📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার

📄 মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার


কুরআনে পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও পিতার কষ্টের চেয়ে মাতার কষ্টের কথা বেশি বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-

'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।' সূরা লুকমান: ১৪

আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন-

'আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫

আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মায়ের ব্যথা ও কষ্টসমূহ তথা গর্ভ, সন্তান প্রসব ও দুধ পান করার কথা উল্লেখ করেছেন।

এ জন্যই আল্লাহর রাসূল ﷺ মায়ের ব্যাপারে তিনবার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পিতার ব্যাপারে একবার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন একজন সাহাবি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন-

'মানুষের মধ্যে সদাচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত কে? তখন তিনি বললেন, 'তোমার মা।' জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার মা।' আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার মা।' আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার পিতা।' বুখারি: ৫৯৭১, মুসলিম: ২৫৪৮

তিনি আরও বলেন-

'আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর পর্যায়ক্রমে নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।' তাবরানি, বাইহাকি ও ইবনে মাজাহ

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো আলেম বলেন, সদ্ব্যবহারের তিন-চতুর্থাংশ মায়ের অধিকার আর এক-চতুর্থাংশ বাবার। কারণ, মা এমনসব কষ্ট সহ্য করেন, যা বাবাকে করতে হয় না, আর সে কারণেই মায়ের জন্য সন্তানের সদ্ব্যবহার অধিক প্রয়োজন। পিতা তার সম্পদ দ্বারা নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মা পারে না। অন্যদিকে সন্তানগণ মায়ের সাথে যে আচরণের সাহস করতে পারে, বাবার সাথে তা পারে না।

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সমাজের ওপর মাতৃত্বের অধিকার

📄 সমাজের ওপর মাতৃত্বের অধিকার


পিতা-মাতার দেখাশোনা করার দায়িত্ব কেবল সন্তানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো সমাজব্যাপী বিস্তৃত। সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে- সন্তান প্রসব পর্যন্ত নারীর মাতৃত্বের যত্ন নেওয়া এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মাঝে তাকে খাদ্য, চিকিৎসা ও সামাজিক সেবা দিয়ে সহযোগিতা করা।

মা যদি কর্মজীবী হয়, তবে গর্ভাবস্থায় তার চাকরির কাজ হালকা করতে হবে; বিশেষ করে গর্ভের শেষ দিনগুলোতে। সন্তান প্রসবের পর তাকে উপযুক্ত মাতৃত্ব ও দুগ্ধ পানকালীন ছুটি দিতে হবে।

সেই ছুটি হয়তো এমনও হতে পারে, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- 'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ানোর পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।' সূরা আল-বাকারা: ২৩৩

উক্ত সময়কালে তাদের পূর্ণ বেতনসহ ছুটি দিতে হবে। কারণ, ওই মা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে। আর তা হলো- নবাগত প্রজন্মকে প্রতিপালন করছে। মাতৃজাতি প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনকারী জাতি। তারা ধন-সম্পদ উৎপাদন করে না; মানুষ উৎপাদন করে।

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক গ্যারি বেকের কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন-

'বাচ্চাদের যত্ন ও প্রতিপালনের জন্য যে সকল নারী ঘরে থাকেন, তারা জাতীয় অর্থনীতির উন্নতিতে ২৫% থেকে ৫০% হারে অংশগ্রহণ করেন। অথচ এই তথ্য অনেকেই জানে না। অনেকে মনে করে, যে সকল নারী ঘরের দায়িত্ব পালন করেন, তারা বেকার। তাদের দৃষ্টিতে, নারীগণ জাতীয় উৎপাদনের ওপর বোঝাস্বরূপ! অথচ আমরা দেখছি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি তার বিপরীত স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।'

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সমাজের ওপর পিতৃত্বের অধিকার

📄 সমাজের ওপর পিতৃত্বের অধিকার


মায়ের সাথে সাথে পিতার দেখাশোনা করাও সমাজের দায়িত্ব। পিতা সন্তানের জন্য তার কষ্টার্জিত সম্পদ ব্যয় করে। যদি তিনি সংকটে পতিত হন এবং স্ত্রী-সন্তানের অধিকার আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে সমাজের কর্তব্য হলো তার প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যাতে করে পিতা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী উপযুক্তভাবে সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সকল অধিকার ন্যায়সংগতভাবে আদায় করতে পারে।

মুসলিম সমাজের অর্থই পারস্পরিক সহযোগিতা। এখানে ধনী ব্যক্তিগণ গরিবদের সহযোগিতা করবে, শক্তিশালীগণ দুর্বলের পাশে দাঁড়াবে। মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য ইমারতস্বরূপ, যার একাংশ অন্য অংশকে মজবুত করে। মুসলমান মুসলমানের ভাই; না সে তার ওপর জুলুম করে, আর না তাকে অন্য কারও কাছে সমর্পণ করে। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় তাকে ছেড়ে যায় না।

এ শূন্যতা পূরণ করার জন্য ইসলামে বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আত্মীয়দের জন্য ব্যয় করার বিধান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত-সাপেক্ষে ধনী ব্যক্তি গরিব আত্মীয়ের জন্য ব্যয় করবে।

যাকাতের বিধান রাখা হয়েছে- যা ধনীদের থেকে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। অনুরূপভাবে যে পিতা তার সন্তানের ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম, তাকেও জাকাত প্রদান করতে হবে।

এমনিভাবে গ্রামবাসী অথবা এলাকাবাসীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিধান রয়েছে। ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে ভরা পেটে রাত্রিযাপন করে, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।

অন্যদিকে সাধারণ তাকাফুলের বিধানও রয়েছে। আল্লাহর পক্ষ হতে প্রজাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিম রাষ্ট্র এ দায়িত্ব পালন করবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সকল ক্ষুধার্তের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। সকল বস্ত্রহীনের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করা। অসুস্থদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করা এবং গৃহহীনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।

এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেছেন- 'তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল, তিনি তার প্রজাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। পিতা তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তিনি তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন।' বুখারি: ৮৯৩

অতএব, পিতা যেমন তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তেমনিভাবে ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানও তার অধীনস্থ প্রজাদের দায়িত্বশীল।

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সন্তানের অধিকার

📄 সন্তানের অধিকার


জন্মলাভকারী প্রত্যেকটি শিশুর অধিকার হচ্ছে তাকে দেখাশোনার জন্য একজন পিতা থাকা এবং তাকে সস্নেহে প্রতিপালনের জন্য একজন মা থাকা। এটি স্বভাবগতভাবেই প্রয়োজন এবং ধর্ম ও শরিয়তের দৃষ্টিতেও আবশ্যক।

অতএব, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে স্বভাবের ওপর সৃষ্টি করেছেন, তার চাহিদা হলো- একজন শিশু পিতা-মাতা তথা নারী-পুরুষ থেকে জন্ম নেবে। যাদের একজনের থাকবে বীর্য, তথা সবেগে নির্গত পানি, আর অন্যজনের থাকবে ডিম্বাণু। আর পুরুষের বীর্য ও নারীর ডিম্বাণু মিলনের মাধ্যমে জরায়ুতে কাঙ্ক্ষিত মানব শিশুর গঠন হয়। অতঃপর মা পূর্ণ সন্তান জন্মদান করেন। এটিই স্বভাবগত বিষয়। ধর্ম ও শরিয়তের দৃষ্টিতে এটিই আবশ্যক।

অর্থাৎ নারী-পুরুষ দুজনে বৈধ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। কুরআনে যাকে 'দৃঢ় চুক্তি' বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই বন্ধনে আল্লাহর পক্ষ হতে বরকত রয়েছে। মানুষও এই সম্পর্ককে সম্মান করে। এর মাধ্যমে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তার পিতা-মাতার কাছে রয়েছে অনেক অধিকার। অনুরূপভাবে আত্মীয়স্বজন ও পূর্ণ সমাজের ওপরও তার রয়েছে যত্ন পাওয়ার অধিকার।

অতএব, বীর্যের কারণে পিতার সঙ্গে এবং ডিম্বানু, গর্ভ ও প্রসবের কারণে মায়ের সঙ্গে এ শিশুর যোগসূত্র স্থাপন হওয়া কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়।

মাতৃত্বের প্রকৃত অর্থের মাঝে এবং সদাচরণ ও সদ্ব্যবহারের অধিকার লাভের ক্ষেত্রে এ কষ্টগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে।' সূরা লুকমান: ১৪

যারা স্ত্রীর সঙ্গে 'জিহার' করে, অর্থাৎ স্ত্রীকে বলে- 'তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো!' তাদের জবাবে বলা হয়েছে- 'তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদের জন্মদান করেছে।' সূরা মুজাদালাহ: ২

এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী মা হলেন সেই নারী, যার সঙ্গে সন্তানের যোগসূত্র স্থাপিত হবে। তেমনিভাবে সেই পিতার সাথেও তার বংশসূত্র স্থাপিত হবে, যার সাথে তার মায়ের বৈধ মিলন হয়েছে এবং ডিম্বানুর সঙ্গে যার বীর্য মিলে গর্ভ সঞ্চার হয়েছে।

এ কারণেই সন্তানকে তার পিতা-মাতার কোনো একজন থেকে বঞ্চিত করা গুরুতর অপরাধ এবং জঘন্য গোনাহের কাজ। যেমনিভাবে, আমরা অবৈধ সন্তানদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। যারা পারিবারিক ব্যবস্থা ছাড়া অবৈধভাবে গর্ভে ধারণ করে, অর্থাৎ বৈধ বিবাহ বন্ধন ছাড়া গর্ভধারণ করে, সেই সকল মা একাই প্রসব, দুধ পান করানো, লালন-পালন ও খরচের ভার বহন করে। অথচ লালন-পালনের অংশীদার বাবার কোনো খোঁজই থাকে না।

এ জন্যই ইসলাম ও অন্যান্য সকল ধর্মে জোর নির্দেশনা এসেছে- শিশুরা যেন স্বাভাবিক বৈধ পরিবারের ছত্র-ছায়ায় জন্মলাভ করে। যেন সে প্রতিপালনপকারী দায়িত্বশীল পিতার দায়িত্বে এবং মমতাময়ী মায়ের ক্রোড়ে বেড়ে উঠতে পারে।

প্রতিটি শিশুর জন্য একজন প্রকৃত মা আবশ্যক; কৃত্রিম মা নয়। অনুরূপভাবে তার জন্য একজন প্রকৃত পিতা থাকা চাই। এমন পিতা নয়, যে তাকে কেবল দত্তক নেবে; অর্থাৎ বাস্তবে পিতা নয়।

যেমনিভাবে কুরআনে বলা হয়েছে-

'এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।' সূরা আহজাব : ৪

প্রকৃত পিতা কেন তার পিতৃত্বের গুরু দায়িত্ব অন্যের ওপর ছেড়ে পালাবে? দাবিদার আর বাস্তব হকদার কখনো এক নয়। মূল আর কৃত্রিম এক হতে পারে না। কেন প্রকৃত পিতা তার সন্তানকে সকলের সামনে এভাবে বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে- ইনি আমার বাবা, ইনি আমার দাদা, এই আমার পরিবার, এই আমার বংশ অথবা গোত্র। কবি ফারাজদাক বলেছেন- 'ওরাই আমার পিতৃপুরুষ, পারলে ওদের মতো কারও দৃষ্টান্ত নিয়ে এসো, ওহে জারির! যখন কোনো সভায় আমার সঙ্গে একত্রিত হও।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px