📄 অবিবাহিতা মাতৃকুল
আজ আধুনিক সভ্যতা যে অবাধ যৌনতার ঢেউ উথলে দিয়েছে, তার কারণেই অবিবাহিত মায়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এটি ব্যভিচারের প্রসারতা ও নারীদের অবৈধভাবে গর্ভধারণের ফল। এর ফলেই আজ ছেলেমেয়েরা প্রকৃত পিতা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। সে সকল কাপুরুষ পিতা, যারা সামান্য সময়ের জন্য হারাম উপায়ে সম্ভোগের পর দায়িত্বভার গ্রহণ করা থেকে পালিয়ে গেছে এবং সকল কষ্টের বোঝা বহন করার জন্য অসহায় নারীকে ত্যাগ করেছে। অথচ সন্তানটি তাদের দুজনেরই শাখা এবং উভয়ের সমন্বিত সম্ভোগের ফল।
📄 কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট
আরও বেশি নিকৃষ্ট ও জঘন্য ব্যাপার হলো- পিতা-মাতা উভয়ে জীবিত থাকা অবস্থায়ও কোনো শিশু তাদের থেকে বঞ্চিত হওয়া! অনেকে কোনো বৈধ বিবাহ ছাড়া সমাজের অগোচরে একত্রে বসবাস ও উপভোগ করছে। অতঃপর গর্ভ সঞ্চার হয়ে যখনই সন্তান প্রসবের সময় হচ্ছে, তখনই পুরুষ লোকটি নারীকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে।
সেই নারী সমাজের মুখোমুখি হওয়ার ভার নিতে না পেরে হয়তো সন্তানকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে কিংবা ইয়াতিমখানায় দিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পিতা-মাতা থাকা সত্ত্বেও সেই শিশু ইয়াতিমের-জীবনযাপন করছে। পিতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, নিজ পরিবারের পরিচয় সে দিতে পারে না। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর-স্নেহ করার মতো কোনো মাকে সে পায় না। এসবই হলো কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট!
📄 মানুষের দীর্ঘ শৈশবকাল
অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের শৈশবকাল বেশ দীর্ঘ। কোনো কোনো প্রাণী বা পাখি জন্মের সাথে সাথেই চলাফেরা করতে পারে। গরুর বাছুর জন্মের পরেই চার পায়ে দাঁড়াতে পারে। অনুরূপভাবে মুরগির বাচ্চা; ডিম থেকেই যেন তার চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন যে, হাঁটা-চলা ও কথা বলতে পারা এবং বুঝ ও ভালো-মন্দের পার্থক্য জ্ঞান আসা পর্যন্ত মানুষের জন্য প্রয়োজন যত্ন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-দীক্ষা, লালন-পালন ও আদব-কায়দার অনুশীলন। আর এসবের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ সময়ে পিতা-মাতা তাকে ধীরে ধীরে প্রতিপালন করবে এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেবে, যেন সে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে।
যে পিতা-মাতা সন্তানকে জন্ম দিয়েছে, তাদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব। যেমনি আছে সন্তানের বৈষয়িক দিকসমূহ দেখার দায়িত্ব, তেমনি রয়েছে তাদের আদব-আখলাক ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি দেখার দায়িত্বও।
পিতা-মাতার সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো- সন্তানের দুগ্ধ পানের ব্যবস্থা করা। স্বভাবগতভাবে ও মাতৃত্বের টানে মা তার সন্তানকে দুধ পান করান। যে বয়সে সন্তানের খাবার চর্বণ করার উপযোগী দাঁত থাকে না এবং শক্ত খাবার হজম করার সামর্থ্য থাকে না, সে সময় তার খাবারের জন্য আল্লাহ তায়ালা মায়ের বুকে দুধ সঞ্চার করে দেন। কিন্তু তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা শরীরের ফিটনেস এবং স্তনের উত্থান বজায় রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ পান না করে কৃত্রিম দুধ পান করানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছে! অথচ কৃত্রিম দুধ কখনো বুকের দুধের বিকল্প হতে পারে না। সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মানে কেবল তার পেটে দুধ পৌঁছানো নয়; বরং এর অর্থ তার চেয়েও গভীর। এর ফলে সন্তান মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে স্নেহের উষ্ণতা অনুভব করে। তাকে জড়িয়ে ধরে একদিকে স্তন থেকে খাবার গ্রহণ করে, অন্যদিকে হৃদয় ও আত্মার উষ্ণতা থেকে মানসিক পুষ্টি গ্রহণ করে।
📄 তালাকপ্রাপ্ত মায়ের কর্তব্য
কোনো কোনো সময় নারী তার সন্তানের পিতা কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। এরূপ পরিস্থিতিতে স্ত্রী স্বামীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বা হয়রানি করার জন্য সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকে। এতে সে সন্তানের কোনো কষ্ট বা ক্ষতির পরোয়া করে না। এ ব্যাপারে কুরআনুল কারিমের সূরা বাকারায় একটি আয়াত এসেছে, যাতে মায়েদের সন্তানের দুধ পানের অধিকার আদায়ের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর জন্মদাতা পিতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা সন্তানের দুধ পান করানোর পূর্ণ সময়কালে মায়ের ব্যয়ভার বহন করে। পিতা যদি মারা যায়, তবে তার উত্তরাধিকারীগণ ব্যয়ভার বহন করবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ানোর পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়। আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ, পিতার ওপর সে সমস্ত নারীর খোরপোষের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন করা হয় না। আর মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। যার সন্তান, তাকেও তার সন্তানের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন করা যাবে না। ওয়ারিশদের ওপরও একই দায়িত্ব। তারপর যদি পিতা-মাতা ইচ্ছা করে, তাহলে দুই বছরের ভেতরেই নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শক্রমে দুধ ছাড়িয়ে দিতে পারে, তাতে তাদের কোনো পাপ নেই। আর যদি তোমরা কোনো ধাত্রীর দ্বারা নিজের সন্তানদের দুধ খাওয়াতে চাও, তাহলে যদি তোমরা সাব্যস্তকৃত প্রচলিত বিনিময় দিয়ে দাও, তাতেও কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রেখ, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ অত্যন্ত ভালো করেই দেখেন।' সূরা বাকারাহ : ২৩৩
কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে- এ আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত মায়েদের কথা বলা হয়েছে। কারণ, এখানে পূর্বাপর আলোচনা তালাকসংক্রান্ত বিধিবিধান নিয়ে। আর তাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখের কারণ, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের পর পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ দেখা দেয়। ফলে তখন নারী হয়তো সন্তানকে দুটো কারণে অবহেলা করে- এক: সন্তানকে কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে স্বামীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। দুই: হয়তো সে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় বলে সন্তানকে অবহেলা করে! তাই মহান আল্লাহ তায়ালা সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য তালাকপ্রাপ্ত মায়েদের আহ্বান করেছেন।
ইমাম রাজি (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে বলেন- আল্লাহ তায়ালা একদিকে যেমন সন্তানের যত্নের বিষয়ে মাকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: 'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে।' তেমনিভাবে মায়ের প্রতি খেয়াল রাখার জন্য পিতাকেও নির্দেশ দিয়েছেন। যেন সে সন্তানের যত্ন নিতে সক্ষম হয়। এ জন্য পিতাকে ন্যায়সংগতভাবে খোরপোষ বহন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এটি হচ্ছে সন্তান প্রতিপালনে পিতা-মাতার পারস্পরিক সহযোগিতার দৃষ্টান্ত।
অতঃপর ইমাম রাজি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন। তা হলো- আল্লাহ তায়ালা প্রথমে মাকে সন্তানের যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর পিতাকে মায়ের যত্ন নিতে বলেছেন। এতে বোঝা যায়, সন্তান প্রতিপালনের জন্য পিতার চেয়ে মাতার প্রয়োজন অধিক বেশি। কারণ, সন্তান প্রতিপালনে মায়ের কোনো মাধ্যম লাগে না। অথচ সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য পিতার মাধ্যমের প্রয়োজন। কারণ, সন্তানকে দুধ পান করানোর জন্য হয়তো অর্থের বিনিময়ে কোনো নারীকে নিযুক্ত করতে হয় এবং খোরপোষ বহন করতে হয়। এতে বোঝা যাচ্ছে, মায়ের অধিকারে পিতার অধিকারের চেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে অনেক প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে।
ইমাম রাজি এ বিষয়ে তৃতীয় আরেকটি মাসয়ালা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন- এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, পিতা-মাতা দুজনের সম্মতি এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শ ব্যতীত দুই বছরের কমে দুধ ছাড়ানো জায়েজ নেই। কারণ, মা হয়তো কখনো বিরক্ত হয়ে দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা করবে। আবার পিতাও হয়তো কখনো খরচ প্রদানে বিরক্ত হয়ে দুধ ছাড়ানোর জন্য বলবে! কিন্তু নিজের প্রয়োজনের খাতিরে সন্তানের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে দুজনের একমত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। একমত হলেও, অন্যের সাথে পরামর্শ করতে হবে। কারণ, শিশুর ক্ষতি করার ব্যাপারে সকলে একমত হওয়া প্রায় অসম্ভব।
দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে দুধ ছাড়ানোর জন্য সকলে একমত হলে বুঝতে হবে, এতে শিশুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মহান আল্লাহ শিশুদের ক্ষতি হতে রক্ষা করার জন্য কতক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন! অতঃপর সকল শর্ত পূরণ হওয়ার পরও সরাসরি অনুমতি দেননি; বরং বলেছেন- তাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। এতে বোঝা যায়- যে মানুষ যত বেশি দুর্বল, তার প্রতি আল্লাহর রহমত ও যত্ন তত বেশি।