📄 মনের মিল
জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- পরস্পরের মাঝে মনের মিল। কোনো কোনো মানুষ এমন আছে, যার সাথে কখনো একসঙ্গে থাকতে পারবেন না। হয়তো বাহ্যিকভাবে তার মাঝে তেমন কোনো দোষ নেই। তবে তার মানসিকতার সাথে আপনার মানসিকতা মিলছে না। এ ব্যাপারে হাদিসে বলা হয়েছে- 'মানবাত্মাসমূহ যেন বিভিন্ন সমষ্টিতে বিভক্ত। (আদিতে) যারা পরস্পর পরিচিত হয়েছে, এখানেও (দুনিয়ায়) তারা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আর সেখানে যারা পরস্পর অপরিচিত ছিল, এখানে তাদের মধ্যে অনৈক্য হবে।' বুখারি: ৩৩৩৬
অতএব, আত্মাসমূহের মাঝে মিল থাকলে পারস্পরিক ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। আর অমিল থাকলে অনৈক্য দেখা দেবে।
এ বিষয়টি কখনো কখনো প্রথম দৃষ্টিতেই অথবা প্রথম সাক্ষাতেই উপলব্ধি করা যায়। আবার কখনো-বা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার পর অথবা ছোটোখাটো আচরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। তখন হয়তো দেখা যায়, তার প্রতি কোনো মহব্বত সৃষ্টি হচ্ছে না; বরং দুজনের আন্তরিক সম্পর্কের মাঝে যেন দেখা দিয়েছে অভেদ্য দেয়াল।
হয়তো এ কারণেই নবি বিবাহের জন্য প্রস্তাবকৃত নারীকে আগেই দেখে নিতে বলেছেন। একজন সাহাবি যখন আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে জানালেন, তিনি এক নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। তখন রাসূল জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি তাকে দেখেছ?' জবাবে তিনি বললেন, 'না!' তখন আল্লাহর রাসূল বললেন- 'তাকে দেখে নাও। কারণ, এটি তোমাদের মাঝে সম্পর্ক স্থায়ী হওয়ার উত্তম পদ্ধতি।' মুসনাদে আহমাদ: ১৮১৫৪
অর্থাৎ পারস্পরিক দৃষ্টি বিনিময়ের ফলে একে অপরের প্রতি হয়তো টান অনুভূত হবে। কারণ, চোখ হলো অন্তরের দূত। দেখার অধিকার কেবল পুরুষের জন্য নয়; বরং নারীরও অধিকার। এ জন্য পুরুষ যেমনিভাবে তার হবু স্ত্রীকে দেখবে, তেমনি নারীর জন্যও হবু স্বামীকে দেখার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে, যেন কথাবার্তা ও আচার-আচরণে একে অপরকে বুঝতে পারে। সেইসঙ্গে চেহারা-সুরতের দিক থেকেও যেন একে অপরের মনপূত হয়।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এর মাধ্যমে যেন একে অপরের অন্তরে জায়গা করে নিতে পারে। যেন পরস্পরকে ঘনিষ্ঠ, পরিপূরক ও নিজের অংশবিশেষ মনে হয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা একে অপরের অংশ।' সূরা আলে ইমরান: ১৯৫
এমন যেন মনে না হয় যে, তাদের দুজন দুই মেরুতে। একজন প্রাচ্যে আরেকজন পাশ্চাত্যে। এমন হলে দুজনের মাঝে কোনো মিল থাকবে না।
পারস্পরিক মনের এই টান-ই হলো 'মনের মিল', যা নিয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করছি। এর অর্থ, দুজনের মাঝে এমন মিল থাকবে, যেন দুজন একই ব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে আরবি ভাষা তথা কুরআনের ভাষার অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হলো, দুজন জীবনসঙ্গী প্রত্যেককেই এখানে (زوج) বা জোড় বলা হয়েছে। আর জোড় মানে একই রকম। প্রত্যেকের মাঝেই যেন অপরজন নিহিত রয়েছে। দুজন যেন একাকার হয়ে গেছে।
এখানে আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। তা হলো, ইসলাম বাগদত্তা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য দেখার যে বিধান রেখেছে, তা আজ অবধি কোনো কোনো মুসলিম দেশে অবহেলিত ও পরিত্যক্ত। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশসমূহে। দেখা যাচ্ছে- প্রস্তাব প্রদানকারী হবু স্বামীকে কোনো অবস্থাতেই তার বাগদত্তা স্ত্রীকে দেখতে দেওয়া হয় না। তারা পূর্বপুরুষদের মূর্খ নীতি অনুসরণ করে ইসলামি বিধানকে দোষের বিষয় মনে করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করে, কোনো যুবক তার বাগদত্তা স্ত্রীকে অথবা কোনো যুবতী তার বাগদত্তা স্বামীকে বাসর রাতের আগে দেখা অন্যায়। এমনকী তাদের অনেকে আকদের পরও এমনটি মনে করে!
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- এ বাগদত্তা নারী স্কুল, ভার্সিটি, মার্কেট অথবা হাসপাতালে আসা-যা যাওয়া করছে, এমনকী বিভিন্ন আরব দেশ বা ইউরোপিয়ান দেশেও ভ্রমণ করছে। জীবনে অনেক পুরুষকে দেখছে এবং তারাও তাকে দেখছে। যেমন: মার্কেটে বিক্রেতাকে দেখছে, হাসপাতালে ডাক্তারকে দেখছে, ভার্সিটিতে শিক্ষককে দেখছে, বিমানে এয়ার হোস্টকে দেখেছে এবং এভাবে আরও অনেককে দেখছে, অথচ একমাত্র যে বেচারা তাকে দেখতে পারবে না, সে হলো তার হবু বর!
📄 পারস্পরিক উপযুক্ততা
তৃতীয় বিষয় হলো- অর্থ, মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, বয়স ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে নিজের উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী খুঁজে নেওয়া। যাতে এগুলোর কোনোটির অনুপস্থিতি বৈবাহিক জীবনে অস্থিরতা বা বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। অতএব, দরিদ্র ব্যক্তির জন্য এমন ধনী নারী খোঁজা উচিত নয়, (যার ব্যয়ভার সে বহন করতে পারবে না। উলটো) স্ত্রীর সম্পদে তাকে চলতে হয়। কারণ, মূলনীতি হলো- পুরুষ হবে নারীর ওপর কতৃত্বশীল, সে নারীর ব্যয়ভার বহন করবে। এখন স্ত্রী যদি তার ব্যয়ভার বহন করে, তবে পুরুষ আর স্ত্রীর ওপর পূর্ণ কতৃত্বশীল হতে পারবে না।
অনুরূপভাবে মূর্খ বা অর্ধ-মূর্খ পুরুষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্ত উচ্চ শিক্ষিত নারী বিবাহ করা উচিত নয়। অন্যদিকে এর বিপরীতে মূর্খ নারীর জন্যেও উচ্চ শিক্ষিত পুরুষকে বিবাহ করা উচিত নয়। কারণ, দুজনের মাঝে জ্ঞানের বিস্তর তফাত থাকে। ফলে দেখা যাবে, তারা কেবল খাবার-দাবার ও যৌন সম্ভোগেই একে অপরের অংশীদার হবে; অন্য কিছুতে নয়।
এমনিভাবে, যুবকের উচিত নয় বৃদ্ধা নারীকে বিবাহ করা এবং যুবতী নারীরও উচিত নয় বৃদ্ধ পুরুষকে বিবাহ করা। কারণ, এ সকল ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় আর্থিক কারণে বিবাহ ঘটে! এতে বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্য নষ্ট হয় এবং নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।
এ জন্যই আনসারি যুবক সাহাবি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ যখন নবি ﷺ-কে নিজের বিবাহের সংবাদ দিলেন, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- 'সে কি কুমারী, না বিবাহিতা?' তিনি বললেন, 'বিবাহিতা'। তখন নবি বললেন- 'কুমারী বিবাহ করলে না কেন, তাহলে একে অপরের সঙ্গে খেলাধুলা ও হাসি-রসিকতা করতে পারতে?' আল লু'লু' ওয়াল মারজান: ৯৩০
তখন জাবির জানালেন, তার পিতা শাহাদাত বরণ করেছেন এবং তাঁর অনেকগুলো ছোটো বোন রয়েছে। তাদের লালন-পালনের জন্য অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নারীর প্রয়োজন (কারণ, তাদের মা ছিল না)। এজন্য যদি তাদের বয়সি কুমারী মেয়ে বিবাহ করেন, তবে হয়তো তাদের সুষ্ঠু লালন-পালন সম্ভব হবে না। তাই তিনি ছোটো বোনদের দিকে লক্ষ করে কুমারী নারী বিবাহ না করে বিবাহিত নারী বিবাহ করেছেন; যেন তাদের মায়ের মতো লালন-পালন করতে পারে।
এতে আমরা বুঝতে পারি, কখনো কখনো বাহ্যিক উপযুক্ততাকে তার চেয়ে বড়ো কোনো কারণে উপেক্ষা করা হয়। তাই কখনো দেখা যায়, কোনো পুরুষ তার চেয়ে বয়সে বড়ো নারীকে বিবাহ করে। আবার কোনো কোনো নারী তার চেয়ে বয়সে ছোটো পুরুষকে বিবাহ করে এমন শক্তিশালী কারণে, যাতে উভয়েই আন্তরিকভাবে পরিতুষ্ট থাকে। ফলে তাদের বৈবাহিক জীবনেও মজবুত ভিত্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।