📄 রিজিক শুধু বস্তুগত বিষয় নয়
আমরা বাংলায় রিজিককে বলি 'জীবনোপকরণ'। মানে, জীবন চালাতে কী কী লাগে, তাকে বলে জীবনোপকরণ বা রিজিক। ইসলামের কনসেপ্ট হচ্ছে, রিজিক শুধু বস্তুগত কোনো বিষয় নয়। যেমন দেখুন-
| বস্তুগত | অবস্তুগত |
| --- | --- |
| ওষুধ | রোগমুক্তি |
| খাবার | ক্ষুধা মেটা |
| সতেজতা | ঘুম |
| অর্থসম্পদ | প্রয়োজন মেটা |
■ বস্তুগত রিজিক হচ্ছে 'ওষুধ'; অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে ' রোগমুক্তি'। মানে, ওষুধ আপনি সেবন করবেন, কিন্তু ওষুধ সেবন করলেই যে সবসময় রোগমুক্তি লাভ হবে, তা নয়।
■ একইভাবে, বস্তুগত রিজিক হচ্ছে ঘুম; অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে সতেজতা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, "আমার চোখের শীতলতা হচ্ছে নামাজে”। [১১] সমস্ত ক্লান্তি ভুলে আল্লাহর রাসুল সতেজ হয়ে যান, যদি তিনি নামাজ পড়তে পারেন। তার মানে, সতেজতাটা ঘুম ছাড়াও আল্লাহ তাআলা দিতে পারেন। আবার, আমাদের বিজ্ঞানীরা এ কথা বলেন যে, কারও যদি সতেজ লাগতে হয়, ঘুমের পরে কারও যদি সতেজ অনুভব হতে হয়, তাহলে তাকে বারোটার আগে দুই ঘণ্টা ঘুমাতে হবে; বা, তার প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। আবার এমন মানুষের সঙ্গেও আপনার পরিচয় হবে, যে দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমায় এবং ওই দুই ঘণ্টার ঘুমেই সে এক্টিভ হয়, সতেজতা লাভ করে। এটা আল্লাহ তাআলার দান, তিনি যাকে যেমন তাওফিক দেন, সে তেমন পায়; এটা অবস্তুগত রিজিক, যা সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে আসে।
আবার দেখুন, বস্তুগত রিজিক হচ্ছে 'খাবার'; আর অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে, 'ক্ষুধা মেটা' বা 'স্বাদ'। আপনি বাজার থেকে বোয়াল মাছ কিনে আনলেন বাড়িতে, কিন্তু রান্নাটা ভালো হলো না; আপনার স্ত্রী ভালোভাবে রাঁধতে পারলেন না। তার মানে, আপনি বস্তুগত রিজিক খাবারটা ইনকাম করে আনতে পারলেও, অবস্তুগত রিজিক স্বাদটা পেলেন না। আবার দেখা গেল, খাবার আপনি কিনছেন, কিন্তু খেতে পারছেন না ডায়াবেটিস বা নানান অসুবিধায়। মানে, কেনার পরেও খাবারটা গ্রহণ করতে পারছেন না। অর্থাৎ, খাওয়ার তাওফিক, ক্ষুধা মেটা, খেতে পারা, স্বাদ হওয়া-এ বিষয়গুলো হলো অবস্তুগত রিজিক। খাবার পেয়ে গেলেই যে এ বিষয়গুলো আপনার লাভ হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। অনেকে দেখবেন যে, অনেক খাচ্ছে, কিন্তু তার ক্ষুধা মিটছে না। ক্ষুধা মেটে না, এমন অসুখ আছে। আবার অনেকের দেখা যায়, পেটটা এত ফেঁপে আছে, ভালো ভালো খাবারও সে খেতে পারছে না। বস্তুগত রিজিক সে কামাই করে এনেছে, কিন্তু পেট ফাঁপা হয়ে থাকার কারণে, পেটে গ্যাস জমে থাকার কারণে সে খেতে পারছে না। এটা হলো অবস্তুগত রিজিকের বিষয়।
এখানে একটি হাদিসের কথাও স্মরণীয়। হাদিসটিতে বলা হয়েছে, শেষ জামানায় খাবারের খুব অভাব দেখা দেবে, দুর্ভিক্ষ হবে; মুমিনরা তখন ঈমান-আমল বাঁচানোর জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নেবেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, সেখানে খাবার ও পানীয়ের কী ব্যবস্থা হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেখানে আল্লাহর জিকিরই হবে তাদের খাবার; তারা জিকির করবে, আর তাদের পেট ভরে যাবে। [১২] বোঝা গেল, অবস্তুগত রিজিক যে 'ক্ষুধা মেটা', এর জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে সবসময় বস্তুগত খাবারের প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ এই বস্তুগত রিজিক ছাড়াও অবস্তুগত বিষয়গুলো চাইলে আমাদেরকে দিতে পারেন। তিনি চাইলে, ওষুধ ছাড়াও রোগমুক্তি দিতে পারেন; খাবার ছাড়াও ক্ষুধা মিটিয়ে দিতে পারেন; ঘুম ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সতেজতা দান করতে পারেন। বস্তুগত রিজিক আল্লাহ তাআলা আমাদের কর্মপ্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেছেন; জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেছেন; কিন্তু অবস্তুগত রিজিক আসে একমাত্র আল্লাহ তাআলার থেকে। তবে, তিনি চাইলে বস্তুগত রিজিক ছাড়াও ওই বিষয়গুলো আমাদেরকে দিতে পারেন। দেখুন, বস্তুগত রিজিক হচ্ছে অর্থসম্পদ, টাকাপয়সা। আর অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে 'প্রয়োজন মেটা'। এখন টাকা থাকলেই যে আপনার প্রয়োজন মিটে যাবে, তা কিন্তু নয়। আবার আল্লাহ তাআলা চাইলে, অর্থ ছাড়াও আপনার প্রয়োজনটা মিটিয়ে দিতে পারেন।
যেমন, আমি একটা উদাহরণ দিই। দেখবেন, যাদের অর্থসম্পদ বেশি, তার অভাবও তত বেশি। একটি চমৎকার হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলছেন, "হে আমার বান্দা, তুমি আমার ইবাদতের জন্য, আমার জিকিরের জন্য অবসর হয়ে নাও, অবসর করে নাও। যদি তুমি তা না করো, তাহলে আমি তোমার দুই হাতকে শত শত কাজ দিয়ে ভরে দেবো কিন্তু তোমার অভাব কখনো পূরণ করব না। আর যদি তুমি আমার জিকিরের জন্য নিজেকে অবসর হয়ে নাও (মানে, অবসর তো তোমার কাছে আসবে না, তুমি নিজে যদি অবসর তৈরি করে নাও) তাহলে আমি তোমার অন্তরকে ধনী করে দেবো।" [১৩]
যার অন্তর ধনী, তার তো বেশি অর্থসম্পদের প্রয়োজন নেই; কারণ, তার তো প্রয়োজনই কম, অত অর্থসম্পদ দিয়ে সে করবেটা কী। মানে, তার প্রয়োজন তো এমনিতেই মিটে আছে, পূরণ হয়েই আছে। দেখবেন, যার যত অর্থসম্পদ বেশি, তার তত লৌকিকতা বেশি। লৌকিকতার একটা চাহিদা আছে, তার খরচ বেশি, দেখানেপনা বেশি, ভোগবিলাসও বেশি। মানে, আয় বেশি বলেই যে তার প্রয়োজন মিটছে, তা নয়। বরং তার আরও প্রয়োজন বাকি রয়ে যাচ্ছে, অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। কারণ, তার অন্তর ধনী নয়। আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে অভাবী করে দিয়েছেন, তাই টাকাপয়সা তার প্রয়োজন মেটাতে পারছে না।
তাহলে, আমরা একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে, প্রয়োজন মেটা একটা রিজিক। আবার, অর্থসম্পদ আলাদা রিজিক। কিন্তু আমাদের মুশকিলটা হলো, আমরা রিজিক বলতে এই খাবার ও অর্থসম্পদকেই শুধু বুঝি। আর বাকি যে রিজিকগুলো আছে, সেগুলো সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। মানে, আমরা রিজিক বলতে শুধু বস্তুগত রিজিকটাকেই বুঝি; অবস্তুগত বিষয়গুলোকে আমরা রিজিক বলতে চাই না। অথচ অবস্তুগত বিষয়গুলোও রিজিক এবং আল্লাহ তাআলা চাইলে সেগুলো আমাদেরকে বস্তুগত মাধ্যম ছাড়া সরাসরিই দিতে পারেন। আবার, বস্তুগত রিজিক থাকলেও, অবস্তুগত প্রয়োজন পূরণ নাও হতে পারে, যদি আল্লাহ না চান। এই হলো ইসলামে রিজিকের কনসেপ্ট।
টিকাঃ
[১১] সুনানুন নাসায়ি: ৩৯৩৯; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৬৭৬; মুসনাদু আহমাদ: ১২২৯২; হাদিসটি সহিহ
[১২] সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০৭৭; সহিহুল জামি: ৭৮৭৫; সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা: ২৪৫৭; ইবনি মাজাহর সনদটি দুর্বল। তবে হাদিসের ভাষ্য সহিহ।
[১৩] সুনানুত তিরিমিযি: ২৪৬৬; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০৭; সহিহু ইবনি হিব্বান: ২০৯১; হাদিসটি সহিহ
আমরা বাংলায় রিজিককে বলি 'জীবনোপকরণ'। মানে, জীবন চালাতে কী কী লাগে, তাকে বলে জীবনোপকরণ বা রিজিক। ইসলামের কনসেপ্ট হচ্ছে, রিজিক শুধু বস্তুগত কোনো বিষয় নয়। যেমন দেখুন-
| বস্তুগত | অবস্তুগত |
| --- | --- |
| ওষুধ | রোগমুক্তি |
| খাবার | ক্ষুধা মেটা |
| সতেজতা | ঘুম |
| অর্থসম্পদ | প্রয়োজন মেটা |
■ বস্তুগত রিজিক হচ্ছে 'ওষুধ'; অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে ' রোগমুক্তি'। মানে, ওষুধ আপনি সেবন করবেন, কিন্তু ওষুধ সেবন করলেই যে সবসময় রোগমুক্তি লাভ হবে, তা নয়।
■ একইভাবে, বস্তুগত রিজিক হচ্ছে ঘুম; অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে সতেজতা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, "আমার চোখের শীতলতা হচ্ছে নামাজে”। [১১] সমস্ত ক্লান্তি ভুলে আল্লাহর রাসুল সতেজ হয়ে যান, যদি তিনি নামাজ পড়তে পারেন। তার মানে, সতেজতাটা ঘুম ছাড়াও আল্লাহ তাআলা দিতে পারেন। আবার, আমাদের বিজ্ঞানীরা এ কথা বলেন যে, কারও যদি সতেজ লাগতে হয়, ঘুমের পরে কারও যদি সতেজ অনুভব হতে হয়, তাহলে তাকে বারোটার আগে দুই ঘণ্টা ঘুমাতে হবে; বা, তার প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। আবার এমন মানুষের সঙ্গেও আপনার পরিচয় হবে, যে দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমায় এবং ওই দুই ঘণ্টার ঘুমেই সে এক্টিভ হয়, সতেজতা লাভ করে। এটা আল্লাহ তাআলার দান, তিনি যাকে যেমন তাওফিক দেন, সে তেমন পায়; এটা অবস্তুগত রিজিক, যা সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে আসে।
আবার দেখুন, বস্তুগত রিজিক হচ্ছে 'খাবার'; আর অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে, 'ক্ষুধা মেটা' বা 'স্বাদ'। আপনি বাজার থেকে বোয়াল মাছ কিনে আনলেন বাড়িতে, কিন্তু রান্নাটা ভালো হলো না; আপনার স্ত্রী ভালোভাবে রাঁধতে পারলেন না। তার মানে, আপনি বস্তুগত রিজিক খাবারটা ইনকাম করে আনতে পারলেও, অবস্তুগত রিজিক স্বাদটা পেলেন না। আবার দেখা গেল, খাবার আপনি কিনছেন, কিন্তু খেতে পারছেন না ডায়াবেটিস বা নানান অসুবিধায়। মানে, কেনার পরেও খাবারটা গ্রহণ করতে পারছেন না। অর্থাৎ, খাওয়ার তাওফিক, ক্ষুধা মেটা, খেতে পারা, স্বাদ হওয়া-এ বিষয়গুলো হলো অবস্তুগত রিজিক। খাবার পেয়ে গেলেই যে এ বিষয়গুলো আপনার লাভ হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। অনেকে দেখবেন যে, অনেক খাচ্ছে, কিন্তু তার ক্ষুধা মিটছে না। ক্ষুধা মেটে না, এমন অসুখ আছে। আবার অনেকের দেখা যায়, পেটটা এত ফেঁপে আছে, ভালো ভালো খাবারও সে খেতে পারছে না। বস্তুগত রিজিক সে কামাই করে এনেছে, কিন্তু পেট ফাঁপা হয়ে থাকার কারণে, পেটে গ্যাস জমে থাকার কারণে সে খেতে পারছে না। এটা হলো অবস্তুগত রিজিকের বিষয়।
এখানে একটি হাদিসের কথাও স্মরণীয়। হাদিসটিতে বলা হয়েছে, শেষ জামানায় খাবারের খুব অভাব দেখা দেবে, দুর্ভিক্ষ হবে; মুমিনরা তখন ঈমান-আমল বাঁচানোর জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নেবেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, সেখানে খাবার ও পানীয়ের কী ব্যবস্থা হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেখানে আল্লাহর জিকিরই হবে তাদের খাবার; তারা জিকির করবে, আর তাদের পেট ভরে যাবে। [১২] বোঝা গেল, অবস্তুগত রিজিক যে 'ক্ষুধা মেটা', এর জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে সবসময় বস্তুগত খাবারের প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ এই বস্তুগত রিজিক ছাড়াও অবস্তুগত বিষয়গুলো চাইলে আমাদেরকে দিতে পারেন। তিনি চাইলে, ওষুধ ছাড়াও রোগমুক্তি দিতে পারেন; খাবার ছাড়াও ক্ষুধা মিটিয়ে দিতে পারেন; ঘুম ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সতেজতা দান করতে পারেন। বস্তুগত রিজিক আল্লাহ তাআলা আমাদের কর্মপ্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেছেন; জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেছেন; কিন্তু অবস্তুগত রিজিক আসে একমাত্র আল্লাহ তাআলার থেকে। তবে, তিনি চাইলে বস্তুগত রিজিক ছাড়াও ওই বিষয়গুলো আমাদেরকে দিতে পারেন। দেখুন, বস্তুগত রিজিক হচ্ছে অর্থসম্পদ, টাকাপয়সা। আর অবস্তুগত রিজিক হচ্ছে 'প্রয়োজন মেটা'। এখন টাকা থাকলেই যে আপনার প্রয়োজন মিটে যাবে, তা কিন্তু নয়। আবার আল্লাহ তাআলা চাইলে, অর্থ ছাড়াও আপনার প্রয়োজনটা মিটিয়ে দিতে পারেন।
যেমন, আমি একটা উদাহরণ দিই। দেখবেন, যাদের অর্থসম্পদ বেশি, তার অভাবও তত বেশি। একটি চমৎকার হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলছেন, "হে আমার বান্দা, তুমি আমার ইবাদতের জন্য, আমার জিকিরের জন্য অবসর হয়ে নাও, অবসর করে নাও। যদি তুমি তা না করো, তাহলে আমি তোমার দুই হাতকে শত শত কাজ দিয়ে ভরে দেবো কিন্তু তোমার অভাব কখনো পূরণ করব না। আর যদি তুমি আমার জিকিরের জন্য নিজেকে অবসর হয়ে নাও (মানে, অবসর তো তোমার কাছে আসবে না, তুমি নিজে যদি অবসর তৈরি করে নাও) তাহলে আমি তোমার অন্তরকে ধনী করে দেবো।" [১৩]
যার অন্তর ধনী, তার তো বেশি অর্থসম্পদের প্রয়োজন নেই; কারণ, তার তো প্রয়োজনই কম, অত অর্থসম্পদ দিয়ে সে করবেটা কী। মানে, তার প্রয়োজন তো এমনিতেই মিটে আছে, পূরণ হয়েই আছে। দেখবেন, যার যত অর্থসম্পদ বেশি, তার তত লৌকিকতা বেশি। লৌকিকতার একটা চাহিদা আছে, তার খরচ বেশি, দেখানেপনা বেশি, ভোগবিলাসও বেশি। মানে, আয় বেশি বলেই যে তার প্রয়োজন মিটছে, তা নয়। বরং তার আরও প্রয়োজন বাকি রয়ে যাচ্ছে, অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। কারণ, তার অন্তর ধনী নয়। আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে অভাবী করে দিয়েছেন, তাই টাকাপয়সা তার প্রয়োজন মেটাতে পারছে না।
তাহলে, আমরা একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে, প্রয়োজন মেটা একটা রিজিক। আবার, অর্থসম্পদ আলাদা রিজিক। কিন্তু আমাদের মুশকিলটা হলো, আমরা রিজিক বলতে এই খাবার ও অর্থসম্পদকেই শুধু বুঝি। আর বাকি যে রিজিকগুলো আছে, সেগুলো সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। মানে, আমরা রিজিক বলতে শুধু বস্তুগত রিজিকটাকেই বুঝি; অবস্তুগত বিষয়গুলোকে আমরা রিজিক বলতে চাই না। অথচ অবস্তুগত বিষয়গুলোও রিজিক এবং আল্লাহ তাআলা চাইলে সেগুলো আমাদেরকে বস্তুগত মাধ্যম ছাড়া সরাসরিই দিতে পারেন। আবার, বস্তুগত রিজিক থাকলেও, অবস্তুগত প্রয়োজন পূরণ নাও হতে পারে, যদি আল্লাহ না চান। এই হলো ইসলামে রিজিকের কনসেপ্ট।
টিকাঃ
[১১] সুনানুন নাসায়ি: ৩৯৩৯; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৬৭৬; মুসনাদু আহমাদ: ১২২৯২; হাদিসটি সহিহ
[১২] সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০৭৭; সহিহুল জামি: ৭৮৭৫; সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা: ২৪৫৭; ইবনি মাজাহর সনদটি দুর্বল। তবে হাদিসের ভাষ্য সহিহ।
[১৩] সুনানুত তিরিমিযি: ২৪৬৬; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০৭; সহিহু ইবনি হিব্বান: ২০৯১; হাদিসটি সহিহ
📄 যে রাস্তাগুলো দিয়ে রিজিক আল্লাহ পৌঁছান
যে রাস্তাগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় রকমের রিজিক পৌঁছান, তার মধ্য থেকে এক নম্বর হলো নামাজ। নামাজের মাধ্যমে এবং নামাজের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রিজিক পৌঁছান। আল্লাহ বলছেন, “হে রাসুল, আপনি আপনার পরিবারদেরকে নামাজের আদেশ করুন, নিজেও অবিচল থাকুন; (নিজেও নামাজ পড়ুন, আর, নামাজের দাওয়াত দিন) আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না; বরং আমিই আপনাকে রিজিক দিই।” [১৪]
আমি আপনাকে রিজিক দেবো, আপনি মানুষকে নামাজের দাওয়াত দিন, আপনি দাওয়াতের কাজ করুন, মেহনত করুন, নিজে আমল করুন, আরেকজনকে আমলের দাওয়াত দিতে থাকুন, আমি আপনাকে রিজিক দেবো। তার মানে, সালাতের দ্বারা রিজিক আসে। দু রাকাত সালাত আপনি পড়লেন, আল্লাহর কাছে চাইলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওষুধ ছাড়াই সুস্থ করে দিলেন। এরকম রিজিক আসতে পারে।
২. তাকওয়া বা স্রষ্টানুভূতি
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে ইসলামের বিধিবিধানকে শক্তভাবে মেনে চলা। হালাল-হারামগুলো বেছে চলা, আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করা যে, আল্লাহ আমার সামনে উপস্থিত, আমি কীভাবে গুনাহ করতে পারি। সুরা তালাকে বলা হচ্ছে- "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত রিজিক দান করেন, যার ব্যাপারে তার কোনো ধারণাও ছিল না।" [১৫]
তার কোনো কল্পনাও নেই যে, এখান থেকে তার রিজিক আসতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা এমন সমস্ত জায়গা থেকেও রিজিক দেবেন।
৩. তাওয়াক্কুল
আল্লাহর ওপর ভরসা করা। অনুকূল হোক বা প্রতিকূল, বিপদে হোক, আনন্দে হোক-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, ভরসা করা, নির্ভর করা। পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা যে, আল্লাহ আপনিই করবেন; আমার কোনো শক্তি নেই, ক্ষমতা নেই; আপনিই করেন, আপনিই করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, "যদি তোমরা সঠিকভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে রিজিক দান করতেন, যেমন পাখিকে রিজিক দান করেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয়, পেট পূর্ণ করে রাতে ফিরে আসে।" [১৬]
অর্থাৎ, পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে, কোনো এমপি-মন্ত্রী-মিনিস্টারের তদবির-সুপারিশের ভরসা না করে, নিজের যোগ্যতার ওপর ভরসা না করে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরতের ওপর ভরসা করা যে, আল্লাহই করবেন। আল্লাহ তাআলা ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলার দ্বারাই ‘ফাইয়াকুন’ (হয়ে যায়)। আল্লাহ চাইলেই হয়ে যায়। গভীরভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে ছেড়ে দেওয়া, তাওয়াক্কুল করা। এর মাধ্যমে রিজিক আসে; পাখির মতোন রিজিক আসে।
৪. ইসতিগফার
প্রতিদিন বেশি বেশি আল্লাহর কাছে তাওবা করা, ক্ষমা চাওয়া। এর মাধ্যমে রিজিক আসে। একটি হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইসতিগফার করবে, আল্লাহ তাকে সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন; সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।" [১৭]
তাহলে, ইসতিগফারের মাধ্যমে রিজিক আসে। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না যে, কোত্থেকে আপনার রিজিক আসছে।
৫. কামাইয়ের চেষ্টা
যেটা আমরা করি। এবং রিজিকের তালাশ বলতে শুধু এটাই বুঝি ও বোঝাই। কুরআনের আয়াতে বলা হচ্ছে, "অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো (অর্থাৎ, জিকিরের সাথে...), যাতে তোমরা সফলকাম হও।" [১৮]
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
একটি হাদিস আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, "যে ব্যক্তি কামনা করে, তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।" [১৯]
অর্থাৎ, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর রাখা, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, সম্পর্ক ঠিক রাখা। এর মাধ্যমে রিজিক প্রশস্ত হয়।
৭. বিবাহ করা
■ কুরআনে এসেছে: "তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও... তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।..." [২০]
■ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "নারীদেরকে বিয়ে করো, নিশ্চয়ই তারা সম্পদ (সৌভাগ্য) নিয়ে আসে।” [২১]
■ আরেক হাদিসে এসেছে, "বিবাহের দ্বারা রিজিক তালাশ করো।" [২২]
■ উমর রা. বলেন, "আমি ওই লোকের প্রতি আশ্চর্য হই, যে বিবাহের দ্বারা রিজিক খুঁজে নেয় না...।" (এরপর তিনি ওপরের আয়াতটি তেলাওয়াত করেন দলিল হিসেবে।) [২৩]
তার মানে, বিবাহের মাধ্যমে রিজিক আসে। তাহলে দেখুন, রিজিকের জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মোট সাতটি ‘দোকান’ দিয়েছেন; কিন্তু আমি দোকান খোলা রেখেছি শুধু একটি। কেবল ব্যবসা আর চাকরির দোকান। একটিমাত্র দোকান খোলা রেখে আমি বলছি, 'আল্লাহ, আমার অভাব দূর হয় না, আমার অভাব দূর করে দিন; আল্লাহ, আপনি আমার রিজিকে বরকত দান করুন, আমার রিজিক বাড়িয়ে দিন।' বাকি ছয়টি দোকান বন্ধ রেখে আমি বলছি, আমার রিজিকের অভাব দূর হয় না। ক্যারিয়ার মানে যদি হয় রিজিকের তালাশ, তবে এই সাতটি মিলে হলো আমাদের ক্যারিয়ার, নাকি?! ক্যারিয়ার যদি হয় পেশা বা টাকা-রিজিক উপার্জনের মাধ্যম, তাহলে তো আমাকে বাকি ছয়টি দোকানও খোলা রাখতে হবে। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু: টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও।
এই সাতটি দোকানের সাতটিই খুলে রাখতে হবে। তাহলে, আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে আমাদের জন্য ভরপুর রিজিকের ফয়সালা হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু-টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও। এই সাতটা দোকান খোলা রাখলে আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, আপনার অনেককিছু হয়ে যাচ্ছে, কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই; কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই আপনার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাচ্ছে। আপনার প্রয়োজনগুলো মিটে যাচ্ছে। কীভাবে মিটে যাচ্ছে, আপনি জানেন না; সবকিছু জানা থাকা তো জরুরিও না। আল্লাহ তাআলা মিটিয়ে দিচ্ছেন। বা আপনার প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছেন। বরকত দিচ্ছেন।
বরকত বিরাট জিনিস। যখন যা পাওয়া দরকার পেয়ে যাচ্ছেন। যখন যে কাজটা হওয়া দরকার, হয়ে যাচ্ছে। একে বলা হয় বরকত। বরকত কিন্তু মাপা যায় না, তবে বোঝা যায়। আমার কাজটা হয়ে যাচ্ছে, আমার প্রয়োজনটা পূরণ হয়ে যাচ্ছে, বা ওই জিনিসটা আমার প্রয়োজনের তালিকা থেকেই সরে গেছে। আমি যতটুকু টাকা আয় করি, এ দিয়েই আমার সব প্রয়োজন মিটে গিয়ে আবার হজও করে এসেছি। এই হলো বরকত। দেখবেন, আপনার অনেক কাজ হয়ে যাচ্ছে অল্পতেই বা এমনিতেই, সুবহানাল্লাহ।
টিকাঃ
[১৪] সুরা তহা: ১৩২
[১৫] সুরা তালাক: ২-৩
[১৬] সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৪; সুনানুন নাসায়ি: ১১৮০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৬৪; হাদিসটি সহিহ
[১৭] হাকিম, মুসতাদরাক: ৭৬৭৭। সহিহ সূত্রে বর্ণিত
[১৮] সুরা জুমুআ: ১০
[১৯] সহিহুল বুখারি: ৫৯৮৫, সহিহ মুসলিম: ৪৬৩৯
[২০] সুরা নুর: ৩২
[২১] মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবা : ১৬১৬১, মুরসাল, নির্ভরযোগ্য
[২২] আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, হাদিস : ১৬২
[২৩] প্রাগুক্ত
যে রাস্তাগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় রকমের রিজিক পৌঁছান, তার মধ্য থেকে এক নম্বর হলো নামাজ। নামাজের মাধ্যমে এবং নামাজের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রিজিক পৌঁছান। আল্লাহ বলছেন, “হে রাসুল, আপনি আপনার পরিবারদেরকে নামাজের আদেশ করুন, নিজেও অবিচল থাকুন; (নিজেও নামাজ পড়ুন, আর, নামাজের দাওয়াত দিন) আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না; বরং আমিই আপনাকে রিজিক দিই।” [১৪]
আমি আপনাকে রিজিক দেবো, আপনি মানুষকে নামাজের দাওয়াত দিন, আপনি দাওয়াতের কাজ করুন, মেহনত করুন, নিজে আমল করুন, আরেকজনকে আমলের দাওয়াত দিতে থাকুন, আমি আপনাকে রিজিক দেবো। তার মানে, সালাতের দ্বারা রিজিক আসে। দু রাকাত সালাত আপনি পড়লেন, আল্লাহর কাছে চাইলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওষুধ ছাড়াই সুস্থ করে দিলেন। এরকম রিজিক আসতে পারে।
২. তাকওয়া বা স্রষ্টানুভূতি
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে ইসলামের বিধিবিধানকে শক্তভাবে মেনে চলা। হালাল-হারামগুলো বেছে চলা, আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করা যে, আল্লাহ আমার সামনে উপস্থিত, আমি কীভাবে গুনাহ করতে পারি। সুরা তালাকে বলা হচ্ছে- "যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত রিজিক দান করেন, যার ব্যাপারে তার কোনো ধারণাও ছিল না।" [১৫]
তার কোনো কল্পনাও নেই যে, এখান থেকে তার রিজিক আসতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা এমন সমস্ত জায়গা থেকেও রিজিক দেবেন।
৩. তাওয়াক্কুল
আল্লাহর ওপর ভরসা করা। অনুকূল হোক বা প্রতিকূল, বিপদে হোক, আনন্দে হোক-সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, ভরসা করা, নির্ভর করা। পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা যে, আল্লাহ আপনিই করবেন; আমার কোনো শক্তি নেই, ক্ষমতা নেই; আপনিই করেন, আপনিই করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, "যদি তোমরা সঠিকভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে রিজিক দান করতেন, যেমন পাখিকে রিজিক দান করেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয়, পেট পূর্ণ করে রাতে ফিরে আসে।" [১৬]
অর্থাৎ, পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে, কোনো এমপি-মন্ত্রী-মিনিস্টারের তদবির-সুপারিশের ভরসা না করে, নিজের যোগ্যতার ওপর ভরসা না করে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার কুদরতের ওপর ভরসা করা যে, আল্লাহই করবেন। আল্লাহ তাআলা ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলার দ্বারাই ‘ফাইয়াকুন’ (হয়ে যায়)। আল্লাহ চাইলেই হয়ে যায়। গভীরভাবে আল্লাহর ওপর নিজেকে ছেড়ে দেওয়া, তাওয়াক্কুল করা। এর মাধ্যমে রিজিক আসে; পাখির মতোন রিজিক আসে।
৪. ইসতিগফার
প্রতিদিন বেশি বেশি আল্লাহর কাছে তাওবা করা, ক্ষমা চাওয়া। এর মাধ্যমে রিজিক আসে। একটি হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইসতিগফার করবে, আল্লাহ তাকে সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন; সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।" [১৭]
তাহলে, ইসতিগফারের মাধ্যমে রিজিক আসে। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না যে, কোত্থেকে আপনার রিজিক আসছে।
৫. কামাইয়ের চেষ্টা
যেটা আমরা করি। এবং রিজিকের তালাশ বলতে শুধু এটাই বুঝি ও বোঝাই। কুরআনের আয়াতে বলা হচ্ছে, "অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো (অর্থাৎ, জিকিরের সাথে...), যাতে তোমরা সফলকাম হও।" [১৮]
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
একটি হাদিস আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, "যে ব্যক্তি কামনা করে, তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।" [১৯]
অর্থাৎ, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর রাখা, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, সম্পর্ক ঠিক রাখা। এর মাধ্যমে রিজিক প্রশস্ত হয়।
৭. বিবাহ করা
■ কুরআনে এসেছে: "তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও... তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।..." [২০]
■ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "নারীদেরকে বিয়ে করো, নিশ্চয়ই তারা সম্পদ (সৌভাগ্য) নিয়ে আসে।” [২১]
■ আরেক হাদিসে এসেছে, "বিবাহের দ্বারা রিজিক তালাশ করো।" [২২]
■ উমর রা. বলেন, "আমি ওই লোকের প্রতি আশ্চর্য হই, যে বিবাহের দ্বারা রিজিক খুঁজে নেয় না...।" (এরপর তিনি ওপরের আয়াতটি তেলাওয়াত করেন দলিল হিসেবে।) [২৩]
তার মানে, বিবাহের মাধ্যমে রিজিক আসে। তাহলে দেখুন, রিজিকের জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মোট সাতটি ‘দোকান’ দিয়েছেন; কিন্তু আমি দোকান খোলা রেখেছি শুধু একটি। কেবল ব্যবসা আর চাকরির দোকান। একটিমাত্র দোকান খোলা রেখে আমি বলছি, 'আল্লাহ, আমার অভাব দূর হয় না, আমার অভাব দূর করে দিন; আল্লাহ, আপনি আমার রিজিকে বরকত দান করুন, আমার রিজিক বাড়িয়ে দিন।' বাকি ছয়টি দোকান বন্ধ রেখে আমি বলছি, আমার রিজিকের অভাব দূর হয় না। ক্যারিয়ার মানে যদি হয় রিজিকের তালাশ, তবে এই সাতটি মিলে হলো আমাদের ক্যারিয়ার, নাকি?! ক্যারিয়ার যদি হয় পেশা বা টাকা-রিজিক উপার্জনের মাধ্যম, তাহলে তো আমাকে বাকি ছয়টি দোকানও খোলা রাখতে হবে। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু: টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও।
এই সাতটি দোকানের সাতটিই খুলে রাখতে হবে। তাহলে, আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে আমাদের জন্য ভরপুর রিজিকের ফয়সালা হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। রিজিক মানে শুধু টাকা নয়, শুধু খাবার নয়; রিজিক মানে সবকিছু-টেনশন-ফ্রি জীবন, রোগমুক্ত জীবন, এগুলোও। এই সাতটা দোকান খোলা রাখলে আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, আপনার অনেককিছু হয়ে যাচ্ছে, কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই; কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই আপনার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাচ্ছে। আপনার প্রয়োজনগুলো মিটে যাচ্ছে। কীভাবে মিটে যাচ্ছে, আপনি জানেন না; সবকিছু জানা থাকা তো জরুরিও না। আল্লাহ তাআলা মিটিয়ে দিচ্ছেন। বা আপনার প্রয়োজন কমিয়ে দিচ্ছেন। বরকত দিচ্ছেন।
বরকত বিরাট জিনিস। যখন যা পাওয়া দরকার পেয়ে যাচ্ছেন। যখন যে কাজটা হওয়া দরকার, হয়ে যাচ্ছে। একে বলা হয় বরকত। বরকত কিন্তু মাপা যায় না, তবে বোঝা যায়। আমার কাজটা হয়ে যাচ্ছে, আমার প্রয়োজনটা পূরণ হয়ে যাচ্ছে, বা ওই জিনিসটা আমার প্রয়োজনের তালিকা থেকেই সরে গেছে। আমি যতটুকু টাকা আয় করি, এ দিয়েই আমার সব প্রয়োজন মিটে গিয়ে আবার হজও করে এসেছি। এই হলো বরকত। দেখবেন, আপনার অনেক কাজ হয়ে যাচ্ছে অল্পতেই বা এমনিতেই, সুবহানাল্লাহ।
টিকাঃ
[১৪] সুরা তহা: ১৩২
[১৫] সুরা তালাক: ২-৩
[১৬] সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৪; সুনানুন নাসায়ি: ১১৮০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৬৪; হাদিসটি সহিহ
[১৭] হাকিম, মুসতাদরাক: ৭৬৭৭। সহিহ সূত্রে বর্ণিত
[১৮] সুরা জুমুআ: ১০
[১৯] সহিহুল বুখারি: ৫৯৮৫, সহিহ মুসলিম: ৪৬৩৯
[২০] সুরা নুর: ৩২
[২১] মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবা : ১৬১৬১, মুরসাল, নির্ভরযোগ্য
[২২] আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, হাদিস : ১৬২
[২৩] প্রাগুক্ত
📄 রিজিক অপরিবর্তনীয়
জীবিকা হচ্ছে রিজিকের মধ্যে একটি অংশ। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি, আমাদের বস্তুগত যে রিজিক রয়েছে (অর্থসম্পদ, খাবার, ওষুধ কেনার জন্য টাকা), এগুলোর সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে কর্মপ্রচেষ্টার সম্পর্ক রয়েছে, যাকে আমরা ক্যারিয়ার বলছি। জীবিকা তথা আয়সম্পদ হচ্ছে রিজিকের অংশ, আর রিজিক হচ্ছে তাকদিরের অংশ।
ওদিকে কারিকুলামে পশ্চিমা দর্শন আমাকে জানাচ্ছে যে, তোমাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে হবে। বেশি বেশি আয় করতে হবে, বেশি বেশি ভোগ করতে হবে, তাহলেই তুমি সফল। আর ইসলাম আমাকে বলছে, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমার আয়-রোজগার-ইনকাম ফিক্সড। রিজিক তাকদিরের অংশ, এটা নির্ধারিত, ফিক্সড। এখানে বাড়া-কমার সুযোগ নেই। তবে এমন হতে পারে, যা কষ্টের মধ্য দিয়ে আসত, সেটা সহজে আসছে। যা অপমানের হাত ধরে আসত, তা সহজতা ও ইজ্জতের সঙ্গে আসছে। যে রিজিকটা আমার, সেটা আমার জন্য ফিক্সড। কিন্তু সেটা কমিয়ে দেওয়া বা বাড়িয়ে দেওয়া, প্রশস্ত করা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, আমি একটা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করছি। আপনি একটি মুরগির বাচ্চাকে চাইলে ধান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে পারেন, বিভিন্ন দিকে ছিটিয়ে দিলেন, সে সারাদিন ধরে ঘুরবে আর কষ্ট করে করে একেকটা দানা খুঁটে খাবে। আবার, আপনি চাইলে এক জায়গাতেই দিতে পারেন, সে এসে একসাথে সব খেয়ে ফেলল, সময় ও শ্রম বেঁচে গেল। তার মানে, রিজিকের সংকীর্ণতা হলো, আপনি সারাদিন কষ্ট করে একটা কিছু অর্জন করলেন। আর প্রশস্ততা হলো, সে জিনিসটাই অল্প সময়ে, অনায়াসে, কম চেষ্টায় ও কম কষ্টে অর্জন করলেন। যেমন মুরগির বাচ্চাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না দিয়ে এক জায়গায় খাবার দিলেন, সে সহজে খেয়ে চলে গেল। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, আয়সম্পদটা রিজিকের অংশ, এটা ফিক্সড। ক্যারিয়ারের দ্বারা এটাই আমার কাছে আসবে; এর চেয়ে বেশি আসা সম্ভব নয়। এবং এটা আমার কাছে কষ্টের সঙ্গে আসবে, নতুবা আরামের সাথে। হয়তো হেনস্থার মাধ্যমে আসবে, নতুবা ইজ্জতের ও সম্মানের হাত ধরে আসবে। হয়তো এটা হালালের মাধ্যমে আসবে, অথবা হারামের মাধ্যমে আসবে।
■ আল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের জীবনোপকরণ ও তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা সব আকাশে আছে।” [২৪]
■ আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "এবং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, সবার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহরই।” [২৫]
■ আরেকটি আয়াতে বলেছেন, "তোমার পরিবারের লোকদের সালাতের নির্দেশ দাও, আর এর ওপর অটল থাকো। আমি তোমার কাছে জীবনোপকরণ চাই না, বরং আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিই...।” [২৬]
তার মানে বোঝা গেল, সব আকাশে আছে, সব আল্লাহর তরফ থেকে ওপর থেকে ফয়সালা হয়। তাহলে কেন কাজ করছি আমরা? দুনিয়ার কর্মপ্রচেষ্টাটা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে করতে বলেছেন; আল্লাহ বলেছেন বলে আমরা করি। কিন্তু এটার দ্বারা কতটুকু কী আসবে, তার ফয়সালা হবে ওপরে, এর ফয়সালা করবেন আল্লাহ তাআলা। আর আমরা কামাই-রুজি করব, কারণ এটা পুরুষের ওপর ফরজ, আল্লাহ করতে বলেছেন, তাই। কিন্তু আমার অন্তরের বিশ্বাস থাকবে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসবে; রাজ্জাকের পক্ষ থেকেই রিজিক আসে। আমি পুরো জীবনে কত টাকা আয় করব, সেটা লিখিত। কে আমার জীবনসঙ্গী হবে, সেটাও লিখিত। কবে, কোথায় মারা যাব, তাও লিখিত। এবং কতটা খাবার ও পানীয় আমি গ্রহণ করব, তাও লিখিত বা নির্দিষ্ট।
* হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তাকদির লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। (মানে, আমার-আপনার তাকদির, আমার-আপনার রিজিক, অর্থ, কামাই-এগুলো আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। (রাসুল আরও বলেছেন,) তখন আল্লাহর আরশ (সিংহাসন) পানির ওপরে ছিল।" [২৭]
* আরেকটি হাদিসে হজরত মুতাল্লিব ইবনে হানতাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিশ্চয়ই জিবরিল আমার অন্তরে ওহি ঢেলে দিয়েছেন, অবশ্যই রিজিক শেষ হওয়ার আগে কারও মৃত্যু হয় না; সুতরাং তোমরা হারাম ছেড়ে হালাল পথে রিজিকের অনুসন্ধান করো।" [২৮]
* আরেকটি হাদিসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বান্দার পাঁচটি বিষয় লিখে অবসর হয়ে গেছেন; তার মৃত্যুর সময়, তার (ভালা-মন্দ) আমল, তার মৃত্যুর সময়, তার রিজিক, তার পদচ্ছাপ, তার কবর।” [২৯]
তার মানে, আমার-আপনার যে রিজিক, সেটা আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদিরে লেখা শেষ। এবং আমার রিজিকটুকু শেষ না করে আমি মৃত্যুবরণ করব না। দোকানি আপনাকে ঠকিয়ে দশ টাকা নিয়েছে, এটা ওর রিজিকই ও নিয়েছে; ও আমার-আপনার ভাগ থেকে নেয়নি। এটা একটু স্পষ্ট করি, দোকানে গিয়ে আমি কথার কথা দশ টাকা ঠকে গেলাম। এটা ওর রিজিকটাই বিক্রেতা নিয়েছে হারামভাবে। আমার রিজিক থেকে ও নেয়নি। তাই, ঠকে যাওয়ার পরে যে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, এই কষ্ট পাওয়ার কিছু এতে নেই। পকেটমার পকেট থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে গেল, এটা ওর রিজিকটাই ও নিল। আমার অংশ থেকে কিছু নেয়নি; আমার থেকে ও কোনোদিন কিছু নিতে পারবে না।
তাহলে আমরা পুরো রিজিকের কনসেপ্টটা ক্লিয়ার করি; পশ্চিমের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের বিরোধ ও সংঘর্ষটা কোথায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষটা হচ্ছে, তারা বলতে চায়, বেশি বেশি কামাই করবে, বেশি বেশি ভোগ করবে। আর আমাদের (ইসলামের) কথা হচ্ছে যে, না, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তুমি বেশি কামাই করতে পারবে না। তুমি যেটা কামাই করবে, সেটা আল্লাহ তাআলা লিখেই রেখেছেন, ফিক্সড। এখন তুমি সেটা হালালভাবে অর্জন করবে, নাকি হারামভাবে করবে; শরীরকে কষ্ট দিয়ে করবে, নাকি আরামে করবে; ইজ্জতের সাথে করতে চাও, নাকি অপমানের সাথে-এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এটার পরিমাণ ফিক্সড, এর চেয়ে বেশি কামাই করতে আমরা পারব না।
টিকাঃ
[২৪] সুরা যারিয়াত: ২২
[২৫] সুরা হুদ: ৬
[২৬] সুরা তহা: ১৩২
[২৭] মুসলিম: ২৬৫৩
[২৮] মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৯/২৫৪
[২৯] মুসনাদে আহমাদ। হাদিস: ২১৭২৩
জীবিকা হচ্ছে রিজিকের মধ্যে একটি অংশ। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি, আমাদের বস্তুগত যে রিজিক রয়েছে (অর্থসম্পদ, খাবার, ওষুধ কেনার জন্য টাকা), এগুলোর সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে কর্মপ্রচেষ্টার সম্পর্ক রয়েছে, যাকে আমরা ক্যারিয়ার বলছি। জীবিকা তথা আয়সম্পদ হচ্ছে রিজিকের অংশ, আর রিজিক হচ্ছে তাকদিরের অংশ।
ওদিকে কারিকুলামে পশ্চিমা দর্শন আমাকে জানাচ্ছে যে, তোমাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে হবে। বেশি বেশি আয় করতে হবে, বেশি বেশি ভোগ করতে হবে, তাহলেই তুমি সফল। আর ইসলাম আমাকে বলছে, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমার আয়-রোজগার-ইনকাম ফিক্সড। রিজিক তাকদিরের অংশ, এটা নির্ধারিত, ফিক্সড। এখানে বাড়া-কমার সুযোগ নেই। তবে এমন হতে পারে, যা কষ্টের মধ্য দিয়ে আসত, সেটা সহজে আসছে। যা অপমানের হাত ধরে আসত, তা সহজতা ও ইজ্জতের সঙ্গে আসছে। যে রিজিকটা আমার, সেটা আমার জন্য ফিক্সড। কিন্তু সেটা কমিয়ে দেওয়া বা বাড়িয়ে দেওয়া, প্রশস্ত করা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, আমি একটা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করছি। আপনি একটি মুরগির বাচ্চাকে চাইলে ধান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে পারেন, বিভিন্ন দিকে ছিটিয়ে দিলেন, সে সারাদিন ধরে ঘুরবে আর কষ্ট করে করে একেকটা দানা খুঁটে খাবে। আবার, আপনি চাইলে এক জায়গাতেই দিতে পারেন, সে এসে একসাথে সব খেয়ে ফেলল, সময় ও শ্রম বেঁচে গেল। তার মানে, রিজিকের সংকীর্ণতা হলো, আপনি সারাদিন কষ্ট করে একটা কিছু অর্জন করলেন। আর প্রশস্ততা হলো, সে জিনিসটাই অল্প সময়ে, অনায়াসে, কম চেষ্টায় ও কম কষ্টে অর্জন করলেন। যেমন মুরগির বাচ্চাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না দিয়ে এক জায়গায় খাবার দিলেন, সে সহজে খেয়ে চলে গেল। তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, আয়সম্পদটা রিজিকের অংশ, এটা ফিক্সড। ক্যারিয়ারের দ্বারা এটাই আমার কাছে আসবে; এর চেয়ে বেশি আসা সম্ভব নয়। এবং এটা আমার কাছে কষ্টের সঙ্গে আসবে, নতুবা আরামের সাথে। হয়তো হেনস্থার মাধ্যমে আসবে, নতুবা ইজ্জতের ও সম্মানের হাত ধরে আসবে। হয়তো এটা হালালের মাধ্যমে আসবে, অথবা হারামের মাধ্যমে আসবে।
■ আল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের জীবনোপকরণ ও তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা সব আকাশে আছে।” [২৪]
■ আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "এবং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, সবার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহরই।” [২৫]
■ আরেকটি আয়াতে বলেছেন, "তোমার পরিবারের লোকদের সালাতের নির্দেশ দাও, আর এর ওপর অটল থাকো। আমি তোমার কাছে জীবনোপকরণ চাই না, বরং আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দিই...।” [২৬]
তার মানে বোঝা গেল, সব আকাশে আছে, সব আল্লাহর তরফ থেকে ওপর থেকে ফয়সালা হয়। তাহলে কেন কাজ করছি আমরা? দুনিয়ার কর্মপ্রচেষ্টাটা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে করতে বলেছেন; আল্লাহ বলেছেন বলে আমরা করি। কিন্তু এটার দ্বারা কতটুকু কী আসবে, তার ফয়সালা হবে ওপরে, এর ফয়সালা করবেন আল্লাহ তাআলা। আর আমরা কামাই-রুজি করব, কারণ এটা পুরুষের ওপর ফরজ, আল্লাহ করতে বলেছেন, তাই। কিন্তু আমার অন্তরের বিশ্বাস থাকবে, এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসবে; রাজ্জাকের পক্ষ থেকেই রিজিক আসে। আমি পুরো জীবনে কত টাকা আয় করব, সেটা লিখিত। কে আমার জীবনসঙ্গী হবে, সেটাও লিখিত। কবে, কোথায় মারা যাব, তাও লিখিত। এবং কতটা খাবার ও পানীয় আমি গ্রহণ করব, তাও লিখিত বা নির্দিষ্ট।
* হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে মাখলুকের তাকদির লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। (মানে, আমার-আপনার তাকদির, আমার-আপনার রিজিক, অর্থ, কামাই-এগুলো আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। (রাসুল আরও বলেছেন,) তখন আল্লাহর আরশ (সিংহাসন) পানির ওপরে ছিল।" [২৭]
* আরেকটি হাদিসে হজরত মুতাল্লিব ইবনে হানতাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "নিশ্চয়ই জিবরিল আমার অন্তরে ওহি ঢেলে দিয়েছেন, অবশ্যই রিজিক শেষ হওয়ার আগে কারও মৃত্যু হয় না; সুতরাং তোমরা হারাম ছেড়ে হালাল পথে রিজিকের অনুসন্ধান করো।" [২৮]
* আরেকটি হাদিসে এসেছে, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বান্দার পাঁচটি বিষয় লিখে অবসর হয়ে গেছেন; তার মৃত্যুর সময়, তার (ভালা-মন্দ) আমল, তার মৃত্যুর সময়, তার রিজিক, তার পদচ্ছাপ, তার কবর।” [২৯]
তার মানে, আমার-আপনার যে রিজিক, সেটা আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদিরে লেখা শেষ। এবং আমার রিজিকটুকু শেষ না করে আমি মৃত্যুবরণ করব না। দোকানি আপনাকে ঠকিয়ে দশ টাকা নিয়েছে, এটা ওর রিজিকই ও নিয়েছে; ও আমার-আপনার ভাগ থেকে নেয়নি। এটা একটু স্পষ্ট করি, দোকানে গিয়ে আমি কথার কথা দশ টাকা ঠকে গেলাম। এটা ওর রিজিকটাই বিক্রেতা নিয়েছে হারামভাবে। আমার রিজিক থেকে ও নেয়নি। তাই, ঠকে যাওয়ার পরে যে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, এই কষ্ট পাওয়ার কিছু এতে নেই। পকেটমার পকেট থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে গেল, এটা ওর রিজিকটাই ও নিল। আমার অংশ থেকে কিছু নেয়নি; আমার থেকে ও কোনোদিন কিছু নিতে পারবে না।
তাহলে আমরা পুরো রিজিকের কনসেপ্টটা ক্লিয়ার করি; পশ্চিমের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের বিরোধ ও সংঘর্ষটা কোথায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষটা হচ্ছে, তারা বলতে চায়, বেশি বেশি কামাই করবে, বেশি বেশি ভোগ করবে। আর আমাদের (ইসলামের) কথা হচ্ছে যে, না, তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন, তুমি বেশি কামাই করতে পারবে না। তুমি যেটা কামাই করবে, সেটা আল্লাহ তাআলা লিখেই রেখেছেন, ফিক্সড। এখন তুমি সেটা হালালভাবে অর্জন করবে, নাকি হারামভাবে করবে; শরীরকে কষ্ট দিয়ে করবে, নাকি আরামে করবে; ইজ্জতের সাথে করতে চাও, নাকি অপমানের সাথে-এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এটার পরিমাণ ফিক্সড, এর চেয়ে বেশি কামাই করতে আমরা পারব না।
টিকাঃ
[২৪] সুরা যারিয়াত: ২২
[২৫] সুরা হুদ: ৬
[২৬] সুরা তহা: ১৩২
[২৭] মুসলিম: ২৬৫৩
[২৮] মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৯/২৫৪
[২৯] মুসনাদে আহমাদ। হাদিস: ২১৭২৩
📄 বস্তুগত জীবিকা উপার্জনের বিধান
ইসলামে জীবিকার গুরুত্ব
• হালাল জীবিকা অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (আলজামিউস সগির লিস-সুযুতি, হাদিস: ৫২৭২) প্রত্যেক মুসলিম বলতে যদিও নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, কিন্তু এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পুরুষের ওপর তার অধীনস্থদের ভরণপোষণ ওয়াজিব, নারীদের ওপর নয়। এর আলোচনা পরে বিস্তারিত আসবে।
■ ফরজ সালাতের পর, জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ। (তাবারানি, বাইহাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)
তার মানে, আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন, ফরজ নামাজের পরে তোমরা বেরিয়ে পড়ো, এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করো। সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ফরজ সালাতের পরে জীবিকা অনুসন্ধানের যে তাগিদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ফরজের পর আরেকটা ফরজের হুকুম আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।
ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হিজরি) রহিমাহুল্লাহর ছাত্র, ইমাম মুহাম্মদ আশ-শাইবানি (১৩২-১৮৯ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ। তার একটি বই আছে, মাকতাবাতুল বায়ান থেকে সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—'জীবিকার খোঁজে'। সেখানে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা পাবেন। ইসলাম যে দুনিয়াবিমুখতার কথা বলে, সেই দুনিয়া-বিমুখতার সাথে জীবিকা উপার্জন বা ক্যারিয়ারের সমন্বয় সম্পর্কে বইটিতে চমৎকার আলোচনা আছে।
• যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না; সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ। ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ। [৩০]
• মুমিনের দেহ হলো তার বাহন, সে যেন বাহনের সাথে উত্তম আচরণ করে। [৩১]
অর্থাৎ, আমার এই দেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য, এই দেহ যদি অসুস্থ হয়ে যায়, এটিকে সুস্থ করার জন্য আমাকে জীবিকা উপার্জন করতে হবে। এই বাহনের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। খাদ্য-পোশাক-আবাস দিতে হবে। সেটা ফ্রি পাওয়া যায় না, সেজন্য অর্থকড়ি লাগবে। এই টাকার ব্যবস্থাটা আমরা দুইভাবে করতে পারি।
হয় আমাকে কারও কাছ থেকে ডাকাতি করতে হবে, কারও কাছ থেকে ছিনতাই করতে হবে, দোকানপাট লুট করতে হবে।
অথবা আমাকে জীবিকা উপার্জন করে, টাকা কামাই করে, সেটা দিয়ে দোকানে গিয়ে কিনতে হবে।
প্রথম রাস্তা হলো হারাম, আর হালাল রাস্তা হলো, জীবিকা উপার্জন করা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামে জীবিকা অনুসন্ধান করা ফরজ একটি আমল।
টিকাঃ
[৩০] কিতাবুল কাসব লি মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, পৃষ্ঠা ৭৩।
[৩১] মুসনাদে আহমদ হাদিস: ৬৬৩৯।
ইসলামে জীবিকার গুরুত্ব
• হালাল জীবিকা অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (আলজামিউস সগির লিস-সুযুতি, হাদিস: ৫২৭২) প্রত্যেক মুসলিম বলতে যদিও নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায়, কিন্তু এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পুরুষের ওপর তার অধীনস্থদের ভরণপোষণ ওয়াজিব, নারীদের ওপর নয়। এর আলোচনা পরে বিস্তারিত আসবে।
■ ফরজ সালাতের পর, জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ। (তাবারানি, বাইহাকি, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)
তার মানে, আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন, ফরজ নামাজের পরে তোমরা বেরিয়ে পড়ো, এবং আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তালাশ করো। সেই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ফরজ সালাতের পরে জীবিকা অনুসন্ধানের যে তাগিদ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। অর্থাৎ, ফরজের পর আরেকটা ফরজের হুকুম আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।
ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হিজরি) রহিমাহুল্লাহর ছাত্র, ইমাম মুহাম্মদ আশ-শাইবানি (১৩২-১৮৯ হিজরি) রহিমাহুল্লাহ। তার একটি বই আছে, মাকতাবাতুল বায়ান থেকে সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে—'জীবিকার খোঁজে'। সেখানে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত একটি ধারণা পাবেন। ইসলাম যে দুনিয়াবিমুখতার কথা বলে, সেই দুনিয়া-বিমুখতার সাথে জীবিকা উপার্জন বা ক্যারিয়ারের সমন্বয় সম্পর্কে বইটিতে চমৎকার আলোচনা আছে।
• যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না; সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ। ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ। [৩০]
• মুমিনের দেহ হলো তার বাহন, সে যেন বাহনের সাথে উত্তম আচরণ করে। [৩১]
অর্থাৎ, আমার এই দেহকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য, এই দেহ যদি অসুস্থ হয়ে যায়, এটিকে সুস্থ করার জন্য আমাকে জীবিকা উপার্জন করতে হবে। এই বাহনের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। খাদ্য-পোশাক-আবাস দিতে হবে। সেটা ফ্রি পাওয়া যায় না, সেজন্য অর্থকড়ি লাগবে। এই টাকার ব্যবস্থাটা আমরা দুইভাবে করতে পারি।
হয় আমাকে কারও কাছ থেকে ডাকাতি করতে হবে, কারও কাছ থেকে ছিনতাই করতে হবে, দোকানপাট লুট করতে হবে।
অথবা আমাকে জীবিকা উপার্জন করে, টাকা কামাই করে, সেটা দিয়ে দোকানে গিয়ে কিনতে হবে।
প্রথম রাস্তা হলো হারাম, আর হালাল রাস্তা হলো, জীবিকা উপার্জন করা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ইসলামে জীবিকা অনুসন্ধান করা ফরজ একটি আমল।
টিকাঃ
[৩০] কিতাবুল কাসব লি মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি, পৃষ্ঠা ৭৩।
[৩১] মুসনাদে আহমদ হাদিস: ৬৬৩৯।