📄 মানুষের দীর্ঘ শৈশবকাল
অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের শৈশবকাল বেশ দীর্ঘ। কোনো কোনো প্রাণী বা পাখি জন্মের সাথে সাথেই চলাফেরা করতে পারে। গরুর বাছুর জন্মের পরেই চার পায়ে দাঁড়াতে পারে। অনুরূপভাবে মুরগির বাচ্চা; ডিম থেকেই যেন তার চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন যে, হাঁটা-চলা ও কথা বলতে পারা এবং বুঝ ও ভালো-মন্দের পার্থক্য জ্ঞান আসা পর্যন্ত মানুষের জন্য প্রয়োজন যত্ন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-দীক্ষা, লালন-পালন ও আদব-কায়দার অনুশীলন। আর এসবের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ সময়ে পিতা-মাতা তাকে ধীরে ধীরে প্রতিপালন করবে এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেবে, যেন সে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে।
যে পিতা-মাতা সন্তানকে জন্ম দিয়েছে, তাদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব। যেমনি আছে সন্তানের বৈষয়িক দিকসমূহ দেখার দায়িত্ব, তেমনি রয়েছে তাদের আদব-আখলাক ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি দেখার দায়িত্বও।
পিতা-মাতার সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো- সন্তানের দুগ্ধ পানের ব্যবস্থা করা। স্বভাবগতভাবে ও মাতৃত্বের টানে মা তার সন্তানকে দুধ পান করান। যে বয়সে সন্তানের খাবার চর্বণ করার উপযোগী দাঁত থাকে না এবং শক্ত খাবার হজম করার সামর্থ্য থাকে না, সে সময় তার খাবারের জন্য আল্লাহ তায়ালা মায়ের বুকে দুধ সঞ্চার করে দেন। কিন্তু তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা শরীরের ফিটনেস এবং স্তনের উত্থান বজায় রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ পান না করে কৃত্রিম দুধ পান করানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছে! অথচ কৃত্রিম দুধ কখনো বুকের দুধের বিকল্প হতে পারে না। সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মানে কেবল তার পেটে দুধ পৌঁছানো নয়; বরং এর অর্থ তার চেয়েও গভীর। এর ফলে সন্তান মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে স্নেহের উষ্ণতা অনুভব করে। তাকে জড়িয়ে ধরে একদিকে স্তন থেকে খাবার গ্রহণ করে, অন্যদিকে হৃদয় ও আত্মার উষ্ণতা থেকে মানসিক পুষ্টি গ্রহণ করে।
📄 তালাকপ্রাপ্ত মায়ের কর্তব্য
কোনো কোনো সময় নারী তার সন্তানের পিতা কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। এরূপ পরিস্থিতিতে স্ত্রী স্বামীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বা হয়রানি করার জন্য সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকে। এতে সে সন্তানের কোনো কষ্ট বা ক্ষতির পরোয়া করে না। এ ব্যাপারে কুরআনুল কারিমের সূরা বাকারায় একটি আয়াত এসেছে, যাতে মায়েদের সন্তানের দুধ পানের অধিকার আদায়ের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর জন্মদাতা পিতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা সন্তানের দুধ পান করানোর পূর্ণ সময়কালে মায়ের ব্যয়ভার বহন করে। পিতা যদি মারা যায়, তবে তার উত্তরাধিকারীগণ ব্যয়ভার বহন করবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ানোর পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়। আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ, পিতার ওপর সে সমস্ত নারীর খোরপোষের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন করা হয় না। আর মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। যার সন্তান, তাকেও তার সন্তানের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন করা যাবে না। ওয়ারিশদের ওপরও একই দায়িত্ব। তারপর যদি পিতা-মাতা ইচ্ছা করে, তাহলে দুই বছরের ভেতরেই নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শক্রমে দুধ ছাড়িয়ে দিতে পারে, তাতে তাদের কোনো পাপ নেই। আর যদি তোমরা কোনো ধাত্রীর দ্বারা নিজের সন্তানদের দুধ খাওয়াতে চাও, তাহলে যদি তোমরা সাব্যস্তকৃত প্রচলিত বিনিময় দিয়ে দাও, তাতেও কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখ, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ অত্যন্ত ভালো করেই দেখেন।' সূরা বাকারাহ : ২৩৩
কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে- এ আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত মায়েদের কথা বলা হয়েছে। কারণ, এখানে পূর্বাপর আলোচনা তালাকসংক্রান্ত বিধিবিধান নিয়ে। আর তাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখের কারণ, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের পর পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ দেখা দেয়। ফলে তখন নারী হয়তো সন্তানকে দুটো কারণে অবহেলা করে- এক: সন্তানকে কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে স্বামীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। দুই: হয়তো সে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় বলে সন্তানকে অবহেলা করে! তাই মহান আল্লাহ তায়ালা সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য তালাকপ্রাপ্ত মায়েদের আহ্বান করেছেন।
ইমাম রাজি (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে বলেন- আল্লাহ তায়ালা একদিকে যেমন সন্তানের যত্নের বিষয়ে মাকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: 'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে।' তেমনিভাবে মায়ের প্রতি খেয়াল রাখার জন্য পিতাকেও নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সে সন্তানের যত্ন নিতে সক্ষম হয়। এ জন্য পিতাকে ন্যায়সংগতভাবে খোরপোষ বহন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এটি হচ্ছে সন্তান প্রতিপালনে পিতা-মাতার পারস্পরিক সহযোগিতার দৃষ্টান্ত।
অতঃপর ইমাম রাজি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন। তা হলো- আল্লাহ তায়ালা প্রথমে মাকে সন্তানের যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর পিতাকে মায়ের যত্ন নিতে বলেছেন। এতে বোঝা যায়, সন্তান প্রতিপালনের জন্য পিতার চেয়ে মাতার প্রয়োজন অধিক বেশি। কারণ, সন্তান প্রতিপালনে মায়ের কোনো মাধ্যম লাগে না। অথচ সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য পিতার মাধ্যমের প্রয়োজন। কারণ, সন্তানকে দুধ পান করানোর জন্য হয়তো অর্থের বিনিময়ে কোনো নারীকে নিযুক্ত করতে হয় এবং খোরপোষ বহন করতে হয়। এতে বোঝা যাচ্ছে, মায়ের অধিকারে পিতার অধিকারের চেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে অনেক প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে।
ইমাম রাজি এ বিষয়ে তৃতীয় আরেকটি মাসয়ালা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন- এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, পিতা-মাতা দুজনের সম্মতি এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শ ব্যতীত দুই বছরের কমে দুধ ছাড়ানো জায়েজ নেই। কারণ, মা হয়তো কখনো বিরক্ত হয়ে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা করবে। আবার পিতাও হয়তো কখনো খরচ প্রদানে বিরক্ত হয়ে দুধ ছাড়ানোর জন্য বলবে! কিন্তু নিজের প্রয়োজনের খাতিরে সন্তানের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে দুজনের একমত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। একমত হলেও, অন্যের সাথে পরামর্শ করতে হবে। কারণ, শিশুর ক্ষতি করার ব্যাপারে সকলে একমত হওয়া প্রায় অসম্ভব।
দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে দুধ ছাড়ানোর জন্য সকলে একমত হলে বুঝতে হবে, এতে শিশুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মহান আল্লাহ শিশুদের ক্ষতি হতে রক্ষা করার জন্য কতক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন! অতঃপর সকল শর্ত পূরণ হওয়ার পরও সরাসরি অনুমতি দেননি; বরং বলেছেন- তাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। এতে বোঝা যায়- যে মানুষ যত বেশি দুর্বল, তার প্রতি আল্লাহর রহমত ও যত্ন তত বেশি।
📄 মায়ের অধিকার
ইসলামি শরিয়তে সন্তানকে শৈশব অবস্থায় খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পিতা-মাতার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটলে এবং বিবাদমান অবস্থায় সন্তানের হক বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তখন সন্তান প্রতিপালনের বিধান কী হবে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সন্তানকে কে প্রতিপালন করবে- মা নাকি বাবা? কোন বয়স পর্যন্ত কে প্রতিপালন করবে এবং প্রতিপালিত সন্তানের খরচ কে বহন করবে ইত্যাদি বিধানসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম আবু দাউদ (রহ.) তাঁর (সুনান) গ্রন্থে সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর হতে বর্ণনা করেন- 'একবার এক মহিলা রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বলল- “হে আল্লাহর রাসূল! এই সন্তানের জন্য আমার পেট ছিল থাকার স্থান। আমার স্তন তার পানপাত্র, আর আমার কোল তার আশ্রয়স্থল। তার পিতা আমাকে তালাক দিয়েছে। এখন সে আমার সন্তানকে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে!” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন- (পুনরায় অন্যত্র) বিয়ে করা পর্যন্ত তুমিই তার বেশি হকদার।'
উপর্যুক্ত নারী সুন্দরভাবে সেই সকল কারণ উপস্থাপন করেছেন, যেগুলোর কারণে সন্তান প্রতিপালনে তার অধিকার তালাকদাতা স্বামীর চেয়ে বেশি। আল্লাহর রাসূলও ﷺ সেসবের প্রতি খেয়াল করে তাকে সন্তান প্রতিপালনের বেশি হকদার বলে ঘোষণা করেন।
আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) তাঁর নিজস্ব বর্ণনাসূত্রে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- 'উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ছেলে আসেমের মাতা আনসারি স্ত্রীকে তালাক দিলেন। অতঃপর মুহাসসার নামক স্থানে (মদিনা ও কুবার মাঝামাঝি বাজার) ছেলেসহ প্রাক্তন স্ত্রীকে দেখতে পেলেন। তখন আসেম দুধছাড়া হয়েছিল এবং হাঁটছিল।'
হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছেলেকে নেওয়ার জন্য হাত ধরলেন। তখন ছেলের মাও তাকে টেনে নিতে উদ্ধত হলো। এমন পরিস্থিতিতে ছেলেটি ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠল। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- আমি তোমার চেয়ে বেশি হকদার। এ পরিস্থিতির সমাধানে তারা উভয়ে খলিফা আবু বকর -এর কাছে বিচার দিলেন। খলিফা ছেলের ব্যাপারে মায়ের পক্ষে রায় দিলেন। সেইসঙ্গে উমর -কে বললেন- ছেলে যুবক হয়ে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাউকে বেছে নেওয়া পর্যন্ত তার জন্য মায়ের ঘ্রাণ, বিছানা এবং কোল তোমার চেয়ে উত্তম।
যেহেতু অন্যত্র বিবাহ করা পর্যন্ত সন্তানের প্রতিপালনের অধিকার তার মায়ের, অতএব তার উচিত হবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মাঝে মাঝে পিতাকে সন্তানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া। সন্তানকে পিতার সাথে দেখা করতে বাধা দেওয়া জায়েজ নেই। এমনিভাবে তার মাথায় এমন সব কথা ঢুকিয়ে দেওয়াও জায়েজ নেই, যার ফলে সে পিতা ও পিতার আত্মীয়স্বজনকে অপছন্দ করে; কিছু মা যেমনটি করে থাকে। কারণ, ভবিষ্যতে সন্তান তার পিতা থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না। সে তাদেরই একজন এবং তারা একই রক্তের। আরব কবি বলেছিলেন-
'তোমার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক রাখো, তোমার ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্ক রাখো। কারণ, যার ভাই নেই- সে ওই ব্যক্তির মতো, যে অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধে নেমেছে। আর জেনে রেখ- কোনো ব্যক্তির চাচাতো ভাই হলো তার জন্য ডানাস্বরূপ ঈগল পাখি কি ডানা ছাড়া দাঁড়াতে পারে?'
অনুরূপভাবে সন্তান যখন নির্দিষ্ট বয়সের পর পিতার নিকট ফিরে আসবে, তখন পিতার কর্তব্য হলো তাকে মায়ের সঙ্গে দেখা করা থেকে বঞ্চিত না করা। কারণ, এ ধরনের বাধা বা বঞ্চিতকরণ একজন মানুষের পক্ষ থেকে অপরের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ।
টিকাঃ
১. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ১২৬০
📄 ইয়াতিম শিশু প্রতিপালনের অধিকার
দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো শিশু যদি বালেগ হওয়ার পূর্বে পিতার মৃত্যুর কারণে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তাকে ইয়াতিম বলা হয়। তখন তার লালন-পালনের দায়িত্ব মুসলিম সমাজের ওপর বর্তায়। যদি সে দরিদ্র হয়, তবে তার ব্যয়ভার আত্মীয়স্বজন বহন করবে। আর যদি সে যদি ধনী হয়, তবে উত্তম উপায়ে তার সম্পদ বিনিয়োগ করবে।
যদি তার জিম্মাদারি নেওয়ার মতো আত্মীয়স্বজন না থাকে, তবে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজকে তার লালন-পালনের দায়িত্ব নিতে হবে। মুসলিমদের অভিভাবক নবি ﷺ বলেছেন- 'আমি প্রত্যেক মুসলিমের সত্তার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী, যে ব্যক্তি সম্পদ রেখে যাবে, তা হবে তার উত্তরাধিকারদের জন্য। আর যে ব্যক্তি কোনো ঋণ বা দরিদ্র ছোটো সন্তান রেখে যায়, তার দায়িত্ব আমার ওপর।'
এ কারণেই কুরআন কারিমে গনিমতের মালে ইয়াতিমের হক রাখা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসূলের, তাঁর আত্মীয়স্বজনের, ইয়াতিমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্য।' সূরা আল-হাশর : ৭
তিনি আরও বলেন- 'আর এ কথাও জেনে রেখ যে, কোনো বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনিমত হিসেবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর ও রাসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্মীয়স্বজনের জন্য এবং ইয়াতিম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য।' সূরা আনফাল : ৪১
ইসলামে ইয়াতিমের লালন-পালনকে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য হাসিলের জন্য অন্যতম মহান নেক আমল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেন- 'আমি ও ইয়াতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকব, এ কথা বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের প্রতি ইশারা করেন এবং এ দুটির মাঝে (সামান্য) ফাঁকা রাখেন।'
ইসলাম ইয়াতিমের ব্যাপারে মুসলিম সমাজের কাছে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দাবি করে-
• ইয়াতিমের সম্পদ থাকলে তা সংরক্ষণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত ইয়াতিমদের ধন-সম্পদের ধারে কাছেও যেয়ো না; তবে উত্তম পন্থায় যেতে পারো।' সূরা আনআম: ১৫২
যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তাদের ব্যাপারে কঠিন হুমকি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যারা ইয়াতিমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং শীঘ্রই তারা আগুনে প্রবেশ করবে।' সূরা আন-নিসা: ১০
• এটি প্রথমটির চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো, ইয়াতিমের ব্যক্তিত্বের প্রতি খেয়াল রাখা; তাকে ধমক না দেওয়া, কঠোর কথা না বলা এবং হেয় না করা। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'সুতরাং আপনি ইয়াতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।' সূরা আদ-দুহা: ৯
অন্যত্র বলেন- 'আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে বিচারদিবসকে মিথ্যা বলে? সে তো সেই ব্যক্তি, যে ইয়াতিমকে গলা ধাক্কা দেয়।' সূরা মাউন: ১-২
এভাবে ইয়াতিম শিশু কোনো সমস্যা ও মানসিক যন্ত্রণা ছাড়াই শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নিয়ে সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে পারবে। সে নিজেকে সমাজের অংশীদার মনে করতে শিখবে এবং নিজেকে হীন বা তুচ্ছ ভাবা থেকে বিরত থাকতে পারবে; বরং সে অনুভব করবে, সমাজ তার প্রতি খেয়াল রাখছে, তার হক আদায়ের জিম্মাদারি নিয়েছে এবং তার মর্যাদা সংরক্ষিত রয়েছে। বড়োরা তার সঙ্গে নিজ ছেলের মতো এবং ছোটোরা আপন ভাইয়ের মতো আচরণ করছে।