📄 ভিক্টোরিয়ান যুগে নারী (১৮৩৭-১৯০১ খ্রি.)
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের চেয়ারম্যান Prof. Lynn Abrams জানাচ্ছেন : তখনকার যুগের নারীরা যথেষ্ট মানসিক পরিপূর্ণতা অনুভব করত গৃহজীবন এবং মাতৃত্বের মাঝেই। একজন নারীর যে পূর্ণতা, সেটা ঘরোয়া পরিবেশ ওই মাতৃত্বে। এটাই ছিল একজন নারীর ক্যারিয়ার এবং এর মধ্যেই সে আত্মমর্যাদা খুঁজে পেত, আত্মতৃপ্তি খুঁজে পেত। এবং স্বাবলম্বন ও ক্ষমতায়ন সবকিছু খুঁজে পেত। এটা তখনকার ইউরোপের নারীদের কথা বলছি। [১২১]
তখনকার সমাজে পরিবারের গুরুত্ব, বিবাহের স্থায়িত্ব এবং নারীর সহজাত নৈতিকতাবোধ তাদের মধ্যে বজায় ছিল। এবং এখানে নারীর সম্মান মানে, ফ্যামিলিকে সে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, বিয়েকে টিকিয়ে রাখার জন্য তার কী চেষ্টা; এবং সতীত্ব, সভ্যতা, ভব্যতা, ভদ্রতা ইত্যাদি দিয়ে একজন নারীর সম্মান নির্ধারণ করা হতো। অর্থাৎ, নারীর ক্যারিয়ারই ছিল এই বিষয়গুলো। আজ সবকিছু উলটে গেছে। পরিবার গঠনে ব্যর্থ নারী, অসভ্য-বেলেল্লা নারীকে আইকন মনে করা হচ্ছে।
তখনকার নারীরা ছিলেন ব্যস্ত, সক্ষম এবং সম্মানিতা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। যাদের মূল শক্তি ছিল তাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার প্রকাশ ছিল অন্যের সেবা। অথচ আজ ঘরের কাজ যারা করেন, তাদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যে তারা বেকার। শিক্ষিত হয়েও নারী বেকার। কিন্তু ঘরে কি আমাদের মায়েরা বেকার ছিলেন? মোটেই না, তারা নিশ্বাস ফেলার ফুরসত পর্যন্ত পেতেন না আমাদের নিয়ে। ঘরে যে-সমস্ত মহিলারা কাজ করেন, তারা বেকার না।
অর্থাৎ, পুঁজিবাদের যে ভ্যালু সিস্টেম, সেই পুঁজিবাদের জন্য তিনি কাজ করছেন না। ঘরে যে নারী কাজ করেন, তিনি কাজ করছেন তার নিজের জন্য। তার স্বামীর জন্য। তার সন্তানের জন্য। সে পুঁজিবাদের দাসী হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। [১২২] অথচ ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই নারীরা বেকার ছিলেন না। কৃষি-শিল্প সবখানে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি উৎপাদনে শ্রম দিয়েছেন।
এখনো দিচ্ছেন। যখন শিল্প ছিল ঘরে (কুটিরশিল্প), তখন তারা ঘরে থেকেই সবকিছু করতে পেরেছেন। আজ যখন শিল্প কেবল বৃহৎ পুঁজির কারখানায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, তখন ঘর ছেড়ে কারখানায় টেনে আনা হয়েছে নারীকে। ঘর ছাড়াকেই ক্যারিয়ার বলা হচ্ছে। ওদিকে শেষ হয়ে গেছে নারীর ঘর, নারীর শরীর, নারীর মন।
ইউরোপের নারীরাও সে সময় বেকার ছিলেন না। তারা ছিলেন কর্মব্যস্ত; তারা সক্ষম; তারা প্রতিষ্ঠিত ফিগার। একদম শক্তসমর্থ ব্যক্তিত্ব। তাদের যে সতীত্ব, ধর্মপরায়ণতা, ধার্মিকতা এবং তাদের যে জনকল্যাণমূলক কাজকর্মগুলো, এসব দ্বারা তাদের সম্মান ও মর্যাদা নির্ধারণ হতো।
আমি শুনেছি, এখনো আমাদের গ্রামের মানুষ এই কথা বলে: আমাদের গ্রামের ৯০% নারী কুরআন শরিফ শিখেছে আমার দাদির মায়ের কাছে। তিনি তো ছিলেন একজন গৃহিণী। কিন্তু পুরো গ্রামে তার কী পরিমাণ সম্মান ছিল, ভেবে দেখুন। ব্যাপারগুলো ছিল এরকম যে, তার সোশ্যাল ওয়ার্ক, মানুষকে সাহায্য করা-এটাই তার সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার উৎস ছিল।
আমার নানি পুরোপুরি পর্দানশিন মানুষ। তিনি পুরো এলাকার মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন, নরমাল ডেলিভারি করানোর জন্য। যত কষ্টই হোক, যত রাতই হোক; নানিকে ডাকা হতো। তিনি হয়তো সারাজীবনে কয়েক হাজারের ওপরে ডেলিভারি করিয়েছেন; ধাত্রী হিসেবে। সম্পূর্ণ ঘরোয়াভাবে শিখে তিনি ফ্রিতে এই সেবাটুকু গ্রামে গ্রামে দিতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন। তার সম্মানের জায়গাটা খেয়াল করুন। মানুষ তার বাসায় উপহারসামগ্রী পাঠাচ্ছে। এই যে মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং তার যে একটা নৈতিক উচ্চতা-এটিই ছিল তার সম্মানের মূল জায়গা।
১৮৬১ সালে মিসেস Beeton-এর 'Book of Household Management' (গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা) নামে একটি বই প্রকাশ হয়, যেটা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেস্টসেলার হিসেবে ছিল। বইটির বিষয়বস্তু হলো, কীভাবে একজন নিপুণা গৃহিণী হওয়া যায়, কীভাবে কর্মব্যস্ত পুরুষের জন্য জান্নাতি ঘর প্রস্তুত করে রাখা যায়। আপনি সে সময়কার নারীদের রুচিটা খেয়াল করুন। তাদের ক্যারিয়ার, তাদের শিক্ষা, তাদের ফ্যাশন ইত্যাদি বিষয়গুলো কল্পনা করুন। এসব ছিল তাদের নারী-শক্তি, ক্ষমতায়ন। তাদের ক্যারিয়ার।
ফ্যাশন, শিষ্টাচার, ঘরের সাজসজ্জা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, ধর্মভক্তি এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম-এসবের দ্বারা তারা নিজেদের এক দুনিয়া তৈরি করে নিয়েছিল, যার মাঝে নারীরা পূর্ণ ক্ষমতায়িত ছিল। অর্থাৎ, সে সময়কার নারীরা ক্ষমতাবতী ছিলেন না, এরকম নয়। বলা যায়, টাকার মাপকাঠিতে ক্ষমতাবতী ছিলেন না। টাকার মাপকাঠিতে মর্যাদাসম্পন্না ছিলেন না। কিন্তু তারা মর্যাদাসম্পন্না ছিলেন, নিজেদের চারিত্রিক গুণাবলি দিয়ে; ইলম দিয়ে। আমরা বহু নারী আলেমার কথা জানি।
মধ্যবিত্ত নারীরা মাতৃত্ব এবং গৃহজীবনকে একটি 'মিষ্টি পেশা' হিসেবে মনে করত। যা ছিল ফ্যাক্টরি-জবের বিকল্প। তখন বিবাহিত নারীর মূলকর্ম ও পেশা ছিল: মাতৃত্ব, সন্তান প্রতিপালন, সন্তানের শিক্ষাদীক্ষা, পুষ্টি, রুচি, মনমানসিকতা গড়ে তোলা, সন্তানের ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট। এবং ঘরবাড়িটাকে সুন্দর করে ঠিকঠাকমতো গুছিয়ে রাখা; এটাই ছিল তার ক্যারিয়ার, পরিপূর্ণতা ও মর্যাদার স্থান।
একজন নারীর জন্য পরিপক্কতা এবং সম্মান বয়ে আনে বিবাহ। আর মাতৃত্ব দ্বারা নিশ্চিত হতো যে, তিনি প্রকৃত ও পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে পেরেছেন। মাতৃত্বকে দেখা হতো একজন নারীর মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা হিসেবে, এক সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে, রাষ্ট্রের প্রতি একটি কর্তব্য হিসেবে এবং একটি ফুলটাইম কর্মব্যস্ততা হিসেবে। সত্যিকারের মাতৃত্ব দাবি করে যে, নারীরা তাদের সন্তানদের জন্য সর্বদা হাজির থাকবে। সে যখন মা হয়ে যাবে, পৃথিবীতে একটি প্রজন্ম উপহার দেবে, এটাই হবে তার নারীজন্মের সার্থকতা। মাতৃত্বই তার পূর্ণতা। একজন নারীর সমাজসেবাই হচ্ছে, সমাজের জন্য একটি আদর্শ সন্তান রেখে যাওয়া। দেশ ও সমাজের প্রতি তার কর্তব্য হচ্ছে, একজন সুস্থ, সুষ্ঠু মনমানসিকতা ও রুচিসম্পন্ন এক বা একাধিক নাগরিক দুনিয়ায় রেখে যাওয়া। আর এটিই হচ্ছে তার ফুলটাইম জব।
অর্থাৎ, আজকে আমরা নারীর ক্যারিয়ার বলতে, নারীর ক্ষমতায়ন বলতে, নারীর স্বাবলম্বী হওয়া ও মর্যাদা-সম্মান বলতে যে জিনিসটা বুঝি; এই ব্যাপারটা চিরকাল এমন ছিল না। ইউরোপের বিভিন্ন দর্শনের সম্মিলনে 'ফেমিনিজম' নামে যে একটা জীবনদর্শন তৈরি হয়েছে, তার মাধ্যমে এটা মূলত পুঁজিবাদের এজেন্ডা, ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। [১২০] নারীকে জবমার্কেটে নিয়ে আসতে হবে। [১২১]
টিকাঃ
[১২০] Nancy Fraser, American critical theorist, feminist, and the Henry A. and Louise Loeb Professor of Political and Social Science and professor of philosophy at The New School in New York City, তিনি বলেন : "পুরুষ জীবিকা উপার্জন করবে, নারী ঘর সামলাবে—এই পরিবার কাঠামো (male breadwinner-female homemaker family) ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত পুঁজিবাদের কেন্দ্রবিন্দু। নারীবাদের নামে আমরা এই কাঠামোটার সমালোচনা করেছিলাম। এই সমালোচনা এখন কাজে লাগাচ্ছে কর্পোরেট বেসরকারি পুঁজিবাদ (flexible capitalism)। কেননা বেসরকারি পুঁজিবাদ নির্ভরই করে নারীর শ্রমের ওপর, বিশেষ করে সেবা ও শিল্প খাতে নারীর কমমূল্যের শ্রমের ওপর। যেহেতু মেয়েরা শ্রমবাজারে বানের মতো আসছে, আগের সেই পরিবারকাঠামো বদলে এই শ্রম কেবল তরুণী অবিবাহিতারা দেয় তা না, বরং বিবাহিতা ও মায়েরাও দিচ্ছে। কেবল কট্টর নারীবাদীরাই দেয় তা না, বরং সব জাতির মেয়েরাই দিয়ে চলেছে। সারা দুনিয়াতেই হয়েছে, 'দুই রোজগেরে' পরিবার (two-earner family), নারীবাদের কারণে।"
[১২১] [How feminism became capitalism's handmaiden - and how to reclaim it, Nancy Fraser Feminism, Capitalism, and the Cunning of History]
[১২২] Lynn Abrams (Glasgow University). Ideals of Womanhood in Victorian Britain (2012)