📄 সমাজের ওপর পিতৃত্বের অধিকার
মায়ের সাথে সাথে পিতার দেখাশোনা করাও সমাজের দায়িত্ব। পিতা সন্তানের জন্য তার কষ্টার্জিত সম্পদ ব্যয় করে। যদি তিনি সংকটে পতিত হন এবং স্ত্রী-সন্তানের অধিকার আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে সমাজের কর্তব্য হলো তার প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যাতে করে পিতা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী উপযুক্তভাবে সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সকল অধিকার ন্যায়সংগতভাবে আদায় করতে পারে।
মুসলিম সমাজের অর্থই পারস্পরিক সহযোগিতা। এখানে ধনী ব্যক্তিগণ গরিবদের সহযোগিতা করবে, শক্তিশালীগণ দুর্বলের পাশে দাঁড়াবে। মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য ইমারতস্বরূপ, যার একাংশ অন্য অংশকে মজবুত করে। মুসলমান মুসলমানের ভাই; না সে তার ওপর জুলুম করে, আর না তাকে অন্য কারও কাছে সমর্পণ করে। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় তাকে ছেড়ে যায় না।
এ শূন্যতা পূরণ করার জন্য ইসলামে বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আত্মীয়দের জন্য ব্যয় করার বিধান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত-সাপেক্ষে ধনী ব্যক্তি গরিব আত্মীয়ের জন্য ব্যয় করবে।
যাকাতের বিধান রাখা হয়েছে- যা ধনীদের থেকে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। অনুরূপভাবে যে পিতা তার সন্তানের ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম, তাকেও জাকাত প্রদান করতে হবে।
এমনিভাবে গ্রামবাসী অথবা এলাকাবাসীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিধান রয়েছে। ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে ভরা পেটে রাত্রিযাপন করে, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।
অন্যদিকে সাধারণ তাকাফুলের বিধানও রয়েছে। আল্লাহর পক্ষ হতে প্রজাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিম রাষ্ট্র এ দায়িত্ব পালন করবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সকল ক্ষুধার্তের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। সকল বস্ত্রহীনের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করা। অসুস্থদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করা এবং গৃহহীনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।
এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেছেন- 'তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল, তিনি তার প্রজাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। পিতা তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তিনি তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন।' বুখারি: ৮৯৩
অতএব, পিতা যেমন তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তেমনিভাবে ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানও তার অধীনস্থ প্রজাদের দায়িত্বশীল।
📄 সন্তানের অধিকার
জন্মলাভকারী প্রত্যেকটি শিশুর অধিকার হচ্ছে তাকে দেখাশোনার জন্য একজন পিতা থাকা এবং তাকে সস্নেহে প্রতিপালনের জন্য একজন মা থাকা। এটি স্বভাবগতভাবেই প্রয়োজন এবং ধর্ম ও শরিয়তের দৃষ্টিতেও আবশ্যক।
অতএব, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে স্বভাবের ওপর সৃষ্টি করেছেন, তার চাহিদা হলো- একজন শিশু পিতা-মাতা তথা নারী-পুরুষ থেকে জন্ম নেবে। যাদের একজনের থাকবে বীর্য, তথা সবেগে নির্গত পানি, আর অন্যজনের থাকবে ডিম্বাণু। আর পুরুষের বীর্য ও নারীর ডিম্বাণু মিলনের মাধ্যমে জরায়ুতে কাঙ্ক্ষিত মানব শিশুর গঠন হয়। অতঃপর মা পূর্ণ সন্তান জন্মদান করেন। এটিই স্বভাবগত বিষয়। ধর্ম ও শরিয়তের দৃষ্টিতে এটিই আবশ্যক।
অর্থাৎ নারী-পুরুষ দুজনে বৈধ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। কুরআনে যাকে 'দৃঢ় চুক্তি' বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই বন্ধনে আল্লাহর পক্ষ হতে বরকত রয়েছে। মানুষও এই সম্পর্ককে সম্মান করে। এর মাধ্যমে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তার পিতা-মাতার কাছে রয়েছে অনেক অধিকার। অনুরূপভাবে আত্মীয়স্বজন ও পূর্ণ সমাজের ওপরও তার রয়েছে যত্ন পাওয়ার অধিকার।
অতএব, বীর্যের কারণে পিতার সঙ্গে এবং ডিম্বানু, গর্ভ ও প্রসবের কারণে মায়ের সঙ্গে এ শিশুর যোগসূত্র স্থাপন হওয়া কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়।
মাতৃত্বের প্রকৃত অর্থের মাঝে এবং সদাচরণ ও সদ্ব্যবহারের অধিকার লাভের ক্ষেত্রে এ কষ্টগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে।' সূরা লুকমান: ১৪
যারা স্ত্রীর সঙ্গে 'জিহার' করে, অর্থাৎ স্ত্রীকে বলে- 'তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো!' তাদের জবাবে বলা হয়েছে- 'তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদের জন্মদান করেছে।' সূরা মুজাদালাহ: ২
এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী মা হলেন সেই নারী, যার সঙ্গে সন্তানের যোগসূত্র স্থাপিত হবে। তেমনিভাবে সেই পিতার সাথেও তার বংশসূত্র স্থাপিত হবে, যার সাথে তার মায়ের বৈধ মিলন হয়েছে এবং ডিম্বানুর সঙ্গে যার বীর্য মিলে গর্ভ সঞ্চার হয়েছে।
এ কারণেই সন্তানকে তার পিতা-মাতার কোনো একজন থেকে বঞ্চিত করা গুরুতর অপরাধ এবং জঘন্য গোনাহের কাজ। যেমনিভাবে, আমরা অবৈধ সন্তানদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। যারা পারিবারিক ব্যবস্থা ছাড়া অবৈধভাবে গর্ভে ধারণ করে, অর্থাৎ বৈধ বিবাহ বন্ধন ছাড়া গর্ভধারণ করে, সেই সকল মা একাই প্রসব, দুধ পান করানো, লালন-পালন ও খরচের ভার বহন করে। অথচ লালন-পালনের অংশীদার বাবার কোনো খোঁজই থাকে না।
এ জন্যই ইসলাম ও অন্যান্য সকল ধর্মে জোর নির্দেশনা এসেছে- শিশুরা যেন স্বাভাবিক বৈধ পরিবারের ছত্র-ছায়ায় জন্মলাভ করে। যেন সে প্রতিপালনপকারী দায়িত্বশীল পিতার দায়িত্বে এবং মমতাময়ী মায়ের ক্রোড়ে বেড়ে উঠতে পারে।
প্রতিটি শিশুর জন্য একজন প্রকৃত মা আবশ্যক; কৃত্রিম মা নয়। অনুরূপভাবে তার জন্য একজন প্রকৃত পিতা থাকা চাই। এমন পিতা নয়, যে তাকে কেবল দত্তক নেবে; অর্থাৎ বাস্তবে পিতা নয়।
যেমনিভাবে কুরআনে বলা হয়েছে-
'এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।' সূরা আহজাব : ৪
প্রকৃত পিতা কেন তার পিতৃত্বের গুরু দায়িত্ব অন্যের ওপর ছেড়ে পালাবে? দাবিদার আর বাস্তব হকদার কখনো এক নয়। মূল আর কৃত্রিম এক হতে পারে না। কেন প্রকৃত পিতা তার সন্তানকে সকলের সামনে এভাবে বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে- ইনি আমার বাবা, ইনি আমার দাদা, এই আমার পরিবার, এই আমার বংশ অথবা গোত্র। কবি ফারাজদাক বলেছেন- 'ওরাই আমার পিতৃপুরুষ, পারলে ওদের মতো কারও দৃষ্টান্ত নিয়ে এসো, ওহে জারির! যখন কোনো সভায় আমার সঙ্গে একত্রিত হও।'
📄 অবিবাহিতা মাতৃকুল
আজ আধুনিক সভ্যতা যে অবাধ যৌনতার ঢেউ উথলে দিয়েছে, তার কারণেই অবিবাহিত মায়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এটি ব্যভিচারের প্রসারতা ও নারীদের অবৈধভাবে গর্ভধারণের ফল। এর ফলেই আজ ছেলেমেয়েরা প্রকৃত পিতা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। সে সকল কাপুরুষ পিতা, যারা সামান্য সময়ের জন্য হারাম উপায়ে সম্ভোগের পর দায়িত্বভার গ্রহণ করা থেকে পালিয়ে গেছে এবং সকল কষ্টের বোঝা বহন করার জন্য অসহায় নারীকে ত্যাগ করেছে। অথচ সন্তানটি তাদের দুজনেরই শাখা এবং উভয়ের সমন্বিত সম্ভোগের ফল।
📄 কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট
আরও বেশি নিকৃষ্ট ও জঘন্য ব্যাপার হলো- পিতা-মাতা উভয়ে জীবিত থাকা অবস্থায়ও কোনো শিশু তাদের থেকে বঞ্চিত হওয়া! অনেকে কোনো বৈধ বিবাহ ছাড়া সমাজের অগোচরে একত্রে বসবাস ও উপভোগ করছে। অতঃপর গর্ভ সঞ্চার হয়ে যখনই সন্তান প্রসবের সময় হচ্ছে, তখনই পুরুষ লোকটি নারীকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে।
সেই নারী সমাজের মুখোমুখি হওয়ার ভার নিতে না পেরে হয়তো সন্তানকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে কিংবা ইয়াতিমখানায় দিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পিতা-মাতা থাকা সত্ত্বেও সেই শিশু ইয়াতিমের-জীবনযাপন করছে। পিতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, নিজ পরিবারের পরিচয় সে দিতে পারে না। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর-স্নেহ করার মতো কোনো মাকে সে পায় না। এসবই হলো কুড়িয়ে পাওয়া শিশুদের কষ্ট!