📄 সন্তান আল্লাহর বিশেষ উপহার
অতঃপর সন্তান লাভের পর এই ছোটো পরিবার ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে। সন্তান লাভ করা বিবাহের অন্যতম লক্ষ্য। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে পুত্র ও পৌত্রাদি দিয়েছেন। সূরা নাহল: ৭২
সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, কুরআনে তাকে আল্লাহর দেওয়া বিশেষ উপহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই।' সূরা শুরা: ৪৯-৫০
অন্যদিকে জাহেলি যুগের লোকেরা কন্যা সন্তান জন্মের ফলে রুষ্ট ও বিরক্ত হতো। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে, নাকি তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে। শুনে রাখো, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।' সূরা নাহল : ৫৮-৫৯
অনেক ক্ষেত্রে জাহেলি চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা কন্যা সন্তানকে নিকৃষ্ট উপায়ে হত্যা করত, জীবন্ত পুঁতে ফেলত। এটি ছিল মানুষের অন্যতম পবিত্র পিতৃত্বের মায়ার ওপর সংঘটিত জাহেলিয়াতের মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো?' সূরা তাকবির: ৮-৯
জাহেলি সমাজ মানুষের মায়া ও আবেগের সাথে জঘন্য প্রতারণা করেছে। উক্ত সমাজ দারিদ্রতা অথবা সম্ভাবনাময় দারিদ্রতার ভয়ে মানুষকে দিয়ে নিজের সন্তান হত্যা করাতো। মানুষ তার সন্তানকে খাওয়ানোর ভয়ে হত্যা করত! অথচ তার কর্তব্য ছিল সন্তানকে রক্ষা করা; নিজের পেট ভরার জন্য হত্যা করা কিংবা ক্ষুধার্ত রাখা নয়।
অনুরূপভাবে জাহেলি সমাজ মানুষের বিবেকের ওপর জুলুম করেছে। কারণ, আমরা দেখতে পাই- তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজ হাতে খোদাই করা পাথরের পূজা করত এবং তাকে সিজদা করত।
📄 সন্তানের জন্ম থেকেই মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের সৃষ্টি
পরিবারে সন্তান জন্মের সাথে সাথেই মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের সৃষ্টি হয়। এ দুটো বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ; উষ্ণ স্নেহ ও ভালোবাসার অপূর্ব উৎস।
মাতৃত্ব হচ্ছে সন্তানের প্রতি মায়ের অবারিত দান। মা শুধু দিয়েই যান, কিন্তু বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করেন না। কোনো স্বার্থ ছাড়াই আত্মত্যাগ করে যান। মা সন্তানের জন্য তার স্বাস্থ্য, যৌবন ও শান্তি সবই দিয়ে দেন, কিন্তু এসবের জন্য খোঁটা দেন না। সন্তানের ঘুমের জন্য রাত জাগা এবং তার শান্তির জন্য কষ্ট করাকে তিনি উপভোগ করেন। সেইসঙ্গে সন্তানকে খাওয়ানো এবং বড়ো করার জন্য নিজে ক্ষুধার্ত থাকার কষ্ট উপভোগ করেন।
মা সন্তানের জন্য ঘরের ভেতরে কষ্ট করেন। আর বাবা সন্তানের প্রয়োজনীয় খরচ জোগানোর জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাইরে পরিশ্রম করেন।
পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্য রয়েছে অনেকগুলো অধিকার ও কর্তব্য।
📄 পিতা-মাতার অধিকার
ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, সকল সন্তানের ওপর পিতা-মাতার প্রথম অধিকার হচ্ছে- তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচারণ করা। সকল আসমানি ধর্মে এ অধিকারের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে।
তাওরাতে বর্ণিত দশটি নির্দেশনার মাঝে রয়েছে- 'তোমার পিতা-মাতাকে সম্মান করো।' Book of Exodus: 13-15/20
এমনিভাবে ঈসা (আ.)-এর ইঞ্জিলেও নির্দেশ এসেছে।
আর কুরআনে এ ব্যাপারে এমনভাবে জোর দেওয়া হয়েছে, যার নজির পৃথিবীর আর কোনো ধর্মে নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো।' নিসা: ৩৬
আরও ইরশাদ করেন- 'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।' সূরা ইসরা : ২৩
অন্যত্র বলেন- 'আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।' সূরা লুকমান : ১৪
যেহেতু তাওহিদের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব, তাই শিরকের পরে মারাত্মক গোনাহ হচ্ছে তাদের অবাধ্য হওয়া। নবি করিম ﷺ এটিকে অন্যতম মারাত্মক কবিরা গোনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
পিতা-মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হয়, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেখাশোনা ও যত্নের মুখাপেক্ষী হয়, তখন তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণের জন্য ইসলামে অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময় তাদের অনুভূতি খুবই আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল থাকে। যেকোনো অনুপযুক্ত কথা যেমন বিরক্তি প্রকাশকারী, তেমনি 'উফ' শব্দও তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা বলো। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে বাহু নত করে দাও এবং বলো: হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।' বনি ইসরাইল: ২৩-২৪
📄 মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার
কুরআনে পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও পিতার কষ্টের চেয়ে মাতার কষ্টের কথা বেশি বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।' সূরা লুকমান: ১৪
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন-
'আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।' সূরা আহকাফ : ১৫
আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মায়ের ব্যথা ও কষ্টসমূহ তথা গর্ভ, সন্তান প্রসব ও দুধ পান করার কথা উল্লেখ করেছেন।
এ জন্যই আল্লাহর রাসূল ﷺ মায়ের ব্যাপারে তিনবার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পিতার ব্যাপারে একবার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন একজন সাহাবি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন-
'মানুষের মধ্যে সদাচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত কে? তখন তিনি বললেন, 'তোমার মা।' জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার মা।' আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার মা।' আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর কে?' বললেন, 'তোমার পিতা।' বুখারি: ৫৯৭১, মুসলিম: ২৫৪৮
তিনি আরও বলেন-
'আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তোমাদেরকে পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তারপর পর্যায়ক্রমে নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।' তাবরানি, বাইহাকি ও ইবনে মাজাহ
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো আলেম বলেন, সদ্ব্যবহারের তিন-চতুর্থাংশ মায়ের অধিকার আর এক-চতুর্থাংশ বাবার। কারণ, মা এমনসব কষ্ট সহ্য করেন, যা বাবাকে করতে হয় না, আর সে কারণেই মায়ের জন্য সন্তানের সদ্ব্যবহার অধিক প্রয়োজন। পিতা তার সম্পদ দ্বারা নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু মা পারে না। অন্যদিকে সন্তানগণ মায়ের সাথে যে আচরণের সাহস করতে পারে, বাবার সাথে তা পারে না।