📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 পুঁজিবাদ

📄 পুঁজিবাদ


টাকা উপার্জনের সঙ্গে যে সম্মানের একটা সম্পর্ক, এ বিষয়টি (বা ধারণাটি) দুনিয়ায় কবে থেকে শুরু হলো? মাছ জন্মায় পানিতে। পানি তার জন্য স্বাভাবিক বিষয়। সে ভাবে, সারা দুনিয়া বুঝি পানিই। আমরা যে পরিবেশে বড় হই, মনে করি, সব যুগে বুঝি এমনই ছিল; পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে সবকিছু বোধ হয় এরকমই ছিল।
জন্মের পর থেকেই আমরা দেখেছি, দোকানে গিয়ে এক টুকরো কাগজ দিলে, একটি চকলেট পাওয়া যায়। কাগজের নোটের বিনিময়ে পণ্য পাওয়া যায়—এর বাইরে অন্য কোনো সিস্টেম আমরা দেখিনি। জন্মের পর থেকে আমরা দেখে আসছি, প্রতি পাঁচ বছরে একবার ভোট হয়ে কেউ একজন ক্ষমতায় আসে। পাঁচ বছর পরে আবার একটা ভোট হয়, আবার নতুন একটি সরকার গঠিত হয়। আমাদের কাছে মনে হয়, এই পদ্ধতিই বুঝি শ্রেষ্ঠ, এটিই ধ্রুব; এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না; পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে হয়তো এমনই ছিল; এটিই স্বাভাবিক। অর্থাৎ, বাতাসের মধ্যে থাকতে থাকতে আমাদের কাছে বাতাস যেমন স্বাভাবিক হয়ে যায়, আমরা আলাদা কিছু অনুভব করতে পারি না, ঠিক একইভাবে, এ বিষয়গুলোও আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়।
ঠিক তেমনইভাবে ছোটবেলা থেকে যে ধ্যানধারণা আমরা শিখে এসেছি— ‘পড়ালেখা করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’, ‘তোমাকে অনেক বড় হতে হবে, বড় ডাক্তার হতে হবে, বড় ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে’। এভাবেই টাকার ভিত্তিতে সম্মান নির্ধারিত হওয়ার চিন্তা নিয়ে আমরা বড় হই। কিন্তু ব্যাপারটি এমন নয়। পৃথিবীর একটি ইতিহাস আছে। পৃথিবী চিরকাল এমন ছিল না; পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে গেছে, পৃথিবী বদলে গেছে। মানুষ বদলে গেছে; মানুষের মন-চিন্তা-চেতনা, হাসি-খুশি-স্বপ্ন সবকিছু বদলে গেছে। কীভাবে বদলে গেছে, তা দীর্ঘ আলোচনার বিষয়—পৃথিবী একটা সময় কেমন ছিল, আর আজকের পৃথিবী কেমন হয়ে গেছে। [৩]
যে অর্থনীতি বুঝল, সে পৃথিবীকে বুঝল। অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ফাসফেল্ডের একটি বিখ্যাত বই আছে, যেটির বাংলা হচ্ছে 'অর্থনীতিবিদদের যুগ'। এই বইয়ে লেখক বলছেন:
"ষোড়শ শতকে এই নতুন শিশু অর্থনীতি (পুজিবাদ) থেকে জন্ম নিল নতুন মনোভাব—বাজার-মানসিকতা, যার মূল্যবোধগুলো ভিন্ন ধরনের।... ধর্মের শিক্ষা ছিল, আর্থিকভাবেও প্রত্যেকে অপরের জন্য দায়ী। বিপরীতে নতুন এই মানসিকতায় সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অন্য সবার চেয়ে ওপরে ওঠা, অপরকে পিছে ফেলা আর টেক্কা দেওয়ার প্রচেষ্টা। ভ্রাতৃভাবের চেয়ে প্রতিযোগিতাই দরকারি মানসিকতা এই নতুন ব্যবস্থাতে।... ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।..."
মানে, ১৫০১-১৫৯৯, এই সময়ে মানুষের মধ্যে এক নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা উদয় হয়েছে, যা মানুষের মূল মানসিকতাকে প্রভাবিত করেছে। সেই নতুন ব্যবস্থা বা মানসিকতাটা কী? তিনি বলছেন, সেটা হলো 'বাজার-মানসিকতা'। যার মূল্যবোধগুলো, মানে নৈতিকতাগুলো ভিন্ন ধরনের। হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধগুলো ভিন্ন, এতদিন যা ছিল, তেমন না। এতদিন নৈতিকতা ছিল ধর্মভিত্তিক। ধর্মের শিক্ষা ছিল, আর্থিকভাবেও প্রত্যেকে অপরের জন্য দায়ী। সমাজে একজন নারী ক্ষুধার জন্য নিজের ইজ্জতকে বিক্রি করছে, এর জন্য পুরো সমাজই দায়ী হবে। পুরো সমাজের কেউ কেন তাকে সহযোগিতা করেনি যে, সে ক্ষুধা নিবারণের আহার জোগাতে এমন একটা জঘন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটা কিন্তু ইসলামেও আছে; ইসলামে জাকাত, সদকার ব্যবস্থা রয়েছে গরিবের জন্য। এমনকি, রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে খলিফা চাইলে ধনীদের ওপর আলাদা ট্যাক্স আরোপ করতে পারেন। সামাজিক নৈতিকতার বিষয়ে ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের নৈতিক নির্দেশনা, মূল্যবোধ, সামাজিক বন্ধনগুলো কাছাকাছি ধরনেরই।
কিন্তু নতুন জন্ম নেওয়া মানসিকতার মূল্যবোধ কেমন? বলা হচ্ছে, বিপরীতে নতুন এই মানসিকতায় সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অন্য সবার চেয়ে ওপরে ওঠা, অপরকে পিছে ফেলা আর টেক্কা দেওয়ার প্রচেষ্টা। অর্থাৎ, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, তাতে প্রতিযোগিতা আর স্বার্থবাদিতার প্রবণতা প্রাধান্য পাচ্ছে। আরেকজনের কী হলো, তা দেখার বিষয় নয়; অপরের জন্য স্যাক্রিফাইস করা বলতে সেখানে কিছু নেই; বরং আরেকজনকে পেছনে ফেলতে হবে, টেক্কা দিতে হবে।
এরপর ড্যানিয়েল ফ্যাসফেল্ড বলছেন, "...ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।" অর্থাৎ, একটা সময় পর্যন্ত মানুষের মর্যাদাটা টাকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল না; বরং এই মর্যাদা সম্পর্কযুক্ত ছিল তার জ্ঞান, আচারব্যবহার, গরিবের প্রতি দরদি মানসিকতার সঙ্গে; এগুলো দ্বারা মানুষ সম্মানিত হতো। অতিথিপরায়ণতার দ্বারা মানুষ সম্মানিত হতো। তা ছাড়া, বীরত্ব ও নেতৃত্ব দ্বারাও সম্মানিত হতো। যেমন আমরা দেখি, আবু সুফিয়ান জাহিলি যুগেও নেতৃত্বের কারণে সম্মানিত ছিলেন। অর্থাৎ, সামাজিক নানারকম ভূমিকায় মানুষ সম্মানিত হতো। কিন্তু ষোড়শ শতকে যে একটা নতুন মানসিকতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, অধিক লাভ করা, মুনাফা করা। কীভাবে অধিক মুনাফা করছি, তা দেখার বিষয় নয়; বরং লাভ করা দরকার, বেশি বেশি ভোগ করা দরকার। এই যে একটা মানসিকতা, এই মানসিকতা থেকেই 'সম্পদ সংগ্রহ দ্বারা মানুষের বিচার হতে থাকল'; অর্থাৎ, টাকা যে যত কামাবে, তার সম্মান তত বেশি; সম্মান বিষয়টিকে টাকার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা হলো। কিন্তু একটা সময় এমনটা ছিল না। তাই আমরা বলতে চাই, এটা আমাদের প্রকৃতিজাত পদ্ধতি নয়; মানুষের ফিতরাতের সঙ্গে এ পদ্ধতিটা যায় না। বরং এটা আমাদেরকে নতুন করে শেখানো হয়েছে, আমাদেরকে এতে প্রভাবিত করা হয়েছে।
এখানে আমরা প্রসঙ্গক্রমে শিক্ষার কথা বলতে পারি। Encyclopedia Britannica বলছে-
The new social and economic changes (এনলাইটেনমেন্ট)। also called upon the schools (public and private) to broaden their aims and curricula. Schools were expected not only to promote literacy, mental discipline, and good moral character (শিক্ষার আগের উদ্দেশ্য) but also to help prepare children for citizenship, for jobs, and for individual development and success. (পরের উদ্দেশ্য)
অর্থাৎ, নতুন চিন্তা-মানসিকতা আসার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক একটি চেঞ্জ এসেছে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষাবিষয়ক চিন্তাধারাও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, লিখতে-পড়তে পারা (promote literacy), শৃঙ্খলা শেখানো (mental discipline)। জীবনে কীভাবে চলতে হবে-সেগুলো শেখানো। আর নৈতিক চরিত্র (good moral character) গঠন করা। কিন্তু সমাজে নতুন যে পরিবর্তন এলো, তাতে এখন শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে গেল। এখন শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল-
১. নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি (citizenship)। মানে, ইউরোপে নতুন সোশ্যাল ও ইকোনমিক চেঞ্জ আসার পরে (যাকে এনলাইটেনমেন্ট বলা হয়) শিক্ষার উদ্দেশ্য পালটে গেল। [৪] এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাধারার মূল বিষয়গুলো হলো, ধর্মকে পাবলিক লাইফ থেকে, জনপরিসর থেকে দূরে সরিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে আবদ্ধ করে রাখা। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকবে, এটা রাষ্ট্রে থাকবে না, সমাজে থাকবে না, অর্থব্যবস্থায়ও থাকবে না। এরকম কিছু পরিবর্তন সাধিত হয় এনলাইটেনমেন্ট যুগের পর। এই যুগের আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য যা ছিল, এই যুগের পর তা পরিবর্তিত হয়ে শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে গেল,
ধর্মকে বাদ দিয়ে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হলো, সেটার জন্য উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করা, যে ওই ধর্মহীন ব্যবস্থার জন্য কাজ করবে।
২. নতুন অর্থব্যবস্থার (পুঁজিবাদী) জন্য কর্মী তৈরি করা, যারা চাকুরিতে (jobs) আসবে। চাকুরি করে এই নতুন অর্থব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে।
৩. নতুন সংজ্ঞার 'ব্যক্তি' তৈরি (individual development) করা। মানে, আপনি 'ব্যক্তি' (individual/human person) হতে পারবেন তখন, যখন আপনি পূর্ববর্তী যুগের ধর্মীয় ধ্যানধারণা-বিশ্বাস ত্যাগ করতে পারবেন। এগুলোকে বাদ দিয়ে নিজের যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে যখন আপনি চিন্তা করতে শিখবেন, ভালো-মন্দ সবকিছু ধর্ম থেকে নয় বরং নিজেই ঠিক করতে শিখবেন, তখন আপনি 'ব্যক্তি' হতে পারবেন। [৫]
'ইনডিভিজুয়াল', 'হিউম্যান', 'পারসন'- এগুলো মূলত দর্শনশাস্ত্রের পরিভাষা। এনলাইটেনমেন্ট যুগে নতুনভাবে যে দর্শন দেওয়া হচ্ছে, নতুনভাবে যে দৃষ্টিভঙ্গি আনা হচ্ছে, সেখানে বলা হচ্ছে, জীবনে আদর্শ 'ব্যক্তি' হতে হলে, ধর্মকে ত্যাগ করতে হবে, বা, কম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রাখতে হবে। এখানে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়াটা সফলতা নয়, বরং দুনিয়ায় সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোগবিলাস করতে পারাটাই হচ্ছে সফলতা।
ষোড়শ শতকে ইউরোপে যারা দার্শনিক ছিলেন, তারা বলছেন যে, 'হিউম্যান পারসন' আপনি তখনই হবেন, যখন আপনি আগের ধর্মীয় নীতিনৈতিকতা, ধর্মের ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম (বৈধ-অবৈধ) ইত্যাদিকে পাশে রেখে নিজের ভালো-মন্দ, নিজের বৈধ-অবৈধ নিজেই ঠিক করতে পারবেন। এ-ও বলা হচ্ছে যে, আপনি যখন এমন 'ব্যক্তি' হলেন, তখন আপনার সফলতা আর ধর্মের সঙ্গে যুক্ত নয়; বরং তা এই ইহলৌকিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এখানকার সফলতাই আপনার সফলতা। আপনি যখন ধর্মের বন্ধন থেকে স্বাধীন হতে পারবেন, নিজের ভালো-মন্দ যখন নিজেই ঠিক করতে পারবেন এবং এর মাধ্যমে যখন এই দুনিয়ায় সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবেন, তখনই আপনি একজন সফল মানুষ। অর্থাৎ, আপনার সফলতার মাপকাঠি পরিবর্তন হয়ে গেল। আগে সফলতার মাপকাঠি ছিল, আমি যদি নীতিনৈতিকতায় ভালো হতে পারি, আচার-আচরণে ভালো হতে পারি এবং এর ফলে পরকালে মুক্তি পেতে পারি, তাহলে আমি সফল। এখন এনলাইটেনমেন্ট পিরিয়ডে এসে তারা বলছে যে, না, আপনি সফল হবেন, যদি আপনি দুনিয়ার জীবনে সর্বোচ্চ ভোগ করে যেতে পারেন, পিতার চেয়ে আরও ওপরের স্তরের ভোক্তা হতে পারেন। [৬]
মোটকথা, শিক্ষার আগের উদ্দেশ্য আর এখনকার উদ্দেশ্যের মধ্যে তফাৎ এসে গেছে। এখনকার শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো-
• যোগ্য নাগরিক তৈরি, যারা নতুন ধর্মহীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে।
• যোগ্য কর্মী তৈরি, যারা নতুন ধর্মহীন অর্থব্যবস্থার জন্য কাজ করবে।
• এবং এমন ব্যক্তি তৈরি, যারা সফলতার নতুন ধর্মহীন সংজ্ঞার জন্য প্রস্তুত হবে।
এই তিনটি হলো নতুন শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য। এই যে আমরা মাঝে মাঝে বলি, ধর্মশিক্ষাকে কেন বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কেন ইসলাম শিক্ষার পাবলিক পরীক্ষা হবে না, কেন ইসলাম শিক্ষার সঙ্গে আবার নৈতিক শিক্ষা যোগ করা হলো? এগুলো কিন্তু ওই নতুন শিক্ষাব্যবস্থারই অনিবার্য পরিণতি-ধর্মহীন সেক্যুলার শিক্ষা।

টিকাঃ
[৩] লেখকের লিখিত 'অবাধ্যতার ইতিহাস' বইটি দেখতে পারেন।
[৪] Enlightenment হলো সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এর ফলে ঈশ্বর, যুক্তি, প্রকৃতি এবং মানবতার ধারণা নতুনভাবে তৈরি হয়; যার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক নতুন worldview বা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পশ্চিমে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং শিল্প-দর্শন-রাজনীতির ছাঁচ গড়ে দেয়। এই চিন্তাধারার কেন্দ্র হচ্ছে-যুক্তির প্রয়োগ। আর মানুষের মূল লক্ষ্য এখানে-জ্ঞান, স্বাধীনতা আর সুখ। ফ্রান্সে Voltaire, D'Alembert, Diderot, Montesquieu; স্কটল্যান্ডে Frances Hutcheson, Adam Smith, David Hume, Thomas Reid; জার্মানিতে Christian Wolff, Moses Mendelssohn, G.E. Lessing, Immanuel Kant প্রমুখ। এঁদের চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিল আরও আগের Hobbes, Locke, Descartes, Bayle, Leibniz, Spinoza-দের চিন্তাকে ঘিরে। [plato.stanford.edu]
[৫] 'ব্যক্তি'র (human person) প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীনতা। প্রাণিসত্তাকে অতিক্রম করে ব্যক্তিসত্তায় যাবার রাস্তা হলো 'পরিপূর্ণ স্বাধীনতা'। [Jean-Paul Sartre, L'Etre et le Néant] একজন লোক 'ব্যক্তি' হতে পারবে, যখন সে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত চর্চা করবে। স্বাধীনভাবে নিজের জীবনকে গড়ে নেবে এবং জীবন কীভাবে চালাবে সে নির্দেশনা নিজেই স্বাধীনভাবে দেবে। [Kierkegaard] সে-ই স্বাধীন 'ব্যক্তি' যে নৈতিকতার স্রষ্টা, নিজের নৈতিকতা নিজেই ঠিক করে (creator of values)। স্বাধীন ব্যক্তি আগের কোনো মূল্যবোধকে মেনে নেয় না। সে মূল্যবোধ-নৈতিকতা নিজে ঠিক করে। [Frederick C. Copleston: The Human Person in Contemporary Philosophy, PHILOSOPHY, Vol. 25, No. 92 (Jan. 1950), pp. 3-19]
[৬] জীবনের লক্ষ্য হলো সর্বাধিক সুখ চরিতার্থ করা (ভোগ) এবং সর্বনিম্ন কষ্ট পাওয়া (maximizing pleasure and minimizing pain) [hedonistic principle, John Locke]

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 ইসলামে সম্মানের ধারণা

📄 ইসলামে সম্মানের ধারণা


ইজ্জত-সম্মান আল্লাহর কাছ থেকে আসে। পার্থিব কিছুর সাথে সম্মান জড়িত না। ঠিক যেভাবে রিজিক আল্লাহর কাছ থেকে আসে, সম্মানও আল্লাহর কাছ থেকে আসে। সম্মান শুধু মুমিনদের।

১. কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
"বস্তুত যাবতীয় সম্মান তো আল্লাহরই এবং তাঁর রাসুল ও বিশ্বাসীদের। কিন্তু মুনাফিকরা (কপট) তা জানে না।" [১০০]
मुनाফিকরা এ কথা জানে না যে, তারা যা করছে তার মধ্যে সম্মান নেই। সেক্যুলার-কাফের-মুরতাদদের সমর্থন, তাদের কাছে প্রিয় হওয়া, স্বীকৃতি লাভ, জাতে ওঠার মাঝে সম্মান নেই। এদেরকে ওরা উচ্ছিষ্টভোগী কুকুর বা ধামাধরা চামচা ছাড়া অন্য নজরে দেখে না। নিজেদের মাঝে আলাপচারিতায় এসব মুনাফিককে নিয়ে ওরা হাসি-তামাশাই করে। বরং বিশ্বাসী যারা, ঈমান এনেছে যারা, ইসলামকে যারা ধারণ করছে, ইসলামের বিজয় চায় যারা, ইসলামের সাথে কোনোকিছুকে আপোশ করে না-তারাই সম্মানের, তাদেরকেই আল্লাহ সম্মান দেবেন। কাফের-মুরতাদরা তাদেরকে ভয় করে চলবে, মাথা নামিয়ে চলবে। নিজেদের মাঝে তাদের বীরত্বের আলোচনা করবে। সুতরাং সম্মান টাকার সাথে সম্পর্কযুক্ত না, সম্মান জমিজমার সাথে সম্পর্কযুক্ত না। সম্মান রাজনৈতিক বিষয়গুলোর সাথে জড়িত না। বরং সম্মান একমাত্র ঈমানের সাথে জড়িত। যে ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছে, সে সম্মান পাবে। সম্মান ইসলামে অটলতার সাথে জড়িত। যে আল্লাহকে রাজি করতে পেরেছেন, সম্মান ইসলামে অটলতার সাথে জড়িত।

আল্লাহ তাআলা আমাকে করতে বলেছেন বিধায়, আমরা জীবিকার্জন করি। আল্লাহ করতে না বললে, করতাম না। রাসুলের সুন্নত বলে, তাই আমরা জীবিকার্জন করি। কিন্তু দেবেন কে? একমাত্র আল্লাহ তাআলা। একইভাবে সম্মানও আল্লাহই দেবেন। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দ্বারা, আল্লাহকে রাজি-খুশি করার দ্বারাই আমি সম্মান পাব। এ ছাড়া অন্য কোনো দিকে যদি আমি সম্মান তালাশ করি, এবং সেখানে যদি আমি আল্লাহকে নারাজ করি, তাহলে সম্মান আমার নাগালে ধরা দেবে না, বরং আমি বেইজ্জত হব।

২. সুরা আলে-ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াতটি দেখুন। আমার প্রিয় একটি আয়াত, যখন আমি ইসলাম বুঝতাম না, তখনও এই আয়াতটি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়।
"বলো, হে আল্লাহ! হে রাজত্বের মালিক! আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান, রাজত্ব কেড়ে নেন। আর আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন। আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।" [১০৪]

আল্লাহ যাকে চান, তাকে অপমানিত করেন। কারও সবকিছু আছে—বড় ক্যারিয়ার আছে, বড় কোম্পানির সিইও, তার টাকার অভাব নেই, ক্রেডিট কার্ড আছে, কোনো চাহিদা পূরণের অভাব নেই। কিন্তু এরপরও সে বেইজ্জত হবে, যদি আল্লাহ চান। কারণ এগুলোর সাথে মান-অপমান নিশ্চিত নয়, মান-অপমান জড়িত একমাত্র আল্লাহ তাআলার সাথে। আল্লাহ যে দ্বীন পাঠিয়েছেন, সেই ইসলামের সাথে, আল্লাহর ওপর ঈমান আনার সাথে। আমি যত ইসলামের ওপর মজবুত, তত আমার সম্মান বাড়তে থাকবে। আর আমি যত ইসলামের ব্যাপারে আপোশকামী, তত আমার লাঞ্ছনা বাড়বে।

তাহলে বোঝা গেল, ক্যারিয়ার দ্বারা আমরা যে দুটি বিষয় চাচ্ছিলাম—
১. রিজিক, এটাও ক্যারিয়ারের সাথে জড়িত না।
২. ইজ্জত বা সম্মান, এটাও ক্যারিয়ারের সাথে জড়িত না।
দুটোই জড়িত আল্লাহ তাআলাকে রাজি-খুশি করার সাথে।

৩. খলিফা উমর রা.-এর সেনাপতি ছিলেন আবু উবাইদা রা.। তিনি বলছিলেন, "হে খলিফা, আপনি এই তালি দেওয়া জামাটাকে রেখে সুন্দর একটা জামা পরুন। আর যে উটে করে এসেছেন, উটটাকে রেখে একটা ঘোড়ায় চড়ুন। অনারবদের সমাজে এগুলো মানায় না।" উমর রা. সেনাপতি আবু উবাইদার বুকে থাপ্পড় দিয়ে বলেছিলেন,
"ওহ আবু উবাইদা, যদি তুমি ছাড়া আর কেউ এ কথা বলত, আমি তাকে এমন শাস্তি দিতাম, পুরো উম্মত তা মনে রাখত। আমরা তো লাঞ্ছিত জাতি ছিলাম, আল্লাহ ইসলামের দ্বারা আমাদেরকে সম্মান দিয়েছেন। আজ সেই ইসলাম ছেড়ে অন্যকিছুতে সম্মান খুঁজতে গেলে, আল্লাহ আবারও আমাদের লাঞ্ছিত করে দেবেন।" [১০৫]
সম্মান-ইজ্জত, এটা ইসলামের সাথে জড়িত। ইসলামকে যথাযথ পালন করার সাথে জড়িত। আরেকবার উমর রা. বলেন, "তোমরা ভাবছ সম্মান এগুলো থেকে আসে? (দুনিয়ার বস্তু দ্বারা) কখনো না। বরং সম্মান আসে ওখান থেকে (আকাশের দিকে ইশারা করে)।"

সুতরাং ক্যারিয়ারের দ্বারাই যে সম্মান পেতে হবে, এ বিষয়টা পশ্চিম আমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বিষয়টা সত্য নয়, বরং সম্মান আসে আল্লাহকে রাজি-খুশি করার মাধ্যমে।

সম্মান আসে জিহাদে
সম্মান আসে জিহাদের দ্বারা, অসম্মান আসে জিহাদ ছেড়ে দেওয়ার দ্বারা।
১. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, আমি শুনেছি, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“যখন তোমরা ‘ইনাহ’ ব্যবসা করবে, এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষবাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের ওপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” [১০৬]
এর ব্যাখ্যা হলো, একটি জাতির সকল লোক যদি জিহাদবিমুখ হয়ে চাষাবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন একপর্যায়ে শত্রুদেরকে তাদের ওপর লেলিয়ে দেওয়া হবে। আবু বাকরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “...এক জাতি হবে যারা গরুর লেজ ধরে চাষাবাদ করবে এবং জিহাদে বিমুখতা প্রকাশ করবে, তারা ধ্বংস হবে।” [১০৭]

আজকে দেখুন, ছাগলের রক্তের যে পরিমাণ দাম আছে, মুসলমানের রক্তের সেই পরিমাণ দামও নেই। একটা মশার রক্তের যে পরিমাণ দাম, মুসলমানের রক্তের সে পরিমাণ দাম নেই। আমাদের ইতিহাসে এতটা লাঞ্ছিত আমরা কখনো ছিলাম না। তাহলে এই অবস্থা হওয়ার কারণ হলো, সম্মানের দরজা আমরা বন্ধ করে রেখেছি, আমরা জিহাদ ছেড়ে দিয়েছি। 'ফরজে আইন' [১০৮] যে আমল, তা ছেড়ে দেওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর বেইজ্জতি চাপিয়ে দিয়েছেন। ইজ্জত যদি পেতে হয়, এই ফরজে আইনকে আবার জিন্দা করতে হবে।

২. দেখুন সুরা তাওবার ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
"বলো, যদি তোমাদের পিতারা, আর তোমাদের সন্তানেরা, আর তোমাদের ভাইয়েরা, আর তোমাদের স্ত্রীরা, আর তোমাদের গোষ্ঠীর লোকেরা, আর ধনসম্পদ যা তোমরা উপার্জন করেছ, আর ব্যবসা তোমরা যার মন্দার ভয় করো, আর বাসস্থান যা তোমরা ভালোবাসো, (এসব) যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তার পথে জিহাদ করা হতে অধিক প্রিয় হয়; তাহলে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তার চূড়ান্ত ফয়সালা তোমাদের কাছে নিয়ে আসেন। আর আল্লাহ অবাধ্য আচরণকারীদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।" [১০৯]
অর্থাৎ, ওই আটটা জিনিস যদি তোমাদের কাছে প্রিয়তর হয় তিনটা জিনিসের চেয়ে (আল্লাহর চেয়ে, আল্লাহর রাসুলের চেয়ে এবং জিহাদ করার চেয়ে), তাহলে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর আজাব তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যে অবাধ্য আচরণ তোমরা করছ, এর দ্বারা সঠিক পথ তোমরা পাবে না। আমরা ওই তিনটা তথা—আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর পথে জিহাদ করা ছেড়ে দিয়েছি এবং বাকি আটটা বিষয় সম্পর্কে আমরা সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি, সেগুলো আমাদের প্রিয় হয়ে গেছে। যার কারণে আজকে আমরা এই বেইজ্জতির মধ্যে পড়ে গেছি। সুতরাং ইজ্জত হচ্ছে আল্লাহর সাথে। ইজ্জত ইসলামের সাথে। ইজ্জত জিহাদের সাথে।

৩. উম্মে মুবাশশির রা. থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"মর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে নিজ ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে শত্রুকে সন্ত্রস্ত করে। এবং শত্রুরাও তাকে সন্ত্রস্ত করে।" [১১০]
শত্রুকে সন্ত্রস্তকারী সম্মানের পাত্র। অথচ আফসোস, শত্রুকে ‘সন্ত্রস্তকারী’- কে আমরা নিজেরাই ‘সন্ত্রাসী’ বলে গালি দিই, ডিজওন করি। নিঃসন্দেহে এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ-রাসুলের কাছে সে সম্মানিত, আর তাকে অসম্মানিত করার দ্বারা আমরাই হীন হয়ে পড়ে রয়েছি।

৪. সাওবান রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
- অনতিদূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজনপাত্রের ওপর একত্র হয়। (এবং চারদিক থেকে ভোজন করে থাকে।)
- আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রাসুল?
- বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।
- হে আল্লাহর রাসুল, দুর্বলতা কী?
- দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া। [১১১]

এই দুটো জিনিসের কারণে সম্মান উঠিয়ে নেবেন আল্লাহ তাআলা। তাহলে দুনিয়াকে যদি আমরা ভালো না বাসি, আখেরাতকে ভালোবাসি এবং মরতে চাই, শহিদ হতে চাই-এই দুটো জিনিস যদি আমরা নিজের মধ্যে আনতে পারি, আল্লাহ আবার আমাদেরকে সম্মান দান করবেন।

সম্মান আসে তাকওয়ায়
আল্লাহ জানাচ্ছেন, "নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।" [১১২]
টাকার সাথে সম্মানের সম্পর্ক নেই, বরং সম্মানের সম্পর্ক হচ্ছে তাকওয়ার সাথে। যত বেশি আমি আল্লাহকে ভয় করব, আল্লাহ আমার সম্মান তত বাড়িয়ে দেবেন। একটা চমৎকার হাদিস আছে, যখন আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বুকে কাউকে ভালোবাসেন, তখন আল্লাহ তাআলা জিবরিলকে বলেন, হে জিবরিল, অমুককে আমি ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। জিবরিল আলাইহিস সালাম তখন সমস্ত ফেরেশতার মধ্যে ঘোষণা করেন, হে ফেরেশতাগণ, অমুককে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, আমি ভালোবাসি, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন সমস্ত ফেরেশতা দুনিয়াতে সবখানে ঘোষণা করে দেন, হে সমস্ত মাখলুক, শোনো, অমুক গ্রামের অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, জিবরিল ভালোবাসেন, আমরা ফেরেশতারাও ভালোবাসি, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। [১১৩] সবাই তাকে সম্মান করে, ইজ্জত দেয়। সুতরাং ইজ্জত-সম্মান তাকওয়ার সাথে সম্পর্ক।

জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন,
"হে লোকসকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপ্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল, তাকওয়ার কারণেই। [১১৪]

সুতরাং তাকওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা আমার সম্মান দেবেন।

সম্মান আসে ইলমে-আমলে
আলেমদের যে কত সম্মান, চিন্তা করা যায় না। হজরত যাইনুল আবেদিন রহ. (আলি বিন হুসাইন) হাঁটছিলেন, আর রাস্তায় সকল মানুষ রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তখন ওই সময়কার খলিফা সুলাঈমান বিন আবদুল মালিক (সম্ভবত), জিজ্ঞেস করলেন, এই ব্যক্তি কে? মানুষ একে এত সম্মান করছে কেন? আমি খলিফা মক্কায় তওয়াফ করি, আমাকে কেউ সম্মান করে না, আর এই লোককে এত সম্মান করছে। তখন বলা হলো, এই লোক হচ্ছে আলি বিন হুসাইন রা.
এর মানে, ইলম ও আখলাকের দ্বারা খলিফার চেয়ে বেশি সম্মান হয়ে যায়। হাসান বসরি রহ.-এর একটা ঘটনা আছে। একবার খলিফা বসে আছেন, খলিফার আশেপাশে অনেক মানুষ। এমন সময় সেখানে হাসান বসরি এসেছেন। সমস্ত মানুষ খলিফাকে ছেড়ে ওখানে চলে গেছে। হাসান বসরির কাছে চলে গেছে। তখন একজন দাসি বলছে, দেখো, এটাই হচ্ছে বাদশাহি। খলিফা যে মর্যাদা পায়নি, হাসান বসরি সেই মর্যাদা পেয়েছে। এটা আসে ইলমের দ্বারা।

সুতরাং সম্মান আসে-
• ইলমের দ্বারা।
• আখলাকের দ্বারা।
• খেদমতের দ্বারা। মানুষের খেদমত করবেন, আল্লাহ সম্মান বাড়িয়ে দেবেন। আখলাকওয়ালা ব্যক্তি, হতে পারে সে গরিব, কিন্তু তার সম্মান আল্লাহ বাড়িয়ে দেন।
• খেদমতের দ্বারা, মানুষের খেদমত করবেন, আল্লাহ সম্মান বাড়িয়ে দেবেন।
• বীরত্বের দ্বারা সম্মান বাড়ে, যে বীর তার সম্মান আল্লাহ বাড়িয়ে দেবেন।
• নেতৃত্বের দ্বারা সম্মান বাড়ে।
• রাজত্বের দ্বারা সম্মান বাড়ে। যেমন, মুসলিমদের কাছে এখন রাজত্ব নেই, ফলে তারা বেইজ্জত হচ্ছেন।

এই বিষয়গুলো হলো সম্মানের আসবাব। টাকা সম্মানের মাধ্যম কখনোই ছিল না। ইউরোপে যখন পুঁজিবাদের উত্থান ঘটেছে, এই পুঁজিবাদের উত্থানের কারণে টাকার দ্বারা মানুষকে মূল্যায়ন করা শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ফ্যাসফেল্ড বলেছেন: (১৫শ শতকে নতুন অর্থনীতির বিকাশের পর) ....ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।...

এর আগ পর্যন্ত উল্লেখিত বিষয়গুলো দ্বারা মানুষদের মূল্যায়ন করা হতো। নারী হোক, পুরুষ হোক। ইলমের কারণে নারী বিখ্যাত হতো, আখলাকের কারণে, খেদমতের কারণে, বীরত্বের কারণে, এগুলোর কারণে নারী- পুরুষ সবাই সম্মানিত হতো। এগুলোই ছিল সম্মান আসার মাধ্যম। কিন্তু আজকে আমরা টাকার মধ্যে সবকিছু নিয়ে গেছি। কারণ আমরা নিজেরাই ইউরোপিয়ানাইজড। আমরা নিজে ইউরোপীয় হয়ে গেছি।

সুতরাং, যে মুমিন না, তার ক্যারিয়ার হলো-টাকা ও সম্মান। আমরা দেখলাম, টাকাও ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত না, সম্মানও ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত না। দুটো জিনিসই আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। ফলে মুমিনের ক্যারিয়ার হবে-দাওয়া ও সদকা। আমাদের ক্যারিয়ারের উদ্দেশ্যই হবে এই দুটো। আমার ক্যারিয়ারটা হবে আল্লাহর জন্য; আর টাকা-সম্মান তো আল্লাহ থেকেই আসে।

আমার ক্যারিয়ারটাকে ব্যয় করব আমার আসল জীবন, আখেরাতের জীবনকে পরিপূর্ণ করার জন্য। আর ওরা তাদের ক্যারিয়ারটা ব্যয় করে দুনিয়ার জীবন পরিপূর্ণ করার জন্য। আমার ক্যারিয়ারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমি এই ক্যারিয়ারটাকে ব্যবহার করে দাওয়া ও সদকার কাজ করব। যদি এটা করতে পারি, তাহলে এটাই হচ্ছে মুমিনের ক্যারিয়ার। একজন ঈমানওয়ালার ক্যারিয়ার। একজন আখেরাতে বিশ্বাসীর ক্যারিয়ার। একজন আল্লাহওয়ালার ক্যারিয়ার।

টিকাঃ
[১০০] সূরা আহযাব: ৩৩
[১০৪] সুরা আলে-ইমরান: ২৬
[১০৫] মাহজুস সাওয়াব: ২/৫৯০ (সনদ বিশুদ্ধ) সূত্রে আলি সাল্লাবি
[১০৬] সুনানু আবি দাউদ: ৩৪৬২; মুসনাদু আহমাদ: ৫৫৬২; বাইহাকি: ১০৪৮৪; হাদিসটি সহিহ
[১০৭] সুনানু আবি দাউদ: ৪৩০৬, মিশকাত: ৫৪৩২; হাদিসটি হাসান
[১০৮] যুদ্ধ বা জিহাদ দুই প্রকার: আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণাত্মক। আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজে কিফায়া (সামষ্টিক ফরজ) এবং রক্ষণাত্মক জিহাদ ফরজে আইন (ব্যক্তিগত ফরজ)। এই আয়াতের যেকোনো বিস্তারিত তাফসিরেই আপনি পাবেন এই কথাগুলো: মুসলিম ভূখণ্ড এক বিঘত পরিমাণও কাফেরদের অধীনে চলে গেলে ওই অঞ্চলের মুসলিমদের ওপর জিহাদ ফরজে আইন, বাকি মুসলিমদের জন্য ফরজে কিফায়া। তারা শত্রুর বিরুদ্ধে অপারগ হলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জন্য ফরজে আইন, বাকিদের জন্য কিফায়া। এভাবে ক্রমান্বয়ে পাশের এলাকা, তারা না পারলে তার পাশের এলাকা, এভাবে ফরজে আইনের হুকুম বর্তাবে। এটা গেল রক্ষণাত্মক জিহাদ। কোনো আলেম বলে দিক বা না দিক, কেউ যাক বা না যাক, প্রত্যেকের ওপর এই হুকুম। (মাআরেফুল কুরআন, সুরা বাকারার ২১৬ নং আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য)
আর আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজে কিফায়া। [দুটোই বিস্তারিত দেখুন, আল-হিদায়া, ই. ফা., ২/৪২১-৪৩০]
[১০৯] সুরা তাওবা: ২৪
[১১০] শুআবুল ঈমান, বাইহাকি: ৪২৯১, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা: ৩৩৩৩; এর সনদ বিশুদ্ধ
[১১১] সুনানু আবি দাউদ: ৪২৯৯; মুসনাদে আহমাদ: ২২৩৯৭; হাদিসটি সহিহ
[১১২] সুরা হুজুরাত: ১৪
[১১৩] সুনানু আবি দাউদ: ৪২৯৭; মুসনাদু আহমাদ: ২২৩৯৭; হাদিসটি সহিহ
[১১৪] সুনানু আবি দাউদ: ৪২৯৭; মুসনাদু আহমাদ: ২২৩৯৭; হাদিসটি সহিহ

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 ব্যবসা

📄 ব্যবসা


হালাল রিজিকের মধ্যে সর্বোত্তম রিজিক হলো গনিমত। এরপর হাদিয়া। এরপর [১১৫]...
১. গনিমত ২. হাদিয়া ৩. তেজারত (ব্যবসা) ৪. চাকরি ৫. ভিক্ষা (হালাল কিন্তু নিকৃষ্ট)
হারাম পেশার চেয়ে ভিক্ষা উত্তম। সেটা অন্য আলাপ। ইসলামে ব্যবসা ইবাদত। ব্যবসার ইসলামি নীতিমালা মেনে ব্যবসা করা আপনাকে সিদ্দিক-শহিদদের সাথে এক কাতারে দাঁড় করাবে। [১১৬] ব্যবসা ব্যাপারটাই ইসলামের সাথে যায়। ইসলামের মৌলিক মেজাজ ব্যবসার সাথে বরাবর। যেমন :

১. ব্যবসার আয় ফিক্সড না। ফলে তাওয়াক্কুল শেখা যায়, যেটা চাকরিতে সম্ভব না। ফলে রিজিক তালাশে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, আমল, দুআ ইত্যাদির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। তকদিরে বিশ্বাস, লেগে থাকার যোগ্যতা, সবর, পজিটিভ থিংকিং, আশা-ভয়ের দোলাচল, ছোট্ট থেকে শুরু করা, পরিশ্রম, কোনো কাজকে ছোট মনে না করা, ঠান্ডা মাথা, তাড়াহুড়াপ্রবণ না হওয়া, বদমেজাজি না হওয়া, আল্লাহর দানশীলতার ওপর অবিচল ভরসা—প্রতিটি জিনিসই ব্যবসার জন্য জরুরি, আর একজন মুসলিম বাই ডিফল্ট এগুলো লালন করে। মুসলিম হিসেবে ওই গুণগুলো আপনার ভেতর এমনিতেই থাকার কথা যেগুলো ব্যবসায় সফল হতে লাগে।

২. ব্যবসার মধ্যে ইসলাম ঢুকালে সেটা হয় 'খেদমতে খালক'। তার লক্ষ্য থাকে 'কাস্টমার স্যাটিসফেকশন' ও 'এমপ্লয়ি স্যাটিসফেকশন'। ব্যবসা ইটসেলফ একটা নেক আমল হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমে বড় বড় কোম্পানিগুলো এই নতুন পদ্ধতি এপ্লাই করছে: 'ভ্যালি মানসিকতা'। মানে হলো:
• ক্রেতাকে খুশি করার চেষ্টা।
• কর্মচারীদেরকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা।
• গ্রাহকের সমস্যার সমাধান খোঁজা।
• সবচেয়ে যোগ্য লোক দিয়ে সমস্যার সমাধান করা। সবচেয়ে সেরা উপায়ে।
• পৃথিবীতে অর্থবহ পরিবর্তন আনার চেষ্টা।
• সবকিছু কীভাবে আরও সুন্দর করা যায়।

ইসলাম তো সে কথাই বলে আসছে ১৪০০ বছর ধরে। ইসলাম এই ইহসান ও ইনসাফের কথাই বলে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রেতাকে পাল্লা ঝুঁকিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন (পরিমাণের চেয়ে সামান্য বেশি)। আপাতদৃষ্টে মুনাফা কমে যাওয়ার কথা থাকলেও দেখা গেছে শেষ পর্যন্ত মুনাফা বেড়ে যায়, বরকত হয়। ভালো মানসম্পন্ন পণ্য 'যৌক্তিক লাভ' রেখে ক্রেতাকে পৌঁছে দেওয়া বিরাট বড় নেক আমল। আর পুঁজিবাদ হলো উলটো। ব্যবসা থেকে ইসলামকে বের করে দিলে হয় 'পুঁজিবাদ', জুলুম। কাস্টমার ও এমপ্লয়িকে যতটা সম্ভব কম দিয়ে নিজের লাভ বেশি রাখা.

৩. ব্যবসা মুসলমানের দাওয়াহ। দক্ষিণ ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, আমাদের চট্টগ্রাম-নোয়াখালি, আফ্রিকার জাঞ্জিবার, তানজানিয়া, মোজাম্বিকে কোনো মুসলিম আর্মি যায়নি। এখানে গিয়েছে আরব ব্যবসায়ীরা। ব্যবসার মাধ্যমে ইসলাম ছড়িয়েছে এসব এলাকায়। চীনের ক্যান্টন শহরে সাহাবিরা গিয়ে ব্যবসা খুলেছিলেন। স্থানীয়রা ছুটে এসেছে: কারা তোমরা? এ কেমন সুন্দর তোমাদের ব্যবসা?
কেরালা-তামিলনাড়ুর মুসলিমরা সেখানে জনসংখ্যার ৩০-৪০%। জাত ব্যবসায়ী। বড় বড় ব্যবসায়গুলো মুসলিমদের। উত্তরপ্রদেশের মতো মুসলিম নির্যাতন সেখানে নেই। গরু জবাইয়েও সমস্যা নেই। সেখানকার রাজনীতি, অর্থনীতি, হিন্দুদের চাকরিবাকরি নির্ভরশীল মুসলিমদের ওপর। সুতরাং ব্যবসা মুসলমানের শক্তিও বটে.

৪. ব্যবসার জন্য আখলাক শেখা জরুরি। ক্রেতাবান্ধব হতে হয়। কাস্টমারের সাথে, কর্মচারীদের সাথে সুন্দর ব্যবহার ব্যবসার জন্য জরুরি.

৫. লেনদেন সাফ হওয়া, আমানতদারি, মজুরি যথাসময়ে পরিশোধ ইত্যাদি নানান অর্থনৈতিক নেক আমল ব্যবসার সাথে জড়িত.

৬. আকিদা সহিহ হয়। আল্লাহই যে রাজ্জাক, রিজিক বণ্টনকারী এটা ইয়াকিন হয়। ব্যবসায়ী চোখের সামনে দেখে প্রতিমাসে তার আয় সমান না। আল্লাহ বণ্টন করছেন। চাকরিতে মানুষ মাস শেষে ফিক্সড ইনকাম পায়, কোম্পানি থেকে আসা দেখে। ব্যবসায়ী আল্লাহ থেকে আসা দেখে। লাভ-লোকসানের দোলাচলে সম্পদ যে ক্ষণস্থায়ী, এটা তার মনমগজে বসে যায়.

কলোনিয়াল মানসিকতা ও অভিজ্ঞতা আমাদেরকে চাকরির নিরাপত্তা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। ব্যবসায়কে অনিশ্চিত হিসেবে দেখায়, নেগেটিভ হিসেবে দেখায়। নেটিভরা ব্যবসা কেন করবে, নেটিভরা করবে চাকরি; আর যত ব্যবসা সব করবে ব্রিটিশ। বিপরীতে দেখুন, ইহুদিরা সন্তানদের শেখায়ই ব্যবসা। খ্রিষ্টানরা ছাত্রবয়সে পার্টটাইম জব খোঁজে, ইহুদিরা খোঁজে পার্টটাইম ব্যবসা.

মুসলিম সন্তানদের গণহারে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা দরকার। উদ্যোক্তা-মন তাকে চাকরিতেও ভালো করার যোগ্যতা দেবে। ব্যবসা ব্যাপারটাই একজন মুসলিমের স্বাধীনচেতা মাইন্ডসেটের সাথে যায়, মুসলিম মাইন্ডসেটের সাথে যায়। চাকরি করতে নিষেধ করছি না। সবাই ব্যবসা করতে পারবেও না। তবে ব্যবসায়ী জ্ঞান, ব্যবসায়ী দৃষ্টি তাকে চাকরিতেও ভালো করার দক্ষতা এনে দেবে। আমরা কেবল চাকরির মুখাপেক্ষী হতে নিষেধ করছি। সুন্দর কয়েকটা বইয়ের নাম বলে দিই:
১. সম্পদ গড়ার কৌশল, সন্দীপন প্রকাশন
২. বিলিয়ন ডলার মুসলিম, সমকালীন প্রকাশনী
৩. প্রোডাক্টিভ মুসলিম, গার্ডিয়ান পাবলিকেশন
৪. শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ভাবনা, চেতনা প্রকাশন
৫. ইউ মাস্ট ডু বিজনেস, ড. তাওফিক চৌধুরি, সমকালীন প্রকাশন
৬. সচ্ছল হও, অক্ষম থেকো না, ইসলাম জামাল, রুহামা প্রকাশনী

আয় করতে, প্রোডাক্টিভ হতে ইসলাম নিষেধ করে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমর ইবনে আস রা.-কে নসিহত করেছেন ব্যবসায় মন দিতে। [১১৭] কারণ হিসেবে বলেছেন: নেক মানুষের হাতে হালাল মাল থাকা উত্তম। কারণ তা দ্বারা সে আত্মীয়ের হক আদায় করবে। ব্যবসা আপনার জন্য আনলিমিটেড আয়ের সুযোগ করে দেয়.

ব্যবসা বলতে আমরা বুঝি, ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা লোন নিয়ে, ব্যবসা করা। না! বরং ওই ব্যবসাই সফল হয়, যে ব্যবসা ছোট্ট থেকে শুরু হয়। যেমন, শুনেছে, আজাদ প্রোডাক্টের মালিক ঢাকা শহরে এসেছেন, পাঁচটা পোস্টার বিক্রি করতে। সেখান থেকে আস্তে আস্তে বিরাট ফ্যাক্টরি হয়ে গেছে। সফল ব্যবসাগুলোর কাহিনিই এরকম। ছোট্ট থেকে শুরু করতে হয়, এবং আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। প্রতিটি সফল ব্যবসা বিরাট আয়োজন করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে দোকান নিয়ে বড় পুঁজি দিয়ে শুরু হয় না। বরং প্রত্যেক সফল ব্যবসা শুরু হয় ঘরে-গ্যারেজে, ছোট্ট একটা ঘুপচির মধ্যে। সফল ব্যবসায়ীরা বড় দোকান ভাড়া নিয়ে নিজের কাছে ক্রেতা আসার অপেক্ষায় থাকে না, নিজেই ক্রেতার দোরগোড়ায় চলে যাওয়ার ফন্দি খোঁজেন। সফল ব্যবসায়ীরা প্রচুর ভোগও করেন না, তাদের জীবন থাকে সাদাসিধে। প্রাথমিক বাধ্যবাধকতা ও দায় কমিয়ে ব্যবসা শুরু করুন। প্রতিষ্ঠানের ঘর ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ইত্যাদি হলো প্রাথমিক দায়। শুরুতে নিজেই শ্রম দিন। সম্পদ ব্যয় কম করে পরিশ্রম ব্যয় করুন.

টিকাঃ
[১১৫] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার রিজিক রাখা আছে আমার বর্শার ছায়াতলে। অর্থাৎ আমার আয়ের উত্তম মাধ্যম হলো গনিমতের সম্পদ। (মুসনাদু আহমাদ: ৫৫১৪; সহিহুল জামি: ২৮৩১; হাদিসটি সহিহ) এ ছাড়াও তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সর্বোত্তম রিজিক কোনটি? তিনি বললেন, নিজ হাতে কামাই করা অর্থ এবং হালাল ব্যবসার কামাই। (মুসনাদু আহমাদ: ১৭২৬৫; আল-মুসতাদরাক, হাকিম: ২১৫৮: হাদিসটি হাসান) তা ছাড়া হাদিয়া আদান-প্রদানও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এই ব্যাপারে রাসুল আমাদের উৎসাহিত করেছেন।
ভিক্ষাবৃত্তি জায়েজ হলেও তাতে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ভিক্ষা করা তিন শ্রেণির মানুষের জন্য প্রযোজ্য: অতি দরিদ্র, ভয়াবহ কণে জর্জরিত, দিয়াত আদায়ে অপারগ ব্যক্তি। (সুনানু ইবনি মাজাহ: ২১৯৮)
[১১৬] সুনানুত তিরমিজি: ১২০৯; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৭৯৬; ইমাম তিরমিজির মতে হাদিসটি হাসান, তবে আলবানি রহিমাহুল্লাহর মতে, এর সনদ দুর্বল।
[১১৭] আল-আদাবুল মুফরাদ: ২৯৯; মুসনাদু আহমাদ: ১৭৭৬৩; ইমাম মুসলিমের শর্তে হাদিসটি সহিহ

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 নারীর ক্যারিয়ারিজম

📄 নারীর ক্যারিয়ারিজম


নারীর ক্যারিয়ারের যে নতুন সংজ্ঞা, সে মতে বর্তমানে নারীকে পুরুষের সাথে একই ট্রাকে ছোটানো হচ্ছে—ছোট; দৌড়াও। কিন্তু পুরুষ যেভাবে তৈরি, নারী তো সেভাবে তৈরি না। খুব স্বাভাবিক কারণে নারী ও পুরুষ আলাদাভাবে তৈরি। তাদের শরীর, মানসিক সাড়াগুলো আলাদাভাবে তৈরি। তাদের চিন্তাচেতনা, মেমোরি থেকে শুরু করে প্রতিটা জিনিস আলাদাভাবে তৈরি। কারণ তাদের 'রোল' আলাদা। নারীর শরীরই বলে দেয়, তাকে কীসের জন্য তৈরি করা হয়েছে। পুরুষের শরীরের স্ট্রাকচারই বলে দেয়, তাকে কীসের জন্য তৈরি করা হয়েছে।

নারীর দেহ-মনের ক্ষতি
দেখুন, একজন নারীর প্রতি মাসেই বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। ৯০% নারী মাসিকের আগে PMS নিয়েই দৌড়াচ্ছে (Rapkin & Winer, ২০০৯), পিরিয়ডের ব্যথায় নারী 'কাত করে ফেলা ব্যথা' নিয়েই দৌড়াচ্ছে কিংবা ছুটি নিচ্ছে। এই কঠিন অবস্থা নিয়েই সে অফিসে দৌড়াচ্ছে। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে দৌড়াচ্ছে। নারীকে এটা নিয়ে দৌড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে। যে সময়টাতে তার বিশ্রাম নেওয়ার কথা, তাকে কম স্ট্রেস দেওয়ার কথা, সেই সময়টাতেই পশ্চিমাবিশ্ব ৯০% নারীকে পুরুষের সাথে দৌড়াতে বাধ্য করছে।

কিন্তু পুরুষের তো আর এই সমস্যাটা নেই। একজন পুরুষকে তৈরিই করা হয়েছে এমনভাবে যে, সে স্ট্রেস নিতে পারবে। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। তার রেস্টের প্রয়োজন আছে। তাকে কম স্ট্রেস দিতে হবে। স্ট্রেসে থাকা একজন পুরুষের চেয়ে, স্ট্রেসে থাকা একজন নারীর শারীরিক ক্ষতি বেশি হয়। মানসিক অসুখ-বিসুখ বেশি হয়। স্ট্রেসের প্রভাবে লক্ষণগুলো নারীদের বেশি প্রকাশ পায়। একই পরিমাণ স্ট্রেসে পুরুষের তুলনায় নারীদের স্ট্রেস-হরমোন কর্টিসল বেশি বের হতে থাকে। (Verma, ২০১১)

■ ফলে টেনশন-জাতীয় মাথাব্যথা ও মানসিক রোগগুলো নারীদের বেশি হয়; Post-Traumatic Stress Disorder, Panic Disorder বা Obsessive-Compulsive Disorder ইত্যাদি। (Hammen, ২০০৯)
■ কমবয়েসী নারীদের হার্টের সমস্যাগুলো মূলত হার্টের ওপর এই স্ট্রেসের কারণেই হয়। (Vaccarino, ২০১৪)
■ লম্বা সময় নিয়ে স্ট্রেস থেকে IBS নামক অসুখ হতে পারে। পুরুষের চেয়ে নারীদের এই রোগের হার দ্বিগুণ। (Grundmann, ২০১০)
■ স্ট্রেসের কারণে মুটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নারীদের অনেক বেশি পুরুষের চেয়ে। (Michopoulos, ২০১৬)
■ লাগাতার স্ট্রেসে থাকা মহিলাদের PMS-এর সমস্যা বেশি মারাত্মক লেভেলের হয়। (Gollenberg, ২০১০) এগুলো ৯০% নারীর সবার মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায় না, কিন্তু যারা স্ট্রেসে থাকে তাদের মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

নারী স্ট্রেসে থাকার মূল কারণ কী?
নারীর স্ট্রেসের মূল কারণ হচ্ছে, নারী ডাবল রোল প্লে করছে। একসাথে দুটো ভূমিকা রাখছে। সে ঘরে সন্তান রেখে আবার চাকরি করতে চলে যাচ্ছে। যে নারীর একটা ফুলটাইম জব ছিল; সে এখন দুটো ফুলটাইম জব করছে। অফিসে একটা ফুলটাইম জব আবার বাসায় একটা ফুলটাইম জব। এই যে অফিসে ও বাসায় দ্বৈত ভূমিকার কারণেই, তাদের স্ট্রেস পুরুষের তুলনায় বেশি। সুতরাং ক্যারিয়ার ব্যাপারটা একজন নারীর ওপর স্ট্রেস। তার শরীরের জন্য ক্ষতি। তার মনের জন্য ক্ষতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ক্ষতি।

অফিসে ও বাসায় নারীর দ্বৈত ভূমিকাই তাদের কর্মস্থলে পুরুষের চেয়ে বেশি স্ট্রেস অনুভব করার মূল কারণ (Prasad, ২০১৬)। নারী-পুরুষ কোনোভাবেই সমান না। চাকরির নামে, স্বাবলম্বী হওয়ার নামে, সমানাধিকারের নামে, ক্ষমতায়নের নামে নারীকে জবমার্কেটে এনে, আমরা এই অতিরিক্ত স্ট্রেসটা নারীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছি।

■ কর্মজীবী নারীদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সম্ভাবনা ৪০% বেশি। ২০১২ সালে ২২,০০০ নারীর ওপর এক রিসার্চে এসেছে, যেসব নারীর (job-related stress) বেশি, তাদের ৪০% বেশি সম্ভাবনা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক (cardiovascular event) হবার। [১২৪]
■ ব্রিটেনের মতো স্ট্রেস-ফ্রি দেশেই ৭৯% নারী কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেসে ভুগছেন, ৭৮% নারী কর্মজীবীর ঘুমে সমস্যা, মোটের ওপর ৮৭% নারী স্ট্রেসে আছেন বলে জানিয়েছেন। [১২৫] অথচ, তাদেরকে যদি কর্মক্ষেত্রে না পাঠানো হতো, তারা যদি ঘরে থাকত, সন্তানের সাথে থাকত, মাসিকের সময় রেস্টে থাকত; তাহলে তাদের এই সমস্যাগুলো হতো না। এই অতিরিক্ত স্ট্রেস চাপিয়ে দেওয়ার কারণে, তাদের আজ এই অবস্থা।
■ পুরুষের মাঝে কাজ করতে নারী বেশি স্ট্রেস ফিল করে, সেখানেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুরুষপ্রধান কর্মস্থলে কর্মরত নারীরা উচ্চমাত্রার উদ্বেগের মাঝে থাকে। (high levels of interpersonal stress) যা তাদের স্বাস্থ্যহানি করতে পারে।
■ নারী কর্মকর্তারা বেশি স্ট্রেস, উদ্বেগ ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন। [১২৬] এর মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পুঁজিবাদ এই যে নারীদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, মোটিভেট করে তাদেরকে কর্মক্ষেত্রে পাঠাল; এর বিরুদ্ধে নারীর শরীরই বিদ্রোহ করছে। নারীর শরীর তো এটার জন্য তৈরি না। পুরুষের শরীর যার জন্য তৈরি, নারীকে সেই মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং ক্যারিয়ারের যে কনসেপ্টটা নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে দেওয়া হলো, তা নারীর শরীরের জন্য, তার মনের জন্য ভালো হয়নি। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কী ক্ষতি হচ্ছে, আমরা তা বিস্তারিত উল্লেখ করব।

মানবপ্রজাতির ক্ষতি
■ গর্ভকালীন স্ট্রেসের দরুন গর্ভকালীন জটিলতা, যেমন আগেই ব্যথা ওঠা, আগে আগেই বাচ্চা হয়ে যাওয়া, কম ওজনের বাচ্চা, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ইত্যাদি এখন বেশি হচ্ছে। (Coussons-Read, ২০১৩)
■ বাচ্চাদের জন্মগত ত্রুটিও বেশি হচ্ছে। যেমন তালুকাটা (cleft palate), ঠোঁটকাটা (cleft lip), মেরুদণ্ড জোড়া না লাগা (spina bifida), জন্মগত হৃদরোগ (Fallots tetralogy) এবং মাথাবিহীন বাচ্চা (anencephaly) ইত্যাদি। মূলত অতিরিক্ত গর্ভকালীন স্ট্রেসের কারণে। অতিরিক্ত কর্টিসলকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। (Carmichael, ২০০৭) [১২৭]
■ বাচ্চা হওয়ার পরও বাচ্চার সমস্যা রয়ে যাচ্ছে তার গর্ভকালীন স্ট্রেসের ফল হিসেবে। (Carmichael, ২০০৭) বাচ্চার সম্পর্ক স্থাপনে সমস্যা, খিটখিটে মেমাজ, আবেগিক সমস্যা, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, কম রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা, বুদ্ধিবিকাশে বাধা, স্মৃতিস্বল্পতা ইত্যাদি। (Coussons-Read, ২০১৩) [১২৮]
■ অটিজম রোগাক্রান্ত শিশুও বেশি জন্মাচ্ছে (Varcin, ২০১৭) [১২৯]
■ শিফটিং ডিউটি করে যেসব মেয়ে, নর্মালের চেয়ে তাদের মোট ডিম্বাণু ৮.৮% কম। আর পরিণত ডিম্বাণু কমে গেছে ১৪.১%। (Gaskins, ২০১৫)

অর্থাৎ, আমাদের যে-সমস্ত বোন মর্নিং-ইভিনিং-নাইট তথা, শিফটিং ডিউটি করে, এর কারণে তাদের ডিম্বাণু কমে যাচ্ছে। যে কারণে নারীজন্ম, সেটিই শেষ। তাহলে তো পুরুষ হয়ে জন্মানো দরকার ছিল। নারী হয়ে জন্মানোর বিশেষত্বই হলো, পরবর্তী প্রজন্ম রেখে যাওয়া। সেই পরবর্তী প্রজন্মের এই বিরাট ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। মূলত নারীকে বড়ি খাওয়ানো হয়েছে—সমতার বড়ি, স্বাধীনতার বড়ি, আত্মমর্যাদার বড়ি, ক্ষমতায়নের বড়ি। ক্যারিয়ার কনসেপ্টটা পুরুষ ও নারীর সমান হতে পারে না। নারীর ক্যারিয়ার হবে আলাদা। তাদের শরীর এটাই ডিমান্ড করে। আরও দেখি চলুন।

১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালে পরপর তিনটি রিসার্চের ফলাফলের ওপর University of London-এর প্রফেসর Jay Belsky সিদ্ধান্তে আসেন: 'ছোটবয়েস থেকে দীর্ঘসময় বাচ্চাকে মা ছাড়া অন্য কারও কাছে রেখে পাললে (early and extensive nonmaternal care),
■ পরবর্তী সময়ে পিতামাতার সাথে সন্তানের দূরত্ব বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
■ সন্তানের ভেতরে রাগ-জেদ ইত্যাদি আগ্রাসী স্বভাব বৃদ্ধি পায়।
■ বাচ্চাবয়সে, স্কুলে যাওয়ার আগের বয়সে এবং প্রাথমিক ক্লাসগুলোতে কাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিক বিকাশ হয় না (noncompliance)।'
■ বাচ্চার ১ম বছরে যেসব মা জবে থাকে ফুলটাইম, সেসব বাচ্চার ৩ বছর, ৪ বছর ও গ্রেড-১-এ বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রোথ তুলনামূলক কম। অর্থাৎ, মায়ের ফুলটাইম জব, বাচ্চাকে আনফিট করে দিচ্ছে।
■ এসব মায়ের ডিপ্রেশন হওয়ার হার 'বেকার' মায়েদের চেয়ে বেশি। (Brooks-Gunn, 2010)

এসবের কারণ আছে, বাচ্চার সাথে মায়ের সম্পর্ক তো শুধু মানসিক না, শারীরিকভাবেও বাচ্চার সাথে মায়ের সম্পর্ক থাকে। অক্সিটোসিন নামে একটা হরমোন আছে। বাচ্চা যখন কাঁদে, মায়ের ওই অক্সিটোসিন হরমোনে উথালপাথাল শুরু হয়। ওই হরমোনের কারণে এই মা, না বাচ্চা রেখে অফিসে গিয়ে শান্তিতে আছে, আর না বাড়িতে শান্তিতে আছে অফিসের কথা ভেবে। অফিসে থাকলে বাচ্চা নিয়ে টেনশন, আবার বাসায় এলে অফিস নিয়ে টেনশন। ফলে ডিপ্রেশনের হার ঘরে থাকা মায়েদের চেয়েও বেশি।

এই রিসার্চ কি আমাদের চিন্তার সাথে মিলল? আমাদের যে নারীর ক্যারিয়ার শেখানো হয়েছে। নারীর শিক্ষা, নারীর এ বিষয়গুলো শেখানো হলো, এসবের সাথে তো মিলল না। পুজিবাদী-নারীবাদী মতের বিরুদ্ধে হওয়ায় এরপর বেচারাকে ধুয়ে দেওয়া হয়। তারপরও ২০০১ সালে Journal of Child Psychiatry and Psychology-তে তিনি নিজ মতের ওপর অটল থাকেন। (Belsky, ২০০১)

তার মানে বোঝা যাচ্ছে, নারীকে যদি পুরুষের মতো ক্যারিয়ার করতে হয়, তাহলে নিজের শরীরকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে। নিজের মনকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে। নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে স্যাক্রিফাইস করে দিয়ে, এরপর তাকে পুরুষের মতো ক্যারিয়ার করতে হবে। এর আগ পর্যন্ত পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতামূলক ক্যারিয়ার করার সুযোগ একজন নারীর নেই। যদি না সে নিজেকে শেষ করে ফেলে, যদি না সে তার মনকে শেষ করে ফেলে, যদি না সে তার সন্তানের ভবিষ্যৎকে শেষ করে ফেলে। এই চিন্তা যদি সে না করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবে সে 'কথিত ক্যারিয়ার' করতে পারবে না। হাততালি পাওয়া 'ক্যারিয়ার-ওম্যান' হতে পারবে না। শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু আমি ওই কথাই বলব, যে কথা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে কথা সালফে সালেহিন বলেছেন, এবং যে কথা আজকে আধুনিক রিসার্চগুলো পর্যন্ত বলছে: পুঁজিবাদী যে ষড়যন্ত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার নেতৃত্বে শুরু হয়েছে, এটা মানুষের জীবনবিরোধী। আপনাকে আপনার জীবন উপভোগ করতে দেবে না। আপনাকে নিংড়ে-চুষে কেবল আপনার শ্রমটাকে তারা নিয়ে নেবে। আপনার যে নিজস্ব একটা জীবন, নিজস্ব সুখশান্তি-এটা আপনাকে উপভোগ করতে দেবে না।

এর ফলে কী হয়েছে দেখুন। মানবজাতিই বিলুপ্তির মুখে পড়ে যাবে এই পশ্চিমা সভ্যতার কারণে। সারা দুনিয়া যদি পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে লেগে যায়, তবে মানবপ্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার দিকে চলে যাবে।

■ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে, যা গড়ে নারীপ্রতি ১.৭৬ জন সন্তান। ইউরোপীয় ইউনিয়নে গড় জন্মহার ১.৬। ধরুন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। ১৬ কোটি জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটিই থাকতে হয়, তাহলে জন্মহার হতে হবে ২.১। মানে, ২.১ হলে জনসংখ্যা স্থির থাকবে। ১.৭৬ মানে জনসংখ্যা কমতে থাকবে। তো, আমেরিকা-ইউরোপে জনসংখ্যার হার কমছে। এর ফলে কী হবে জানেন? (যেহেতু এখন চিকিৎসাব্যবস্থা ভালো) বুড়ো মানুষের সংখ্যা হবে অনেক। কিন্তু কাজ করার মতো জোয়ান মানুষ হবে কম (এজন্যই ইউরোপ যুদ্ধকবলিত দেশের অভিবাসীদের আশ্রয় দিয়েছে ফ্যাক্টরিগুলো চলমান রাখবে বলে)। শিশু হবে আরও কম।
■ এক প্রতিবেদনে ১৯৫টি দেশ নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে, ১৫১টি দেশে জন্মহার ২.১-এর নিচে থাকবে। যদি সমস্ত নারী ১৬ বছরের শিক্ষাজীবন পার করে, এবং ৯৫% নারী জন্মনিরোধ ব্যবহার করে, তাহলে জন্মহার ১.৭-এর চেয়ে কমে যাবে। (হয়ে যাবে ১.৪)

মানে পুরো দুনিয়ার মানুষ কমতে থাকলে তো সমস্যা না, দেশের জন্য ভালো। কিন্তু একটা দেশে যখন বুড়ো মানুষ বেশি, কাজ করার মতো যুবক মানুষ কম, তখন জিডিপি কমতে থাকবে। কর্মক্ষম-বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে জিডিপি বৃদ্ধির হার হ্রাস করবে। গবেষকরা বলছেন, এর আর্থিক পরিণতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এভাবে পশ্চিমা দুনিয়ায় মানুষ কমে যাওয়ার মূল কারণ কী?

১. প্রযুক্তির উন্নয়ন। যেহেতু এখন মেশিন দিয়ে কাজ চলে, তাই এখন তেমন কর্মী দরকার হয় না। যেমন, কোনো কৃষকের দশটা ছেলে, তাহলে তার কৃষি কাজ করতে সুবিধা হতো, কিন্তু এখন সেটা দরকার হয় না।
২. মাইগ্রেশানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিছু মানুষ গ্রাম থেকে শহরে চলে আসছে, কিছু মানুষ বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। এটাও একটা কারণ।
৩. জন্ম বিরতিকরণ। পরিবার পরিকল্পনা মেথড সবখানে চলে গেছে, যার কারণে পুরো দুনিয়ার জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে।
৪. নারীদের উচ্চশিক্ষা। একজন নারী যখন উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে জীবনের ২৮ বছর ব্যয় করে ফেলছে। এর ফলে অধিক সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একটা বা দুটো সন্তান জন্ম দিয়েই তাকে থেমে যেতে হচ্ছে। অতএব এতেও মানুষের জনসংখ্যা কমছে, এবং সামনে বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
৫. দেরি করে বিয়ে করা। নারী ক্যারিয়ার করতে গিয়ে দেরি করে বিয়ে করছে। যার ফলে জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে।

এখন পশ্চিমাবিশ্বে নারীরা যেভাবে ক্যারিয়ার করছে এবং উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, এবং তাদের অনুকরণ করে বাংলাদেশের মেয়েরা বা মুসলিমবিশ্বের মেয়েরাও যখন ক্যারিয়ার বা উচ্চশিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, পরিবার দিচ্ছে। সন্তানপালন, সন্তানের সাথে থাকা এগুলোকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে। ঠিক এভাবেই যদি চলতে থাকে, তাহলে একটা সময় কলকারখানাগুলো শ্যূণ্য হয়ে যাবে। একটা দেশের প্রোডাক্টিভিটি শূন্য হয়ে যাবে। সেখানে কাজ করার মতো লোক থাকবে না। কর্মক্ষম-যুবক বয়সের মানুষ থাকবে না; বুড়ো মানুষ অধিক হয়ে যাবে। পুরো বিশ্বের কী অবস্থা হবে!

দেখুন, পশ্চিমাবিশ্বে কীভাবে খুব দ্রুত জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে, তাদের ওয়ার্কিং পপুলেশন কমে যাচ্ছে। কারণ হচ্ছে সেখানকার নারীরা অনেক দেরিতে পরিবার গঠন করে, লেবার ফোর্সে কাজ করে, জবমার্কেটে এসেছে গণহারে। পাশাপাশি তারা জীবনের মূল অংশটা, অর্থাৎ যে সময় তাদের জন্মধারণ করাটা সহজ, ওই সময়টাই তারা উচ্চশিক্ষার পেছনে দিয়ে দেয়।

* যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া প্রদেশের কংগ্রেসম্যান Steve King টুইট করেছেন যে, “আমরা অন্য কারও বাচ্চা দিয়ে নিজেদের সভ্যতা পুনরুদ্ধার করতে পারি না।”
* সুইডেনে নারীপ্রতি জন্মহার ১.৮৫ এবং ডেনমার্কে ১.৭৯। কর্মজীবী পিতামাতাকে জন্মদানে আগ্রহী করার জন্য সন্তানগ্রহণ ও পালনে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যা যা সাপোর্ট দেওয়া দরকার, তার পলিসি নেওয়া হয়েছে। ডেনমার্ক তার নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে, "Do it for Denmark", কী করবে? ছুটিতে আরও বেশি সেক্স করাটা দেশের জন্য দরকার। দেশের জন্য বেশি বেশি সেক্স করো আর বাচ্চা নাও।
* পোল্যান্ডের সরকার তার নাগরিকদের “খরগোশের মতো বংশবৃদ্ধির” আহ্বান জানিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করেছে।
* হাঙ্গেরির পরিবার ও যুব প্রতিমন্ত্রী Katalin Novak বলেছেন, “ইউরোপীয় নেতারা এটা নিয়ে খোলাখুলি এবং গুরুত্বের সাথে কথা বলেন না। এবং আমি মনে করি এটি একটি সমস্যা।” নারীপ্রতি জন্মহার ১.৫-এ নেমে যাওয়ায় হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী Viktor Orban প্রস্তাব করেছেন: আরও বেশি হাঙ্গেরীয় শিশু জন্ম দিন। প্রণোদনার একটি প্যাকেজ অফার করেছেন:
■ গর্ভধারণে সমস্যা থাকলে দম্পতিদের জন্য পাঁচটি বিনামূল্যে আইভিএফ [১৩০]-এর ব্যবস্থা করা;
■ পিতামাতার তিন বছরের মাতৃত্ব-পিতৃত্বকালীন ছুটি;
■ শিশুপ্রতি হাউজিং ভর্তুকি দেওয়া (১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত) এবং
■ ভর্তুকিযুক্ত চাইল্ডকেয়ারের ব্যবস্থা ইত্যাদি।
২০০০ সালের মধ্যে জন্মহার ২.১-এ ওঠানো পর্যন্ত এই অফার চলমান থাকবে। অলরেডি Katalin Novak (হাঙ্গেরির পরিবার ও যুব প্রতিমন্ত্রী) জানিয়েছেন: তাদের এই নীতির ফলে ২০১১ সালে যেখানে জন্মহার ছিল ১.৩, সেখান থেকে বেড়ে আজ ১.৫ হয়েছে।
* রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ঘোষণা দিয়েছে, যেসব রুশ নারী ১০টার বেশি সন্তান জন্ম দেবে, তাদেরকে ‘মাদার হিরোইন’ (জননী দেশনায়িকা) উপাধিতে ভূষিত করা হবে।

মানে, পুরো ইউরোপ এখন বেশি বেশি বাচ্চা নিতে উৎসাহ দিচ্ছে। পশ্চিমাবিশ্বই বিপদ বুঝে তাদের অবস্থান থেকে ফেরত আসছে। আর আমাদের দেশের মেয়েরা সেই আগের মডেলেই পড়ে আছে। পশ্চিমাবিশ্ব থেকে ঠেকেছে; ঠেকে শিখে তারা এখন ফিরে এসেছে। কিন্তু আমাদের দেশের নারীবাদীরা এখনো সেই উপনিবেশী প্রভুদের দাসীবান্দিগিরি করে খাচ্ছে।

আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পুঁজিবাদ মেয়েদেরকে গণহারে ক্যারিয়ারের দিকে আনা, বা মেয়েদের ‘আগের ক্যারিয়ার’ থেকে সরিয়ে এনে গণহারে পুরুষের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় লাগিয়ে দেওয়া—এর ফলে সারা বিশ্বের অবস্থাই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। মানববিরোধী একটা কাজ। দুনিয়াতে মানুষের জন্মই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানবপ্রজাতিই বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এর মানে, পশ্চিমা সভ্যতা ব্যর্থ। এর দ্বারা সুখ তো নেই-ই, বরং এর দ্বারা নারীর নিজের সুখ, নিজের শরীর, মন, সন্তান সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পুরো মানবসভ্যতাই টেনশনের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এটার কারণে। আমরা যদি নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করি, তাহলে বুঝতে পারব, নারী ও পুরুষকে একই মনে করা; নারী ও পুরুষকে সমান মনে করা; কাজের ভূমিকা ও তাদের ক্যারিয়ারকে একই মনে করা-এটা একটা বিরাট সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।

একই ক্যারিয়ারে দুজনকে আনার ফলে কী হচ্ছে। বাজারে নতুন ভোক্তা তৈরি হচ্ছে, তার ফলে বিক্রি বাড়ছে, মুনাফা বাড়ছে। নারী শ্রমবাজারে আসার কারণে, শ্রমবাজারে একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। যার ফলে কম বেতনে সবাই চাকরি করতে তৈরি আছে।

তারপরে ছেলেদের জন্য একটা অহেতুক শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পরিবারগঠনকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘসূত্রী কারিকুলাম, চাকরির কৃত্রিম প্রতিযোগিতা-এগুলোর মাধ্যমে পরিবারগঠন পিছিয়ে যাওয়ার কারণে, পরিবার যে চাহিদাগুলো পূরণ করত, সে চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য বিভিন্ন সার্ভিসের প্রয়োজন হচ্ছে। খাবারের জন্য ফাস্টফুডের ব্যবসা শুরু হচ্ছে, অবসর সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হচ্ছে।

এগুলো সব হচ্ছে, পরিবার না থাকার কারণে। মানে, পরিবার থেকে মানুষ যে জিনিসগুলো পেত, সে জিনিসগুলো না থাকার কারণে, এগুলো নিয়ে তারা ব্যবসা করতে পারছে। এই পুরো বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে আছে, পরিবারগঠনকে পিছিয়ে দেওয়া, নারীদেরকে শ্রমবাজারে নিয়ে আসার ওপরে।

বিয়ে পিছিয়ে দেওয়ার ফলে—

ফলে মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা:
* একটা বয়স পর্যন্ত জব মার্কেটে ধরে রাখা যায়।
* পুরুষের প্রতিযোগী বানিয়ে জবমার্কেটে যোগান বাড়ানো যায়। যোগান বাড়লে চাহিদা কমে, ফলে স্যালারি কমে। কম মজুরিতেই বেশি ম্যানপাওয়ার এভেইভেবল থাকে জবমার্কেটে।
* কম পারিশ্রমিক দেয়া লাগে, মুনাফা বেশি থাকে। যেকোনো কর্পোরেট মালিকের মুনাফা বাড়ে।

ফলে ছেলেদের দিয়ে ব্যবসা:
* বছরে ৯৭০০ কোটি ডলারের পর্ণব্যবসা।
* পতিতালয় ও এসকর্ট ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়। যৌনকাজে ব্যবহৃত মানব পাচার থেকে ১৯০০ কোটি ডলার। পতিতাব্যবসা বছরে ১৮৪০০ কোটি ডলারের।
* যৌনরোগকেন্দ্রিক একটা ব্যবসাও আছে। কেবল Erectile Dysfunction Market-ই ২০২৪ সালের মধ্যে ৪২৫ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। যৌনবাহিত রোগের ঔষধের মার্কেট ২০১৭ সালে সারা দুনিয়াতে প্রায় ৩০০০ কোটি ডলার, ২০২৫ সালের মধ্যে হবে ৮৬০০ কোটি ডলার।

এর ফলে মুনাফা / পুঁজি বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু পরিবারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, হতাশা বাড়ছে। বছরে ১৩৪৪০০ কোটি ডলারের এলকোহল ব্যবসা হচ্ছে। অফিসে অশান্তি বাড়ছে, অপরাধ বাড়ছে, ৪০৫০০ কোটি ডলারের ড্রাগ ব্যবসা হচ্ছে। বেঁচে থাকার সুখ থেকে ডিফোকাস করে ভার্চুয়াল সুখ দিচ্ছে। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে। ক্যাবল টিভি ও স্যাটেলাইট ব্যবসা বছরে ২৮৬০০ কোটি ডলার। নারীকে বুঝানো হচ্ছে নারী তুমি নিরাপদ নও। ৪৪৫০০ কোটি ডলারের ট্যুরিজম ব্যবসা। বছরে ৭০০০০ কোটি ডলারের স্বাস্থ্য ব্যবসা। যত ব্যবসা হবে, গরিব আরও গরিব হবে। ধনী আরও ধনী হবে।

আমাদেরকে ছোটবেলা থেকে যে বিষয়গুলো দেখানো হচ্ছে:
* নারীশিক্ষা মানে শিক্ষিত হয়ে চাকরিতে আসা।
* নারী অধিকার মানে, ঘরের বাইরে চাকরি করার অধিকার।
* নারীর ক্ষমতায়ন মানে, চাকরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া।
* নারীস্বাধীনতা মানে, পরিবারের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে চাকরি করার স্বাধীনতা।
* নারী, তোমার স্বামী তোমার ওপর জুলুম করে, ডিভোর্স দিয়ে চাকরি করো, সমাধান।
* তোমার ওপর ম্যারিটাল রেপ হয়, চাকরি করো।
* পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তোমার ভালো চায় না, চাকরি করো।

এটা এখনকার আওয়াজ না। এটা সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন পুরুষেরা ফ্যাক্টরি ছেড়ে ছেড়ে যুদ্ধে চলে গেল। আর ওই ফ্যাক্টরিগুলো খালি হয়ে গেল। সেই খালি জায়গাগুলোতে কে কাজ করবে? তাই সেখানে নারীদের আনা হয়েছে। বলা হয়েছে: চাকরি করো, চাকরি করো। পোস্টারের মাধ্যমে, বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, বিভিন্ন অফারের মাধ্যমে চাকরির দিকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এগুলো পেছনে আলোচনা হয়েছে। মোটকথা হলো, নারী তুমি চাকরি করো। চাকরি করলে, ভোক্তা তৈরি হবে, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, নতুন নতুন ব্যবসা সৃষ্টি হবে। এবং পরিবারগঠন পিছিয়ে যাবে, নতুন নতুন ব্যবসা ও সার্ভিস তৈরি করতে হবে; যা আমি ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি।

হিসেবে ফাঁদ
অথচ, নারী কিন্তু ক্যারিয়ার অলরেডি করছে। গবেষণায় এসেছে, non-SNA [System of National Account] কাজে (ঘরের কাজে) নারীদের কাজের চাপ ও সময় পুরুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি। "Women's Unaccounted Work and Contribution to the Economy" নামের স্টাডিতে পাওয়া গেছে, যদি নারীর এই ঘরের কাজকে টাকায় পরিণত করা হয়, তাহলে তা দাঁড়াবে জিডিপির ৭৬.৮% থেকে ৮৭.২%। বেতনভুক্ত আয়ের চেয়ে তা ২.৫ থেকে ২.৯ গুণ বেশি। [১৩১]

অর্থাৎ, সারাবছরে বাংলাদেশ টোটাল যে উৎপাদন করে, (উৎপাদন বলতে শুধু চাল-গম এগুলো নয়। বরং উৎপাদন বলতে অনেককিছুই বোঝায়। যেমন, আমার বাসায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান এসে ১,০০০/- টাকার বিনিময়ে কিছু সার্ভিসিং করে দিয়ে গেল। ধরুন, আমার এসি পরিষ্কার করে দিয়ে গেল। এই এক হাজার টাকাটাও জিডিপিতে যোগ হবে। কিন্তু আমি নিজে যদি আমার এসি পরিষ্কার করি, তাহলে কিন্তু জিডিপিতে কোনো টাকা যোগ হচ্ছে না। এর মানে একজন নারী, অর্থাৎ, আমার স্ত্রী যখন ঘরে রান্না করে, তখন সেটা জিডিপিতে যোগ হবে না। কিন্তু আমার স্ত্রী যদি কোনো বাসায় গিয়ে রান্না করে দিয়ে আসে, এবং তার বদলে সে যদি কিছু টাকা বেতন পায়, ওই টাকাটা কিন্তু এই জিডিপিতে যোগ হচ্ছে। এই হচ্ছে জিডিপির ফাঁকি।

তার মানে, নারীর ঘরের কাজকে তারা জিডিপির মধ্যে ধরে না। এবং জিডিপির মধ্যে আসে না বলে, তারা নারীকে বেকার বলে। আমার মা-স্ত্রী-বোনদের ক্যারিয়ারকে বলে—বেকার। অথচ, এই কাজটাকে যদি টাকায় পরিণত করা হয়, তাহলে সেটা বাংলাদেশের টোটাল যে আয়, সেই আয়ের ৮০-৯০% হবে।

অনেক বোন বলেন, 'আমরা কী ক্যারিয়ার করব?' আমি তাদের বলব, বোন, আপনারা তো অলরেডি ক্যারিয়ার করছেনই। আপনি যদি একজন স্ত্রী হয়ে, একজন মা বা মেয়ে হিসেবে আপনি যদি ঘরে কাজ করেন, ঘরটা ম্যানেজ করেন, বা পরবর্তী প্রজন্মের ম্যানেজ করেন, তাহলে তো আপনি ক্যারিয়ার করছেনই। আপনার ক্যারিয়ার একটা আছেই। একে যারা গোনায় ধরছে না, সেটা তাদের সিস্টেমের সমস্যা। বেতনভুক্ত আয়, অর্থাৎ আমি নিজে যে আয় করি, তার চেয়ে আমার স্ত্রীর শ্রম-কাজ-ক্যারিয়ার তিনগুণ বেশি। আমার স্ত্রী ঘরে যে কাজ করে, সেটা লোক রেখে করাতে হলে যে খরচ হতো তা আমার বেতনের তিন গুণ।

সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো, আমরা পুরুষেরাও নির্বোধের মত মেয়েদেরকে টাকা দিয়েই মাপি। পশ্চিমাবিশ্ব যেভাবে টাকা দিয়ে মাপে, আমরাও সেভাবে আমাদের ঘরের মেয়েদের টাকা দিয়ে মাপি। আমাদের প্রবলেম হয়ে গেছে এখানে, আমরাও টাকার জন্য খোঁটা দিই। বলি, ইনকাম করতে কত কষ্ট তা তো বোঝো না, সারাদিন ঘরে বসে থাকো, কাজ তো করো না। মানে, আমাদের পুরুষদের প্রবলেম। নারীরা ক্যারিয়ার করছে না যে, তা কিন্তু নয়। আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি না। পুঁজিবাদী পশ্চিমাবিশ্ব স্বীকৃতি দিচ্ছে না।

আসলে দোষটা কাকে দেবো? দোষ হচ্ছে সিস্টেমের। আজকে কেন ইসলামধর্মের শিক্ষা গুরুত্ব সহকারে আমাকে শেখানো হয়নি। আজকে যদি আমাকে ইসলামের হুকুম-আহকাম, স্ত্রীর কী কী হক, স্ত্রীর অন্যান্য বিষয়, তারা যে ঘরে কাজ করছে-সেটার মূল্যায়ন ইসলাম কীভাবে করছে। এই পুরো বিষয়টা যদি আমাকে স্কুলকলেজে শিখিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে আমি তো আজকে স্ত্রীকে এভাবে খোঁটা দিতাম না। আমি বুঝতাম যে, ইসলামের চোখে ঘরের কাজ বাইরের কাজ সমান সম্মানের ও মর্যাদার। ইসলামের চোখে আমি বাইরে যে উপার্জন করছি, আর আমার স্ত্রী ঘরে যে পরিমাণ টাকা বাঁচাচ্ছে-একই পরিমাণ মর্যাদার। মর্যাদায় কোনো পার্থক্য নেই। আমার স্ত্রী ঘরে কাজ করে এটা যে পরিমাণ জরুরি, আমি বাইরে কাজ করাও একইরকম জরুরি। কোনোভাবে আমি টাকা আয় করছি বলে, আমার কাজ বেশি জরুরি-এই টাকার মাপ ইসলাম মাপে না। এটা আমি কেন শিখিনি? কারণ আমাকে স্কুলকলেজে এগুলো শেখানো হয়নি।

মূল সমস্যা সিস্টেমের। এই সিস্টেমগুলো বদলে গেলে, সেক্যুলার সিস্টেমের বদলে ইসলামের সিস্টেম এলে আমাদের বোনেরা এ কথা বুঝতে পারবে যে, তারা অলরেডি ক্যারিয়ার করছে। তারা ফুলটাইম জব করছে। যে কাজ করার সামর্থ্য পুরুষের নেই, পুরুষের হরমোনই সে কাজ করতে দেয় না পুরুষকে। [১৩২] সমাজ-দেশ-জাতিকে আমাদের নারীরা সার্ভিস দিচ্ছে সুস্থ-সবল, নীরব, রুচিবান প্রজন্ম উপহার দেওয়ার মাধ্যমে। দেশের জিডিপিতে মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা যোগ করার জন্য ১২ লক্ষ বেকার পুরুষ এখনো রয়েছে। সুন্দর ভবিষ্যৎ-প্রজন্ম উপহার দেওয়ার ক্ষমতা পুরুষের নেই। নারীর নারীত্বের সবচেয়ে বড় দেশসেবা এটাই যে, সে আদর্শ ভবিষ্যৎ রেখে যাবে দেশের জন্য, উম্মাহর জন্য।

সুতরাং আমাদের বোনদের বুঝতে হবে, তাদের ক্যারিয়ার হচ্ছে মূলত ঘরে। মানে, ঘরে তারা যে কাজগুলো করে, সেটাই তাদের আসল ক্যারিয়ার। সন্তান তাদের মূল ফোকাস। এটাই তাদের শরীরের সাথে যায়, তাদের মনের সাথে যায়। পুরুষ ও নারীর ক্যারিয়ার একই হতে হবে, টাকার মাপেই ক্যারিয়ারকে মাপতে হবে-ব্যাপারটা আসলে পশ্চিমাবিশ্ব আমাদের শিখিয়েছে, তাদের নিজেদের প্রয়োজনে। কিন্তু এটা পশ্চিমা নারীদের শেষ করে ফেলেছে। এতে নারীর শরীর, নারীর মন, পরবর্তী প্রজন্ম সব শেষ করে দিচ্ছে পশ্চিমে। আমরা অনুকরণ করলে আমাদেরও একই অবস্থা হবে।

ইসলাম কী বলে?
"আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে, এবং জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো। হে নবি-পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।" [১৩৩]

ইবনু হাজার আসকালানি (৭৭৩-৮৫২ হিজরি) রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন, এটিই প্রকৃত ও মৌলিক আদেশ। 'মুসলিম' মেয়েদের জন্য, যারা আল্লাহর সামনে নিজেদের সঁপে দিয়েছে। আল্লাহর ও রাসুলের তরিকার সামনে নিজের জ্ঞান, নিজের বুদ্ধি, নিজের মনমানসিকতা সবকিছু সমর্পণ করে দিয়েছেন, তাদের জন্য এই আদেশ। সুতরাং আমাদের এটা বুঝতে হবে, আল্লাহর প্রকৃত ও মৌলিক আদেশই হচ্ছে, আমরা নিজ গৃহে অবস্থান করব এবং বিনা-প্রয়োজনে নিজেদের সৌন্দর্য বাইরে প্রকাশ করব না।

আল্লামা শাওকানি (১১৭৩-১২২৯ হিজরি) রহ. বলেন, এর অর্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা মেয়েদেরকে ঘরের মধ্যে বসবাস ও অবস্থান করতে আদেশ করেছেন। তবে হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আম্মাজান সাওদা রা.-কে বলেন,
"প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য আল্লাহ তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন।" [১৩৪]

সুতরাং নারীর প্রয়োজনে সে ঘর থেকে বের হতে পারবে, যেমন শিক্ষার জন্য হতে পারে, চিকিৎসার প্রয়োজনে। যেমনটা আমরা তাদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যাই; ঘোরাঘুরি করতে বের হই। পশ্চিমাবিশ্ব ও তাদের এ দেশীয় ঠিকাদাররা বলতে চায়, মুসলিমরা নারীদের ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখে। আমরা কি আসলেই আমাদের স্ত্রী-মাকে 'বন্দি' করে রাখি! কোথাও বন্দি করে রাখা হয় না। বরং তারা যখনই বলছে, তাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদের সাথে আমরা নিজেরাও যাচ্ছি তাদের সেফটির জন্য। তাদের যখন যেটা প্রয়োজন হচ্ছে, বললে আমরা এনে দিচ্ছি। তাদের শপিংয়ের প্রয়োজন হলে, তাদের সাথে নিয়ে শপিংয়ে যাচ্ছি। বাইরে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদন স্পটে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা ঘরে অবস্থান করতে বলেছেন, এটা নারীর জন্য মৌলিক হুকুম। কিন্তু প্রয়োজনে (যা ওপরে দেখলাম) ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। তারা প্রয়োজনে বের হয়ে, নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করবেন, ব্যস হয়ে গেল। এখানে বন্দি করার মতো কোনো বিষয় নেই।

আসুন, আমাদের এতক্ষণের আলোচনা একটু পয়েন্ট আকারে দেখে নিই:
■ মর্যাদার সাথে কামাইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ওটা পুঁজিবাদের স্ট্যান্ডার্ড। Male value system-অর্থাৎ, পুরুষের সাথে নারীকে মাপা হচ্ছে। আমরা সেটা করব না। বরং নারী নারীর মতো, পুরুষ পুরুষের মতো।
■ ইসলাম বলছে, রোজগার পুরুষের দায়িত্ব এবং পুরুষের জন্য ফরজ। নিষ্কর্মা ঘরে বসে থাকা পুরুষের জন্য নাজায়েজ।
■ নারীর জন্য জেনারেল রুল হলো, নারী ঘরে থাকবে, প্রয়োজন না হলে বাইরে যাবে না, এবং তারা ঘরের দায়িত্বগুলো পালন করবে।
■ নারী-পুরুষের দায়িত্ব ভিন্ন ভিন্ন ও সমান গুরুত্বপূর্ণ, পরিপূরক। একটা ছাড়া আরেকটা অসম্পূর্ণ। এবং এই আলাদা আলাদা দায়িত্বপালন যার যার ওপর ওয়াজিব। [১৩৫]

এ ক্ষেত্রে আবু বকর ইবন আবি শাইবা (১৫৯-২৩৫ হিজরি), আবু ইসহাক আল-যাওজানি ও ইবনু তাইমিয়া (৬৬১-৭২৮ হিজরি) রহ.-এর মতটি ভারসাম্যপূর্ণ: যৌক্তিকভাবে শরিয়ার সীমায় যে কাজগুলো একজন মেয়ে ঘরে করে থাকে, সেগুলো করা তার দায়িত্ব। প্রথাগতভাবে স্বামীদের জন্য যেসব কাজ ওই এলাকায় স্ত্রীরা করে থাকেন, সেগুলো করা স্ত্রীর কর্তব্য। পরিবেশ, স্থান ও যুগভেদে এটা বদলাতে পারে। যেমন, গ্রামের মেয়ে এবং শহরের স্ত্রীর ঘরের কাজ একরকম হবে না। কারণ দেখা যায়, গ্রামের মেয়ে ঘরের অনেক কাজ করে, পুরুষেরা ধান কেটে নিয়ে আসে, সেই ধান সেদ্ধ করা, সেই ধান থেকে চাউল বের করা ইত্যাদি প্রোসেসিংগুলো করে থাকে। এই কাজটা গ্রামের মেয়েদের জন্য দায়িত্ব। কিন্তু শহরের মেয়েদের ক্ষেত্রে একটু ভিন্নতা আছে, শহরের মেয়েরা কিন্তু এত কাজ করে না। দেখা যায়, ঘরে একজন কাজের লোক রেখে দেওয়া হয়, ঘর মোছা-টোছা এগুলো তারা করে দিয়ে যায়।

দলিল হিসেবে বলা যেতে পারে, ফাতিমা রা.-এর ব্যাপারে হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি রুটি তৈরি করতেন, জাঁতা পিষে আটা বানাতেন। ইমাম কুরতুবি (ইনতিকাল: ৬৭১ হিজরি) রহ. বলেন,
"স্ত্রী স্বামীর ঘরে কাজ করা ও ঘরের দেখভাল করার বিষয়টি উরফ (প্রচলিত প্রথা)-এর সাথে জড়িত। উরফ-ও শরিয়তের একটি উৎস।"

আসমা বিনতে ইয়াজিদ রা. নবিজির দরবারে গিয়ে আরজ করেন, নারীদের পক্ষ থেকে আমি আপনার কাছে আগমন করেছি, (আল্লাহর রাসুল) আল্লাহ তাআলা আপনাকে নারী ও পুরুষ সবার কাছেই রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আমরা আপনার ওপর ও আপনার প্রতিপালকের ওপর ঈমান এনেছি। আমরা নারীরা তো ঘরের কাজ আঞ্জাম দিই, সন্তান গর্ভে ধারণ করি, তাদের লালনপালন করি। আমাদের ওপর (বিভিন্ন ইবাদতের ক্ষেত্রে) পুরুষদের ফজিলত রয়েছে। তারা জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে। রোগী দেখতে যায়। জানাজায় শরিক হয়। একের পর এক হজ করে। সবচেয়ে বড় ফজিলতের ব্যাপার হলো, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে পারে। তো, আমরা কীভাবে তাদের মতো ফজিলত ও সওয়াব লাভ করতে পারব? নবিজি তখন সাহাবায়ে কেরামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো দ্বীনি বিষয়ে তোমরা কি কোনো নারীকে এর চেয়ে সুন্দর প্রশ্ন করতে শুনেছ কখনো? এরপর নবিজি সেই নারীকে লক্ষ করে বললেন,
তুমি আমার কথা ভালোভাবে অনুধাবন করো এবং অন্য মহিলাদেরও এ কথা জানিয়ে দাও যে, স্বামীর সাথে সদাচরণ করা, তার সন্তুষ্টি কামনা ও পছন্দনীয় কাজ করা, এ সকল আমলের সমতুল্য সওয়াব ও মর্যাদা রাখে। [১৩৬]

এর মানে, জামাতে নামাজ আদায়, রোগী দেখা, জানাজায় শরিক হওয়া, হজ করা, জিহাদ করা এ সবগুলো এক পাল্লায় আর নারীর স্বামীর সাথে সদাচরণ করা, তার সন্তুষ্টি কামনা করা, তার পছন্দনীয় কাজ করা আরেক পাল্লায়। সমতুল্য, সমান মর্যাদা, আল্লাহর কাছে সমান সওয়াব। তার মানে নারীর ঘরের এসব কাজ পুরুষের কাজের ও দায়িত্বের সমান মর্যাদার; ইসলাম এগুলোকে ছোট করেনি, এগুলোকে ছোট করেছে পুঁজিবাদ। ইউরোপ ছোট করেছে। তাদের নিজের স্বার্থে। নারীকে বুঝিয়েছে, তোমার কাজগুলো ছোট, পুরুষের কাজগুলো বড়, অতএব তোমাকে পুরুষের কাজ করতে হবে, পুরুষের ক্যারিয়ারে আসতে হবে। অথচ ওপরে ওঠা, বা, প্রভাবপ্রতিপত্তি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আত্মতুষ্টি, আত্মমর্যাদা এ বিষয়গুলো বিশেষভাবে টেস্টোস্টেরন হরমোনের কারণে পুরুষের মধ্যে জন্ম নেয়। যেহেতু নারীর মধ্যে টেস্টোস্টেরন হরমোন কম ও সীমিত [১৩৭], তাই উপরিউক্ত বিষয়গুলো, অর্থাৎ উঁচু হওয়া, বড় হওয়া, সবাইকে কন্ট্রোল করা, সবার ওপর খবরদারি করা-এগুলো নারীর মধ্যে কম। শরীরের বিপরীতে গিয়ে নারীকে এসব করতে বাধ্য করা হচ্ছে, স্বাধীনতা-সমতার নেশায় বুঁদ হয়ে তারা নিজ শরীর-মনের ওপর জুলুম করছে।

আরেকটি হাদিস আমরা দেখি: "যে মহিলা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, রমজানের রোজা রাখবে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে এবং স্বামীর আনুগত্য করবে, তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো।" [১৩৮]

সুতরাং এই উল্লেখিত কাজগুলো তার পরিতৃপ্তির জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা তাকে পুরুষের সমান মূল্যায়ন করবেন। মূল বিষয় হলো, পশ্চিমাবিশ্ব নারীকে যেভাবে দেখে, এই দেখাটা নারীর জন্য কল্যাণকর না। বোনদের ঘরই মূলত তাদের ক্যারিয়ার। শুনতে খারাপ শোনাচ্ছে হয়তো, কিন্তু এটাই হচ্ছে ইসলামের অবস্থান। আমরা এটা আপনাকে পৌঁছে দিতে বাধ্য। মানা না-মানা আপনার আর আপনার রবের ব্যাপার।

কারিকুলামে এগুলো কোথায়?
আমি সাংবাদিকতা করব না, তাহলে আমার জার্নালিজম পড়ে কী লাভ? আমি এমন একটা সাবজেক্ট পড়ছি, যেটি আমার সারাজীবন কাজেই লাগবে না। কেউ যদি ফিজিক্স পড়ে ব্যাংকে চাকরি করে, তাহলে কী লাভ তার ফিজিক্স পড়ে? তার ডিগ্রির প্রয়োজনটা কী? অথচ নিচের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা প্রত্যেকের জন্য জরুরি ছিল, কিন্তু আমাদের কারিকুলামে বিষয়গুলো নেই।
* নারীর মানসিক ও শারীরিক গঠন, পছন্দ ও সময়ে সময়ে তাদের দেহ-মনে পরিবর্তন, সেক্স—একটা ছেলের জন্য এগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত কোনো শিক্ষা। একটি ছেলের জন্য জরুরি ছিল, সে নারী সম্পর্কে জানা, তেমনই নারীর পুরুষমানুষ সম্পর্কে জানা।
* গর্ভধারণ ও প্রসবকালীন সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রতিটা মেয়েকেই শেখানো। প্রতিটা মেয়ের জানা দরকার যে, গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সমস্যাগুলো কী কী। এগুলো বিস্তারিত জানা দরকার। কারণ, এগুলো তার জীবনের একটা মেজর ইভেন্ট।
* প্যারেন্টিং সম্পর্কে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান। আমরা প্রত্যেকেই প্যারেন্ট হব, তাহলে প্যারেন্টিং সম্পর্কে যে আধুনিক জ্ঞান, চাইল্ড সাইকোলজি, চাইল্ড এডুকেশন এগুলো জানা থাকা দরকার।
* বয়স্কদের শরীর-মনস্তত্ত্ব-যত্ন। প্রত্যেকের বাসায় বয়স্ক বাবা-মা থাকেন, সেই বয়স্ক বাবা-মায়েদের শরীর, তাদের মনস্তত্ত্ব, তাদের যত্ন; কারিকুলামে এগুলো কোথায়?
* ধর্ম ও নৈতিকতার উচ্চতর জ্ঞান। ধর্ম ও নৈতিকতার কারণে মানুষ বড় বড় সমস্যা থেকে দূরে থাকে, অ্যালকোহল, একাধিক যৌনসঙ্গী ইত্যাদি যত রিস্কি লাইফস্টাইল থেকে দূরে থাকে। ‘অ্যাজ এ কমিউনিটি’ অন্য ধর্মের তুলনায় মুসলিমদের মাঝে...
- অ্যালকোহল পানের হার কম। মাদকাসক্তির হার কম। (Ghandour 2009, Amundsen 2006, Abu-Ras 2010)
- জুয়ার হার কম। (Ghandour, 2013)
- ব্যভিচার কম। (Adamczyk, 2012)
- ধর্ষণ কম।
- চ্যারিটি বেশি। [১৩৯]

কিন্তু কারিকুলামে ধর্ম ও নৈতিকতার জ্ঞান কোথায়? বরং ধর্মকে আরও অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়েছে বর্তমান কারিকুলামে। তার মানে যারা ধর্মহীন কারিকুলাম করেছে তারা চায়, ধর্ম যেসব সমস্যাকে বাধা দিচ্ছে, সেগুলোতে সমাজ সয়লাব হয়ে যাক। অ্যালকোহল-জুয়া-ব্যভিচার-ধর্ষণ বেড়ে যাক।
* নিজের শরীরকে জানা ও প্রাথমিক মেডিকেল জ্ঞান। নিজের শরীরকে আমরা কয়জন জানি? নিজের শরীর ও প্রাথমিক মেডিকেল জ্ঞানগুলো কি আমাদের জানার দরকার নেই?
■ জমি বণ্টন ও ভূমির টুকটাক আইন, দেশের টুকটাক আইন, মামলা করা, জিডি করা। আমাদের বাবা-মা একসময় মারা যাবেন, তাদের সম্পত্তি আমরা কে কতটুকু পাব না-পাব—এগুলো তো আমাদের কারিকুলামে শেখানোর কথা, কিন্তু এগুলো কোথায়?
* নাগরিক হিসেবে আপনার প্রাপ্য অধিকার কী কী। আমি একটা দেশের নাগরিক, আমি একটা সরকারকে বসিয়েছি ক্ষমতায়, এই সরকারের কাছে আমি ঠিক কী কী পাই? আমি পনেরো পার্সেন্ট ভ্যাট দিই; একশ টাকার একটা জিনিস কিনলে, পনেরো টাকা আমি সরকারকে দিই, এই পনেরো টাকা দিয়ে সরকার কী করছে, এই হিসেব কি আমি নিতে পারব না? আমার তো সেই অধিকার আছে, কী কী অধিকার আমি পাব রাষ্ট্রের কাছ থেকে—এগুলো তো আমাদের শেখানো হয়নি।

এর মানে, টোটাল কারিকুলামে নারী-পুরুষকে যা শেখানো হচ্ছে, পুরোটাই বকওয়াস। বাস্তব জীবনে এর কোনো উপযোগিতা নেই, কোনো কার্যকারিতা নেই। একটা অহেতুক সময় নষ্ট করছি জাতিগতভাবে। মেডিকেল ও ইনজিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের ওপর একটি রিসার্চ হয়েছিল। দেখা গেছে, ৫২% ইনজিনিয়ারিং-পড়ুয়া মেয়ে-স্টুডেন্ট তারা কর্মক্ষেত্রে যায় না। [১৪০] ফলে তারা আল্টিমেটলি গৃহিণী হয়ে যাচ্ছে। গৃহিণী হওয়ার জন্য যে শিক্ষার প্রয়োজন, সেই শিক্ষাটা কোথায়! এখানে কি শিক্ষা লাগবে না? এখানে পুষ্টিবিদ্যার জ্ঞান লাগবে, চাইল্ড সাইকোলজি, চাইল্ড এডুকেশন লাগবে, হোম ইকোনমিক্সের বিষয় আছে, এখানে বিভিন্ন সাংসারিক খরচ-ম্যানেজমেন্টের বিষয় আছে, একাউন্টিংয়ের কিছু বিষয় আছে। এই পুরো বিষয়টা কেন একজন মেয়েকে শেখানো হচ্ছে না, যে কিনা আল্টিমেটলি গৃহিণীই থাকবে, চাকরিতে আসবে না। কারিকুলামে পুরো অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষা দিয়ে ভরে রেখেছে। প্রাসঙ্গিক কোনো শিক্ষা, যেটা তার লাগবে সেটা নেই।

উচ্চশিক্ষার নামে অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষা
■ এই পাঁচ বছরের পড়াটা তার না পেশাগত, না পারিবারিক—কোনো কাজেই লাগল না।
■ অহেতুক কিছু স্ট্রেস, পরীক্ষা পাশের টেনশন ইত্যাদি ধকল গেল।
■ সরকারি খরচের নামে, জনগণের টাকা একবার ব্যয় হলো তাকে ডিগ্রি দেওয়াতে, আরেকবার ব্যয় হলো, পেশার ট্রেনিং-এ। যেমন, একজন লোক ফিজিক্স পড়ে ব্যাংকে চাকরি করতে এসেছে, এখন ব্যাংকের জন্য তাকে আরও ছয়মাস ট্রেনিং দেওয়া লাগবে। অথচ, ভার্সিটিতে কিন্তু ব্যাংকিং নামে একটা সাবজেক্ট ছিল, তাহলে ব্যাংকিং যে পঞ্চাশটি ছেলে পড়েছে, সেই পঞ্চাশটি ছেলেকে ব্যাংকে নিলে পরে, অন্যদের মতো অতিরিক্ত ট্রেনিংটা দেওয়া লাগত না। তাহলে দুবার জনগণের টাকা ব্যয় হচ্ছে।
■ পাঁচটা বছর জীবন থেকে লস হলো—কোনো কাজের শিক্ষা না, কেবল ডিগ্রির পেছনে। জাস্ট ডিগ্রিটা লাগল চাকরিতে, শিক্ষাটা না। অথচ সিস্টেমে পরিবর্তন হলে, এই পাঁচটা বছর বাঁচানো যেত। ব্যাংকিং-এ পড়া ছেলেগুলোকে ব্যাংকে ঢুকালেই হতো। পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনে পড়া ছেলেগুলোকে ফিবছর এডমিন ক্যাডারে নিলেই হতো। গবেষক প্লাস স্কুলকলেজে ফিজিক্সের টিচার প্রতিবছর কতজন লাগে, হিসেব করে ততজনকে ফিজিক্স পড়ালেই চলত। [১৪১]

মোটকথা এটা বলতে চাচ্ছি, এই যে আমাদের উচ্চশিক্ষা, এটা পুরোটাই একটা অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেডিকেল-ইনজিনিয়ারিং এগুলো ছাড়া। বাকি যে সাবজেক্টগুলো ভার্সিটিতে পড়ানো হয়, অধিকাংশই তো সেই পেশাটা করে না। সেই সাবজেক্ট রিলেটেড পেশায় তো সে যায় না। তাহলে পাঁচ বছর যে তাকে বসিয়ে রাখা হলো, যেটি একজন নারীর জীবনের মূল অংশ (২০-৩০ বছর); যে সময় গর্ভধারণ তার জন্য নিরাপদ, যে সময় নরমাল ডেলিভারি হওয়ার সম্ভাবনা তার জন্য সবচেয়ে বেশি। যে সময় সন্তান সুস্থ, সবল ও স্বাস্থ্যবান হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই সময়টাতেই একজন নারীকে পাঁচ-পাঁচটা বছর ভার্সিটিতে রেখে দেওয়া হলো এমন শিক্ষার জন্য, যেটি তার কোনো কাজেই এলো না। এই হচ্ছে, বর্তমান শিক্ষার প্রকৃত অবস্থা।

আমি আপনাদের সামনে পুরো পিকচারটা তুলে ধরলাম, আপনারা হতাশ হবেন, এটা জানি। কিন্তু আপনাদের এগুলো জানার দরকার। মানতে না পারলাম, কিন্তু জানা থাকা দরকার। অনেকের হয়তো বিভিন্ন ওজর আছে; কথার কথা, বাবা-মার বিরুদ্ধে তো বিদ্রোহ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদেরকে পড়তে হচ্ছে, আমাদের হয়তো চাকরিও করতে হবে। কিন্তু মূল বিষয়টা জানা থাকা লাগবে, আমাকে-আপনাকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

এখানে দেখানো হয়েছে যে, মূলত পরিবারগঠনকে পিছিয়ে দিয়ে, ছেলেদের সর্বনাশ করা হচ্ছে, মেয়েদেরও সর্বনাশ করা হচ্ছে। ফলে অশান্তি, হতাশা, অপরাধময় একটা জীবন কাটাচ্ছে লাখ লাখ নারী-পুরুষ। এবং এগুলোর ওপর ভিত্তি করে কীভাবে তারা ব্যবসা করছে, এই চার্টে তা-ই বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

মেয়েদের কারিকুলাম যেমন হওয়া দরকার ছিল:
* যেকোনো লেভেলের একটা বাংলা বই পড়ে, তার রস বোঝার যোগ্যতা।
* একটা মানসম্পন্ন আর্টিকেল বাংলায় ও ইংরেজিতে লেখার যোগ্যতা।
* যেকোনো লেভেলের একটা ইংরেজি বই পড়ে, তা বোঝার যোগ্যতা।
* আরবি ভাষা, কুরআন-হাদিস-ফিকহ।
* প্যারেন্টিং বা সন্তান পালন।
* জেরিয়াট্রিক্স বা বার্ধক্যের যত্ন।
* দাম্পত্যজীবনের বিভিন্ন রসায়ন।
* প্রাথমিক মেডিকেল সায়েন্স ও শারীরতত্ত্ব।
* খাদ্য ও পুষ্টি।
* ভোকেশনাল কিছু একটা—সূচিশিল্প বা ফুলের কাজজাতীয় কিছু।
* কম্পিউটার ও ফ্রিল্যান্সিং।
* ইতিহাস-দর্শন-ভূগোলের সব বিষয়ে যেন স্পষ্ট ধারণা থাকে।
* বিজ্ঞানের সব শাখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা।
* অঙ্কের সব শাখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা।

এরকম একটা কারিকুলাম মেয়েদের হওয়ার দরকার ছিল। যে কারিকুলামটা সে তার ব্যক্তিগত লাইফে প্রয়োগ করতে পারবে। তার কাজে লাগবে। অকাজের জিনিস শিখিয়ে, তার ব্রেইন-বুদ্ধি খরচ করে কী লাভ? আমি কিন্তু কোনো বোনকে ক্যারিয়ারের জন্য 'তৈরি হতে' নিরুৎসাহিত করছি না। আপনাদের রেডি থাকতে হবে, যদি কখনো জীবনে এমন পজিশনে পড়ে যান যে, আপনার নিজেকেই উপার্জন করতে হচ্ছে, তখন যেন আপনি কিছু করতে পারেন, এরকম চালু হতে হবে আপনাকে।

পরিবার নিজেই ফুলটাইম জব
আমাদের অনেক চাহিদা পরিবার পূরণ করে। আপনাকে ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই। স্ত্রীর সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটালে, একসাথে থাকলে, স্ট্রেস চলে যায়। মনের দুঃখদুর্দশাগুলো শেয়ার করা যায়। স্ত্রী স্বামীকে সাহস দেয়। যেমন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন প্রথম ওহি পেলেন, তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। আম্মাজান খাদিজা রা.-কে ডেকে বলেছেন: যাম্মিলুনি, যাম্মিলুনি (আমাকে ঢাকো, আমাকে ঢেকে দাও)। আম্মাজান বললেন, ভয় পাবেন না, আপনি ভালো মানুষ, আপনার সাথে খারাপ কিছু হবে না। আপনি গরিব মানুষের উপকার করেন, দানখয়রাত করেন। আপনার সাথে আল্লাহ খারাপ কিছু করবেন না। এই যে দেখুন—স্ত্রীর সান্ত্বনা।

এখন পশ্চিমে যাদের পরিবার নেই, তারা কী করে? এখন তারা কাডলিং (cuddle—বুকে জড়িয়ে রাখা) সার্ভিস নিচ্ছে। মানে, একটা মেয়েকে প্রতি ঘন্টায় দশ ডলারের মতো দেবে, আর ওই মেয়েটাকে সেবাক্রেতা পুরুষটা জড়িয়ে ধরে গল্প করবে। নিজের দুঃখ-দুর্দশা-কষ্ট এগুলো শেয়ার করবে, গল্প করবে; মেয়েটা তাকে সাহস দেবে, হিম্মত দেবে। অতিরিক্ত কিছু করতে পারবে না। অতিরিক্ত কিছু করলে অতিরিক্ত চার্জ।

মানে, স্ত্রী থাকলে যে কাজটা করত, এই কাজটাকে ওরা ব্যবসা বানিয়েছে। মা সন্তান গর্ভে ধারণ করত, এখন ওরা সারোগেসি (surrogate mother) তথা, গর্ভ ভাড়া দেওয়াচ্ছে। অর্থাৎ, পরিবারকে ভেঙে দিতে পারলে, নতুন নতুন চাহিদা পাওয়া যাবে ব্যবসা করার জন্য। কেন নতুন নতুন ব্যবসা খুলতে হবে? পৃথিবীর সব অঞ্চলে ব্যবসার ক্ষেত্রে ভোক্তার সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। এমনকি যেসব ব্যবসা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক, সেগুলোও পৃথিবী নামক দ্বীপের সীমাবদ্ধতার ফাঁদে পড়ে যায়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ও লাভের ধারা বজায় রাখতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন খাতে টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন মার্কেট তৈরি বা ব্যবসাকে বহুমুখীকরণ করে থাকে। [১৪২]

পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য মানুষ ত্যাগ করে, sacrifice করে, যা ভোগকে কমায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আদর্শের দ্বারা তৈরি হবে স্বার্থপর মানুষ। যার ফোকাস হবে শুধু নিজের ভোগ। পরিবারের পিতা সন্তানকে deterred comsumption শেখায়, কম ভোগ করতে শেখায়। যেমন, আমার কলিজার টুকরা আম্মু খাদিজা মাঝেমধ্যে বলে, আব্বা এটা করতে হবে, ওটা কিনে দাও। আমি বলি: না এখন না, পরে। হয়তো সেটা কিনে দিই আল্টিমেটলি, কিন্তু দুয়েকদিন পরে। তাহলে এই যে, 'না পাওয়া'; না পেতে না পেতে অভ্যস্ত হওয়া। এর ফলে হয় কি, মানুষের মন হঠাৎ করে কোনো কষ্ট পায় না। দেখুন না, এখনকার বাচ্চারা এ প্লাস পায় না বলে আত্মহত্যা করে। কারণ, ও সারাজীবন সবই পেয়েছে, এখন এই প্রথম সে একটা জিনিস পায়নি। ব্যস, আত্মহত্যা করেছে। তাহলে এই যে, বাচ্চাকে শেখানো যে-না বাবা, পৃথিবীতে সব জিনিস ভালোই যায় না। এই শেখানোটা বাবা শেখায়।

যে পরিবারে বাবা থাকে না, সে পরিবারের সন্তানরা হয় compulsive consumer. সে ভোগ করতেই থাকে, করতেই থাকে। এরকম মানুষই তো দরকার পুঁজিবাদের। সারা পৃথিবীর সব মানুষ যদি এরকম হয়ে যায়, তাহলে তো পুঁজিবাদের প্রভাব আরও বাড়ল, বিক্রি আর বিক্রি, লাভ আর লাভ। তাই তারা চাচ্ছে, পরিবার যেন না থাকে, সন্তান যেন বাবাকে কাছে না পায়।

সুতরাং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, নারীবাদ প্রভৃতি ব্যবহার করে: পরিবার ভেঙে দাও, দুর্বল করে দাও, পরিবারগঠন পিছিয়ে দাও, লিভ-টুগেদারভিত্তিক ভঙ্গুর পরিবার (Fragile family) তৈরি করো। বাবাকে সন্তান যেন না পায়, নিজের ভোগ স্যাক্রিফাইস করার মতো কেউ যেন না থাকে। পুঁজিবাদীরা আপনার শরীরের তোয়াক্কা করে না, আপনার সন্তানের কী হলো না হলো, এর তোয়াক্কা করে না। তারা শুধু চায়—আপনার সার্ভিস।

এজন্যই এরা সবাই মিলে পরিবারের পেছনে লেগেছে। পরিবার একটা প্রতিষ্ঠান। অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মতো এরও ম্যানেজার প্রয়োজন, এডমিন প্রয়োজন, ফুলটাইম প্রয়োজন। অফিস-আদালতের মতো প্রতিষ্ঠান তো একটা সময়ের পর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। আর এখানেই ফুলটাইম জব নেই? পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য মুখরোচক সব স্লোগান ব্যবহার করে নাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবারের মূল খুঁটি নারীদের। দেখুন কর্মজীবী নারীর শিশুকে সামলাতে ঠিকই কিন্তু আরেক নারীকে (দাদি-নানি-বুয়া) প্রয়োজন পড়ছে। আপনার সন্তান অন্যজনের মনমতো বড় হচ্ছে, তার ভাষাগঠন, তার ব্যক্তিত্বগঠন, তার মন-রুচি-মেধা গঠন হচ্ছে অন্য কারও হাতে। হয়তো সেটা আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। নেপোলিয়নের কথাটা খুব ব্যবহার হয় নারীশিক্ষার পক্ষে: আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো। শিক্ষিত মায়ের শিশু যদি বড় হয় অশিক্ষিত বুয়ার হাতে, তবে এই কথার আর ভিত্তি রইল কোথায়?

পরিবার আধখ্যাঁচড়া, জোড়াতালি, আগপিছ করে নেওয়ার মতো হালকা কাজ না। মায়ের পূর্ণ মেধা-শ্রম-চিন্তন-ফিকির-জ্ঞান দাবি করে একটা পরিবার। পরিবারের স্বার্থেই এবং নারীর স্বার্থেই নারীকে ঘরের দুনিয়া সামলাতে হবে, আর পুরুষকে বাইরের দুনিয়া সামলাতে হবে। এটাই উভয়ের শরীরবান্ধব, মনবান্ধব, সমাজবান্ধব।

পেশাগত প্রস্তুতি জরুরি
এরপরেও বোনদের জন্য কিছু পেশাগত প্রস্তুতি খুব জরুরি। স্পেশাল পরিস্থিতির জন্য। কথার কথা, যদি কারও স্বামী মারা যায়, বা, নিজেকে উপার্জন করতে হয়-এমন কোনো সিচুয়েশন যদি আসে, তখন যেন নিজে উপার্জন করতে পারে। যেমন:
* অনলাইনে ব্যবসা এবং মার্কেটিং-এর বিষয়-আশয়। এমন না যে, টাকার মাধ্যমে আপনি অনেক সম্মান চাচ্ছেন, অনেক খ্যাতি চাচ্ছেন। বরং যদি কারও আসলেই প্রয়োজন হয়, তাহলে সে অনলাইনে পর্দার সাথে ব্যবসা করতে পারবে।
* শিশু প্রতিষ্ঠান (কিন্ডারগার্টেন) বা গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা। বিভিন্ন নুরানি স্কুল, মাদরাসা ইত্যাদিতে শিক্ষকতা করা। সামনে ডে-কেয়ার জিনিসটা মেইনস্ট্রিম হয়ে যাবে। এসব জায়গায় দ্বীনি বোনেরা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মকে দ্বীনের ওপর গড়ে তোলার একটা মওকা হতে পারে। এখানেও একই কথা, এটা প্রয়োজনের কারণে করবে; কিন্তু আত্মমর্যাদার জন্য না, স্বাবলম্বী হওয়া, নারী ক্ষমতায়নের জন্য না। বরং যদি তার আসলেই প্রয়োজন হয় করার জন্য, তাহলে সে করতে পারবে।
* ফ্রিল্যান্সিং। বোনদের জন্য এটাও একটা আয় করার চমৎকার জায়গা।
* বুটিক ও এমব্রয়ডারি।
* ব্যক্তিগত চেম্বার। (নারী ও শিশু রোগী) আমাদের ডাক্তার বোন যারা আছেন, এটা তাদের জন্য।

এগুলো হচ্ছে তাদের আর্ন করার জায়গা। যদি সিচুয়েশন এমন হয় যে, তাকে পেশায় আসতে হচ্ছে। পুরুষমানুষ নেই, বা পুরুষের পেশাটা যথেষ্ট হচ্ছে না-এমন যদি হয়, সে ক্ষেত্রে তারা স্বামীকে হেল্প করতে পারবে। এটা আলেমদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া জরুরি। কোনো আলেমের সাথে পরামর্শ করা, স্বামীর অনুমতি থাকা-এ বিষয়গুলোর শর্ত আছে এখানে। আসলেই এটা আপনার জন্য জরুরি কি না শরিয়তের দিক থেকে, এটা একজন আলেম দেখবেন। এবং সেইসাথে স্বামীর অনুমতি আছে কি না। এই ক্যারিয়ানা টেবলে গিয়ে, পরিবারে বোনদের 'মূল আল্লাহপ্রদত্ত ক্যারিয়ার'-এর কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, সে বিষয়টা লক্ষ রাখতে হবে।

সুতরাং বোনদের ফোকাস হওয়া উচিত, ডিগ্রি নেওয়ার শিক্ষার চেয়ে, পেশামুখী ও Home management-মুখী শিক্ষা নেওয়া।

আসল 'ক্যারিয়ার-ওম্যান'
একজন নারী মানবজাতির জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য, দ্বীনের জন্য ও নিজের জন্য সর্বোচ্চ যা করতে পারে, তার নিজ দক্ষতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে একজন নারী হিসেবে যে বিশেষ বিশেষ কিছু যোগ্যতা দিয়েছেন, ওই জিনিসটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। যা কোনো পুরুষকে দিয়ে হবে না। কোনো পুরুষ কোনোদিনও সেই দায়িত্ব, সেই অবদান, সেই অর্জন করতে পারবে না। সেটা হচ্ছে-যতজন সম্ভব আদর্শ সন্তান দুনিয়াতে রেখে যাওয়া।

আজকে আমরা আম্মাজান খাদিজা রা.-এর কথা বলি। বিখ্যাত যুক্তি: তিনি ব্যবসা করতেন, আমিও ব্যবসা করব। আম্মাজান আয়েশা রা.-কে সামনে আনি: তিনি আলেমা ছিলেন, লেকচারার ছিলেন, প্রফেসর ছিলেন। আমিও লেকচারার হব, প্রফেসর হব।

কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করুন, জান্নাতি নারীদের সর্দার হলেন, ফাতিমা রা. [১৪৩] এটা কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা হওয়ার কারণেই? অর্থাৎ, পবিত্র রক্তসম্পর্কের দরুন? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে? রক্তসম্পর্কের কারণে কেউ জান্নাতে যাবে না, এটা নবিজিই বলেছেন নিজের মেয়েকে: "হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ! আমার ধনসম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না।" [১৪৪]

বরং জান্নাতের সর্দার তিনি এই কারণে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে, সারা পৃথিবীতে যত নারী আসবেন-সবার আইকন হচ্ছেন তিনি। আদর্শ, যার মতো হতে হয়, টার্গেট। কিন্তু ফাতেমা রা. না কোনো প্রফেসর ছিলেন, না সিইও ছিলেন, না ব্যবসা করেছেন আর না চাকরি করেছেন। বরং তিনি যেটা করেছেন তা হলো-তিনি একজন আদর্শ স্ত্রী হয়েছেন; একজন আদর্শ মা হয়েছেন এবং একজন আদর্শ মেয়ে হয়েছেন।

তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'মেয়ে'। বিশ্বের সকল মুসলিমাকে এমন আদর্শ 'মেয়ে' হতে হবে। আমরা একটা ঘটনা জানি: মক্কাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দাওয়াতের কাজ করছেন। অনেক মানুষ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে থুথু দিয়েছে, আবর্জনা দিয়েছে, মুখে মাটি মেরেছে। প্রখর রোদে ঘর্মাক্ত দেহে, ক্লান্ত হয়ে, হতাশ হয়ে, মনে কষ্ট, শরীর অবসন্ন-এরকম অবস্থায় ঘরের সামনে এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন। তখন ছুটে এসেছেন ফাতিমা রা.। বাবার চেহারা থেকে মাটি মুছে দিচ্ছেন, আর কাঁদছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন: "হে আমার মেয়ে! তুমি কষ্ট পেয়ো না। তোমার বাবার এই দ্বীন একদিন প্রত্যেক কাঁচা-পাকা ঘরে পৌঁছে যাবে।” দেখুন, মেয়ে হিসেবে তার যত দায়িত্ব রয়েছে, তিনি তা পালন করেছেন।

ফাতিমা রা.-এর স্বামী ছিলেন হজরত আলি রা.-এর মতো মানুষ। যিনি খলিফা ছিলেন। রাসুলের যুগেই তিনি কাজি ছিলেন; অর্থাৎ, বিচার করতেন। পরবর্তী খলিফাদের যুগেও তিনি বিচার করতেন। ছিলেন সেনাপতি। ছিলেন নবিজির মন্ত্রী। ছিলেন আলেম বা শিক্ষক। আলি রা. 'আলি' হতে পেরেছেন, কারণ, তাঁর ঘরে একজন 'ফাতিমা' ছিলেন। ঘর নিয়ে, হাসান-হুসাইনকে নিয়ে তাকে চিন্তা করতে হয়নি। ফাতিমা রা.-ই সব ম্যানেজ করে ফেলতেন। আলিকে ওয়াকফ করে দিয়েছেন 'আলি' হয়ে ওঠার জন্য।

হাসান-হুসাইনকে জন্ম দেওয়া, তাদের বড় করে তোলা। হাসান-হুসাইন যেন আদর্শ মানুষ হতে পারে, রুচিবান মানুষ হতে পারে, আল্লাহওয়ালা হতে পারে, আলেম হতে পারে-এগুলো সব ফাতিমা রা. দেখতেন। এটা একটা ফুলটাইম কাজ। বুয়ার কাছে রেখে, নানি-দাদির কাছে রেখে আমার সন্তান আমার 'মনের মতো' করে গড়া সম্ভব না। এইজন্য আলি রা.-কে আর টেনশন করতে হয়নি। আলি রা.-কে 'আলি' হয়ে ওঠার জন্য টেনশন-ফ্রি করে ছেড়ে দিয়েছেন। ফাতিমা রা. তার ঘরের দায়িত্বগুলো পালন করেছেন বলেই, আমরা একজন 'আলি'-কে পেয়েছি। আমরা হাসান রাদি.-কে পেয়েছি, যিনি মুসলিমদের আন্তঃউম্মাহ মতভেদে আদর্শ। হুসাইন রাদি.-কে পেয়েছি, যিনি জালেম শাসকের বিপরীতে উম্মতের অনুসরণীয় আদর্শ। রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন। কেন পেয়েছি? কারণ তারা এমন এক কোলে বড় হয়েছেন, ফাতিমা রা. 'মা' হিসেবে তার যে দায়িত্ব ছিল, সে দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি করেননি। তিনি তার দুই সন্তানকে আলেম হিসেবে, ফকিহ হিসেবে, মুজাহিদ হিসেবে তৈরি করেছেন।

বিপরীতটা ভাবুন, ফাতিমা যদি 'আলি'-কে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন। যদি পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেই 'আলি' হয়ে উঠতে চাইতেন। গত ১৪০০ বছরে সকল মুসলিমা যদি এভাবে ভাবতেন। 'আলি'-এর ক্যারিয়ারকে নিজের 'ক্যারিয়ার' মনে করতেন। আলেম-ফকিহ-বিচারক-সেনাপতি হওয়াকে ক্যারিয়ার মনে করতেন। যেমনটা আজ অনেক আধুনিক উস্তাযা প্রচার করছেন। তাহলে কী হতো? আর এই কারণেই ফাতিমা রা. জান্নাতি নারীদের সর্দার। আদর্শ মা-মেয়ে-স্ত্রী তার ক্যারিয়ার, ফুলটাইম ক্যারিয়ার। আধাখ্যাঁচড়া না, বল-পাসিং না। আজ আমরা জান্নাতে যেতে চাই, কিন্তু সর্দারকে অনুসরণ করতে চাই না। কী আজিব আমাদের চাওয়াগুলো!

ফাতিমা রা. ছাড়া আরও তিনজনের ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিয়েছেন, যাদের কেউই সিইও-প্রফেসর নন। তিনি বলেছেন, "চারজন নারী নারীশ্রেষ্ঠা-মারিয়াম আ., আসিয়া রা., আম্মাজান খাদিজা রা., ফাতিমা রা.।" [১৪৫]

মারিয়াম আ. কেন শ্রেষ্ঠা? কী তার ক্যারিয়ার? একজন আদর্শ মা। এই মাতৃত্বের কারণে তাকে কী পরিমাণ স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে, ভাবুন! সমাজের কটুকথা, পিতৃহীন সন্তানকে বড় করে তোলা, আলেম বানানো। ইহুদি বড় বড় আলেমদের সাথে ঈসানবি বাহাস করতেন কিশোর বয়সে। একজন নবির মায়ের যা যা দায়িত্ব, তা পইপই করে আদায় করেছেন বলেই তিনি শ্রেষ্ঠা। অন্য কোনো কারণ তো নেই, নাকি?

হজরত খাদিজা রা. কেন শ্রেষ্ঠা? একজন শ্রেষ্ঠ স্ত্রী, শ্রেষ্ঠ মা। তাকে কর্পোরেট আইকন বানানোর মতো ডাহা মিথ্যা কথা মানুষ কীভাবে বলে? তিনি পুরুষ মানুষের সাথে বোর্ড মিটিং করতেন? ফ্রি-মিক্সিং অফিস করতেন? ইসলামগ্রহণের আগেও তো তিনি এসব করেননি, যেসব অপবাদ তাকে দেওয়া হচ্ছে। এসব তার নামে নির্জলা অপবাদ, তিনি জাহেলিয়াতের যুগেও ছিলেন খাদিজাতুত তাহিরা (পবিত্রা)। তিনি শ্রেষ্ঠা কারণ-
* নবির স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সান্ত্বনা দেওয়া, হিম্মত দেওয়া, গরিবির ওপর সবর, হেরা গুহায় খাবার নিয়ে যাওয়া।
* সমস্ত সম্পদ দাওয়াতের কাজে স্বামীর জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন।
* একহাতে গৃহস্থালি সামলেছেন, যে ব্যস্ততা সামলাতে তার মৃত্যুর পর প্রয়োজন পড়েছে বয়স্কা আম্মা সাওদা রা.-কে।
* ফাতিমা রা.-এর মতো আরেক নারীশ্রেষ্ঠাকে গড়ে তুলেছেন। উসমান যিন-নুরাইনের 'দুই নুর'-কে (রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম, উসমান রা.-এর দুই স্ত্রী) গড়ে তুলেছেন।

হজরত আসিয়া রা. কেন শ্রেষ্ঠা? তিনি দ্বীনের ব্যাপারে কোনো আপস করেননি। তাকওয়া, পরহেজগারি ও ঈমানের ব্যাপারে কোনো আপস করেননি। স্বামী ফিরআউন, রাজকীয় শানশওকত, সাজসজ্জা, দাসী-বাঁদি সবকিছু হাসিমুখে আল্লাহর জন্য বিসর্জন দিয়েছেন।

এগুলোর কারণে নারী শ্রেষ্ঠ হয়। নারীর সম্মান এগুলোর কারণে হয়। বড় সিইও হওয়া-এগুলো নারীর সম্মানের না। বরং এগুলো নারীত্বকে শেষ করে দেয়। নারীর যে দায়িত্ব, তার যে গর্ব-সবকিছু শেষ করে দেয়।

এখন ইনডিভিজুয়াল অনেক প্রশ্ন আসতে পারে যে, আমার এই এই অবস্থা, আমি কী করব! এতক্ষণ আমরা যে আলোচনা করলাম, এটা ইসলামের জেনারেল হুকুম। এটা আমাদের টার্গেট, আমরা এখানে উঠতে চাই। কিন্তু প্রত্যেকের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভিন্ন। কারও পারিবারিক চাপ থাকে। কেউ দেখা যাচ্ছে, বাবা-মার বড় মেয়ে। তিন মেয়ের মধ্যে সে বড়। এখন স্বাভাবিকভাবে তাকে আয়রোজগার করতে হবে। হয়তো পরের দুইবোনের বিয়েশাদি তাকেই দিতে হবে। বা দেখা গেছে, কারও বাবা নেই। তার এখন পরিবারকে দেখতে হচ্ছে। পরিবার তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বা দেখা গেছে কারও পারিবারিক চাপ রয়েছে, ছোটবেলা থেকে ভালো ছাত্রী, বাবা-মায়ের ইচ্ছে, মেয়ে ডাক্তার হবে। খুব কষ্টের বিষয়, মেডিকেল স্টুডেন্টদের মধ্যে একটা রিসার্চ হয়েছে, এরমধ্যে ১৭% মেডিকেল ফিমেল স্টুডেন্ট বলছে, তারা মেডিকেল পড়তে এসেছে বিয়ের জন্য। ভালো বিয়ে হবে, এই কারণে। [১৪৬]

টিকাঃ
[১২৪] Alexandra Sifferlin (August 25, 2015) Women in Male-Dominated Jobs Have More Stress, TIME)
[১২৫] Louise Chunn (Mar 26, 2019) Women Are at Breaking Point Because of Workplace Stress: Wellbeing Survey from Cigna, Forbes.com
[১২৬] Why Women Feel More Stress at Work (Harvard Business Review 2016)
[১২৭] Pregnancy stress causes defects (BBC, 2000)
[১২৮] Stress in pregnancy makes child personality disorder more likely [BBC, 2019]
[১২৯] University of Missouri-Columbia. (2016, June 7). Stress exposure during pregnancy observed in mothers of children with autism: More research needed to understand gene-stress interaction. ScienceDaily.
[১৩০] IVF (In Vitro Fertilization), কাচের টেস্টটিউবের মধ্যে ভ্রূণ নিষেক ঘটানো, তারপর ওই নিষিক্ত ভ্রূণকে মায়ের শরীরে প্রবেশ করানো।
[১৩১] Include unpaid work of women in GDP (The Daily Star, 2019)
[১৩২] টেস্টোস্টেরন হরমোন এই 'বাচ্চা-পালা'র ঝোঁক কমিয়ে দেয়, যা বাবাদের বেশি। (Udry, 2000)
[১৩৩] সুরা আহযাব: ৩৩
[১৩৪] সহিহ বুখারি: ৪৭৯৫
[১৩৫] তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন, সুরা নিসা: ৩৪ নং আয়াতের তাফসির
[১৩৬] শুআবুল ঈমান, বাইহাকি, হাদিস: ৮৩৬৯; মুসনাদে বাযযার, হাদিস: ৫২০৯
[১৩৭] পুরুষে ২৮০-১১০০, নারীতে ১৫-৭০ (ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার)
[১৩৮] মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৬১; মুসনাদে বাযযার, হাদিস: ৭৪৮০; সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস: ৪১৬৩
[১৩৯] Muslims give more to charity than others, UK poll says [NBC News 2013] We found that Muslim Americans gave more to charity, donating an average of $3,200, in 2020, versus $1,905 for other respondents. US Muslims gave more to charity than other Americans in 2020 [Siddiqui, Lilly Family School of Philanthropy 2021]
[১৪০] বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্টের পক্ষে বিডিওএসএনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স ও মেকাট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান লাফিফা জামাল স্বল্পপরিসরে করা একটি জরিপে দেখেছেন, প্রকৌশলবিদ্যায় নারীদের শিক্ষার হার যত বাড়ছে কাজে অংশ নেওয়ার হার সেভাবে বাড়ছে না। তিনি বললেন, ২০১৫ সালে এই ইন্ডাস্ট্রিতে মাত্র ৯ শতাংশ নারী ছিলেন। বিডিওএসএন এবং সরকারের পক্ষ থেকে অনেক ধরনের প্রশিক্ষণ, বৃত্তি এবং আর্থিক সহায়তার পর ২০১৭ সালে এসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ১১-১২ শতাংশ, কিন্তু প্রকৌশলশিক্ষায় নারী ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা দেখেছেন, তাদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ পুরুষ চিকিৎসক ও ৫২ শতাংশ নারী চিকিৎসক। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে অনলাইন মেডিকেল জার্নাল PLOS ONE-এ প্রকাশিত গবেষণায় এমবিবিএস শেষ বর্ষের সরকারি মেডিকেলের ২০৭ জন ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ১০৭ জন ছাত্রীর ওপর জরিপ করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ছাত্রীদের ১৭ শতাংশ বলেছিলেন, বিয়ের বাজারে এই পেশার দাম আছে। এই গবেষণায় ছাত্রীরা বিয়ের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পালটে যাওয়া, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার সমস্যাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন। এই গবেষণাপ্রবন্ধেই উল্লেখ করা হয়েছে, এমবিবিএস পাস করলেও অনেক নারী চিকিৎসক পেশা চর্চার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান, অনেকে পেশা ছেড়ে দেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এই প্রবণতা আছে। [মাকসুদা আজীজ (১৮ অক্টোবর ২০১৯), নারীরা শিক্ষিত হয়েও বেকার, প্রথম আলো]
[১৪১] "প্রচলিত উচ্চশিক্ষা-ব্যবস্থায় মর্যাদা নয়, কেবল ডিগ্রি অর্জন সম্ভব।" বাংলা একাডেমির সেমিনারে শিক্ষাবিদরা; ২৬ আগস্ট, ২০১৫, দৈনিক ইত্তেফাক।
[১৪২] মোহাইমিন পাটোয়ারি, ব্যাংকব্যবস্থা ও টাকার গোপন রহস্য
[১৪৩] সহিহুল বুখারি: ৩৬২৩; সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৮১; সুনানুন নাসায়ি: ৬২৪০
[১৪৪] সহিহুল বুখারি ২৭৫৩; সহিহ মুসলিম: ২০৬; সুনানুন নাসায়ি: ৬৪৪০
[১৪৫] মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪১৬০; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৬১৮১; সহিহুল জমি: ৩৩৩৬; হাদিসটি সহিহ।
[১৪৬] ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে অনলাইন মেডিকেল জার্নাল PLOS ONE-এ প্রকাশিত গবেষণায় এমবিবিএস শেষ বর্ষের সরকারি মেডিকেলের ২০৭ জন ও বেসরকারি মেডিকেন কলেজের ১০৭ জন ছাত্রীর ওপর জরিপ করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ছাত্রীদের ১৭ শতাংশ বলেছিলেন, বিয়ের বাজারে এই পেশার দাম আছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px