📄 স্থিতিশীল বিবাহ
সেই পরিবারকে উত্তম পরিবার বলে, যা স্থিতিশীল বিবাহ বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয় পারস্পরিক মায়া-মমতা ও ভালোবাসা। এটি পবিত্র জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক জীবনের স্থিতিশীলতার জন্য এটি একটি মৌলিক উপাদান।
ইসলাম এ জন্যই বিবাহের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। পাশাপাশি এটি প্রতিষ্ঠিত করা, এর সুফল অব্যাহত রাখা এবং একে ছিন্নতা ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য মানসিক, চারিত্রিক ও আইনগত নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
এ ক্ষেত্রে ইসলাম প্রথম যে কাজটি করেছে তা হলো- বিবাহের মূল হাকিকত ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন করেছে। যেন মুসলিমরা মূল বাস্তবতা জেনে ও বুঝে অগ্রসর হতে পারে এবং ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। কারণ, ভ্রান্ত ধারণার কারণেই মানুষ বিভ্রান্তিমূলক আচরণ করে।
বিবাহের ইচ্ছুক প্রত্যেক মুসলিমের জেনে রাখা উচিত, বিবাহ নিছক কোনো শারীরিক বন্ধন নয়। বিবাহের অন্তর্গত অর্থ হলো একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের বন্ধন। এ বন্ধন বলতে মন-মনন, অস্থিমজ্জার বন্ধনকে বোঝায়, যা শারীরিক সম্পর্কের চেয়েও বেশি কিছু। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বুদ্ধি, বিবেক, আবেগ-অনুভূতি ও রুহ।
এর অর্থ এটা নয় যে, দৈহিক সম্ভোগ ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো ইসলামসম্মত বিবাহের উদ্দেশ্য বহির্ভূত বিষয়; বরং স্বভাবগতভাবে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক যৌন চাহিদা মেটানো এবং পবিত্র ও হালাল উপায়ে পরস্পরের মাধ্যমে তৃপ্তি লাভ করা বিবাহের একটি অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন- 'তারা তোমাদের পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের পোশাকস্বরূপ।' সূরা আল বাকারা : ১৮৭
উদ্দেশ্য হলো, যেন মুমিন বান্দা তার প্রবৃত্তির চাহিদাকে হালালমুখী করে এবং নিজেকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রশিক্ষণ নিতে পারে। আর এর দ্বারা প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত হবে এবং মনের চাহিদা সংযত হবে। এ জন্যই নবি যুবকদের সম্বোধন করে বলেছেন- 'ওহে যুবক সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য (সক্ষমতা ও ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য) রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ, তা (হারাম হতে) দৃষ্টিকে অধিক অবনতকারী এবং লজ্জাস্থানকে অধিক রক্ষাকারী।' বুখারি: ৫০৬৫, মুসলিম: ১৪০০
কিন্তু একজন মুসলিমের বিবাহের উদ্দেশ্য কেবল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আরও বেশ কিছু উদ্দেশ্য পূরণ করে থাকে। আর তা হলো- ঈমানের সহিত পরিপূর্ণ ঘর বাঁধা এবং উত্তম পরিবার গঠন করা। যেন তাদের দ্বারা উত্তম সমাজ বিনির্মাণের ভিত রচিত হতে পারে। ঈমানের সহিত গড়ে উঠা ঘর তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। যথা: প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। কুরআনে এ তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করে এগুলোকে আল্লাহর নিদর্শনরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঈমানদারের বৈবাহিক জীবন এ তিনটি বিষয়ের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।' সূরা রুম: ২১
বিবাহের মাধ্যমে কেবল একজন নারী ও পুরুষের মাঝেই সম্পর্কের বন্ধন সৃষ্টি হয় না; বরং দুটো পরিবারের মাঝেও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। কুরআনুল কারিমে উক্ত সম্পর্ককে রক্ত সম্পর্কের সঙ্গেই তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি হতে। তারপর তিনি তাকে বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্কশীল করেছেন।' সূরা ফুরকান: ৫৪
একটু বাড়িয়ে বলতে গেলে কুরআনের দৃষ্টিতে বিবাহ এমন একটি বিষয়, যা পৃথিবী সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অবদান রাখে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটিও বিবাহের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল হতে তোমাদের জন্য পুত্র ও পৌত্র সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন।' সূরা আন-নাহল: ৭২
অন্যদিকে, মানুষ স্বভাবগতভাবে স্থায়িত্ব পছন্দ করে। ফলে সে সন্তান লাভে আগ্রহী হয়। যেন মৃত্যুর পরও তার নিদর্শন বাকি থাকে। এ জন্যই আমরা দেখতে পাই, নবি আলাইহিমুস সালামগণ আল্লাহর কাছে সন্তান চেয়েছেন। যেমন: ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন- 'হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন। (আল্লাহ বলেন) অতঃপর তাকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।' সূরা আস-সাফফাত: ১০০-১০১
আমরা দেখেছি, জাকারিয়া (আ.) বলছেন- 'হে আমার পালনকর্তা! আমাকে একা রেখ না। তুমি তো উত্তম ওয়ারিশ। (আল্লাহ তায়ালা বলেন) অতঃপর আমি তাঁর দুআ কবুল করেছিলাম, তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া এবং তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলাম।' সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯-৯০
বিবাহের এ সকল মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার পর মুসলিমদের উচিত সে সকল মৌলিক নীতিমালা ও উপাদান সম্পর্কে জানা, যার ওপর ভিত্তি করে উত্তম বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত থাকে। এখন এ ব্যাপারে পরের অধ্যায়গুলোতে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।