ-সব ক্ষেত্রেই সময় এই গতি মেনে চলে। যদিও মনে হয়, সুখের দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়, আর কষ্টের দিনগুলো যেতেই চায় না; কিন্তু বাস্তবে ঘটে এমনটা নয়। যে যেমন করে ভাবে, তার কাছে ঠিক তেমনই মনে হয়। জনৈক কবি বলেছেন- فكأنها * مر سنين بالوصال وبالهنا
تم انثنت أيام هجر بعدها * فكأنها من طولها أعوام
تم انقضت تلك السنون وأهلها * فكأنهم وكأنهم أحلام
'ধারাবাহিক সুখময় একটি সময় কাটিয়েছি, বেশ কিছু বছর ধরে।
মনে হলো যেন কয়েকটি দিন...
এরপর শুরু হলো বিচ্ছেদ আর বেদনাভরা কালো দিন;
ক'দিন-ই বা গেল, উপলব্ধি কিন্তু বহু বছরের।
সুখ-দুঃখ কাটিয়ে নতুন সময়ে পা দিতেই;
এ তো শুধু স্বপ্ন এবং সবকিছু আগের।'
দুনিয়ায় মানুষের বয়স যত বেশিই হোক, বাস্তবে তা নিতান্তই ক্ষুদ্র। মানুষের জীবনে কত কিছু ঘটে! কিন্তু শেষটা ঠিকই মৃত্যু দিয়ে শুরু হয়। আল্লাহ কবির ওপর রহম করুন। তিনি বলেছেন- واذا كان اخر العمر موتا
فسواء قصيره والطويل
'মৃত্যুই যদি হয় জীবনের শেষ সীমান্ত, কি-ই বা পার্থক্য তার, লম্বায় নাকি সংক্ষিপ্ত!'
মৃত্যুর সময় জীবনের মুহূর্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে। মনে হয় যেন জীবনিটা যেন আকস্মিক বিদ্যুতের গতিতে ফুরিয়ে যাওয়া কিছু সময় ছিল।
নূহ (আ.)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, মৃত্যুর সময় আজরাইল তার কাছে এসে হাজির হলো। তিনি দুনিয়াতে আগে-পরে মিলিয়ে হাজার বছরের বেশি বেঁচে ছিলেন। আজরাইল তাকে জিজ্ঞাসা করল, 'হে সবচেয়ে দীর্ঘ জীবন প্রাপ্ত নবি! দুনিয়াকে কেমন পেয়েছেন?' তিনি বললেন, 'আমার কাছে দুনিয়াটা যেন একটা ঘর। যার একপাশ দিয়ে প্রবেশ করেছি, আর অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছি।'
ঘটনাটি সঠিক হোক কিংবা বেঠিক! তবুও এই কথাগুলো যেন একটা ধ্রুব সত্য! মৃত্যুর সময় জীবনিশক্তি দুর্বল ও সংকুচিত হয়ে পড়ে। আর এটা ঘটবে কিয়ামতের সময়ও। দুনিয়ায় সে যা ছেড়ে এসেছে এবং যা হারিয়েছে, তার স্বল্পতা বিস্ময়কর ধারণ করে তার সামনে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন- 'যে দিন তারা সে দিনটিকে দেখতে পাবে, তারা অনুভব করবে- পৃথিবীতে তারা কাটিয়েছে একটি সন্ধ্যা কিংবা একটি সকাল মাত্র।' সূরা নাজিয়াত : ৪৬
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন- 'যেদিন তিনি তাদের হাশর করবেন, সেদিন তাদের মনে হবে- (পৃথিবীতে) তারা অবস্থান করেছিল দিনের কিছুক্ষণ মাত্র। তারা পরস্পরকে চিনবে।' সূরা ইউনুছ : ৪৫
২. সময় কখনো ফিরে আসে না : এটা সময়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেকটি দিন গত হয়। প্রত্যেকটি ঘণ্টা অতিবাহিত হয়। প্রত্যেকটি মুহূর্ত অতিক্রম করে চলে যায়। তার কোনটিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার কোনো সুযোগ থাকে না। অতিক্রান্ত সময়ের নেই কোনো প্রতিদান কিংবা বিনিময়। হাসান বসরি সবচেয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- 'ফজর ভেদ করে আলোকিত আসা প্রতিটি দিন ডেকে বলে, "হে আদম সন্তান! আমি এক নতুন সৃষ্টি। আমি তোমার কাজের ব্যাপারে সাক্ষী। আমার নিকট থেকে রসদ সংগ্রহ করো। কারণ, আমি বিদায় নেওয়ার পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কখনোই ফিরে আসব না।"'
এটি রাসূলের হাদিস নয়। অনেকে এটাকে হাদিস মনে করেন; বস্তুত এটি হাসান বসরির উক্তি। ইমাম জালালুদ্দিন এ ব্যাপারে বলেছেন, আর তাহা নবিদের ভাষার মতোই।
এ কারণেই অনেক কবি-সাহিত্যিককে বার্ধক্য আসার পর যৌবন ফিরে পাওয়ার আকাঙ্খা ব্যক্ত করতে দেখা যায়, কিন্তু তা নিছক কামনা মাত্র। এই আকাঙ্খা কম-বেশি যাই হোক, তাতে কোনো ফায়দা নেই। তাদের একজনের উক্তি হলো- الا ليت الشباب يعود يوما
فأخبره بما فعل المشيب
'যদি একদিনের জন্যও যৌবনটা ফিরে পেতাম!
বার্ধক্য আমার সাথে যা যা করেছে, শুধু তা জানিয়ে দিতাম।'
অন্য কবির বর্ণনায় ফুটে উঠেছে- জীবন কীভাবে কেটে যায়। কীভাবে দিবারাত্রি চলে যায়, যা আর কখনো ফিরে আসে না। ফিরে পাওয়ার আশাও থাকে না। তিনি বলেন- وما المرء الا راكب ظهر عمره * على سفر يفنيه باليوم والشهر
يبيت ويضحى كل يوم وليلة * بعيدا عن الدنيا قريبا الى القبر
'মানুষ মানেই সওয়ারী।
সে জীবনের পিঠে আরোহন করে আছে।
এমন এক সফরে আছে সে, শেষ হয় যা, দিন ও মাসের হিসাবে।
প্রতিটি দিন আসছে, আলোকিত দিন শেষে রাত্রিও কেটে যাচ্ছে,
দুনিয়া থেকে দূর দূরান্তে মহাকাল; সেই আখিরাতের দিকে।'
৩. সময় মূল্যবান সম্পদ : সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। আর যখন ফুরিয়ে যায়, তখন তা আর পূরণ হওয়ার জন্য ফিরে আসে না। তার কোনো প্রতিদানও সম্ভব নয়। তাই এটি মানুষের মালিকানায় থাকা সবচেয়ে দামী এবং মূল্যবান জিনিস। সর্বোচ্চ সৃজনশীলতার রক্তক্ষরণ। বাস্তবে এটাই সকল মান্য ও সমাজের আসল মূলধন।
প্রচলিত প্রবাদে সময়কে সোনার সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি সোনা, জহরত, হিরা কিংবা সকল মূল্যবান মণি-মুক্তো পাথরের চেয়েও মূল্যবান। ইমাম শহিদ হাসান আল বান্না বলেন- 'জীবন! মানুষের জীবন জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত কাটানো সময় ব্যতীত অন্য কিছু নয়।'
একই প্রসঙ্গে হাসান বসরি বলেন- 'হে আদম সন্তান! তুমি মুষ্টিমেয় কিছু দিনের সমষ্টি। এক এক করে দিন যখন চলে যায়, তখন তোমার জীবনের একটা করে অংশ চলে যায়।' হিলয়াতুল আউলিয়া
যে মানুষ এখন সময়ের মূল্য নিয়ে অজ্ঞতায় আছে, তারও এমন একটা সময় আসবে, যখন সে সময়ের মূল্য ও মর্যাদা কাজে লাগানোর গুরুত্ব অনুধাবন করবে। কিন্তু তখন শুধু 'সময়' নামক পরিভাষাটি তার হাতে থাকবে না। এই প্রসঙ্গে কুরআনে দুটো সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যখন মানুষ সময় অপচয়ের জন্য খুব আফসোস করবে, কিন্তু তার আফসোস আর কোনো কাজে আসবে না।
প্রথম অবস্থা : মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে। যখন মানুষ দুনিয়াকে পেছনে ফেলে আখিরাতে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হবে, তখন সে চাইবে-যদি তাকে একটুখানি সময় ভিক্ষা দেওয়া হতো! যদি তার মৃত্যুকে একটু পিছিয়ে দেওয়া হতো! জীবনে সে যা ভুল করেছে, সব ঠিকঠাক করে দিয়ে আসত। যা ছেড়ে এসেছে তা পূর্ণ করে দিত। এ প্রসঙ্গে কুরআন বলে- 'হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের ধন- মাল এবং সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর জিকির থেকে উদাসীন না করে। যারা সে রকম হবে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগেই তোমাদের আমরা যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো। তা না হলে মৃত্যু এলে বলবে- "আমার প্রভু! আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দাও, যাতে আমি দান করতে পারি এবং পুণ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।" সূরা মুনাফিকুন : ৯-১০
তার এই ফাঁকা বাসনার জবাব দেওয়া হবে একটি- 'যখন কারও নির্ধারিত সময় উপস্থিত হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে আর (এক মুহূর্তও) আকাশ দেবেন না। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।' সূরা মুনাফিকুন : ১১
দ্বিতীয় অবস্থা : আখিরাতে, যখন মানুষ তার সকল কাজের ফলাফল হাতে পেয়ে যাবে। তার সকল অর্জনের প্রতিদান দেওয়া হয়ে যাবে। জান্নাতের অধিবাসী জান্নাতে প্রবেশ করবে। জাহান্নামের অধিবাসী জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা আকাঙ্ক্ষা করবে, যদি তাদের আবারও দুনিয়ার জীবনে পাঠানো হতো! তখন তারা তাদের জীবনকে আমল সালেহ দিয়ে সাজিয়ে নিত। আফসোস! তারা তখন নতুন জীবনের তালাশে ব্যস্ত। অথচ কর্মের সময় শেষ হয়ে প্রতিদানের সময় শুরু হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন- 'আর যারা কুফরি করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। সেখানে তাদের জন্য মৃত্যুর ফয়সালা দেওয়া হবে না। ফলে তারা আর মরবে না এবং তাদের থেকে আজাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমরা শাস্তি দেবো প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে। তারা সেখানে আর্তনাদ করে বলবে- "প্রভু! আমাদের এখন থেকে বের করে নাও। এত দিন আমরা যে আমল করেছি, তার পরিবর্তে আমরা এখন থেকে পুণ্য কাজ করব।" (আল্লাহ বলবেন) "আমরা কি তোমাদের একটা দীর্ঘ জীবন দিইনি, যাতে কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারত? তা ছাড়া তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং এখন আস্বাদন করো আজাব, জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।"' সূরা ফাতির : ৩৬-৩৭
বিদ্রূপাত্মক এক প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের থামিয়ে দেওয়া হবে- 'আমি কি তোমাদের একটা বয়স দিইনি, যাতে চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীর আগমন করেছিল।' সূরা ফাতির : ৩৭
তারা আর কোনো জবাব খুঁজে পাবে না। কারণ, তখন আল্লাহ কৈফিয়ত প্রদানের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি প্রত্যেক মানুষকে নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে তখন অমনোযোগী হয়েছে, তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। বিশেষ করে যারা ৬০ কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়স পেয়েছেন, তাদের জন্য সাবধান হওয়ার এটাই যথেষ্ট সময়। সে যে বয়স পেয়েছে, তা একজন অন্যমনস্কের সতর্ক হওয়া, বিভ্রান্তি থেকে ফিরে আসা কিংবা পাপী ব্যক্তির তওবার জন্য যথেষ্ট। সহিহ হাদিসে এসেছে- 'আল্লাহ কোনো লোককে কোনো সংশোধনের সুযোগ দেন। এমনকী তাকে ৬০ বছর পর্যন্ত অবকাশ দিয়েছেন।' বুখারি : ৬৪১৯
📄 সময়ের সাথে মুসলমানের দায়বদ্ধতা
সময়ের এত বেশি গুরুত্বের কারণ হলো- প্রকৃতপক্ষে সময়ই জীবন। একজন মুসলিম মানুষের ওপর সময়ের সাথে বেশ কিছু দায়িত্ব চলে আসে। শুধু কিছু দায়িত্ব বললে ঠিক হবে না; বরং তার ওপর একগুচ্ছ দায়িত্ব আসে। তাকে সচেতনভাবে এই দায়িত্বগুলো উপলব্ধি করতে হবে। সর্বদা নিজ চোখের সামনে রাখতে হবে। আর সেটিকে উপলব্ধি ও জানার পর্যায় থেকে বিশ্বাস ও ইচ্ছার পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। আর সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বগুলো বাস্তবায়ন করেও দেখাতে হবে।
📄 সময় থেকে উপকৃত হওয়া
মুসলমানের প্রথম কথা হলো সময়কে সংরক্ষণ করা। প্রিয় সম্পদকে যেভাবে আগলে রাখা হয়, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে সময়কে আগলে রাখা জরুরি। সময়ের সবটুকু ব্যবহার করে উপকৃত হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা দরকার। দুনিয়ার অপচয় থেকে পরকালীন যেকোনো উপকারী সবব্যবহার করতে হবে। এমন কিছু করা দরকার যা জাতিকে কল্যাণ, সৌভাগ্য এবং আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।
আমাদের সালাফরা সবচেয়ে বেশি কৃপণ ছিলেন সময়ের ব্যাপারে। সময়ের মূল্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে সর্বাধিক মুনাফাভোগী ব্যবসায়ীর মতো তারা ছিলেন।
হাসান বসরি বলেছেন- 'আমি বেশ কিছু জাতির সঙ্গে মেলামেশা করেছি। তোমরা তোমাদের দিরহাম-দিনারের প্রতি যতটুকু মনোযোগী, তারা তাদের সময়ের প্রতি তার চেয়েও বেশি মনোযোগী।'
তাদের সর্বোতকরণে প্রচেষ্টা ছিল নিয়মতান্ত্রিক কর্মের মাধ্যমে নিজেদের সময়কে নির্মাণ করার। কিঞ্চিত পরিমাণ সময়ও যাতে অবান্তরজনক কাজে ব্যয় না হয়। উমর ইবনে আব্দুল আজিজ বলেন- 'রাত ও দিন তোমার মাঝে কাজ করে। তুমিও তাদের মাঝে কাজ করো।'
তারা বলতেন, সময়ের অপচয় করা অস্থিরতার আলামত। তারা আরও বলতেন- 'সময় একটি ধারালো তরবারি। যদি তুমি তাকে কাটতে না পারো, তাহলে সে তোমাকে কেটে ফেলবে।'