📘 মুমিন জীবনে পরিবার 📄 পছন্দের স্বাধীনতা

📄 পছন্দের স্বাধীনতা


উত্তম সঙ্গী নির্বাচনের সাথে সাথে এখানে আরেকটি বিষয় আবশ্যক। তা হলো- নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাধীনভাবে সঙ্গী নির্বাচন করবে। অন্য কেউ তাদের ওপর সঙ্গী পছন্দ করার বিষয়টি চাপিয়ে দেবে না; এমনকী প্রিয় বাবা, মমতাময়ী মাতা বা আপন ভাইও না।

যে বিয়ে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ, আর্থিক কিংবা অন্য কোনো বাধ্য- বাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে সম্পন্ন হয়, তাকেই স্থিতিশীল ও সুষ্ঠু বিবাহ বলে। এটি পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।

আমাদের সমাজে এখনও কিছু পুরাতন রীতি চালু রয়েছে। এর ফলে সন্তানদের বৈবাহিক জীবনের ব্যাপারে পরিবারের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করা হয়। চাই সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে। যদিও মেয়েদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপের মাত্রাটা একটু বেশি ও শক্তিশালী।

অনেক সময় প্রজন্মের ভিন্নতার ফলে পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে ছেলেমেয়েদের চিন্তার ভিন্নতা বা বৈপরিত্য দেখা দেয়। আবার কোনো কোনো পরিবারে এমন কিছু রীতি-নীতি চালু রয়েছে, যার ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো দলিল বা প্রমাণ নেই।

যেমন, ছেলের বিবাহের জন্য চাচাতো বোন নির্ধারিত থাকা এবং তাকে অন্যত্র বিবাহ দেওয়া জায়েজ মনে না করা। অনেক সময় দেখা যায়, উক্ত ছেলে তার চাচাতো বোনকে বিবাহ করতে আগ্রহী নয় এবং সেই বোনও তাকে বিবাহ করতে অনাগ্রহী। হয়তো তাদের অন্তর অন্য কারও সঙ্গে যুক্ত এবং তারা প্রত্যেকে একে অপরের সম্পর্কের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। এরপরও পরিবারের কর্তা-ব্যক্তিরা ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে তাদের ওপরে নিজস্ব রীতি চাপিয়ে দেয়। তখন হয়তো তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, কিন্তু সেই বিয়ে দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না। ফলে দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

মিশরের উষ্ণ অঞ্চলে কিছু গোত্র রয়েছে, তারা মেয়েদের চাচাতো ভাই না হলেও স্বীয় গোত্রের বাহিরে বিবাহ দেয় না। গোত্রের বাহিরের মিশরিদের তারা কৃষক বলে অভিহিত করে। তারা মনে করে, ওরা তাদের মেয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। এমনকী গোত্রের বাহিরের কোনো লোক যদি জ্ঞান ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে উচ্চ অবস্থানেও পৌঁছে, তারপরও সে ওই সকল গোত্রের কাছে কৃষকই রয়ে যায়। তাদের মাঝে এ প্রবাদ চালু রয়েছে যে, 'মেয়েকে কুমিরে খেয়ে ফেলুক, তবুও কৃষক যেন না নেয়।'

কখনো দেখা যায়- কোনো ব্যক্তির আর্থিক বা সামাজিক অবস্থানের কারণে পরিবার তার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে চায়, কিন্তু মেয়ে তাকে বিবাহ করতে চায় না। এমনকী মেনেও নিতে পারে না। কিন্তু পারিবারিকভাবে জোর করে এ তিক্ত বিবাহ গলদকরণ করানো হয় এবং যাকে চায়, তাকে বিয়ে করতে বাধা প্রদান করা হয়। অথচ এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেছেন- 'যারা পরস্পরকে ভালোবাসে, তাদের জন্য বিয়ের মতো উত্তম আর কিছু নেই।' ইবনে মাজাহ: ১৮৪৭

ছেলেদের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। কখনো দেখা যায়, পরিবার তার আবেগ- অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো সম্ভ্রান্ত বা ধনী পরিবারে বিয়ে দেয়। এ ধরনের বৈষয়িক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে যে বিবাহ সংঘটিত হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

জাহেলি যুগে আরব সমাজে এ ধরনের জবরদস্তিমূলক বিবাহের প্রচলন ছিল। ইসলাম এসে মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে চাপমুক্ত করেছে এবং স্বাধীনতা প্রদান করেছে। যেন সে নিজেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে এবং দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারে।

এ জন্যই রাসূল ﷺ সঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা দিয়ে, বিশেষ করে নারীদের স্বামী নির্বাচনে স্বাধীনতা দিয়ে উম্মাহর প্রতি সুবিচার করেছেন। নারী যখন কোনো পাত্রকে অপছন্দ করে এবং বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আল্লাহর রাসূল তাকে জোর করে বিয়ে দিতে নিষেধ করেছেন।

এ ব্যাপারে বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ আনসারি নারী খানসা বিনতে খুদ্দামের বিবাহকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যখন খানসা বিনতে খুদ্দাম অভিযোগ করেছিলেন, তার বাবা তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিবাহ দিয়েছে! তিনি ছিলেন ‘সাইয়্যেবা’ অর্থাৎ পূর্বে তার একবার বিবাহ হয়েছিল। বুখারি, মুসনাদে আহমাদ

ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত আছে- ‘একজন কুমারী মেয়ে রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে জানাল যে, তার বাবা তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে বিবাহ দিয়েছে! তখন তিনি সেই মেয়েকে বিবাহ রাখা না রাখার ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছেন।’ আবু দাউদ: ২০৯৬, ইবনে মাজাহ : ১৮৭৫

আল্লামা সানআনি তাঁর সবুলুস সালাম গ্রন্থে এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ইতঃপূর্বে আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে- ‘কুমারী নারীকে তার অনুমতি ব্যতিত বিবাহ দেওয়া যাবে না।’ এই হাদিসের অর্থ সুস্পষ্ট। এতে প্রমাণিত হয়, মেয়েকে জোর করে বিবাহ দেওয়া ইসলামে হারাম। অতএব, অন্য অভিভাবকগণের ক্ষেত্রে এ হুকুম আরও ভালোভাবে সাব্যস্ত হবে।

যারা বলেন, হাদিসে বর্ণিত উক্ত মেয়েকে তার পিতা অনুপযুক্ত পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল বলে এমন স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে! তাদের প্রত্যুত্তরে আল্লামা সানআনি বলেন, এ ব্যাখ্যার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, এমন কিছু হলে মেয়েটি তা উল্লেখ করত; বরং সে বলেছে, তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার পিতা তাকে বিবাহ দিয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে, অপছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার কারণেই তাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এখানে এ কারণটিই উল্লেখ করা হয়েছে, অতএব তাকে বলা হয়েছে- তোমার যখন অপছন্দ, তাহলে এ ব্যাপারে তোমার স্বাধীনতা রয়েছে।

'উম্মুল মোমেনিন আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি মেয়ে তাঁর কাছে এসে বলল- “আমার পিতা নিজের মর্যাদা উঁচু করার জন্য আমাকে তার ভাতিজার কাছে বিবাহ দিয়েছে, অথচ আমি তাকে পছন্দ করি না।” তিনি বললেন, নবি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। অতঃপর নবি আসার পর তিনি তাকে এ ব্যাপারে জানালেন। রাসূল ﷺ তার পিতাকে ডেকে আনলেন এবং মেয়েকে এ বিয়ে রাখা বা না রাখার ব্যাপারে স্বাধীনতা প্রদান করলেন। তখন মেয়েটি বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা যা করেছে, তাতে এখন আমি রাজি হয়েছি। কিন্তু আমি নারী সমাজকে এটি জানিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম যে, তাদের পিতা তাদের ওপর জোর করতে পারবে না।” সুনানে নাসায়ি

অর্থাৎ, মেয়েদের অপছন্দনীয় পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে অভিভাবকগণ জোর করতে পারবে না। হাদিসের বর্ণনা দ্বারা এটাই বোঝা যাচ্ছে।

সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে- 'কুমারী মেয়ের থেকে তার পিতা (বিয়ের ব্যাপারে) অনুমতি নেবে।' মুসলিম: ১৪১৯

নাসায়ি ও অন্যদের বর্ণনায় এ হাদিস এসেছে- 'ইয়াতিম মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে তার অনুমতি নেওয়া হবে। যদি সে চুপ থাকে, তবে তা অনুমতি হিসেবে গৃহীত হবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া জায়েজ হবে না।' হাদিস: ৩২৭০

অতএব বোঝা গেল, নারী তার নিজের ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল। সে নিজেই তার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করবে। অভিভাবক যদি তা নির্বাচন করে, তবে সে ব্যাপারে তার অনুমোদন নিতে হবে। অন্যথা বিবাহ কার্যকর হবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px