📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সন্তানের অধিকার

📄 সন্তানের অধিকার


জন্মলাভকারী প্রত্যেকটি শিশুর অধিকার হচ্ছে তাকে দেখাশোনার জন্য একজন পিতা থাকা এবং তাকে সস্নেহে প্রতিপালনের জন্য একজন মা থাকা। এটি স্বভাবগতভাবেই প্রয়োজন এবং ধর্ম ও শরিয়তের দৃষ্টিতেও আবশ্যক।

অতএব, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে স্বভাবের ওপর সৃষ্টি করেছেন, তার চাহিদা হলো- একজন শিশু পিতা-মাতা তথা নারী-পুরুষ থেকে জন্ম নেবে। যাদের একজনের থাকবে বীর্য, তথা সবেগে নির্গত পানি, আর অন্যজনের থাকবে ডিম্বাণু। আর পুরুষের বীর্য ও নারীর ডিম্বাণু মিলনের মাধ্যমে জরায়ুতে কাঙ্ক্ষিত মানব শিশুর গঠন হয়। অতঃপর মা পূর্ণ সন্তান জন্মদান করেন। এটিই স্বভাবগত বিষয়। ধর্ম ও শরিয়তের দৃষ্টিতে এটিই আবশ্যক।

অর্থাৎ নারী-পুরুষ দুজনে বৈধ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। কুরআনে যাকে 'দৃঢ় চুক্তি' বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই বন্ধনে আল্লাহর পক্ষ হতে বরকত রয়েছে। মানুষও এই সম্পর্ককে সম্মান করে। এর মাধ্যমে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তার পিতা-মাতার কাছে রয়েছে অনেক অধিকার। অনুরূপভাবে আত্মীয়স্বজন ও পূর্ণ সমাজের ওপরও তার রয়েছে যত্ন পাওয়ার অধিকার।

অতএব, বীর্যের কারণে পিতার সঙ্গে এবং ডিম্বানু, গর্ভ ও প্রসবের কারণে মায়ের সঙ্গে এ শিশুর যোগসূত্র স্থাপন হওয়া কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়।

মাতৃত্বের প্রকৃত অর্থের মাঝে এবং সদাচরণ ও সদ্ব্যবহারের অধিকার লাভের ক্ষেত্রে এ কষ্টগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে।' সূরা লুকমান: ১৪

যারা স্ত্রীর সঙ্গে 'জিহার' করে, অর্থাৎ স্ত্রীকে বলে- 'তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো!' তাদের জবাবে বলা হয়েছে- 'তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদের জন্মদান করেছে।' সূরা মুজাদালাহ: ২

এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী মা হলেন সেই নারী, যার সঙ্গে সন্তানের যোগসূত্র স্থাপিত হবে। তেমনিভাবে সেই পিতার সাথেও তার বংশসূত্র স্থাপিত হবে, যার সাথে তার মায়ের বৈধ মিলন হয়েছে এবং ডিম্বানুর সঙ্গে যার বীর্য মিলে গর্ভ সঞ্চার হয়েছে।

এ কারণেই সন্তানকে তার পিতা-মাতার কোনো একজন থেকে বঞ্চিত করা গুরুতর অপরাধ এবং জঘন্য গোনাহের কাজ। যেমনিভাবে, আমরা অবৈধ সন্তানদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। যারা পারিবারিক ব্যবস্থা ছাড়া অবৈধভাবে গর্ভে ধারণ করে, অর্থাৎ বৈধ বিবাহ বন্ধন ছাড়া গর্ভধারণ করে, সেই সকল মা একাই প্রসব, দুধ পান করানো, লালন-পালন ও খরচের ভার বহন করে। অথচ লালন-পালনের অংশীদার বাবার কোনো খোঁজই থাকে না।

এ জন্যই ইসলাম ও অন্যান্য সকল ধর্মে জোর নির্দেশনা এসেছে- শিশুরা যেন স্বাভাবিক বৈধ পরিবারের ছত্র-ছায়ায় জন্মলাভ করে। যেন সে প্রতিপালনপকারী দায়িত্বশীল পিতার দায়িত্বে এবং মমতাময়ী মায়ের ক্রোড়ে বেড়ে উঠতে পারে।

প্রতিটি শিশুর জন্য একজন প্রকৃত মা আবশ্যক; কৃত্রিম মা নয়। অনুরূপভাবে তার জন্য একজন প্রকৃত পিতা থাকা চাই। এমন পিতা নয়, যে তাকে কেবল দত্তক নেবে; অর্থাৎ বাস্তবে পিতা নয়।

যেমনিভাবে কুরআনে বলা হয়েছে-

'এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।' সূরা আহজাব : ৪

প্রকৃত পিতা কেন তার পিতৃত্বের গুরু দায়িত্ব অন্যের ওপর ছেড়ে পালাবে? দাবিদার আর বাস্তব হকদার কখনো এক নয়। মূল আর কৃত্রিম এক হতে পারে না। কেন প্রকৃত পিতা তার সন্তানকে সকলের সামনে এভাবে বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে- ইনি আমার বাবা, ইনি আমার দাদা, এই আমার পরিবার, এই আমার বংশ অথবা গোত্র। কবি ফারাজদাক বলেছেন- 'ওরাই আমার পিতৃপুরুষ, পারলে ওদের মতো কারও দৃষ্টান্ত নিয়ে এসো, ওহে জারির! যখন কোনো সভায় আমার সঙ্গে একত্রিত হও।'

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 অবিবাহিতা মাতৃকুল

📄 অবিবাহিতা মাতৃকুল


আজ আধুনিক সভ্যতা যে অবাধ যৌনতার ঢেউ উথলে দিয়েছে, তার কারণেই অবিবাহিত মায়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এটি ব্যভিচারের প্রসারতা ও নারীদের অবৈধভাবে গর্ভধারণের ফল। এর ফলেই আজ ছেলেমেয়েরা প্রকৃত পিতা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। সে সকল কাপুরুষ পিতা, যারা সামান্য সময়ের জন্য হারাম উপায়ে সম্ভোগের পর দায়িত্বভার গ্রহণ করা থেকে পালিয়ে গেছে এবং সকল কষ্টের বোঝা বহন করার জন্য অসহায় নারীকে ত্যাগ করেছে। অথচ সন্তানটি তাদের দুজনেরই শাখা এবং উভয়ের সমন্বিত সম্ভোগের ফল।

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট

📄 কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট


আরও বেশি নিকৃষ্ট ও জঘন্য ব্যাপার হলো- পিতা-মাতা উভয়ে জীবিত থাকা অবস্থায়ও কোনো শিশু তাদের থেকে বঞ্চিত হওয়া! অনেকে কোনো বৈধ বিবাহ ছাড়া সমাজের অগোচরে একত্রে বসবাস ও উপভোগ করছে। অতঃপর গর্ভ সঞ্চার হয়ে যখনই সন্তান প্রসবের সময় হচ্ছে, তখনই পুরুষ লোকটি নারীকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে।

সেই নারী সমাজের মুখোমুখি হওয়ার ভার নিতে না পেরে হয়তো সন্তানকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে কিংবা ইয়াতিমখানায় দিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পিতা-মাতা থাকা সত্ত্বেও সেই শিশু ইয়াতিমের-জীবনযাপন করছে। পিতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, নিজ পরিবারের পরিচয় সে দিতে পারে না। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর-স্নেহ করার মতো কোনো মাকে সে পায় না। এসবই হলো কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট!

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 মানুষের দীর্ঘ শৈশবকাল

📄 মানুষের দীর্ঘ শৈশবকাল


অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের শৈশবকাল বেশ দীর্ঘ। কোনো কোনো প্রাণী বা পাখি জন্মের সাথে সাথেই চলাফেরা করতে পারে। গরুর বাছুর জন্মের পরেই চার পায়ে দাঁড়াতে পারে। অনুরূপভাবে মুরগির বাচ্চা; ডিম থেকেই যেন তার চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন যে, হাঁটা-চলা ও কথা বলতে পারা এবং বুঝ ও ভালো-মন্দের পার্থক্য জ্ঞান আসা পর্যন্ত মানুষের জন্য প্রয়োজন যত্ন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-দীক্ষা, লালন-পালন ও আদব-কায়দার অনুশীলন। আর এসবের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ সময়ে পিতা-মাতা তাকে ধীরে ধীরে প্রতিপালন করবে এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেবে, যেন সে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে।

যে পিতা-মাতা সন্তানকে জন্ম দিয়েছে, তাদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব। যেমনি আছে সন্তানের বৈষয়িক দিকসমূহ দেখার দায়িত্ব, তেমনি রয়েছে তাদের আদব-আখলাক ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি দেখার দায়িত্বও।

পিতা-মাতার সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো- সন্তানের দুগ্ধ পানের ব্যবস্থা করা। স্বভাবগতভাবে ও মাতৃত্বের টানে মা তার সন্তানকে দুধ পান করান। যে বয়সে সন্তানের খাবার চর্বণ করার উপযোগী দাঁত থাকে না এবং শক্ত খাবার হজম করার সামর্থ্য থাকে না, সে সময় তার খাবারের জন্য আল্লাহ তায়ালা মায়ের বুকে দুধ সঞ্চার করে দেন। কিন্তু তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা শরীরের ফিটনেস এবং স্তনের উত্থান বজায় রাখতে সন্তানকে বুকের দুধ পান না করে কৃত্রিম দুধ পান করানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছে! অথচ কৃত্রিম দুধ কখনো বুকের দুধের বিকল্প হতে পারে না। সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মানে কেবল তার পেটে দুধ পৌঁছানো নয়; বরং এর অর্থ তার চেয়েও গভীর। এর ফলে সন্তান মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে স্নেহের উষ্ণতা অনুভব করে। তাকে জড়িয়ে ধরে একদিকে স্তন থেকে খাবার গ্রহণ করে, অন্যদিকে হৃদয় ও আত্মার উষ্ণতা থেকে মানসিক পুষ্টি গ্রহণ করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px