📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 বস্তুগত জীবিকা উপার্জনের বিধান

📄 বস্তুগত জীবিকা উপার্জনের বিধান


ইসলামে জীবিকার গুরুত্ব
• হালাল জীবিকা অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (আলজামিউস সগির লিস-সুযুতি, হাদিস: ৫২৭২) প্রত্যেক মুসলিম বলতে যদিও নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, কিন্তু এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পুরুষের ওপর তার অধীনস্থদের ভরণপোষণ ওয়াজিব, নারীদের ওপর নয়। এর আলোচনা পরে বিস্তারিত আসবে।
■ ফরজ সালাতের পর, জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ। (তাবারানি, বাইহাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

তার মানে, আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন, ফরজ নামাজের পরে তোমরা বেরিয়ে পড়ো, এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করো। সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ফরজ সালাতের পরে জীবিকা অনুসন্ধানের যে তাগিদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ফরজের পর আরেকটা ফরজের হুকুম আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।

ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হিজরি) রহিমাহুল্লাহর ছাত্র, ইমাম মুহাম্মদ আশ-শাইবানি (১৩২-১৮৯ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ। তার একটি বই আছে, মাকতাবাতুল বায়ান থেকে সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—'জীবিকার খোঁজে'। সেখানে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা পাবেন। ইসলাম যে দুনিয়াবিমুখতার কথা বলে, সেই দুনিয়া-বিমুখতার সাথে জীবিকা উপার্জন বা ক্যারিয়ারের সমন্বয় সম্পর্কে বইটিতে চমৎকার আলোচনা আছে।

• যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না; সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ। ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ। [৩০]
• মুমিনের দেহ হলো তার বাহন, সে যেন বাহনের সাথে উত্তম আচরণ করে। [৩১]

অর্থাৎ, আমার এই দেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য, এই দেহ যদি অসুস্থ হয়ে যায়, এটিকে সুস্থ করার জন্য আমাকে জীবিকা উপার্জন করতে হবে। এই বাহনের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। খাদ্য-পোশাক-আবাস দিতে হবে। সেটা ফ্রি পাওয়া যায় না, সেজন্য অর্থকড়ি লাগবে। এই টাকার ব্যবস্থাটা আমরা দুইভাবে করতে পারি।
হয় আমাকে কারও কাছ থেকে ডাকাতি করতে হবে, কারও কাছ থেকে ছিনতাই করতে হবে, দোকানপাট লুট করতে হবে।
অথবা আমাকে জীবিকা উপার্জন করে, টাকা কামাই করে, সেটা দিয়ে দোকানে গিয়ে কিনতে হবে।
প্রথম রাস্তা হলো হারাম, আর হালাল রাস্তা হলো, জীবিকা উপার্জন করা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামে জীবিকা অনুসন্ধান করা ফরজ একটি আমল।

টিকাঃ
[৩০] কিতাবুল কাসব লি মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, পৃষ্ঠা ৭৩।
[৩১] মুসনাদে আহমদ হাদিস: ৬৬৩৯।

ইসলামে জীবিকার গুরুত্ব
• হালাল জীবিকা অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (আলজামিউস সগির লিস-সুযুতি, হাদিস: ৫২৭২) প্রত্যেক মুসলিম বলতে যদিও নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, কিন্তু এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পুরুষের ওপর তার অধীনস্থদের ভরণপোষণ ওয়াজিব, নারীদের ওপর নয়। এর আলোচনা পরে বিস্তারিত আসবে।
■ ফরজ সালাতের পর, জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ। (তাবারানি, বাইহাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

তার মানে, আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন, ফরজ নামাজের পরে তোমরা বেরিয়ে পড়ো, এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করো। সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ফরজ সালাতের পরে জীবিকা অনুসন্ধানের যে তাগিদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ফরজের পর আরেকটা ফরজের হুকুম আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।

ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হিজরি) রহিমাহুল্লাহর ছাত্র, ইমাম মুহাম্মদ আশ-শাইবানি (১৩২-১৮৯ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ। তার একটি বই আছে, মাকতাবাতুল বায়ান থেকে সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—'জীবিকার খোঁজে'। সেখানে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা পাবেন। ইসলাম যে দুনিয়াবিমুখতার কথা বলে, সেই দুনিয়া-বিমুখতার সাথে জীবিকা উপার্জন বা ক্যারিয়ারের সমন্বয় সম্পর্কে বইটিতে চমৎকার আলোচনা আছে।

• যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না; সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ। ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ। [৩০]
• মুমিনের দেহ হলো তার বাহন, সে যেন বাহনের সাথে উত্তম আচরণ করে। [৩১]

অর্থাৎ, আমার এই দেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য, এই দেহ যদি অসুস্থ হয়ে যায়, এটিকে সুস্থ করার জন্য আমাকে জীবিকা উপার্জন করতে হবে। এই বাহনের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। খাদ্য-পোশাক-আবাস দিতে হবে। সেটা ফ্রি পাওয়া যায় না, সেজন্য অর্থকড়ি লাগবে। এই টাকার ব্যবস্থাটা আমরা দুইভাবে করতে পারি।
হয় আমাকে কারও কাছ থেকে ডাকাতি করতে হবে, কারও কাছ থেকে ছিনতাই করতে হবে, দোকানপাট লুট করতে হবে।
অথবা আমাকে জীবিকা উপার্জন করে, টাকা কামাই করে, সেটা দিয়ে দোকানে গিয়ে কিনতে হবে।
প্রথম রাস্তা হলো হারাম, আর হালাল রাস্তা হলো, জীবিকা উপার্জন করা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামে জীবিকা অনুসন্ধান করা ফরজ একটি আমল।

টিকাঃ
[৩০] কিতাবুল কাসব লি মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, পৃষ্ঠা ৭৩।
[৩১] মুসনাদে আহমদ হাদিস: ৬৬৩৯।

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 কতটুকু উপার্জন ফরজ

📄 কতটুকু উপার্জন ফরজ


যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন ফরজ। এখন কথার কথা, আমাকে গাড়ি কিনতে হবে, বাড়ি করতে হবে, ঢাকায় দুটো বাড়ি কিনতে হবে, কয়েকটা ফ্ল্যাট নিতে হবে, বছর বছর বিদেশে ঘুরতে যেতে হবে—এই জীবিকা অর্জন করা কি ফরজ? মোটেও না! যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন করা ফরজ। সেটা কতটুকু?

১. নিজের খাবার ও পোশাক
মৌলিক চাহিদা যেটাকে বলে আরকি। আধুনিক মৌলিক চাহিদা বলতে বোঝায়, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলিক চাহিদা [৩২] হচ্ছে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী বা জীবনসঙ্গিনী, বাহন। তাহলে প্রথমে হলো, নিজের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা, এর মধ্যে বিবাহ-শাদিও আছে, যানবাহন আছে, মোটরসাইকেল বা সাইকেল হতে পারে। বা আমরা যারা গণপরিবহণে যাতায়াত করি, পরিবহণের ভাড়াটা হতে পারে। এগুলো হচ্ছে ফরজ পরিমাণ।

২. ঋণ শোধ
যদি কোনো ঋণ থাকে আমার ওপরে, সেই ঋণ শোধ করাও আমার ফরজ উপার্জনের মধ্যে পড়ে। এটার জন্য যদি আমি ইনকাম করি, সেটাও ফরজ ইনকাম।

৩. স্ত্রী-সন্তানের খরচ
স্ত্রী-সন্তান-দাসের ভরণপোষণ পুরুষের ওপর ওয়াজিব। এবং পুরুষের একার ওপরই ওয়াজিব। এখানে স্ত্রীর কোনো দায়দায়িত্ব নেই। সুতরাং স্ত্রীর যে মৌলিক চাহিদা, তার খাবারদাবার, পোশাক-আশাক এবং সন্তানের যে মৌলিক চাহিদা, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসাখরচ থেকে শুরু আরও বিভিন্ন বিষয়-আশয়-এ সবকিছু ফরজ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।

৪. বয়স্ক পিতামাতার খরচ
অর্থাৎ, নির্ভরশীল অন্যান্য যারা আছেন, যেমন বয়স্ক পিতামাতা। তাদের যে খরচটা, মৌলিক চাহিদাসহ আরও অন্যান্য বিষয়-আশয়, সেই খরচটাও ফরজ উপার্জনের মধ্যে শামিল।

এই পুরো জিনিসটাকে বলা হচ্ছে ফরজ পরিমাণ ইনকাম। এখন ফরজ পরিমাণ ইনকাম যখন আমার হয়ে গেল, এরপরে দিনের বাকি সময়টা কি আমি আরও ইনকাম করব? নাকি আমি বাকি সময়টা ইবাদতের পেছনে দেবো? এর ব্যাপারে আলেমগণ বলেছেন, ফরজ জীবিকা অর্জনের পর, বাকি সময় ইবাদতে ব্যয় উত্তম। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ।" দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ফরজ জীবিকা উপার্জন যখন হয়ে গেল, এরপর দিনের বাকি সময় আরও জীবিকা কামাই করার ধান্দায় না থেকে ইবাদতে ব্যয় করাই উত্তম। কিন্তু অতিরিক্ত ইনকামেরও সুযোগ আছে। একেবারে নেই যে, তা না। তবে ইবাদত করাটা উত্তম।

ইমাম গাজালি (৪৫০- ৫০৫ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি খুব টাকাপয়সা উপার্জন করছিল। তাকে সবাই দুনিয়াদার বলছে, এবং এরকম কথা বলছে যে, সে যদি অতিরিক্ত এত ইনকাম না করে বাকি সময়টা আল্লাহর রাস্তায় কাটাত, তাহলে কতই-না ভালো হতো। রাসুলের একটা হাদিসের মর্ম এমন-
যখন তোমার সামনে বলা হচ্ছে, "অমুকে অনেক ইনকাম করছে, ইনকামের পেছনে অনেক সময় ব্যয় করছে। সবচেয়ে ভালো হতো, যদি সে ইনকামটা না করে আল্লাহর রাস্তায় সময় দিত।" নবিজি বলেন যে, "তোমরা এরকম বলো না। কেননা, যদি সে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাজকর্ম করে, তবে সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে। (অর্থাৎ, ফরজ পরিমাণ উপার্জন) আর যদি সে নিজের বৃদ্ধ পিতামাতা ও দুর্বল শিশুদের জন্য কাজকর্ম করে, যাতে তারা অভাবগ্রস্ত না হয়, তবুও সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে।" [৩৩]

ঈসা আলাইহিস সালামের একটি কাহিনি আছে। এক ব্যক্তি তার কাছে এলো। ঈসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী করো? লোকটি বলল, আমি আল্লাহর ইবাদত করি। তিনি বললেন, তাহলে তোমার যে খরচাপাতি আছে, এগুলো কে চালায়? লোকটি জবাব দিলো, আমার ভাই চালায়। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম জবাব দেন, তাহলে তো দেখছি তোমার ভাই-ই তোমার চেয়ে বেশি ইবাদত করে। যেহেতু তোমার খরচাপাতিগুলো সে চালাচ্ছে। সে জীবিকার পেছনে সময় দিচ্ছে, আর তুমি এখানে আল্লাহর ইবাদত করছ। তাহলে তো তোমার ভাই-ই আল্লাহর ইবাদত বেশি করছে। সে নিজেও চলছে, তোমাকেও চালাচ্ছে। [৩৪]

তাহলে আমরা এখানে একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে, ফরজ পরিমাণ জীবিকা উপার্জন করা, এটা আল্লাহর রাস্তায় থাকার মতো এবং এটা এক বিরাট বড় নেক আমল। মোটেই এমন না যে, আমি দুনিয়ার প্রয়োজন পুরা করছি বলে এগুলো বেকার হয়ে গেছে। বিলকুল তা নয়, বরং এটা একটা বড় নেক আমল। এবং এর জন্য আল্লাহর দরবারে সওয়াব পাওয়া যাবে।

আরেকটা হাদিস লক্ষ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিজের স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়া, এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম সদকা।" [৩৫] এর মানে, স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য, স্ত্রীর খায়খরচের জন্য আপনি যে ব্যয়টা করবেন, এই ব্যয়টা সদকার সমান। সুতরাং জীবিকা উপার্জন করা এক তো হলো ফরজ। কেউ যদি উপার্জন না করে বসে থাকে, তাহলে সে কবিরা গুনাহের মধ্যে পড়ল। এবং সেইসাথে যদি কেউ উপার্জন করে, তাহলে এটা একটা বিরাট বড় নেক আমল হচ্ছে। ফরজের পরে সে এক বিরাট নফল আমলও করছে, সুবহানাল্লাহ।

টিকাঃ
[৩২] যদিও ইসলামের এ সংক্রান্ত ধারণাটি আরও ব্যাপক ও সমাজের নানা স্তর বিস্তৃত। পাঠকের ধারণার জন্য শুধু শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি। বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছি না। প্রথমত ইসলাম মানুষের প্রয়োজনগুলোকে তিনভাগে ভাগ করে। ক. যরুরিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে প্রাণ রক্ষা পায় না। খ. হাজিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে পেরেশানিমুক্ত স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করা যায় না। গ. তাহসিনিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা হয়ে গেলে, জীবন সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়।
এরপর এগুলো কোনটা কোনস্তরে কতটুকু পরিমাণ লাগবে, এরও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আছে। আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। এর পাশাপাশি ইসলাম আরও পাঁচটিভাগে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে। যথা: ক. হিফজুদ-দীন তথা দীন সংরক্ষণ। খ. হিফজুন নাফস তথা প্রাণ সংরক্ষণ। গ. হিফজুল আকল তথা মস্তিষ্ক সংরক্ষণ। ঙ. হিফজুন নাসল তথা বংশধারা সংরক্ষণ। চ. হিফজুল মাল তথা সম্পদের সংরক্ষণ।
[৩৩] ইমাম গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৩০৬
[৩৪] ইমাম মুহাম্মাদ রহ., আল-কাসব (জীবিকার খোঁজে, মাকতাবাতুল বায়ান)
[৩৫] সহিহুল বুখারি: ২৭৪২; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮; সুনানু আবি দাউদ: ২৮৬৪

যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন ফরজ। এখন কথার কথা, আমাকে গাড়ি কিনতে হবে, বাড়ি করতে হবে, ঢাকায় দুটো বাড়ি কিনতে হবে, কয়েকটা ফ্ল্যাট নিতে হবে, বছর বছর বিদেশে ঘুরতে যেতে হবে—এই জীবিকা অর্জন করা কি ফরজ? মোটেও না! যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন করা ফরজ। সেটা কতটুকু?

১. নিজের খাবার ও পোশাক
মৌলিক চাহিদা যেটাকে বলে আরকি। আধুনিক মৌলিক চাহিদা বলতে বোঝায়, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলিক চাহিদা [৩২] হচ্ছে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী বা জীবনসঙ্গিনী, বাহন। তাহলে প্রথমে হলো, নিজের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা, এর মধ্যে বিবাহ-শাদিও আছে, যানবাহন আছে, মোটরসাইকেল বা সাইকেল হতে পারে। বা আমরা যারা গণপরিবহণে যাতায়াত করি, পরিবহণের ভাড়াটা হতে পারে। এগুলো হচ্ছে ফরজ পরিমাণ।

২. ঋণ শোধ
যদি কোনো ঋণ থাকে আমার ওপরে, সেই ঋণ শোধ করাও আমার ফরজ উপার্জনের মধ্যে পড়ে। এটার জন্য যদি আমি ইনকাম করি, সেটাও ফরজ ইনকাম।

৩. স্ত্রী-সন্তানের খরচ
স্ত্রী-সন্তান-দাসের ভরণপোষণ পুরুষের ওপর ওয়াজিব। এবং পুরুষের একার ওপরই ওয়াজিব। এখানে স্ত্রীর কোনো দায়দায়িত্ব নেই। সুতরাং স্ত্রীর যে মৌলিক চাহিদা, তার খাবারদাবার, পোশাক-আশাক এবং সন্তানের যে মৌলিক চাহিদা, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসাখরচ থেকে শুরু আরও বিভিন্ন বিষয়-আশয়-এ সবকিছু ফরজ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।

৪. বয়স্ক পিতামাতার খরচ
অর্থাৎ, নির্ভরশীল অন্যান্য যারা আছেন, যেমন বয়স্ক পিতামাতা। তাদের যে খরচটা, মৌলিক চাহিদাসহ আরও অন্যান্য বিষয়-আশয়, সেই খরচটাও ফরজ উপার্জনের মধ্যে শামিল।

এই পুরো জিনিসটাকে বলা হচ্ছে ফরজ পরিমাণ ইনকাম। এখন ফরজ পরিমাণ ইনকাম যখন আমার হয়ে গেল, এরপরে দিনের বাকি সময়টা কি আমি আরও ইনকাম করব? নাকি আমি বাকি সময়টা ইবাদতের পেছনে দেবো? এর ব্যাপারে আলেমগণ বলেছেন, ফরজ জীবিকা অর্জনের পর, বাকি সময় ইবাদতে ব্যয় উত্তম। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ।" দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ফরজ জীবিকা উপার্জন যখন হয়ে গেল, এরপর দিনের বাকি সময় আরও জীবিকা কামাই করার ধান্দায় না থেকে ইবাদতে ব্যয় করাই উত্তম। কিন্তু অতিরিক্ত ইনকামেরও সুযোগ আছে। একেবারে নেই যে, তা না। তবে ইবাদত করাটা উত্তম।

ইমাম গাজালি (৪৫০- ৫০৫ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি খুব টাকাপয়সা উপার্জন করছিল। তাকে সবাই দুনিয়াদার বলছে, এবং এরকম কথা বলছে যে, সে যদি অতিরিক্ত এত ইনকাম না করে বাকি সময়টা আল্লাহর রাস্তায় কাটাত, তাহলে কতই-না ভালো হতো। রাসুলের একটা হাদিসের মর্ম এমন-
যখন তোমার সামনে বলা হচ্ছে, "অমুকে অনেক ইনকাম করছে, ইনকামের পেছনে অনেক সময় ব্যয় করছে। সবচেয়ে ভালো হতো, যদি সে ইনকামটা না করে আল্লাহর রাস্তায় সময় দিত।" নবিজি বলেন যে, "তোমরা এরকম বলো না। কেননা, যদি সে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাজকর্ম করে, তবে সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে। (অর্থাৎ, ফরজ পরিমাণ উপার্জন) আর যদি সে নিজের বৃদ্ধ পিতামাতা ও দুর্বল শিশুদের জন্য কাজকর্ম করে, যাতে তারা অভাবগ্রস্ত না হয়, তবুও সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে।" [৩৩]

ঈসা আলাইহিস সালামের একটি কাহিনি আছে। এক ব্যক্তি তার কাছে এলো। ঈসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী করো? লোকটি বলল, আমি আল্লাহর ইবাদত করি। তিনি বললেন, তাহলে তোমার যে খরচাপাতি আছে, এগুলো কে চালায়? লোকটি জবাব দিলো, আমার ভাই চালায়। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম জবাব দেন, তাহলে তো দেখছি তোমার ভাই-ই তোমার চেয়ে বেশি ইবাদত করে। যেহেতু তোমার খরচাপাতিগুলো সে চালাচ্ছে। সে জীবিকার পেছনে সময় দিচ্ছে, আর তুমি এখানে আল্লাহর ইবাদত করছ। তাহলে তো তোমার ভাই-ই আল্লাহর ইবাদত বেশি করছে। সে নিজেও চলছে, তোমাকেও চালাচ্ছে। [৩৪]

তাহলে আমরা এখানে একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে, ফরজ পরিমাণ জীবিকা উপার্জন করা, এটা আল্লাহর রাস্তায় থাকার মতো এবং এটা এক বিরাট বড় নেক আমল। মোটেই এমন না যে, আমি দুনিয়ার প্রয়োজন পুরা করছি বলে এগুলো বেকার হয়ে গেছে। বিলকুল তা নয়, বরং এটা একটা বড় নেক আমল। এবং এর জন্য আল্লাহর দরবারে সওয়াব পাওয়া যাবে।

আরেকটা হাদিস লক্ষ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিজের স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়া, এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম সদকা।" [৩৫] এর মানে, স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য, স্ত্রীর খায়খরচের জন্য আপনি যে ব্যয়টা করবেন, এই ব্যয়টা সদকার সমান। সুতরাং জীবিকা উপার্জন করা এক তো হলো ফরজ। কেউ যদি উপার্জন না করে বসে থাকে, তাহলে সে কবিরা গুনাহের মধ্যে পড়ল। এবং সেইসাথে যদি কেউ উপার্জন করে, তাহলে এটা একটা বিরাট বড় নেক আমল হচ্ছে। ফরজের পরে সে এক বিরাট নফল আমলও করছে, সুবহানাল্লাহ।

টিকাঃ
[৩২] যদিও ইসলামের এ সংক্রান্ত ধারণাটি আরও ব্যাপক ও সমাজের নানা স্তর বিস্তৃত। পাঠকের ধারণার জন্য শুধু শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি। বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছি না। প্রথমত ইসলাম মানুষের প্রয়োজনগুলোকে তিনভাগে ভাগ করে। ক. যরুরিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে প্রাণ রক্ষা পায় না। খ. হাজিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে পেরেশানিমুক্ত স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করা যায় না। গ. তাহসিনিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা হয়ে গেলে, জীবন সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়।
এরপর এগুলো কোনটা কোনস্তরে কতটুকু পরিমাণ লাগবে, এরও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আছে। আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। এর পাশাপাশি ইসলাম আরও পাঁচটিভাগে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে। যথা: ক. হিফজুদ-দীন তথা দীন সংরক্ষণ। খ. হিফজুন নাফস তথা প্রাণ সংরক্ষণ। গ. হিফজুল আকল তথা মস্তিষ্ক সংরক্ষণ। ঙ. হিফজুন নাসল তথা বংশধারা সংরক্ষণ। চ. হিফজুল মাল তথা সম্পদের সংরক্ষণ।
[৩৩] ইমাম গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৩০৬
[৩৪] ইমাম মুহাম্মাদ রহ., আল-কাসব (জীবিকার খোঁজে, মাকতাবাতুল বায়ান)
[৩৫] সহিহুল বুখারি: ২৭৪২; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮; সুনানু আবি দাউদ: ২৮৬৪

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 নবিদের (আলাইহিমুস সালাম) জীবিকা

📄 নবিদের (আলাইহিমুস সালাম) জীবিকা


নবিদেরকে (আলাইহিমুস সালাম) তো আল্লাহ তাআলা দ্বীনের দাওয়াতের জিম্মাদারি দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাঁদেরও জীবিকা ছিল। তাদেরকেও আল্লাহ তাআলা বস্তুগত জীবিকা অর্জন করতে বলেছেন। অর্থাৎ, দাওয়াতের পাশাপাশি নিজের রুজি নিজেকে অর্জন করার আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। দেখুন, তারা কিন্তু চাইলেই বলতে পারতেন, হে আল্লাহ, আমার ঘরে খাবার নেই, আমায় খাবার দেন। আল্লাহ অবশ্যই পাঠিয়ে দিতেন। তারা যদি বলতেন, হে আল্লাহ, আমার কিছু টাকাপয়সা দরকার, তাহলেও আল্লাহ তাআলা টাকাপয়সা পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের নবিজিকে আল্লাহ দুনিয়া-আখিরাতের সমস্ত ধনভান্ডারের চাবি দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হুকুম দিয়েছেন এটা, আমাদেরকে শেখানোর জন্য। আমরা যেন কাজকর্ম অর্থাৎ জীবিকা উপার্জন ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে বসে না যাই। এইজন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শেখানোর জন্য, নবিদেরকেও দুনিয়াতে জীবিকা করে উপার্জনের আদেশ দিয়েছেন; যারা আল্লাহর কাছে চাইলেই সবকিছু পেয়ে যেতে পারতেন।

| নবি | পেশা |
| --- | --- |
| আদম আ. | কৃষি |
| নূহ, জাকারিয়া আ. | কাঠমিস্ত্রী |
| ইদরিস আ. | দরজি |
| ইবরাহিম আ. | বস্ত্র ব্যবসায়ী |
| দাউদ আ. | বর্ম তৈরি |
| সুলাঈমান আ. | তালপাতার ঝুড়ি তৈরি |
| ঈসা আ. | চরকায় সুতা কাটা |

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমরা যা খাও তার মাঝে সর্বোত্তম হলো ওই খাবার, যা তোমরা নিজের হাতে উপার্জন করো। আমার ভাই দাউদ নিজের হাতে উপার্জন করে খেতেন।" [৩৬]

দাউদ আলাইহিস সালামের কাজ ছিল, বর্ম তৈরি করা। কুরআনের মধ্যে কিন্তু এই আয়াতটা আছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, দাউদের জন্য আমি লোহাকে নরম করে দিয়েছি। মানে, দাউদ আলাইহিস সালাম লোহায় হাত দিলেই তা আটার খামিরের মতো নরম হয়ে যেত। [৩৭] এক তো তিনি নবি ছিলেন, রাসুল ছিলেন আবার ইসরাইলের বাদশাহও ছিলেন, এবং তিনি লোহার বর্মও তৈরি করতেন। সেই পোশাক তৈরি করে তিনি নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন।

ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিকা ছিল, চরকায় সুতা কাটা। ঈসা আলাইহিস সালামের মা, মারইয়াম আলাইহিস সালামের একটা চরকা ছিল, সুতা কাটার জন্য। পশুর লোম থেকে পশমি সুতা তৈরি করা। তো, এটাই ছিল তার জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম। [৩৮]

তার মানে বোঝা গেল, নবিদেরকে—যারা আল্লাহর কাছে হাত পাতলেই পেয়ে যান; এই সমস্ত শ্রেষ্ঠ মানুষদেরকেও আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে নিজের জীবিকা নিজে অর্জন করতে শিখিয়েছেন। এবং তারা তাদের যে মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ, দাওয়াতের কাজের পাশাপাশি নিজের জীবিকা নিজেই উপার্জন করতেন।

টিকাঃ
[৩৬] সহিহুল বুখারি : ২৯৭৭; সহিহ মুসলিম: ৫২৩; সুনানুন নাসায়ি: ৪২৮০
[৩৭] বুখারি, ৪/৩০৩
[৩৮] কিতাবুল কাসব, পৃষ্ঠা: ৭৫-৭৯

নবিদেরকে (আলাইহিমুস সালাম) তো আল্লাহ তাআলা দ্বীনের দাওয়াতের জিম্মাদারি দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাঁদেরও জীবিকা ছিল। তাদেরকেও আল্লাহ তাআলা বস্তুগত জীবিকা অর্জন করতে বলেছেন। অর্থাৎ, দাওয়াতের পাশাপাশি নিজের রুজি নিজেকে অর্জন করার আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। দেখুন, তারা কিন্তু চাইলেই বলতে পারতেন, হে আল্লাহ, আমার ঘরে খাবার নেই, আমায় খাবার দেন। আল্লাহ অবশ্যই পাঠিয়ে দিতেন। তারা যদি বলতেন, হে আল্লাহ, আমার কিছু টাকাপয়সা দরকার, তাহলেও আল্লাহ তাআলা টাকাপয়সা পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের নবিজিকে আল্লাহ দুনিয়া-আখিরাতের সমস্ত ধনভান্ডারের চাবি দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হুকুম দিয়েছেন এটা, আমাদেরকে শেখানোর জন্য। আমরা যেন কাজকর্ম অর্থাৎ জীবিকা উপার্জন ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে বসে না যাই। এইজন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শেখানোর জন্য, নবিদেরকেও দুনিয়াতে জীবিকা করে উপার্জনের আদেশ দিয়েছেন; যারা আল্লাহর কাছে চাইলেই সবকিছু পেয়ে যেতে পারতেন।

| নবি | পেশা |
| --- | --- |
| আদম আ. | কৃষি |
| নূহ, জাকারিয়া আ. | কাঠমিস্ত্রী |
| ইদরিস আ. | দরজি |
| ইবরাহিম আ. | বস্ত্র ব্যবসায়ী |
| দাউদ আ. | বর্ম তৈরি |
| সুলাঈমান আ. | তালপাতার ঝুড়ি তৈরি |
| ঈসা আ. | চরকায় সুতা কাটা |

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমরা যা খাও তার মাঝে সর্বোত্তম হলো ওই খাবার, যা তোমরা নিজের হাতে উপার্জন করো। আমার ভাই দাউদ নিজের হাতে উপার্জন করে খেতেন।" [৩৬]

দাউদ আলাইহিস সালামের কাজ ছিল, বর্ম তৈরি করা। কুরআনের মধ্যে কিন্তু এই আয়াতটা আছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, দাউদের জন্য আমি লোহাকে নরম করে দিয়েছি। মানে, দাউদ আলাইহিস সালাম লোহায় হাত দিলেই তা আটার খামিরের মতো নরম হয়ে যেত। [৩৭] এক তো তিনি নবি ছিলেন, রাসুল ছিলেন আবার ইসরাইলের বাদশাহও ছিলেন, এবং তিনি লোহার বর্মও তৈরি করতেন। সেই পোশাক তৈরি করে তিনি নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন।

ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিকা ছিল, চরকায় সুতা কাটা। ঈসা আলাইহিস সালামের মা, মারইয়াম আলাইহিস সালামের একটা চরকা ছিল, সুতা কাটার জন্য। পশুর লোম থেকে পশমি সুতা তৈরি করা। তো, এটাই ছিল তার জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম। [৩৮]

তার মানে বোঝা গেল, নবিদেরকে—যারা আল্লাহর কাছে হাত পাতলেই পেয়ে যান; এই সমস্ত শ্রেষ্ঠ মানুষদেরকেও আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে নিজের জীবিকা নিজে অর্জন করতে শিখিয়েছেন। এবং তারা তাদের যে মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ, দাওয়াতের কাজের পাশাপাশি নিজের জীবিকা নিজেই উপার্জন করতেন।

টিকাঃ
[৩৬] সহিহুল বুখারি : ২৯৭৭; সহিহ মুসলিম: ৫২৩; সুনানুন নাসায়ি: ৪২৮০
[৩৭] বুখারি, ৪/৩০৩
[৩৮] কিতাবুল কাসব, পৃষ্ঠা: ৭৫-৭৯

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 নবিজি সা.-এর জীবিকা

📄 নবিজি সা.-এর জীবিকা


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, "আমি সম্পদ জমা করব ও ব্যবসায়ী হব, এজন্য আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়নি। বরং আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়েছে, "তোমার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করো; সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও; এবং চরম নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) আসার আগ পর্যন্ত তোমার রবের গোলামি করতে থাকো।" [৩৯]

অর্থাৎ, আমার কাছে ওহি মানুষকে ব্যবসা শেখানোর জন্য পাঠানো হয়নি। মানে ব্যাপারটা হলো, আমি ওহির মাধ্যমে মানুষকে জাহান্নাম থেকে জান্নাতের দিকে নেব। কিন্তু এই ওহির মাধ্যমে আমাকে ব্যবসা করতে বলা হয়নি।

এখানে অনেকে ভুল ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়াবি কোনো পেশা ছিল না। 'আমি সম্পদ জমা করব ও ব্যবসায়ী হব, এজন্য আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়নি।' এর মানে হলো, 'ওহি পাঠিয়ে' আমাকে বলা হয়নি যে, আপনি সম্পদ জমা করুন বা ব্যবসায়ী হোন। ওহি পাঠানোর উদ্দেশ্য দুনিয়ার কামাই না। বরং ওহি পাঠানো হয়েছে আখেরাতের কামাই বাতলানোর জন্য। যেন আমি নিজের রবের প্রশংসা করি, সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হই এবং রবের গোলামি করতে থাকি। ওহি পাঠিয়ে এই কথাগুলোই আমাকে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ ওহি পাঠানোর উদ্দেশ্য কী, সেটা বলা হাদিসের উদ্দেশ্য। নয়তো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের ব্যবসা ছিল, এবং তিনি সম্পদও জমা করেছেন। সেটা আমরা সামনে দেখব। তার মানে, এই কথা ওহির সাথে খাস। অর্থাৎ, ওহি আসার উদ্দেশ্য আমাকে এগুলো বানানো নয়। বরং আখেরাতমুখী করার জন্য। [৪০]

আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
১. প্রথম জীবনে মেষের রাখাল ছিলেন। একসময় খাদিজা রা.-এর ব্যবসাও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামলাতেন। পরবর্তী সময়ে আম্মা খাদিজার সম্পদই ছিল তাঁর জীবিকানির্বাহের বড় একটা মাধ্যম। নবুয়তের পর...
২. তিনি চামড়ার কারবারে অংশীদার ছিলেন। সাহাবিগণ রা. ব্যবসা করতেন, আর রাসুল ইনভেস্ট করতেন এবং সেখান থেকে লাভ গ্রহণ করতেন। [৪১]
৩. 'জুরফ' নামক একটি এলাকায় আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বীজ বপন করাতেন। সেখান থেকে তাঁর ফসল আসত। এটা দিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবিকা এবং এগারোটা সংসারের জীবিকা উপার্জন করতেন। অর্থাৎ, চামড়ার কারবার ও জুরফের বীজের ফসল থেকে তিনি জীবিকা উপার্জন করতেন। আর সেইসাথে হাদিয়া তো আছেই। এবং যুদ্ধের গনিমতের মালামাল থেকেও কিছু আসত। [৪২]

টিকাঃ
[৩৯] আয-যুহদ লিল আহমদ, আবু মুসলিম খাওলানির সূত্রে
[৪০] কিতাবুল কাসব, পৃষ্ঠা ৭৮
[৪১] আবু দাউদ সূত্রে ইমাম মুহাম্মাদ রহ., প্রাগুক্ত।
[৪২] সহিহুল বুখারি, ২০৭১

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, "আমি সম্পদ জমা করব ও ব্যবসায়ী হব, এজন্য আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়নি। বরং আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়েছে, "তোমার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করো; সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও; এবং চরম নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) আসার আগ পর্যন্ত তোমার রবের গোলামি করতে থাকো।" [৩৯]

অর্থাৎ, আমার কাছে ওহি মানুষকে ব্যবসা শেখানোর জন্য পাঠানো হয়নি। মানে ব্যাপারটা হলো, আমি ওহির মাধ্যমে মানুষকে জাহান্নাম থেকে জান্নাতের দিকে নেব। কিন্তু এই ওহির মাধ্যমে আমাকে ব্যবসা করতে বলা হয়নি।

এখানে অনেকে ভুল ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়াবি কোনো পেশা ছিল না। 'আমি সম্পদ জমা করব ও ব্যবসায়ী হব, এজন্য আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়নি।' এর মানে হলো, 'ওহি পাঠিয়ে' আমাকে বলা হয়নি যে, আপনি সম্পদ জমা করুন বা ব্যবসায়ী হোন। ওহি পাঠানোর উদ্দেশ্য দুনিয়ার কামাই না। বরং ওহি পাঠানো হয়েছে আখেরাতের কামাই বাতলানোর জন্য। যেন আমি নিজের রবের প্রশংসা করি, সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হই এবং রবের গোলামি করতে থাকি। ওহি পাঠিয়ে এই কথাগুলোই আমাকে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ ওহি পাঠানোর উদ্দেশ্য কী, সেটা বলা হাদিসের উদ্দেশ্য। নয়তো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের ব্যবসা ছিল, এবং তিনি সম্পদও জমা করেছেন। সেটা আমরা সামনে দেখব। তার মানে, এই কথা ওহির সাথে খাস। অর্থাৎ, ওহি আসার উদ্দেশ্য আমাকে এগুলো বানানো নয়। বরং আখেরাতমুখী করার জন্য। [৪০]

আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
১. প্রথম জীবনে মেষের রাখাল ছিলেন। একসময় খাদিজা রা.-এর ব্যবসাও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামলাতেন। পরবর্তী সময়ে আম্মা খাদিজার সম্পদই ছিল তাঁর জীবিকানির্বাহের বড় একটা মাধ্যম। নবুয়তের পর...
২. তিনি চামড়ার কারবারে অংশীদার ছিলেন। সাহাবিগণ রা. ব্যবসা করতেন, আর রাসুল ইনভেস্ট করতেন এবং সেখান থেকে লাভ গ্রহণ করতেন। [৪১]
৩. 'জুরফ' নামক একটি এলাকায় আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বীজ বপন করাতেন। সেখান থেকে তাঁর ফসল আসত। এটা দিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবিকা এবং এগারোটা সংসারের জীবিকা উপার্জন করতেন। অর্থাৎ, চামড়ার কারবার ও জুরফের বীজের ফসল থেকে তিনি জীবিকা উপার্জন করতেন। আর সেইসাথে হাদিয়া তো আছেই। এবং যুদ্ধের গনিমতের মালামাল থেকেও কিছু আসত। [৪২]

টিকাঃ
[৩৯] আয-যুহদ লিল আহমদ, আবু মুসলিম খাওলানির সূত্রে
[৪০] কিতাবুল কাসব, পৃষ্ঠা ৭৮
[৪১] আবু দাউদ সূত্রে ইমাম মুহাম্মাদ রহ., প্রাগুক্ত।
[৪২] সহিহুল বুখারি, ২০৭১

ফন্ট সাইজ
15px
17px