📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 ইসলাম হচ্ছে মধ্যপন্থা

📄 ইসলাম হচ্ছে মধ্যপন্থা


ক্যারিয়ারের সাথে কি দুনিয়াবিমুখতা সাংঘর্ষিক? সারকথা হলো: না, ইসলামে জীবিকা (মুমিনের ক্যারিয়ার) ও দুনিয়াবিমুখতা সাংঘর্ষিক না। বরং এই দুটোর মধ্যে আমাদের একটা ব্যালেন্স তৈরি করতে হবে। ফরজ পরিমাণ আয় 'প্লাস' সঞ্চয় 'প্লাস' দান-সদকার জন্য এক্সট্রা আয়-এই টোটাল আয়টা এবং দুনিয়াবিমুখতা ও সাদাসিধে জীবনের মধ্যে ব্যালেন্স করতে হবে।
আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমরা প্রোডাক্টিভ হব। আমরা ব্যবসায় লাভ করব, চাকরিতে প্রমোশন পাওয়ার চেষ্টা করব। অফিস-প্রধান হওয়ার চেষ্টা করব, বেশি বেতন পাওয়ার চেষ্টা করব। সবই করব। কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবনে ভোগ করব কম। আয় করব বেশি, ভোগ করব কম। দান-সদকা করে সব আখেরাতে পাঠিয়ে দেবো। সাহাবিগণ আয় কম করতেন, তা কিন্তু না। কিন্তু তারা ভোগ না করে শুধু আখেরাতে পাঠিয়ে দিতেন। তারা কিন্তু গরিব ছিলেন না। তবে অর্থ আসার সাথে সাথেই তারা তা আখেরাতে পাঠিয়ে দিতেন। যেন আখেরাতে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, আমি আখেরাতে জমা করে দিলাম। এটার বদলা আমি আখেরাতে গিয়ে পাব।
মূলকথা হচ্ছে, তারা আয় করতেন অনেক; যেকোনো মাধ্যমে হোক, ভাতার মাধ্যমে হোক, বা ব্যবসার মাধ্যমে হোক, আয় থাকত অনেক, কিন্তু তাদের জীবন ছিল সাদাসিধে। জীবন ছিল মধ্যমপন্থার।
খাব্বাব রা. সবচেয়ে গরিব সাহাবিদের একজন ছিলেন। ১৩ কোটি টাকা তার কাছে মৃত্যুর সময় ছিল। তিনি পুরো টাকাটাকে উন্মুক্ত করে একটা ফান্ড তৈরি করে চলে গেলেন। সেই ফান্ড থেকে গরিব মানুষেরা করজে হাসানা নিত। সাহাবি হজরত উসমান রা. মৃত্যুর সময় সব দান করে দিয়েছেন। দেখুন সাহাবায়ে কেরাম কত চালাক ছিলেন, মৃত্যুর সময় সব টাকা আখেরাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তারা ছিলেন চালাক। আর আমরা হলাম বোকা। আমরা দুনিয়াতে জমিয়ে রেখে যাই। পরে বারো ভূতে লুটে খায়। আর তারা টাকা আসার সাথে সাথে আখেরাতে পাঠিয়ে দিতেন। যেহেতু আসল জীবন হচ্ছে আখেরাতের জীবন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "আবু বকরের সম্পদ আমার যেরকম উপকার করেছে, অন্য কারও সম্পদ সেরকম করেনি।" আবু বকর রা. মক্কার জীবনে ছিলেন কুরাইশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী ও ধনী।
তাবুকের যুদ্ধে উসমান রা. একাই ৯৪০টি উট [৮৭] ও ৬০টি ঘোড়া সদকা করেন। ধরুন আজকের দিনে ১০০০টা গাড়ি। ৩৫ হাজার দিরহামে রুমা কূপ কিনে ওয়াকফ করেন। ২৫ হাজার দিরহামে জমি কিনে মসজিদে নববি সম্প্রসারণ করেন। [৮৮]
আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. ছিলেন সাহাবিদের মাঝে সবচেয়ে ধনী। তার দানের একেকটা লটবহর ছিল : একবারে ১০০০ ঘোড়া দিলেন, একবারে ৩০টি গোলাম মুক্ত করলেন [৮৯], একবারে ৪০ হাজার দিরহামে জমি কিনে আম্মাজানদের হাদিয়া দিয়ে দিলেন।
তালহা রা.-এর আয় ছিল প্রতিদিন ১০০০ দিরহাম (আড়াই-তিন লক্ষ টাকা)। খেতখামার ও ঘরবাড়ি থেকে আসা আয়ই ছিল ৩ কোটি দিরহাম। যুবাইর রা.-এর মদিনায় ১১টি বাড়ি ছিল, বসরায় ২টি, কুফায় ১টি, মিসরে ১টি। পুরো সম্পদের মূল্য ছিল ৫ কোটি দিরহাম। অথচ নবিজি বলে গেছেন, তালহা ও যুবাইর জান্নাতে আমার প্রতিবেশী। [৯০]

| সাহাবি | অর্থনৈতিক অবস্থা (আজকের হিসাবে) | শেষ পরিণতি |
| --- | --- | --- |
| উসমান রা. | মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকা | সব দান |
| আম্মা যাইনাব রা. | বার্ষিক ভাতা দেড় কোটি টাকা | সাথে সাথে দান |
| খাব্বাব রা. | ১৩ কোটি টাকা | উন্মুক্ত ফান্ড করে যান |
| আম্মা আয়িশা রা. | বার্ষিক দেড় কোটি টাকা ভাতা একবার ১০ কোটি টাকা এলো মুয়াবিয়া রা. পাঠান ১৫ কোটি টাকা ভাগনে দেন ১৫ কোটি টাকা | ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব দান পাওয়ামাত্র দান |
| তালহা রা. | মৃত্যুকালে রেখে যান: ২০ লক্ষ দিরহাম ৩০০ উট বহন করতে পারে, এই পরিমাণ স্বর্ণ | |
| আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. | ইনতেকালের সময় ৩১০,৩০,০০,০০০ (৩১০ কোটি ৩০ লক্ষ) দিনার রেখে যান। ৫০ হাজার দিনার দান প্রত্যেক স্ত্রী ৮০ হাজার দিনার বদরী সাহাবী প্রত্যেকে ৪০০ দিনার (১০০ জন জীবিত ছিলেন) | |

১ দিনার = ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ। ১ গ্রাম স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য হলো ৭৫০০ টাকা। অর্থাৎ ১ দিনার = ৩১,৮৭৫ টাকা। নবিজি একটা ছাগল কেনার জন্য একজনকে ১ দিনার দিয়েছিলেন। তিনি সেই ১ দিনার দিয়ে দুইটা ছাগল কিনেছিলেন। এখন দুইটা ছাগলের মূল্য ৩০ হাজার টাকাই হবে।
সেই হিসেবে ইবনে আওফের সম্পদের বর্তমান মূল্য হলো ১৩ লক্ষ কোটি টাকা। ডলারের হিসাবে এটার মূল্য ৮৮৬ বিলিয়ান ডলার। তুলনীয়: মার্চ ২০২৩-এ ইলন মাস্কের সম্পদ ১৮৬ বিলিয়ন ডলার।

মোটকথা, সাহাবায়ে কেরামের আয় ছিল অনেক। যখন বিভিন্ন দিকে ইসলামের বিজয় সূচিত হলো, এরপরে সাহাবিরা প্রত্যেকেই ধনী ছিলেন। তবে তারা পুরো অর্থটাই বা বেশিরভাগ আখিরাতে পাঠিয়ে দিতেন। দুনিয়া তাদের কাছে আসত, কিন্তু তাদের মনের মধ্যে তা প্রবেশ করতে পারত না।
লাইফস্টাইল হবে বেশি করুণও না, বেশি জাঁকজমকপূর্ণও না। নরমাল, সাদাসিধে। সুতরাং এই দুটোর ওপর ব্যালেন্স করাই হচ্ছে, আপনার ইসলামের ওপর থাকা। আপনি আয় করবেন বেশি, কিন্তু ভোগ করবেন কম। আপনার ভোগের জীবন থাকা যাবে না, আপনার থাকতে হবে দান-সদকার জীবন।
"তোমরা জেনে রাখো যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়। তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখেরাতে আছে কঠিন আজাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।" [৯১]
■ ধনসম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা করা যাবে না। যেমন, অমুকে ঢাকায় বাড়ি বানিয়েছে, আর আমি এখানেই পড়ে আছি! আমাকেও তা করতে হবে। অমুকের মেয়ে গাড়িতে চড়ে স্কুলে যায়, আমি এখনো কিছুই কিনতে পারলাম না! দুনিয়ার এই প্রতিযোগিতা আমরা কিছুতেই করব না। দুনিয়া নিয়ে পারস্পরিক গর্ব-অহংকার করব না। যেমন, "আমি অনেক টাকাপয়সা কামিয়েছি, আমি তো অনেক বড় হয়ে গেলাম"-এইরকম ক্যারিয়ার নিয়ে গর্ব-অহংকার আমরা করব না, প্রতিযোগিতা করব না।
■ এবং আমরা শোভা-সৌন্দর্য গ্রহণ করব না। বেশি বেশি জাঁকজমক, ডিজাইন, প্রতি মাসে নতুন নতুন কাপড়-বিলাসিতা বলতে যা বোঝায়, এটা আমরা এড়িয়ে চলব।
■ অহেতুক ক্রীড়া-কৌতুকের পেছনে আমরা ছুটব না। অপ্রয়োজনে খরচ করব না। বর্তমান ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ব্যবস্থা, ক্রেডিট কার্ডের ধারণা, উইন্ডো শপিং (অহেতুক বাজারে ঘোরাফেরা) এগুলো সবই এমন জিনিস কেনার কাজে আমাদেরকে প্ররোচিত করে। [৯২]
হাদিসে এসেছে যে, পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত আদমসন্তান হাশরের ময়দানে একটা কদমও এগোতে পারবে না। সেই পাঁচটা প্রশ্ন হলো-
এক. জীবনকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?
দুই. যৌবনকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?
তিন. কোন পথে আয় করেছ?
চার. কোন পথে ব্যয় করেছ?
পাঁচ. অর্জিত জ্ঞান অনুসারে কতটুকু আমল করেছ? [৯৩]
এর মানে, কোন পথে আয় করেছি এবং কীভাবে আমি টাকাটা ব্যয় করলাম তার হিসেবও আমাকে দিতে হবে। সুতরাং উল্লিখিত কয়টা কাজে আমি দুনিয়াকে ব্যবহার করব না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “দুনিয়ার জীবনটা ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই না।” কারণ, দুনিয়া বাইডিফল্টই এমন। কিন্তু দুনিয়া আমাদেরকে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, জীবিকা উপার্জন করতে বলা হয়েছে, দান-সদকা করতে বলা হয়েছে এবং বৃদ্ধ বয়সের জন্য সঞ্চয় করতেও বলা হয়েছে। যেহেতু এটি আল্লাহ ও তার রাসুলের হুকুম। তাই আমরা এটা করব। রিজিক তো আসে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে, আসল জীবন তো আখেরাতই। কিন্তু আল্লাহ ও রাসুল করতে বলেছেন বলেই করি। এভাবে আমরা নিয়তটাকে ঠিক করব।

টিকাঃ
[৮৭] ১৪০০ বছর আগে মক্কায় ৮০ দিরহাম অর্থাৎ সাড়ে ১১ হাজার টাকা দিয়ে একটি মাঝারি সাইজের উট পাওয়া যেত।
[৮৮] ১ দিরহামে একটা মুরগি পাওয়া যেত। দেড় কেজির ব্রয়লার ২০০ টাকা। আবার ১ দিরহাম সমান ৩ গ্রাম রুপা। মার্চ ২০২৩-এ পুরাতন রুপার দাম ৯০ টাকা/গ্রাম, ক্যারেটভেদে ১২০-৪৭ টাকা। সেই হিসেবে ১ দিরহাম সমান আজকে ২৫০-৩০০ টাকা ধরুন। তাহলে রুমা কূপ পড়েছে ৮৫ লক্ষ-১ কোটি টাকা। জমির দাম ৬২-৭৫ লাখ টাকা।
[৮৯] সাধারণত তখন দাস-দাসীর মূল্য ছিল প্রায় ৫০০ দিরহাম, অর্থাৎ ৭০ হাজার টাকা।
[৯০] সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৪১
[৯১] সুরা হাদিদ: ২০
[৯২] শরীরচর্চা ছাড়া।
[৯৩] সহিহুল বুখারি : ২৯৭৭; সহিহ মুসলিম: ৫২৩; সুনানুন নাসায়ি: ৪২৮০

ফন্ট সাইজ
15px
17px