📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সন্তান প্রতিপালনে একক পদ্ধতি

📄 সন্তান প্রতিপালনে একক পদ্ধতি


সন্তান প্রতিপালনে পিতা-মাতার একক পদ্ধতি অবলম্বনের ব্যাপারে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, এমন যেন না হয়- পিতা সন্তানের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করবে, আর মাতা শুধু আদর-সোহাগের নীতি অবলম্বন করবে; বরং তাদের উভয়ের উচিত মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। অতিরিক্ত কঠোরতা নয়, আবার বাড়াবাড়ি রকমের আদর সোহাগও করা যাবে না। কারণ, মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা সন্তানের ব্যক্তিত্বের ওপর আঘাত হানে, অপমানিত করে। এতে লাঞ্চনা অনুভব হয় এবং নিজেকে অবহেলিত ভাবে। এর কারণে তার মাঝে বিভিন্ন মানসিক রোগ দেখা দেয়। ফলে অনেক সময় সন্তান অস্বাভাবিকতা নিয়ে গড়ে ওঠে। আবার কখনো তার মাঝে সমাজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় এবং তার মধ্যে অন্যায় ও অপরাধের প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয়।

ইসলাম আমাদের সকল মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ এবং কঠোরতার পরিবর্তে কোমল আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। কারণ, যেকোনো বিষয়ে কোমলতা থাকলে তা সুন্দরই হয়। আর কঠোরতা থাকলে তা আর সুন্দর থাকে না। আল্লাহ তায়ালা সবকিছুতে কোমলতা পছন্দ করেন; এমনকী বিরোধীপক্ষ ও শত্রুদের সাথেও। অতএব, মুমিনগণ যে সন্তানকে চোখের প্রশান্তি বানানোর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তার ব্যাপারে কতটুকু কোমলতা করা উচিত- তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। কুরআনে এসেছে- 'যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো।' সূরা ফুরকান: ৭৪

একবার এক বেদুইন নেতা দেখলেন, আল্লাহর রাসূল তাঁর নাতিকে আদর করে চুমু দিচ্ছেন। এতে বেদুইন নেতা বিস্ময় প্রকাশ করলে রাসূল তা অপছন্দ করেন। তখন অপর একজন সাহাবি নবি -কে বললেন- 'আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু তাদের কাউকে কখনোই চুমু খাইনি!' তখন রাসূল বললেন, 'যে অপরের প্রতি দয়া করে না, সে দয়াপ্রাপ্ত হয় না।' বুখারি: ৫৯৯৭, মুসলিম: ২৩১৮

'হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-এর কাছে এক বেদুইন এসে বলল, "আপনারা শিশুদের চুমু দেন, অথচ আমরা তাদের চুমু দিই না!" তখন রাসূল বললেন- "আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নিলে আমি কি তোমার জন্য কিছু করতে পারব?" বুখারি : ৫৯৯৮

শিশুদের অন্যতম অধিকার হলো- তাদের জন্য যথেষ্ট খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া। যেন সে খেলার আগ্রহ মেটাতে পারে। এটি তার মাঝে আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক স্বভাব। কারণ, তার মাঝে রয়েছে অনেক শক্তি, খেলাধুলার মাধ্যমে সেই শক্তি কাজে লাগাতে চায়। এর ফলে তার পেশি শক্তিশালী হয়। শরীরচর্চা হয়। কাজে প্রাণচঞ্চলতার সৃষ্টি হয় এবং আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়। সমবয়সি শিশুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। সম্ভব হলে পিতা নিজেও তার সাথে খেলায় অংশগ্রহণ করবে। খেলার ভান করে হলেও শরিক হবে।

কোনো একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বলেছিলেন- 'সাত বছর বয়সে তোমার ছেলের সঙ্গে খেলাধুলা করো, সেই বয়সে তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দাও এবং তখন তার সাথে ভাইয়ের মতো আচরণ করো, তারপর তার রশি ছেড়ে দাও।'

বর্তমান যুগে বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলনা বেরিয়েছে, যেগুলোতে বুদ্ধি ব্যবহার করতে হয়। ছোটো সন্তানদের জন্য এসব খেলনার ব্যবস্থা করাও উত্তম। আধুনিক যুগের আবিষ্কার কমপিউটারে বিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে, সন্তানের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী এমন সব খেলা বাছাই করে দেওয়া, যা ধর্ম ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল্লাহর রাসূল শিশুদের সঙ্গে খেলতেন। তিনি নাতিদের পিঠে চড়াতেন; এমনকী নামাজ ও সিজদারত অবস্থায়ও। একবার সিজদারত অবস্থায় তাঁর নাতি হাসান বা হোসাইন পিঠে উঠে বসল, তখন সিজদাহ এত দীর্ঘ করলেন যে, সাহাবাগণ কোনো কিছু ঘটার আশঙ্কা করলেন। অতঃপর তিনি সিজদাহ হতে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন। তখন সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, সিজদাহ এত দীর্ঘ করার কারণ কী? উত্তরে রাসুল ﷺ বললেন- 'আমার নাতি পিঠে উঠে বসেছিল। তাকে দ্রুত নামিয়ে দিতে অপছন্দ করছিলাম।'

তিনি নাতিকে জোর করে পিঠ থেকে নামিয়ে দিতে চাননি। তিনি চাননি তার পিঠে চড়ার মজা শেষ হয়ে যাক; বরং তাকে সুযোগ দিয়েছেন, যেন সে পিঠে আরোহণের মজা উপভোগ করে তৃপ্ত হয়। অতঃপর নিজ থেকে নেমে পড়ে!

তিনি আবু তালহার ছেলের সঙ্গে দুষ্টুমি করতেন এবং বলতেন- 'হে আবু উমাইর, তোমার নুগাইর (ছোটো পাখি) এর কী খবর?' বুখারি, মুসলিম

একদিকে যেমন সন্তান প্রতিপালনে মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা অপ্রয়োজনীয় ও অগ্রহণযোগ্য, তেমনি অতিরিক্ত আদর-সোহাগ করাও অনুচিত। অতএব, সন্তানকে এ যুক্তিতে নিজের খেয়ালমতো চলতে দেওয়া উচিত নয় যে, সে প্রথম সন্তান বা ছেলে সন্তান অথবা একমাত্র ছেলে বা একমাত্র সন্তান কিংবা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান; বরং তার ভুল শুধরিয়ে দেওয়া কর্তব্য। অন্যায় আচরণের জন্য শাসন করা জরুরি। বিশেষ করে যদি একই অন্যায় বারবার করে। তবে তা করতে হবে অত্যন্ত সুন্দর ও কোমলতার সঙ্গে। যেন উলটো জটিলতার সৃষ্টি না হয়। অনেক সময় আমরা ভুলের মাধ্যমে ভুল শোধরানোর চেষ্টা করি। আবার কখনো গুরুতর ভুলের মাধ্যমে সাধারণ ভুল ঠিক করতে যাই!

সন্তান যেন বুঝতে পারে, পিতা-মাতা উভয়েই তার প্রতি ন্যায়বিচার করছে। সে যেন কোনো কিছুতেই পক্ষপাতিত্ব বা জুলুম অনুভব না করে। সালফে সালেহিনগণ প্রত্যেকটা বিষয়ে, এমনকী আদরের ক্ষেত্রেও সন্তানের মাঝে সমতা বজায় রাখতেন। কারণ, সন্তান যদি বুঝতে পারে কাকে বেশি ভালোবাসে, তবে তার প্রতি মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়; এমনকী পিতা-মাতার প্রতিও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।

কুরআনে ইয়াকুব (আ.)-এর সাথে ইউসুফ (আ.) ও তাঁর ভাই বেনিয়ামিনের ঘটনা এসেছে। অন্য ভাইদের তুলনায় তাদের প্রতি পিতার অধিক ভালোবাসার কথা বর্ণিত হয়েছে। আরও বর্ণিত হয়েছে- উক্ত ভালোবাসা কীভাবে তাদের ভাইদের মনে খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। উক্ত প্রতিক্রিয়ার ফলে এমন অন্যায় ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছিল, যার প্রভাব কয়েক দশক পর্যন্ত ছিল।

এ জন্যই রাসূল ﷺ বলেন- 'তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার করো।'

কোনো একজন সাহাবি সন্তানকে বিশেষ অনুদান প্রদানের জন্য নবি ﷺ-কে সাক্ষী বানাতে চাইলেন। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন- 'তুমি কি তোমার প্রত্যেক সন্তানকে এমন অনুদান প্রদান করেছ?' জবাবে তিনি বললেন- 'না।' অতঃপর রাসূল বললেন- 'এ ব্যাপারে আমি ছাড়া অন্য কাউকে সাক্ষী বানাও। কারণ, আমি জুলুমের ওপর সাক্ষী হব না।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px