📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 পিতা-মাতার অধিকার

📄 পিতা-মাতার অধিকার


ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, সকল সন্তানের ওপর পিতা-মাতার প্রথম অধিকার হচ্ছে- তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচারণ করা। সকল আসমানি ধর্মে এ অধিকারের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে।

তাওরাতে বর্ণিত দশটি নির্দেশনার মাঝে রয়েছে- 'তোমার পিতা-মাতাকে সম্মান করো।' Book of Exodus: 13-15/20

এমনিভাবে ঈসা (আ.)-এর ইঞ্জিলেও নির্দেশ এসেছে।

আর কুরআনে এ ব্যাপারে এমনভাবে জোর দেওয়া হয়েছে, যার নজির পৃথিবীর আর কোনো ধর্মে নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো।' নিসা: ৩৬

আরও ইরশাদ করেন- 'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।' সূরা ইসরা : ২৩

অন্যত্র বলেন- 'আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।' সূরা লুকমান : ১৪

যেহেতু তাওহিদের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব, তাই শিরকের পরে মারাত্মক গোনাহ হচ্ছে তাদের অবাধ্য হওয়া। নবি করিম ﷺ এটিকে অন্যতম মারাত্মক কবিরা গোনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

পিতা-মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হয়, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেখাশোনা ও যত্নের মুখাপেক্ষী হয়, তখন তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণের জন্য ইসলামে অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময় তাদের অনুভূতি খুবই আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল থাকে। যেকোনো অনুপযুক্ত কথা যেমন বিরক্তি প্রকাশকারী, তেমনি 'উফ' শব্দও তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা বলো। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে বাহু নত করে দাও এবং বলো: হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।' বনি ইসরাইল: ২৩-২৪

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার

📄 মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার


কুরআনে পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও পিতার কষ্টের চেয়ে মাতার কষ্টের কথা বেশি বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-

'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।' সূরা লুকমান: ১৪

আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন-

'আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫

আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মায়ের ব্যথা ও কষ্টসমূহ তথা গর্ভ, সন্তান প্রসব ও দুধ পান করার কথা উল্লেখ করেছেন।

এ জন্যই আল্লাহর রাসূল ﷺ মায়ের ব্যাপারে তিনবার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পিতার ব্যাপারে একবার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন একজন সাহাবি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন-

'মানুষের মধ্যে সদাচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত কে? তখন তিনি বললেন, 'তোমার মা।' জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার মা।' আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার মা।' আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার পিতা।' বুখারি: ৫৯৭১, মুসলিম: ২৫৪৮

তিনি আরও বলেন-

'আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর পর্যায়ক্রমে নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।' তাবরানি, বাইহাকি ও ইবনে মাজাহ

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো আলেম বলেন, সদ্ব্যবহারের তিন-চতুর্থাংশ মায়ের অধিকার আর এক-চতুর্থাংশ বাবার। কারণ, মা এমনসব কষ্ট সহ্য করেন, যা বাবাকে করতে হয় না, আর সে কারণেই মায়ের জন্য সন্তানের সদ্ব্যবহার অধিক প্রয়োজন। পিতা তার সম্পদ দ্বারা নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মা পারে না। অন্যদিকে সন্তানগণ মায়ের সাথে যে আচরণের সাহস করতে পারে, বাবার সাথে তা পারে না।

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সমাজের ওপর মাতৃত্বের অধিকার

📄 সমাজের ওপর মাতৃত্বের অধিকার


পিতা-মাতার দেখাশোনা করার দায়িত্ব কেবল সন্তানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো সমাজব্যাপী বিস্তৃত। সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে- সন্তান প্রসব পর্যন্ত নারীর মাতৃত্বের যত্ন নেওয়া এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মাঝে তাকে খাদ্য, চিকিৎসা ও সামাজিক সেবা দিয়ে সহযোগিতা করা।

মা যদি কর্মজীবী হয়, তবে গর্ভাবস্থায় তার চাকরির কাজ হালকা করতে হবে; বিশেষ করে গর্ভের শেষ দিনগুলোতে। সন্তান প্রসবের পর তাকে উপযুক্ত মাতৃত্ব ও দুগ্ধ পানকালীন ছুটি দিতে হবে।

সেই ছুটি হয়তো এমনও হতে পারে, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- 'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ানোর পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।' সূরা আল-বাকারা: ২৩৩

উক্ত সময়কালে তাদের পূর্ণ বেতনসহ ছুটি দিতে হবে। কারণ, ওই মা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে। আর তা হলো- নবাগত প্রজন্মকে প্রতিপালন করছে। মাতৃজাতি প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনকারী জাতি। তারা ধন-সম্পদ উৎপাদন করে না; মানুষ উৎপাদন করে।

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক গ্যারি বেকের কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন-

'বাচ্চাদের যত্ন ও প্রতিপালনের জন্য যে সকল নারী ঘরে থাকেন, তারা জাতীয় অর্থনীতির উন্নতিতে ২৫% থেকে ৫০% হারে অংশগ্রহণ করেন। অথচ এই তথ্য অনেকেই জানে না। অনেকে মনে করে, যে সকল নারী ঘরের দায়িত্ব পালন করেন, তারা বেকার। তাদের দৃষ্টিতে, নারীগণ জাতীয় উৎপাদনের ওপর বোঝাস্বরূপ! অথচ আমরা দেখছি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি তার বিপরীত স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।'

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 সমাজের ওপর পিতৃত্বের অধিকার

📄 সমাজের ওপর পিতৃত্বের অধিকার


মায়ের সাথে সাথে পিতার দেখাশোনা করাও সমাজের দায়িত্ব। পিতা সন্তানের জন্য তার কষ্টার্জিত সম্পদ ব্যয় করে। যদি তিনি সংকটে পতিত হন এবং স্ত্রী-সন্তানের অধিকার আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে সমাজের কর্তব্য হলো তার প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যাতে করে পিতা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী উপযুক্তভাবে সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সকল অধিকার ন্যায়সংগতভাবে আদায় করতে পারে।

মুসলিম সমাজের অর্থই পারস্পরিক সহযোগিতা। এখানে ধনী ব্যক্তিগণ গরিবদের সহযোগিতা করবে, শক্তিশালীগণ দুর্বলের পাশে দাঁড়াবে। মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য ইমারতস্বরূপ, যার একাংশ অন্য অংশকে মজবুত করে। মুসলমান মুসলমানের ভাই; না সে তার ওপর জুলুম করে, আর না তাকে অন্য কারও কাছে সমর্পণ করে। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় তাকে ছেড়ে যায় না।

এ শূন্যতা পূরণ করার জন্য ইসলামে বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আত্মীয়দের জন্য ব্যয় করার বিধান রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত-সাপেক্ষে ধনী ব্যক্তি গরিব আত্মীয়ের জন্য ব্যয় করবে।

যাকাতের বিধান রাখা হয়েছে- যা ধনীদের থেকে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। অনুরূপভাবে যে পিতা তার সন্তানের ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম, তাকেও জাকাত প্রদান করতে হবে।

এমনিভাবে গ্রামবাসী অথবা এলাকাবাসীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিধান রয়েছে। ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে ভরা পেটে রাত্রিযাপন করে, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।

অন্যদিকে সাধারণ তাকাফুলের বিধানও রয়েছে। আল্লাহর পক্ষ হতে প্রজাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিম রাষ্ট্র এ দায়িত্ব পালন করবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সকল ক্ষুধার্তের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। সকল বস্ত্রহীনের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করা। অসুস্থদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করা এবং গৃহহীনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।

এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেছেন- 'তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল, তিনি তার প্রজাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন। পিতা তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তিনি তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন।' বুখারি: ৮৯৩

অতএব, পিতা যেমন তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তেমনিভাবে ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানও তার অধীনস্থ প্রজাদের দায়িত্বশীল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px