📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 আল্লাহর বিধান

📄 আল্লাহর বিধান


এখানে আল্লাহর বিধান বলতে বোঝানো হচ্ছে, তাঁর সে সকল হুকুম-আহকাম ও আদেশ-নিষেধ, যাতে পারিবারিক ব্যবস্থার নিয়মকানুন ও বিধিবিধান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য কুরআনে পারিবারিক বিষয়ে বারবার বলা হয়েছে- 'এসব আল্লাহর সীমারেখা। অতএব, তোমরা এ সীমা লঙ্ঘন করো না, আর যারা আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, তারাই অত্যাচারী।' সূরা বাকারা: ২২৯

অন্যত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন- 'এসব আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, সে নিজেরই অনিষ্ট করে।' সূরা তালাক : ১

স্বামীর ওপর স্ত্রীর যে সকল অধিকারের কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্যে কতিপয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

মোহর: এটি নারীর অধিকার। পুরুষ তার আন্তরিক ভালোবাসা ও আগ্রহের নিদর্শন হিসেবে এবং নারীর ভালোবাসা অর্জনের জন্য হাদিয়াস্বরূপ এটি প্রদান করবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তোমরা স্ত্রীদের খুশি মনে মোহর দিয়ে দাও। তারা যদি খুশি হয়ে তা থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।' সূরা নিসা: ৪

ভরণ-পোষণ : পুরুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী অপচয় কিংবা কৃপণতা ব্যতীত নারীর জন্য উপযুক্ত খাবার-পানীয়, পোশাক, সাজ-সজ্জা, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। প্রত্যেকে তার অবস্থা অনুযায়ী এটি করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'বিত্তশালী ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে। যে ব্যক্তি সীমিত পরিমাণে রিজিকপ্রাপ্ত, তাকে আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করবে।' সূরা তালাক: ৭

রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীর জন্য ব্যয় করাকে জিহাদের জন্য দান করা এবং মিসকিনদের সাদাকা করার চেয়ে উত্তম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মুসলিম: ১৮২৭

স্ত্রীর সাথে সৎভাবে জীবনযাপন: আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা নারীদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করো।' সূরা নিসা: ১৯

এর অর্থ হলো- তার সাথে কথা ও কাজে সুন্দর ও কোমল আচরণ করা এবং কঠোরতা ও রূঢ় আচরণ না করা। আল্লাহ তায়ালা তাদের অধিকারের গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলেন- 'নারীরা তোমাদের কাছে থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।' সূরা নিসা: ২১

নবিদের ব্যাপারেও আল্লাহ তায়ালা এমন কথা বলেছেন- 'যখন আমি নবিদের থেকে অঙ্গিকার নিয়েছিলাম এবং আপনার থেকেও এবং নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও ঈসা ইবনে মরিয়মের থেকেও; আমি তাদের থেকে নিয়েছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।' সূরা আহজাব : ৭

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা দশটি অধিকারের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন- 'আর তোমরা এক আল্লাহর ইবাদাত করো এবং কোনো কিছুকে তাঁর সাথে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম-মিসকিন, আত্মীয়- প্রতিবেশী, সঙ্গী ও নিজের দাস-দাসীর সাথেও (সদ্ব্যবহার করো)। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক-গর্বিতদের পছন্দ করেন না।' সূরা নিসা : ৩৬

এ আয়াতে 'সঙ্গীর ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, এর দ্বারা নিজ স্ত্রীকে বোঝানো হয়েছে।

বিদায় হজের ভাষণে নবি নারীদের ব্যাপারে ওসিয়ত করে বলেন- 'তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।' মুসলিম: ১২১৮

তিনি আরও বলেন- 'আমি তোমাদের স্ত্রীদের সম্পর্কে উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা আমার উপদেশ গ্রহণ করো।' বুখারি: ৫১৮৬, মুসলিম : ১৪৬৮

অতএব, পুরুষের কর্তব্য হলো স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা, তার খারাপ আচরণে ধৈর্য ধারণ করা। সেইসঙ্গে স্ত্রীর মধ্যে অপছন্দনীয় কোনো কিছু লক্ষ করলে, সে কারণে তাকে ত্যাগ করার দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।' সূরা নিসা: ১৯

স্ত্রীর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে পুরুষকে বাস্তববাদী হওয়া উচিত। নিখুঁত স্ত্রীর কল্পনা-বিলাসী হওয়া উচিত নয়। মানবিক বাস্তবতার আলোকে স্ত্রীর সাথে আচরণ করা উচিত। তার নেতিবাচক দিকগুলোর সাথে সাথে ইতিবাচক গুণগুলোও দেখতে হবে। হাদিসে এসেছে- 'কোনো ঈমানদার স্বামী যেন তার ঈমানদার স্ত্রীকে অপছন্দ না করে। তার কোনো একটি আচরণ অপছন্দ হলেও অন্যটি পছন্দ হবে।' মুসলিম: ১৪৬৯

ইমাম গাজালি বলেন- 'জেনে রেখ, স্ত্রীর সাথে সুন্দর আচরণ মানে শুধু তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা নয়; বরং তার নির্বুদ্ধিতাসূলভ আচরণ ও রাগ সহ্য করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এটি হবে রাসূল-এর আদর্শের অনুসরণ। কারণ, রাসূল-এর স্ত্রীগণও তাঁর সাথে কথার প্রত্যুত্তর করতেন এবং তাদের কেউ কেউ কোনোদিন রাত পর্যন্ত তাঁর সাথে কথা বলতেন না।' ইহয়াউ উলুমিদ দ্বীন: ২/৪৩

স্ত্রীর দেওয়া কষ্ট সহ্য করা যেমন তার সাথে সদ্ব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি তার সাথে খেলাধুলা, হাঁসি-ঠাট্টা ও কৌতুক করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এতে তার মন ভালো থাকে। আল্লাহর রাসূল ﷺ এমনটি করতেন। একবার তিনি হজরত আয়েশা রা.-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করলেন, তখন আয়েশা রা. জয়লাভ করলেন। এরপর অন্য একদিন আবার প্রতিযোগিতা করলেন এবং এইবার আল্লাহর রাসূল ﷺ জিতলেন। তখন বললেন, 'এটি আগেরবারের বদলা।' অর্থাৎ বর্তমান সময়ের পরিভাষা অনুযায়ী দুজনে 'ড্র' করেছেন। আবু দাউদ, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ

একবার হাবশি গোলামগণ যখন মসজিদে বর্শা দিয়ে খেলছিল, তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ আয়েশা রা.-কে খেলা দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে আয়েশা রা. বলেন, তিনি আমাকে তাঁর পেছনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার গাল ছিল তাঁর গালের সাথে। আল-লু'লু' ওয়াল মারজান: ৫১৩

রাসূল ﷺ বলেন- 'তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।' ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, তিরমিজি: ৩৮৯৫

তিনি আরও বলেন- 'মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক পূর্ণ ঈমানের অধিকারী, যে অধিক সুন্দর চরিত্রের অধিকারী এবং পরিবারের সাথে অধিক কোমল আচরণকারী।' তিরমিজি, নাসায়ি

স্ত্রীদের ওপর স্বামীর যে সকল অধিকারের বিধান রয়েছে, তা নিচে উল্লেখ করা হলো- পরিবারের ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব মানা: এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন- 'পুরুষরা নারীদের ওপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে।' সূরা নিসা: ৩৪

যেহেতু পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি দুপক্ষের মাঝে একটি যৌথ কোম্পানির মতো। তাই পরিচালক ছাড়া এটি চলা সম্ভব নয়। অন্যদিকে একসঙ্গে দুজন পরিচালক থাকাও সম্ভব নয়। কারণ, যে নৌকার দুই কান্ডারি থাকে তার পরিণতি হচ্ছে পানিতে ডুবে যাওয়া। নারী পরিবারের পরিচালিকা হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তার মাঝে আবেগের প্রাধান্য রয়েছে। এটি তার মাতৃত্বের জন্য আবশ্যক।

অন্যদিকে পরিবার প্রতিষ্ঠা করতে নারীর ওপর কোনো আর্থিক দায়-দায়িত্ব বর্তায় না। পক্ষান্তরে, পুরুষ পারিবারিক বিষয়াদিতে নারীর চেয়ে অধিক বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং বিভিন্ন পদক্ষেপের ক্ষেত্রে পরিণাম ও পরিণতির বিষয়ে অধিক সচেতন থাকে। সেইসঙ্গে তার খরচেই গড়ে উঠে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি। কাজেই তার কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে গেলে পুরো পরিবারই ধ্বংস হয়ে যায়।

নারী কর্তৃক পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার মানে হলো, ন্যায়সংগত বিষয়ে আনুগত্য করা, যেন দুজনের জীবনতরী নিরাপদে চলতে পারে। অনুরূপভাবে নারীর কর্তব্য হলো, ছোটো-বড়ো সবকিছু নিয়ে স্বামীর সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত না হওয়া। নারী যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান মতো স্বীয় কর্তব্য পালনার্থে স্বামীকে মেনে চলে, তবে এটি তার নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে, যার ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদিসে এসেছে- 'নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, স্বীয় লজ্জাস্থান হেফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তবে সে যেকোনো দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।' তাবরানি ও আহমাদ

তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুরুষ তার পরিবারে স্বৈরশাসন চালাবে এবং স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়া স্বৈরশাসকের মতো আদেশ-নিষেধ জারি করবে। মোটেও নয়; বরং পুরুষের উচিত পারবারিক বিভিন্ন বিষয়ে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করা এবং তার চিন্তা-ভাবনায় স্ত্রীকে শরিক করা। এতে হয়তো তার থেকে এমন কোনো পরামর্শ পাওয়া যাবে, যা অধিক কল্যাণকর হবে।

আল্লাহ তায়ালা বাচ্চাদের দুগ্ধপানের বিষয়ে পিতা-মাতার ভূমিকা সম্পর্কে বলেন- 'অতঃপর তারা (পিতা-মাতা) যদি পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুধ ছাড়াতে চায়, তাহলে তাদের কোনো পাপ হবে না।' সূরা বাকারাহ : ২৩৩

হুদায়বিয়ার ঘটনার সময় রাসূল তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করেছিলেন। তখন নবি উম্মে সালামার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেছেন এবং তাতে কল্যাণ ছিল।

স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ : এ ব্যাপারে ত্রুটি না করা। এমনকী স্বামীর স্পষ্ট বা ইঙ্গিতমূলক অনুমতি ব্যতীত তার সম্পদ হতে সাদাকা দেওয়াও জায়েজ নেই। তার অনুমতিতে দান করলে স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে সওয়াবে অংশীদার হবে। স্বামী যদি সামর্থ্য থাকা স্বত্তেও স্ত্রীর যথোপযুক্ত ভরণ-পোষণ প্রদানে ত্রুটি করে, তবে স্ত্রী তার অনুমতি ছাড়াই অপচয় ও অপব্যায় ব্যতীত উপযুক্ত পরিমাণ মাল নিতে পারবে। নবি করিম আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাকে বলেছেন- 'তোমার নিজের জন্য এবং সন্তানের জন্য ন্যায়সংগতভাবে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু পরিমাণ সম্পদ তুমি নিতে পারবে।'

তার অনুপস্থিতে নিজের হেফাজত : স্বামীর অনুপস্থিতে মাহরাম ছাড়া অন্য কোনো আত্মীয়কে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। বিশেষ করে নিজের গায়রে মাহরাম পুরুষ আত্মীয় বা শ্বশুরপক্ষের গায়রে মাহরাম আত্মীয়। হাদিসে এসেছে- 'তোমরা নারীদের ঘরে প্রবেশ করো না। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, শশুরপক্ষের পুরুষ আত্মীয়দের ব্যাপারে কী বলেন? তিনি বললেন- শ্বশুরপক্ষের পুরুষ আত্মীয়গণ হলো মৃত্যু সমতুল্য।' বুখারি : ৫২৩২, মুসলিম: ২১৭২

সাধারণত আত্মীয়গণ দীর্ঘ সময় অবস্থান করে এবং অনেক কথাবার্তা বলে। ফলে এতে অনেক সময় তার প্রশান্তি বিনষ্ট হয় এবং বিরক্তি সৃষ্টি হয়। উপরন্তু ফেতনার সম্ভাবনা তো আছেই।

স্বামীর সন্তানের যত্ন : সন্তানদের সুন্দরভাবে প্রতিপালনের দায়িত্ব পালন করা। প্রথম কয়েক বছর সন্তান প্রতিপালনে স্ত্রীর ভূমিকা স্বামীর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সে সময় সন্তান মায়ের কাছে বেশি থাকে এবং পিতার চেয়ে মায়ের কাছেই বেশি শেখে।

এ ব্যাপারে কবি বলেন- 'মা হলো এমন একটি শিক্ষালয়স্বরূপ, যাকে তুমি যদি ঠিকভাবে প্রস্তুত করো, তবে তুমি যেন উত্তম মৌলিকত্বসম্পন্ন একটা জাতি তৈরি করলে।'

বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে- 'নারী তার স্বামীর ঘরে দায়িত্বশীল, সে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।' বুখারি: ৮৯৩

স্বামীকে কল্যাণকর কাজে সহায়তা: স্বামীকে কল্যাণকর কাজে, নেক আমলে এবং গোনাহ হতে বাঁচতে সহায়তা করা। স্বামীর সামর্থ্যের বাইরে তার কাছে এমন কিছু না চাওয়া, যেন সে হারাম উপার্জনে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়; বরং এ ব্যাপারে তাকে সতর্ক করা। যেমন আগেকার যুগের নেককার লোকদের স্ত্রীগণ স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলতেন- 'হারাম উপার্জন হতে বেঁচে থাকো। আমরা ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারব, কিন্তু জাহান্নামের শাস্তি সইতে পারব না।'

একবার এক লোক জিহাদ বা এ জাতীয় কোনো নেক কাজে বের হয়েছিল। তখন প্রতিবেশীগণ তার স্ত্রীকে বলল, 'তুমি তার সফরের ব্যাপারে রাজি হয়েছে কেন? অথচ সে তোমার জন্য কোনো অর্থ রেখে যায়নি!' জবাবে তার স্ত্রী বলল, 'আমি যখন থেকে তাকে চিনি, তখন থেকেই তাকে ভক্ষণকারী হিসেবে চিনি! কখনো তো তাকে রিজিকদাতা হিসেবে দেখিনি। আমার তো রিজিকদাতা রব আছেন। ভক্ষণকারী চলে গেছে, কিন্তু রিজিকদাতা রয়ে গেছেন।'

📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 নিয়ম অনুযায়ী ন্যায়সংগত আচরণ

📄 নিয়ম অনুযায়ী ন্যায়সংগত আচরণ


অন্য আরেকটি বিষয় কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। তা হলো- 'মারুফ' বা নিয়মানুগ আচরণ। 'মারুফ' শব্দটির উদ্দেশ্য হলো পুণ্য ও ভালো মানুষদের আচরণ, সুষ্ঠু স্বভাবসুলভ আচরণ এবং উত্তম বিবেক সমর্থিত আচরণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে নিয়মানুগ ন্যায়সংগত আচরণ করো।' নিসা: ১৯

'আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ পিতার ওপর সে সমস্ত (দুগ্ধপানকারিনী) নারীর খোরপোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।' বাকারা: ২৩৩

'নারীদের তেমনি নিয়মানুগ ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমনিভাবে তাদের ওপর পুরুষদের অধিকার আছে।' বাকারা: ২২৮

'অতঃপর তারা যখন নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়মানুযায়ী তাদের রেখে দাও অথবা সহানুভূতির সঙ্গে তাদের মুক্ত করে দাও।' বাকারা: ২৩১

'মারুফ' বা সাধারণ নিয়ম হিসেবে বিভিন্ন বিধিবিধান নির্ধারিত হয়। যেমন: ন্যায়সংগত প্রচলন এবং সাধারণ নিয়মানুযায়ী স্ত্রীর আবশ্যকীয় ভরণ-পোষণের খরচের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সদাচরণ নির্ধারিত হবে ন্যায়সংগত প্রচলনের আলোকে। কারণ, সদাচরণের খুঁটিনাটি বিস্তারিত বিবরণ শরিয়তের পক্ষ হতে নির্ধারণ করে দেওয়া যৌক্তিক নয়; বরং যে সকল ন্যায়সংগত আচরণ ঈমানদার নেক মানুষদের নিকট স্বীকৃত এবং সাধারণ মুসলিমদের নিকট সন্তোষজনক, সে সকল উত্তম আচরণ ইসলামি শরিয়তেও সদাচরণ হিসেবে গৃহীত। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন- 'মুসলিমগণ যা ভালো মনে করে, তা আল্লাহর নিকটও ভালো। আর মুসলিমগণ যা খারাপ মনে করে, তা আল্লাহর নিকটও খারাপ।'

আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তুমি বলে দাও, তোমরা আমল করে যাও, পরবর্তী সময়ে আল্লাহ দেখবেন তোমাদের কাজ এবং দেখবেন রসূল ও মুসলমানগণ।' সূরা তাওবাহ: ১০৫

এখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) আমল দেখার পর মুমিনদের দেখাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেখার পর আসে তাদের গ্রহণ অথবা প্রত্যাখ্যানের বিষয়টিও।

আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেছেন- 'যারা নিজেদের কাছে আগত কোনো দলিল ছাড়াই আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে বিতর্ক করে, তাদের প্রত্যেকজন আল্লাহ ও মুমিনদের কাছে খুবই অসন্তোষজনক।' সূরা মুমিন: ৩৫

এখানে আল্লাহর অসন্তোষের পর মুমিনদের অসন্তোষকেও মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এ জন্যই ইলমে ফিকহের জনৈক গবেষক বলেন- 'শরিয়তে প্রচলিত নিয়মকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাই তো এর ওপর ভিত্তি করে কখনো শরয়ি বিধান বর্ণনা করা হয়।'

অতএব, এ দুটো উপাদান তথা আল্লাহ প্রদত্ত শরয়ি বিধান এবং মানবীয় প্রচলিত নিয়মের মাধ্যমেই আমরা সুষ্ঠু পরিবার ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে পারি, দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারি এবং এ গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বন্ধন অটুট রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারি, যা সমাজের ভিত্তিস্বরূপ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px