📄 পিতৃত্বের দাবি ত্যাগ
এমন অনেক পিতা রয়েছে, যারা জীবিত অবস্থায় স্বেচ্ছায় পিতৃত্বের দাবি ত্যাগ করে। পিতৃত্ব পরিত্যাগ করা জায়েজ নেই। কারণ, পিতার ওপর সন্তানদের অধিকার রয়েছে। পিতা কেন তার পিতৃত্ব ত্যাগ করবে? হতে পারে তিনি নিজের প্রবৃত্তি ও লালসা নিয়ে ব্যস্ত অথবা ধন-সম্পদ অর্জন ও সঞ্চয়ে মত্ত। সন্তানকে মায়ের কাছে ছেড়ে দিয়ে সম্পদের দুনিয়ায় অঙ্ক কষতে মগ্ন। আর ওদিকে মা একই সঙ্গে বাবা-মা দুজনের দায়িত্ব পালনে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের পিতা যেন জীবিত থেকেও মৃত, উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত; বরং এ ধরনের পিতা জীবিত থাকার চেয়ে মৃত্যুই সন্তানের জন্য অধিক কল্যাণকর। কারণ, মানুষ পিতৃহারা ইয়াতিমের প্রতি অনুগ্রহ করে, কিন্তু পিতার অবহেলিত সন্তানের প্রতি অনুগ্রহ করে না।
এমন দুর্ভাগা পিতা হয়তো লাখ লাখ কিংবা মিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ সঞ্চয় করতে পারে, কিন্তু এ সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলে নিজের আদরের সন্তানকে, যা স্পষ্টভাবে বড়ো ধরনের ক্ষতি। কারণ, সেই পিতা উত্তম জিনিসের বিনিময়ে ঠুনকো জিনিস গ্রহণ করছে।
এমন পিতাগণ নিজ সন্তানের ওপর জুলুম করছে। অনুরূপভাবে স্ত্রীর ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তার ওপরও জুলুম করেছে। অনেক সময় নারী চাকরিজীবী হয়। দিনের অধিকাংশ সময় তাকে কর্মক্ষেত্রে থাকতে হয়। অতঃপর ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে আবার ঘর সামলাতে হয়, সন্তানের যত্ন নিতে হয়। সন্তানের খাবার-দাবার, পোশাকাদি, পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা ও শিক্ষাসহ সবকিছুর খেয়াল রাখতে হয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য সন্তানকে ভোরবেলায় ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হয়। তাদের জন্য খাবার তৈরি করতে হয়। পড়ার কক্ষ, ঘুমের কক্ষ ইত্যাদি প্রস্তুত করতে হয়। ফলে সে নারী একাধারে মা, বাবা, চাকরানী, বাবুর্চি, সন্তান পালনকারিণী ও শিক্ষিকা! অথচ এসব দায়িত্বের ব্যাপারে বাবা একেবারই উদাসীন!
এটি স্পষ্ট জুলুম, যা অনেক পুরুষই করে থাকে। এটি স্ত্রীর ওপর জুলুম, সন্তানের ওপরও জুলুম। অথচ আল্লাহ তায়ালা জালিমদের পছন্দ করেন না।
📄 পিতা-মাতার স্নেহ বঞ্চিত সন্তান
উপর্যুক্ত অবস্থার চেয়ে আরও মারাত্মক অবস্থা হলো- পিতা-মাতা উভয়ে ব্যস্ততার কারণে আপন সন্তানের ব্যাপারে উদাসীন থাকা, তার কল্যাণের চিন্তা না করা, তাকে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা না দেওয়া এবং কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা অপ্রয়োজন তা না শেখানো।
তারা দুজনেই ব্যস্ত, বাবা ব্যস্ত ব্যবসা বা সম্পদ অর্জনের কাজে। মা ব্যস্ত নিজের রূপচর্চা : গালের রং, ঠোটের রং ও চুলের রঙে বৈচিত্র আনয়নে কিংবা টেলিফোন, বান্ধবী, পার্টি ইত্যাদি নিয়ে। ফলে সন্তান হয়ে উঠে বাবা-মাহারা। অথচ পিতা-মাতা উভয়ে জীবিত; তারা জমিনে দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে! এমনকী তারা সব কাজেই ভুমিকা রাখছে; কেবল পিতৃত্ব আর মাতৃত্বেই গাফলতি।
এমন সন্তানই প্রকৃত ইয়াতিম। যার ব্যাপারে কবিসম্রাট আহমদ শাওকী বলেছিলেন- 'সে ইয়াতিম নয়- যার পিতা-মাতা তাকে অসহায় রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। অতঃপর সে দুনিয়াতে তাদের বিকল্প পেয়ে সুন্দর শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেছে; বরং প্রকৃত ইয়াতিম তো সে-ই, যার মা তাকে ত্যাগ করেছে এবং বাবা ব্যস্ত রয়েছে।'
📄 সন্তানের উত্তম প্রতিপালনে পারস্পরিক দায়িত্ব
সন্তান প্রতিপালনে বাবা-মায়ের সম্পূরক দায়িত্ব হলো-
• আত্মিকভাবে তার মনে ঈমান ও ইবাদতের বীজ বপন করা।
• মানসিকভাবে তার মাঝে উত্তম জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো।
• চারিত্রিকভাবে উত্তম শিষ্টাচার ও আখলাক শিক্ষা দেওয়া।
• সামাজিকভাবে কল্যাণকর কাজ ও জনসেবার মানসিকতা গড়ে তোলা।
• রাজনৈতিক দিক থেকে স্বজাতি ও নিজ ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত হতে শেখানো।
• শিল্প-সংস্কৃতির জন্য তার মাঝে জগতের পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্যের অনুভূতি সৃষ্ট করা।
• ভাষাগত দিক থেকে স্বজাতির ভাষার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা, যেন সে ভাষা ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং মনের অনুভূতি উত্তমভাবে প্রকাশ করতে পারে।
সন্তানের এ ধরনের প্রতিপালন কঠিন দায়িত্ব। এ ব্যাপারে পিতা-মাতা দুজনই জিজ্ঞাসিত হবেন। যেমনিভাবে মহানবি ﷺ বলেছেন- 'তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম; যিনি জনগণের দায়িত্বশীল, তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল, সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর ঘরে পরিবার, সন্তান-সন্ততির ওপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।' বুখারি: ৮৯৩
এ দায়বদ্ধতা আল্লাহর কাছে, বিবেকের কাছে এবং সমাজের কাছে।
সন্তানের শৈশবে মায়ের দায়িত্ব বাবার চেয়ে বেশি। কারণ, তিনি সন্তানের কাছে বাবার চেয়ে বেশি সময় কাটান এবং সরাসরি দেখাশোনা করেন। এ জন্যই জ্ঞানী-গুণী, বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক ও কবিগণ মায়ের দায়িত্বের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য মাতৃক্রোড়কে সর্বপ্রথম বিদ্যাপীঠ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নীলনদের কবি হাফেজ ইবরাহিম তাই বলেছেন- 'মা এমন এক বিদ্যাপীঠ, যাকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করার মানে হলো উত্তম চরিত্রের একটি জাতি প্রস্তুত করা।'
সন্তান যত বড়ো হতে থাকে, পিতার দায়িত্বও তত বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে বাবার দায়িত্ব মায়ের চেয়ে বেশি হতে থাকে। কারণ, তখন সন্তানের জন্য দিক-নির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজন পড়ে তার আচার-আচরণের প্রতি নিবিড় পর্যবেক্ষণের। এসব দায়িত্ব প্রধানত পিতার ওপরই বর্তায়।
কোনো কোনো পিতা মনে করেন, তার দায়িত্ব কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত। অতঃপর সন্তানের কথা ভুলে যায়, কিছুই জানে না। এমনও অনেক পিতা রয়েছে, যারা জানেই না তার সন্তান কোন বিদ্যালয়ে পড়ে? কোন ক্লাসে পড়ে? সে পাশ করেছে, নাকি ফেল করেছে? সে বন্ধু-বান্ধব ছাড়া অন্তর্মুখী জীবনযাপন করছে, নাকি বন্ধু-বান্ধবে মত্ত? তার বন্ধুগণ খারাপ নাকি ভালো, অসুস্থ নাকি বিপথগামী?
এ ধরনের পিতাকে সন্তানের বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশে ডাকা হলে কখনো উপস্থিত হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সন্তানের আচার-আচরণের ব্যাপারে পত্র পাঠানো হলেও তার উত্তর প্রদান করে না। এমনকী পড়েও দেখে না। সন্তান কী সঠিক পথে চলল নাকি বিগড়ে গেল। পড়াশোনা করছে নাকি অবহেলা করছে- এসব ব্যাপারেও তার কোনো মাথাব্যথা নেই।
কোনো কোনো পিতা মনে করে, তার দায়িত্ব কেবল সন্তানের বস্তুগত চাহিদা মেটানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ তার জন্য ভালো খাবার, উত্তম পোশাক, সুন্দর বাড়ি ও গাড়ির ব্যবস্থা করা এবং এসবের বিলাসবহুল আয়োজন করাই কেবল পিতার দায়িত্ব! সন্তান যত অর্থ চায়, তা-ই দিয়ে দেয়। কোনো দাবি-ই অপূর্ণ রাখে না। ছোটো-বড়ো সব আবদারই পূরণ করে। অথচ এসবের মাধ্যমে তাকে মূলত অন্যায়ের প্রতি-ই উৎসাহিত করা হয়। যেমনিভাবে কবি আবুল আতাহিয়া বলেন- 'যৌবন, অবসর ও সম্পদের সুলভ্যতা একজন মানুষের নষ্ট হওয়ার জন্য অনেক বড়ো কারণ।'
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ ধরনের পিতা সন্তানের সব মনোবাসনা পূরণ করে মনে করে- সন্তানের প্রতি সকল কর্তব্য পালন করা হয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা স্বামী ও বাবাদের লক্ষ করে বলেন- 'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।' সূরা তাহরিম : ৬
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ যাদের ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞেস করবেন, সন্তান-সন্ততি তার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা পিতাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা নিজেদের এবং পরিবারকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করে। তারা যেন কেবল খাওয়া, পরিধান এবং অন্যান্য বস্তুগত চাহিদা পূরণ করাকেই যথেষ্ট মনে না করে।
এ জন্য এ আয়াতের তাফসিরে হজরত আলি বলেন- 'তাদের কল্যাণকর বিষয় শিক্ষা দান করো।' জাদুল মাসির
রাসূল ﷺ হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- 'সন্তানের জন্য পিতার পক্ষ হতে সুন্দর শিষ্টাচারের চেয়ে উত্তম দান আর কিছু হতে পারে না।' তিরমিজি ও হাকিম
যে পিতা তার সন্তানদের ভালোবাসে, স্নেহ করে, তার কর্তব্য হলো তাদের জাহান্নাম হতে রক্ষা করা। জাহান্নাম হতে রক্ষা করার অর্থ হলো- তাদের জাহান্নামে যেতে বাধা দেওয়া। বাধা দেওয়ার পদ্ধতি হলো- নাফরমানি, বড়ো গুনাহ, নিষিদ্ধ কাজ এবং ফরজ তরক করা হতে রক্ষা করা। অনুরূপভাবে তাদের ছোটোবেলা থেকে আল্লাহ তায়ালা, পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, পূর্ণ সমাজ ও নিজের প্রতি দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা। এই শিক্ষা তাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে এবং জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে সফল হবে।' সূরা আলে ইমরান : ১৮৫
📄 সন্তান প্রতিপালনে একক পদ্ধতি
সন্তান প্রতিপালনে পিতা-মাতার একক পদ্ধতি অবলম্বনের ব্যাপারে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, এমন যেন না হয়- পিতা সন্তানের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করবে, আর মাতা শুধু আদর-সোহাগের নীতি অবলম্বন করবে; বরং তাদের উভয়ের উচিত মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। অতিরিক্ত কঠোরতা নয়, আবার বাড়াবাড়ি রকমের আদর সোহাগও করা যাবে না। কারণ, মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা সন্তানের ব্যক্তিত্বের ওপর আঘাত হানে, অপমানিত করে। এতে লাঞ্চনা অনুভব হয় এবং নিজেকে অবহেলিত ভাবে। এর কারণে তার মাঝে বিভিন্ন মানসিক রোগ দেখা দেয়। ফলে অনেক সময় সন্তান অস্বাভাবিকতা নিয়ে গড়ে ওঠে। আবার কখনো তার মাঝে সমাজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় এবং তার মধ্যে অন্যায় ও অপরাধের প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয়।
ইসলাম আমাদের সকল মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ এবং কঠোরতার পরিবর্তে কোমল আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। কারণ, যেকোনো বিষয়ে কোমলতা থাকলে তা সুন্দরই হয়। আর কঠোরতা থাকলে তা আর সুন্দর থাকে না। আল্লাহ তায়ালা সবকিছুতে কোমলতা পছন্দ করেন; এমনকী বিরোধীপক্ষ ও শত্রুদের সাথেও। অতএব, মুমিনগণ যে সন্তানকে চোখের প্রশান্তি বানানোর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তার ব্যাপারে কতটুকু কোমলতা করা উচিত- তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। কুরআনে এসেছে- 'যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো।' সূরা ফুরকান: ৭৪
একবার এক বেদুইন নেতা দেখলেন, আল্লাহর রাসূল তাঁর নাতিকে আদর করে চুমু দিচ্ছেন। এতে বেদুইন নেতা বিস্ময় প্রকাশ করলে রাসূল তা অপছন্দ করেন। তখন অপর একজন সাহাবি নবি -কে বললেন- 'আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু তাদের কাউকে কখনোই চুমু খাইনি!' তখন রাসূল বললেন, 'যে অপরের প্রতি দয়া করে না, সে দয়াপ্রাপ্ত হয় না।' বুখারি: ৫৯৯৭, মুসলিম: ২৩১৮
'হজরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-এর কাছে এক বেদুইন এসে বলল, "আপনারা শিশুদের চুমু দেন, অথচ আমরা তাদের চুমু দিই না!" তখন রাসূল বললেন- "আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে দয়া উঠিয়ে নিলে আমি কি তোমার জন্য কিছু করতে পারব?" বুখারি : ৫৯৯৮
শিশুদের অন্যতম অধিকার হলো- তাদের জন্য যথেষ্ট খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া। যেন সে খেলার আগ্রহ মেটাতে পারে। এটি তার মাঝে আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক স্বভাব। কারণ, তার মাঝে রয়েছে অনেক শক্তি, খেলাধুলার মাধ্যমে সেই শক্তি কাজে লাগাতে চায়। এর ফলে তার পেশি শক্তিশালী হয়। শরীরচর্চা হয়। কাজে প্রাণচঞ্চলতার সৃষ্টি হয় এবং আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়। সমবয়সি শিশুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। সম্ভব হলে পিতা নিজেও তার সাথে খেলায় অংশগ্রহণ করবে। খেলার ভান করে হলেও শরিক হবে।
কোনো একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বলেছিলেন- 'সাত বছর বয়সে তোমার ছেলের সঙ্গে খেলাধুলা করো, সেই বয়সে তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দাও এবং তখন তার সাথে ভাইয়ের মতো আচরণ করো, তারপর তার রশি ছেড়ে দাও।'
বর্তমান যুগে বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলনা বেরিয়েছে, যেগুলোতে বুদ্ধি ব্যবহার করতে হয়। ছোটো সন্তানদের জন্য এসব খেলনার ব্যবস্থা করাও উত্তম। আধুনিক যুগের আবিষ্কার কমপিউটারে বিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে, সন্তানের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী এমন সব খেলা বাছাই করে দেওয়া, যা ধর্ম ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল্লাহর রাসূল শিশুদের সঙ্গে খেলতেন। তিনি নাতিদের পিঠে চড়াতেন; এমনকী নামাজ ও সিজদারত অবস্থায়ও। একবার সিজদারত অবস্থায় তাঁর নাতি হাসান বা হোসাইন পিঠে উঠে বসল, তখন সিজদাহ এত দীর্ঘ করলেন যে, সাহাবাগণ কোনো কিছু ঘটার আশঙ্কা করলেন। অতঃপর তিনি সিজদাহ হতে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন। তখন সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, সিজদাহ এত দীর্ঘ করার কারণ কী? উত্তরে রাসুল ﷺ বললেন- 'আমার নাতি পিঠে উঠে বসেছিল। তাকে দ্রুত নামিয়ে দিতে অপছন্দ করছিলাম।'
তিনি নাতিকে জোর করে পিঠ থেকে নামিয়ে দিতে চাননি। তিনি চাননি তার পিঠে চড়ার মজা শেষ হয়ে যাক; বরং তাকে সুযোগ দিয়েছেন, যেন সে পিঠে আরোহণের মজা উপভোগ করে তৃপ্ত হয়। অতঃপর নিজ থেকে নেমে পড়ে!
তিনি আবু তালহার ছেলের সঙ্গে দুষ্টুমি করতেন এবং বলতেন- 'হে আবু উমাইর, তোমার নুগাইর (ছোটো পাখি) এর কী খবর?' বুখারি, মুসলিম
একদিকে যেমন সন্তান প্রতিপালনে মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা অপ্রয়োজনীয় ও অগ্রহণযোগ্য, তেমনি অতিরিক্ত আদর-সোহাগ করাও অনুচিত। অতএব, সন্তানকে এ যুক্তিতে নিজের খেয়ালমতো চলতে দেওয়া উচিত নয় যে, সে প্রথম সন্তান বা ছেলে সন্তান অথবা একমাত্র ছেলে বা একমাত্র সন্তান কিংবা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান; বরং তার ভুল শুধরিয়ে দেওয়া কর্তব্য। অন্যায় আচরণের জন্য শাসন করা জরুরি। বিশেষ করে যদি একই অন্যায় বারবার করে। তবে তা করতে হবে অত্যন্ত সুন্দর ও কোমলতার সঙ্গে। যেন উলটো জটিলতার সৃষ্টি না হয়। অনেক সময় আমরা ভুলের মাধ্যমে ভুল শোধরানোর চেষ্টা করি। আবার কখনো গুরুতর ভুলের মাধ্যমে সাধারণ ভুল ঠিক করতে যাই!
সন্তান যেন বুঝতে পারে, পিতা-মাতা উভয়েই তার প্রতি ন্যায়বিচার করছে। সে যেন কোনো কিছুতেই পক্ষপাতিত্ব বা জুলুম অনুভব না করে। সালফে সালেহিনগণ প্রত্যেকটা বিষয়ে, এমনকী আদরের ক্ষেত্রেও সন্তানের মাঝে সমতা বজায় রাখতেন। কারণ, সন্তান যদি বুঝতে পারে কাকে বেশি ভালোবাসে, তবে তার প্রতি মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়; এমনকী পিতা-মাতার প্রতিও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।
কুরআনে ইয়াকুব (আ.)-এর সাথে ইউসুফ (আ.) ও তাঁর ভাই বেনিয়ামিনের ঘটনা এসেছে। অন্য ভাইদের তুলনায় তাদের প্রতি পিতার অধিক ভালোবাসার কথা বর্ণিত হয়েছে। আরও বর্ণিত হয়েছে- উক্ত ভালোবাসা কীভাবে তাদের ভাইদের মনে খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। উক্ত প্রতিক্রিয়ার ফলে এমন অন্যায় ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছিল, যার প্রভাব কয়েক দশক পর্যন্ত ছিল।
এ জন্যই রাসূল ﷺ বলেন- 'তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার করো।'
কোনো একজন সাহাবি সন্তানকে বিশেষ অনুদান প্রদানের জন্য নবি ﷺ-কে সাক্ষী বানাতে চাইলেন। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন- 'তুমি কি তোমার প্রত্যেক সন্তানকে এমন অনুদান প্রদান করেছ?' জবাবে তিনি বললেন- 'না।' অতঃপর রাসূল বললেন- 'এ ব্যাপারে আমি ছাড়া অন্য কাউকে সাক্ষী বানাও। কারণ, আমি জুলুমের ওপর সাক্ষী হব না।'