📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 যে রাস্তাগুলো দিয়ে রিজিক আল্লাহ পৌঁছান

📄 যে রাস্তাগুলো দিয়ে রিজিক আল্লাহ পৌঁছান


যে রাস্তাগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় রকমের রিজিক পৌঁছান, তার মধ্য থেকে এক নম্বর হলো নামাজ। নামাজের মাধ্যমে এবং নামাজের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রিজিক পৌঁছান। আল্লাহ বলছেন, “হে রাসুল, আপনি আপনার পরিবারদেরকে নামাজের আদেশ করুন, নিজেও অবিচল থাকুন; (নিজেও নামাজ পড়ুন, আর, নামাজের দাওয়াত দিন) আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না; বরং আমিই আপনাকে রিজিক দিই।” [১৪]

আমি আপনাকে রিজিক দেবো, আপনি মানুষকে নামাজের দাওয়াত দিন, আপনি দাওয়াতের কাজ করুন, মেহনত করুন, নিজে আমল করুন, আরেকজনকে আমলের দাওয়াত দিতে থাকুন, আমি আপনাকে রিজিক দেবো। তার মানে, সালাতের দ্বারা রিজিক আসে। দু রাকাত সালাত আপনি পড়লেন, আল্লাহর কাছে চাইলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওষুধ ছাড়াই সুস্থ করে দিলেন। এরকম রিজিক আসতে পারে।

২. তাকওয়া বা স্রষ্টানুভূতি
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে ইসলামের বিধিবিধানকে শক্তভাবে মেনে চলা। হালাল-হারামগুলো বেছে চলা, আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করা যে, আল্লাহ আমার সামনে উপস্থিত, আমি কীভাবে গুনাহ করতে পারি। সুরা তালাকে বলা হচ্ছে- "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত রিজিক দান করেন, যার ব্যাপারে তার কোনো ধারণাও ছিল না।" [১৫]

তার কোনো কল্পনাও নেই যে, এখান থেকে তার রিজিক আসতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা এমন সমস্ত জায়গা থেকেও রিজিক দেবেন।

৩. তাওয়াক্কুল
আল্লাহর ওপর ভরসা করা। অনুকূল হোক বা প্রতিকূল, বিপদে হোক, আনন্দে হোক-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, ভরসা করা, নির্ভর করা। পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা যে, আল্লাহ আপনিই করবেন; আমার কোনো শক্তি নেই, ক্ষমতা নেই; আপনিই করেন, আপনিই করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, "যদি তোমরা সঠিকভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে রিজিক দান করতেন, যেমন পাখিকে রিজিক দান করেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয়, পেট পূর্ণ করে রাতে ফিরে আসে।" [১৬]

অর্থাৎ, পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে, কোনো এমপি-মন্ত্রী-মিনিস্টারের তদবির-সুপারিশের ভরসা না করে, নিজের যোগ্যতার ওপর ভরসা না করে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরতের ওপর ভরসা করা যে, আল্লাহই করবেন। আল্লাহ তাআলা ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলার দ্বারাই ‘ফাইয়াকুন’ (হয়ে যায়)। আল্লাহ চাইলেই হয়ে যায়। গভীরভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে ছেড়ে দেওয়া, তাওয়াক্কুল করা। এর মাধ্যমে রিজিক আসে; পাখির মতোন রিজিক আসে।

৪. ইসতিগফার
প্রতিদিন বেশি বেশি আল্লাহর কাছে তাওবা করা, ক্ষমা চাওয়া। এর মাধ্যমে রিজিক আসে। একটি হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইসতিগফার করবে, আল্লাহ তাকে সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন; সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।" [১৭]

তাহলে, ইসতিগফারের মাধ্যমে রিজিক আসে। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না যে, কোত্থেকে আপনার রিজিক আসছে।

৫. কামাইয়ের চেষ্টা
যেটা আমরা করি। এবং রিজিকের তালাশ বলতে শুধু এটাই বুঝি ও বোঝাই। কুরআনের আয়াতে বলা হচ্ছে, "অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো (অর্থাৎ, জিকিরের সাথে...), যাতে তোমরা সফলকাম হও।" [১৮]

৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
একটি হাদিস আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, "যে ব্যক্তি কামনা করে, তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।" [১৯]

অর্থাৎ, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর রাখা, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, সম্পর্ক ঠিক রাখা। এর মাধ্যমে রিজিক প্রশস্ত হয়।

৭. বিবাহ করা
■ কুরআনে এসেছে: "তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও... তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।..." [২০]
■ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "নারীদেরকে বিয়ে করো, নিশ্চয়ই তারা সম্পদ (সৌভাগ্য) নিয়ে আসে।” [২১]
■ আরেক হাদিসে এসেছে, "বিবাহের দ্বারা রিজিক তালাশ করো।" [২২]
■ উমর রা. বলেন, "আমি ওই লোকের প্রতি আশ্চর্য হই, যে বিবাহের দ্বারা রিজিক খুঁজে নেয় না...।" (এরপর তিনি ওপরের আয়াতটি তেলাওয়াত করেন দলিল হিসেবে।) [২৩]

তার মানে, বিবাহের মাধ্যমে রিজিক আসে। তাহলে দেখুন, রিজিকের জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মোট সাতটি ‘দোকান’ দিয়েছেন; কিন্তু আমি দোকান খোলা রেখেছি শুধু একটি। কেবল ব্যবসা আর চাকরির দোকান। একটিমাত্র দোকান খোলা রেখে আমি বলছি, 'আল্লাহ, আমার অভাব দূর হয় না, আমার অভাব দূর করে দিন; আল্লাহ, আপনি আমার রিজিকে বরকত দান করুন, আমার রিজিক বাড়িয়ে দিন।' বাকি ছয়টি দোকান বন্ধ রেখে আমি বলছি, আমার রিজিকের অভাব দূর হয় না। ক্যারিয়ার মানে যদি হয় রিজিকের তালাশ, তবে এই সাতটি মিলে হলো আমাদের ক্যারিয়ার, নাকি?! ক্যারিয়ার যদি হয় পেশা বা টাকা-রিজিক উপার্জনের মাধ্যম, তাহলে তো আমাকে বাকি ছয়টি দোকানও খোলা রাখতে হবে। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু: টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও।

এই সাতটি দোকানের সাতটিই খুলে রাখতে হবে। তাহলে, আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে আমাদের জন্য ভরপুর রিজিকের ফয়সালা হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু-টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও। এই সাতটা দোকান খোলা রাখলে আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, আপনার অনেককিছু হয়ে যাচ্ছে, কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই; কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই আপনার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাচ্ছে। আপনার প্রয়োজনগুলো মিটে যাচ্ছে। কীভাবে মিটে যাচ্ছে, আপনি জানেন না; সবকিছু জানা থাকা তো জরুরিও না। আল্লাহ তাআলা মিটিয়ে দিচ্ছেন। বা আপনার প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছেন। বরকত দিচ্ছেন।

বরকত বিরাট জিনিস। যখন যা পাওয়া দরকার পেয়ে যাচ্ছেন। যখন যে কাজটা হওয়া দরকার, হয়ে যাচ্ছে। একে বলা হয় বরকত। বরকত কিন্তু মাপা যায় না, তবে বোঝা যায়। আমার কাজটা হয়ে যাচ্ছে, আমার প্রয়োজনটা পূরণ হয়ে যাচ্ছে, বা ওই জিনিসটা আমার প্রয়োজনের তালিকা থেকেই সরে গেছে। আমি যতটুকু টাকা আয় করি, এ দিয়েই আমার সব প্রয়োজন মিটে গিয়ে আবার হজও করে এসেছি। এই হলো বরকত। দেখবেন, আপনার অনেক কাজ হয়ে যাচ্ছে অল্পতেই বা এমনিতেই, সুবহানাল্লাহ।

টিকাঃ
[১৪] সুরা তহা: ১৩২
[১৫] সুরা তালাক: ২-৩
[১৬] সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৪; সুনানুন নাসায়ি: ১১৮০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৬৪; হাদিসটি সহিহ
[১৭] হাকিম, মুসতাদরাক: ৭৬৭৭। সহিহ সূত্রে বর্ণিত
[১৮] সুরা জুমুআ: ১০
[১৯] সহিহুল বুখারি: ৫৯৮৫, সহিহ মুসলিম: ৪৬৩৯
[২০] সুরা নুর: ৩২
[২১] মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবা : ১৬১৬১, মুরসাল, নির্ভরযোগ্য
[২২] আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, হাদিস : ১৬২
[২৩] প্রাগুক্ত

যে রাস্তাগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় রকমের রিজিক পৌঁছান, তার মধ্য থেকে এক নম্বর হলো নামাজ। নামাজের মাধ্যমে এবং নামাজের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রিজিক পৌঁছান। আল্লাহ বলছেন, “হে রাসুল, আপনি আপনার পরিবারদেরকে নামাজের আদেশ করুন, নিজেও অবিচল থাকুন; (নিজেও নামাজ পড়ুন, আর, নামাজের দাওয়াত দিন) আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না; বরং আমিই আপনাকে রিজিক দিই।” [১৪]

আমি আপনাকে রিজিক দেবো, আপনি মানুষকে নামাজের দাওয়াত দিন, আপনি দাওয়াতের কাজ করুন, মেহনত করুন, নিজে আমল করুন, আরেকজনকে আমলের দাওয়াত দিতে থাকুন, আমি আপনাকে রিজিক দেবো। তার মানে, সালাতের দ্বারা রিজিক আসে। দু রাকাত সালাত আপনি পড়লেন, আল্লাহর কাছে চাইলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওষুধ ছাড়াই সুস্থ করে দিলেন। এরকম রিজিক আসতে পারে।

২. তাকওয়া বা স্রষ্টানুভূতি
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে ইসলামের বিধিবিধানকে শক্তভাবে মেনে চলা। হালাল-হারামগুলো বেছে চলা, আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করা যে, আল্লাহ আমার সামনে উপস্থিত, আমি কীভাবে গুনাহ করতে পারি। সুরা তালাকে বলা হচ্ছে- "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত রিজিক দান করেন, যার ব্যাপারে তার কোনো ধারণাও ছিল না।" [১৫]

তার কোনো কল্পনাও নেই যে, এখান থেকে তার রিজিক আসতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা এমন সমস্ত জায়গা থেকেও রিজিক দেবেন।

৩. তাওয়াক্কুল
আল্লাহর ওপর ভরসা করা। অনুকূল হোক বা প্রতিকূল, বিপদে হোক, আনন্দে হোক-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, ভরসা করা, নির্ভর করা। পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা যে, আল্লাহ আপনিই করবেন; আমার কোনো শক্তি নেই, ক্ষমতা নেই; আপনিই করেন, আপনিই করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, "যদি তোমরা সঠিকভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে রিজিক দান করতেন, যেমন পাখিকে রিজিক দান করেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয়, পেট পূর্ণ করে রাতে ফিরে আসে।" [১৬]

অর্থাৎ, পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে, কোনো এমপি-মন্ত্রী-মিনিস্টারের তদবির-সুপারিশের ভরসা না করে, নিজের যোগ্যতার ওপর ভরসা না করে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরতের ওপর ভরসা করা যে, আল্লাহই করবেন। আল্লাহ তাআলা ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলার দ্বারাই ‘ফাইয়াকুন’ (হয়ে যায়)। আল্লাহ চাইলেই হয়ে যায়। গভীরভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে ছেড়ে দেওয়া, তাওয়াক্কুল করা। এর মাধ্যমে রিজিক আসে; পাখির মতোন রিজিক আসে।

৪. ইসতিগফার
প্রতিদিন বেশি বেশি আল্লাহর কাছে তাওবা করা, ক্ষমা চাওয়া। এর মাধ্যমে রিজিক আসে। একটি হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইসতিগফার করবে, আল্লাহ তাকে সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন; সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।" [১৭]

তাহলে, ইসতিগফারের মাধ্যমে রিজিক আসে। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না যে, কোত্থেকে আপনার রিজিক আসছে।

৫. কামাইয়ের চেষ্টা
যেটা আমরা করি। এবং রিজিকের তালাশ বলতে শুধু এটাই বুঝি ও বোঝাই। কুরআনের আয়াতে বলা হচ্ছে, "অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো (অর্থাৎ, জিকিরের সাথে...), যাতে তোমরা সফলকাম হও।" [১৮]

৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
একটি হাদিস আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, "যে ব্যক্তি কামনা করে, তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।" [১৯]

অর্থাৎ, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর রাখা, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, সম্পর্ক ঠিক রাখা। এর মাধ্যমে রিজিক প্রশস্ত হয়।

৭. বিবাহ করা
■ কুরআনে এসেছে: "তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও... তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।..." [২০]
■ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "নারীদেরকে বিয়ে করো, নিশ্চয়ই তারা সম্পদ (সৌভাগ্য) নিয়ে আসে।” [২১]
■ আরেক হাদিসে এসেছে, "বিবাহের দ্বারা রিজিক তালাশ করো।" [২২]
■ উমর রা. বলেন, "আমি ওই লোকের প্রতি আশ্চর্য হই, যে বিবাহের দ্বারা রিজিক খুঁজে নেয় না...।" (এরপর তিনি ওপরের আয়াতটি তেলাওয়াত করেন দলিল হিসেবে।) [২৩]

তার মানে, বিবাহের মাধ্যমে রিজিক আসে। তাহলে দেখুন, রিজিকের জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মোট সাতটি ‘দোকান’ দিয়েছেন; কিন্তু আমি দোকান খোলা রেখেছি শুধু একটি। কেবল ব্যবসা আর চাকরির দোকান। একটিমাত্র দোকান খোলা রেখে আমি বলছি, 'আল্লাহ, আমার অভাব দূর হয় না, আমার অভাব দূর করে দিন; আল্লাহ, আপনি আমার রিজিকে বরকত দান করুন, আমার রিজিক বাড়িয়ে দিন।' বাকি ছয়টি দোকান বন্ধ রেখে আমি বলছি, আমার রিজিকের অভাব দূর হয় না। ক্যারিয়ার মানে যদি হয় রিজিকের তালাশ, তবে এই সাতটি মিলে হলো আমাদের ক্যারিয়ার, নাকি?! ক্যারিয়ার যদি হয় পেশা বা টাকা-রিজিক উপার্জনের মাধ্যম, তাহলে তো আমাকে বাকি ছয়টি দোকানও খোলা রাখতে হবে। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু: টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও।

এই সাতটি দোকানের সাতটিই খুলে রাখতে হবে। তাহলে, আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে আমাদের জন্য ভরপুর রিজিকের ফয়সালা হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু-টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও। এই সাতটা দোকান খোলা রাখলে আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, আপনার অনেককিছু হয়ে যাচ্ছে, কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই; কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই আপনার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাচ্ছে। আপনার প্রয়োজনগুলো মিটে যাচ্ছে। কীভাবে মিটে যাচ্ছে, আপনি জানেন না; সবকিছু জানা থাকা তো জরুরিও না। আল্লাহ তাআলা মিটিয়ে দিচ্ছেন। বা আপনার প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছেন। বরকত দিচ্ছেন।

বরকত বিরাট জিনিস। যখন যা পাওয়া দরকার পেয়ে যাচ্ছেন। যখন যে কাজটা হওয়া দরকার, হয়ে যাচ্ছে। একে বলা হয় বরকত। বরকত কিন্তু মাপা যায় না, তবে বোঝা যায়। আমার কাজটা হয়ে যাচ্ছে, আমার প্রয়োজনটা পূরণ হয়ে যাচ্ছে, বা ওই জিনিসটা আমার প্রয়োজনের তালিকা থেকেই সরে গেছে। আমি যতটুকু টাকা আয় করি, এ দিয়েই আমার সব প্রয়োজন মিটে গিয়ে আবার হজও করে এসেছি। এই হলো বরকত। দেখবেন, আপনার অনেক কাজ হয়ে যাচ্ছে অল্পতেই বা এমনিতেই, সুবহানাল্লাহ।

টিকাঃ
[১৪] সুরা তহা: ১৩২
[১৫] সুরা তালাক: ২-৩
[১৬] সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৪; সুনানুন নাসায়ি: ১১৮০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৬৪; হাদিসটি সহিহ
[১৭] হাকিম, মুসতাদরাক: ৭৬৭৭। সহিহ সূত্রে বর্ণিত
[১৮] সুরা জুমুআ: ১০
[১৯] সহিহুল বুখারি: ৫৯৮৫, সহিহ মুসলিম: ৪৬৩৯
[২০] সুরা নুর: ৩২
[২১] মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবা : ১৬১৬১, মুরসাল, নির্ভরযোগ্য
[২২] আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, হাদিস : ১৬২
[২৩] প্রাগুক্ত

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 রিজিক অপরিবর্তনীয়

📄 রিজিক অপরিবর্তনীয়


জীবিকা হচ্ছে রিজিকের মধ্যে একটি অংশ। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি, আমাদের বস্তুগত যে রিজিক রয়েছে (অর্থসম্পদ, খাবার, ওষুধ কেনার জন্য টাকা), এগুলোর সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে কর্মপ্রচেষ্টার সম্পর্ক রয়েছে, যাকে আমরা ক্যারিয়ার বলছি। জীবিকা তথা আয়সম্পদ হচ্ছে রিজিকের অংশ, আর রিজিক হচ্ছে তাকদিরের অংশ।

ওদিকে কারিকুলামে পশ্চিমা দর্শন আমাকে জানাচ্ছে যে, তোমাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে হবে। বেশি বেশি আয় করতে হবে, বেশি বেশি ভোগ করতে হবে, তাহলেই তুমি সফল। আর ইসলাম আমাকে বলছে, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমার আয়-রোজগার-ইনকাম ফিক্সড। রিজিক তাকদিরের অংশ, এটা নির্ধারিত, ফিক্সড। এখানে বাড়া-কমার সুযোগ নেই। তবে এমন হতে পারে, যা কষ্টের মধ্য দিয়ে আসত, সেটা সহজে আসছে। যা অপমানের হাত ধরে আসত, তা সহজতা ও ইজ্জতের সঙ্গে আসছে। যে রিজিকটা আমার, সেটা আমার জন্য ফিক্সড। কিন্তু সেটা কমিয়ে দেওয়া বা বাড়িয়ে দেওয়া, প্রশস্ত করা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, আমি একটা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করছি। আপনি একটি মুরগির বাচ্চাকে চাইলে ধান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে পারেন, বিভিন্ন দিকে ছিটিয়ে দিলেন, সে সারাদিন ধরে ঘুরবে আর কষ্ট করে করে একেকটা দানা খুঁটে খাবে। আবার, আপনি চাইলে এক জায়গাতেই দিতে পারেন, সে এসে একসাথে সব খেয়ে ফেলল, সময় ও শ্রম বেঁচে গেল। তার মানে, রিজিকের সংকীর্ণতা হলো, আপনি সারাদিন কষ্ট করে একটা কিছু অর্জন করলেন। আর প্রশস্ততা হলো, সে জিনিসটাই অল্প সময়ে, অনায়াসে, কম চেষ্টায় ও কম কষ্টে অর্জন করলেন। যেমন মুরগির বাচ্চাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না দিয়ে এক জায়গায় খাবার দিলেন, সে সহজে খেয়ে চলে গেল। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, আয়সম্পদটা রিজিকের অংশ, এটা ফিক্সড। ক্যারিয়ারের দ্বারা এটাই আমার কাছে আসবে; এর চেয়ে বেশি আসা সম্ভব নয়। এবং এটা আমার কাছে কষ্টের সঙ্গে আসবে, নতুবা আরামের সাথে। হয়তো হেনস্থার মাধ্যমে আসবে, নতুবা ইজ্জতের ও সম্মানের হাত ধরে আসবে। হয়তো এটা হালালের মাধ্যমে আসবে, অথবা হারামের মাধ্যমে আসবে।

■ আল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের জীবনোপকরণ ও তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা সব আকাশে আছে।” [২৪]
■ আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "এবং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, সবার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহরই।” [২৫]
■ আরেকটি আয়াতে বলেছেন, "তোমার পরিবারের লোকদের সালাতের নির্দেশ দাও, আর এর ওপর অটল থাকো। আমি তোমার কাছে জীবনোপকরণ চাই না, বরং আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিই...।” [২৬]

তার মানে বোঝা গেল, সব আকাশে আছে, সব আল্লাহর তরফ থেকে ওপর থেকে ফয়সালা হয়। তাহলে কেন কাজ করছি আমরা? দুনিয়ার কর্মপ্রচেষ্টাটা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে করতে বলেছেন; আল্লাহ বলেছেন বলে আমরা করি। কিন্তু এটার দ্বারা কতটুকু কী আসবে, তার ফয়সালা হবে ওপরে, এর ফয়সালা করবেন আল্লাহ তাআলা। আর আমরা কামাই-রুজি করব, কারণ এটা পুরুষের ওপর ফরজ, আল্লাহ করতে বলেছেন, তাই। কিন্তু আমার অন্তরের বিশ্বাস থাকবে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসবে; রাজ্জাকের পক্ষ থেকেই রিজিক আসে। আমি পুরো জীবনে কত টাকা আয় করব, সেটা লিখিত। কে আমার জীবনসঙ্গী হবে, সেটাও লিখিত। কবে, কোথায় মারা যাব, তাও লিখিত। এবং কতটা খাবার ও পানীয় আমি গ্রহণ করব, তাও লিখিত বা নির্দিষ্ট।

* হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তাকদির লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। (মানে, আমার-আপনার তাকদির, আমার-আপনার রিজিক, অর্থ, কামাই-এগুলো আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। (রাসুল আরও বলেছেন,) তখন আল্লাহর আরশ (সিংহাসন) পানির ওপরে ছিল।" [২৭]

* আরেকটি হাদিসে হজরত মুতাল্লিব ইবনে হানতাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিশ্চয়ই জিবরিল আমার অন্তরে ওহি ঢেলে দিয়েছেন, অবশ্যই রিজিক শেষ হওয়ার আগে কারও মৃত্যু হয় না; সুতরাং তোমরা হারাম ছেড়ে হালাল পথে রিজিকের অনুসন্ধান করো।" [২৮]

* আরেকটি হাদিসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বান্দার পাঁচটি বিষয় লিখে অবসর হয়ে গেছেন; তার মৃত্যুর সময়, তার (ভালা-মন্দ) আমল, তার মৃত্যুর সময়, তার রিজিক, তার পদচ্ছাপ, তার কবর।” [২৯]

তার মানে, আমার-আপনার যে রিজিক, সেটা আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদিরে লেখা শেষ। এবং আমার রিজিকটুকু শেষ না করে আমি মৃত্যুবরণ করব না। দোকানি আপনাকে ঠকিয়ে দশ টাকা নিয়েছে, এটা ওর রিজিকই ও নিয়েছে; ও আমার-আপনার ভাগ থেকে নেয়নি। এটা একটু স্পষ্ট করি, দোকানে গিয়ে আমি কথার কথা দশ টাকা ঠকে গেলাম। এটা ওর রিজিকটাই বিক্রেতা নিয়েছে হারামভাবে। আমার রিজিক থেকে ও নেয়নি। তাই, ঠকে যাওয়ার পরে যে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, এই কষ্ট পাওয়ার কিছু এতে নেই। পকেটমার পকেট থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে গেল, এটা ওর রিজিকটাই ও নিল। আমার অংশ থেকে কিছু নেয়নি; আমার থেকে ও কোনোদিন কিছু নিতে পারবে না।

তাহলে আমরা পুরো রিজিকের কনসেপ্টটা ক্লিয়ার করি; পশ্চিমের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের বিরোধ ও সংঘর্ষটা কোথায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষটা হচ্ছে, তারা বলতে চায়, বেশি বেশি কামাই করবে, বেশি বেশি ভোগ করবে। আর আমাদের (ইসলামের) কথা হচ্ছে যে, না, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তুমি বেশি কামাই করতে পারবে না। তুমি যেটা কামাই করবে, সেটা আল্লাহ তাআলা লিখেই রেখেছেন, ফিক্সড। এখন তুমি সেটা হালালভাবে অর্জন করবে, নাকি হারামভাবে করবে; শরীরকে কষ্ট দিয়ে করবে, নাকি আরামে করবে; ইজ্জতের সাথে করতে চাও, নাকি অপমানের সাথে-এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এটার পরিমাণ ফিক্সড, এর চেয়ে বেশি কামাই করতে আমরা পারব না।

টিকাঃ
[২৪] সুরা যারিয়াত: ২২
[২৫] সুরা হুদ: ৬
[২৬] সুরা তহা: ১৩২
[২৭] মুসলিম: ২৬৫৩
[২৮] মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৯/২৫৪
[২৯] মুসনাদে আহমাদ। হাদিস: ২১৭২৩

জীবিকা হচ্ছে রিজিকের মধ্যে একটি অংশ। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি, আমাদের বস্তুগত যে রিজিক রয়েছে (অর্থসম্পদ, খাবার, ওষুধ কেনার জন্য টাকা), এগুলোর সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে কর্মপ্রচেষ্টার সম্পর্ক রয়েছে, যাকে আমরা ক্যারিয়ার বলছি। জীবিকা তথা আয়সম্পদ হচ্ছে রিজিকের অংশ, আর রিজিক হচ্ছে তাকদিরের অংশ।

ওদিকে কারিকুলামে পশ্চিমা দর্শন আমাকে জানাচ্ছে যে, তোমাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে হবে। বেশি বেশি আয় করতে হবে, বেশি বেশি ভোগ করতে হবে, তাহলেই তুমি সফল। আর ইসলাম আমাকে বলছে, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমার আয়-রোজগার-ইনকাম ফিক্সড। রিজিক তাকদিরের অংশ, এটা নির্ধারিত, ফিক্সড। এখানে বাড়া-কমার সুযোগ নেই। তবে এমন হতে পারে, যা কষ্টের মধ্য দিয়ে আসত, সেটা সহজে আসছে। যা অপমানের হাত ধরে আসত, তা সহজতা ও ইজ্জতের সঙ্গে আসছে। যে রিজিকটা আমার, সেটা আমার জন্য ফিক্সড। কিন্তু সেটা কমিয়ে দেওয়া বা বাড়িয়ে দেওয়া, প্রশস্ত করা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, আমি একটা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করছি। আপনি একটি মুরগির বাচ্চাকে চাইলে ধান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে পারেন, বিভিন্ন দিকে ছিটিয়ে দিলেন, সে সারাদিন ধরে ঘুরবে আর কষ্ট করে করে একেকটা দানা খুঁটে খাবে। আবার, আপনি চাইলে এক জায়গাতেই দিতে পারেন, সে এসে একসাথে সব খেয়ে ফেলল, সময় ও শ্রম বেঁচে গেল। তার মানে, রিজিকের সংকীর্ণতা হলো, আপনি সারাদিন কষ্ট করে একটা কিছু অর্জন করলেন। আর প্রশস্ততা হলো, সে জিনিসটাই অল্প সময়ে, অনায়াসে, কম চেষ্টায় ও কম কষ্টে অর্জন করলেন। যেমন মুরগির বাচ্চাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না দিয়ে এক জায়গায় খাবার দিলেন, সে সহজে খেয়ে চলে গেল। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, আয়সম্পদটা রিজিকের অংশ, এটা ফিক্সড। ক্যারিয়ারের দ্বারা এটাই আমার কাছে আসবে; এর চেয়ে বেশি আসা সম্ভব নয়। এবং এটা আমার কাছে কষ্টের সঙ্গে আসবে, নতুবা আরামের সাথে। হয়তো হেনস্থার মাধ্যমে আসবে, নতুবা ইজ্জতের ও সম্মানের হাত ধরে আসবে। হয়তো এটা হালালের মাধ্যমে আসবে, অথবা হারামের মাধ্যমে আসবে।

■ আল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের জীবনোপকরণ ও তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা সব আকাশে আছে।” [২৪]
■ আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "এবং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, সবার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহরই।” [২৫]
■ আরেকটি আয়াতে বলেছেন, "তোমার পরিবারের লোকদের সালাতের নির্দেশ দাও, আর এর ওপর অটল থাকো। আমি তোমার কাছে জীবনোপকরণ চাই না, বরং আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিই...।” [২৬]

তার মানে বোঝা গেল, সব আকাশে আছে, সব আল্লাহর তরফ থেকে ওপর থেকে ফয়সালা হয়। তাহলে কেন কাজ করছি আমরা? দুনিয়ার কর্মপ্রচেষ্টাটা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে করতে বলেছেন; আল্লাহ বলেছেন বলে আমরা করি। কিন্তু এটার দ্বারা কতটুকু কী আসবে, তার ফয়সালা হবে ওপরে, এর ফয়সালা করবেন আল্লাহ তাআলা। আর আমরা কামাই-রুজি করব, কারণ এটা পুরুষের ওপর ফরজ, আল্লাহ করতে বলেছেন, তাই। কিন্তু আমার অন্তরের বিশ্বাস থাকবে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসবে; রাজ্জাকের পক্ষ থেকেই রিজিক আসে। আমি পুরো জীবনে কত টাকা আয় করব, সেটা লিখিত। কে আমার জীবনসঙ্গী হবে, সেটাও লিখিত। কবে, কোথায় মারা যাব, তাও লিখিত। এবং কতটা খাবার ও পানীয় আমি গ্রহণ করব, তাও লিখিত বা নির্দিষ্ট।

* হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তাকদির লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। (মানে, আমার-আপনার তাকদির, আমার-আপনার রিজিক, অর্থ, কামাই-এগুলো আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। (রাসুল আরও বলেছেন,) তখন আল্লাহর আরশ (সিংহাসন) পানির ওপরে ছিল।" [২৭]

* আরেকটি হাদিসে হজরত মুতাল্লিব ইবনে হানতাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিশ্চয়ই জিবরিল আমার অন্তরে ওহি ঢেলে দিয়েছেন, অবশ্যই রিজিক শেষ হওয়ার আগে কারও মৃত্যু হয় না; সুতরাং তোমরা হারাম ছেড়ে হালাল পথে রিজিকের অনুসন্ধান করো।" [২৮]

* আরেকটি হাদিসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বান্দার পাঁচটি বিষয় লিখে অবসর হয়ে গেছেন; তার মৃত্যুর সময়, তার (ভালা-মন্দ) আমল, তার মৃত্যুর সময়, তার রিজিক, তার পদচ্ছাপ, তার কবর।” [২৯]

তার মানে, আমার-আপনার যে রিজিক, সেটা আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদিরে লেখা শেষ। এবং আমার রিজিকটুকু শেষ না করে আমি মৃত্যুবরণ করব না। দোকানি আপনাকে ঠকিয়ে দশ টাকা নিয়েছে, এটা ওর রিজিকই ও নিয়েছে; ও আমার-আপনার ভাগ থেকে নেয়নি। এটা একটু স্পষ্ট করি, দোকানে গিয়ে আমি কথার কথা দশ টাকা ঠকে গেলাম। এটা ওর রিজিকটাই বিক্রেতা নিয়েছে হারামভাবে। আমার রিজিক থেকে ও নেয়নি। তাই, ঠকে যাওয়ার পরে যে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, এই কষ্ট পাওয়ার কিছু এতে নেই। পকেটমার পকেট থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে গেল, এটা ওর রিজিকটাই ও নিল। আমার অংশ থেকে কিছু নেয়নি; আমার থেকে ও কোনোদিন কিছু নিতে পারবে না।

তাহলে আমরা পুরো রিজিকের কনসেপ্টটা ক্লিয়ার করি; পশ্চিমের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের বিরোধ ও সংঘর্ষটা কোথায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষটা হচ্ছে, তারা বলতে চায়, বেশি বেশি কামাই করবে, বেশি বেশি ভোগ করবে। আর আমাদের (ইসলামের) কথা হচ্ছে যে, না, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তুমি বেশি কামাই করতে পারবে না। তুমি যেটা কামাই করবে, সেটা আল্লাহ তাআলা লিখেই রেখেছেন, ফিক্সড। এখন তুমি সেটা হালালভাবে অর্জন করবে, নাকি হারামভাবে করবে; শরীরকে কষ্ট দিয়ে করবে, নাকি আরামে করবে; ইজ্জতের সাথে করতে চাও, নাকি অপমানের সাথে-এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এটার পরিমাণ ফিক্সড, এর চেয়ে বেশি কামাই করতে আমরা পারব না।

টিকাঃ
[২৪] সুরা যারিয়াত: ২২
[২৫] সুরা হুদ: ৬
[২৬] সুরা তহা: ১৩২
[২৭] মুসলিম: ২৬৫৩
[২৮] মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৯/২৫৪
[২৯] মুসনাদে আহমাদ। হাদিস: ২১৭২৩

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 বস্তুগত জীবিকা উপার্জনের বিধান

📄 বস্তুগত জীবিকা উপার্জনের বিধান


ইসলামে জীবিকার গুরুত্ব
• হালাল জীবিকা অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (আলজামিউস সগির লিস-সুযুতি, হাদিস: ৫২৭২) প্রত্যেক মুসলিম বলতে যদিও নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, কিন্তু এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পুরুষের ওপর তার অধীনস্থদের ভরণপোষণ ওয়াজিব, নারীদের ওপর নয়। এর আলোচনা পরে বিস্তারিত আসবে।
■ ফরজ সালাতের পর, জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ। (তাবারানি, বাইহাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

তার মানে, আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন, ফরজ নামাজের পরে তোমরা বেরিয়ে পড়ো, এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করো। সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ফরজ সালাতের পরে জীবিকা অনুসন্ধানের যে তাগিদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ফরজের পর আরেকটা ফরজের হুকুম আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।

ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হিজরি) রহিমাহুল্লাহর ছাত্র, ইমাম মুহাম্মদ আশ-শাইবানি (১৩২-১৮৯ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ। তার একটি বই আছে, মাকতাবাতুল বায়ান থেকে সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—'জীবিকার খোঁজে'। সেখানে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা পাবেন। ইসলাম যে দুনিয়াবিমুখতার কথা বলে, সেই দুনিয়া-বিমুখতার সাথে জীবিকা উপার্জন বা ক্যারিয়ারের সমন্বয় সম্পর্কে বইটিতে চমৎকার আলোচনা আছে।

• যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না; সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ। ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ। [৩০]
• মুমিনের দেহ হলো তার বাহন, সে যেন বাহনের সাথে উত্তম আচরণ করে। [৩১]

অর্থাৎ, আমার এই দেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য, এই দেহ যদি অসুস্থ হয়ে যায়, এটিকে সুস্থ করার জন্য আমাকে জীবিকা উপার্জন করতে হবে। এই বাহনের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। খাদ্য-পোশাক-আবাস দিতে হবে। সেটা ফ্রি পাওয়া যায় না, সেজন্য অর্থকড়ি লাগবে। এই টাকার ব্যবস্থাটা আমরা দুইভাবে করতে পারি।
হয় আমাকে কারও কাছ থেকে ডাকাতি করতে হবে, কারও কাছ থেকে ছিনতাই করতে হবে, দোকানপাট লুট করতে হবে।
অথবা আমাকে জীবিকা উপার্জন করে, টাকা কামাই করে, সেটা দিয়ে দোকানে গিয়ে কিনতে হবে।
প্রথম রাস্তা হলো হারাম, আর হালাল রাস্তা হলো, জীবিকা উপার্জন করা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামে জীবিকা অনুসন্ধান করা ফরজ একটি আমল।

টিকাঃ
[৩০] কিতাবুল কাসব লি মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, পৃষ্ঠা ৭৩।
[৩১] মুসনাদে আহমদ হাদিস: ৬৬৩৯।

ইসলামে জীবিকার গুরুত্ব
• হালাল জীবিকা অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (আলজামিউস সগির লিস-সুযুতি, হাদিস: ৫২৭২) প্রত্যেক মুসলিম বলতে যদিও নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, কিন্তু এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পুরুষের ওপর তার অধীনস্থদের ভরণপোষণ ওয়াজিব, নারীদের ওপর নয়। এর আলোচনা পরে বিস্তারিত আসবে।
■ ফরজ সালাতের পর, জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ। (তাবারানি, বাইহাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

তার মানে, আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন, ফরজ নামাজের পরে তোমরা বেরিয়ে পড়ো, এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করো। সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ফরজ সালাতের পরে জীবিকা অনুসন্ধানের যে তাগিদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ফরজের পর আরেকটা ফরজের হুকুম আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।

ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হিজরি) রহিমাহুল্লাহর ছাত্র, ইমাম মুহাম্মদ আশ-শাইবানি (১৩২-১৮৯ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ। তার একটি বই আছে, মাকতাবাতুল বায়ান থেকে সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—'জীবিকার খোঁজে'। সেখানে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা পাবেন। ইসলাম যে দুনিয়াবিমুখতার কথা বলে, সেই দুনিয়া-বিমুখতার সাথে জীবিকা উপার্জন বা ক্যারিয়ারের সমন্বয় সম্পর্কে বইটিতে চমৎকার আলোচনা আছে।

• যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না; সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ। ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ। [৩০]
• মুমিনের দেহ হলো তার বাহন, সে যেন বাহনের সাথে উত্তম আচরণ করে। [৩১]

অর্থাৎ, আমার এই দেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য, এই দেহ যদি অসুস্থ হয়ে যায়, এটিকে সুস্থ করার জন্য আমাকে জীবিকা উপার্জন করতে হবে। এই বাহনের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। খাদ্য-পোশাক-আবাস দিতে হবে। সেটা ফ্রি পাওয়া যায় না, সেজন্য অর্থকড়ি লাগবে। এই টাকার ব্যবস্থাটা আমরা দুইভাবে করতে পারি।
হয় আমাকে কারও কাছ থেকে ডাকাতি করতে হবে, কারও কাছ থেকে ছিনতাই করতে হবে, দোকানপাট লুট করতে হবে।
অথবা আমাকে জীবিকা উপার্জন করে, টাকা কামাই করে, সেটা দিয়ে দোকানে গিয়ে কিনতে হবে।
প্রথম রাস্তা হলো হারাম, আর হালাল রাস্তা হলো, জীবিকা উপার্জন করা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামে জীবিকা অনুসন্ধান করা ফরজ একটি আমল।

টিকাঃ
[৩০] কিতাবুল কাসব লি মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, পৃষ্ঠা ৭৩।
[৩১] মুসনাদে আহমদ হাদিস: ৬৬৩৯।

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 কতটুকু উপার্জন ফরজ

📄 কতটুকু উপার্জন ফরজ


যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন ফরজ। এখন কথার কথা, আমাকে গাড়ি কিনতে হবে, বাড়ি করতে হবে, ঢাকায় দুটো বাড়ি কিনতে হবে, কয়েকটা ফ্ল্যাট নিতে হবে, বছর বছর বিদেশে ঘুরতে যেতে হবে—এই জীবিকা অর্জন করা কি ফরজ? মোটেও না! যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন করা ফরজ। সেটা কতটুকু?

১. নিজের খাবার ও পোশাক
মৌলিক চাহিদা যেটাকে বলে আরকি। আধুনিক মৌলিক চাহিদা বলতে বোঝায়, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলিক চাহিদা [৩২] হচ্ছে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী বা জীবনসঙ্গিনী, বাহন। তাহলে প্রথমে হলো, নিজের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা, এর মধ্যে বিবাহ-শাদিও আছে, যানবাহন আছে, মোটরসাইকেল বা সাইকেল হতে পারে। বা আমরা যারা গণপরিবহণে যাতায়াত করি, পরিবহণের ভাড়াটা হতে পারে। এগুলো হচ্ছে ফরজ পরিমাণ।

২. ঋণ শোধ
যদি কোনো ঋণ থাকে আমার ওপরে, সেই ঋণ শোধ করাও আমার ফরজ উপার্জনের মধ্যে পড়ে। এটার জন্য যদি আমি ইনকাম করি, সেটাও ফরজ ইনকাম।

৩. স্ত্রী-সন্তানের খরচ
স্ত্রী-সন্তান-দাসের ভরণপোষণ পুরুষের ওপর ওয়াজিব। এবং পুরুষের একার ওপরই ওয়াজিব। এখানে স্ত্রীর কোনো দায়দায়িত্ব নেই। সুতরাং স্ত্রীর যে মৌলিক চাহিদা, তার খাবারদাবার, পোশাক-আশাক এবং সন্তানের যে মৌলিক চাহিদা, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসাখরচ থেকে শুরু আরও বিভিন্ন বিষয়-আশয়-এ সবকিছু ফরজ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।

৪. বয়স্ক পিতামাতার খরচ
অর্থাৎ, নির্ভরশীল অন্যান্য যারা আছেন, যেমন বয়স্ক পিতামাতা। তাদের যে খরচটা, মৌলিক চাহিদাসহ আরও অন্যান্য বিষয়-আশয়, সেই খরচটাও ফরজ উপার্জনের মধ্যে শামিল।

এই পুরো জিনিসটাকে বলা হচ্ছে ফরজ পরিমাণ ইনকাম। এখন ফরজ পরিমাণ ইনকাম যখন আমার হয়ে গেল, এরপরে দিনের বাকি সময়টা কি আমি আরও ইনকাম করব? নাকি আমি বাকি সময়টা ইবাদতের পেছনে দেবো? এর ব্যাপারে আলেমগণ বলেছেন, ফরজ জীবিকা অর্জনের পর, বাকি সময় ইবাদতে ব্যয় উত্তম। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ।" দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ফরজ জীবিকা উপার্জন যখন হয়ে গেল, এরপর দিনের বাকি সময় আরও জীবিকা কামাই করার ধান্দায় না থেকে ইবাদতে ব্যয় করাই উত্তম। কিন্তু অতিরিক্ত ইনকামেরও সুযোগ আছে। একেবারে নেই যে, তা না। তবে ইবাদত করাটা উত্তম।

ইমাম গাজালি (৪৫০- ৫০৫ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি খুব টাকাপয়সা উপার্জন করছিল। তাকে সবাই দুনিয়াদার বলছে, এবং এরকম কথা বলছে যে, সে যদি অতিরিক্ত এত ইনকাম না করে বাকি সময়টা আল্লাহর রাস্তায় কাটাত, তাহলে কতই-না ভালো হতো। রাসুলের একটা হাদিসের মর্ম এমন-
যখন তোমার সামনে বলা হচ্ছে, "অমুকে অনেক ইনকাম করছে, ইনকামের পেছনে অনেক সময় ব্যয় করছে। সবচেয়ে ভালো হতো, যদি সে ইনকামটা না করে আল্লাহর রাস্তায় সময় দিত।" নবিজি বলেন যে, "তোমরা এরকম বলো না। কেননা, যদি সে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাজকর্ম করে, তবে সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে। (অর্থাৎ, ফরজ পরিমাণ উপার্জন) আর যদি সে নিজের বৃদ্ধ পিতামাতা ও দুর্বল শিশুদের জন্য কাজকর্ম করে, যাতে তারা অভাবগ্রস্ত না হয়, তবুও সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে।" [৩৩]

ঈসা আলাইহিস সালামের একটি কাহিনি আছে। এক ব্যক্তি তার কাছে এলো। ঈসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী করো? লোকটি বলল, আমি আল্লাহর ইবাদত করি। তিনি বললেন, তাহলে তোমার যে খরচাপাতি আছে, এগুলো কে চালায়? লোকটি জবাব দিলো, আমার ভাই চালায়। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম জবাব দেন, তাহলে তো দেখছি তোমার ভাই-ই তোমার চেয়ে বেশি ইবাদত করে। যেহেতু তোমার খরচাপাতিগুলো সে চালাচ্ছে। সে জীবিকার পেছনে সময় দিচ্ছে, আর তুমি এখানে আল্লাহর ইবাদত করছ। তাহলে তো তোমার ভাই-ই আল্লাহর ইবাদত বেশি করছে। সে নিজেও চলছে, তোমাকেও চালাচ্ছে। [৩৪]

তাহলে আমরা এখানে একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে, ফরজ পরিমাণ জীবিকা উপার্জন করা, এটা আল্লাহর রাস্তায় থাকার মতো এবং এটা এক বিরাট বড় নেক আমল। মোটেই এমন না যে, আমি দুনিয়ার প্রয়োজন পুরা করছি বলে এগুলো বেকার হয়ে গেছে। বিলকুল তা নয়, বরং এটা একটা বড় নেক আমল। এবং এর জন্য আল্লাহর দরবারে সওয়াব পাওয়া যাবে।

আরেকটা হাদিস লক্ষ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিজের স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়া, এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম সদকা।" [৩৫] এর মানে, স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য, স্ত্রীর খায়খরচের জন্য আপনি যে ব্যয়টা করবেন, এই ব্যয়টা সদকার সমান। সুতরাং জীবিকা উপার্জন করা এক তো হলো ফরজ। কেউ যদি উপার্জন না করে বসে থাকে, তাহলে সে কবিরা গুনাহের মধ্যে পড়ল। এবং সেইসাথে যদি কেউ উপার্জন করে, তাহলে এটা একটা বিরাট বড় নেক আমল হচ্ছে। ফরজের পরে সে এক বিরাট নফল আমলও করছে, সুবহানাল্লাহ।

টিকাঃ
[৩২] যদিও ইসলামের এ সংক্রান্ত ধারণাটি আরও ব্যাপক ও সমাজের নানা স্তর বিস্তৃত। পাঠকের ধারণার জন্য শুধু শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি। বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছি না। প্রথমত ইসলাম মানুষের প্রয়োজনগুলোকে তিনভাগে ভাগ করে। ক. যরুরিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে প্রাণ রক্ষা পায় না। খ. হাজিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে পেরেশানিমুক্ত স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করা যায় না। গ. তাহসিনিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা হয়ে গেলে, জীবন সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়।
এরপর এগুলো কোনটা কোনস্তরে কতটুকু পরিমাণ লাগবে, এরও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আছে। আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। এর পাশাপাশি ইসলাম আরও পাঁচটিভাগে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে। যথা: ক. হিফজুদ-দীন তথা দীন সংরক্ষণ। খ. হিফজুন নাফস তথা প্রাণ সংরক্ষণ। গ. হিফজুল আকল তথা মস্তিষ্ক সংরক্ষণ। ঙ. হিফজুন নাসল তথা বংশধারা সংরক্ষণ। চ. হিফজুল মাল তথা সম্পদের সংরক্ষণ।
[৩৩] ইমাম গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৩০৬
[৩৪] ইমাম মুহাম্মাদ রহ., আল-কাসব (জীবিকার খোঁজে, মাকতাবাতুল বায়ান)
[৩৫] সহিহুল বুখারি: ২৭৪২; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮; সুনানু আবি দাউদ: ২৮৬৪

যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন ফরজ। এখন কথার কথা, আমাকে গাড়ি কিনতে হবে, বাড়ি করতে হবে, ঢাকায় দুটো বাড়ি কিনতে হবে, কয়েকটা ফ্ল্যাট নিতে হবে, বছর বছর বিদেশে ঘুরতে যেতে হবে—এই জীবিকা অর্জন করা কি ফরজ? মোটেও না! যেটুকু জীবিকা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, সেটুকু উপার্জন করা ফরজ। সেটা কতটুকু?

১. নিজের খাবার ও পোশাক
মৌলিক চাহিদা যেটাকে বলে আরকি। আধুনিক মৌলিক চাহিদা বলতে বোঝায়, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মৌলিক চাহিদা [৩২] হচ্ছে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্ত্রী বা জীবনসঙ্গিনী, বাহন। তাহলে প্রথমে হলো, নিজের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা, এর মধ্যে বিবাহ-শাদিও আছে, যানবাহন আছে, মোটরসাইকেল বা সাইকেল হতে পারে। বা আমরা যারা গণপরিবহণে যাতায়াত করি, পরিবহণের ভাড়াটা হতে পারে। এগুলো হচ্ছে ফরজ পরিমাণ।

২. ঋণ শোধ
যদি কোনো ঋণ থাকে আমার ওপরে, সেই ঋণ শোধ করাও আমার ফরজ উপার্জনের মধ্যে পড়ে। এটার জন্য যদি আমি ইনকাম করি, সেটাও ফরজ ইনকাম।

৩. স্ত্রী-সন্তানের খরচ
স্ত্রী-সন্তান-দাসের ভরণপোষণ পুরুষের ওপর ওয়াজিব। এবং পুরুষের একার ওপরই ওয়াজিব। এখানে স্ত্রীর কোনো দায়দায়িত্ব নেই। সুতরাং স্ত্রীর যে মৌলিক চাহিদা, তার খাবারদাবার, পোশাক-আশাক এবং সন্তানের যে মৌলিক চাহিদা, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসাখরচ থেকে শুরু আরও বিভিন্ন বিষয়-আশয়-এ সবকিছু ফরজ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।

৪. বয়স্ক পিতামাতার খরচ
অর্থাৎ, নির্ভরশীল অন্যান্য যারা আছেন, যেমন বয়স্ক পিতামাতা। তাদের যে খরচটা, মৌলিক চাহিদাসহ আরও অন্যান্য বিষয়-আশয়, সেই খরচটাও ফরজ উপার্জনের মধ্যে শামিল।

এই পুরো জিনিসটাকে বলা হচ্ছে ফরজ পরিমাণ ইনকাম। এখন ফরজ পরিমাণ ইনকাম যখন আমার হয়ে গেল, এরপরে দিনের বাকি সময়টা কি আমি আরও ইনকাম করব? নাকি আমি বাকি সময়টা ইবাদতের পেছনে দেবো? এর ব্যাপারে আলেমগণ বলেছেন, ফরজ জীবিকা অর্জনের পর, বাকি সময় ইবাদতে ব্যয় উত্তম। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةٌ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ।" দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ফরজ জীবিকা উপার্জন যখন হয়ে গেল, এরপর দিনের বাকি সময় আরও জীবিকা কামাই করার ধান্দায় না থেকে ইবাদতে ব্যয় করাই উত্তম। কিন্তু অতিরিক্ত ইনকামেরও সুযোগ আছে। একেবারে নেই যে, তা না। তবে ইবাদত করাটা উত্তম।

ইমাম গাজালি (৪৫০- ৫০৫ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি খুব টাকাপয়সা উপার্জন করছিল। তাকে সবাই দুনিয়াদার বলছে, এবং এরকম কথা বলছে যে, সে যদি অতিরিক্ত এত ইনকাম না করে বাকি সময়টা আল্লাহর রাস্তায় কাটাত, তাহলে কতই-না ভালো হতো। রাসুলের একটা হাদিসের মর্ম এমন-
যখন তোমার সামনে বলা হচ্ছে, "অমুকে অনেক ইনকাম করছে, ইনকামের পেছনে অনেক সময় ব্যয় করছে। সবচেয়ে ভালো হতো, যদি সে ইনকামটা না করে আল্লাহর রাস্তায় সময় দিত।" নবিজি বলেন যে, "তোমরা এরকম বলো না। কেননা, যদি সে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাজকর্ম করে, তবে সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে। (অর্থাৎ, ফরজ পরিমাণ উপার্জন) আর যদি সে নিজের বৃদ্ধ পিতামাতা ও দুর্বল শিশুদের জন্য কাজকর্ম করে, যাতে তারা অভাবগ্রস্ত না হয়, তবুও সে আল্লাহর রাস্তায়ই রয়েছে।" [৩৩]

ঈসা আলাইহিস সালামের একটি কাহিনি আছে। এক ব্যক্তি তার কাছে এলো। ঈসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী করো? লোকটি বলল, আমি আল্লাহর ইবাদত করি। তিনি বললেন, তাহলে তোমার যে খরচাপাতি আছে, এগুলো কে চালায়? লোকটি জবাব দিলো, আমার ভাই চালায়। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম জবাব দেন, তাহলে তো দেখছি তোমার ভাই-ই তোমার চেয়ে বেশি ইবাদত করে। যেহেতু তোমার খরচাপাতিগুলো সে চালাচ্ছে। সে জীবিকার পেছনে সময় দিচ্ছে, আর তুমি এখানে আল্লাহর ইবাদত করছ। তাহলে তো তোমার ভাই-ই আল্লাহর ইবাদত বেশি করছে। সে নিজেও চলছে, তোমাকেও চালাচ্ছে। [৩৪]

তাহলে আমরা এখানে একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে, ফরজ পরিমাণ জীবিকা উপার্জন করা, এটা আল্লাহর রাস্তায় থাকার মতো এবং এটা এক বিরাট বড় নেক আমল। মোটেই এমন না যে, আমি দুনিয়ার প্রয়োজন পুরা করছি বলে এগুলো বেকার হয়ে গেছে। বিলকুল তা নয়, বরং এটা একটা বড় নেক আমল। এবং এর জন্য আল্লাহর দরবারে সওয়াব পাওয়া যাবে।

আরেকটা হাদিস লক্ষ করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিজের স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়া, এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম সদকা।" [৩৫] এর মানে, স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য, স্ত্রীর খায়খরচের জন্য আপনি যে ব্যয়টা করবেন, এই ব্যয়টা সদকার সমান। সুতরাং জীবিকা উপার্জন করা এক তো হলো ফরজ। কেউ যদি উপার্জন না করে বসে থাকে, তাহলে সে কবিরা গুনাহের মধ্যে পড়ল। এবং সেইসাথে যদি কেউ উপার্জন করে, তাহলে এটা একটা বিরাট বড় নেক আমল হচ্ছে। ফরজের পরে সে এক বিরাট নফল আমলও করছে, সুবহানাল্লাহ।

টিকাঃ
[৩২] যদিও ইসলামের এ সংক্রান্ত ধারণাটি আরও ব্যাপক ও সমাজের নানা স্তর বিস্তৃত। পাঠকের ধারণার জন্য শুধু শিরোনামগুলো উল্লেখ করছি। বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছি না। প্রথমত ইসলাম মানুষের প্রয়োজনগুলোকে তিনভাগে ভাগ করে। ক. যরুরিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে প্রাণ রক্ষা পায় না। খ. হাজিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা না হলে পেরেশানিমুক্ত স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করা যায় না। গ. তাহসিনিয়্যাত তথা এমন প্রয়োজন, যা হয়ে গেলে, জীবন সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়।
এরপর এগুলো কোনটা কোনস্তরে কতটুকু পরিমাণ লাগবে, এরও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আছে। আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। এর পাশাপাশি ইসলাম আরও পাঁচটিভাগে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে। যথা: ক. হিফজুদ-দীন তথা দীন সংরক্ষণ। খ. হিফজুন নাফস তথা প্রাণ সংরক্ষণ। গ. হিফজুল আকল তথা মস্তিষ্ক সংরক্ষণ। ঙ. হিফজুন নাসল তথা বংশধারা সংরক্ষণ। চ. হিফজুল মাল তথা সম্পদের সংরক্ষণ।
[৩৩] ইমাম গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৩০৬
[৩৪] ইমাম মুহাম্মাদ রহ., আল-কাসব (জীবিকার খোঁজে, মাকতাবাতুল বায়ান)
[৩৫] সহিহুল বুখারি: ২৭৪২; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮; সুনানু আবি দাউদ: ২৮৬৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px