📄 দুনিয়া বনাম হায়াতুদ-দুনিয়া
দুনিয়া (পৃথিবী) ও হায়াতুদ দুনিয়া (পার্থিব জীবন)-এর ব্যবহার কুরআনে ভিন্নভাবে এসেছে। যত জায়গায় আল্লাহ 'হায়াতুদ দুনিয়া' ব্যবহার করেছেন, নেগেটিভ অর্থে করেছেন:
■ আর দুনিয়ার জীবন খেলাধুলা ও তামাশা ছাড়া কিছু না। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাস উত্তম। অতএব তোমরা কি বুঝবে না? [৭৩]
■ হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হলো, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় (যুদ্ধে) বের হও, তখন তোমরা জমিনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়ো? তবে কি তোমরা আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী আখেরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। [৭৪]
■ হে মানুষ, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য; অতএব দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে; আর বড় প্রতারক (শয়তান) যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে প্রতারণা না করে। [৭৫]
■ মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তানসন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং খেতখামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আল্লাহর কাছেই হলো উত্তম আশ্রয়স্থল। [৭৬]
■ অনন্তর যে সীমালঙ্ঘন করে এবং দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়, জাহান্নামই হবে তার আবাস। পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস। [৭৭]
• তোমরা জেনে রেখো! পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্বপ্রকাশ, ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে প্রাচুর্যলাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়। [৭৮]
• বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখেরাতই উৎকৃষ্টতর এবং স্থায়ী। এটি তো আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থে, ইবরাহিম ও মুসার কিতাবে। [৭৯]
• যারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের চেয়ে ভালোবাসে, মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ থেকে এবং আল্লাহর পথ বক্র করতে চায়; তারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছে। [৮০]
বিপরীতে যেসব স্থানে শুধু দুনিয়া উল্লেখ করেছেন, সেখানে পজিটিভ অর্থে ব্যবহার করেছেন। দেখুন:
• আর তাদের মধ্যে এমনও আছে, যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। [৮১]
• যে-কেউ দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করবে, তার জেনে রাখা প্রয়োজন যে, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ আল্লাহরই নিকট রয়েছে। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও দেখেন। [৮২]
• অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দিলেন দুনিয়ার প্রতিদান এবং আখেরাতের উত্তম সওয়াব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন। [৮৩]
• মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে-কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে 'পবিত্র জীবন' দান করব। আর অবশ্যই আমি তাদের যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান প্রদান করব।' (সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাসসিরের মতে, এই আয়াতে 'হায়াতে তাইয়েবা' বলতে দুনিয়ার পবিত্র ও আনন্দময় জীবনকে বোঝানো হয়েছে।) [৮৪]
অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনকে ভালোবাসা যাবে না, প্রাধান্য দেওয়া যাবে না, অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না। তবে দুনিয়ার উপকরণ প্রয়োজনীয় ও জরুরি। দুনিয়ার সাথে হাত লাগাতে হবে, অন্তর লাগানো যাবে না। দুনিয়া থাকবে হাতে, মনে নয়। ঠিক যেমনটি বলেছেন ইমাম গাযালি, ইবনুল কাইয়িম (৬৯১- ৭৫১ হিজরি) রহ, এবং আলি রা.-ও।
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (৯৭-১৬১) রহ. বিখ্যাত ফকিহ ও দুনিয়াবিমুখ আলেম ছিলেন। কিন্তু ধনী ছিলেন। একজন তাকে তিরস্কার করলে তিনি জবাব দিলেন, চুপ থাকো। যদি এই সম্পদ আমাদের না থাকত, তবে রাজাবাদশারা আমাদেরকে রুমালের মতো ব্যবহার করত। (তুলনা করুন আজকে)... শক্ত রুটি খাওয়া আর শক্ত পোশাক পরা জুহ্দ নয়, বরং জুহ্দ হচ্ছে দুনিয়া তোমার হাতে থাকলেও তোমার মাঝে প্রবেশ করবে না। দুনিয়ার সম্পদ তোমার হাতে আসুক বা না আসুক, তুমি তার জন্য উতলা হবে না। এটাই হচ্ছে জুহদ। [৮৫]
আলি রা.-এর একটা বিখ্যাত কথা আছে এমন : একজন মানুষ ধনী হওয়া সত্ত্বেও জাহেদ অর্থাৎ দুনিয়াবিমুখ হতে পারে। আবার কেউ গরিব কিন্তু তার অন্তরের মধ্যে দুনিয়া ঢুকে আছে। সে আরও দুনিয়া চায়, আরও দুনিয়া চায়। সে মানুষ হিসেবে গরিব, কিন্তু তার মধ্যে মালের প্রতি মুহাব্বত, টাকার প্রতি মুহাব্বত এই জিনিসগুলো আছে। তাহলে এই গরিব লোকটাই দুনিয়ালোভী। আবার একজন লোকের অনেক টাকাপয়সা আছে, কিন্তু সে আখেরাতমুখী। সে দান-সদকা করছে, দুনিয়ার লোভ-লালসাগুলো তার মধ্যে নেই। তাহলে এই লোকটা দুনিয়াবিমুখ। সুতরাং ধনী হয়েও দুনিয়াবিমুখ হওয়া সম্ভব, গরিব হয়েও দুনিয়ালোভী হওয়া সম্ভব। এটা হচ্ছে আলি রা.-এর কথার মূল উদ্দেশ্য। ধনী হওয়া দুনিয়াবিমুখতার সাথে সাংঘর্ষিক না।
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, অর্থসম্পদ যখন আপনার অন্তরে না থেকে হাতে থাকবে, তখন অগাধ সম্পদও আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর সম্পদ যখন আপনার অন্তরে ঠাঁই পাবে, তখন আপনার হাতে একটা পয়সা না থাকলেও, তা আপনার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। [৮৬]
ইমাম গাযালি রহিমাহুল্লাহর একটা চমৎকার উক্তি আছে। নৌকা পানিতে চলবে, কিন্তু তাতে যেমন পানি ঢুকতে দেওয়া যাবে না, আমরাও চলব দুনিয়ার ওপর দিয়ে, দুনিয়ার টাকাপয়সা-ধনদৌলতের ওপর দিয়ে, কিন্তু দুনিয়া যেন আমাদের অন্তরের মধ্যে ঢুকতে না পারে। দুনিয়ার লোভ, দুনিয়ার ভালোবাসা যেন অন্তরের মধ্যে না ঢোকে। চলব দুনিয়ার মধ্য দিয়েই; কিন্তু অন্তর থাকবে খালি। অন্তরটা শুধু আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য, শুধু আখেরাতের স্মরণের জন্য, শুধু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার জন্য। কাজেই এর মধ্যে কোনো দুনিয়া থাকবে না। কোনো লালসা থাকবে না, লোভ থাকবে না।
টিকাঃ
[৭৩] সুরা আনআম: ৩২
[৭৪] সুরা তাওবা: ৩৮
[৭৫] সুরা ফাতির : ৫
[৭৬] সুরা আলে-ইমরান: ১৪
[৭৭] সুরা নাজিয়াত: ৩৭-৪১
[৭৮] সুরা হাদিদ: ২০
[৭৯] সুরা আলা: ১৬-১৯
[৮০] সুরা ইবরাহিম : ০৩
[৮১] সুরা বাকারা: ২০১
[৮২] সুরা নিসা: ১৩৪
[৮৩] সুরা আলে-ইমরান: ১৪৮
[৮৪] সুরা নাহল : ৯৭
[৮৫] ইসলাম জামাল, সচ্ছল হও অক্ষম থেকো না, রুহামা পাবলিকেশন।
[৮৬] ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালেকিন: ১/৪৬৩
📄 ইসলাম হচ্ছে মধ্যপন্থা
ক্যারিয়ারের সাথে কি দুনিয়াবিমুখতা সাংঘর্ষিক? সারকথা হলো: না, ইসলামে জীবিকা (মুমিনের ক্যারিয়ার) ও দুনিয়াবিমুখতা সাংঘর্ষিক না। বরং এই দুটোর মধ্যে আমাদের একটা ব্যালেন্স তৈরি করতে হবে। ফরজ পরিমাণ আয় 'প্লাস' সঞ্চয় 'প্লাস' দান-সদকার জন্য এক্সট্রা আয়-এই টোটাল আয়টা এবং দুনিয়াবিমুখতা ও সাদাসিধে জীবনের মধ্যে ব্যালেন্স করতে হবে।
আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমরা প্রোডাক্টিভ হব। আমরা ব্যবসায় লাভ করব, চাকরিতে প্রমোশন পাওয়ার চেষ্টা করব। অফিস-প্রধান হওয়ার চেষ্টা করব, বেশি বেতন পাওয়ার চেষ্টা করব। সবই করব। কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবনে ভোগ করব কম। আয় করব বেশি, ভোগ করব কম। দান-সদকা করে সব আখেরাতে পাঠিয়ে দেবো। সাহাবিগণ আয় কম করতেন, তা কিন্তু না। কিন্তু তারা ভোগ না করে শুধু আখেরাতে পাঠিয়ে দিতেন। তারা কিন্তু গরিব ছিলেন না। তবে অর্থ আসার সাথে সাথেই তারা তা আখেরাতে পাঠিয়ে দিতেন। যেন আখেরাতে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, আমি আখেরাতে জমা করে দিলাম। এটার বদলা আমি আখেরাতে গিয়ে পাব।
মূলকথা হচ্ছে, তারা আয় করতেন অনেক; যেকোনো মাধ্যমে হোক, ভাতার মাধ্যমে হোক, বা ব্যবসার মাধ্যমে হোক, আয় থাকত অনেক, কিন্তু তাদের জীবন ছিল সাদাসিধে। জীবন ছিল মধ্যমপন্থার।
খাব্বাব রা. সবচেয়ে গরিব সাহাবিদের একজন ছিলেন। ১৩ কোটি টাকা তার কাছে মৃত্যুর সময় ছিল। তিনি পুরো টাকাটাকে উন্মুক্ত করে একটা ফান্ড তৈরি করে চলে গেলেন। সেই ফান্ড থেকে গরিব মানুষেরা করজে হাসানা নিত। সাহাবি হজরত উসমান রা. মৃত্যুর সময় সব দান করে দিয়েছেন। দেখুন সাহাবায়ে কেরাম কত চালাক ছিলেন, মৃত্যুর সময় সব টাকা আখেরাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তারা ছিলেন চালাক। আর আমরা হলাম বোকা। আমরা দুনিয়াতে জমিয়ে রেখে যাই। পরে বারো ভূতে লুটে খায়। আর তারা টাকা আসার সাথে সাথে আখেরাতে পাঠিয়ে দিতেন। যেহেতু আসল জীবন হচ্ছে আখেরাতের জীবন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "আবু বকরের সম্পদ আমার যেরকম উপকার করেছে, অন্য কারও সম্পদ সেরকম করেনি।" আবু বকর রা. মক্কার জীবনে ছিলেন কুরাইশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী ও ধনী।
তাবুকের যুদ্ধে উসমান রা. একাই ৯৪০টি উট [৮৭] ও ৬০টি ঘোড়া সদকা করেন। ধরুন আজকের দিনে ১০০০টা গাড়ি। ৩৫ হাজার দিরহামে রুমা কূপ কিনে ওয়াকফ করেন। ২৫ হাজার দিরহামে জমি কিনে মসজিদে নববি সম্প্রসারণ করেন। [৮৮]
আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. ছিলেন সাহাবিদের মাঝে সবচেয়ে ধনী। তার দানের একেকটা লটবহর ছিল : একবারে ১০০০ ঘোড়া দিলেন, একবারে ৩০টি গোলাম মুক্ত করলেন [৮৯], একবারে ৪০ হাজার দিরহামে জমি কিনে আম্মাজানদের হাদিয়া দিয়ে দিলেন।
তালহা রা.-এর আয় ছিল প্রতিদিন ১০০০ দিরহাম (আড়াই-তিন লক্ষ টাকা)। খেতখামার ও ঘরবাড়ি থেকে আসা আয়ই ছিল ৩ কোটি দিরহাম। যুবাইর রা.-এর মদিনায় ১১টি বাড়ি ছিল, বসরায় ২টি, কুফায় ১টি, মিসরে ১টি। পুরো সম্পদের মূল্য ছিল ৫ কোটি দিরহাম। অথচ নবিজি বলে গেছেন, তালহা ও যুবাইর জান্নাতে আমার প্রতিবেশী। [৯০]
| সাহাবি | অর্থনৈতিক অবস্থা (আজকের হিসাবে) | শেষ পরিণতি |
| --- | --- | --- |
| উসমান রা. | মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকা | সব দান |
| আম্মা যাইনাব রা. | বার্ষিক ভাতা দেড় কোটি টাকা | সাথে সাথে দান |
| খাব্বাব রা. | ১৩ কোটি টাকা | উন্মুক্ত ফান্ড করে যান |
| আম্মা আয়িশা রা. | বার্ষিক দেড় কোটি টাকা ভাতা একবার ১০ কোটি টাকা এলো মুয়াবিয়া রা. পাঠান ১৫ কোটি টাকা ভাগনে দেন ১৫ কোটি টাকা | ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব দান পাওয়ামাত্র দান |
| তালহা রা. | মৃত্যুকালে রেখে যান: ২০ লক্ষ দিরহাম ৩০০ উট বহন করতে পারে, এই পরিমাণ স্বর্ণ | |
| আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. | ইনতেকালের সময় ৩১০,৩০,০০,০০০ (৩১০ কোটি ৩০ লক্ষ) দিনার রেখে যান। ৫০ হাজার দিনার দান প্রত্যেক স্ত্রী ৮০ হাজার দিনার বদরী সাহাবী প্রত্যেকে ৪০০ দিনার (১০০ জন জীবিত ছিলেন) | |
১ দিনার = ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ। ১ গ্রাম স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য হলো ৭৫০০ টাকা। অর্থাৎ ১ দিনার = ৩১,৮৭৫ টাকা। নবিজি একটা ছাগল কেনার জন্য একজনকে ১ দিনার দিয়েছিলেন। তিনি সেই ১ দিনার দিয়ে দুইটা ছাগল কিনেছিলেন। এখন দুইটা ছাগলের মূল্য ৩০ হাজার টাকাই হবে।
সেই হিসেবে ইবনে আওফের সম্পদের বর্তমান মূল্য হলো ১৩ লক্ষ কোটি টাকা। ডলারের হিসাবে এটার মূল্য ৮৮৬ বিলিয়ান ডলার। তুলনীয়: মার্চ ২০২৩-এ ইলন মাস্কের সম্পদ ১৮৬ বিলিয়ন ডলার।
মোটকথা, সাহাবায়ে কেরামের আয় ছিল অনেক। যখন বিভিন্ন দিকে ইসলামের বিজয় সূচিত হলো, এরপরে সাহাবিরা প্রত্যেকেই ধনী ছিলেন। তবে তারা পুরো অর্থটাই বা বেশিরভাগ আখিরাতে পাঠিয়ে দিতেন। দুনিয়া তাদের কাছে আসত, কিন্তু তাদের মনের মধ্যে তা প্রবেশ করতে পারত না।
লাইফস্টাইল হবে বেশি করুণও না, বেশি জাঁকজমকপূর্ণও না। নরমাল, সাদাসিধে। সুতরাং এই দুটোর ওপর ব্যালেন্স করাই হচ্ছে, আপনার ইসলামের ওপর থাকা। আপনি আয় করবেন বেশি, কিন্তু ভোগ করবেন কম। আপনার ভোগের জীবন থাকা যাবে না, আপনার থাকতে হবে দান-সদকার জীবন।
"তোমরা জেনে রাখো যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়। তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখেরাতে আছে কঠিন আজাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।" [৯১]
■ ধনসম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা করা যাবে না। যেমন, অমুকে ঢাকায় বাড়ি বানিয়েছে, আর আমি এখানেই পড়ে আছি! আমাকেও তা করতে হবে। অমুকের মেয়ে গাড়িতে চড়ে স্কুলে যায়, আমি এখনো কিছুই কিনতে পারলাম না! দুনিয়ার এই প্রতিযোগিতা আমরা কিছুতেই করব না। দুনিয়া নিয়ে পারস্পরিক গর্ব-অহংকার করব না। যেমন, "আমি অনেক টাকাপয়সা কামিয়েছি, আমি তো অনেক বড় হয়ে গেলাম"-এইরকম ক্যারিয়ার নিয়ে গর্ব-অহংকার আমরা করব না, প্রতিযোগিতা করব না।
■ এবং আমরা শোভা-সৌন্দর্য গ্রহণ করব না। বেশি বেশি জাঁকজমক, ডিজাইন, প্রতি মাসে নতুন নতুন কাপড়-বিলাসিতা বলতে যা বোঝায়, এটা আমরা এড়িয়ে চলব।
■ অহেতুক ক্রীড়া-কৌতুকের পেছনে আমরা ছুটব না। অপ্রয়োজনে খরচ করব না। বর্তমান ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ব্যবস্থা, ক্রেডিট কার্ডের ধারণা, উইন্ডো শপিং (অহেতুক বাজারে ঘোরাফেরা) এগুলো সবই এমন জিনিস কেনার কাজে আমাদেরকে প্ররোচিত করে। [৯২]
হাদিসে এসেছে যে, পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত আদমসন্তান হাশরের ময়দানে একটা কদমও এগোতে পারবে না। সেই পাঁচটা প্রশ্ন হলো-
এক. জীবনকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?
দুই. যৌবনকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?
তিন. কোন পথে আয় করেছ?
চার. কোন পথে ব্যয় করেছ?
পাঁচ. অর্জিত জ্ঞান অনুসারে কতটুকু আমল করেছ? [৯৩]
এর মানে, কোন পথে আয় করেছি এবং কীভাবে আমি টাকাটা ব্যয় করলাম তার হিসেবও আমাকে দিতে হবে। সুতরাং উল্লিখিত কয়টা কাজে আমি দুনিয়াকে ব্যবহার করব না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “দুনিয়ার জীবনটা ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই না।” কারণ, দুনিয়া বাইডিফল্টই এমন। কিন্তু দুনিয়া আমাদেরকে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, জীবিকা উপার্জন করতে বলা হয়েছে, দান-সদকা করতে বলা হয়েছে এবং বৃদ্ধ বয়সের জন্য সঞ্চয় করতেও বলা হয়েছে। যেহেতু এটি আল্লাহ ও তার রাসুলের হুকুম। তাই আমরা এটা করব। রিজিক তো আসে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে, আসল জীবন তো আখেরাতই। কিন্তু আল্লাহ ও রাসুল করতে বলেছেন বলেই করি। এভাবে আমরা নিয়তটাকে ঠিক করব।
টিকাঃ
[৮৭] ১৪০০ বছর আগে মক্কায় ৮০ দিরহাম অর্থাৎ সাড়ে ১১ হাজার টাকা দিয়ে একটি মাঝারি সাইজের উট পাওয়া যেত।
[৮৮] ১ দিরহামে একটা মুরগি পাওয়া যেত। দেড় কেজির ব্রয়লার ২০০ টাকা। আবার ১ দিরহাম সমান ৩ গ্রাম রুপা। মার্চ ২০২৩-এ পুরাতন রুপার দাম ৯০ টাকা/গ্রাম, ক্যারেটভেদে ১২০-৪৭ টাকা। সেই হিসেবে ১ দিরহাম সমান আজকে ২৫০-৩০০ টাকা ধরুন। তাহলে রুমা কূপ পড়েছে ৮৫ লক্ষ-১ কোটি টাকা। জমির দাম ৬২-৭৫ লাখ টাকা।
[৮৯] সাধারণত তখন দাস-দাসীর মূল্য ছিল প্রায় ৫০০ দিরহাম, অর্থাৎ ৭০ হাজার টাকা।
[৯০] সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৪১
[৯১] সুরা হাদিদ: ২০
[৯২] শরীরচর্চা ছাড়া।
[৯৩] সহিহুল বুখারি : ২৯৭৭; সহিহ মুসলিম: ৫২৩; সুনানুন নাসায়ি: ৪২৮০